Tuesday, 1 December 2020

ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীর হত্যাকান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভাজনেরই ফলফল

০১লা ডিসেম্বর ২০২০ 

মার্কিনীরা তাদের নিজেদের ঘরে মারাত্মকভাবে বিবাদে জড়িয়েছে, যার ফলাফল বিশ্বব্যাপী প্রকাশ পাচ্ছে। এটা পরিষ্কার যে, ট্রাম্প প্রশাসন হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগে নিশ্চিত করতে চাইছে যে, পরবর্তী বাইডেন প্রশাসনের জন্যে ইরানের সাথে নতুন করে চুক্তি করা যেন কঠিন হয়ে যায়। ইরানের জন্যেও এখন জাতীয় গৌরব রক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আবার আলোচনায় বসাটা দুরূহ হয়ে গেলো।

গত ২৭শে নভেম্বর ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের শীর্ষ বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ আজানা আততায়ীদের হাতে নিহত হবার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ইরানের সম্ভাব্য প্রত্যুত্তরই শুধু নয়, এই হত্যাকান্ডের পিছনে ইস্রাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও আলোচনায় আসছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ফাখরিজাদেহ ছিলেন ইরানের পরমাণু অস্ত্র প্রকল্পের জনক। সে হিসেবে হামলাকারীরা ইরানের পরমাণু প্রকল্পে এর চাইতে বড় কোন টার্গেট পেতে পারে না। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মাঝে ইরানের ৪ জন পরমাণু বিজ্ঞানী রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করে। ইরানিরা ইস্রাইলকেই এই হামলাগুলির জন্যে দোষারোপ করেছিল। এবার ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি না হলেও বিশ্লেষকেরা ইস্রাইলকেই এব্যাপারে দায়ি করছেন। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিদের হত্যাকান্ড সাম্প্রতিককালে বড় খবর হয়েছে। ২০১৯এর ২৭শে ডিসেম্বর ইরাকের কিরকুক শহরে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের রকেট হামলায় একজন মার্কিন কন্ট্রাক্টর নিহত হবার পর ৩রা জানুয়ারি বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের ‘আইআরজিসি’ বাহিনীর প্রধান কাসেম সুলাইমানিকে নিহত হন। এর প্রতিশোধ হিসেবে ৮ই জানুয়ারি ইরানিরা ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দু’টা সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে, যেখানে কেউ হতাহত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিবাদ

মার্কিন অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘এফবিআই’এর প্রাক্তন কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এসিসট্যান্ট ডিরেক্টর ফ্র্যাঙ্ক ফিগলিউজি ‘এমএসএনবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ইস্রাইল বুঝতে পারছিল যে, ইরানের বিরুদ্ধে তারা কিছু করতে গেলে সেটা কয়েক সপ্তাহের মাঝেই করতে হবে; যতদিন ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া ইস্রাইল খুব সম্ভবতঃ এরকম কোন কাজের মাঝে যাবে না। ট্রাম্প এই কাজগুলির দায়িত্ব নেবেন না; নিতে হবে বাইডেনকে। এটা পরিষ্কার যে, ট্রাম্প প্রশাসন হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগে নিশ্চিত করতে চাইছে যে, পরবর্তী বাইডেন প্রশাসনের জন্যে ইরানের সাথে নতুন করে চুক্তি করা যেন কঠিন হয়ে যায়। ইরানের জন্যেও এখন জাতীয় গৌরব রক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আবার আলোচনায় বসাটা দুরূহ হয়ে গেলো। আর ইরানও চাইবে ইস্রাইলের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে গেলে তা যেন ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি কয়েকদিনের মাঝেই সম্পন্ন হয়; বাইডেন ক্ষমতায় বসার আগেই। ফিগলিউজি মনে করছেন যে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মাঝেই হয়তো ইস্রাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধমূলক আক্রমণ দেখা যাবে। তিনি আরও বলছেন যে, ইরাকে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গ্রুপগুলি বেশি সক্রিয় বিধায় সেখানেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে হামলা হবার সম্ভাবনা বেশি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রেই সকলে এক সুরে কথা বলছেন না। প্রাক্তন মার্কিন জেনারেল জ্যাক কীন ‘ফক্স নিউজ’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে বহুবার হামলা করলেও দেশটা যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি নয়; কিন্তু ইরানের পরমাণু প্রকল্প ইস্রাইলের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি। যেকারণে ইরানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইস্রাইলের নীতি সবসময়েই ভিন্ন ছিল। ইস্রাইলিরা সবসময়েই বিশ্বাস করেছে যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রকল্প চালিয়ে নিয়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ইস্রাইলিরা তেহরানের একটা গোডাউন থেকে বিপুল পরিমাণ গোপন দলিলপত্র চুরি করে তেল আভিভে নিয়ে আসে। সেই দলিলগুলি প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করার পরেও ইরান তার বোমা তৈরির প্রকল্প থেকে সরে আসেনি। ইরানের নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির স্থাপনায় ইস্রাইলিরা হামলা করে দেশটার পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রকল্পকে পিছিয়ে দেবার চেষ্টা করে। জানুয়ারি মাসে কাসেম সুলাইমানিকে হত্যার পর ইরানিরা মার্কিন নির্বাচনকে মাথায় রেখেই হয়তো বড় কোন প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে বিরত থাকে। এবারও জো বাইডেন নির্বাচনে জেতার কারণে ইরানিরা সেরকমই চিন্তা করতে পারে। ইরানিরা হয়তো মনে করতে পারে যে, বাইডেন প্রশাসন ইরানের উপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেবে।

 

ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীর গাড়ি। এই হত্যাকান্ডটা ছিল অন্য কোন হত্যাকান্ড থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রায় হলিউড স্টাইলে রিমোট কন্ট্রোল মেশিন গানের মাধ্যমে এই হত্যাকান্ড চালনা করা হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এধরণের ঘটনা সামনের দিনগুলিতে সংঘাতের ভাষা পরিবর্তন করে দিচ্ছে। যুদ্ধবিগ্রহে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন এক উচ্চতা অর্জন করেছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। হত্যাকান্ডের ধরণ নতুন ধরণের এক সংঘাতের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভূরাজনৈতিক ব্যালান্সকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারে।


