Thursday, 17 September 2020

তুরস্কের বঙ্গোপসাগরে অবতরণ?

১৮ই সেপ্টেম্বর ২০২০

হিমালয়ের উত্তেজনার মাঝে প্রতিবেশীদের সমর্থন না পাওয়ায় ভারতের ভৌগোলিক অখন্ডতাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতিতে এতদিন ভারতের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল চীন; এখন তুরস্কের আবির্ভাবে তা আরও অনেক জটিল হয়ে যাচ্ছে। ভারত মহাসাগরে চীন এবং তুরস্ক উভয়ের পক্ষেই একা সামরিকভাবে ভারতকে ব্যালান্স করা দুষ্কর। একারণেই উভয়েই চাইছে ভারত মহাসাগরে শক্তিশালী বন্ধু তৈরি করতে; পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের ভূমিকা একারণেই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে।

১৬ই সেপ্টেম্বর তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক টুইটার বার্তায় বলা হয় যে, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বিএনএস বিজয়, যা গত ৪ঠা অগাস্ট লেবাননের রাজধানী বৈরুতে বিশাল বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি সচল। তুরস্কের আকসাজ নৌঘাঁটিতে জাহাজটার মেরামতের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এর মাত্র দু’দিন আগেই ১৪ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তুরস্ককে নৌবাহিনীর জাহাজ মেরামতের জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। শেখ হাসিনা আঙ্কারাতে ভিডিও কনফারেন্সিংএর মাধ্যমে বাংলাদেশের নতুন চান্সেরি কমপ্লেক্স উদ্ভোধন করার সময় মিয়ানমারের মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে তুরস্কের সমর্থন দেবার জন্যেও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। একইসাথে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেবার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক হিসেবনিকেশের মাঝে বাংলাদেশের সাথে তুরস্কের সম্পর্কোন্নয়ের প্রচেষ্টার গুরুত্ব কতটুকু, তা সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ করলেই পরিষ্কার হতে শুরু করবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাসকে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশকে তুরস্কের স্বীকৃতির বহু আগে নিয়ে যান। তিনি বলেন যে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কি জেনারেল ইখতিয়ার উদ্দিন মূহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী যখন বাংলা জয় করেন, তখনই তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। শেখ হাসিনা এমন এক ইতিহাসের উদাহরণ টেনে এনেছেন, যা কিনা বর্তমান তুরস্ক এবং বর্তমান বাংলাদেশের ইতিহাসের চাইতে অনেক পুরোনো এবং গভীর। তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে আস্থা, বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যের ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে আখ্যা দেন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের মাধ্যমেই বাংলায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এরপর থেকে আষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশরা ঔপনিবেশিকেরা নিয়ন্ত্রণ নেবার আগ পর্যন্ত বাংলার বেশিরভাগ শাসকই ছিলেন তুর্কি। অপরদিকে বর্তমান তুরস্ক উসমানি খিলাফতের ধ্বংসের পর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। উসমানিরা মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বশীল স্থানে আসার আগেই তুর্কি নেতৃত্ব ভারতীয় উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়। বখতিয়ার খিলজীর ইতিহাসও সেসময়েরই। বাংলা বিজয়ের আরও প্রায় আড়াই’শ বছর পর উসমানিরা ১৪৫৩ সালে কন্সটানটিনোপল বিজয় করে; যা এখন ইস্তাম্বুল নামে পরিচিত। পরবর্তী সাড়ে ৪’শ বছর ইস্তাম্বুল ছিল উসমানি খলিফার রাজধানী। মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বে থাকা খলিফার সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের বিশ্বাসগত বন্ধন ছিল নিবিড়। ১৫১৯ সালে উসমানি খলিফা প্রথম সেলিম মধ্য এশিয়ার তুর্কি নেতা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবুরকে সমর্থন দেন। উসমানি আর্টিলারি জেনারেল উস্তাদ আলী কুলি এবং আগ্নেয়াস্ত্র ম্যাচলক বিশেষজ্ঞ মুস্তাফা রুমিকে বাবুরের সহায়তায় প্রেরণ করা হয়। এই আর্টিলারি প্রযুক্তি এবং বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়েই ১৫২৬ সালে বাবুর পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদির বিরুদ্ধে জয়লাভ করে ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৪ সালে ইউরোপিয়রা উসমানি খিলাফত ভেঙ্গে ফেললে বর্তমান তুরস্কের জন্ম হয়; যা কিনা উসমানিদের অধীনে থাকা আনাতোলিয়া অঞ্চল নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। সেসময় ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভারতীয় উপমহাদেশে খিলাফত আন্দোলন সংগঠিত হয়। এই ইতিহাসগুলিই বলে দেয় যে, জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং তুরস্কের চাইতেও অনেক গভীর সম্পর্ক রয়েছে দুই দেশের মানুষের; যার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বৈশ্বিক; আঞ্চলিক নয়।

  

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বিএনএস বিজয়এর মেরামত কাজ সম্পন্ন করা হয় তুরস্কের আকসাজ নৌঘাঁটিতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তুরস্ককে নৌবাহিনীর জাহাজ মেরামতের জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন যে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কি জেনারেল ইখতিয়ার উদ্দিন মূহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী যখন বাংলা জয় করেন, তখনই তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। শেখ হাসিনা এমন এক ইতিহাসের উদাহরণ টেনে এনেছেন, যা কিনা বর্তমান তুরস্ক এবং বর্তমান বাংলাদেশের ইতিহাসের চাইতে অনেক পুরোনো এবং গভীর।

 

২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আঙ্কারা সফর করেন। তবে গত এক দশকে দুই দেশের মাঝে সম্পর্ক ওঠানামা করেছে। বিশেষ করে ১৯৭১এর স্বাধীনতা যুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওয়ামী লীগ সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তুরস্কের ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’। ২০১৭ সালেও তুরস্কের সরকারি মিডিয়া ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড’এর এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘অবাধ্য রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। সেই অবস্থান থেকে ২০২০ সালের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের এই প্রয়াস বিরাট এক পরিবর্তন। দুই সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের মাঝে পার্থক্য থাকলেও দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক সর্বদাই ভালো ছিল। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মাঝে সম্পর্ক বেশ গভীর। ১৯৮১ সালে দুই দেশের মাঝে সামরিক প্রশিক্ষণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তুরস্কে তৈরি ‘অতোকার কোবরা’ আর্মার্ড ভেহিকল ব্যবহার করে। বাংলাদেশি দূতাবাসের ভবন উদ্ভোধনের পর সংবাদ সন্মেলনে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু বলেন যে, দুই দেশের বাণিজ্য এখন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের মতো; তবে তিনি তা ২ বিলিয়ন ডলারে উঠিয়ে নেবার পক্ষপাতি। বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোর হিসেবে বিগত অর্থবছরে বাংলাদেশ তুরস্কে ৪’শ ৫৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন দূতাবাস উদ্ভোধন উপলক্ষে আঙ্কারা ভ্রমণ করেন। কাভুসোগলু বলেন যে, তুরস্কের ‘এশিয়া এনিউ ইনিশিয়েটিভ’ চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বাংলাদেশ। এই চিন্তার অংশ হিসেবে তুরস্ক এশিয়ার দেশগুলির সাথে শিক্ষা, প্রতিরক্ষা শিল্প, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং রাজনীতি বিষয়ে সম্পর্ক গভীর করতে চায়। তিনি আরও বলেন যে, খুব শিগগিরই ঢাকায় নতুন তুর্কি দূতাবাস উদ্ভোধন করা হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং তার পত্নীকে দূতাবাস উদ্ভোধনের জন্যে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান।

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কে শৈত্য প্রবাহ?

তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নের ঘটনা এমন সময়ে ঘটলো, যখন বাংলাদেশের সাথে তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। অগাস্ট মাসেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বাংলাদেশ সফর করে যান। করোনাভাইরাসের লকডাউন শুরুর পর থেকে এটা ছিল শ্রিংলার প্রথম বিদেশ সফর। ভারতের ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই সফরের মাধ্যমে ভারত চাইছিল বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক করতে। সেখানে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের নেয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের ব্যাপারে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের অবকাঠামোতে চীনের বড় আকারের বিনিয়োগের ব্যাপারে ভারতের অস্বস্তির কথাও সেখানে বলা হয়। ভারতের ‘দ্যা উইক’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, শ্রিংলার সফর ছিল দুই দেশের সম্পর্কের ‘শীতলতা’ কাটাবার চেষ্টা। সেখানে মনে করিয়ে দেয়া হয় যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন যে, ভারত কেন নাগরিকত্ব বিল সংশোধন করেছিল, তা তিনি বুঝতে পারেননি; যদিও শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, সেটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এরপর অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ শুরুর সময়েও বাংলাদেশে উদ্বেগ দেখা দেয় বলে উল্লেখ করে পত্রিকাটা। যদিও সেসময়ও বাংলাদেশ সরকার বলেছিল যে, সেটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু।

তবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের সবচাইতে বড় ইস্যু ছিল চীনের ব্যাপারে নীতি। ভারতের ‘দ্যা প্রিন্ট’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, লাদাখে যখন ভারত এবং চীনের মাঝে উত্তেজনা চলছে, তখন বাংলাদেশ চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করছিল। ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, চীনারা ঢাকায় তাদের প্রভাব খাটিয়ে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নের পিছনে কাজ করছে। লাদাখের উত্তেজনার মাঝেই চীন বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যের জন্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়। বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন হাই কমিশনার বীনা সিক্রি বলেন যে, চীন সর্বদাই এধরনের কৌশল অবলম্বন করে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির উপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে; এবং এতে তারা বেশ সফলও হচ্ছে। তিনি ভারত সরকারকে এব্যাপারে আরও শক্তিশালী ভূমিকা নেবার উপদেশ দেন। চীন থেকে বাংলাদেশের অস্ত্র আমদানির ব্যাপারেও ভারতের পত্রিকাগুলিতে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ওয়াশিংটন ভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর ফেলো কনস্টানটিনো জেভিয়ার বলেন যে, দিল্লী এখন ঢাকার উপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে যেন বাংলাদেশ চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে কিছুটা পিছিয়ে আসে।
   

২০১৯এর নভেম্বর। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান কাতারে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি ‘খালিদ বিন ওয়ালিদ’ পরিদর্শনে। সোমালিয়া, কাতার এবং পাকিস্তানের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক দেখিয়ে দেয় যে, ভারত মহাসাগরে তুরস্কের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে তুরস্ক বঙ্গোপসাগরেও তার অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
 

ভারত মহাসাগরে তুরস্ক

গত নভেম্বরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান কাতার সফর করেন। কাতারে তুর্কি সামরিক ঘাঁটি তৈরি শেষে বলা হয় যে, মুসলিম বীর খালিদ বিন ওয়ালিদের (রাঃ) নামানুসারে এই ঘাঁটির নামকরণ করা হয়েছে। এখানে ৫ হাজার তুর্কি সেনার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দু’বছর আগে কাতারের উপর সৌদি অবরোধের সময় কাতারে সেনা পাঠায় তুরস্ক। কাতারের জয়েন্ট স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল হামাদ বিন আব্দুল্লাহ আল ফুত্তাইস ২০১৮ সালে ঘোষণা দেন যে, কাতারে তুরস্কের জন্যে একটা নৌঘাঁটি তৈরির জন্যে দুই দেশের মাঝে সমঝোতা হয়েছে। কাতার ছাড়াও সোমালিয়াতে একটা সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে তুরস্ক। ‘ক্যাম্প তুর্কসোম’ নামের এই ঘাঁটিতে সোমালিদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তুরস্কের ‘আনাদোলু এজেন্সি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে তুর্কি রাষ্ট্রদূত মেহমেত ইলমাজ বলেন যে, সোমালিয়ার সেনাবাহিনীর এক তৃতীয়াংশ সেনার প্রশিক্ষণ দিয়েছে তুরস্ক; যা সংখ্যায় প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজারের মতো। এছাড়াও জানুয়ারি মাসে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান ঘোষণা দেন যে, তিনি সোমালিয়ার সরকারের কাছ থেকে সোমালিয়ার উপকূলে সমুদ্রে তেল গ্যাস আহরণের একটা আমন্ত্রণ পেয়েছেন। তুরস্ক তেল গ্যাস আহরণের জন্যে ভূমধ্যসাগর এবং কৃষ্ণ সাগরে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে এবং তা করতে গিয়ে প্রতিবেশী গ্রীসের সাথে তুরস্কের উত্তেজনাও চলছে। ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের এই আহরণের প্রচেষ্টাতে সরাসরি নিরাপত্তা দিচ্ছে তুর্কি নৌবাহিনী। তুরস্ক যদি সোমালিয়ার উপকূলে আহরণের কাজ শুরু করতে যায়, তাহলে সেখানেও তুরস্ক নিরাপত্তার কথা শুরুতেই চিন্তা করবে।

আদেন উপসাগর এবং আরব সাগরে জলদস্যু দমনের লক্ষ্যে তুরস্ক তার একটা নৌবাহিনী জাহাজকে টহলে রেখেছে। পাকিস্তানের সাথেও তুরস্কের রয়েছে গভীর সামরিক সম্পর্ক। ২০১৮ সালের এক চুক্তি অনুযায়ী তুরস্ক পাকিস্তান নৌবাহিনীর জন্যে ৪টা ‘মিলজেম ক্লাস’এর ফ্রিগেট তৈরি করছে। ‘আনাদোলু এজেন্সি’ বলছে যে, গত জুনে পাকিস্তানের করাচিতে দ্বিতীয় ফ্রিগেটের কাজ শুরু হয়। এর আগে গত বছরের অক্টোবরে তুর্কি শিপইয়ার্ডে প্রথম ফ্রিগেটের কাজ শুরু হয়, তুর্কি প্রেসিডেন্ট নিজে যেটার উদ্ভোধন করেন। সোমালিয়া, কাতার এবং পাকিস্তানের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক দেখিয়ে দেয় যে, ভারত মহাসাগরে তুরস্কের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে তুরস্ক বঙ্গোপসাগরেও তার অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। দক্ষিণ এশিয়াকে নিয়ে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। অক্টোবরের ২৬ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত তুর্কিরা ‘ডিফেন্স পোর্ট টার্কি, সাউথ এশিয়া’ নামে একটা মেলার আয়োজন করতে যাচ্ছে। সেখানে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে ৮০ জন সামরিক প্রতিনিধি যোগ দেবেন বলে তারা আশা করছেন। ‘ক্যাপিটাল এক্সিবিশন’এর প্রধান নির্বাহী হাকান কুর্ত বলছেন যে, আগামী এক দশকের মাঝে এই তিন দেশে তুরস্কের ৫ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র বিক্রির টার্গেট রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথায় এটা পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের ভিত বিশ্বাসগত; জাতি রাষ্ট্রের স্বার্থের উপর নয়। রাজনৈতিক দলের স্বার্থ যখন রাষ্ট্রের স্বার্থকে ছাপিয়ে যেতে না পারে, তখন তার ভূরাজনৈতিক ফলাফল হয় সুদূরপ্রসারী। দক্ষিণ এশিয়াতে শুধুমাত্র পাকিস্তানের সাথে সুসম্পর্ক রাখাটা তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির একটা দুর্বল দিক ছিল। কাশ্মির ইস্যুতে তুরস্কের অবস্থান ছিল মূলতঃ পাকিস্তানের কারণেই। এখন মিয়ানমার ইস্যুতেও তুরস্ক তাদের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে পারে। সেকুলার জাতি রাষ্ট্র তুরস্ক তার আদর্শিক ইতিহাসকে মুছে ফেলতে পারছে না; যদিও জাতীয় স্বার্থের কারণে তুরস্ক মুসলিমদের বিভিন্ন ইস্যুতে আদর্শত শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। হিমালয়ের উত্তেজনার মাঝে প্রতিবেশীদের সমর্থন না পাওয়ায় ভারতের ভৌগোলিক অখন্ডতাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতিতে এতদিন ভারতের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল চীন; এখন তুরস্কের আবির্ভাবে তা আরও অনেক জটিল হয়ে যাচ্ছে। তুরস্কের নতুন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘আনাদোলু’কে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ভারত মহাসাগরেও দেখা যেতে পারে বলে বলছে তুর্কি পত্রিকা ‘ডেইলি সাবাহ’। তবে ভারত মহাসাগরে চীন এবং তুরস্ক উভয়ের পক্ষেই একা সামরিকভাবে ভারতকে ব্যালান্স করা দুষ্কর। একারণেই উভয়েই চাইছে ভারত মহাসাগরে শক্তিশালী বন্ধু তৈরি করতে; পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের ভূমিকা একারণেই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে। চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে পাবে নিশ্চিত; তবে তুরস্কের বেলায় ভারতকে নতুন কোন কৌশলগত পার্টনার খুঁজতে হবে। পাকিস্তানের সাথে সৌদিদের সাম্প্রতিক মনোমালিন্যের পর তুর্কিদের মোকাবিলায় সৌদিদের ভারত নিজ পক্ষে আনার চেষ্টা চালাতে পারে। ভূমধ্যসাগরে তুর্কিদের প্রতিপক্ষ ফ্রান্সও ভারত মহাসাগরে ভারতের পাশে থাকতে পারে। ২০২১ সাল থেকে ব্রিটেনও ভারত মহাসাগরে তার বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে যাচ্ছে। মোট কথা দিনে দিনে ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতি আরও জটিল হচ্ছে।

Saturday, 12 September 2020

পশ্চিম আফ্রিকার মালির অভ্যুত্থান... ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় প্রভাব হারাচ্ছে ফ্রান্স

১৩ই সেপ্টেম্বর ২০২০

‘ফ্রাঙ্কোফোন’ প্রাক্তন ফরাসী উপনিবেশ মালির রাজনৈতিক সমস্যায় ‘এংলোফোন’ প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ নাইজেরিয়ার ভূমিকা অত্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করছে। মালির অভ্যুত্থান নেতারা কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, তা নির্ধারণে ‘এংলোফোন’ নাইজেরিয়ার অবস্থানই যখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের শক্তি খর্ব হবার ইঙ্গিতই পাওয়া যায়।

