Monday, 6 April 2020

পশ্চিমাদের সেলেব্রিটি সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে করোনাভাইরাস

০৭ই এপ্রিল ২০২০

  
প্রাক্তন ব্রিটিশ সুপারমডেল নাওমি ক্যাম্পবেল তার ইন্সটাগ্রামে নিজের একটা ছবি পোস্ট করেন; যেখানে তার সারা শরীর ঢাকা ছিল সাদা রঙের পার্সোনাল প্রোটেকটিভ স্যুটে; মুখে তার ছিল ‘এন৯৫’ রেস্পিরেটর মাস্ক। এই স্যুট এবং মাস্ক পশ্চিমা সবগুলি দেশের হাসপাতালে চরম সরবরাহ স্বল্পতার মাঝে রয়েছে।



ব্রিটিশ অভিনয় শিল্পী ইদ্রিস এলবা গত ১৭ই মার্চ ঘোষণা দেন যে, তার শরীরে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। তিনি সন্দেহ করেছিলেন যে, তিনি খুব সম্ভবতঃ একজন করোনাভাইরাস পজিটিভ ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন। তাই কোন উপসর্গ দেখা দেয়া ছাড়াই তিনি নিজের করোনাভাইরাস টেস্টের ব্যবস্থা করেন। সেলেব্রিটি ইদ্রিস এলবা কোন উপসর্গ ছাড়াই তার করোনাভাইরাস পরীক্ষা করতে পারলেও সাধারণ ব্যক্তিদের জন্যে ব্যাপারটা অত সহজ ছিল না; অন্ততঃ উপসর্গ ছাড়া তো নয়ই। টেস্ট কিটের অপ্রতুলতার কারণে মার্কিন ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’ বা ‘সিডিসি’ করোনাভাইরাস টেস্টের জন্যে কঠোর গাইডলাইন দিয়ে দেয়। ওয়াশিংটন ডিসির ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ রিসার্চ’এর প্রেসিডেন্ট ডায়ানা জুকারম্যান ‘ইনসাইডার’ ম্যাগাজিনের সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, যখন কোন কিছু স্বল্প পরিমাণে পাওয়া যায়, তখন বিখ্যাত এবং ধনী মানুষেরাই তা আগে পেয়ে থাকে। গত ১১ই মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা রাজ্যের ৬০ শতাংশ টেস্টিং কিট ব্যবহার করে বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের করোনাভাইরাস টেস্ট করা হয়। এই টেস্টের কারণ হিসেবে উটাহ রাজ্যের বাস্কেটবল দলের একজনের করোনাভাইরাস পজিটিভ হবার কথা বলা হয়। দলের মোট ৫৮ জন খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তাকে টেস্ট করার পর একজনকে পজিটিভ পাওয়া যায়। ইদ্রিস এলবা বা বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের মতো লোকদের টেস্ট করা হয়েছে কোন লক্ষণ ছাড়াই। খুব সম্ভবতঃ প্রাইভেট ল্যাবরেটরির মাধ্যমেই এই টেস্টগুলি করা হয় বলে বলছে ‘বিজনেস ইনসাইডার’। কিছু ধনী ব্যক্তি নিজের বাড়িতে প্রাইভেট ডাক্তার এনে শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করিয়েছেন। যদিও মার্কিন সরকার জনগণের জন্যে করোনাভাইরাস টেস্ট বিনামূল্যেই করে দিচ্ছে, ধনী ব্যক্তিদের প্রাইভেট টেস্টিং অবশ্য কম খরচে হচ্ছে না। ধনী ব্যক্তিদের জন্যে কাজ করা ডাক্তার ডেভিড নাজারিন বলছেন যে, ডাক্তারের ফি বাদেই এরকম টেস্ট করতে কয়েক’শ ডলার খরচ হবার কথা। লস এঞ্জেলেসের ডাক্তার সারি আইচেস বলছেন যে, যখন ল্যাবরেটরিগুলি টেস্টের ফলাফল সরবরাহ করতে হিমসিম খাচ্ছে, তখন তাদের হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে যে, কাদের টেস্টগুলি আগে করা হবে। যাদের আর্থসামাজিক অবস্থান উপরের দিকে, তাদের টেস্টগুলিই তখন প্রাধান্য দিয়ে করা হবে।

বিখ্যাত এবং ধনী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করোনাভাইরাস টেস্ট করা একটা বিষয়; আর করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে গিয়ে নিজের ধনসম্পদ ব্যবহার করা আরেকটা বিষয়। মার্কিন মিডিয়া ‘স্লেট’ এক প্রতিবেদনে বলছে যে, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে দুই সপ্তাহের মাঝে প্রাইভেট জেট বিমানের বুকিং দশ গুণ বেড়ে গিয়েছে। ধনী ব্যক্তিরা নিজস্ব জেটবিমান ব্যবহারের মাধ্যমে জনসমাগম এড়াতে চেয়েছে। ‘সাউদার্ন জেট’এর মালিক জেরড ডেভিস বলছেন যে, নিউ ইয়র্ক থেকে দক্ষিণ ফ্লোরিডা প্রাইভেট জেট বিমানে যেতে কমপক্ষে ২০ হাজার ডলার খরচ হবে। প্রতি ঘন্টার জন্যে ৪ হাজার ডলারের উপর চার্জ করা হয়। একসময় কাস্টমার পেতে তারা দ্বারে দ্বারে ঘুরতেন; এখন চাহিদার ভাড়ে নুয়ে পড়ছেন তারা। প্রতিদিন পাঁচ থেকে দশটা বুকিংএর অনুরোধ আসছে। প্রাইভেট বিমান চার্টারের ব্যবসায় স্বাভাবিক সময়ে কখনোই ৩০ দিন পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যায় না। আর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য যখন সর্বনিম্ন স্তরে, তখন এই প্রাইভেট চার্টার কোম্পানিগুলি ব্যাপক মুনাফা আশা করছে।
 
 
বিলিয়নায়ার ডেভিড গেফেন তার টুইটার একাউন্টে তার লাক্সারি ইয়টের ছবি পোস্ট করে বলেন যে, তিনি এই ইয়টে নিজেকে আলাদা করে রাখবেন। আর তিনি এ-ও আশা করেন যে, সকলে যেন নিরাপদ থাকে। গেফেনের এই পোস্টে জনগণ এতটাই আক্রমণাত্মক মতামত দিতে থাকে যে, তিনি তার টুইটার একাউন্টই ডিলিট করে দেন!



চার্টার বিমানের মাধ্যমে ধনী ব্যক্তিরা অপেক্ষাকৃত ‘নিরাপদ’ জায়গা খুঁজছে। যেমন, ফেইবুকে বিনিয়োগ করা বিলিয়নায়ার পিটার থিয়েল নিউজিল্যান্ডে ৪’শ ৭৭ একর জমির মালিক। অন্যরা কেউ কেউ শহর থেকে দূরে কোথাও নিজস্ব বাড়িতে চলে যাচ্ছেন। ব্রিটেনের ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ পত্রিকা বলছে যে, কোন কোন অতিধনী ব্যক্তি করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে সমুদ্রের মাঝে ঘুরে বেড়াবার পরিকল্পনা করেছেন। লন্ডনের ইয়ট চার্টার কোম্পানি ‘বুরগেস’এর প্রধান নির্বাহী জনাথন বেকেট বলছেন যে, বিলিয়নায়াররা একটা লাক্সারি ইয়ট ভাড়া করে আলাস্কা, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর বা চিলির দক্ষিণে চলে যাচ্ছেন। কোন কোন পরিবার দুই মাসের বেশি সময়ের জন্যে ইয়ট ভাড়া করেছে। তাদের নিজেদের শিশুদেরকে ইয়টের উপরেই পড়াশুনা করাবার পরিকল্পনা নিয়েছেন তারা! এই ইয়টগুলির এক সপ্তাহের ভাড়া ১ লক্ষ ডলার থেকে ৬ লক্ষ ডলার পর্যন্ত হতে পারে; এর উপর ক্রুর বেতন তো রয়েছেই।

১১ই মার্চ প্রাক্তন ব্রিটিশ সুপারমডেল নাওমি ক্যাম্পবেল তার ইন্সটাগ্রামে নিজের একটা ছবি পোস্ট করেন; যেখানে তার সারা শরীর ঢাকা ছিল সাদা রঙের পার্সোনাল প্রোটেকটিভ স্যুটে; মুখে তার ছিল ‘এন৯৫’ রেস্পিরেটর মাস্ক। এই স্যুট এবং মাস্ক পশ্চিমা সবগুলি দেশের হাসপাতালে চরম সরবরাহ স্বল্পতার মাঝে রয়েছে। এর আগে ২৬শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন অভিনেত্রী গিনেথ প্যাল্ট্রো তার ইন্সটাগ্রামে একটা সেলফি পোস্ট করেন, যেখানে তার মুখে ছিল সুইডিশ কোম্পানি ‘এয়ারিনাম’এর তৈরি ‘আরবান এয়ার মাস্ক’, যা কিনা এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না।

