Showing posts with label Facebook. Show all posts
Showing posts with label Facebook. Show all posts

Tuesday, 23 February 2021

মার্কিন সোশাল মিডিয়ার বিরুদ্ধে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর যুদ্ধ ঘোষণার উদ্দেশ্য কি?

২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২১ 

 



গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি ‘ফেইসবুক’ অস্ট্রেলিয়ার ব্যবহারকারীদের জন্যে সংবাদ মিডিয়ার কনটেন্ট দেখা বা শেয়ার করার সক্ষমতা বন্ধ করে দেয়। কয়েক মাস ধরে অস্ট্রেলিয়ার সাথে ‘ফেইসবুক’এর যে টানাপোড়েন চলছিল, তার ফলাফল ছিল এটা। অস্ট্রেলিয়ার আইনপ্রণেতারা আলোচনা করছেন যে, সংবাদ মিডিয়া এবং সোশাল মিডিয়ার মাঝে সম্পর্ককে নতুন করে কিভাবে ব্যালান্স করা যায়। প্রস্তাবিত নতুন আইনের অধীনে ‘ফেইসবুক’ এবং ‘গুগল’এ সার্চ রেজাল্টে বা নিউজ ফিডে সংবাদ কনটেন্ট দেখালে সংবাদ মাধ্যমকে অর্থ দেবে সোশাল মিডিয়া কোম্পানি। ২৩শে ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার ট্রেজারার বা অর্থমন্ত্রী জশ ফ্রাইডেনবার্গ সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, তিনি মার্ক জুকারবার্গের সাথে কথা বলেছেন এবং জুকারবার্গ তাকে আশ্বাস দিচ্ছেন যে, সামনের দিনগুলিতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যবহারকারীদের উপর থেকে ফেইসবুকের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে; কারণ ‘ফেইসবুক’ আবারও অস্ট্রেলিয়াকে বন্ধু হিসেবে নিচ্ছে।

‘বিবিসি’ বলছে যে, অস্ট্রেলিয়ার আইনপ্রণেতারা মনে করছেন যে, ডিজিটাল যুগে আয়ের বন্টনে সমতা আসা প্রয়োজন। কারণ সোশাল মিডিয়ার আবির্ভাবের পর থেকে সংবাদ মাধ্যমগুলির আয়ে ভাটা পড়েছে। ‘ফেইসবুক’ বলছে যে, মিডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে তারা আর্থিকভাবে খুব বেশি লাভবান না হওয়ায় কোম্পানিগুলির সাথে চুক্তি করতে চাইছে না তারা। ‘ফেইসবুক’এর মাত্র ৪ শতাংশ পোস্ট মিডিয়া থেকে আসা। ‘ফেইসবুক অস্ট্রেলিয়া’র প্রধান নির্বাহী উইলিয়াম ইসটন বলছেন যে, বিগত বছরে ‘ফেইসবুক’ অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়া কোম্পানিগুলিকে ৫ বিলিয়ন ‘ক্লিক’ যোগাড় করে দিয়েছে; যা দিয়ে মিডিয়া কোম্পানিগুলির পোস্ট বহু মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। সেই হিসেবে ‘ফেইসবুক’এরই মিডিয়া কোম্পানিগুলির কাছ থেকে ৪’শ ৭ মিলিয়ন ডলার পাওয়া উচিৎ। বর্তমানে মার্কিন এবং ব্রিটিশ ব্যবহারকারীদের জন্যে ‘ফেইসবুক’ ‘নিউজ ট্যাব’ তৈরি করেছে; যার মাধ্যমে মিডিয়া কোম্পানিগুলির খবর শেয়ার করছে ‘ফেইসবুক’ এবং বিনিময়ে মিডিয়া কোম্পানিগুলি অর্থ পাচ্ছে।

