Saturday, 21 March 2020

করোনাভাইরাস পশ্চিমা পুঁজিবাদকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে!

২১শে মার্চ ২০২০

 
জীবনরক্ষাকারী রিএজেন্ট, ওষুধ ও যন্ত্রের উপর মালিকানার স্বাধীনতা এবং যেকোন দ্রব্য যেকোন মুনাফায় বিক্রি করার মতো চিন্তাগুলি করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক দুর্যোগের মাঝে পশ্চিমা মানবাধিকারের চিন্তার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে, যা কিনা পশ্চিমা সভ্যতার মূলেই আঘাত করছে।



১১ই মার্চ মার্কিন ‘ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন’ বা ‘এফডিএ’এর কমিশনার স্টিফেন হান মার্কিন কংগ্রেসকে বলেন যে, ‘এফডিএ’ জানে যে, নভেল করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার জন্যে যেসকল কেমিক্যাল বা রিএজেন্ট দরকার, সেগুলির সরবরাহের উপর চাপ পড়েছে। মেডিক্যাল ম্যাগাজিন ‘মেডটেক ডাইভ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, রিএজেন্ট সরবরাহকারী কোম্পানি ‘কিয়াজেন’ বলছে যে, তারা করোনাভাইরাসের ভীষণ চাহিদার কারণে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমসিম খাচ্ছে। মার্কিন চাহিদা বাড়ার কারণে কোম্পানিটা যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যন্ডের জার্মানটাউনে তাদের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। ‘কিয়াজেন’ হলো মেডিক্যাল গবেষণার জন্যে কেমিক্যাল ও রিএজেন্ট সরবরাহকারী কোম্পানি, যাদের বাৎসরিক আয় দেড় বিলিয়ন ডলারের উপর। এর হেডকোয়ার্টার্স হলো নেদারল্যান্ডস ও জার্মানিতে; এবং এর কর্মচারীর সংখ্যা ৫ হাজারের মতো। ‘ইয়াহু ফিনান্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গত ছয় মাসে নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে মেডিক্যাল কোম্পানিগুলির স্টকের মূল্য যেখানে ৪ শতাংশ কমেছে, সেখানে ‘কিয়াজেন’এর শেয়ারের মূল্য বেড়েছে ১৪ শতাংশ। বিশেষ করে করোনাভাইরাসের কারণে স্টক এক্সচেঞ্জে ব্যাপক দরপতনের মাঝেও এর মূল্য বেড়েছে।