২২শে মার্চ মার্কিন সেলেব্রিটি ম্যাডোনা তার ইন্সটাগ্রামে নিজের একটা ছবি পোস্ট করেন, যেখানে তাকে গোলাপের পাপড়ি ভাসা বাথটাবে গোসল করতে দেখা যাচ্ছে! তিনি ছবির টাইটেলে লেখেন ‘কোন বৈষম্য নয়’। তিনি বলেন যে, যে যতটা ধনীই হোক না কেন, করোনাভাইরাস সকলকে এক সাড়িতে নামিয়ে আনে। তবে ম্যাডোনার এই ছবির সাথে কথাগুলি মানুষের কাছে ভালোভাবে যায়নি মোটেই। বিলিয়নায়ার ডেভিড গেফেন তার টুইটার একাউন্টে তার লাক্সারি ইয়টের ছবি পোস্ট করে বলেন যে, তিনি এই ইয়টে নিজেকে আলাদা করে রাখবেন। আর তিনি এ-ও আশা করেন যে, সকলে যেন নিরাপদ থাকে। গেফেনের এই পোস্টে জনগণ এতটাই আক্রমণাত্মক মতামত দিতে থাকে যে, তিনি তার টুইটার একাউন্টই ডিলিট করে দেন!

মার্কিন সঙ্গীতশিল্পী ফ্যারেল উইলিয়ামস এক টুইটার পোস্টে তার অনুসারীদেরকে হাসপাতালে দান করতে বলেন। এর জবাবে তার এক ভক্ত বলেন যে, উইলিয়ামস কমপক্ষে দেড়’শ মিলিয়ন ডলারের মালিক; তার উচিৎ তার নিজের অর্থ দান করা। উইলিয়ামস পরবর্তীতে জবাবে বলেন যে, তিনি নিজেও দান করেছেন। তবে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন সেলেব্রিটিদের করোনাভাইরাস প্রতিরোধে অনুদানের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন করছে। মার্কিন সেলেব্রিটি শেফ ববি ফ্লে তার রেস্তোঁরার কর্মীদের বেতন দেয়ার জন্যে জনগণের কাছে অর্থ চাইছেন। অথচ তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার। পত্রিকাটা বলছে যে, করোনাভাইরাস মানুষকে এক কাতারে নামায়নি; বরং মানুষের মাঝে বৈষম্যকে আরও বেশি ফুটিয়ে তুলেছে। সম্পদের ক্ষেত্রে বৈষম্য ছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা পাবার ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে বৈষম্য। সেলেব্রিটিরা করোনাভাইরাসের লক্ষণ না দেখিয়েও তাদের টেস্ট করিয়ে ফেলতে পাচ্ছেন। অথচ সাধারণ মানুষ কাশতে থাকলেও টেস্ট করাতে পারেনি। রিপোর্টের উপসংহারে বলা হচ্ছে যে, পশ্চিমের সেলেব্রিটি সংকৃতি এবং পুঁজিবাদ একই সূত্রে গাঁথা। উভয়েই ব্যক্তিকে সমাজের উপরে স্থান দেয়। এটা অস্বস্তিকরভাবে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, মেডিক্যাল কর্মী, সুপারমার্কেট স্টাফ, বাস ড্রাইভার, পণ্য ডেলিভারি কর্মীদের মতো কঠোর পরিশ্রমীরা যখন বিশ্বকে টিকিয়ে রাখছে, তখন ধনী ব্যক্তিরা শহর ছেড়ে দূরবর্তী অঞ্চলে পালাচ্ছে। আর এর আগে কখনো এতটা পরিষ্কারভাবে দেখা যায়নি যে, সমাজের অতিকায় ধনী ব্যক্তিরা সমাজকে কতটা কম দিচ্ছে।


Sunday, 5 April 2020

পশ্চিমা দেশগুলিতে বর্ণবাদী চিন্তাকে উস্কে দিয়েছে করোনাভাইরাস!

৫ই এপ্রিল ২০২০

     
ফ্রান্সের নঁতে শহরে গ্রাফিতি বলছে, ‘করোনাভাইরাস যত মানুষকে অসুস্থ্য করেছে, তার চাইতে বেশি মানুষকে বর্ণবাদী করেছে’



গত পহেলা এপ্রিল দু’জন ডাক্তার ফরাসী টিভিতে এসে মতামত দেন যে, নভেল করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আফ্রিকার জনগণের উপর টেস্ট করে দেখা যেতে পারে। এই মন্তব্যের পর থেকে এই ডাক্তারদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ উঠেছে। টিভি চ্যানেল ‘এলসিআই’এর সাথে সাক্ষাতে প্যারিসের কোচিন হসপিটালের আইসিইউএর প্রধান জঁ-পল মিরা বলেন যে, এইডসএর ভ্যাকসিন টেস্ট করার জন্যে যেমন পতিতাদের বেছে নেয়া হয়েছিল, তেমনি করোনাভাইরাসের প্রতিরোধক হিসেবে যক্ষ্মার প্রতিরোধক ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন টেস্ট করার জন্যে আফ্রিকার মানুষগুলিকে বেছে নেয়া যেতে পারে; কারণ পতিতাদের যেমন এইডসএর বিরুদ্ধে আলাদা কোন প্রতিরোধ নেই, তেমনি আফ্রিকার মানুষগুলিরও করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ নেই। তিনি যুক্তি দেন যে, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার মেডিক্যাল কর্মীরা যথেষ্ট সুরক্ষা নিয়ে কাজ করেন, যার ফলে এমনিতেই তাদের করোনভাইরাসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম থাকবে; তাদেরকে ভ্যাকসিন দেয়া হোক আর না হোক। ফ্রান্সের ন্যাশনাল হেলথ ইন্সটিটিউটের রিসার্চ ডিরেক্টর ক্যামিল লক্ট তার সাথে সহমত পোষণ করে বলেন যে, তারা ইতোমধ্যেই ইউরোপের সমান্তরালে আফ্রিকাতেও এই টেস্ট চালাবার চিন্তা করছেন। এই টেলিভিশন অনুষ্ঠানের পর থেকে প্রায় সাথেসাথেই শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। আইভোরি কোস্টের বিখ্যাত ফুটবলার দিদিয়ের দ্রগবা এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, এটা আশ্চর্য্য একটা ব্যাপার যে এধরণের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে বারংবার সাবধান করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, আফ্রিকা কোন টেস্টিং ল্যাবরেটরি নয়। তিনি তাদের কথাগুলিকে বর্ণবাদী কথা বলে আখ্যা দেন। দ্রগবার মতো ফ্রান্সের সোশালিস্ট পার্টি এবং বর্ণবাদ বিরোধী গ্রুপগুলিও বিবৃতি দিয়েছে।

‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আফ্রিকা এই মুহুর্তে সবচাইতে কম আক্রান্ত মহাদেশ, যেখানে সাড়ে ৭ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গিয়েছে মোট ৩’শ ২০ জন। জঁ-পল মিরা পরবর্তীতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ‘হাফিংটন পোস্ট’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা হিসেবে বলেন যে, ফ্রান্স এবং আস্ট্রেলিয়ার সাথে আফ্রিকার একটা দেশ এই গবেষণার অংশ হতে পারে, এধরনের কথা আগে কখনোই শোনা যায়নি। ‘বিবিসি’ এক সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল টেনে নিয়ে এসে বলে যে, যক্ষ্মার প্রতিরোধে ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন বা টিকা যেসব দেশে জনগণের মাঝে দেয়া হয়েছে, সেসব দেশে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা কম হয়ে থাকতে পারে। তারা বলছেন যে, যেসব দেশে যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি, সেসব দেশেই শিশুদের মাঝে ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন দেবার প্রচলন রয়েছে। এই চিন্তার উপর নির্ভর করেই কিছু গবেষক ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিনকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যবহার করা যায় কিনা, তা নিয়ে চিন্তা করছেন। তবে এই টিভি সাক্ষাতের পর থেকে ভ্যাকসিনের চাইতে পশ্চিমা সমাজের বর্ণবাদ নিয়েই কথা হচ্ছে বেশি।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হবার পর থেকে পশ্চিমা বিশ্বে বর্ণবাদী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী আচরণের খবর আবারও সংবাদপত্রে আসা শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রীটে এক সিঙ্গাপুর বংশোদ্ভূত ব্যক্তির উপর চার ব্যক্তি হামলা করে ব্যাপক মারধর করে। হামলাকারীরা বলে যে, ‘আমরা তোমার করোনাভাইরাস আমাদের দেশে চাই না’। ফেব্রুয়ারির শুরুতে নিউ ইয়র্কের সাবওয়ে স্টেশনে মাস্ক পড়া এক চীনা বংশোদ্ভূত মহিলার উপর হামলা করা হয় এবং তাকে ‘রোগের বাহক’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়ায় এক এশিয় পরিবারের গাড়ির উপর করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে গালাগালি লেখা হয়। ক্যালিফোর্নিয়াতে এক স্কুলে চীনা বংশোদ্ভূত এক ছাত্রকে কাশি দেবার কারণে শিক্ষক নার্সের কাছে যেতে বলেন, যদিও অন্যদের জন্যে তিনি তা বলেননি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৬ই মার্চ এক টুইটার বার্তায় করোনাভাইরাসকে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে আখ্যা দেবার সাথেসাথেই চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের মাঝে নতুন করে শংকা দেখা দিয়েছে। নিউ ইয়র্কের জনপ্রতিনিধি গ্রেইস মেং একজন চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিনী। তিনি ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, বিভিন্ন দেশে চীনাদের বিরুদ্ধে হয়রানি এবং আক্রমণের ঘটনার খবর শুনে মনে হয় যে, চীনা বংশোদ্ভূত জনগণকে এখনও বিদেশী বলেই আখ্যা দেয়া হয়। পত্রিকাটা বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে যুগের পর যুগ বর্ণবাদ এবং বৈষম্য পেরিয়ে এশিয় বংশোদ্ভূতরা অনেক আশা নিয়ে একুশ শতক শুরু করেছিল। তিনজন এশিয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দাঁড়িয়েছেন, যা কিনা এশিয়দের মাঝে আশার সঞ্চার করেছিল। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু পর থেকে মার্কিন শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীরা এশিয় বংশোদ্ভূতদেরকে ভাইরাসের সংক্রমণের জন্যে দায়ি করতে থাকে এবং একইসাথে এশিয়দের উপর বিপুল সংখ্যায় আক্রমণ আসতে থাকে। শতশত মানুষ হামলার কথা রিপোর্ট করলেও বহু মানুষ এব্যাপারে কোন রিপোর্টই করেনি।
   