১৮ই অগাস্ট পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। ১১ই সেপ্টেম্বর মালির সামরিক সরকারের নিযুক্ত ২০ সদস্যের এক বিশেষজ্ঞ কমিটি নতুন এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব করে, যার মেয়াদ হবে দুই বছর; প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত করবে সেনাবাহিনী। আর প্রেসিডেন্ট নিজে সেনাবাহিনীর প্রস্তাব করা প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন। এই প্রস্তাবে প্রেসিডেন্টকে সামরিক বা বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মালির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বেসামরিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং গ্রুপের কয়েক’শ সদস্যকে সেনাবাহিনী রাজধানী বামাকোতে তিনদিনের এক আলোচনায় ডাকে। এই আলোচনার দ্বিতীয় দিনের মাথায় এক চার্টারে বলা হয় যে, মালির সমস্যার গভীরতার কথা চিন্তা করেই দুই বছরের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট ‘ইকনমিক কমিউনিটি অব ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেটস’ বা ‘একোওয়াস’ মালির সেনাবাহিনীকে ১৭ই সেপ্টেম্বরের মাঝে একজন প্রেসিডেন্ট এবং একজন প্রধানমন্ত্রীর নাম প্রকাশ করার জন্যে সময় বেঁধে দেয়। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, বামাকোর আলোচনায় যারা অংশ নিয়েছেন, তারা দু’টা ব্যাপারে বেশ বিভক্ত। প্রথমতঃ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ কতদিন হবে; আর দ্বিতীয়তঃ সেনাবাহিনীর ভূমিকাই বা এক্ষেত্রে কি হবে। সেনাবাহিনী প্রথমে প্রস্তাব করেছিল যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ হবে তিন বছর। অর্থাৎ সেনাবাহিনী হয়তো তাদের আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে। তবে সরকারের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা কোন ছাড় যে দেয়নি তা মোটামুটিভাবে পরিষ্কার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পুরো পশ্চিম আফ্রিকার উপর মালির রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রভাব কতটুকু হবে, সেটাই হবে ভূরাজনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

মালির সেনাবাহিনীর একাংশ এমন একটা সময়ে ক্ষমতা দখল করে, যখন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম বুবাকার কেইতার বিরুদ্ধে এক মাস ধরে রাস্তায় ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা অভিযোগ আনা হয়েছিল। মালির উত্তরাংশে ২০১২ সাল থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে; এবং এই সংঘাত ইতোমধ্যেই পার্শ্ববর্তী দেশ নিজের, বুরকিনা ফাসো এবং আইভোরি কোস্টে ছড়িয়ে পড়েছে। এভাবে পুরো অঞ্চল অস্থির হওয়া ছাড়াও মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। মালির এই রাজনৈতিক সমস্যা অত্র অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করবে, এই যুক্তিতেই অঞ্চলিক জোট মালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে।

মালিতে মাসব্যাপী সহিংস বিক্ষোভের মাঝেই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নটা আলোচনায় আসতে থাকে। বিরোধী ‘জুন ফাইভ মুভমেন্ট’ এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয়। সমস্যা সমাধানে ‘একোওয়াস’এর একটা প্রতিনিধিদল জুলাইএর মাঝামাঝি মালি রওয়ানা দেয়। নাইজেরিয়ার পত্রিকা ‘প্রিমিয়াম টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে ‘একোওয়াস’এর কমিশন প্রেসিডেন্ট জঁ ক্লদ কাসি ব্রুএর স্বাক্ষরিত এক চিঠির বরাত দিয়ে বলা হয় যে, নাইজেরিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট গুডলাক জনাথনকে এই মিশনের বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়েছে। জনাথন তার মিশনের মাধ্যমে একটা জাতীয় ঐক্যের সরকার প্রস্তাব করেন, যেখানে বিরোধী দল এবং বেসামরিক ব্যক্তিত্বরাও থাকবেন। তবে জনাথনের প্রস্তাবে ‘জুন ফাইভ মুভমেন্ট’ রাজি হয়নি। জনাথনের ব্যর্থতার পর ‘একোওয়াস’এর পাঁচটা দেশ নাইজেরিয়া, ঘানা, আইভোরি কোস্ট, নিজের এবং সেনেগালের প্রেসিডেন্টরা মালিতে গিয়ে উপস্থিত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট কেইতা যেমন ক্ষমতা ছাড়তে ছিলেন নারাজ, তেমনি বিরোধী গ্রুপের নেতা ইব্রাহিম ডিকোও ছিলেন নিজের অবস্থানে অটল। ‘একোওয়াস’এর এই প্রচেষ্টাও হয় ব্যর্থ।

মালির সমস্যার পিছনে শক্তিশালী দেশগুলির বড় ভূমিকা রয়েছে। মালির গৃহযুদ্ধে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে দেশটার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্স। মালিতে ফ্রান্সের ৫ হাজারের বেশি সেনা রয়েছে। অপরদিকে দেশটার রাজনৈতিক সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে আঞ্চলিক সংগঠন ‘একোওয়াস’। এই সংস্থার ১৫টা সদস্য রাষ্ট্রের মাঝে ৮টা দেশই ছিল ফ্রান্সের উপনিবেশ; যেগুলির রাষ্ট্রীয় ভাষা ফরাসী; এগুলিকে বলা হয় ‘ফ্রাঙ্কোফোন’ দেশ। চারটা ব্রিটেনের উপনিবেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা একটা রাষ্ট্রের অফিশিয়াল ভাষা ইংরেজি; এগুলিকে বলা হয় ‘এংলোফোন’ দেশ। বাকি দু’টা দেশ পর্তুগালের উপনিবেশ হওয়ায় তাদের অফিশিয়াল ভাষা পুর্তুগীজ। তবে জনসংখ্যার দিক থেকে ‘একোওয়াস’এর প্রায় ৩৫ কোটি জনগণের মাঝে ইংরেজি ভাষাভাষি দেশগুলির জনসংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি। এর মাঝে আবার এক নাইজেরিয়ার জনসংখ্যাই প্রায় ২০ কোটি। অর্থনীতির আকারের দিক থেকেও পুরো অঞ্চলে নাইজেরিয়ার ধারেকাছেও কোন দেশ নেই। ‘একোওয়াস’এর মোট প্রায় ৬’শ ৭৫ বিলিয়ন ডলারের জিডিপির মাঝে নাইজেরিয়ার একার জিডিপিই প্রায় ৫’শ বিলিয়ন ডলার। ‘একোওয়াস’এর মাঝে প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ নাইজেরিয়ার অবস্থান অতি শক্তিশালী হওয়ার কারণে সংস্থার উপর ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণ খুবই কম এবং ফ্রান্স ‘একোওয়াস’এর ব্যাপারে সর্বদাই সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ‘একোওয়াস’এর মাধ্যমে পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে নাইজেরিয়ার নেতৃত্ব নেয়াকে ফ্রান্স তার প্রাক্তন উপনিবেশগুলির উপর ‘এংলোফোন’ প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশগুলির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হিসেবেই দেখেছে।

‘মিডল ইস্ট মনিটর’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, পশ্চিম আফ্রিকার মূল সমস্যা হলো ফ্রান্স। যতদিন ফ্রান্স আফ্রিকার দেশগুলির উপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ না সরিয়ে নেবে, ততদিন আফ্রিকার সমস্যাগুলির সমাধান হবে না। এই মন্তব্যের সাথে মিল পাওয়া যাবে আফ্রিকার দেশগুলির মুদ্রার দিকে তাকালেই। পশ্চিম আফ্রিকার ৮টা এবং মধ্য আফ্রিকার ৬টা দেশের মুদ্রা ‘সিএফএ ফ্রাঙ্ক’, যা ফরাসী মুদ্রা ফ্রাঙ্কের সাথে যুক্ত; যেকারণে এই দেশগুলির অর্থনীতি বহুলাংশেই ফ্রান্সের উপর নির্ভরশীল। নাইজেরিয়ার নেতৃত্বে ‘একোওয়াস’এর চাপের মুখে ২০১৯এর শেষের দিকে পশ্চিম আফ্রিকার ৮টা ফরাসী ভাষাভাষী দেশ ২০২০ সাল থেকে ‘সিএফএ ফ্রাঙ্ক’ থেকে বের হয়ে যাবার ঘোষণা দেয়। তবে ফ্রান্স এর মাধ্যমে তার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারাবার পরিস্থিতিই দেখছে। ফরাসী নেতৃত্বে দীর্ঘ আট বছর ধরে মালির যুদ্ধ চলতে থাকার ফলে অত্র অঞ্চলে ফ্রান্সের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ‘ফ্রাঙ্কোফোন’ প্রাক্তন ফরাসী উপনিবেশ মালির রাজনৈতিক সমস্যায় ‘এংলোফোন’ প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ নাইজেরিয়ার ভূমিকা অত্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করছে। মালির অভ্যুত্থান নেতারা কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, তা নির্ধারণে ‘এংলোফোন’ নাইজেরিয়ার অবস্থানই যখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের শক্তি খর্ব হবার ইঙ্গিতই পাওয়া যায়।