মার্কিন ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’ বা ‘সিডিসি’ করোনাভাইরাসের টেস্টিং কিটের জন্যে ছয়টা রিএজেন্টের নাম উল্লেখ করেছে, যার মাঝে ‘কিএম্প ডিএসপি’, ‘এজেড ১’ এবং ‘কিএকিউব’ তৈরি করছে ‘কিয়াজেন’। এর বাইরেও কোম্পানিটা ‘কিএসট্যাট ডিএক্স’ নামের একটা টেস্ট কিট বাজারে ছেড়েছে। ‘সিডিসি’র অনুমতিপ্রাপ্ত বাকি তিনটা রিএজেন্ট হলো ‘রোশ’ কোম্পানির ‘ম্যাগনা পিউর এলসি’, ‘ম্যাগনা পিউর কমপ্যাক্ট’ এবং ‘ম্যাগনা পিউর ৯৬’। ব্যাবসায়িক ম্যাগাজিন ‘ইনভেস্টর্স বিজনেস ডেইলি’ এক প্রতিবেদনে বলছে যে, মার্কিন ‘এফডিএ’এর কাছ থেকে করোনাভাইরাসের টেস্টিংএর জন্যে পণ্য সরবরাহের অনুমতি পাবার পর ১৩ই মার্চ ‘রোশ’এর শেয়ারের মূল্য এক দিনেই ১৩ শতাংশ বেড়ে যায়। ‘রোশ’ বা ‘ফ্রিতস হফম্যান লা রোশ’ ১৮৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত একটা বহুজাতিক মেডিক্যাল কোম্পানি, যার হেডকোয়ার্টার্স হলো সুইজারল্যান্ডে। এর বাৎসরিক আয় প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলার এবং কর্মচারীর সংখ্যা ৯৪ হাজারের উপর। অন্যদিকে এই রিএজেন্টগুলি মার্কিন বাজারে সরবরাহের অনুমতি পেয়েছে ‘ইনটেগ্রেটেড ডিএনএ টেকনলজিস’ এবং ‘বায়োরিসার্চ টেকনলজিস’ নামের দু’টা মাত্র কোম্পানি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সংস্থা ‘দ্যা ইন্টারসেপ্ট’ বলছে যে, করোনাভাইরাসের আতঙ্ক শুরুর পর থেকে প্রভাবশালী ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কগুলি মেডিক্যাল কোম্পানিগুলির উপর করোনাভাইরাসের ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির জন্যে চাপ দিচ্ছে। এমনই একটা কোম্পানি হলো ‘গিলিয়াড সাইন্সেস’। ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত এই বায়োটেকনলজি কোম্পানির বাৎসরিক আয় ২২ বিলিয়ন ডলার এবং কর্মচারী ১১ হাজারের মতো। ‘গিলিয়াড’এর ডেভেলপ করা ‘রেমডেসিভির’ নামক এন্টিভাইরাল ড্রাগ ‘ডেঙ্গু’, ‘ওয়েস্ট নাইল’ ভাইরাস, ‘জিকা’ ভাইরাস, ‘মার্স’ ভাইরাস এবং ‘সার্স’ ভাইরাসের চিকিৎসার জন্যে ব্যবহৃত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কথায়, এই ‘রেমডেসিভির’ই হলো একমাত্র ওষুধ যেটা করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা গেলে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই কথা বলার সাথেসাথেই গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি ‘গিলিয়াড’এর শেয়ারের মূল্য এক দিনে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে গিয়ে ২০১৮ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ মূল্যে পৌঁছায়। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ‘গিলিয়াড’এর বাজারমূল্য ১২ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যায়। ‘ব্যাংক অব আমেরিকা’র বিশ্লেষকদের মতে, ‘রেমডেসিভির’ বিক্রি করে কোম্পানিটার এককালীন আড়াই বিলিয়ন ডলার আয় আসতে পারে।
  
 
ইতালির এক তরুন ইঞ্জিনিয়ার ক্রিশ্চিয়ান ফ্রাকাসি হাসপাতালে ‘ভেনচুরি’ ভালভ নামে পরিচিত একটা যন্ত্রের অপ্রতুলতার কথা শুনে ‘থ্রিডি প্রিন্টার’এর সাহায্যে যন্ত্রটার ১’শটা কপি করার ব্যবস্থা করেন। এই যন্ত্রের প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘ইন্টারসার্জিক্যাল’এর কাছ থেকে যন্ত্রটার ব্লুপ্রিন্ট চাওয়া হলে তারা তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা বলে যে, এই যন্ত্রের স্বত্ব শুধুমাত্র তাদের কোম্পানির এবং অন্য কারুর এই যন্ত্র কপি করাটা বেআইনী। কোম্পানিটা এমন এক সময়ে তার যন্ত্রের ডিজাইন দিতে অস্বীকৃতি জানালো, যখন বাস্থ্যসেবা, ওষুধ এবং যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার মাঝে সর্বোচ্চ কত বয়স পর্যন্ত রুগীকে চিকিৎসা দেয়া হবে, সেব্যাপারেও ডাক্তারদের চিন্তা করতে বলা হয়েছে।