 
বহু আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে চীনাদেরকে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের, নোংড়া এবং রুগ্ন মানুষ হিসেবে দেখা হতো। ১৮৭০ সাল থেকে চীন থেকে আসা শ্রমিকদেরকে শ্বেতাঙ্গরা তাদের চাকুরি হারাবার কারণ হিসেবে দেখতে থাকে। ১৮৮২ সালে এক আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা শ্রমিকের আসা বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর ১৯৪০এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা জাপানিদের ভাগ্যে জোটে ব্যাপক অত্যাচার। যুক্তরাষ্ট্রে বরাবরই এশিয় এবং অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ দেশ থেকে আগত জনগণকে অপেক্ষাকৃত নিম্ন স্তরের মানুষ এবং রোগের বাহক হিসেবে দেখা হয়েছে।




জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের প্রফেসর রসালিন্ড চৌ বলছেন যে, তিনি এখন জনসন্মুখে কাশি দিতেও ভয় পান। কারণ তিনি মনে করছেন যে, এশিয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় তাকে কাশি দিতে দেখে অন্যরা সেটাকে কিভাবে দেখবে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ক্লেয়ার জীন কিম বলেন যে, বহু আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে চীনাদেরকে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের, নোংড়া এবং রুগ্ন মানুষ হিসেবে দেখা হতো। ১৮৭০ সাল থেকে চীন থেকে আসা শ্রমিকদেরকে শ্বেতাঙ্গরা তাদের চাকুরি হারাবার কারণ হিসেবে দেখতে থাকে। ১৮৮২ সালে এক আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা শ্রমিকের আসা বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর ১৯৪০এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা জাপানিদের ভাগ্যে জোটে ব্যাপক অত্যাচার। যুক্তরাষ্ট্রে বরাবরই এশিয় এবং অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ দেশ থেকে আগত জনগণকে অপেক্ষাকৃত নিম্ন স্তরের মানুষ এবং রোগের বাহক হিসেবে দেখা হয়েছে। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট শহরে গাড়ির ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা কিছু লোক ভিনসেন্ট চিন নামে এক চীনা আমেরিকানকে পিটিয়ে হত্যা করে। সেসময় তারা তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্যে এশিয়দেরকে দায়ি করেছিল। এরপর ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে বাদামি বর্ণের যেকোন মানুষ দেখলেই তাকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দেয়া হতো। এখন করোনাভাইরাসের প্রভাব কবে কমবে, তা যেহেতু কেউই বলতে পারছে না, তাই এশিয়দের বিরুদ্ধে মার্কিন উগ্রবাদী শ্বেতাঙ্গদের আক্রমণাত্মক এই অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

‘দ্যা আটলান্টিক’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, পশ্চিমা সমাজে মহামারী সবসময়েই ভীতির সঞ্চার করেছে। আর এই ভীতি শেষ পর্যন্ত বৈষম্যের মাঝ দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের সংক্রমণের সময় পূর্ব এশিয়দের টার্গেট করা হয়েছিল। ২০১৪ সালে ইবোলা ভাইরাসের কারণে টার্গেট করা হয়েছিল আফ্রিকানদের। ইবোলা ভাইরাসের নাম দেয়া হয়েছে আফ্রিকার একটা নদীর নামে; যেকারণে এই ভাইরাসটা স্বাভাবিকভাবেই আফ্রিকান ভাইরাস হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০১২ সালে সংক্রমিত হওয়া ‘মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম’ বা ‘মার্স’ ভাইরাসের নামের সাথেই মধ্যপ্রাচ্যকে জুড়ে দেয়া হয়। এবারে করোনাভাইরাসকে একইভাবে অনেক মার্কিন নেতারা ‘উহান ভাইরাস’ বলে আখ্যা দিতে কার্পণ্য করেননি। ইউরোপের উগ্রবাদী ডানপন্থী নেতারা ভাইরাসের সংক্রমণকে যুক্ত করতে চাইছেন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সাথে। ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স এবং স্পেনে ডানপন্থী নেতারা ভাইরাস সংক্রমণের কারণ হিসেবে এশিয় এবং আফ্রিকান অভিবাসীদের দুষতে ভুল করেননি। ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মিরি সং ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছুতোয় বাহ্যিকভাবে আলাদা করা যায় এমন গ্রুপগুলিকে টার্গেট করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের মতো দেশে এটা বাকিদের চাইতে অনেক বেশি হয়েছে। ‘নাইন ইলেভেন’এর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা, বা আরব, মুসলিম এবং শিখদের উপর হামলা বেড়ে যায়। ব্রিটেনেও ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে জাতিগত এবং ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হামলার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।
  
  
চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্লেগের আবির্ভাব হয়, যা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বলে পরিচিত। সেসময় ইউরোপিয়রা মনে করেছিল যে, ইহুদী বণিকরা সিল্ক রুটের মাধ্যমে ইউরোপে প্লেগ এনেছিল। এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সারা ইউরোপে ইহুদীদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার চলেছিল। ১৩৪৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ গণহত্যা ছিল সবচাইতে ভয়াবহ; যখন ২ হাজার ইহুদীকে স্ট্রাসবুর্গ শহরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। মানুষকে রোগের বাহক বা তেলাপোকার সাথে তুলনা দিলে হত্যা করাটা সহজতর হয়েছে। এই কথাগুলি পশ্চিমা সমাজের গোঁড়ার সমস্যাকেই তুলে ধরে। করোনাভাইরাস এই সমস্যাকে শুধু আরেকবার সামনে নিয়ে এলো মাত্র।



ইউনিভার্সিটি অব বাথএর প্রফেসর ব্র্যাড ইভান্স ব্রিটেনের ‘দ্যা ইন্ডেপেন্ডেন্ট’এর এক লেখায় পশ্চিমা সমাজের বর্ণবাদের ইতিহাসকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্লেগের আবির্ভাব হয়, যা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বলে পরিচিত। সেসময় ইউরোপিয়রা মনে করেছিল যে, ইহুদী বণিকরা সিল্ক রুটের মাধ্যমে ইউরোপে প্লেগ এনেছিল। এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সারা ইউরোপে ইহুদীদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার চলেছিল। ১৩৪৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ গণহত্যা ছিল সবচাইতে ভয়াবহ; যখন ২ হাজার ইহুদীকে স্ট্রাসবুর্গ শহরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। ইভান্স বলছেন যে, বর্ণবাদ ও জাতিগত বিদ্বেষ পশ্চিমাদের জীবনব্যবস্থার মাঝে গেঁথেই ছিল। ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো পশ্চিমা চিন্তাগুলি এই বিদ্বেষকে নিয়ন্ত্রণ তো করেইনি, বরং লালনপালন করেছে। প্রতিটা গণহত্যার সময়ই সমাজের কিছু মানুষকে ইঁদুরের সাথে তুলনা দেয়া হয়েছে; বলা হয়েছে যে, এরা হলো রোগের বাহক। মানুষকে রোগের বাহক বা তেলাপোকার সাথে তুলনা দিলে হত্যা করাটা সহজতর হয়েছে। ইভান্সএর কথাগুলি পশ্চিমা সমাজের গোঁড়ার সমস্যাকেই তুলে ধরে। করোনাভাইরাস এই সমস্যাকে শুধু আরেকবার সামনে নিয়ে এলো মাত্র।


Friday, 3 April 2020

করোনাভাইরাস - সুইডেনে কোন লকডাউন নেই কেন?