দীর্ঘমেয়াদী চিত্র

এই হত্যাকান্ডটা ছিল অন্য কোন হত্যাকান্ড থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রায় হলিউড স্টাইলে রিমোট কন্ট্রোল মেশিন গানের মাধ্যমে এই হত্যাকান্ড পরিচালনা করা হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এধরণের ঘটনা সামনের দিনগুলিতে সংঘাতের ভাষা পরিবর্তন করে দিচ্ছে। যুদ্ধবিগ্রহে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন এক উচ্চতা অর্জন করেছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। ড্রোন যুদ্ধ এই মুহুর্তে যথেষ্ট আলোচিত বিষয় হয়ে গিয়েছে; বিশেষ করে সিরিয়া, লিবিয়া এবং আজেরবাইজানের যুদ্ধে ড্রোনের সফল ব্যবহারের কারণে তা বারংবার আলোচনায় উঠে আসছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপর গোয়েন্দাবৃত্তি এমনকি হামলার জন্যেও ব্যবহৃত হচ্ছে ড্রোন। কাসেম সুলাইমানিকেও ড্রোন হামলার মাধ্যমেই হত্যা করা হয়েছিল। ছোট ড্রোনগুলিও অতি দ্রুতই মারাত্মক সক্ষমতা দ্বারা সজ্জিত হচ্ছে। অনেকেই বলছেন যে, ড্রোন ব্যবহারের ফলে অনেক রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী কম খরচেই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা অর্জন করে ফেলতে পারে; যেগুলির ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিকভাবে হতে পারে অতি গুরুত্ববহ। ইরান এই হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নিক আর না নিক, এই হত্যাকান্ড নতুন ধরণের এক সংঘাতের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভূরাজনৈতিক ব্যালান্সকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

২০২০ সাল ইরানের জন্যে সকল দিক থেকেই খারাপ যাচ্ছে। এবছরেই ইরানের নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনায় এক বোমা হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই স্থাপনায় পারমাণবিক বোমা তৈরিতে প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্টএর জন্যে ‘সেন্ট্রিফিউজ’ নামক যন্ত্র তৈরি করা হতো। অনেকেই এই হামলার পিছনে ইস্রাইলকেই দায়ি করেছে। তবে ইরান এই হামলার প্রতিশোধ হিসেবেও তেমন কিছু দেখাতে পারেনি, যা ইরানের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে আরও একবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অনেকেই বলছেন যে, ইরান তার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা এবং ব্যক্তিত্বদের রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছে না; উপরন্তু এরকম হামলার প্রত্যুত্তর দিতেও তার অক্ষম বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই সকলকিছুই এমন সময়ে আসছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বাজার সর্বনিম্ন এবং এর উপরে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা নতুন করে আরোপ করেছে। এছাড়াও অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে থাকা অবস্থাতেই ইরানে আঘাত করেছে করোনাভাইরাস। মহামারি ঠেকাতে ব্যর্থতাই শুধু নয়, নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে মহামারির প্রকোপ সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রদান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে ইউক্রেনের বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করা এবং সেটা প্রথমতঃ অস্বীকার করা; এবং পরবর্তীতে আবার স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ দেয়া; ইত্যাদি ঘটনা ইরানের রাষ্ট্রকে দুর্বল করেছে।

ইরান কি করতে পারে

অঞ্চলিকভাবেও ইরানের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে। কাসেম সুলাইমানির হত্যার ফলে সিরিয়া এবং ইরাকে ইরানের অবস্থান যথেষ্টই দুর্বল হয়েছে। নভেম্বর মাসেই ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের সাথে বৈঠকে বসেন। এই বৈঠক ইরানের জন্যে মোটেই ভালো খবর নয়; কারণ এর মাধ্যমে ইস্রাইল, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ইরানের শত্রু দেশগুলির একত্রে বসার আরেকটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। আরব দেশগুলি তাদের অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেও অস্ত্র ক্রয় বন্ধ রাখেনি। এছাড়াও সিরিয়ার যুদ্ধেও ইরানকে তুরস্কের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ইরাকেও ইরানের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে তুরস্ক এবং সৌদি আরব। লেবাননেও অর্থনৈতিক ধ্বস, বৈরুতের বিস্ফোরণ এবং সামাজিক অসন্তোষের কারণে ইরানের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে। ইয়েমেনের যুদ্ধও প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছে।

মার্কিন ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানী হত্যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের পক্ষে ইরানের সাথে নতুন করে আরেকটা চুক্তি করা কঠিন হবে। একইসাথে তিনি মনে করছেন যে, ইরান এমন কিছু করতে চাইবে না, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের অধীনে আরেকটা চুক্তি করাটা একেবারে অবাস্তব হয়ে যায়। ২০২০ সালে ইরানের জন্যে একমাত্র ‘ভালো’ খবর হলো, জো বাইডেন মার্কিন নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। বাইডেন সরকারের হবু জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভান এবং পররাষ্ট্র সচিব টনি ব্লিনকিন ইরানের সাথে আলোচনার ব্যাপারে আগ্রহী। এমতাবস্থায় ইরান হয়তো ইস্রাইলের কিছু কর্তাব্যক্তির বিরুদ্ধে হামলা করে প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করতে পারে। তবে ইরানের সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

মার্কিনীরা তাদের নিজেদের ঘরে মারাত্মকভাবে বিবাদে জড়িয়েছে, যার ফলাফল বিশ্বব্যাপী প্রকাশ পাচ্ছে। ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীর হত্যাকান্ড এরকমই একটা ঘটনা মাত্র। ওবামা প্রশাসনের সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’এর প্রাক্তন ডিরেক্টর জন ব্রেনান ২৭শে নভেম্বর এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ইরানের বিজ্ঞানীকে হত্যা করাটা ছিল একটা অপরাধমূলক এবং ঔধ্যত্বপূর্ণ কাজ। এর ফলে পাল্টাপাল্টি হামলায় আঞ্চলিক সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। ইরানের নেতৃবৃন্দের উচিৎ হবে পরবর্তী প্রজ্ঞাবান এবং দ্বায়িত্বশীল মার্কিন নেতৃত্বের জন্যে অপেক্ষা করা; এবং ধৈর্য্যধারণ করে প্রতিশোধমূলক কর্মকান্ড থেকে দূরে থাকা। ব্রেনানের এই বার্তা যে ব্যাপারটা এড়িয়ে যায় তা হলো, তিনি ‘সিআইএ’এর নেতৃত্বে থাকার সময়েই ৪ জন ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি অবশ্য সেসময় চুপই ছিলেন। ব্রেনানের বার্তার জবাবে টেক্সাসের মার্কিন সিনেটর টেড ক্রুজ আরেক টুইটার বার্তায় বলেন যে, এটা অদ্ভুত ব্যাপার যে, ‘সিআইএ’এর একজন প্রাক্তন প্রধান নিয়মিতভাবে এমন একটা সরকারের পক্ষে কথা বলছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস কামনা করে। ক্রুজ আরও বলেন যে, ইরান ইস্রাইলকে সকল সময়েই আক্রমণ করে কথা বলে; জো বাইডেন কি এব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন? ক্রুজের বার্তার জবাবে জন ব্রেনান আবারও টুইটার বার্তায় বলেন যে, ক্রুজের আইনের তোয়াক্কা না করা এবং সবকিছু সাধারণভাবে নেবার চিন্তাটাই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তিনি টেক্সাসের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা রাখেন না।

Saturday, 28 November 2020

‘আরসেপ’ বাণিজ্য চুক্তি... ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন?