অন্যদিকে বিপুল সখ্যক আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে অক্সিজেন দেবার জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইতালির এক তরুন ইঞ্জিনিয়ার ক্রিশ্চিয়ান ফ্রাকাসি এবং তার সহযোগী আলেসান্দ্রো রোমাইওলি ইতালির উত্তরে মিলানের কাছাকাছি চিয়ারি শহরের এক হাসপাতালে ‘ভেনচুরি’ ভালভ নামে পরিচিত একটা যন্ত্রের অপ্রতুলতার কথা শুনে ‘থ্রিডি প্রিন্টার’এর সাহায্যে যন্ত্রটার ১’শটা কপি করার ব্যবস্থা করেন; আর এই কাজের জন্যে খরচ হয় নামমাত্র; যেখানে এই যন্ত্রের অরিজিনাল ভার্সনের মূল্য কয়েক হাজার ডলার। হাসপাতালের ডাক্তাররা বলছেন যে, কপি করা মূল্যহীন এই যন্ত্র মুমুর্ষু রোগীর জন্যে অমূল্য সেবা দিচ্ছে। এই যন্ত্রের প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘ইন্টারসার্জিক্যাল’এর কাছ থেকে যন্ত্রটার ব্লুপ্রিন্ট চাওয়া হলে তারা তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা বলে যে, এই যন্ত্রের স্বত্ব শুধুমাত্র তাদের কোম্পানির এবং অন্য কারুর এই যন্ত্র কপি করাটা বেআইনী। ১৯৮২ সালে স্থাপিত হওয়া ‘ইন্টারসার্জিক্যাল’এর হেডকোয়ার্টার্স হলো ব্রিটেনে। শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রুগীদের জন্যে কোম্পানিটা বিভিন্ন যন্ত্র তৈরি করে থাকে। বর্তমানে এর কর্মচারী ৩ হাজারের বেশি। কোম্পানিটা এমন এক সময়ে তার যন্ত্রের ডিজাইন দিতে অস্বীকৃতি জানালো, যখন ইতালির কলেজ ‘এসআইএএআরটি’ স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ এবং যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার মাঝে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতে যাদের বাঁচার সম্ভাবনা বেশি, শুধু তাদেরকেই চিকিৎসা দেবার জন্যে গাইডলাইন দিয়েছে। এমনকি সর্বোচ্চ কত বয়স পর্যন্ত রুগীকে চিকিৎসা দেয়া হবে, সেব্যাপারেও ডাক্তারদের চিন্তা করতে বলেছে।

রিএজেন্ট, ওষুধ বা যন্ত্রপাতি ছাড়াও করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সকলকিছুরই মারাত্মক স্বল্পতা চলছে। আর প্রত্যেক ক্ষেত্রেই চলছে ব্যবসা এবং মুনাফার দৌরাত্ম। সামরিক পত্রিকা ‘এয়ারফোর্স টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, মার্কিন বিমান বাহিনীর এক প্রাক্তন সদস্য ১৭ হাজার বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা করেন। তারই মতো আরেকজন সাড়ে ৩ ডলার দামে ২ হাজার জীবনরক্ষাকারী কিট নিনে ৪০ ডলার করে বিক্রি করেছেন। ‘এনবিসি নিউজ’ আড়াই’শ মেডিক্যাল কর্মীর উপর করা এক গবেষণার ফলাফলের বরাত দিয়ে বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে বহু মেডিক্যাল কর্মী কোন মাস্ক বা জীবাণুনাশক ছাড়াই নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছেন। ‘পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট’ বা ‘পিপিই’ এখন মারাত্মক স্বল্পতায় রয়েছে। চাকুরি হারাবার ভয়ে নিজের নাম পরিচয় গোপন করা মিশিগানের এক নার্স বলছেন যে, তার মনে হয় না যে তাদের হাসপাতাল তাদের ব্যর্থতার কারণ; বরং পুরো ব্যবস্থাটাই এখন ব্যর্থ! মিশিগানের নার্সের মন্তব্য পুঁজিবাদের গোড়ার সমস্যাকেই তুলে ধরে। জীবনরক্ষাকারী রিএজেন্ট, ওষুধ ও যন্ত্রের উপর মালিকানার স্বাধীনতা এবং যেকোন দ্রব্য যেকোন মুনাফায় বিক্রি করার মতো চিন্তাগুলি করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক দুর্যোগের মাঝে পশ্চিমা মানবাধিকারের চিন্তার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে, যা কিনা পশ্চিমা সভ্যতার মূলেই আঘাত করছে।

Sunday, 15 March 2020

যুক্তরাষ্ট্রের পর...