Monday, 7 September 2020

ইউরোপে উগ্রপন্থীদের উত্থান প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা আদর্শের সংকট

৭ই সেপ্টেম্বর ২০২০
বার্লিনে করোনা বিরোধী প্রতিবাদের বিশেষত্ব ছিল উগ্র ডানপন্থীদের অংশগ্রহণ এবং জার্মান পার্লামেন্টে হামলার চেষ্টা। যে উগ্রপন্থী চিন্তাকে পুঁজি করে ডানপন্থীরা ইউরোপজুড়ে ক্ষমতায় যাচ্ছে, তার পিছনে জনগণের সমর্থন গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ধারাতেই উগ্রপন্থীরা ইউরোপে আরও শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে। সেই হিসেবে জার্মান পুলিশের উগ্রপন্থীদের টার্গেট করে চাপের মাঝে ফেলার চেষ্টাখানা যথেষ্টই অগণতান্ত্রিক। গণতন্ত্রকে পুঁজি করে পরস্পরবিরোধী এই কার্যকলাপ ইউরোপের আদর্শিক সংকটেরই চিত্র, যা থেকে বের হবার কোন পথ কেউ দেখাতে পারছেন না। 




অগাস্টের শেষে জার্মান রাজধানী বার্লিনে ৩৮ হাজার মানুষের এক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। করোনাভাইরাস বিষয়ে জার্মান সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছিল। পুলিশ এদের মাঝ থেকে প্রায় ৩’শ প্রতিবাদকারীকে গ্রেপ্তারও করে। পরবর্তীতে কয়েক’শ ডানপন্থী প্রতিবাদকারী জার্মান পার্লামেন্ট ‘রাইখস্টাগ’এ হামলা করার চেষ্টা করে। জার্মান রাজনীতিবিদেরা অনেকেই এই হামলাকে ‘লজ্জাজনক’ এবং ‘অগ্রহনীয়’ বলে আখ্যা দেন। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, প্রতিবাদকারীদের মাঝে অনেকেই উগ্রপন্থী কথা লেখা টি শার্ট বা পতাকা বহন করছিল। ‘ল্যাটেরাল থিংকিং ৭১১’ নামের একতা সংগঠন বলে যে, সরকারের করোনাভাইরাসের নিয়মকানুন জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর আঘাতের স্বরূপ। অংশগ্রহণকারীদের মাঝে অনেকেই করোনাভাইরাস বলে কিছু আছে, সেটাই বিশ্বাস করে না। তারা মনে করছে যে, করোনাভাইরাস একটা ষড়যন্ত্র; এবং সরকার করোনাভাইরাসের নামে মানুষের উপর গোয়েন্দাগিরি করছে। একই রকমের চিন্তার মানুষের লন্ডন, প্যারিস, ভিয়েনা এবং জুরিখ শহরেও বিক্ষোভ করে।

‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানিতে মোট ২ লক্ষ ৪২ হাজার মানুষের মাঝে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছে, যা কিনা অন্যান্য ইউরোপিয় দেশ থেকে কম। ৯ হাজার ৩’শ মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাটাও ব্রিটেন, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি বা রাশিয়ার চাইতে কম বলে বলছে ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র গবেষণা। ‘ইসিডিসি’র হিসেবে অগাস্ট মাসে পুরো ইউরোপেই সংক্রমণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। জার্মানিতেও তাই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আরও কঠোর হচ্ছে সরকার। ২৭শে অগাস্ট চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের সরকার জনসমক্ষে মাস্ক না পড়ার জন্যে ৫০ ইউরো জরিমানা ধার্য্য করে। আগামী বছর পর্যন্ত জনসমাগমের উপরে নিষেধাজ্ঞা বলবত করা হয়েছে। বার্লিনের করোনা বিরোধী প্রতিবাদের বিশেষত্ব ছিল উগ্র ডানপন্থীদের অংশগ্রহণ এবং জার্মান পার্লামেন্টে হামলার চেষ্টা। করোনা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ডানপন্থীরা নিজেদের অবস্থান সংহত করতে চাইছে কিনা, তা নিয়েও কথা শুরু হয়েছে। কারণ জার্মানিতে উগ্রবাদী, বিশেষ করে নিও নাজিদের কর্মকান্ড নিয়ে উদার ও মধ্যপন্থীরা যারপরনাই চিন্তিত।

গত মার্চে জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘বিএফভি’এর প্রধান থমাস হালডেনওয়াং এক সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, ডানপন্থী উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ জার্মানির গণতন্ত্রের জন্যে সবচাইতে বড় হুমকি। তিনি বলেন যে, উগ্র ডানপন্থীদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজারের মতো; এর মাঝে ১৩ হাজারের সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়াবার সম্ভাবনা বেশি। তিনি আরও বলেন যে, জার্মানির ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘অলটারনেটিভ ফুর ডয়েচল্যান্ড’ ‘এএফডি’ বা ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’র সবচাইতে উগ্রবাদী অংশের নেতৃবৃন্দকে গোয়েন্দা নজরে রাখা হয়েছে। এই অংশটার নাম ‘ডের ফ্লুগেল’ বা ‘দ্যা উইং’; যার সদস্যসংখ্যা আনুমানিক ৭ হাজারের মতো। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, এই গ্রুপের গুরুত্ব তাদের সংখ্যার চাইতেও আরও বেশি; কারণ এরা পুরো দলের নীতি নির্ধারণেও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। জার্মান পুলিশ এবং তাদের কথাবার্তা শুনতে এবং রেকর্ড করতে পারবে। হালডেনওয়াং বলেন যে, জার্মানিতে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন হামলার ঘটনাই বলে দিচ্ছে যে, উগ্রবাদী গ্রুপগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। গত ফেব্রুয়ারিতে হানাউ শহরে একতা শিশা বারে এক উগ্রপন্থী বন্দুকধারী ৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে। এর আগে অক্টোবরে হাল শহরে ইহুদিদের উপাসনালয় সিনাগগে হামলায় দুই জন নিহত হয়। তারও আগে জুন মাসে হেস রাজ্যে ইমিগ্রেশনের ব্যাপারে নমনীয় অবস্থানে থাকা এক রাজনীতিবিদ ওয়াল্টার লুবেককে এক উগ্রপন্থী ব্যক্তি গুলি করে হত্যা করে।

  
জার্মানির ‘এএফডি’ দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সান্ডার গল্যান্ড ছিলেন একজন সরকারি আমলা এবং পরবর্তীতে পটসড্যামের একটা পত্রিকার সম্পাদক। জার্মানির উগ্রপন্থী রাজনীতিবিদেরা জার্মানির স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মাঝ থেকেই উঠে এসেছে। এদের অনেকেই সবচাইতে বড় রাজনৈতিক দল এঙ্গেলা মার্কেলের ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন’এর সদস্য ছিল; কেউ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর; সরকারি কর্মকর্তা; বা গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার সাংবাদিক বা কলামিস্ট। জার্মান গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়েই এই উগ্রপন্থী চিন্তার আবির্ভাব ঘটেছে। 



‘এএফডি’ তৈরি হয় ২০১২ সালে। দল গঠনের পিছনে মূল যুক্তি ছিল জার্মানিকে ইউরো থেকে নিজস্ব মুদ্রা ডয়েচ মার্কে ফিরিয়ে নেয়া। তাদের বক্তব্য ছিল যে, ইউরোর চাপে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলি দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং তারা ক্রমান্বয়ে জার্মানির উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে। ২০১০ সালে গ্রীসের দেউলিয়া হবার ঘটনায় জার্মানির অর্থনৈতিক সহায়তা দেবার প্রতিশ্রুতি দল গঠনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। দলের উদ্যোক্তা হিসেবে তিনজনের নাম বলা হয়েছিল। এর মাঝে আলেক্সান্ডার গল্যান্ড ছিলেন একজন সরকারি আমলা এবং পরবর্তীতে পটসড্যামের একটা পত্রিকার সম্পাদক। গল্যান্ড একইসাথে এঙ্গেলা মার্কেলের ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন’ বা ‘সিডিইউ’এর সদস্য ছিলেন। ‘সিডিইউ’ হলো জার্মানির সবচাইতে বড় রাজনৈতিক দল। জার্মান পার্লামেন্ট ‘বুন্দেস্টাগ’এর ৭’শ ৯টা আসনের মাঝে ‘সিডিইউ’এর আসন রয়েছে ২’শ। আরেকজন প্রতিষ্ঠাতা বার্ন্ড লাক ইউনিভার্সিটি অব হামবুর্গের অর্থনীতির প্রফেসর। তিনি বিশ্ব ব্যাঙ্কের একজন উপদেষ্টার পদে থাকা ছাড়াও কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভিজিটিং স্কলার ছিলেন। আরেকজন প্রতিষ্ঠাতা কোনরাড এডাম মূলতঃ সাংবাদিক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘ ২৮ বছর তিনি জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ‘ফ্রাঙ্কফুটার আলেমাইন জাইটুং’ এবং ‘ডাই ওয়েল্ট’এর সাথে কাজ করেছে। ২০০৭ সাল থেকে তিনি পত্রিকাতে কলামিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। ‘এএফডি’ গঠনের পূর্বে তিনিও ‘সিডিইউ’এর সদস্য ছিলেন। গত সাত বছরে দলটা রও বেশি উগ্রবাদী ধারণা পোষণ শুরু করে এবং নিজেদের নেতৃত্বে বেশ কয়েক দফা পরিবর্তন হয়। ২০১৫ সালে ইউরোপে শরণার্থী আগমণ শুরু হলে ‘এএফডি’ চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের সীমান্ত খুলে রাখার নীতির ব্যাপক সমালোচনা করে। বর্তমানে ‘এএফডি’ই হলো ক্ষমতাসীন ‘সিডিইউ’এর সবচাইতে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। পার্লামেন্টে এখন তাদের ৮৮টা আসন রয়েছে; ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টেও এদের ১১টা আসন রয়েছে। কাজেই এই দলকে এড়িয়ে যাওয়া কারুর পক্ষেই সভব নয়। গোয়েন্দা সংস্থার বিবৃতির পর ‘এএফডি’র মুখপাত্র জোর্গ মিউথেন বলেন যে, দলের বিরুদ্ধে এই কর্মকান্ড দলটার কন্ঠরোধ করার একটা চেষ্টা। এই প্রচেষ্টা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