৪ঠা এপ্রিল ২০২০
ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিতে লকডাউনের মাঝ দিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার পর লকডাউন ভাঙ্গার বহু উদাহরণ দেখা গেছে। সুইডেন সেই পথে হাঁটতেই নারাজ। সুইডেন ইউরোপের সবচাইতে বেশি লিবারাল চিন্তার রাষ্ট্র বলেই পরিচিত। ব্যক্তিস্বাধীনতার নিরাপত্তা দেয়াকে সুইডিশরা পবিত্র দায়িত্ব হিসেবেই দেখে। করোনাভাইরাস ইস্যু শুধুমাত্র দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সুইডিশরা ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সমাজের দুর্বলদের সুরক্ষা দেবার উপরে স্থান দিচ্ছে।


পশ্চিমা দেশগুলির মাঝে প্রায় সবগুলি দেশই নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ‘লকডাউন’এর পথে হাঁটলেও সুইডেন এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সুইডেনের স্কুল, রেস্তোঁরা, শপিং মল, বার, সিনেমা হল এবং স্কি রেজর্টের মতো জায়গাগুলি এখনও খোলা রয়েছে। ট্রেন-বাস চলছে সমানে। শুধুমাত্র ৫০ জনের বেশি মানুষের জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং রেস্তোঁরায় দূরত্ব বজায় রেখে বসতে বলা হয়েছে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সুইডেন এবং ডেনমার্কের মাঝে ‘ওরেসুন্ড’ সেতু পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, কেননা সেতুর দক্ষিণের ডেনমার্ক তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। তবে সুইডেন এই সেতুর উত্তর দিক খোলাই রেখেছে। সেখানে এখনও মানুষ হাত ধরাধরি করে রাস্তায় হাঁটছে। খোলা স্থানে পিকনিক এবং বারবিকিউ চলছে; স্কেটিং এবং খেলার মাঠে খেলাও চলছে বেশ। কেউই মাস্ক পড়ছে না। সুইডেনের এই নীতির পিছনে চিন্তাগুলি এখন আলোচনার বিষয় হয়ে গেছে।

৩রা এপ্রিল পর্যন্ত সুইডেনে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৬ হাজার ১’শ ৩১; এর মাঝে মৃত্যুবরণ করেছেন ৩’শ ৫৮ জন। এখন পর্যন্ত প্রতি লাখের মাঝে আক্রান্ত হয়েছে ৬১ জন। ব্রিটেনে এটা ৫৭ জন; জার্মানিতে ১০৮ জন; ফ্রান্সে ৮৮ জন; নরওয়েতে ৯৯ জন; ডেনমার্কে ৬৭ জন; ফিনল্যান্ডে ২৯ জন। অর্থাৎ সুইডেন যে করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ, তা বলা যাচ্ছে না।

‘ইউগভ’ নামের এক গবেষণা সংস্থার এক নিয়মিত গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, ২৬টা দেশের মাঝে সুইডেনের মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার ব্যাপারে সবচাইতে কম ভীতির মাঝে রয়েছে। ২৯শে মার্চের ফলাফল বলছে যে, মাত্র ৩১ শতাংশ সুইডিশ আক্রান্ত হবার ব্যাপারে খুব বেশি বা কিছুটা ভীত। এর বিপরীতে এই সংখ্যাটা ইতালিতে ৭২ শতাংশ, ফ্রান্সে ৭০ শতাংশ, ব্রিটেনে ৬১ শতাংশ, স্পেনে ৫০ শতাংশ, জার্মানিতে ৪৯ শতাংশ, নরওয়েতে ৪৮ শতাংশ, ডেনমার্কে ৪২ শতাংশ এবং ফিনল্যান্ডে ৩৯ শতাংশ। এশিয়ার দেশগুলিতে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। তবে সুইডেনের মানুষ নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করলেও পরিসংখ্যান বলছে অন্যরকম।

‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, মানুষ সম্ভবতঃ একেকটা দেশের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রকাশ করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা হচ্ছে যে, মালয়েশিয়ায় ৪৫ জন করোনাভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেছে; আর ভিয়েতনামে একজনও মারা যায়নি। অথচ দুই দেশই ভাইরাস প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলস্বরূপ, মালয়েশিয়াতে ৯০ শতাংশ জনগণ সংক্রমণের ভয়ে রয়েছে; ভিয়েতনামে এই সংখ্যা ৮৯ শতাংশ। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, সুইডেনের রাস্তার পরিস্থিতি দেখে দেশের মানুষের মাঝে কোন ভীতি না আসাটাই স্বাভাবিক। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্তেফান লোফুয়েন সুইডিশদেরকে ‘প্রাপ্তবয়স্ক’দের মতো আচরণ করতে বলেন এবং ‘উদ্বেগ বা গুজব’ ছড়াতে মানা করেন। সুইডেনের প্রধান রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ এন্ডার্স তেগনেল বলছেন যে, লকডাউন করলে পুরো ব্যবস্থাটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। মাসের পর মাস লকডাউন অসম্ভব। বরং কিছুদিন পরপর কঠোর সিদ্ধান্তে যেতে হবে; আর সেটা চালাতে হবে যতটা সম্ভব স্বল্প সময়ের জন্যে। তেগনেলের কথাগুলিই সুইডিশরা মেনে নিয়েছে। সুইডেনে গত ৩’শ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের উপর দেশের মানুষের অগাধ বিশ্বাস জন্মেছে; যেকারণে বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন, জনগণ তা-ই মেনে চলছে।

‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সুইডেনের এই নীতির ফলে দেশটার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকে নিম্নস্তরের মানুষগুলি মৃত্যুঝুঁকির মাঝে পড়ে যাচ্ছে। এদের মাঝে অনেকেই মনে করছেন যে, সুইডিশ সরকার এই মানুষগুলিকে করোনাভাইরাসের ফ্রন্টলাইনে ছেড়ে দিয়েছে। সুইডেনের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন না যে, শিশুরা এই রোগের শক্তিশালী বাহক। তাই সুইডেনের অনেক স্কুল এখনও খোলা রয়েছে। নোবেল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কার্ল হেনরিক হেলডিন-সহ সুইডেনের দুই হাজার মেডিক্যাল প্রফেশনালের স্বাক্ষরসহ এক চিঠিতে সুইডেনের এহেন নীতির সমালোচনা করে বলা হয় যে, এই নীতি সুইডেনকে মারাত্মক দুর্যোগের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তবে এই নীতির পক্ষেও রয়েছেন অনেকে। সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর পিটার নিলসন বলছেন যে, বাকি বিশ্বে রাজনীতিবিদেরা লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিলেও সুইডেনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীও সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞদের মতামতের উপর। তারা বলছেন যে, অনির্দিষ্টকালের জন্যে লকডাউন চালিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আর এই মহামারী আবারও ফিরে আসবে না, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনা। অতীতের বিভিন্ন রোগের সংক্রমণের ইতিহাস বলছে যে, সকলেরই উচিৎ মহামারীর দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বারের মতো সংক্রমণকে এড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।

সুইডেনের ‘কারোলিন্সকা ইন্সটিটিউট’এর গবেষক সেসিলিয়া সোডারবার্গ নাউক্লের বলছেন যে, সরকার মনে করছে যে, এই মহামারিকে তারা রুখতে পারবে না; সুতরাং তারা মানুষকে মরতে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর মানুষ অন্ধভাবে সরকারের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছে। তিনি মনে করছেন যে, কিছুদিনের মাঝেই স্টকহোমে ইতালির মতো আইসিইউএর ভয়ঙ্কর অপ্রতুলতা দেখা দেবে। আর তখন কিছুই করার থাকবে না। নাউক্লেরের সমালোচনাগুলি অমূলক নয়; কারণ অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকে সুইডেনের নিম্নস্তরের মানুষগুলিই থাকবে মৃত্যুঝুঁকিতে। সুইডেনের জনগণের রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করার আরেকটা কারণ রয়েছে; তারা সুইডেনের স্বাধীনচেতা আদর্শকে তুলে ধরে রাখতে অনড় রয়েছেন। নিজ উদ্যোগে সুইডেনের স্পোর্টস ক্লাবগুলি তাদের যুব কর্মকান্ডগুলি থামিয়ে দিলে দেশটার পাবলিক হেলথ এজেন্সির ডিরেক্টর জেনারেল ইহোহান কার্লসন ক্লাবগুলিকে এই কর্মকান্ড পুনরায় শুরু করার জন্যে আহ্বান জানান। ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিতে লকডাউনের মাঝ দিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার পর লকডাউন ভাঙ্গার বহু উদাহরণ দেখা গেছে। সুইডেন সেই পথে হাঁটতেই নারাজ। সুইডেন ইউরোপের সবচাইতে বেশি লিবারাল চিন্তার রাষ্ট্র বলেই পরিচিত। ব্যক্তিস্বাধীনতার নিরাপত্তা দেয়াকে সুইডিশরা পবিত্র দায়িত্ব হিসেবেই দেখে। করোনাভাইরাস ইস্যু শুধুমাত্র দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সুইডিশরা ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সমাজের দুর্বলদের সুরক্ষা দেবার উপরে স্থান দিচ্ছে।

Sunday, 29 March 2020

করোনাভাইরাস পশ্চিমা সমাজের বৈষম্যকে কমাবে নাকি বাড়াবে?