২৯শে নভেম্বর ২০২০

‘আরসেপ’ অত্র অঞ্চলের ভূরাজনৈতিকে পরিবর্তিত করেনি। এখনও এই অঞ্চলের বেশিরভাগ পণ্য তৈরি হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বকে টার্গেট করেই। এশিয়ার দেশগুলি নিজেদের মাঝে পণ্যের ‘কম্পোনেন্ট’ বা অংশবিশেষ নিয়ে বাণিজ্য করে, যাতে পশ্চিমা বাজারে ‘ফিনিশড প্রডাক্ট’ বা সর্বশেষ পণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়। সেই লক্ষ্যে ‘আরসেপ’ সেই সহযোগিতা বৃদ্ধি করছে মাত্র।

গত ১৫ই নভেম্বর দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট ‘এসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস’ বা ‘আসিয়ান’এর ১০টা দেশ সহ এশিয়া প্যাসিফিকের মোট ১৫টা দেশ পৃথিবীর সবচাইতে বড় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।‘রিজিওনাল কম্প্রিহেন্সিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ’ বা ‘আরসিইপি’ বা ‘আরসেপ’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই জোটের সদস্যদেশগুলির মাঝে পৃথিবীর প্রায় ৩০ শতাংশ বাণিজ্য হয়ে থাকে। এই অঞ্চলের মাঝে পড়েছে ২’শ ২০ কোটি মানুষ, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় একতৃতীয়াংশ; এর ২৬ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপি গোটা বিশ্বের ২৯ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বাণিজ্য চুক্তি এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের চাইতেও এই চুক্তি বড়। স্বাক্ষর করা দেশগুলির মাঝে চীন ছাড়াও মার্কিন প্রভাব বলয়ে থাকা দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানও রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কমনওয়েলথ এবং ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার অংশ অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। তবে জোটের বাইরে থাকা দেশগুলির মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র। এরকম বিরল ঘটনার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আসলে কতটুকু?

২০১২ সালে আলোচনা শুরুর পর থেকে বেশ কিছু সময় পার হয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত ‘ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ’ বা ‘টিপিপি’ থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বের হয়ে আসার ঘোষণা দেবার পর থেকেই ‘আরসেপ’এর গুরুত্ব বেড়ে যায়। ওবামা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘টিপিপি’ নিয়ে যখন কথা চলছিল, তখনই প্রতিদ্বন্দ্বী চুক্তি হিসেবে ‘আরসেপ’এর আবির্ভাব হয়। ‘বিবিসি’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, ‘আরসেপ’ প্রকৃতপক্ষে ‘টিপিপি’র মতো শুল্ক কর্তনের দিকে যায়নি। তবে এর আকার এটাকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে; বিশেষ করে এর মাঝে চীন থাকার কারণে পুরো জোটের একত্রিত জিডিপি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। যদিও চীন এতকাল অনেক দেশের সাথেই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে, এবারই প্রথম চীন বহুপাক্ষিক কোন বাণিজ্য চুক্তির মাঝে ঢুকেছে। চীনা প্রধানমন্ত্রী লী কিচিয়াং বলেন যে, আট বছর ধরে দরকষাকষির পর বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে একটা আশার সঞ্চার হয়েছে। তিনি এই চুক্তিকে ‘বহুপাক্ষিকতা এবং মুক্ত বাণিজ্যে’র বিজয় বলে উল্লেখ করেন।

‘সিএনবিসি’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, এই চুক্তি চীনের জন্যে একটা ভূরাজনৈতিক বিজয়; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যখন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি নিয়ে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সরে আসছিল। এটা এখনও পরিষ্কার নয় যে, হবু মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন কোন বড় বাণিজ্য চুক্তির দিকে এগুবে কিনা। সিটি ব্যাঙ্কের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিটি রিসার্চ’ তাদের এক প্রতিবেদনে বলছে যে, অর্থনৈতিকভাবে এই চুক্তি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্ব বহন করছে এর কূটনৈতিক বার্তা। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের মাঝে এই চুক্তি বার্তা দিচ্ছে যে, পূর্ব এশিয়া মুক্ত বাণিজ্যের জন্যে প্রস্তুত রয়েছে। আর চীন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে বলে যা অনেকে মনে করছিল, তা আসলে ঠিক নয়। এছাড়াও এটা এখন বোঝা যাচ্ছে যে, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র অথবা শুধুমাত্র চীনের সাথে থাকার পক্ষপাতি নয়। এই ব্যাপারটা দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে। 

ভারত এই চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার ফলে স্বাক্ষরকারী অনেক দেশের কাছেই নতুন শুল্কমুক্ত এলাকার গুরুত্ব বেশকিছুটা কমে গেছে। সদস্য দেশগুলির জন্যে চুক্তিকে এড়িয়ে যাবার জন্যে যথেষ্ট পদ্ধতি রাখার ফলে এটা অত শক্তিশালী চুক্তি নয়। তথাপি চুক্তিটা অনেককেই মনে করাবে যে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চাইতে পারস্পরিক সহযোগিতায় অধিকতর বিশ্বাসী। ‘আরসেপ’এর কারণে চীন এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হবে না; কারণ চীন ইতোমধ্যেই অত্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু।

