Showing posts with label Idlib. Show all posts
Showing posts with label Idlib. Show all posts

Saturday, 14 November 2020

ককেশাসের পর কি সিরিয়ার যুদ্ধ পুনরায় শুরু হচ্ছে?

১৫ই নভেম্বর ২০২০
অক্টোবর ২০২০। ইদলিবের কাছে সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে যাচ্ছে তুর্কি সেনাবাহিনী। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এই ঘাঁটিগুলি ছেড়ে আসার অর্থ এই নয় যে, তুরস্ক অস্ত্র অঞ্চলে নিজেদের অবস্থানকে কমাচ্ছে; বরং এর মাধ্যমে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আভাস পাওয়া যায়।

গত ২৬শে অক্টোবর সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশে রুশ বিমান হামলায় সিরিয়ার বিদ্রোহীদের ৫০ জনের বেশি সদস্য নিহত হয়। সিরিয়ার যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন যে, এই হামলা হয়েছে জেবেল আল দোয়াইলা এলাকায়, যেখানে ‘ফাইলাক আল শাম’ নামের বিদ্রোহী গ্রুপের সামরিক প্রশিক্ষণ শিবির রয়েছে। এই গ্রুপটা তুর্কি সমর্থিত গ্রুপগুলির মাঝে সবচাইতে বড়। সাম্প্রতিক সময়ে রুশদের বেশিরভাগ বিমান হামলার উদ্দেশই ছিল কৌশলগত ‘এম৪’ হাইওয়ের আশপাশ থেকে বিদ্রোহী গ্রুপগুলিকে সরানো; কিন্তু দোয়াইলার হামলার উদ্দেশ্য ছিল পুরোপুরি আলাদা। হামলার ভয়াবহতা দেখে অনেকেই ধারণা করছেন যে, এই হামলার পিছনে শুধুমাত্র সিরিয়া নয়, আরও বড় ভূরাজনীতি জড়িত। তুরস্ক এবং রাশিয়া বর্তমানে লিবিয়া, ককেশাস এবং সিরিয়াতে ভিন্ন পক্ষ সমর্থন করে প্রক্সি যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ‘আল জাজিরা’ তাদের এক বিশ্লেষণে বলছে যে, এই হামলা খুব সম্ভবতঃ ককেশাসে আজেরবাইজানের পক্ষে তুরস্কের জড়ানোর সাথে সম্পর্কিত। রাশিয়া ককেশাস এবং মধ্য এশিয়ার অঞ্চলকে তার নিজের প্রভাবের মাঝে মনে করে থাকে। সেখানে তুরস্কের জড়ানোটা রাশিয়া ভালো চোখে দেখেনি। ২০২০এর মার্চে তুরস্ক এবং রাশিয়া সিরিয়ার ইদলিবে একটা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল, যা এতকাল মোটামুটিভাবে বহাল থাকলেও বিভিন্ন আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে তুরস্কের জড়াবার পর এই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ১০ই অক্টোবর ককেশাসে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হবার পর সিরিয়ার যুদ্ধের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়ে গেছে।

ইউরেশিয়া বিশ্লেষক এসরেফ ইয়ালিনকিলিচলি তুর্কি মিডিয়া ‘টিআরটি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলছেন যে, এই বিমান হামলার মাধ্যমে রাশিয়া খুব সম্ভবতঃ তুরস্ককে বার্তা দিতে চাইছে যে ককেশাসে তুরস্কের জড়ানোটা রাশিয়া পছন্দ করছে না। দুই দেশ অর্থনৈতিকভাবে নিবিঢ় সম্পর্ক রাখলেও লিবিয়া, সিরিয়া এবং ককেশাসের ব্যাপারে দুই দেশের ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে। তিনি বলেন যে, সিরিয়ার ঘটনাগুলি তুরস্ক এবং রাশিয়ার সম্পর্কের মূল ভিত্তি হতে যাচ্ছে; সেখানে দুই দেশের মাঝে সংঘাত শুরু হলে পুরো সম্পর্কই টানাপোড়েনে পড়বে। তুর্কি বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, লিবিয়া এবং ককেশাসে রাশিয়া এবং ফ্রান্স এক পক্ষে থেকেছে, যদিও দুই দেশের মাঝে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মতের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। লিবিয়াতে জেনারেল হাফতারকে এবং ককেশাসে আর্মেনিয়াকে তারা সমর্থন দিয়েছে। অপরদিকে সিরিয়াতে রাশিয়া বাশার সরকারকে সরাসরি সমর্থন দিলেও ফ্রান্স সেক্ষেত্রে অতটা আগায়নি। তবে ২০১৭ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ বলেন যে, বাশারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তার উপযুক্ত উত্তরসুরী কে হবে, সেব্যাপারে তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না; তাই বাশারকে ক্ষমতা থেকে সরাবার কোন প্রাধান্য তাদের নীতির মাঝে নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে রুশদের বেশিরভাগ বিমান হামলার উদ্দেশই ছিল কৌশলগত ‘এম৪’ হাইওয়ের আশপাশ থেকে বিদ্রোহী গ্রুপগুলিকে সরানো; কিন্তু দোয়াইলার হামলার উদ্দেশ্য ছিল পুরোপুরি আলাদা। হামলার ভয়াবহতা দেখে অনেকেই ধারণা করছেন যে, এই হামলার পিছনে শুধুমাত্র সিরিয়া নয়, আরও বড় ভূরাজনীতি জড়িত। 