২৯শে মার্চ ২০২০

   
করোনা ঝড়ের আগেই পশ্চিমা সমাজব্যবস্থা নিম্নবিত্তদের উপেক্ষা করেছিল; এখন সেই বৈষম্যের ফলাফলই চোখে পড়ছে।

 
ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, ব্রিটেনের অর্থনৈতিকভাবে সর্বনিম্ন স্তরের মানুষের গড় আয়ুষ্কাল সর্বোচ্চ স্তরের মানুষের গড় আয়ুষ্কাল হতে ৯ বছর কম! ব্রিটেনের উচ্চবিত্ত এলাকাগুলি থেকে যাত্রা করে নিম্নবিত্ত এলাকার দিকে যেতে থাকলেই গড় আয়ুষ্কাল এক বছর করে কমতে থাকে। খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে হৃদরোগে মৃত্যুর হার উচ্চবিত্তদের চাইতে তিনগুণ বেশি। ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট এবং বক্ষব্যাধিও নিম্নবিত্তদের মাঝে অনেক বেশি। পেনসনে থাকা ১৯ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে। করোনাভাইরাস এখন এই বৈষম্যের বাস্তবতার সাথে সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হতে যাচ্ছে। উবার ড্রাইভার, ডেলিভারি সার্ভিসে থাকা মানুষগুলি, বিভিন্ন কারখানার কর্মী, পরিচ্ছন্নকর্মীদের মতো কম আয়ের মানুষগুলি একাধারে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের ঝুঁকিতে যেমন পড়ছে, তেমনি অর্থনৈতিক দিক থেকেও দুর্যোগের মাঝে পতিত হতে যাচ্ছে।

‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্রে কিছু মানুষ ব্যাপক মুনাফা করে নিজেদের পকেট ভরেছে; অন্যদিকে নিজেদের অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলিকে জনগণের কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছে। ব্যাঙ্কগুলিকে জনগণের করের অর্থে বাঁচানো হয়েছে; যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে ব্যাঙ্কগুলি ক্ষতি থেকে তো বের হয়েছেই; তাদের মুনাফা হয়েছে আকাশচুম্বী। অথচ পুরো সমস্যার কেন্দ্রেই ছিল ব্যাঙ্কগুলির দায়িত্বজ্ঞানহীন ঋণ ব্যবসা এবং জনগণের লগ্নীকৃত অর্থকে ব্যবহার করে জুয়া খেলা। অন্যদিকে বেশিরভাগ খেটে খাওয়া করপ্রদানকারী নাগরিকের জীবনে বিন্দুমাত্র উন্নতি আসেনি। অনেকেরই বাড়িঘর কেড়ে নেয়া হয়েছে। কম বেতনভোগী মানুষের অবস্থা সবচাইতে খারাপ হয়েছিল। এবারেও মানুষের অবস্থা খারাপের দিকে চলেছে; তবে এর গতি অনেক বেশি দ্রুত। ‘গোল্ডমান সাক্স’এর হিসেবে এপ্রিল থেকে জুনের মাঝে মার্কিন অর্থনীতি ২৪ শতাংশ কমতে পারে। আর ‘মরগ্যান স্ট্যানলি’ বলছে যে, এটা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

মার্কিন সরকারের অর্থনৈতিক সহায়তা প্যাকেজে ভাগ বসাবার জন্যে বিভিন্ন কারখানার মালিক গ্রুপ, বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘বোয়িং’, এয়ারলাইন্স, রেস্টুর‍্যান্ট, হোটেল চেইন, ট্রাভেল অপারেটর, কয়লা খনির মালিক, মদ উৎপাদক কোম্পানি, ইত্যাদি বাণিজ্য গ্রুপগুলি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার এবং শীর্ষ এক্সিকিউটিভরাই বরাবর সুবিধা পেয়েছে; উৎপাদন বৃদ্ধি বা গবেষণালব্ধ কাজে বিনিয়োগ হয়নি। এছাড়াও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে ২ কোটি মানুষ চিকিৎসা ভাতা পায় না। লক্ষ লক্ষ নাগরিকের জন্যে চিকিৎসা সেবা সুলভ নয়। ‘মায়ামি হেরাল্ড’এর ফেব্রুয়ারি মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীন ফেরত এক আমেরিকান ফ্লুএর লক্ষণ দেখা যাবার পর একজন দায়িত্ববান নাগরিকের মতো ফ্লোরিডার হাসপাতালে যান করোনাভাইরাসের টেস্ট করাতে। টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ আসলেও কয়েক সপ্তাহ পর তার কাছে ৩ হাজার ২’শ ৭০ ডলারের একটা মেডিক্যাল বিল চলে আসে। তার ইন্সুর‍্যান্স কোম্পানি বলছে যে, তিনি সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪’শ ডলার ইন্সুর‍্যান্স বাবদ পেতে পারেন; বাকিটা তার নিজের পকেট থেকেই দিতে হবে। তবে এখানে উল্লেখ্য যে, তার হেলথ ইন্সুর‍্যান্স রয়েছে; অনেকের আবার সেটাও নেই। ‘ইউনাইটেড স্টেটস সেনসাস ব্যুরো’র ২০১৮ সালের হিসেবে ২ কোটি ৭৫ লক্ষ মানুষ, বা যুক্তরাষ্ট্রের সাড়ে ৮ শতাংশ জনগণের হেলথ ইন্সুর‍্যান্সই নেই। এটা ২০১৭ সালে ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বা ২ কোটি ৫৬ লক্ষ; অর্থাৎ এক বছরের মাঝেই ১৯ লক্ষ মানুষ হেলথ ইন্সুর‍্যান্স থেকে ঝরে পড়েছে। এর পুরোটাই হয়েছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের আগেই। ‘লস এঞ্জেলেস টাইমস’এর এক সম্পাদকীয়তে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে ইন্সুর‍্যান্সএর মাঝে থাকা ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় কম ইন্সুর‍্যান্স পেয়ে থাকে। মেডিক্যাল খরচার অনেকটাই তাদের নিজ পকেট থেকে দিতে হয়।

উপরন্তু, মার্কিন সেক্রেটারি অব হেলথ এন্ড হিউম্যান সার্ভিসেস এলেক্স আজার বলছেন যে, করোনাভাইরাসের কোন ভ্যাকসিন বের হলেও সেটার সুবিধা সকলে পাবে, এই নিশ্চয়তা তিনি দিতে পারছেন না। মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘গ্যালাপ’এর ২০১৯ সালের এক জরিপে বলা হচ্ছে যে, জরিপে অংশ নেয়া জনগণের ১৩ শতাংশ বলছেন যে, গত ৫ বছরের মাঝে তাদের পরিচিত কেউ না কেউ অর্থের অভাবে চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুবরণ করেছেন। এর মাঝে শ্বেতাঙ্গ মানুষের মাঝে এই হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ; আর অশ্বেতাঙ্গদের মাঝে তা ছিল ২০ শতাংশের বেশি; অর্থাৎ দ্বিগুণ! বার্ষিক ১ লক্ষ ডলারের বেশি আয়ের মানুষের মাঝে এই হার ছিল ৯ শতাংশ; আর ৪০ হাজার ডলারের কম আয়ের মানুষের মাঝে ছিল সাড়ে ১৮ শতাংশ; অর্থাৎ দ্বিগুণ!