‘ডের ফ্লুগেল’ শাখার নেতা বিয়র্ন হোক হলেন জার্মানির পূর্বাংশের থুরিঞ্জিয়া রাজ্যের ‘এএফডি’র রাজনীতিবিদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে ইহুদি নিধনের স্মৃতি স্তম্ভকে তিনি ‘লজ্জার স্মৃতি’ বলে আখ্যা দিয়ে এই স্মৃতি রোমন্থনের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানান। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, গত অক্টোবরে থুরিঞ্জিয়ার প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষ ‘এএফডি’কে ভোট দিয়েছে। সিরিয়া এবং আফ্রিকা থেকে আসা শরণার্থীদেরকে জার্মানিতে ডুকতে দেবার নীতির সমালোচনা থেকেই ‘এএফডি’র জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের কথা হলো, চ্যান্সেলর মার্কেল একনায়কের মতো দেশ চালান এবং তাদের মতামতকে কোন মূল্যই দেন না। বিয়র্ন হোক অভিযোগ করেন যে, আফ্রিকা থেকে আগত মানুষেরা জার্মানির সমাজকে কলুষিত করে ফেলছে। তার কথার ধরণ অনেকেই পছন্দ না করলেও তিনি যা বলছেন, সেগুলিকে যুক্তিযুক্ত বলছেন তারা। অনেকেরই ধারণা রয়েছে যে, জার্মানিতে যথেষ্ট গরীব মানুষ রয়েছে; সরকারের উচিৎ বাইরে থেকে আসা মানুষের পিছনে অর্থ ব্যয় না করা। তবে জার্মান গোয়েন্দারা শুধুমাত্র বিয়র্ন হোককে টার্গেট করার কথা বললেও ‘এএফডি’র অন্যান্য নেতৃবৃন্দও উগ্রপন্থী বক্তব্যে পিছিয়ে নেই। দলের প্রতিষ্ঠাতা রাজনীতিবিদ আলেক্সান্ডার গল্যান্ড মন্তব্য করেন যে, জার্মান ফুটবল দলের কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় বোয়াটেং খেলার মাঠে জার্মানির জন্যে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হলেও জার্মানির অনেক মানুষই তাকে নিজেদের প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চাইবে না। তিনি আরও বলেছিলেন যে, শিশুদের চেহাড়া দেখে শরণার্থীকে জার্মানিতে ঢুকতে দেয়াটা ব্ল্যাকমেইলের শামিল। ২০১৭ সালে তিনি বলেন যে, তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান রাজনীতিবিদ আইদান উজুগুজকে তুরস্কে ফেরত পাঠানো উচিৎ। ২০১৬ সালে ‘এএফডি’র রাজনীতিবিদ ফ্রাউকা পেট্রি এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, শরণার্থীদের থামাতে সীমান্ত পুলিশের দরকার হলে গুলি করা উচিৎ। বিয়াট্রিক্স ভন স্টর্ক আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে শরণার্থীদেরকে আক্রমণকারী হিসেবে আখ্যা দেন। ব্র্যান্ডেনবার্গ রাজ্যের ‘এএফডি’র প্রধান আন্দ্রেয়াস কালবিতজ ২০০৭ সালে গ্রীসে এক নিও নাজি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন, যেখানে স্বস্তিকা সংবলিত পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল।

  
২০১৬ সালে জার্মান ডানপন্থীদের একটা সমাবেশ। উগ্র ডানপন্থী দল ‘এএফডি’ এখন জার্মান পার্লামেন্টে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল; তাদের রয়েছে লাখো সমর্থক। পুলিশি কর্মকান্ডের মাধ্যমে এই উগ্রপন্থী চিন্তা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টাটা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা প্রশ্ন করা যেতেই পারে। স্বাধীনচেতা ইউরোপের কাছে কিছু রাজনীতিবিদদের উপর ধরপাকড়ের বিষয়টা মানুষের বাকস্বাধীনতার উপর হামলা বলে বিবেচিত হবে কিনা, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে তা সমাজকে যে বিভক্ত করবে, তা নিশ্চিত।



যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, জার্মানির উগ্রপন্থী রাজনীতিবিদেরা জার্মানির স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মাঝ থেকেই উঠে এসেছে। এদের অনেকেই সবচাইতে বড় রাজনৈতিক দল এঙ্গেলা মার্কেলের ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন’এর সদস্য ছিল; কেউ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর; সরকারি কর্মকর্তা; বা গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার সাংবাদিক বা কলামিস্ট। জার্মান গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়েই এই উগ্রপন্থী চিন্তার আবির্ভাব ঘটেছে। ‘ডের ফ্লুগেল’এর নেতাদের নজরদারির মাঝে আনার কথা বলা হলেও পুরো ‘এএফডি’র নেতারাই তো প্রকাশ্যে স্বাধীনভাবে উগ্রপন্থী কথা বলছেন। শুধু তাই নয়, ‘এএফডি’ এখন জার্মান পার্লামেন্টে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল; তাদের রয়েছে লাখো সমর্থক। পুলিশি কর্মকান্ডের মাধ্যমে এই উগ্রপন্থী চিন্তা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টাটা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা প্রশ্ন করা যেতেই পারে। স্বাধীনচেতা ইউরোপের কাছে কিছু রাজনীতিবিদদের উপর ধরপাকড়ের বিষয়টা মানুষের বাকস্বাধীনতার উপর হামলা বলে বিবেচিত হবে কিনা, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে তা সমাজকে যে বিভক্ত করবে, তা নিশ্চিত।

আর জার্মানি কেন, বাকি ইউরোপেও ডানপন্থী চিন্তার ব্যাপক প্রসার ঘটছে। ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সে সহিংসতার সংখ্যা বেড়ে গেছে। উদাহরণসরূপ, মাস্ক পড়তে বলার কারণে কিছু বাসযাত্রীর হাতে এক বাস ড্রাইভারের প্রাণ গিয়েছে। ফরাসী ফুটবল দল প্যারিস সাঁ জার্মেই জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হেরে যাবার পর রাস্তায় কিছু লোক ভাংচুর করে। বিভিন্ন শহরের মেয়ররাও জনগণকে মাস্ক পড়তে বলার কারণে হামলার শিকার হয়েছে। ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী নেতা ম্যারিন লা পেন ৬ই সেপ্টেম্বর জনসমক্ষে এক ভাষণে বলেন যে, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর সরকার অপরাধের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর হতে পারছে না। আর ফ্রান্স ধীরে ধীরে আরও ‘হিংস্র’ হয়ে যাচ্ছে। লা পেন ২০১৭ সালের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে ম্যাক্রঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। ২০২২ সালের নির্বাচনেও তিনি ম্যাক্রঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাইছেন। তিনি মনে করছেন যে, ম্যাক্রঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার মতো আর কেউই এখন ফ্রান্সে নেই। ২০১৭এর নির্বানের দ্বিতীয় ধাপে তিনি ৩৪ শতাংশ মানুষের ভোট পেয়েছিলেন। লা পেনের অভিবাসন নীতি জার্মান ডানপন্থীদের মতোই। তিনি ঘোরতরভাবে মুসলিম বিদ্বেষী এবং শরণার্থীদের ফ্রান্সে ঢোকার যারপরনাই বিরোধী। ফ্রান্সে মুসলিম অভিবাসী আসা থামাতে তিনি ফ্রান্সের সীমানা বন্ধ করে দেবার কথা বলেন। একজন উগ্র ডানপন্থী নেতার জন্যে প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে এক তৃতীয়াংশ ভোট অর্জন বলে দেয় যে, পুরো জাতির মাঝেই ডানপন্থী চিন্তা কতটা বাসা বেঁধেছে। জার্মানি এবং ফ্রান্সের চাইতেও ডানপন্থীরা বেশি শক্তিশালী ইতালিতে। সেখানে ডানপন্থী কোয়ালিশন ক্ষমতায়ও গিয়েছে। হাঙ্গেরিতেও ডানপন্থী ভিক্টর অরবান বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী। গতবছর পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন ডানপন্থীরা তাদের ভোট ৩৮ শতাংশ থেকে ৪৪ শতাংশে বাড়িয়ে নিয়েছে।