বিমান হামলার সপ্তাখানেক আগে ১৯শে অক্টোবর ইদলিবে একটা সামরিক ঘাঁটি খালি করা শুরু করে তুরস্ক। মোরেক এলাকায় ঘাঁটিসহ বেশ কয়েকটা ঘাঁটি বাশার বাহিনীর অধিকৃত অঞ্চলের একেবারে মাঝখানে। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে তুরস্কই এই ঘাঁটিগুলিকে বাশার বাহিনীর অধিকৃত অঞ্চলের মাঝে রেখেছিল। ৩রা নভেম্বর নাগাদ এই ঘাঁটি পুরো খালি করা হয়। ৯ই নভেম্বর নাগাদ তুর্কি বাহিনী শের মুঘার, মার হাত্তাত, ক্বাবতান আল জাবাল এবং শেইখ আকিল ঘাঁটিগুলি খালি করা শুরু করেছে। সিরিয়ান মিডিয়া ‘এনাব বালাদি’ বলছে যে, ১৫ই অক্টোবর তুরস্ক ঘাঁটি সরাবার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা আরও বলছে যে, তুরস্ক হয়তো বাশার বাহিনীর অধিকৃত অঞ্চলের মাঝে সকল ঘাঁটিই খালি করতে যাচ্ছে। তুর্কি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওমরান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর গবেষক মাআন তালআ বলছেন যে, ঘাঁটি খালি করার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেয় যে, তুরস্ক সামনের দিনগুলিতে সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কা করছে। বাশার বাহিনী খুব সম্ভবতঃ রুশ সহায়তায় নতুন অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে; যার প্রস্তুতি হিসেবে তুরস্ক তার বাহিনীগুলিকে নতুন করে বিন্যাস করছে। তিনি বলছেন যে, সরিয়ে নেয়া বাহিনীগুলিকে তুরস্ক বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে নতুন করে মোতায়েন করে কিনা, সেটা দেখার বিষয় হবে। ‘আল মনিটর’এর এক লেখায় তুর্কি কলামিস্ট ফেহিম তেস্তেকিন বলছেন যে, এই ঘাঁটিগুলি ছেড়ে আসার অর্থ এই নয় যে, তুরস্ক অত্র অঞ্চলে নিজেদের অবস্থানকে কমাচ্ছে; বরং এর মাধ্যমে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আভাস পাওয়া যায়।

যেসময় তুরস্ক ইদলিবের আশেপাশে ঘাঁটি খালি করছে, সেই সময় সিরিয়াতে ঢুকছে আরও তুর্কি সেনা। তুরস্কের পত্রিকা ‘মিলিয়েত’ বলে যে, গত ১৫ই অক্টোবর তুরস্কের সামরিক বাহিনীর ৭০টা গাড়ির একটা বহর ইদলিবে ঢোকে, যে বহরের মাঝে ট্যাঙ্ক এবং আর্টিলারিও ছিল। একইসাথে পত্রিকাটা বলে যে, ইদলিবের দক্ষিণ দিকে তুরস্ক নতুন একটা সামরিক ঘাঁটি তৈরির কাজ শুরু করেছে। এর একদিন আগেই বাশার বাহিনীর হামলায় দু’জনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনাগুলি কয়েক মাসের অপেক্ষাকৃত শান্ত পরিবেশকে বিঘ্নিত করছিল।