ভারতও এই চুক্তির আলোচনায় অংশ নেয়; তবে গত বছর কমদামি চীনা পণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে যাবার ভয়ে ভারত এই চুক্তির আলোচনা থেকে নিজেকে উঠিয়ে নেয়। ‘ক্যাপিটাল ইকনমিক্স’এর জ্যেষ্ঠ এশিয়া অর্থনীতিবিদ গ্যারেথ লেদার বলছেন যে, চুক্তিতে ভবিষ্যতে ভারতের ফিরে আসার জন্যে দুয়ার খোলা রাখা হয়েছে। জাপানিরাই মূলতঃ ভারতকে চেয়েছিল চীনের অর্থনৈতিক আকৃতিকে ব্যালান্স করতে। তবে হিমালয়ের পাদদেশে চীনের সাথে ভারতের দ্বন্দ্বের ফলে এই চুক্তিতে থাকাটা ভারতের জন্যে কঠিন হয়ে যায়। ‘সিটি রিসার্চ’ বলছে যে, ‘আরসেপ’এ না থাকার কারণে ভারত বিরাট একটা সুযোগ হারিয়েছে; ভারত এখন এই জোটের প্রতিদ্বন্দ্বী উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে নিজেকে শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবে না।

তবে অনেকেই বলছেন যে, এই চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলির জন্যে বড় কোন সুবিধা নিয়ে আসবে না; আর এর বাস্তবায়ন অনেক বছর লেগে যাবে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ‘আরসেপ’ ‘টিপিপি’র মতো শক্তিশালী চুক্তি নয়; এর বাধ্যবাধকতা বেশ অনেকটাই কম। সদস্য রাষ্ট্রগুলির নিজেদের নীতি এবং ভর্তুকি দেয়ার চিন্তা থেকে বের হয়ে আসার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। ‘আরসেপ’এর সদস্য দেশগুলির মাঝে ইতোমধ্যেই দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক চুক্তি ছিল। ‘আসিয়ান’এর দেশগুলির মাঝে মোট বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ ইতোমধ্যেই শুল্কবিহীনভাবে হয়ে থাকে। তবে ‘দ্য ইকনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’এর বৈশ্বিক প্রধান অর্থনীতিবিদ সায়মন ব্যাপটিস্ট বলছেন যে, ‘আরসেপ’এর যে দেশগুলির মাঝে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নেই, সেই দেশগুলির মাঝে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। ‘এইচএসবিসি’র হিসেবে ২০৩০ সালের মাঝে ‘আরসেপ’এর দেশগুলির একত্রিত জিডিপি দাঁড়াবে বিশ্বের ৫০ শতাংশ। চুক্তির আগ থেকেই গত কয়েক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতি যেভাবে এশিয়ার দিকে ঝুঁকছে, তা চুক্তির পরেও অব্যহত থাকবে।

‘আরসেপ’ অত্র অঞ্চলের ভূরাজনৈতিকে পরিবর্তিত করেনি। এখনও এই অঞ্চলের বেশিরভাগ পণ্য তৈরি হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বকে টার্গেট করেই। এশিয়ার দেশগুলি নিজেদের মাঝে পণ্যের ‘কম্পোনেন্ট’ বা অংশবিশেষ নিয়ে বাণিজ্য করে, যাতে পশ্চিমা বাজারে ‘ফিনিশড প্রডাক্ট’ বা সর্বশেষ পণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়। সেই লক্ষ্যে ‘আরসেপ’ সেই সহযোগিতা বৃদ্ধি করছে মাত্র। ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘স্ট্রাটফর’এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রজার বেকার বলছেন যে, ভারত এই চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার ফলে স্বাক্ষরকারী অনেক দেশের কাছেই নতুন শুল্কমুক্ত এলাকার গুরুত্ব বেশকিছুটা কমে গেছে। সদস্য দেশগুলির জন্যে চুক্তিকে এড়িয়ে যাবার জন্যে যথেষ্ট পদ্ধতি রাখার ফলে এটা অত শক্তিশালী চুক্তি নয়। তথাপি চুক্তিটা অনেককেই মনে করাবে যে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চাইতে পারস্পরিক সহযোগিতায় অধিকতর বিশ্বাসী। ‘আরসেপ’এর কারণে চীন এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হবে না; কারণ চীন ইতোমধ্যেই অত্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। অপরদিকে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল না থেকে নিজস্ব একটা প্রভাব বলয় তৈরি করতে চাইছে জাপান; যার অংশ হিসেবে জাপান এই চুক্তির অংশ হয়েছে।

Sunday, 22 November 2020

ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বলি হতে চলেছে ইথিওপিয়া?

২২শে নভেম্বর ২০২০
সুদান এবং এরিত্রিয়া ইতোমধ্যেই অংশ নিচ্ছে বলে বলেন তিনি। ইথিওপিয়াসহ হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের জন্যেই কিছুদিনের মাঝেই এখানে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শক্তিরা জড়াবে।



ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা জাতিসংঘের এক গোপন ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টের বরাত দিয়ে বলছে যে, ইথিওপিয়ার সেনারা দেশটার উত্তরের তিগ্রে অঞ্চলে সামরিক অভিযানে ব্যাপক বাধার সন্মুখীন হচ্ছে, যদিও সরকারি বাহিনী বলছে যে, তারা হুমেরা, দানশা, শিরারো, আলামাতা এবং শিরে সহ বেশ কয়েকটা শহর নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ইথিওপিয়ার সরকারি মুখপাত্র রেদওয়ান হুসেইন বলেন যে, সরকারি বাহিনী তিগ্রের মূল শহর মেকেল্লের অভিমুখে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সুদান ও এরিত্রিয়ার সীমান্তে পশ্চিমের শহর হুমেরাতে এবং দক্ষিণের শহর আলামাতাতে ব্যাপক সংঘাত হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। ইথিওপিয়ার বিমান বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালাচ্ছে। তিগ্রেতে টেলিযোগাযোগ বন্ধ করে দেয়ায় এবং সাংবাদিকদের যেতে বাধা দেয়ায় তথ্য সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। সংঘাতে কয়েক’শ মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ৪ঠা নভেম্বর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ৩৬ হাজার মানুষ পার্শ্ববর্তী সুদানে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়াও তিগ্রে অঞ্চলের মাঝেই অনেকে ঘরছাড়া হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ঘোষণা দেন যে, ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী তিগ্রের রাজধানী মেকেল্লের দিকে রওয়ানা হয়েছে এবং তারা বিদ্রোহী ‘তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট’ বা ‘টিপিএলএফ’এর নেতৃবৃন্দকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। ‘টিপিএলএফ’ ১১ কোটি মানুষের ইথিওপিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল হলেও এর মূল ভিত্তি তিগ্রে অঞ্চলের ৬০ লক্ষ তিগ্রেদের মাঝে। ১৯৯১ সালে বামপন্থী মেনজিসটু হাইলেমারিয়ামএর সরকারকে উৎখাত করে ‘টিপিএলএফ’এর গেরিলারা ক্ষমতা নেয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত তারা ছিল ক্ষমতাসীন দল, যাদেরকে সরিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ অরোমো এবং আমহারাদের নেতৃত্বে আবি আহমেদ ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আরোহণ করেন।

‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ‘টিপিএলএফ’ এর আগেও কয়েকবার ইথিওপিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবার হুমকি দিয়েছিল। অগাস্ট মাসে ‘টিপিএলএফ’এর নেতা দেব্রেতসিওন গেব্রেমাইকেল বলেন যে, তারা কখনোই তাদের কষ্টার্জিত স্বশাসনের অধিকার ছেড়ে দেবেন না। সেপ্টেম্বর মাসে করোনা মহামারির কারণ দেখিয়ে ইথিওপিয়া সরকার জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেবার পর ‘টিপিএলএফ’এর তত্বাবধানে তিগ্রে অঞ্চলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকেই আদ্দিস আবাবা সরকারের সাথে ‘টিপিএলএফ’এর সম্পর্কের ব্যাপক অবণতি হয়। অক্টোবর মাসে ইথিওপিয়ার সরকার তিগ্রে অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক স্থগিত করে এবং সংসদে তিগ্রের বাজেট স্থগিত করা হয়। ইথিওপিয়ার সরকার বলে যে, মেকেল্লের এক সেনা ঘাঁটিতে হামলা করে ‘টিপিএলএফ’এর সদস্যরা অস্ত্র ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করার পর থেকেই এই সামরিক মিশন শুরু করা হয়েছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, দ্রুত যুদ্ধজয়ের সম্ভাবনা নেই; কারণ তিগ্রের সেনারা খুব শীঘ্রই মেকেল্লে শহরের পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নেবে। এই পাহাড়ি অঞ্চল রক্ষা করা অপেক্ষাকৃত সহজ বলেই সেখানে ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনীর দ্রুত সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। সেনাবাহিনীর শক্তিশালী ইউনিটগুলি শহরগুলিকে বাইপাস করে মেকেল্লে রওয়ানা হচ্ছে। আর মিলিশিয়া এবং আধাসামরিক বাহিনীর অপেক্ষাকৃত দুর্বল ইউনিটগুলি পরবর্তীতে এই শহরগুলির নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা করছে; এবং এরাই তিগ্রেদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী যত এগুবে, তাদের সাপ্লাই লাইন গেরিলা আক্রমণের শিকার হবার সম্ভাবনা তৈরি হবে। অর্থাৎ ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী ‘টিপিএলএফ’কে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারলেও সংঘাত নাও থামতে পারে। 

সরকারি বাহিনী তিগ্রের মূল শহর মেকেল্লের অভিমুখে রয়েছে।  তারা হুমেরা, দানশা, শিরারো, আলামাতা এবং শিরে সহ বেশ কয়েকটা শহর নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সুদান ও এরিত্রিয়ার সীমান্তে পশ্চিমের শহর হুমেরাতে এবং দক্ষিণের শহর আলামাতাতে ব্যাপক সংঘাত হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। ইথিওপিয়ার বিমান বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালাচ্ছে।


‘বিবিসি’ বলছে যে, ইথিওপিয়ার প্রতিবেশী এরিত্রিয়া মূলতঃ তিগ্রেদের পছন্দ করে না। তিগ্রেরা বলছে যে, এরিত্রিয়ার বাহিনী ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনীকে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে। ১৯৯৮ সালে এরিত্রিয়ার সাথে ইথিওপিয়ার সীমান্ত যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, যা যুদ্ধ মূলতঃ তিগ্রের সাথে সীমানা নিয়েই। তিগ্রের আঞ্চলিক সরকারের অসহযোগিতার কারণে সীমান্তবর্তী শহর বাদমে নিয়ে দুই দেশের দ্বন্দ্বের সুরাহা হয়নি।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল রেইনর প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এবং ‘টিপিএলএফ’এর নেতা দেব্রেতসিওন গেব্রেমাইকেলএর সাথে কথা বলার পর উভয় পক্ষেরই সামরিক ফলাফল পাবার দিকে আশাবাদী হবার আশংকা রয়েছে বলে মতামত দেন। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, পূর্ব আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইথিওপিয়া। এবং এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র আবি আহমেদের সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ১৯শে নভেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আফ্রিকা বিষয়ক সহকারি সচিব তিবর নাগি সাংবাদিকদের বলেন যে, ইথিওপিয়ার এই সংঘাত দুই দেশের মাঝে সংঘাত নয়; বরং একটা দেশের একটা অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে। তাই এর ফলাফল হিসেবে যা তারা আশা করেছিল, সেটাই হচ্ছে।

তিগ্রেদের নেতা গেব্রেমাইকেল বলছেন যে, তারা যুদ্ধ চান না। তবে তাদের সেনাবাহিনী, মিলিশিয়া এবং স্পেশাল ফোর্স যুদ্ধ জয়ের জন্যে প্রস্তুত রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এখানে বাইরের শক্তিদের জড়িত হবার সম্ভাবনা বাড়বে। বিশেষ করে নীল নদের উপর ইথিওপিয়ার ‘গ্র্যান্ড রেনেসাঁস ড্যাম’ প্রকল্প এবং নদীর পানির হিস্যা নিয়ে ইথিওপিয়ার সাথে মিশর এবং সুদানের যখন দ্বন্দ্ব চলছে, তখন ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ কলহ আঞ্চলিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। ‘দ্যা ইস্ট আফ্রিকান’ বলছে যে, ২০শে নভেম্বর আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সাইরিল রামাফোসা মোজাম্বিক, লাইবেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার তিনজন প্রাক্তন প্রেসিডেন্টকে সদস্য করে একটা মিশন ইথিওপিয়াতে পাঠাবার ঘোষণা দেবার পরদিন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রীর অফিশিয়াল টুইটার একাউন্ট থেকে বলা হয় যে, ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে মধ্যস্ততা করতে আফ্রিকান ইউনিয়নের মিশনের ইথিওপিয়া আসার খবরটা বানোয়াট। হর্ন অব আফ্রিকা বিশ্লেষক রশিদ আবদি 'বিবিসি’কে বলছেন যে, এই যুদ্ধ ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক। সুদান এবং এরিত্রিয়া ইতোমধ্যেই অংশ নিচ্ছে বলে বলেন তিনি। ইথিওপিয়াসহ হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের জন্যেই কিছুদিনের মাঝেই এখানে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শক্তিরা জড়াবে। আবদি আরও বলেন যে, ইথিওপিয়া যদি তিগ্রের কারণে সোমালিয়ার যুদ্ধ থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়, তাহলে সোমালিয়াতেও এর প্রভাব পড়বে। এছাড়াও জাতিগত কারণে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমতে থাকলে জাতিরাষ্ট্র ইথিওপিয়ার অস্তিত্বই হুমকির মাঝে পড়ে যাবে। অপরদিকে জাতিসংঘ বলছে যে, ইথিওপিয়ার ৭০ লক্ষ মানুষ খাদ্য সহায়তার উপর নির্ভরশীল, যার মাঝে তিগ্রের ৬ লক্ষ। এই অঞ্চল পঙ্গপালের আক্রমণেও জর্জরিত। ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে দুর্বল মানুষগুলিই সবচাইতে ঝুঁকিতে পড়ছে। 