১৫ই মার্চ ২০২০











আলহামদুলিল্লাহ!
আমার তৃতীয় বই প্রকাশিত হলো।
 
'যুক্তরাষ্ট্রের পর... সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার হাতছানি'
 












বই-এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছুটা ধারণা এই বর্ণনা থেকে পাওয়া যাবে -


-----------------------------------------------------------------------------------------------

"বিশ্ব এখন প্রস্তুত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক কাঠামোর জন্যে। কেমন হবে সেই বিশ্ব? কে হবে এর নিয়ন্ত্রক? যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব ধরে রাখতে হিমসিম খাচ্ছে এবং তাদের প্রক্সিগুলির উপর নির্ভর করছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর করছে তুরস্ক, সৌদি আরব, আমিরাত এবং মিশরের উপর। পশ্চিম আফ্রিকাতে ফ্রান্সের নেতৃত্বকেই মেনে চলছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তানের সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকায় ভারতকে কাছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পূর্ব এশিয়ায় চীনকে ব্যালান্স করতে জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইনকে ব্যবহার করছে তারা। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ এখন আর নিরঙ্কুশ নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে। অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানের ভয়ে ভীত; বিশেষতঃ অজনপ্রিয় অত্যাচারী শাসকেরা।

পশ্চিমা শক্তি ব্রিটেন চেষ্টা করছে এই সুযোগে নিজের প্রভাব বাড়িয়ে নিতে। কিন্তু ব্রেক্সিটের চাপই যেখানে ব্রিটিশ জনগণ নিতে পারছে না, সেখানে স্কটল্যান্ডের গণভোটকে কিভাবে নেবে তারা? ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক শোষণের স্মৃতিগুলিও মুছে যায়নি। ইউরেশিয়ার শক্তি রাশিয়া এবং চীন আদর্শিক শক্তি নয়। প্রযুক্তি এবং অর্থনীতিই এদের শক্তির ভিত; আদর্শ নয়। তাই রুশ এবং চীনা জাতীয়তাবাদ যে বিশ্বের নেতৃত্ব নিতে পারবে, তা বিশ্বাসযোগ্যতা পায়না। তুরস্ক চেষ্টা করছে ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে। কিন্তু সেকুলার আদর্শের মাঝে থেকে ইসলামের নেতৃত্ব নিতে গেলে সেই নেতৃত্ব পশ্চিমা সেকুলারদের হাতেই যাবে। তথাপি এই ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’এর মূলে রয়েছে মুসলিম বিশ্বের জনগণের আদর্শিক নেতৃত্বের আকাংক্ষা, যা পশ্চিমাদের দৃষ্টিকে এড়ায়নি। এই আকাংক্ষাই পশ্চিমাদেরকে বুঝিয়ে দিচ্ছে সামনের দিনের ভূরাজনৈতিক ভরকেন্দ্রটা কোথায় হবে।" 


-----------------------------------------------------------------------------------------------

আপডেট ২৪শে জুলাই ২০২০

বইখানা এখন 'রকমারি ডট কম'এ পাওয়া যাচ্ছে। 
https://www.rokomari.com/book/202000/juktorashtrer-por--- 

----------------------------------------------------------------------------------------------- 


এছাড়াও বইটি কুরিয়ারের মাধ্যমে ডেলিভারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যারা অর্ডার করতে ইচ্ছুক, তারা নিচের ফেসবুক পেইজে পুরো ঠিকানা এবং ফোন নম্বরসহ 'ইনবক্স' করুন। পেমেন্ট করতে হবে বিকাশে। ডেলিভারি চার্জ ফ্রি। অর্থাৎ বইএর মূল্যের বাইরে কোন চার্জ দিতে হবে না।  

https://www.facebook.com/k360bd/


------------------------------------------------------------------------------------- 








লেখক - আহমেদ শরীফ

প্রকাশক - মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম, ড্রিমস পাবলিকেশনস, টাঙ্গাইল

প্রথম প্রকাশ - ফেব্রুয়ারি ২০২০

প্রচ্ছদ - তৌহিদুল ইসলাম

মুদ্রণ - ওমাসিস প্রেস, কাঁটাবন, ঢাকা

পৃষ্ঠা সংখ্যা - ৩৪৭; হার্ড কভার 

মূল্য - ৯০০/- (নয়শত টাকা মাত্র) 

ISBN : 978-984-34-9063-6
 -------------------------------------------------------------------------------
লেখকের প্রথম বই দু'টা না পেয়ে থাকলে এই লিঙ্ক থেকে ঘুরে আসুন - 
 

'বঙ্গোপসাগর আসলে কার? বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান'

Saturday, 14 March 2020

করোনাভাইরাসের মাঝে তেল-যুদ্ধ – আসল টার্গেট যুক্তরাষ্ট্র?