২০২০ সালের শুরুতে ইদলিবে সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারের বাহিনীর আক্রমণ ঠেকাতে তুরস্ক সরাসরি বিদ্রোহীদের পক্ষ নেয়। যুদ্ধের ফলে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ গৃহহারা হয়ে তুরস্কের সীমান্তে আরও লাখো উদ্বাস্তুর সাথে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ‘ডেইলি সাবাহ’ ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে যে, বাশার বাহিনীর আক্রমণ তুরস্ক অভিমুখে আরও উদ্বাস্তু তৈরি করছে, এই পরিস্থিতিটাই তুরস্কের ইদলিবে সেনা পাঠাবার ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ‘আল মনিটর’এর ‘তুর্কি পালস’এর কলামিস্ট সেলিম ইদিজএর মতে, রাশিয়া এবং তুরস্কের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে কিছু বিদ্রোহী গ্রুপের সংজ্ঞার ব্যাপারে। ২০১৭ সালে রাশিয়া এবং তুরস্ক একটা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার শর্ত ছিল কিছু বিদ্রোহী গ্রুপকে তুরস্ক ভেঙ্গে ফেলবে, যাদেরকে রাশিয়া ‘উগ্রপন্থী’ বলে মনে করে। এই গ্রুপগুলির মাঝে সবচাইতে বড় গ্রুপ হলো ‘হায়াত তাহরির আল শাম’ বা ‘এইচটিএস’। তুরস্ক যে ১১টা গ্রুপকে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে, তার মাঝে ‘এইচটিএস’ নেই। সেলিম ইদিজ বলছেন যে, তুরস্ক হয় ‘এইটিএস’কে ভাংতে পারছে না বা ভাংতে চায় না। তিনি আরও বলেন যে, ইদলিবে সর্বশেষ রুশ হামলা খুব সম্ভবতঃ পুতিনের সতর্কবাণী ছিল।



‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর বিশ্লেষক দারীন খলিফা ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, মস্কো বিদ্রোহী গ্রুপের ব্যাপারে তাদের দাবি বাস্তবায়ন হবার আগ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেবে, যা মোটামুটি জানাই ছিল। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের মাঝে যুদ্ধবিরতির যে সমঝোতা ছিল, তার মাঝে প্রধান শর্ত ছিল সিরিয়ার সবচাইতে শক্তিশালী কয়েকটা বিদ্রোহী গ্রুপকে তুরস্ক ভেঙ্গে ফেলবে। এরকম অবান্তর শর্তের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। সেলিম ইদিজ বলছেন যে, যুদ্ধবিরতির পর রাশিয়া এবং তুরস্ক ফ্রন্টলাইন বরাবর যৌথ প্যাট্রোলের ব্যবস্থা করে। এই প্যাট্রোল প্রকৃতপক্ষে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিতে পারেনি; শুধুমাত্র সকলকে একটা ধারণা দিয়েছে যে, সিরিয়াতে রাশিয়া এবং তুরস্ক একত্রে কাজ করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে যৌথ প্যাট্রোল বন্ধ হয়ে গেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুদ্ধবিরতির শেষ অতি সন্নিকটে। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘মিডল ইস্ট ইন্সটিটিউট’এর ডিরেক্টর চার্লস লিস্টার মনে করছেন যে, এই মুহুর্তে বড় কোন যুদ্ধ হয়তো আসন্ন নয়, তবে আঙ্কারা এই হামলাকে একেবারেই এড়িয়ে যাবে, এটা ভাবা ভুল হবে। রুশ হামলার পরদিনই সিরিয়ার বিদ্রোহী গ্রুপগুলি বাশার বাহিনীর উপর শত শত রকেট নিক্ষেপ করে। এই রকেটগুলির মাঝে কোন একটা যদি অতি গুরুত্বপূর্ণ কোন স্থাপনার উপর গিয়ে পড়ে, অথবা এই আক্রমণগুলি যদি নিজে থেকেই চলতে থাকে, তাহলে এই সহিংসতা একটা অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। দারীন খলিফা বলছেন যে, রুশদের সাথে তুর্কিদের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল দরকষাকষির জন্যে ব্যবহৃত হতে থাকবে। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিয়ে বলছে যে, গত মার্চের যুদ্ধবিরতির সময় দুই পক্ষের সমঝোতায় বলা ছিল যে, বাশার বাহিনী হামলা করলে তুরস্কের অধিকার থাকবে সর্বশক্তি দিয়ে প্রত্যুত্তর দেবার।

লিবিয়া এবং ককেশাসে প্রক্সি যুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর তুরস্ক এখন আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান। সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রটা তাই নতুন করে জেগে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইদলিবে তুরস্কের ঘাঁটিগুলির পুনর্বিন্যাস এবং নতুন করে সৈন্য সমাবেশ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সিরিয়ার স্থিতাবস্থা নিয়ে তুরস্ক খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। অপরদিকে লিবিয়া এবং ককেশাসে তুরস্ককে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মোকাবিলার পর সিরিয়াতে তুরস্কের প্রভাব কমাতে নতুন করে সচেষ্ট হতে পারে রাশিয়া। ইদলিবে রাশিয়ার সাম্প্রতিক বিমান হামলা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সিরিয়ার যুদ্ধবিরতি কতটা দুর্বল ভিতের উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হয়তো ককেশাসের ফয়সালাই সিরিয়ার ফ্রন্টলাইনকে কয়েক মাসের জন্যে থামিয়ে রেখেছিল। তুরস্ক এবং রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বলি হচ্ছে সিরিয়ার লাখো মানুষ। শীতকাল এবং করোনাভাইরাসের কারণে এই ঘরছাড়া মানুষগুলির অবস্থা হয়তো আরও শোচনীয় হতে চলেছে। 