Friday, 20 November 2020

'ভূরাজনৈতিক ভূমিকম্প ২০২০'

২০শে নভেম্বর ২০২০ 

 


 


আলহামদুলিল্লাহ!
আমার চতুর্থ বই প্রকাশিত হলো।
 
'ভূরাজনৈতিক ভূমিকম্প ২০২০ - করোনা দুর্যোগে আদর্শিক সংকট এবং বিপর্যস্ত বিশ্ব ব্যবস্থা'


















বই-এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছুটা ধারণা এই বর্ণনা থেকে পাওয়া যাবে -


-----------------------------------------------------------------------------------------------

"
২০২০ সালকে সংজ্ঞায়িত করেছে করোনাভাইরাসের মহামারি। ভাইরাসের সংক্রমণের মাঝে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা উঠেছে চরমে। এই ভূরাজনৈতিক খেলায় আগের খেলোয়াড়রাই মাঠে রয়েছে। তবে২০১৯ সালের হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতার সাথে করোনাভাইরাস মিশ্রিত হওয়ায় পরিস্থিতি হয়েছে বেসামাল। এবং তা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার অতি ভঙ্গুর পরিস্থিতিকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ২০২০ সালে সবচাইতে বড় ভূমিকম্প ছিল এটাই; যা কিনা পশ্চিমা আদর্শের ভিতকেই দুর্বল করে ফেলেছে। এর আগের কোন দুর্যোগেই এমনটা ঘটেনি। ভূমিকম্পের মতোই দুর্বল স্তম্ভগুলিকে এই দুর্যোগ আক্রমণ করেছে; অতি দুর্বলগুলিকে ধ্বসিয়ে ফেলেছে। অনেক স্থানেই তৈরি হয়েছে ফাঁটল; যেখানে নতুন ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে।

২০২০ সাল ছিল ভূরাজনৈতিক ভুমিকম্পের বছর; কারণ তা যুক্তরাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে কোন জাতিরাষ্ট্র, সেব্যাপারটাকে সামনে আনেনি। বরং পশ্চিমা জীবনব্যবস্থা কতদিন সমাধানহীন অবস্থায় দুনিয়ার নেতৃত্ব দিতে পারবে, সেই প্রশ্নকে সামনে এনেছে। প্রশ্নটা এখন আর জাতিরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়; এটা এখন একটা আদর্শিক প্রশ্ন। গত বেশ কয়েক বছর ধরেই পশ্চিমা আদর্শ থেকে আসা জাতিরাষ্ট্রের চিন্তাটাই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। অনেকগুলি জাতিরাষ্ট্রই অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে; বাকিগুলি জাতিরাষ্ট্রের বাউন্ডারি না মেনেই চলছে দেদারসে। জঙ্গলের নিয়মে চলছে বিশ্ব; যা সভ্য দুনিয়ার দিকে ইঙ্গিত দেয় না। এই পরিস্থিতি মানুষকে নতুন সমাধান খুঁজতে মরিয়া করে তুলবে।"


-----------------------------------------------------------------------------------------------


আপাততঃ বইটি কুরিয়ারের মাধ্যমে ডেলিভারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যারা অর্ডার করতে ইচ্ছুক, তারা নিচের ফেসবুক পেইজে পুরো ঠিকানা এবং ফোন নম্বরসহ 'ইনবক্স' করুন। পেমেন্ট করতে হবে বিকাশে। ডেলিভারি চার্জ ফ্রি। অর্থাৎ বইএর মূল্যের বাইরে কোন চার্জ দিতে হবে না।  

https://www.facebook.com/k360bd/ 
 
 -----------------------------------------------------------------------------------------------
 
 

 

 
 লেখক - আহমেদ শরীফ

প্রকাশক - মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম, ড্রিমস পাবলিকেশনস, টাঙ্গাইল

প্রথম প্রকাশ - অক্টোবর ২০২০

প্রচ্ছদ - তৌহিদুল ইসলাম

মুদ্রণ - এস আর প্রিন্টার্স

পৃষ্ঠা সংখ্যা - ৪২৪; হার্ড কভার 

মূল্য - ৯০০/- (নয়শত টাকা মাত্র) 

ISBN : 978-984-34-9520-4
 -------------------------------------------------------------------------------
লেখকের প্রথম বই তিনটা না পেয়ে থাকলে এই লিঙ্ক থেকে ঘুরে আসুন - 
 

'বঙ্গোপসাগর আসলে কার? বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান'
 
 

Saturday, 14 November 2020

ককেশাসের পর কি সিরিয়ার যুদ্ধ পুনরায় শুরু হচ্ছে?

১৫ই নভেম্বর ২০২০
অক্টোবর ২০২০। ইদলিবের কাছে সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে যাচ্ছে তুর্কি সেনাবাহিনী। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এই ঘাঁটিগুলি ছেড়ে আসার অর্থ এই নয় যে, তুরস্ক অস্ত্র অঞ্চলে নিজেদের অবস্থানকে কমাচ্ছে; বরং এর মাধ্যমে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আভাস পাওয়া যায়।