সার্চ ইঞ্জিন কোম্পানি ‘গুগল’ ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্ক কর্তনের চিন্তা করার পর আবারও ছাড় দেয়ার মানসিকতা দেখাচ্ছে। তবে গত কয়েকদিনের মাঝেই ‘গুগল’ অস্ট্রেলিয়ার বেশ কয়েকটা মিডিয়া কোম্পানির সাথে চুক্তি করেছে। সার্চ ইঞ্জিনে মিডিয়া কোম্পানিগুলির কনটেন্ট যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মিডিয়া এসোসিয়েশন ‘নিউজ মিডিয়া এলায়েন্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৮ সালে নিউজ মিডিয়ার কারণে ‘গুগুল’ ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। ‘গুগল’এর ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবহার করে ‘গুগল’ যে আরও আয় করে, তা এই হিসেবে ধরা হয়নি। অথচ পুরো যুক্তরাষ্ট্রের নিউজ মিডিয়া একত্রে সেবছর আয় করেছে মাত্র ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। ‘নিউজ মিডিয়া এলায়েন্স’এর প্রেসিডেন্ট ডেভিড চ্যাভার্ন বলছেন যে, তথ্য চায় বিনা খরচায় পাঠকের কাছে পৌঁছাতে; কিন্তু সাংবাদিকদের তো এই কাজের বিনিময়ে অর্থ দরকার। যদি মিডিয়া কোম্পানিগুলি সাংবাদিকতার উন্নয়নে কাজ করে আর সোশাল মিডিয়া এর বিনিময়ে কোন অর্থ দিতে না চায়, তাহলে মিডিয়ার কাজ কঠিন হয়ে যায়। ‘গুগল’ বলছে যে, এই প্রতিবেদনে সঠিক তথ্য ফুটে ওঠেনি। ‘গুগল’ প্রতিমাসে মিডিয়া কোম্পানিগুলিকে ১০ বিলিয়ন ‘ক্লিক’ দিচ্ছে। এই ‘ক্লিক’ ব্যবহার করে মিডিয়া কোম্পানিগুলি পাঠক পাচ্ছে এবং বিজ্ঞাপন পাচ্ছে। ‘কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর বিল গ্রুসকিন ‘দ্যা গার্ডিয়ান’কে বলেন যে, এই গবেষণার ভিত বেশ দুর্বল। তিনি বলছেন যে, সোশাল মিডিয়াকে আরও নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। তবে মিডিয়া গ্রুপগুলিরও উচিৎ আরও শক্ত তথ্যের উপর তাদের প্রতিবেদনকে দাঁড় করানো।

‘ফেইসবুক’ অস্ট্রেলিয় মিডিয়াকে আটকাতে গিয়ে তাদের ডোমেইন বন্ধ করেনি; বরং ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘এআই’এর মাধ্যমে মিডিয়া কনটেন্ট বন্ধ করতে চেয়েছে। এখানেই হয়ে গেছে বিপত্তি। ‘ফেইসবুক’এর ‘এআই’ নিউজ মনে করে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি কিছু পেইজ বন্ধ করে দেয়। এর মাঝে ছিল অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য দপ্তর এবং জরুরি সেবাদানকারী সংস্থার ফেইসবুক পেইজ। অনেকেই কোম্পানির এহেন সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক’ বা ‘একনায়কোচিত’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কেউ কেউ এই দাবিও করতে শুরু করেছেন যে, মিডিয়াগুলি বন্ধ করে দেয়ায় মিথ্যা বানোয়াট খবরে ভরে যাচ্ছে ‘ফেইসবুক’। তবে উল্টোদিকে কেউ কেউ বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তাবিত আইনের পিছনে মিডিয়া টাইকুন রুপার্ট মারডকের হাত রয়েছে। মারডকের ‘নিউজ কর্প’ অস্ট্রেলিয়ার প্রধান পত্রিকাগুলির অনেকগুলিরই মালিক। অস্ট্রেলিয়ার বৃহৎ মিডিয়া কোম্পানি ‘নাইন এন্টারটেইনমেন্ট’ বলছে যে, অস্ট্রেলিয়ার সরকার ও ‘ফেইসবুক’এর আলোচনার খবরে তারা খুশি হয়েছে। তারা আশা করছে যে, অচিরেই এই আলোচনা নতুন একটা বাণিজ্যিক চুক্তির দিকে এগুবে। তবে এই পুরো ব্যাপারটা ‘ফেইসবুক’এর দুর্নামের কারণ হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন যে, ‘ফেইসবুক’ গায়ের জোরে নিজের স্বার্থকে ধরে রাখতে চাইছে। আর অস্ট্রেলিয়ার সাথে সমমনা দেশগুলি ব্যাপারটাকে খুব মনোযোগ সহকারে দেখছে, এবং তাদের দেশেও একই ধরনের আইন তৈরি করার ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়াকে উদাহরণ হিসেবে দেখছে।