Thursday, 5 March 2020

ইদলিবের যুদ্ধ সিরিয়ায় ইরানের অবস্থানকে দুর্বল করছে

০৫ই মার্চ ২০২০
 
 
সুলাইমানির হত্যার পর একটা দুর্বল অবস্থানে থেকে ইরানের পক্ষে আলোচনায় মধ্যস্ততা করাটা কতটুকু সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়া এবং তুরস্কের ভূরাজনৈতিক খেলায় ইরানের কোন ভূমিকাই নেই। এমতাবস্থায় শুধুমাত্র সিরিয়ার যুদ্ধকে ব্যবহার করে ইরানের পক্ষে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব নয়। কাসেম সুলাইমানি-পরবর্তী সময়ের আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক হিসেবনিকেশে ইরানের দুর্বলতর অবস্থানের সুযোগ অনেকটাই তুরস্ক নেবে।
 

ইরানের ‘ক্বোম নিউজ’এর বরাত দিয়ে ‘রেডিও ফারদা’ জানাচ্ছে যে, সিরিয়ার ইদলিবে ৩৪ জন তুর্কি সেনা নিহত হবার পর তুর্কিদের প্রতিশোধমূলক আক্রমণে সিরিয় সেনাদের সাথেসাথে ২১ জন ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া নিহত হয়। এই সেনাদের রিক্রুট করা হয়েছিল আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান থেকে। এর মাঝে ১৮ জন ছিল পাকিস্তানের ‘জেইনাবিউন ব্রিগেড’এর, আর ৩ জন ছিল আফগানিস্তানের ‘ফাতেমিউন ব্রিগেড’এর। পহেলা মার্চ ইরানের শিয়াদের পবিত্র শহর ক্বোমএ এই ২১ জনের শেষকৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। হিযবুল্লাহর ১৪ জন সদস্যও ইদলিবে নিহত হয়েছে, যাদের শেষকৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় লেবাননের রাজধানী বৈরুতে। ২৯শে ফেব্রুয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের সাথে ফোনালাপ করেন। ফোনালাপে তিনি ২০১৮ সালের আস্তানা আলোচনার ছায়ায় তুরস্ক এবং রাশিয়াকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানান। পরদিন পহেলা মার্চ সিরিয়াতে ইরানের ‘মিলিটারি এডভাইজরি সেন্টার’ বা ‘এমএসি’র এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, ইরানিরা তুর্কিদের টার্গেট না করলেও তুর্কিরা ইরানিদেরকে টার্গেট করছে। একইসাথে বিবৃতিতে হুমকি দিয়ে বলা হয় যে, তুর্কিদের জেনে রাখা উচিৎ যে, তারা ‘এমএসি’র অস্ত্রের পাল্লার মাঝেই রয়েছে। এতে আরও বলা হয় যে, ইচ্ছে করলেই ইরানিরা তুর্কিদের উপর প্রতিশোধ নিতে পারতো; কিন্তু নেয়নি। বিবৃতির শেষে বলা হয় যে, যতদিন সিরিয়াতে সন্ত্রাসীরা থাকবে, ততদিন ইরান সিরিয়াতে থাকবে। ‘এমএসি’র এই ঘোষণা অনেককেই অবাক করেছে; কারণ প্রায় কেউই এতকালে ‘এমএসি’র নাম শোনেনি। তুর্কি মিডিয়া ‘ইয়েনি সাফাক’এর ৪ঠা মার্চের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে লন্ডনভিত্তিক প্রেস মনিটরিং সংস্থা ‘মিডলইস্ট মনিটর’ বলছে যে, ইরান ইদলিবের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর সারাকিবে ‘আল কুদস ফোর্স’এর ২ হাজার সেনা প্রেরণ করেছে; আর সারাকিবের দক্ষিণে মা’রাত আল নুমানে ‘ফাতেমিউন ব্রিগেড’এর সদস্যরা পৌঁছেছে ২’শ গাড়িতে করে। হিযবুল্লাহও সারাকিবে তাদের যোদ্ধাদের পাঠিয়েছে।

ইদলিবের যুদ্ধ পরিস্থিতি - ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২০

  