১৪ই মার্চ ২০২০

    
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের মাঝে সৌদি এবং রুশদের তেলের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক ঋণগ্রস্ত তেলের কোম্পানিগুলিকে দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। করোনাভাইরাসের অনিশ্চয়তার মাঝে সকলেই নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় দেখতে চাইছে; এতে অন্য কারুর ক্ষতি হোক বা না হোক। বাজার হিস্যা দখলের সাথেসাথে ভূরাজনৈতিক প্রভাবের হিস্যার মাঝেও ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। উত্তরপূর্ব এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকায় ভাইরাসের আক্রমণ যে ভূরাজনৈতিক ভূমিকম্পের সূচনা করেছে, তেল-যুদ্ধ তার একটা ফলাফল মাত্র।



৯ই মার্চ আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজার মূল্য একদিনে ৩০ শতাংশের বেশি কমে যায়। ১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে এটা ছিল তেলের বাজারে একদিনের সর্বোচ্চ ধ্বস। এই ধ্বসের একটা কারণ ছিল বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের কারণে তেলের চাহিদা পড়ে যাওয়া। তবে এর সাথে যোগ হয়েছে সৌদি আরব এবং রাশিয়ার মাঝে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে সমঝোতায় না পৌঁছানো। গত ৬ই মার্চ ভিয়েনায় এক বৈঠকে সৌদি কর্মকর্তারা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় রুশদেরকে তেলের উৎপাদন কমাতে অনুরোধ করেন। এই প্রস্তাবে রাশিয়া রাজি না হওয়ায় সৌদিরা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে উৎপাদন ১ কোটি ২৩ লাখ ব্যারেলে ওঠানো এবং বিশেষ ক্রেতাদের জন্যে ২০ বছরের মাঝে সর্বোচ্চ মূল্য কর্তনের ঘোষণা দেয়। ‘ব্লুমবার্গ’ এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে যে, সৌদিদের কমদামি তেলের বাজার ধরতে উত্তরপূর্ব এশিয়ার ক্রেতারা ব্যর্থ হবার ফলে এটা নিশ্চিত হয়ে যায় যে সৌদিদের তেলের বাজার হতে যাচ্ছে ইউরোপ, যা কিনা রুশ তেলের মূল বাজার। উত্তর এশিয়ার ক্রেতারা লাইট ক্রুড চাইলেও সৌদিরা তাদেরকে মিডিয়াম ও হেভি ক্রুড কেনার অফার দেয়। এতে এশিয়রা বাধ্য হয় সৌদিদের তেলের অফার ছেড়ে দিতে। অন্যদিকে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সৌদিরা মিডিয়াম ক্রুডের সরবরাহ বাড়াচ্ছে।

‘গোল্ডমান সাকস’এর বিশ্লেষকেরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারে নেমে যাবার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তেলের বাজারে ধ্বসের সাথেসাথে তেল কোম্পানিগুলির শেয়ারের মূল্যেও ব্যাপক দরপতন হয়েছে। দু’দিন পর ১১ই মার্চ সৌদি তেল কোম্পানি আরামকো ঘোষণা দেয় যে, তারা তাদের তেলের উৎপাদন ২০২০ সালের মাঝেই বাড়িয়ে দৈনিক ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল করবে। একইসাথে আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানিও ঘোষণা দেয় যে, তারা এপ্রিল মাসে তাদের উৎপাদন ১০ লাখ ব্যারেল বাড়িয়ে ৪০ লাখ ব্যারেল করবে। ‘ব্লুমবার্গ’ জানাচ্ছে যে, ইরাক এবং নাইজেরিয়াও তেল উৎপাদন বাড়াবার ঘোষণা দিয়েছে। এই ব্যাপারটার ব্যাখ্যা দিয়ে ‘সিএনএন’ বলছে যে, তেলের মূল্যের এই যুদ্ধের মাঝে সকলেই চাইবে যে করেই হোক তেলের বাজারে নিজস্ব হিস্যা বাড়িয়ে নিতে। গত তিন বছর ধরে সৌদিরা রুশদের সাথে সমঝোতা করে তেলের বাজারে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু এখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে সমঝোতা শেষ হয়ে যাওয়ায় সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান বাজার হিস্যা ধরতে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক একটা কৌশল নিয়েছেন।