গত ১৯শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, ‘ফেইসবুক’এর সাথে অস্ট্রেলিয়া সরকারের দ্বন্দ্বকে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটা বেসরকারি কোম্পানির সাথে অস্ট্রেলিয় সরকারের ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে দেখছে। এই ব্যবসায়িক লেনদেনের মাঝে যারা যুক্ত রয়েছে, তারাই যেকোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। প্রাইসের কথায় পরিষ্কার যে, মার্কিন সরকার এই দ্বন্দ্বে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে দাঁড়াতে চাইছে না। ‘ফেইসবুক’ এবং ‘গুগল’এর মালিক ‘এলফাবেট’ উভয়েই মার্কিন কোম্পানি। ২০২০ সালে ‘এলফাবেট’ আয় করে প্রায় ১’শ ৮২ বিলিয়ন ডলার। আর ‘ফেইসবুক’ আয় করে ৮৬ বিলিয়ন ডলার। ‘গ্লোবাল ফিনান্স ম্যাগাজিন’এর হিসেবে ২০২০ সালের শেষে ‘এলফাবেট’এর বাজারমূল্য ছিল ১১’শ ১৬ বিলিয়ন ডলার; আর ‘ফেইসবুক’এর বাজারমূল্য ছিল ৭’শ ৯৫ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের সবচাইতে দামি কোম্পানিগুলির মাঝে ‘এলফাবেট’ ৫ম; আর ‘ফেইসবুক’ ৭ম। সবচাইতে দামি ১০টা কোম্পানির মাঝে ৬টাই মার্কিন; যার মাঝে ‘এপল’, ‘আমাজন’ এবং ‘মাইক্রোসফট’ও রয়েছে।