‘জার্মান ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এন্ড সিকিউরিটি এফেয়ার্স’এর ফেলো হামিদরেজা আজিজি ওয়াশিংটনভিত্তিক আরবের পত্রিকা ‘আল মনিটর’এর এক লেখায় বলছেন যে, ইদলিবের যুদ্ধে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের মৃত্যু যুদ্ধকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। ইরান এতকাল সিরিয়ার যুদ্ধে তার জড়িত থাকার ব্যাপারটাকে প্রচার না করলেও এখন সে আর তা গোপন রাখতে চাইছে না। সিরিয়ার দামাস্কাস আর আলেপ্পোর মাঝে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর চলে যাওয়া ‘এম ৫’ হাইওয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়াটা ইরানের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা লক্ষ্য বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এই হাইওয়ের সাথে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী লাতাকিয়া থেকে আসা ‘এম ৪’ হাইওয়ে মিশেছে সারাকিব শহরে, যা কিনা ইতোমধ্যেই চলমান ইদলিবের যুদ্ধের মাঝে দু’বার হাতবদল হয়েছে। ২০১৮ সালে সিরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার সময় রাশিয়ার ভূমিকাকে মেনে নিয়েছিল ইরান। কিন্তু এবারে সিরিয়ার বাশার সরকারকে রক্ষা করতে যথেষ্ট চেষ্টা না করায় ইরান কিছুটা অসন্তুষ্ট। ইরানিরা ধারণা করছে যে, রাশিয়া এবং তুরস্কের মাঝে সম্ভবতঃ একটা সমঝোতা হয়েছে, যা কিনা সন্মুখে আসেনি। ‘রাশান ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স কাউন্সিল’এর নন-রেসিডেন্ট বিশেষজ্ঞ ম্যাক্সিম সুচকভের মতে, রাশিয়া এবং তুরস্কের সম্পর্কের মাঝে অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, তুরস্কের মাঝ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে রুশ তেল ও গ্যাস সরবরাহের সহযোগিতা, রুশ সহায়তায় আক্কুইউতে তুরস্কের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, এবং রুশ ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ। এই প্রকল্পগুলি দুই দেশের জন্যে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, সেই তুলনায় সিরিয়ার যুদ্ধ দুই দেশকে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবার জন্যে যথেষ্ট নয়।



জেনারেল কাসেম সুলাইমানির (ডানে) সাথে সিরিয়াতে আফগান শিয়াদের ‘ফাতেমিউন ব্রিগেড’এর নেতা আলিরেজা তাভাসোলি (মাঝে)। তাভাসোলি সিরিয়ার দেরাতে যুদ্ধে নিহত হন; আর সুলাইমানি বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন
ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত আরবের পত্রিকা ‘দ্যা এরাব উইকলি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, সিরিয়ার বিষয়ে এর আগে আস্তানা এবং সোচিতে যে সমঝোতা হয়েছিল, তাতে শান্তি ধরে রাখার মূল নিশ্চয়তা দানকারী ছিল রাশিয়া, তুরস্ক এবং ইরান। কিছুদিন আগ পর্যন্তও ব্যাপারটা এমন থাকলেও এখন তা পরিবর্তন হচ্ছে। কারণ ইদলিবের সংঘর্ষ থামাবার ব্যাপারে আলোচনাতে শুধুমাত্র আঙ্কারা এবং মস্কোর নামই শোনা যাচ্ছে; তেহরান এক্ষেত্রে অনুপস্থিত। ইউফ্রেতিসের পূর্বাঞ্চলের ব্যাপারে আলোচনাতে উপস্থিত ছিল তুরস্ক, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র; সেখানেও ইরান ছিল অনুপস্থিত। সিরিয়াতে কাজ করার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে যে ম্যান্ডেট দিয়েছিল, ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহারের সাথে সাথে সরিয়ে নেন। সেসময় থেকেই সিরিয়াতে ইরানি সশস্ত্র গ্রুপগুলি ইস্রাইলসহ অন্য যেকোন বিরোধী শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হবার ভয়ে রয়েছে। ইরানের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞাও এই গ্রুপগুলিকে দুর্বল করছে। এই পুরো ব্যাপারটা তেহেরানের জন্যে আরও কঠিন হয়ে যায় নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে ইরানি জেনারেল কাসেম সুলাইমানির হত্যাকান্ডের পর। ইরানের ‘আইআরজিসি’র ‘আল কুদস ফোর্স’এর এই কমান্ডার সিরিয়াতে ইরান সমর্থিত বাহিনীরগুলিকে একত্রে ধরে রাখার জন্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা তার হত্যার পরই বোঝা যাচ্ছে। সিরিয়াতে সেনাবাহিনী এবং হিযবুল্লাহর কাজগুলি এখন কিছু কমান্ডারের ব্যক্তিগত চেষ্টার ফলাফল; তেহেরানের সমর্থিত কোন সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ নয়, যা কিনা সুলাইমানি নিশ্চিত করতেন। সুলাইমানি তেহেরানে সরাসরি যোগাযোগ না করেও অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। সিরিয়ার আকাশের নিয়ন্ত্রণ মস্কোর হাতে; তাই মস্কোর সাথে লিয়াঁজো রক্ষাও তিনিই করতেন। ইদলিবই হলো সুলাইমানিকে হারাবার পর সিরিয়াতে ইরানের জন্যে প্রথম চ্যালেঞ্জ।