‘ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ফেইসবুক, গুগল ও টুইটারএর মতো কোম্পানিগুলি নিজেদের কর্মচারীদেরকে বাড়ি থেকে কাজ করতে বলেছে। কিন্তু হোটেল ও রেস্টুর‍্যান্টে ওয়েটারের কাজ বা সুপারস্টোরে সেলসম্যানের কাজ বা বাড়িতে পণ্য পৌঁছে দেয়ার কাজ তো আর বাড়িতে বসে করা যাবে না। কলেজ পাস উচ্চশিক্ষিত মানুষের অনেকেই বাড়ি থেকে কম্পিউটারে কাজ করতে পারছে; অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত মানুষের অনেকেই কাজের অভাবে বাড়িতে বসে দিন কাটাচ্ছে। সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা মানুষগুলির অনেকের জন্যেই মানুষের সংস্পর্শে আসাটা বাঞ্ছনীয়। আর করোনাভাইরাসের কারণে এই মানুষগুলি রোগের শিকারও হচ্ছে বেশি; আবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে এরাই উপার্জন ছাড়া বাড়িতে বসে থাকছে। শুধু তা-ই নয়, ‘দ্যা আটলান্টিক’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, কম আয়ের জনগণ বাস করছে গাদাগাদি করে; যার ফলে তাদের মাঝে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হবার সম্ভাবনা বেশি থাকছে।

করোনাভাইরাস পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকে সরাসরি আঘাত করেছে। এর ফলশ্রুতিতে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে নিম্ন আয়ের মানুষগুলি, যাদের হেলথ ইন্সুর‍্যান্স নেই বা থাকলেও তা অপ্রতুল। উচ্চবিত্ত এবং উচ্চশিক্ষিত জনগণের মাঝে অনেকেই বাড়িতে থেকে কাজ করে নিজেকে বাঁচাতে পারলেও নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলি আশাহীন হয়ে পড়েছে। তাদেরকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বড় বড় কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার এবং এক্সিকিউটিভদের সাথে। করোনা ঝড়ের আগেই পশ্চিমা সমাজব্যবস্থা নিম্নবিত্তদের উপেক্ষা করেছিল; এখন সেই বৈষম্যের ফলাফলই চোখে পড়ছে।


Sunday, 22 March 2020

সারাবিশ্ব আজ যুদ্ধাবস্থায়; বাংলাদেশ কি করবে?

২৩শে মার্চ ২০২০


ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্রিটেনকে যুদ্ধাবস্থায় নিয়ে যাবার ঘোষণা দেন। ব্রিটিশ ইঞ্জিন ম্যানুফ্যাকচারার ‘রোলস রয়েস’ এবং কন্সট্রাকশন যন্ত্রপাতির ম্যানুফ্যাকচারার ‘জেসিবি’কে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যায় থাকা রুগীদের জন্যে ‘ভেন্টিলেটর’ যন্ত্র বানাবার অনুরোধ করেন তিনি।


পশ্চিমা বিশ্বে যুদ্ধাবস্থা

১৪ই মার্চ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্রিটেনকে যুদ্ধাবস্থায় নিয়ে যাবার ঘোষণা দেন। তিনি ব্রিটিশ ইঞ্জিন ম্যানুফ্যাকচারার ‘রোলস রয়েস’ এবং কন্সট্রাকশন যন্ত্রপাতির ম্যানুফ্যাকচারার ‘জেসিবি’কে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যায় থাকা রুগীদের জন্যে ‘ভেন্টিলেটর’ যন্ত্র বানাবার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন যে, তাদের পিতামহরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সমস্ত জাতীয় সম্পদকে যুদ্ধের পিছনে নিয়োজিত করেছিল। আজকে তাদের জেনারেশন করোনাভাইরাসের মতো অন্য ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। [১] ‘রোলস রয়েস’এর এক মুখপাত্রকে এধরনের কাজ করা সম্ভব কিনা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, সরকার নিজেদের পরিকল্পনা করলে তারা নিজেদের সাধ্যমতো সরকার এবং দেশকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। [৩] ২২শে মার্চ মার্কিন ‘ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিসট্রেশন’ বা ‘এফডিএ’ ঘোষণা দেয় যে, তারা ‘ভেন্টিলেটর’ যন্ত্র তৈরি করার জন্যে মার্কিন সরকারের যেসকল বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা শিথিল করতে যাচ্ছে, যাতে করে নতুন কিছু কোম্পানি ‘ভেন্টিলেটর’ তৈরি করার জন্যে এগিয়ে আসতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, মার্কিন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্ড’, ‘জেনারেল মোটরস’ এবং ‘টেসলা’কে ‘ভেন্টিলেটর’ এবং অন্যান্য মেটাল প্রডাক্ট অতি দ্রুত বানানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে। দেখা যাক গাড়ি নির্মাতারা কতটুকু সক্ষম! ‘আমেরিকান হসপিটাল এসোসিয়েশন’এর হিসেবে করোনাভাইরাসের কারণে ৯ লক্ষ ৬০ হাজার মার্কিন নাগরিককে ‘ভেন্টিলেটর’ দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা করতে হতে পারে। [২] ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নিজেদেরকে যুদ্ধাবস্থায় উপনীত করেছে। এর অর্থ হলো, তারা নিজেদের জাতীয় সম্পদের সবকিছু বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিয়োজিত করেছে। এক্ষেত্রে তারা শুধু বিপদ অনুধাবনই করেনি; এমতাবস্থায় কি করতে হবে, সেটা দ্রুত নির্ধারণ করেছে। পশ্চিমা আদর্শিক রাষ্ট্রগুলির আদর্শ সাম্প্রতিক সময়ে যতটাই দুর্বল হোক না কেন, কঠিন সময়ে তাদের কর্মদক্ষতাকে ব্যবহার করতে পারার মতো কাজগুলি বলে দেয় যে, তারা এখনও আদর্শিক শক্তি।

মার্কিন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘জেনারেল মোটরস’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কামান এবং ট্যাঙ্ক তৈরি করেছিল। আর আজকে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তারা চীনের ‘সাইক মোটরস’এর সাথে যৌথভাবে চীনের লিউঝৌ শহরে সার্জিক্যাল মাস্ক তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে। শুধু তাই নয়, একসময় যেসকল কারখানা আইফোন, কসমেটিকস বা কেমিক্যাল তৈরি করতো, তারা এখন সার্জিক্যাল মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং মেডিক্যাল সাপ্লাই তৈরি করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। [৩] ১৫ই মার্চ ফ্রান্সের লাক্সারি গুডস ম্যানুফ্যাকচারার ‘এলভিএমএইচ’, যারা ‘লুই ভুইতঁ’, ‘ক্রিশ্চিয়ান দিয়র’ ও ‘গিভেঞ্চি’র মতো ব্র্যান্ডগুলির মালিক, তারা ঘোষণা দেয় যে, পারফিউম এবং কসমেটিক্স তৈরির কারখানাগুলি এখন থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করবে। ‘এলভিএমএইচ’ তাদের এক বার্তায় বলে যে, যত বেশি সম্ভব মানুষকে সুরক্ষা দিতেই চেষ্টা করছে তারা। কোম্পানির মুখপাত্র ‘ফরচুন’ ম্যাগাজিনের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ‘হাইড্রো এলকোহলিক জেল’ তৈরির জন্যে সকল সক্ষমতাই তাদের রয়েছে এবং তারা প্রথম সপ্তাহেই ১২ টন তৈরি করার চিন্তা করছে এবং ১৬ই মার্চ থেকেই তারা উৎপাদনে নেমে গিয়েছে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘এলভিএমএইচ’ তাদের হ্যান্ড স্যানিটাইজার ফরাসী কর্তৃপক্ষকে দিচ্ছে, যারা বিভিন্ন হাসপাতালে এগুলি দেবার ব্যবস্থা নিচ্ছেন। [৩] মদ তৈরির কোম্পানিগুলিও নেমেছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরিতে; কারণ এলকোহল উৎপাদন করার কারণে তাদের জন্যে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করাটা বেশ সহজ। [৬]

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘জনতার যুদ্ধ’এর ডাক দেন। এই ডাকে সাড়া দিয়ে আড়াই হাজার চীনা কোম্পানি মাস্ক তৈরিতে নেমেছে! ‘এপল’এর ডিভাইসের ম্যানুফ্যাকচারার ‘ফক্সকন’ ফেব্রুয়ারির শুরুতে ঘোষণা দেয় যে, নতুন চালু করা ‘আইফোন’ কারখানায় তারা মাস্ক তৈরি করবে। বর্তমানে চীনে মাস্ক তৈরি করা আড়াই হাজার কোম্পানির মাঝে ৭’শ রয়েছে টেকনলজি কোম্পানি, যার মাঝে রয়েছে ‘ফক্সকন’, ‘শাওমি’ এবং ‘অপ্পো’।

 