অপরদিকে ব্রিটেন সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে কথা বলেছে এবং সোশাল মিডিয়াকে একটা শৃংখলার মাঝে আনার প্রচেষ্টার আভাস দিয়েছে। ১৯শে ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস ক্লেভারলি ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, ব্রিটেন অবশ্যই অস্ট্রেলিয়ার সাথে ‘ফেইসবুক’এর সমস্যার সমাধান চায়। তবে শেষ পর্যন্ত এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, একটা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের মাঝে যেন একটা ব্যালান্স থাকে। ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’ বলছে যে, আরও কিছু দেশ অস্ট্রেলিয়াকে অনুসরণ করতে যাচ্ছে। ব্রিটিশ কমনওয়েলথের আরেক সদস্যরাষ্ট্র কানাডা অস্ট্রেলিয়াকে অনুসরণ করতে চাইছে। কানাডার মন্ত্রী স্টিফেন গাইলবল্ট বলেন যে, ‘ফেইসবুক’ যা করেছে তা একেবারেই ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’। কানাডা এই যুদ্ধের সন্মুখে রয়েছে; এবং ভীত হবে না। ‘ফেইসবুক’ এবং ‘গুগল’কে আয় শেয়ার করতে বাধ্য করতে কিছুদিন আগেই গাইলবল্ট অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ফিনল্যান্ডের মন্ত্রীদের সাথে বসে একটা কোয়ালিশন তৈরি করতে চেয়েছেন। তিনি আশা করছেন যে, ১৫টা দেশ এই কোয়ালিশনে যুক্ত হতে পারে। তিনি প্রশ্ন করেন যে, ‘ফেইসবুক’ কি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি এবং অন্যান্য সকল রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে? ক্লেভারলি এবং গাইলবল্টের কথাগুলি বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, ব্রিটিশ কমনওয়েলথের দেশগুলি ‘ফেইসবুক’ এবং ‘গুগল’এর বিরুদ্ধে একটা আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন তৈরি করতে চাইছে; যার মূলে থাকবে নতুন কিছু আইন। আন্তর্জাতিক আইনকে নিজের প্রভাব বৃদ্ধিতে ব্যবহার করতে চাইছে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’। এক্ষেত্রে ইউরোপিয় পুঁজিবাদের পুরোনো স্তম্ভ সংবাদ মাধ্যমকে ব্যবহার করে আইনগত নেতৃত্ব নেয়ার মাধ্যমে মূলতঃ মার্কিন নেতৃত্বে থাকা সোশাল মিডিয়ার বিরুদ্ধে বাকি দুনিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশকে তাদের সাথে চাইছে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ কোন সুযোগই হাতছাড়া করতে চাইছে না; বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে, যার মাধ্যমে ব্রিটেন একসময় দুনিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছে।

Saturday, 19 December 2020

আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় সোশাল মিডিয়াকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়েছে ফ্রান্স ও রাশিয়া

২০শে ডিসেম্বর ২০২০ 

 ফেইসবুকের এই ব্যবস্থা গ্রহণে রুশ অপারেশন বেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে ঠিকই, তবে একইসাথে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে দুর্বল হওয়া ফ্রান্সের অনৈতিক অবস্থানও জনসন্মুখে এসে গেল। এতে শুধু ফ্রান্সই ইমেজ সংকটে পড়েনি, গণতন্ত্রের ঝান্ডাবাহী পশ্চিমা লিবারাল চিন্তার দেশগুলি আফ্রিকার প্রাক্তন উপনিবেশগুলিকে স্বাধীনভাবে চলতে দেবার বেলায় কতটা লিবারাল, তা আরও একবার প্রকাশ পেল।

গত ১৫ই ডিসেম্বর সোশাল মিডিয়া কোম্পানি ফেইসবুক ঘোষণা দেয় যে, তারা বেশকিছু একাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে, যেগুলির রুশ এবং ফরাসি সরকারি গোয়েন্দা বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয় যে, এসব একাউন্ট থেকে ভুয়া আইডির মাধ্যমে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কর্মকান্ড পরিচালিত হতো। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ বলছে যে, প্রথমবারের মতো ফেইসবুক কোন পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশের সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ থাকা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলো। ফেইসবুক রুশ যে গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, তারা ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে জড়িত ছিল বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। ফেইসবুক বলছে যে, মোট ২’শ ৭৪টা একাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে; সাথে এদের দ্বারা চালিত বিভিন্ন গ্রুপ এবং পেইজ ছাড়াও ‘ইন্সটাগ্রাম’ একাউন্টও রয়েছে। ‘ইন্সটাগ্রাম’ হলো একটা ছবি শেয়ারিং ওয়েবসাইট, যা ফেইসবুক ২০১২ সালে ১ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। এক সংবাদ সন্মেলনে ফেইসবুকের কর্মকর্তারা বলেন যে, এই অপারেশনগুলি সবচাইতে বেশি টার্গেট করেছে পশ্চিম আফ্রিকার মালি এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিককে। এছাড়াও বুরকিনা ফাসো, নিজের, আলজেরিয়া, আইভোরি কোস্ট এবং শাদ কমবেশি আক্রান্ত হয়েছে। নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ গ্রুপ ‘গ্রাফিকা’ বলছে যে, ফেইসবুকের এহেন ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো তৃতীয় কোন রাষ্ট্রে দু’টা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার চিত্র ফুটে উঠলো। আফ্রিকার দেশগুলিতে প্রভাব বিস্তারের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুধু ফেইসবুকই নয়, টুইটার, ইউটিউব এবং বিভিন্ন আর্টিকেলের মাঝেও দেখা যাচ্ছে। ‘গ্রাফিকা’র চিফ ইনোভেশন অফিসার ক্যামিল ফ্রাঁসোয়া বলছেন যে, যখন গণতান্ত্রিক সরকারগুলি মিথ্যা বানোয়াট খবর প্রচারে মনোনিবেশ করে, তখন তাদের জন্যে নিজেদের দেশে অন্য কারুর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাকে নিন্দা করাটা কঠিন হয়ে যায়।