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ, ধ্বংসাত্মক মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও এর ফলশ্রুতিতে দেশব্যাপী জনবিক্ষোভ, নিজভূমে লিবারাল এবং কনজার্ভেটিভদের মাঝে দ্বন্দ্ব, লেবানন ও ইরাকে ব্যাপক জনরোষের মুখে ইরানের প্রভাবের ক্ষয়ে যাবার সম্ভাবনা ছাড়াও আঞ্চলিকভাবে ইস্রাইল, তুরস্ক এবং সৌদি গ্রুপের আগ্রাসী কর্মকান্ডে ইরান যথেষ্টই ক্ষতির মুখে পড়েছে। এমনই এক সময়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ইদলিবের ব্যাপারে আলোচনার জন্যে রাশিয়া এবং তুরস্কের কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন। রাশিয়া এবং তুরস্ক উভয়েই ইরানের বর্তমান দুর্বল অবস্থানের ব্যাপারে অবগত। তুর্কিরা সিরিয়াতে রুশ টার্গেটে হামলা করা থেকে বিরত থাকলেও ইরানি টার্গেট সেখান থেকে বাদ পড়ে যায়নি। অপরদিকে রুশরা তুর্কিদেরকে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জন্যে ডাকলেও সেখানে ইরানকে যোগ দেবার জন্যে বলেনি। সুলাইমানির হত্যার পর একটা দুর্বল অবস্থানে থেকে ইরানের পক্ষে আলোচনায় মধ্যস্ততা করাটা কতটুকু সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়া এবং তুরস্কের ভূরাজনৈতিক খেলায় ইরানের কোন ভূমিকাই নেই। এমতাবস্থায় শুধুমাত্র সিরিয়ার যুদ্ধকে ব্যবহার করে ইরানের পক্ষে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব নয়। কাসেম সুলাইমানি-পরবর্তী সময়ের আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক হিসেবনিকেশে ইরানের দুর্বলতর অবস্থানের সুযোগ অনেকটাই তুরস্ক নেবে।

Saturday, 8 February 2020

তুরস্ক কোনটা বেছে নেবে - ইদলিব, নাকি রাশিয়া?

০৯ই ফেব্রুয়ারি ২০২০

 
তুরস্কের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত তারা ইদলিবকে রক্ষা করবে, নাকি রাশিয়াকে বন্ধু হিসেবে রাখবে? ইদলিব ধরে রাখতে হলে তুরস্ককে সিরিয় সেনাবাহিনীর সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে হতে পারে। আর রুশ সামরিক সহায়তা ছাড়া সিরিয় বাহিনীর পক্ষে তুর্কিদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন। একদিকে তুর্কিরা যেমন চাইবে না রুশদের সাথে কৌশলগত চুক্তিগুলি সমস্যায় পড়ুক, তেমনি রাশিয়াও চাইবে না তুরস্কের মাধ্যমে রুশ অর্থনীতি লাভবান হবার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাক।


‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, ৭ই ফেব্রুয়ারি সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমের শহর ইদলিবে বাশার আল আসাদের সরকারি বাহিনী এবং রুশ বিমান বাহিনীর আক্রমণকে প্রতিরোধ করতে তুরস্ক আরও সেনা এবং ট্যাঙ্ক পাঠাচ্ছে। ইদলিব হলো সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সর্বশেষ প্রতিরোধের এলাকা। সিরিয়ার বিদ্রোহীদেরকে সমর্থন দেয়া তুরস্ক ইদলিবে বাশার বাহিনীর সাথে সংঘাতে জড়াবার কাছাকাছি রয়েছে। ‘ইসলাস নিউজ এজেন্সি’ বলছে যে, তুর্কি সেনাবাহিনীর কমপক্ষে ৩’শ ৩০টা গাড়ি কাফর লুসিন গিরিপথের মাঝ দিয়ে ইদলিব পৌঁছেছে। এর আগে ইদলিবের কাছাকাছি সারাকিবে তুরস্কের ৮ জন সেনা সিরিয় হামলায় নিহত হয়। এর জবাবে তুর্কিরাও সিরিয় বাহিনীর উপর গোলাবর্ষণ করেছে। ইদলিবের হাসপাতাল এবং স্কুলগুলির উপর রুশ এবং সিরিয় বিমান বাহিনীর নির্বিচার হামলা থেকে বাঁচতে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা আবহাওয়ার মাঝেই ইদলিব ছাড়ছে হাজারো মানুষ। গত কয়েক মাসে এখান থেকে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ পালিয়েছে। এর মাঝে অনেকে ইতোমধ্যেই সিরিয়ার অন্যান্য এলাকা থেকে কয়েকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তুরস্ক বলছে যে, সিরিয়ার সরকার ২০১৮ সালে তুরস্ক এবং রাশিয়ার সম্মতিতে করা যুদ্ধবিরতি লংঘন করেছে। ইদলিবে তুরস্কের ১২টা অবজার্ভেশন পোস্ট রয়েছে, যার মাধ্যমে তুরস্ক যুদ্ধবিরতি দেখাশুনা করে। তুর্কিরা বলছে যে, তারা এই পোস্টগুলি থেকে তাদের সৈন্য সড়াবে না; এবং তুর্কি অবস্থানে সিরিয়রা হামলা করলে তুরস্কও এর বদলা নেবে।