জার্মানি ও ফ্রান্সসহ ইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থান শুধু ইউরোপিয় ইউনিয়নের ঐক্যের জন্যেই যে হুমকি তা নয়; ব্যক্তিস্বাধীনতায় কঠোরভাবে বিশ্বাসী ইউরোপিয়দের আদর্শিক অবস্থানকেও তা আঘাত করেছে। ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে পুলিশি গোয়েন্দাগিরি চালনা করাটা সেই আঘাতেরই বহিঃপ্রকাশ। তবে যে চিন্তার স্বাধীনতা থেকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মাঝে উগ্রপন্থী ধারণা বাসা বাঁধছে, সেই চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নিজেদের আদর্শকেই খাঁচায় পুরতে হচ্ছে ইউরোপিয়দের। একইসাথে যে উগ্রপন্থী চিন্তাকে পুঁজি করে ডানপন্থীরা ইউরোপজুড়ে ক্ষমতায় যাচ্ছে, তার পিছনে জনগণের সমর্থন গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ধারাতেই উগ্রপন্থীরা ইউরোপে আরও শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে। সেই হিসেবে জার্মান পুলিশের উগ্রপন্থীদের টার্গেট করে চাপের মাঝে ফেলার চেষ্টাখানা যথেষ্টই অগণতান্ত্রিক। গণতন্ত্রকে পুঁজি করে পরস্পরবিরোধী এই কার্যকলাপ ইউরোপের আদর্শিক সংকটেরই চিত্র, যা থেকে বের হবার কোন পথ কেউ দেখাতে পারছেন না।


Saturday, 5 September 2020

সৌদি পাকিস্তান টানাপোড়েন মুসলিম নেতৃত্বের বিভাজনকেই দেখিয়ে দেয়

০৫ই সেপ্টেম্বর ২০২০
   

কাশ্মির ইস্যুতে অনৈক্য মুসলিম দেশগুলির পারস্পরিক সাংঘর্ষিক জাতীয় স্বার্থের বেড়াজালে আটকে রয়েছে। সৌদি নেতৃত্বের দেশগুলির সাথে তুর্কি নেতৃত্বের দেশগুলির দ্বন্দ্ব এতটাই প্রাধান্য পেয়েছে যে, মুসলিম নেতৃত্বের কাছে কাশ্মির, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইয়েমেন বা উইঘুরের মতো সমস্যাগুলি ছোট হয়ে গিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে চীনের কাছ থেকে ব্যাপক সহায়তা পাওয়ায় পাকিস্তানের জন্যে সৌদি আরবের সাথে মনোমালিন্য কাটিয়ে ওঠা সহজতর হবে। তবে কাশ্মির ইস্যুতে চীন, তুরস্ক বা মালয়েশিয়ার সমর্থন পেলেও এখানেও যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকবে না, তার নিশ্চয়তা পাকিস্তানের কাছে নেই। আদর্শগত অবস্থান নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই এগুচ্ছে পাকিস্তানসহ সকলে। অপরদিকে কোন পথে এগুলে কাশ্মির সমস্যার সত্যিকার সমাধান হবে, সেটার উত্তরও পাকিস্তানের কাছে নেই।

 

পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক বেশ গভীর বলেই সকলে জানে, কিন্তু তারপরেও হঠাত করেই সম্পর্কে একটা টানাপোড়েন দেখা দেয়ায় অনেকেই অবাক হয়েছেন। ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন পাকিস্তানের পরররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশী গত ৪ঠা অগাস্ট পাকিস্তানের একটা টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন যে, তিনি আবারও ‘ওআইসি’কে আহ্বান করছেন যাতে তারা কাশ্মির ইস্যুতে কাউন্সিল অব ফরেন মিনিস্টার্সএর একটা আলোচনার ডাক দেয়। যদি ‘ওআইসি’ সেটা করতে ব্যর্থ হয়, তবে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে বলতে বাধ্য হবেন যে, তিনি যেন এমন একটা আলাদা আলোচনার ডাক দেন, যেখানে কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে দাঁড়াবে এমন মুসলিম দেশগুলি যোগ দেয়। তিনি বলেন যে, পাকিস্তানের নিজস্ব কিছু অবস্থান রয়েছে যেগুলি ‘ওআইসি’ এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলিকে বুঝতে হবে। কোরোশীর এই বক্তব্যের পরপরই ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলে যে, সৌদি আরব পাকিস্তানের জন্যে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা স্থগিত করেছে। একইসাথে তারা পাকিস্তানকে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ ফেরত দিতে বলে। চীনাদের জরুরি সহায়তায় পাকিস্তান এই ঋণ ফেরত দেয়। এই ঋণ ২০১৮ সালের নভেম্বরে দেয়া হয়েছিল, তখন পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভয়াবহ রকমের কমে গিয়েছিল। সৌদি আরব থেকে তেল কেনার মূল্য দেরিতে পরিশোধ করার ব্যাপারে দুই দেশের মাঝে যে চুক্তি রয়েছে, সেই চুক্তিও সৌদি আরব নবায়ন করা বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানা যায়। ১৭ই অগাস্ট পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া সৌদি আরব সফরে গেলে পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা বলে যে, অনেকেই মনে করছেন যে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘ওআইসি’র আরব নেতৃত্বের সমালোচনা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের জন্যে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়ার ব্যাপারটার সাথে সেনাপ্রধানের এই সফরের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই সফরকে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মাঝে নিয়মিত সফরের অংশ হিসেবেই আখ্যা দেয়। এর কয়েকদিন পরেই পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতিতে কাশ্মিরের ব্যাপারে ‘ওআইসি’র ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোরেশীও সাংবাদিকদের বলেন যে, কাশ্মির ইস্যুতে ‘ওআইসি’ বহু রেজোলিউশন পাস করেছে, যার ব্যাপারে কোন সন্দেহই নেই। আর সেই ব্যাপারগুলি পাকিস্তানের অবস্থানের সাথে মিল রেখেই হয়েছিল। তিনি আরও পরিষ্কার করে বলেন যে, পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের কোন মতপার্থক্য নেই। এতো অল্প সময়ের মাঝে পরস্পরবিরোধী এই খবরগুলির গুরুত্ব আসলে কোথায়?

সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মাঝে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। গত বছর দুই দশের মাঝে বাণিজ্য ছিল ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার; যার মাঝে ৭৪ শতাংশই ছিল সৌদি আরব থেকে পাকিস্তানের তেল আমদানি। পাকিস্তানের এক চতুর্থাংশ তেল আসে সৌদি আরব থেকে। এছাড়াও প্রায় ২৫ লক্ষ পাকিস্তানি সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছে; যাদের কাছ থেকে পাকিস্তানের মোট রেমিট্যান্স আয়ের ৩০ শতাংশ আসে। অপরদিকে সৌদি আরবের সামরিক বাহিনীর গঠন এবং প্রশিক্ষণের পিছনে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তথাপি কাশ্মির ইস্যুতে সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নেয়াটা অতটা সহজ নয়। ‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের সাথে সৌদি আরবের বার্ষিক বাণিজ্য এখন প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। সৌদি আরব এতবড় বাণিজ্যকে ছেড়ে দিয়ে কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের বিপক্ষে অবস্থান নিতে চাইবে না। ভারতের সাথে সৌদিদের সম্পর্কের ব্যাপারে পাকিস্তানের অসন্তোষ থাকলেও সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের দরকষাকষির সুযোগ খুব কমই রয়েছে। অন্ততঃ পরবর্তীতে সৌদিদের ব্যাপারে পাকিস্তানের সুর পাল্টে ফেলার ব্যাপারটা সেটাই দেখিয়ে দিচ্ছে।

মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর ফেলো মাদিহা আফজাল বলছেন যে, দুই দেশের নির্ভরশীলতার মাঝে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাগুলি বেশ অদ্ভূতই ঠেকেছে। তবে এতে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। এটা এর আগেও একবার হয়েছে, যখন গতবছর কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়া, তুরস্ক এবং পাকিস্তান আলাদাভাবে ‘ওআইসি’কে বাইপাস করে মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্ব নেবার একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরির দিকে এগিয়ে যায়। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সেই বৈঠক থেকে শেষ মুহুর্তে নিজের নাম সড়িয়ে নিয়ে সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান বা ‘এমবিএস’এর অধীনে সৌদি আরব তুরস্ক, ইরান এবং কাতারকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র হিসেবে দেখছে; পাকিস্তানের সাথে এই দেশগুলির সম্পর্কোন্নয়নও তাই সৌদি আরবের কাছে ভালো ঠেকছে না।