বন্ধ করা ফরাসি একাউন্টগুলির মাঝে রয়েছে ৮৪টা ফেইসবুক একাউন্ট, ১৪টা ‘ইন্সটাগ্রাম’ একাউন্ট এবং কতগুলি ফেইসবুক গ্রুপ ও পেইজ। এদের প্রায় হাজার পাঁচেক ফলোয়ার ছিল। ফরাসিরা আফ্রিকান মানুষের ভুয়া বেশ ধরে ফরাসি এবং আরবি ভাষায় আফ্রিকায় ফ্রান্সের নীতি, সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আফ্রিকার নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা, ইত্যাদি বিষয় ছাড়াও আফ্রিকায় প্রাক্তন ফরাসি উপনিবেশগুলিতে ফরাসি সামরিক বাহিনীর কর্মকান্ডের পক্ষে পোস্ট দিচ্ছিল। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির জনগণকে টার্গেট করা একটা ফেইসবুক পোস্টে বলা হয় যে, ‘মালির জন্যে রুশ সাম্রাজ্যবাদীরা হলো গ্যাংগ্রিনের মতো! জারিস্ট ব্রেইনওয়াশ থেকে সাবধান থাকুন!’ ফেইসবুক বলছে যে, যদিও এই একাউন্টগুলি নিজেদের পরিচয় এবং সমন্বয় গোপন করতে চাইছিল, তথাপি তাদের তদন্তে পাওয়া গেছে যে, এই ব্যক্তিদের সাথে ফরাসি সামরিক বাহিনীর যোগসাজস রয়েছে। ফেইসবুকের ব্যবস্থা নেবার পরদিন ফরাসি সরকার এই ঘটনায় তাদের নিজেদের জড়িত থাকার ব্যাপারে কোনকিছু না বলে শুধু বলে যে, আফ্রিকায় মিথ্যা বানোয়াট খবর মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয় যে, ফরাসি সরকার এই প্রতিবেদন খতিয়ে দেখছে। এই মুহুর্তে তারা কাউকে দায়ি করতে পারছেন না; বরং তারা বলছেন যে, যেহেতু অনেকগুলি পক্ষ এখানে জড়িত, তাই কাউকে নির্দিষ্ট করা কঠিন। তাদের পার্টনারদের সাথে ফ্রান্স আফ্রিকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করে যাচ্ছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়।