তুর্কি মিডিয়া ‘আহভাল নিউজ’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে লেবাননে কাজ করা জাতিসংঘের এক প্রাক্তন কর্মকর্তা তিমুর গোকসেল বলেন যে, ৬ই ফেব্রুয়ারি সারাকিব নামক স্থান সিরিয় বাহিনীর হাতে চলে যাবার পর তুর্কিরা এবং তাদের সমর্থিত মিলিশিয়ারা পুরো ইদলিব হারাতে বসেছে। আলেপ্পো থেকে আসা ‘এম৫’ এবং লাটাকিয়া থেকে আসা ‘এম৪’ হাইওয়ের সংযোগস্থলে সারাকিব হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটা শহর, যার নিয়ন্ত্রণের উপরে আলেপ্পো থেকে ইদলিব পর্যন্ত সাপ্লাই লাইনের নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করছে। এই হাইওয়ে ধরে রাখতে তুরস্ক সারাকিব এবং ইদলিবের মাঝে তিনটা শক্তিশালী অবজার্ভেশন পোস্ট তৈরি করছিল। সারাকিবের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া তুর্কিদের ইদলিব পৌঁছানো কঠিন হবে। আর তখন ইদলিবের ৩০ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়ে তুর্কি সীমানার দিকে রওয়ানা হবে। বর্তমানে তুরস্কের অভ্যন্তরে ৩৭ লাখেরও বেশি সিরিয় শরণার্থী রয়েছে। একারণেই হয়তো তুরস্ক সারাকিবের দিকে সেনা পাঠাবার ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গোকসেল বলছেন যে, এখন তুরস্ককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তারা রুশদের বিরুদ্ধে সংঘাতে যাবে কিনা; কারণ সিরিয় সরকার রুশ সহায়তা ছাড়া ইদলিবের অপারেশন শুরুই করতে পারতো না। উত্তর সিরিয়াতে বিদ্রোহী গ্রুপগুলিকে তুরস্ক তার প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তুরস্ক তার জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী এই প্রক্সিগুলিকে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করেছে। ‘মিডলইস্ট মনিটর’ বলছে যে, ৬ই ফেব্রুয়ারি তুর্কি সেনারা ইদলিবের পূর্বে তাফতানাজ বিমান ঘাঁটি নিয়ন্ত্রণে নেবার পরপরই সিরিয়রা সেখানে গোলাবর্ষণ করেছে। তবে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু বলছেন যে, রুশ প্রতিনিধিদল তুরস্কে আসছে সিরিয়া বিষয়ে আলোচনা করতে। ইদলিবে উত্তেজনা প্রশমণে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবেন। ইদলিবের সংঘর্ষ এমন সময়ে এলো, যখন রাশিয়া এবং তুরস্কের সম্পর্কের মধুরতা চলছে বেশ কিছু সময় ধরে।
 
৬ই ফেব্রুয়ারি সারাকিব নামক স্থান সিরিয় বাহিনীর হাতে চলে যাবার পর তুর্কিরা এবং তাদের সমর্থিত মিলিশিয়ারা পুরো ইদলিব হারাতে বসেছে। আলেপ্পো থেকে আসা ‘এম৫’ এবং লাটাকিয়া থেকে আসা ‘এম৪’ হাইওয়ের সংযোগস্থলে সারাকিব হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটা শহর, যার নিয়ন্ত্রণের উপরে আলেপ্পো থেকে ইদলিব পর্যন্ত সাপ্লাই লাইনের নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করছে।
 