‘উড্রো উইলসন সেন্টার ফর স্কলার্স’এর দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলমান ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, পাকিস্তানের পক্ষে প্রমাণ করা কঠিন হচ্ছে যে, পাকিস্তানের কাশ্মির নীতি কাজ করছে। এই প্রচেষ্টা যদি ফলাফল না নিয়ে আসে, তাহলে তারা কি করবে? ইসলামাবাদের ‘কায়েদ এ আজম ইউনিভার্সিটি’র এসিসট্যান্ট প্রফেসর রাজা কায়সার আহমেদ বলছেন যে, এখন পর্যন্ত কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তান শুধুমাত্র চীন, তুরস্ক এবং মালয়েশিয়াকে পাশে পেয়েছে। এর থেকে বের হতে পাকিস্তানের আরও আক্রমণাত্মক কূটনীতিতে যেতে হবে। কুগেলমান বলছেন যে, সৌদিদের সাথে সমস্যা খুব সহজেই মুছে যাবে না; তবে চীন এবং আরবের বাইরে অন্যান্য মুসলিম দেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান।

কাশ্মির ইস্যুতে অনৈক্য মুসলিম দেশগুলির পারস্পরিক সাংঘর্ষিক জাতীয় স্বার্থের বেড়াজালে আটকে রয়েছে। সৌদি নেতৃত্বের দেশগুলির সাথে তুর্কি নেতৃত্বের দেশগুলির দ্বন্দ্ব এতটাই প্রাধান্য পেয়েছে যে, মুসলিম নেতৃত্বের কাছে কাশ্মির, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইয়েমেন বা উইঘুরের মতো সমস্যাগুলি ছোট হয়ে গিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে চীনের কাছ থেকে ব্যাপক সহায়তা পাওয়ায় পাকিস্তানের জন্যে সৌদি আরবের সাথে মনোমালিন্য কাটিয়ে ওঠা সহজতর হবে। তবে কাশ্মির ইস্যুতে চীন, তুরস্ক বা মালয়েশিয়ার সমর্থন পেলেও এখানেও যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকবে না, তার নিশ্চয়তা পাকিস্তানের কাছে নেই। আদর্শগত অবস্থান নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই এগুচ্ছে পাকিস্তানসহ সকলে। অপরদিকে কোন পথে এগুলে কাশ্মির সমস্যার সত্যিকার সমাধান হবে, সেটার উত্তরও পাকিস্তানের কাছে নেই।

Tuesday, 1 September 2020

করোনা মন্দায় পুঁজিবাদের নিম্নগামীতাকে থামানো যাচ্ছে না কিছুতেই!

২রা সেপ্টেম্বর ২০২০

দুনিয়ার সবচাইতে ধনী ব্যক্তি ‘আমাজন’এর প্রতিষ্ঠাতা বেফ বেজস করোনাভাইরাসের মন্দার মাঝে রেকর্ড পরিমাণ আয় করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার বেশিরভাগ অর্থ ব্যাংক এবং কর্পোরেটদের হাত ঘুরে গুটি কয়েক ধনীদের পকেটেই গিয়েছে। প্রণোদনার অর্থে শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়েছে ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির জন্যেই। অপরদিকে প্রণোদনার অর্থে উঠে দাঁড়ানো ধনীদের অফশোর ব্যাংক একাউন্টও ফুলে ফেঁপে উঠছে। পুঁজিবাদের করুণ অবস্থা করোনাভাইরাসের আগে থেকেই দৃশ্যমান ছিল; বিশেষ করে ব্যাপক আয় বৈষম্যের প্রতিবেদনে পত্রিকার পাতা ভরেছে সাম্প্রতিক সময়ে। করোনাভাইরাসের মাঝে এই করুণ দৃশ্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থায় আয় বৈষম্যের চিত্রটা এখন আর সমাধানের পর্যায়ে নেই। পুঁজিবাদের নিম্নগামীতাকে থামাতে পারছেন না কেউই।

‘বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ’এর এক গবেষণা বলছে যে, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় যেখানে মানুষের পকেট থেকে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার উধাও হয়ে গিয়েছিল, এবছর করোনাভাইরাসের কারণে সেটা ১৬ ট্রিলিয়ন ডলার ছুঁয়ে যেতে পারে। তবে এই সম্পদহানি সকলের জন্যে সমানভাবে আসেনি। ‘বিজনেস ইনসাইডার’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের লকডাউনের কারণে যেখন প্রায় ৪ কোটি মানুষ তাদের চাকুরি হারাবার পর সরকারের কাছে বেকার ভাতা চেয়েছে, সেখানে সেদেশের বিলিয়নায়াররা আরও বেশি করে অর্থ কামিয়ে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়নায়াররা একত্রে প্রায় ৬’শ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত সম্পদ আয় করে নিয়েছেন। মার্চ থেকে জুনের মাঝে ‘আমাজন’এর প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজস তার সম্পদকে ৪৮ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে নিয়েছেন। ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার ‘জুম’এর মালিকের সম্পদ বেড়েছে আড়াই বিলিয়ন ডলার। ‘মাইক্রোসফট’এর প্রধান নির্বাহী স্টিভ বলমারএর সম্পদ বেড়েছে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে, অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে এই মানুষগুলি ঠিক সময়ে ঠিক ব্যবসায়ে থাকার ফলেই লাভবান হয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও কিছু ঘটনা রয়েছে, যা এই যুক্তির বিরুদ্ধে যাবে। ক্যাসিনো মালিক শেলডন এডেলসন তার সম্পদ বাড়িয়ে নিয়েছেন ৫ বিলিয়ন ডলার। এলন মাস্কও তার সম্পদ বাড়িয়েছে ১৭ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, এর আগে ২০০৭ সালে হাউজিং কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেও এমনটাই ঘটেছিল। বাড়িঘরের মূল্য পড়ে গিয়েছিল ২১ শতাংশ; শেয়ার বাজারের মূল্য হয়ে গিয়েছিল অর্ধেক; ৮৮ লক্ষ আমেরিকান হয়েছিল বেকার। সেই মন্দার পরপর ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মাঝে নিচের ৯৯ শতাংশ মানুষের সম্পদ বেড়েছিল শূণ্য দশমিক ৪ শতাংশ; অপরদিকে উপরের ১ শতাংশ মানুষের সম্পদ বেড়েছিল ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ।

‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্বে আয় বৈষম্য আরও বাড়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। বিভিন্ন গবেষণা বলছে যে, ধনীরা গত মার্চের পর থেকে অর্থ জমাতে সক্ষম হয়েছে; আর অন্যদিকে গরীব লোকেরা আয় না থাকার কারণে বাধ্য হয়েছে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দিতে এবং নতুন করে ধারকর্য করতে। ব্রিটেনের ‘রেজোলিউশন ফাউন্ডেশন’এর এক গবেষণা বলছে যে, ব্রিটেনের নিম্ন আয়ের মানুষের বেশিরভাগই জুন মাসে ক্রেডিট কার্ডের উপর বেঁচে ছিল। লাক্সারি জিনিসপত্রের দোকান বন্ধ থাকায় এবং ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ধনী ব্যক্তিদের খরচ কমে গেছে। ‘নিউ পলিসি ইন্সটিটিউট’এর গবেষণা বলছে যে, ব্রিটেনের সমাজের উপরের ২০ শতাংশ মানুষের ব্যাংক একাউন্টে লকডাউনের মাঝে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার জমে গেছে। হারভার্ডের একদল গবেষক বলছে যে, মার্কিন সমাজের উপরের ২৫ শতাংশ মানুষের খরচ ২০ শতাংশ কমেছে; অথচ নিচের ২৫ শতাংশের খরচ কমেছে মাত্র ৫ শতাংশ। ধনীদেরকে টার্গেট করা লাক্সারি গাড়ি তৈরির কারখানা, দামী জামাকাপড় বিক্রেতা, রেস্টুরেন্ট, হোটেলগুলি বিপদে পড়েছে; আর ব্যবসা মালিকরা খরচ কমাতে গিয়ে কম মজুরির কর্মচারীদেরকে ছাঁটাই করেছে। ধনীদের সম্পদ যারা দেখাশোনা করছেন, তারা আবার উপদেশ দিচ্ছে যে, আপাততঃ বিনিয়োগ এবং খরচ কম করাই ভালো হবে। প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হচ্ছে যে, একজন ধনী ব্যবসায়ী যদি বাড়ি থেকেই কাজ করেন, তাহলে নতুন স্যুট কিনে তিনি কি করবেন? আর তার স্ত্রী যেহেতু কোন পার্টিতে যাচ্ছেন না, তাই নতুন লাক্সারি জিনিসপত্র কিনে তিনি কাকে দেখাবেন? সাধারণ সময়ে বোঝা না গেলেও মহামারি এবং অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেই বোঝা যাচ্ছে যে, শুধুমাত্র কিছু ধনী ব্যক্তির ইচ্ছেমত খরচের উপর পুরো অর্থনীতিটা কিভাবে চলছে।