অপরপক্ষে রুশদের মূল লক্ষ্য ছিল সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে ২৭শে ডিসেম্বরের আসন্ন নির্বাচন। একটা রুশ পোস্টে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফস্টিন আরশাঞ্জ তুয়াদেরার পক্ষ নিয়ে বলা হয় যে, শান্তির পক্ষে প্রেসিডেন্ট তুয়াদেরা যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তার কারণে পরবর্তী প্রজন্ম ভালো জীবন পাবে। রুশ নেটওয়ার্কগুলি রাশিয়ার ডেভেলপ করা করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের পক্ষেও পোস্ট দেয়। বন্ধ করা রুশ একাউন্টগুলির প্রায় ৬০ লক্ষ ফলোয়ার ছিল। রুশরা লিবিয়ার রাজনৈতিক আলোচনাকে টার্গেট করে অপারেশন চালাচ্ছিল। লিবিয়ার এই ফেইসবুক পেইজগুলিতে ১৩ লক্ষ ফলোয়ার ছিল। এছাড়াও পশ্চিম আফ্রিকার গিনি উপকূলের দেশ ইকুয়েটোরিয়াল গিনিতে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা চলছে বলেও তথ্য ছড়ায় রুশরা। রুশরা অবশ্য সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে অন্য কোন দেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করার ব্যাপারটা সরাসরিই অস্বীকার করেছে। রুশ এবং ফরাসি নেটওয়ার্কগুলি একে অপরের পোস্টে কমেন্ট করছিল এবং একে অপরের ফ্রেন্ড লিস্টে ঢোকার চেষ্টা করছিল। তারা একে অপরকে ভুয়া একাউন্ট বলে অভিযোগ করছিল। ফেইসবুক বলছে যে, ২০১৭ সাল থেকে ফেইসবুক ১’শ নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা নিয়েছে, যার মাঝে মাত্র একটাতে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ একে অপরের সাথে যোগাযোগ করছিল। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যখন রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে মিথায় বানোয়াট তথ্য দিয়ে সোশাল মিডিয়া ভরিয়ে দেয়, তখন সাধারণ জনগণ এর শিকারে পরিণত হয়।

ফরাসি পত্রিকা ‘লে ওপিনিওন’এর এক লেখায় ফরাসি সাংবাদিক জঁ ডমিনিক মারশে ফরাসি সামরিক বাহিনীর এই ‘সমন্বিত ভুয়া কর্মকান্ড’র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, এধরণের কর্মকান্ড এতদিন রাশিয়ার কাছ থেকে আসতো; এখন ফরাসি সেনাবাহিনী এহেন কর্মকান্ডে জড়িয়েছে। ফরাসি পত্রিকায় সেদেশের সরকারের আফ্রিকা নীতি নিয়ে সমালোচনা করা হলেও এগুলি মূলতঃ ফ্রান্সের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতিরই ফলাফল। পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে নিয়মিত সামরিক হস্তক্ষেপ করায় এমনিতেই ফরাসিরা ইমেজ সংকটে রয়েছে। তদুপরি ফ্রান্সের সামরিক হস্তক্ষেপের পর থেকে পশ্চিম আফ্রিকার মালি এবং আশেপাশের নিজের, বুরকিনা ফাসো, আইভোরি কোস্টে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার কারণে আফ্রিকায় ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক নীতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। আফ্রিকায় ফ্রান্সের এই দুর্বল অবস্থানের সুযোগ নিয়ে অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্র নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করতে চাইছে; ফেইসবুকে এই দ্বন্দ্ব সেই ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সোশাল মিডিয়ার গুরুত্ব যে বাড়ছে, তা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির সুনির্দিষ্ট অপারেশনই বলে দিচ্ছে। ফেইসবুকের এই ব্যবস্থা গ্রহণে রুশ অপারেশন বেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে ঠিকই, তবে একইসাথে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে দুর্বল হওয়া ফ্রান্সের অনৈতিক অবস্থানও জনসন্মুখে এসে গেল। এতে শুধু ফ্রান্সই ইমেজ সংকটে পড়েনি, গণতন্ত্রের ঝান্ডাবাহী পশ্চিমা লিবারাল চিন্তার দেশগুলি আফ্রিকার প্রাক্তন উপনিবেশগুলিকে স্বাধীনভাবে চলতে দেবার বেলায় কতটা লিবারাল, তা আরও একবার প্রকাশ পেল।