গত ৮ই জানুয়ারি তুরস্ক এবং রাশিয়ার নেতারা কৃষ্ণ সাগরের একটা গ্যাস পাইপলাইন উদ্ভোধন করেন। কৃষ্ণ সাগরের নিচ দিয়ে যাওয়া ৯’শ ৩০ কিঃমিঃ লম্বা এই পাইপলাইন রাশিয়ার উপকূলের আনাপা থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের পশ্চিমের কিয়িকয় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এই পাইপলাইনের একাংশের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস তুরস্ক যাবে। আর বাকি আরেক অংশের মাধ্যমে গ্যাস তুরস্কের মাঝ দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বুলগেরিয়া, সার্বিয়া এবং হাঙ্গেরিতে যাবে। ‘আল-জাজিরা’ ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে যে, ‘তুর্কস্ট্রিম’ নামে পরিচিত এই পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়ার গ্যাস ইউক্রেনকে বাইপাস করে ইউরোপ পৌঁছাবে। আর একইসাথে তা তুরস্ককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা জ্বালানি ট্রানজিট করিডোরে পরিণত করবে। আবার ‘এস-৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রির পর ‘তুর্কস্ট্রিম’ রাশিয়া এবং তুরস্কের মাঝে সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। প্রকল্প অনুযায়ী তুরস্ক বছরে ১৬ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস আমদানি করবে রাশিয়া থেকে। আর এর দ্বিতীয় অংশের কাজ শেষ হলে একই পরিমাণ গ্যাস যাবে ইউরোপে। মস্কোর সাথে ইউক্রেনের সংঘাত শুরু পর থেকেই রাশিয়া ইউক্রেনকে বাইপাস করে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি করতে চাইছে। ‘তুর্ক্সট্রিম’ ছাড়াও রাশিয়া বল্টিক সাগরের নিচ দিয়ে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ নামের আরেকটা পাইপলাইনের মাধ্যেম জার্মানিতে গ্যাস রপ্তানি করতে চাইছে। ২০১৯এর ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটা নতুন আইনে সই করেন, যার মাধ্যমে এই দুই পাইপলাইন তৈরির উপর অবরোধ আরোপ করা হয়। তবে ‘তুর্ক্সট্রিম’ তৈরির কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় অবরোধ মূলতঃ পড়েছে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’এর উপর।
   
‘তুর্কস্ট্রিম’ নামে পরিচিত এই পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়ার গ্যাস ইউক্রেনকে বাইপাস করে ইউরোপ পৌঁছাবে। আর একইসাথে তা তুরস্ককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা জ্বালানি ট্রানজিট করিডোরে পরিণত করবে। একদিকে তুর্কিরা যেমন চাইবে না রুশদের সাথে কৌশলগত চুক্তিগুলি সমস্যায় পড়ুক, তেমনি রাশিয়াও চাইবে না তুরস্কের মাধ্যমে রুশ অর্থনীতি লাভবান হবার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাক।

 
তবে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের ঘনিষ্টতা তুরস্কের জন্যে কূটনৈতিক দুর্বলতা তৈরি করবে বলে মনে করেন কেউ কেউ। ‘টারকিশ চ্যাম্বার অব পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার্স’এর জ্বালানি নীতির প্রধান নেচদেত পামির বলছেন যে, এই পাইপলাইনের মাধ্যমে তুরস্ক গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা পেলেও তা তুরস্ককে রাশিয়ার সাথে বেঁধে ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে রাশিয়ার উপরেও তুরস্কের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কিনা গ্যাস সরবরাহের ব্যাপারে তুরস্কের দরকষাকষির সুযোগকে কমিয়ে দিচ্ছে। এতে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাশিয়া বেশি সুবিধা ভোগ করবে। তবে পামির যে ব্যাপারটাকে উল্লেখ করেননি তা হলো ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক। রুশ গ্যাস যতদিন পর্যন্ত ইউক্রেনের মাঝ দিয়ে নির্বিঘ্নে না যেতে পারবে, ততদিন ‘তুর্ক্সট্রিম’ থাকবে রাশিয়ার কাছে মহামূল্যবান। মার্কিন অবরোধের মাঝে তুরস্ক এবং ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির এই সুযোগ দেশটার অর্থনৈতিক দৈন্যতা থেকে উত্তোরণের একটা পথ।

তুরস্কের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত তারা ইদলিবকে রক্ষা করবে, নাকি রাশিয়াকে বন্ধু হিসেবে রাখবে? ইদলিব ধরে রাখতে হলে তুরস্ককে সিরিয় সেনাবাহিনীর সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে হতে পারে। আর রুশ সামরিক সহায়তা ছাড়া সিরিয় বাহিনীর পক্ষে তুর্কিদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন। একদিকে তুর্কিরা যেমন চাইবে না রুশদের সাথে কৌশলগত চুক্তিগুলি সমস্যায় পড়ুক, তেমনি রাশিয়াও চাইবে না তুরস্কের মাধ্যমে রুশ অর্থনীতি লাভবান হবার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাক। সিরিয়ার মতো লিবিয়াতেও তুরস্ক এবং রাশিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে। আবার ক’দিন আগেই তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান ইউক্রেন ঘুরে এসেছেন, যা রাশিয়াকে উত্তক্ত করেছে বলেই বলছেন বিশ্লেষকেরা। ইদলিব, লিবিয়া এবং ইউক্রেনের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি দেখিয়ে দেয় যে, তুরস্কের সাথে রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক খুব শক্ত ভিতের উপরে দাঁড়িয়ে নয়। কিন্তু আপাততঃ যেহেতু উভয়েই সেই কৌশলগত সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল, তাই ইদলিব বা লিবিয়ার মত স্থানে দুই দেশ সংঘাতের পরিস্থিতিতে গেলেও দ্রুত পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে চাইবে।