চীনে যুদ্ধাবস্থা

তবে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চীন প্রথম যুদ্ধাবস্থা ঘোষণা করেছিল। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘জনতার যুদ্ধ’এর ডাক দেন। এই ডাকে সাড়া দিয়ে আড়াই হাজার চীনা কোম্পানি মাস্ক তৈরিতে নেমেছে! ‘এপল’এর ডিভাইসের ম্যানুফ্যাকচারার ‘ফক্সকন’ ফেব্রুয়ারির শুরুতে ঘোষণা দেয় যে, নতুন চালু করা ‘আইফোন’ কারখানায় তারা মাস্ক তৈরি করবে। চীনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘সিনোপেক’ তাদের একটা কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিকে ফেস মাস্ক এবং অন্যান্য মেডিক্যাল সাপ্লাইয়ের কাঁচামাল তৈরির জন্যে প্রস্তুত করে ফেলে। [৩] তারা জানুয়ারিতে পলিপ্রোপাইলিন বা পিপি এবং পলিভিনাইল ক্লোরাইড বা পিভিসির দু’টা প্ল্যান্ট তৈরি করে। মার্চের শুরুতে তারা বেইজিংএ দৈনিক ৪ টন ক্ষমতার ‘মেল্ট ব্লোউন নন উভেন ফ্যাব্রিক’ তৈরির দু’টা প্রোডাকশন লাইন প্রস্তুত করে, যা দিয়ে প্রতিদিন ১২ লক্ষ ‘এন ৯৫’ ‘রেসপিরেটর’ মাস্ক বা ৬০ লক্ষ সার্জিক্যাল মাস্ক তৈরি করা যাবে। [৫] আর ১৩ই মার্চ চীনা ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরির কোম্পানি ‘বিওয়াইডি’ ঘোষণা দেয় যে, তারা এখন দৈনিক ৫০ লক্ষ মাস্ক এবং ৩ লক্ষ বোতল জীবাণুনাশক তৈরি করছে। তারা তাদের এই উৎপাদনযজ্ঞ শুরু করে ৮ই ফেব্রুয়ারি থেকে। তারা এই উৎপাদনের জন্যে এমন কিছু কাজ দুই সপ্তাহের মাঝেই করে ফেলে, যা কিনা সাধারণভাবে দুই মাস লাগার কথা। তারা এক সপ্তাহের মাঝেই মাস্ক তৈরির যন্ত্র এবং প্রসেস ডেভেলপ করে ফেলে। একইসাথে তারা মেডিক্যাল গ্রেডের হ্যান্ড স্যানিটাইজার ডেভেলপ করে ফেলে ৬ দিনের মাঝে; যা তারা উহানের হাসপাতালগুলিকে ৮ দিনের মাথায় সরবরাহ করে! শুধু তাই নয়, তারা প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ১০টা মাস্ক তৈরির যন্ত্র তৈরি করতে থাকে! এর ফলে প্রতিদিন তাদের উৎপাদনক্ষমতা ৩ থেকে ৫ লক্ষ ইউনিট বাড়তে থাকে! ফেব্রুয়ারির শুরুতে পুরো চীনের মাস্ক তৈরির ক্ষমতার চার ভাগের একভাগ ছিল ‘বিওয়াইডি’এর। [৪]

করোনাভাইসের সংক্রমণ শুরু হবার আগে চীনের মাস্ক তৈরির সক্ষমতা ছিল দৈনিক ২ কোটি পিস। ২৯শে ফেব্রুয়ারি নাগাদ তা ১১ কোটি ৬০ লক্ষে পৌঁছায়। এই কোটি মাস্কের মাঝেই একটা গল্প বলছে ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। গুয়াংঝুতে অবস্থিত লিউ ফ্যামিলির কারখানায় গত ১০ বছর ধরেই তৈরি হচ্ছিল ডায়াপার এবং বেবি প্রডাক্ট। ফুজিয়ান প্রদেশে তাদের কারখানায় ১’শ লোক কাজ করতো; যেখানে তারা প্রতিদিন ২ লক্ষ মাস্ক তৈরি করা শুরু করে। যদিও সিদ্ধান্তটা বাণিজ্যিকই ছিল; তথাপি সরকার বিভিন্ন সাবসিডি, ট্যাক্স বেনেফিট, ইন্টারেস্ট ফ্রি লোন, ইত্যাদি সহায়তা দেয়ায় কাজ সহজ হয়ে যায়। অস্ট্রিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি ‘আনদ্রিতস’এর ‘ওয়েট ওয়াইপস’ তৈরির যন্ত্রের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। তাদের চীন অফিসের প্রেসিডেন্ট থমাস স্মিটসএর মতে, চীনের সবচাইতে বড় ব্যাপার হলো গতি। যখন কারুর দৌড়াবার প্রয়োজন হয়, তখন সে জানে যে কি করে দৌড়াতে হয়! [৫] চীনা ‘জে ২০’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান তৈরির প্রতিষ্ঠান ‘চেংডু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপ’ তাদের কারখানার কিছু অংশকে মাস্ক তৈরি প্রোডাকশন লাইন ডিজাইনে কাজে লাগায়। ‘দ্যা সিচুয়ান ডেইলি’ বলছে যে, কোম্পানির ২’শ ৫৮ জন ইঞ্জিনিয়ার মাত্র ৩ দিনের মাঝে একটা এসেম্বলি লাইন ডেভেলপ করে ফেলে, যা তৈরির জন্যে ১২’শ কম্পোনেন্ট দরকার ছিল। [৫] বর্তমানে চীনে মাস্ক তৈরি করা আড়াই হাজার কোম্পানির মাঝে ৭’শ রয়েছে টেকনলজি কোম্পানি, যার মাঝে রয়েছে ‘ফক্সকন’, ‘শাওমি’ এবং ‘অপ্পো’। ইতালি সরকার বলে যে, তারা চীনের কাছ থেকে ১ হাজার ‘ভেন্টিলেটর’, ২০ লক্ষ মাস্ক, ১ লক্ষ ‘রেস্পিরেটর’, ২ লক্ষ প্রোটেকটিভ স্যুট এবং ৫০ হাজার করোনাভাইরাস টেস্টিং কিট আমদানি করছে। [৫]


বাংলাদেশ এতকাল কতটা উন্নয়ন করেছে, তার পরীক্ষা হবে আজ! বাংলাদেশের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সক্ষমতা যদি এই রোগের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা না যায়, তাহলে গত দুই দশকের সকল অর্থনৈতিক অগ্রগতি মুহুর্তের মাঝে ধূলায় মিশে যাবে! বাংলাদেশ গার্মেন্টস শিল্পে দুনিয়ায় এতটা এগিয়ে থাকার পরেও ‘পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট’ বা ‘পিপিই’ তৈরি করতে পারবে না, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। মাল্টিবিলিয়ন ডলারের এই ইন্ডাস্ট্রি দুর্যোগের সময় অথর্ব হয়ে বসে থাকবে, এটা মেনে নেয়া যায়না।



বাংলাদেশের জন্যে করণীয়

বাকি বিশ্বের যুদ্ধাবস্থার উদাহরণ যদি এখনই বাংলাদেশের জন্যে উদাহরণ হিসেবে না আসে, তাহলে অতি শীঘ্রই দেশ মহাবিপদের মাঝে পতিত হতে পারে। সকলকিছুর জন্যেই চীনের সরণাপন্ন হওয়াটা সকল দেশের জন্যেই জাতীয় নিরাপত্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সেটা প্রকাশ পায় উহানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাঝ দিয়ে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারছে যে, এই মুহুর্তে জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে তাদের কি করতে হবে। ইতালি অসহায়ের মতো চীনের দিকেই তাকিয়েছে। এই ভাইরাস মোকাবিলায় ইতালি কতটা অপ্রস্তুত ছিল, তা বোঝাই যাচ্ছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের জন্যে করণীয় কাজগুলি সহজেই অনুমেয়। যুদ্ধাবস্থায় যা যা করা দরকার তাই করতে হবে। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা শুধু ‘যুদ্ধাবস্থা’ উচ্চারণ করেই থেমে যাবেন, তা হতে পারে না। বাকি বিশ্বের অবস্থা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই ভাইরাস কি করতে সক্ষম। এর থেকে শিক্ষা না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

এই রোগের প্রথম দিক হলো এটা ভীষণ ছোঁয়াচে। কোয়ার‍্যান্টাইন হলো ছোঁয়াচে রোগের বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিরোধ। কিন্তু সেই ব্যাপারটা মানা হয়নি একেবারেই। আক্রান্ত দেশগুলি থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছে বাংলাদেশে। আক্রান্ত এলাকা ত্যাগ করে অন্য এলাকায় রোগ ছড়িয়ে দেয়া ইসলাম বহির্ভূত কাজ। রাসূল (সাঃ) বলেন,

“প্লেগ শাস্তির প্রতিক। মহীয়ান গরীয়ান আল্লাহ তায়ালা তা দ্বারা তাঁর বান্দাদের কতিপয় ব্যক্তিকে পরীক্ষায় ফেলেছেন। তাই কোনো অঞ্চলে এর প্রভাবের খবর পেলে, তোমরা সেথায় যেয়ো না এবং কোনো অঞ্চলে অবস্থানকালে সেখানে প্লেগ লক্ষ্য করলে সেখান থেকে পালিয়ে যাবে না”। মুসলিম ৫৬৬৬-(৯৩/…)