গত ২৬শে অক্টোবর সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশে রুশ বিমান হামলায় সিরিয়ার বিদ্রোহীদের ৫০ জনের বেশি সদস্য নিহত হয়। সিরিয়ার যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন যে, এই হামলা হয়েছে জেবেল আল দোয়াইলা এলাকায়, যেখানে ‘ফাইলাক আল শাম’ নামের বিদ্রোহী গ্রুপের সামরিক প্রশিক্ষণ শিবির রয়েছে। এই গ্রুপটা তুর্কি সমর্থিত গ্রুপগুলির মাঝে সবচাইতে বড়। সাম্প্রতিক সময়ে রুশদের বেশিরভাগ বিমান হামলার উদ্দেশই ছিল কৌশলগত ‘এম৪’ হাইওয়ের আশপাশ থেকে বিদ্রোহী গ্রুপগুলিকে সরানো; কিন্তু দোয়াইলার হামলার উদ্দেশ্য ছিল পুরোপুরি আলাদা। হামলার ভয়াবহতা দেখে অনেকেই ধারণা করছেন যে, এই হামলার পিছনে শুধুমাত্র সিরিয়া নয়, আরও বড় ভূরাজনীতি জড়িত। তুরস্ক এবং রাশিয়া বর্তমানে লিবিয়া, ককেশাস এবং সিরিয়াতে ভিন্ন পক্ষ সমর্থন করে প্রক্সি যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ‘আল জাজিরা’ তাদের এক বিশ্লেষণে বলছে যে, এই হামলা খুব সম্ভবতঃ ককেশাসে আজেরবাইজানের পক্ষে তুরস্কের জড়ানোর সাথে সম্পর্কিত। রাশিয়া ককেশাস এবং মধ্য এশিয়ার অঞ্চলকে তার নিজের প্রভাবের মাঝে মনে করে থাকে। সেখানে তুরস্কের জড়ানোটা রাশিয়া ভালো চোখে দেখেনি। ২০২০এর মার্চে তুরস্ক এবং রাশিয়া সিরিয়ার ইদলিবে একটা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল, যা এতকাল মোটামুটিভাবে বহাল থাকলেও বিভিন্ন আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে তুরস্কের জড়াবার পর এই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ১০ই অক্টোবর ককেশাসে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হবার পর সিরিয়ার যুদ্ধের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়ে গেছে।

ইউরেশিয়া বিশ্লেষক এসরেফ ইয়ালিনকিলিচলি তুর্কি মিডিয়া ‘টিআরটি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলছেন যে, এই বিমান হামলার মাধ্যমে রাশিয়া খুব সম্ভবতঃ তুরস্ককে বার্তা দিতে চাইছে যে ককেশাসে তুরস্কের জড়ানোটা রাশিয়া পছন্দ করছে না। দুই দেশ অর্থনৈতিকভাবে নিবিঢ় সম্পর্ক রাখলেও লিবিয়া, সিরিয়া এবং ককেশাসের ব্যাপারে দুই দেশের ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে। তিনি বলেন যে, সিরিয়ার ঘটনাগুলি তুরস্ক এবং রাশিয়ার সম্পর্কের মূল ভিত্তি হতে যাচ্ছে; সেখানে দুই দেশের মাঝে সংঘাত শুরু হলে পুরো সম্পর্কই টানাপোড়েনে পড়বে। তুর্কি বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, লিবিয়া এবং ককেশাসে রাশিয়া এবং ফ্রান্স এক পক্ষে থেকেছে, যদিও দুই দেশের মাঝে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মতের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। লিবিয়াতে জেনারেল হাফতারকে এবং ককেশাসে আর্মেনিয়াকে তারা সমর্থন দিয়েছে। অপরদিকে সিরিয়াতে রাশিয়া বাশার সরকারকে সরাসরি সমর্থন দিলেও ফ্রান্স সেক্ষেত্রে অতটা আগায়নি। তবে ২০১৭ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ বলেন যে, বাশারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তার উপযুক্ত উত্তরসুরী কে হবে, সেব্যাপারে তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না; তাই বাশারকে ক্ষমতা থেকে সরাবার কোন প্রাধান্য তাদের নীতির মাঝে নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে রুশদের বেশিরভাগ বিমান হামলার উদ্দেশই ছিল কৌশলগত ‘এম৪’ হাইওয়ের আশপাশ থেকে বিদ্রোহী গ্রুপগুলিকে সরানো; কিন্তু দোয়াইলার হামলার উদ্দেশ্য ছিল পুরোপুরি আলাদা। হামলার ভয়াবহতা দেখে অনেকেই ধারণা করছেন যে, এই হামলার পিছনে শুধুমাত্র সিরিয়া নয়, আরও বড় ভূরাজনীতি জড়িত। 


বিমান হামলার সপ্তাখানেক আগে ১৯শে অক্টোবর ইদলিবে একটা সামরিক ঘাঁটি খালি করা শুরু করে তুরস্ক। মোরেক এলাকায় ঘাঁটিসহ বেশ কয়েকটা ঘাঁটি বাশার বাহিনীর অধিকৃত অঞ্চলের একেবারে মাঝখানে। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে তুরস্কই এই ঘাঁটিগুলিকে বাশার বাহিনীর অধিকৃত অঞ্চলের মাঝে রেখেছিল। ৩রা নভেম্বর নাগাদ এই ঘাঁটি পুরো খালি করা হয়। ৯ই নভেম্বর নাগাদ তুর্কি বাহিনী শের মুঘার, মার হাত্তাত, ক্বাবতান আল জাবাল এবং শেইখ আকিল ঘাঁটিগুলি খালি করা শুরু করেছে। সিরিয়ান মিডিয়া ‘এনাব বালাদি’ বলছে যে, ১৫ই অক্টোবর তুরস্ক ঘাঁটি সরাবার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা আরও বলছে যে, তুরস্ক হয়তো বাশার বাহিনীর অধিকৃত অঞ্চলের মাঝে সকল ঘাঁটিই খালি করতে যাচ্ছে। তুর্কি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওমরান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর গবেষক মাআন তালআ বলছেন যে, ঘাঁটি খালি করার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেয় যে, তুরস্ক সামনের দিনগুলিতে সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কা করছে। বাশার বাহিনী খুব সম্ভবতঃ রুশ সহায়তায় নতুন অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে; যার প্রস্তুতি হিসেবে তুরস্ক তার বাহিনীগুলিকে নতুন করে বিন্যাস করছে। তিনি বলছেন যে, সরিয়ে নেয়া বাহিনীগুলিকে তুরস্ক বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে নতুন করে মোতায়েন করে কিনা, সেটা দেখার বিষয় হবে। ‘আল মনিটর’এর এক লেখায় তুর্কি কলামিস্ট ফেহিম তেস্তেকিন বলছেন যে, এই ঘাঁটিগুলি ছেড়ে আসার অর্থ এই নয় যে, তুরস্ক অত্র অঞ্চলে নিজেদের অবস্থানকে কমাচ্ছে; বরং এর মাধ্যমে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আভাস পাওয়া যায়।