সমাজের উপরের স্তরের মানুষের সাথে নিচের স্তরের মানুষের এই ক্রমবর্ধমান বিভেদ, যা কিনা অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে বেড়েছে, এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ‘বিজনেস ইনসাইডার’ বলছে যে, এখানে দু’টা সমস্যার দিকে তাকাতে হবে। প্রথমতঃ সরকার বেশিরভাগ প্রণোদনা দেয় ব্যাংক এবং কর্পোরেটদেরকে। ২০০৮ সালের ‘ইমার্জেন্সি ইকনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন এক্ট’এর অধীনে ৭’শ বিলিয়ন ডলার খরচে ব্যাংকগুলির কাছ থেকে মূল্য পড়ে যাওয়া সম্পদ কিনে নেয়া হয়। পরবর্তীতে বারাক ওবামা প্রশাসন ‘ট্রাবল্ড এসেট রিলিফ প্রোগ্রাম’ প্রকল্পের অধীনে বাড়ির মালিকদেরকে ৭৫ বিলিয়ন ডলার প্রণোদনা দিয়ে তাদের সুদ পরিশোধে সহায়তা দেয়। অর্থাৎ ৭’শ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা থেকে ৭৫ বিলিয়ন বা ১০ শতাংশ গিয়েছে বাড়ির মালিকদের কাছে; বাকিটা গিয়েছে ব্যাংক এবং কর্পোরেটদের কাছে। দ্বিতীয়তঃ কর্পোরেটদের হাতে প্রণোদনার অর্থ যাওয়ায় তারা শেয়ার বাজারে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে নিতে পেরেছে। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যারা প্রণোদনার অর্থ পায়নি, তারা ঝরে পড়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডেরাল রিজার্ভ ২০০৮ সালে স্বল্পমেয়াদী সুদের হার প্রায় শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে নিয়ে আসে। আর এই সুযোগে ব্যবসায়ীয়া পরবর্তী এক দশকে শেয়ার বাজার গরম করে রাখে। ‘স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর্স ৫০০’ ইন্ডেক্স মূল্যসূচক ৪’শ ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এর অর্থ হলো, মন্দার সবচাইতে খারাপ সময়ে যে ব্যবসায়ী শেয়ার বাজারে ১’শ ডলার বিনিয়োগ করেছে, সে ৪’শ ৬২ ডলার পর্যন্ত কামিয়ে নিতে পেরেছে। আর ১ মিলিয়ন ডলার যে বিনিয়োগ করেছে, সে তুলে নিয়েছে ৪ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বিনিয়োগের সাড়ে চার গুণেরও বেশি সে তুলে নিতে পেরেছে। ২০০৯ সালের মাঝেই অতিধনী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদ ১৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যায়; মন্দার কারণে তারা যা হারিয়েছিল, তার পুরোটাই তারা এক বছরের মাঝেই পুষিয়ে নেয়। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মাঝে সকল মানুষের আয় মোট যত বৃদ্ধি পেয়েছে, তার ৯৫ ভাগই গিয়েছে ১ শতাংশ মানুষের হাতে; আর ৯৯ শতাংশ মানুষ পেয়েছে মাত্র ৫ ভাগ। আর যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের মাঝে বিলিয়নায়ারদের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ৮০ শতাংশ।   
 

সারা দুনিয়ায় আয় বৈষম্য এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ২০০৮ সালের মতোই ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সময় যখন প্রণোদনা দেয়া হয়, তখনও বেশিরভাগ অর্থ চলে যায় কর্পোরেটদের হাতে। ধনীরা গত মার্চের পর থেকে অর্থ জমাতে সক্ষম হয়েছে; আর অন্যদিকে গরীব লোকেরা আয় না থাকার কারণে বাধ্য হয়েছে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দিতে এবং নতুন করে ধারকর্য করতে।
 

২০০৮ সালের মতোই ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সময় যখন প্রণোদনা দেয়া হয়, তখনও বেশিরভাগ অর্থ চলে যায় কর্পোরেটদের হাতে। ‘স্মল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন’এর মাধ্যমে ৩’শ ৪৯ বিলিয়ন ডলার বিতরণ করা হয়, যার মাঝে ২’শ ৪৩ বিলিয়ন ডলার পায় বড় কর্পোরেটরা; যাদের কোন কোনটা ১’শ মিলিয়ন ডলারের চাইতে বড় কোম্পানি। ১৬ই মার্চ ‘ডাউ জোন্স’ ইন্ডেক্স ইতিহাসে একদিনের সবচাইতে মারাত্মক ধ্বসের মাঝে পড়ে। অথচ ৪ঠা জুনের মাঝেই বিশ্বের সবচাইতে ধনী সাত ব্যক্তির সম্পদ ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়! সরকারের প্রণোদনা ঘোষণার পরপরই শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে এবং স্বাভাবিকভাবেই বড় শেয়ারহোল্ডার ব্যক্তিরা তাদের সম্পদ বাড়িয়ে ফেলে।

২০১০ সালে হাইতিতে ভূমিকম্পের পর ১’শ ৯৫ মিলিয়ন ডলারের যে সহায়তা দেয়া হয়, তার বেশিরভাগই চলে যায় মার্কিন কন্সট্রাকশন কোম্পানির কাছে; হাইতির কোম্পানিগুলি পায় মাত্র আড়াই শতাংশ ফান্ড। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিয়ান্সএ হারিকেন ‘ক্যাটরিনা’ আঘাত করার পর মার্কিন কন্সট্রাকশন কোম্পানি ‘কেবিআর’ ৩১ বিলিয়ন ডলারের কাজ পায়। এই কোম্পানির মালিক ‘হ্যালিবারটন’এর প্রধান নির্বাহী ছিলেন প্রাক্তন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি। নিজেদের বিশাল সম্পদের উপরে সরকার থেকে আরও প্রণোদনা পাওয়ায় এই বিলিয়নায়াররা দুর্যোগের মুহুর্তগুলিকে কাজে লাগিয়ে আরও ধনী হয়েছে। আবার একইসাথে বিনিযোগের সুযোগ বাড়াবার নামে এই বিলিয়নায়ারদেরকে দেয়া হয়েছে কর সুবিধা এবং তাদের অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারার জন্যে রেখে দেয়া হয়েছে নানা ফাঁকফোঁকড়। উদাহরণস্বরূপ, লিমিটেড কোম্পানিগুলির ক্ষেত্রে কোম্পানি মালিকেরা নির্দিষ্ট আকারের ঋণের বেশি কোন ঋণ ফেরত দেবার জন্যে দায়বদ্ধ থাকে না। বিভিন্ন ছুতো ধরে ‘আমাজন’ কোম্পানি দুই বছরে এক ডলারও কর দেয়নি; আর ২০১৯ সালে তারা আয়ের উপর মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ কর দেয়! ১৯৮০এর দশক থেকে বিলিয়নায়ারদের কর ৭৯ শতাংশ কমে গেছে! শুধু তাই নয়, এই অতিধনীদের বেশিরভাগ অর্থই অফশোর ব্যাংক একাউন্টে জমা হয়েছে। ২০১৭ সালে কিছু গবেষক বের করেন যে, পুরো দুনিয়ার জিডিপির ১০ শতাংশই এসব অফশোর ব্যাংক একাউন্টে চলে গেছে! ২০১২ সালে আরেক গবেষণায় উঠে আসে যে, প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৩২ হাজার বিলিয়ন ডলার অফশোর একাউন্টে জমা রয়েছে! এটা চীনের জিডিপির প্রায় তিন গুণ!

মন্দা থেকে উঠে দাঁড়াতে অনেকেই অনেক ফর্মূলা দিচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসন জনগণকে নগদ অর্থ প্রদান করতে চাইলে অনেকেই বাধা দিয়েছেন। তবে এরপরেও প্রণোদনার বেশিরভাগ অর্থ ব্যাংক এবং কর্পোরেটদের হাত ঘুরে গুটি কয়েক ধনীদের পকেটেই গিয়েছে। প্রণোদনার অর্থে শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়েছে ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির জন্যেই। আবার ধনীদের খরচের খাতা থমকে যাওয়াতেও চাকুরি হারাতে হয়েছে খেটে খাওয়া মানুষগুলিকেই। ধনীরা কবে আবার খরচ শুরু করবে, সেদিনের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে গরীব মানুষগুলিকে। ধনীদের মতো অর্থ জমানো দূরে থাক, শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দিয়ে ক্রেডিট কার্ডের উপর বেঁচে থাকার পথ বেছে নিতে হয়েছে তাদের। অপরদিকে প্রণোদনার অর্থে উঠে দাঁড়ানো ধনীদের অফশোর ব্যাংক একাউন্টও ফুলে ফেঁপে উঠছে। পুঁজিবাদের করুণ অবস্থা করোনাভাইরাসের আগে থেকেই দৃশ্যমান ছিল; বিশেষ করে ব্যাপক আয় বৈষম্যের প্রতিবেদনে পত্রিকার পাতা ভরেছে সাম্প্রতিক সময়ে। করোনাভাইরাসের মাঝে এই করুণ দৃশ্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থায় আয় বৈষম্যের চিত্রটা এখন আর সমাধানের পর্যায়ে নেই। পুঁজিবাদের নিম্নগামীতাকে থামাতে পারছেন না কেউই।