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সাঃ)-কে প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, উত্তরে তিনি বলেনঃ “এটি এক ধরনের আযাব। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের প্রতি ইচ্ছা করেন, তাঁদের উপর তা প্রেরন করেন। আর আল্লাহ তায়ালা তাঁর মু’মিন বান্দাগনের উপর তা রহমত করে দিয়েছেন। অতএব কোনো ব্যক্তি যখন প্লেগ রোগে আক্রান্ত যায়গায় সাওয়াবের আশায় ধৈর্যধারন করে অবস্থান করে এবং অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহ তাকদীরে যা লিখে রেখেছেন তা-ই হবে, এছাড়া আর কোনো বিপদ তার উপর আসবে না, তাহলে সে একজন শহীদের সমান সাওয়াব পাবে’” বুখারী ৩৪৭৪, ৫৭৩৪, ৬৬১৯।


দেশের মাঝে যে এলাকায় এই রোগ দেখা দেবে, সেই এলাকাটাকে কোয়ার‍্যান্টাইন করা যেতে পারে। তবে এই কাজ করতে রাষ্ট্রের সকল শক্তি নিয়োগ করতে হবে। পুলিশ এবং আধা সামরিক বাহিনীকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় মোতায়েন করে এই কোয়ার‍্যান্টাইন কার্যকর করা যেতে পারে। কোয়ার‍্যান্টাইনের সময় ঐ এলাকায় খাদ্যদ্রব্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দরকারি রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিতে হবে। এই কাজে যারা নিয়োজিত থাকবে, তাদেরকে দরকারমতো ‘পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট’ বা ‘পিপিই’, জীবাণুনাশক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, ইত্যাদি দিতে হবে।


দ্বিতীয়তঃ এই রোগের এখনও নিশ্চিত কোন চিকিৎসা নেই। কাজেই আপাততঃ কোয়ার‍্যান্টাইন করা ছাড়া কোন প্রতিরোধই নেই এর বিরুদ্ধে। যেহেতু আক্রান্ত দেশগুলি থেকে ইতোমধ্যেই লাখো মানুষ ডেকে নিয়ে আসার মতো মারাত্মক ভুল হয়েই গেছে, তাই সেব্যাপারে এখন কথা বলার কিছু নেই। তবে দেশের মাঝে যে এলাকায় এই রোগ দেখা দেবে, সেই এলাকাটাকে কোয়ার‍্যান্টাইন করা যেতে পারে। তবে এই কাজ করতে রাষ্ট্রের সকল শক্তি নিয়োগ করতে হবে। পুলিশ এবং আধা সামরিক বাহিনীকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় মোতায়েন করে এই কোয়ার‍্যান্টাইন কার্যকর করা যেতে পারে। কোয়ার‍্যান্টাইনের সময় ঐ এলাকায় খাদ্যদ্রব্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দরকারি রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিতে হবে। এই কাজে যারা নিয়োজিত থাকবে, তাদেরকে দরকারমতো ‘পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট’ বা ‘পিপিই’, জীবাণুনাশক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, ইত্যাদি দিতে হবে।

এখন পর্যন্ত নিশ্চিত প্রতিষেধক নেই বলে রুগীকে সুস্থ্য হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেবা দিয়ে যেতে হবে। বাকি বিশ্বের হিসেব দেখলে বোঝা যাবে যে, এই রোগে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষই সুস্থ্য হয়ে ওঠে। আগে থেকে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম না হলে সে নিশ্চিতভাবেই সুস্থ্য হয়ে যায়। কাজেই একজন মানুষ আক্রান্ত হলে তার কোয়ার‍্যান্টাইন ‘মিলিটারি প্রিসিশন’এর মাধ্যমে করতে হবে, যাতে অন্য কারুর মাঝে না ছড়ায়; বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের সংস্পর্শে যাতে কিছুতেই না আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে। পশ্চিমা মূল্যবোধের মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না। ব্যক্তিস্বাধীনতা ইতালি এবং বাকি ইউরোপের জন্যে কি বয়ে এনেছে, তা এখন সকলেরই জানা। এসময় কোন প্রকারের দুর্বলতা সারা জাতির জন্যে মহাদুর্যোগ বয়ে আনতে পারে।

তৃতীয়তঃ যেহেতু এই রোগ শ্বাসপ্রশ্বাস, হাঁচি কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, তাই এই রোগ প্রতিরোধে ফ্রন্টলাইনে থাকবে ‘পিপিই’, জীবাণুনাশক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, ইত্যাদি। পশ্চিমা বিশ্ব এবং চীন যেভাবে যুদ্ধাবস্থায় উপনীত হয়েছে, বাংলাদেশকেও সেটাই করতে হবে। যদি সেটা না-ই করা সম্ভব হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধুর ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল... তোমাদের যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো” কথাগুলি মূল্যহীন হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ এতকাল কতটা উন্নয়ন করেছে, তার পরীক্ষা হবে আজ! বাংলাদেশের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সক্ষমতা যদি এই রোগের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা না যায়, তাহলে গত দুই দশকের সকল অর্থনৈতিক অগ্রগতি মুহুর্তের মাঝে ধূলায় মিশে যাবে! বাংলাদেশ গার্মেন্টস শিল্পে দুনিয়ায় এতটা এগিয়ে থাকার পরেও ‘পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট’ বা ‘পিপিই’ তৈরি করতে পারবে না, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। মাল্টিবিলিয়ন ডলারের এই ইন্ডাস্ট্রি দুর্যোগের সময় অথর্ব হয়ে বসে থাকবে, এটা মেনে নেয়া যায়না।

জীবাণুনাশক এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার এমন কোন জিনিস নয় যে এটা তৈরি করা যাবে না।জীবাণুনাশক হিসেবে ব্লিচিং পাউডার বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। একটা বড় এলাকা জীবাণুমুক্ত করতে হলে ব্যাপক পরিমাণে ব্লিচিং পাউডারের দরকার হবে। বাংলাদেশে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড বা কস্টিক সোডা ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট আছে বেশ কয়েকটা। ‘ক্লোর এলকালি প্ল্যান্ট’ বলে পরিচিত এই কারখানাগুলি ক্যালসিয়াম হাইপোক্লোরাইট বা ব্লিচিং পাউডার তৈরি করে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করাটাও খুব কঠিন নয়। এলকোহল বেইজড হ্যান্ড স্যানিটাইজারে মূলতঃ ব্যবহৃত হয় ইথাইল এলকোহল অথবা আইসোপ্রোপাইল এলকোহল। আর একলোহল ছাড়া স্যানিটাইজারে ব্যবহৃত হয় বেনজালকোনিয়াম ক্লোরাইড। [৭] বাংলাদেশের কর্পোরেট হাউজগুলি কি সারাজীবন মুনাফার পিছনেই ছুটবে, নাকি দুর্যোগের সময় ‘ইউনিলিভার’এর মতো মাল্টিন্যাশনালের হাতে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ছেড়ে দিয়ে পালাবে?

‘এন ৯৫’ মাস্ক এবং ‘ভেন্টিলেটর’ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কঠিন জিনিস। কিন্তু এটাই কি সময় নয় নিজেদের সক্ষমতাকে দেখাবার? এখন না দেখালে কখন দেখাবে? পশ্চিমা বাজার ধরে অর্থ উপার্জনের জন্যে বাংলাদেশের কর্পোরেট হাউজগুলি দুনিয়ার সর্বশেষ প্রযুক্তি আমদানি করেছে। আজকে মানুষের জীবন বাঁচাতে সেটা করতে কেন কার্পণ্য করবে? সক্ষমতা থাকার পরেও যারা এসময় মানুষের পাশে দাঁড়াবে না, তারা একসময় সকলকিছু হারাবে। আর আল্লাহও তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ যাদেরকে সক্ষমতা দিয়েছেন, তাদেরকে সবচাইতে বেশি জবাবদিহিতা করতে হবে।

“অনন্তর যে ব্যক্তি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে (জবাবদিহি) ভয় করে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস”। (সূরা আন নাযিয়াত‌, আয়াত: ৪০)



----------------------------
[১] ‘UK coronavirus: Boris puts industry on war footing to build ventilators amid outbreak’, Express, 15 March 2020
[২] ‘GM, Tesla tackle ventilator shortage amid coronavirus pandemic’, USA Today, 22 March 2020
[৩] ’Masks and hand sanitizer replace iPhones and perfume: Firms redeploy factories to make coronavirus supplies’, Fortune, 17 March 2020
[৪] ‘BYD Opens World’s Largest Face Mask Manufacturing Plant’, BYD Global Press Release, 13 March 2020
[৫] ‘Coronavirus: China’s mask-making juggernaut cranks into gear, sparking fears of over-reliance on world’s workshop’, South China Morning Post, 12 March 2020
[৬] ’Distilleries Race to Make Hand Sanitizer Amid Coronavirus Pandemic’, The New York Times, 19 March 2020
[৭] ‘Fact check: No, hand sanitizer won't harm your pets if they lick your hand after you use it’, USA Today, 20 March 2020