যেসময় তুরস্ক ইদলিবের আশেপাশে ঘাঁটি খালি করছে, সেই সময় সিরিয়াতে ঢুকছে আরও তুর্কি সেনা। তুরস্কের পত্রিকা ‘মিলিয়েত’ বলে যে, গত ১৫ই অক্টোবর তুরস্কের সামরিক বাহিনীর ৭০টা গাড়ির একটা বহর ইদলিবে ঢোকে, যে বহরের মাঝে ট্যাঙ্ক এবং আর্টিলারিও ছিল। একইসাথে পত্রিকাটা বলে যে, ইদলিবের দক্ষিণ দিকে তুরস্ক নতুন একটা সামরিক ঘাঁটি তৈরির কাজ শুরু করেছে। এর একদিন আগেই বাশার বাহিনীর হামলায় দু’জনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনাগুলি কয়েক মাসের অপেক্ষাকৃত শান্ত পরিবেশকে বিঘ্নিত করছিল।

২০২০ সালের শুরুতে ইদলিবে সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারের বাহিনীর আক্রমণ ঠেকাতে তুরস্ক সরাসরি বিদ্রোহীদের পক্ষ নেয়। যুদ্ধের ফলে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ গৃহহারা হয়ে তুরস্কের সীমান্তে আরও লাখো উদ্বাস্তুর সাথে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ‘ডেইলি সাবাহ’ ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে যে, বাশার বাহিনীর আক্রমণ তুরস্ক অভিমুখে আরও উদ্বাস্তু তৈরি করছে, এই পরিস্থিতিটাই তুরস্কের ইদলিবে সেনা পাঠাবার ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ‘আল মনিটর’এর ‘তুর্কি পালস’এর কলামিস্ট সেলিম ইদিজএর মতে, রাশিয়া এবং তুরস্কের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে কিছু বিদ্রোহী গ্রুপের সংজ্ঞার ব্যাপারে। ২০১৭ সালে রাশিয়া এবং তুরস্ক একটা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার শর্ত ছিল কিছু বিদ্রোহী গ্রুপকে তুরস্ক ভেঙ্গে ফেলবে, যাদেরকে রাশিয়া ‘উগ্রপন্থী’ বলে মনে করে। এই গ্রুপগুলির মাঝে সবচাইতে বড় গ্রুপ হলো ‘হায়াত তাহরির আল শাম’ বা ‘এইচটিএস’। তুরস্ক যে ১১টা গ্রুপকে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে, তার মাঝে ‘এইচটিএস’ নেই। সেলিম ইদিজ বলছেন যে, তুরস্ক হয় ‘এইটিএস’কে ভাংতে পারছে না বা ভাংতে চায় না। তিনি আরও বলেন যে, ইদলিবে সর্বশেষ রুশ হামলা খুব সম্ভবতঃ পুতিনের সতর্কবাণী ছিল।



‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর বিশ্লেষক দারীন খলিফা ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, মস্কো বিদ্রোহী গ্রুপের ব্যাপারে তাদের দাবি বাস্তবায়ন হবার আগ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেবে, যা মোটামুটি জানাই ছিল। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের মাঝে যুদ্ধবিরতির যে সমঝোতা ছিল, তার মাঝে প্রধান শর্ত ছিল সিরিয়ার সবচাইতে শক্তিশালী কয়েকটা বিদ্রোহী গ্রুপকে তুরস্ক ভেঙ্গে ফেলবে। এরকম অবান্তর শর্তের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। সেলিম ইদিজ বলছেন যে, যুদ্ধবিরতির পর রাশিয়া এবং তুরস্ক ফ্রন্টলাইন বরাবর যৌথ প্যাট্রোলের ব্যবস্থা করে। এই প্যাট্রোল প্রকৃতপক্ষে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিতে পারেনি; শুধুমাত্র সকলকে একটা ধারণা দিয়েছে যে, সিরিয়াতে রাশিয়া এবং তুরস্ক একত্রে কাজ করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে যৌথ প্যাট্রোল বন্ধ হয়ে গেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুদ্ধবিরতির শেষ অতি সন্নিকটে। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘মিডল ইস্ট ইন্সটিটিউট’এর ডিরেক্টর চার্লস লিস্টার মনে করছেন যে, এই মুহুর্তে বড় কোন যুদ্ধ হয়তো আসন্ন নয়, তবে আঙ্কারা এই হামলাকে একেবারেই এড়িয়ে যাবে, এটা ভাবা ভুল হবে। রুশ হামলার পরদিনই সিরিয়ার বিদ্রোহী গ্রুপগুলি বাশার বাহিনীর উপর শত শত রকেট নিক্ষেপ করে। এই রকেটগুলির মাঝে কোন একটা যদি অতি গুরুত্বপূর্ণ কোন স্থাপনার উপর গিয়ে পড়ে, অথবা এই আক্রমণগুলি যদি নিজে থেকেই চলতে থাকে, তাহলে এই সহিংসতা একটা অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। দারীন খলিফা বলছেন যে, রুশদের সাথে তুর্কিদের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল দরকষাকষির জন্যে ব্যবহৃত হতে থাকবে। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিয়ে বলছে যে, গত মার্চের যুদ্ধবিরতির সময় দুই পক্ষের সমঝোতায় বলা ছিল যে, বাশার বাহিনী হামলা করলে তুরস্কের অধিকার থাকবে সর্বশক্তি দিয়ে প্রত্যুত্তর দেবার।

লিবিয়া এবং ককেশাসে প্রক্সি যুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর তুরস্ক এখন আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রটা তাই নতুন করে জেগে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইদলিবে তুরস্কের ঘাঁটিগুলির পুনর্বিন্যাস এবং নতুন করে সৈন্য সমাবেশ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সিরিয়ার স্থিতাবস্থা নিয়ে তুরস্ক খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। অপরদিকে লিবিয়া এবং ককেশাসে তুরস্ককে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মোকাবিলার পর সিরিয়াতে তুরস্কের প্রভাব কমাতে নতুন করে সচেষ্ট হতে পারে রাশিয়া। ইদলিবে রাশিয়ার সাম্প্রতিক বিমান হামলা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সিরিয়ার যুদ্ধবিরতি কতটা দুর্বল ভিতের উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হয়তো ককেশাসের ফয়সালাই সিরিয়ার ফ্রন্টলাইনকে কয়েক মাসের জন্যে থামিয়ে রেখেছিল। তুরস্ক এবং রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বলি হচ্ছে সিরিয়ার লাখো মানুষ। শীতকাল এবং করোনাভাইরাসের কারণে এই ঘরছাড়া মানুষগুলির অবস্থা হয়তো আরও শোচনীয় হতে চলেছে।