‘জেপি মরগ্যান’এর বিশ্লেষক যোসেফ লুপটন এক বিশ্লেষণে বলছেন যে, তেলের মূল্য কমায় তেলের ব্যবহারকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সুবিধা হবে। তবে সেদেশের তেল কোম্পানিগুলির যেগুলি শেইল অয়েলের ব্যবসায় রয়েছে, সেগুলি সমস্যায় পতিত হতে পারে। তিনি সৌদিদের লক্ষ্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, সৌদিরা বাজারে তেলের বন্যা বইয়ে দিতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলিকে চাপে ফেলার জন্যে। ২০১৫-১৬ সালের দিকে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার থেকে ৩০ ডলারে নেমে গেলে সেবারেও শেইল অয়েল ইন্ডাস্ট্রি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছিল; বিনিয়োগ চলে গিয়েছিল; চাকুরি হারিয়েছিল বহু মানুষ। এখন মার্কিন শেইল ইন্ডাস্ট্রি আগের চাইতে আরও শক্ত অবস্থানে থাকলেও পূর্বে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হওয়ায় মার্কিন ব্যাংকগুলি সেখানে আরও বিনিয়োগ করতে আর রাজি নয়। আবার তেলের বাজারে ধ্বসের সাথেসাথে শেয়ার বাজারে যেমন ধ্বস নেমেছে, তেমনি তেল কোম্পানিগুলির বন্ডগুলিও ব্যাপকভাবে মূল্য হারাচ্ছে। ‘জেপি মরগ্যান’ বলছে যে, ২০২০ সালের দ্বিতীয়াংশে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলার এবং ২০২১ সালে ৫০ ডলারে উঠলেও ২০২১ সালে প্রায় ২৪ শতাংশ তেলের কোম্পানির বন্ড খেলাপি হয়ে যেতে পারে।
  
বিশ্বের সবচাইতে বড় তেলের ব্যবহারকারী যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়েছে মাত্র। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ব্যবহার করেছে, যা সারা দুনিয়ার তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ। দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত, অনুষ্ঠান বা খেলাধূলার আসরে যাতায়াত কমতে থাকলেই তেলের চাহিদায় ধ্বস আসতে থাকবে।
  

‘সিএনএন’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, সৌদিরা তেলের মূল্যের যুদ্ধে নেমে ঘোষণা দিচ্ছে যে, প্রথমতঃ সৌদিরা নিয়ন্ত্রণ না করে তেলের বাজারকে মুক্ত বাজার হিসেবে চলতে দিলে বিপর্যয় নেমে আসবে। সুতরাং বিশ্বকে সৌদিদের এই নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে হবে। আর দ্বিতীয়তঃ তেলের মূল্য যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির তেলের উৎপাদন খরচ সর্বনিম্ন হওয়ায় তারাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। বিশেষ করে মার্কিন শেইল অয়েলের চাইতে তারা অনেক কমে বিশ্বকে তেল দিতে সক্ষম।

তেলের বাজারের পত্রিকা ‘অয়েল প্রাইস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যদিও কেউকেউ ধারণা করছিলেন যে, চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমে আসার সাথেসাথে তেলের বাজারে চাহিদার অবস্থার হয়তো উন্নতি হবে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, বিশ্বের সবচাইতে বড় তেলের ব্যবহারকারী যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়েছে মাত্র। মার্কিন ‘এনার্জি ইনফরমেশন এডমিনিস্ট্রেশন’এর হিসেবে ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ব্যবহার করেছে, যা সারা দুনিয়ার তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ। এর সাথে তুলনামূলকভাবে চীন ব্যবহার করেছে ১ কোটি ৩৬ লাখ ব্যারেল তেল। যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সাথেসাথে মানুষ বাড়ির বাইরে যাওয়া কমিয়ে দেবে; অর্থাৎ মানুষের যাতায়াত কমতে শুরু করবে। মার্কিন ক্রীড়াঙ্গনের মধ্যমনি বাস্কেটবল, আইস হকি এবং বেইসবল লীগ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত, অনুষ্ঠান বা খেলাধূলার আসরে যাতায়াত কমতে থাকলেই তেলের চাহিদায় ধ্বস আসতে থাকবে।

‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’ বলছে যে, তেলের মূল্য যুদ্ধের মাঝ দিয়ে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের শেইল অয়েলের ইন্ডাস্ট্রিকে টার্গেট করেছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘হাডসন ইন্সটিটিউট’এর থমাস দুস্তারবার্গ ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের মাঝে সৌদি এবং রুশদের তেলের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক ঋণগ্রস্ত তেলের কোম্পানিগুলিকে দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের কথায় এটা নিশ্চিত যে, করোনাভাইরাসের অনিশ্চয়তার মাঝে সকলেই নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় দেখতে চাইছে; এতে অন্য কারুর ক্ষতি হোক বা না হোক। বাজার হিস্যা দখলের সাথেসাথে ভূরাজনৈতিক প্রভাবের হিস্যার মাঝেও ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। উত্তরপূর্ব এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকায় ভাইরাসের আক্রমণ যে ভূরাজনৈতিক ভূমিকম্পের সূচনা করেছে, তেল-যুদ্ধ তার একটা ফলাফল মাত্র।

Saturday, 7 March 2020

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ইতালি - ‘সিক ম্যান অব ইউরোপ’, নাকি আদর্শিক চ্যালেঞ্জ?

৭ই মার্চ ২০২০

 
মানবাধিকার, মুক্ত বাজার অর্থনীতি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো পশ্চিমা আদর্শের ভিতগুলিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে করোনাভাইরাস। এগুলি পুরো পশ্চিমা বিশ্বের জন্যে চ্যালেঞ্জ হলেও ইতালি হয়তো সেক্ষেত্রে সবচাইতে বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে আসছে।


৬ই মার্চ ইতালিয় কর্মকর্তারা ঘোষণা করেন যে, ২৪ ঘন্টায় ইতালিতে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ইতালিতে করোনাভাইরাসের আবির্ভাবের পর থেকে এটা একদিনে মৃতের সর্বোচ্চ সংখ্যা। এর আগের দিন মৃত্যু হয়েছিল ২৮ জনের। এখন পর্যন্ত মোট ১’শ ৯৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে ইতালিতে; আক্রান্ত হয়েছে ৪ হাজার ৬’শ জনেরও বেশি। চীনের বাইরে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে ইতালিতেই। ইতালি সরকার সকল স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় ১০ দিনের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করেছে। আর এক মাসের জন্যে সকল পেশাদার খেলা দর্শকবিহীন মাঠে অনুষ্ঠিত হবে বলে বলা হয়েছে। ‘বিবিসি’ জানাচ্ছে যে, ইতালির উত্তরের কোদোনিয়ো শহরে মৃতদের শেষকৃত্যানুষ্ঠান করারও অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। ইতালির ‘ইল মেসাজেরো’ পত্রিকা বলছে যে, ঠান্ডা লাগার কারণে ৮৩ বছর বয়সী পোপ ফ্রান্সিসকেও করোনাভাইরাসের পরীক্ষার সন্মুখীন হতে হয়েছে; যদিওবা তিনি আক্রান্ত নন। তবে এর কারণে তার কর্মপরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। ‘দ্যা সান’ পত্রিকা বিভিন্ন রিপোর্টের বরাত দিয়ে বলছে যে, ইতালি সরকার চুম্বন, আলিঙ্গন এবং করমর্দনের মতো সামাজিক আচরণগুলির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করার চিন্তা করছে। করোনাভাইরাসের কারণে ইতালিতে স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছাড়াও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক জটিলতা, অর্থনৈতিক দৈন্যদশা, এমনকি সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধও চলে আসছে, যা কিনা পুরো দেশের, এবং একইসাথে ইউরোপের জীবনযাত্রাকেই চ্যালেঞ্জ করছে।

ইতালির জাতীয় স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট বলছে যে, ইতালিতে মৃত ব্যক্তিদের গড় বয়স ছিল ৮১; বেশিরভাগ মানুষেরই বয়স ছিল ৬৩ থেকে ৯৫ বছরের মাঝে। সবচাইতে কম বয়সী মৃতের বয়স ছিল ৫৫ বছর; যিনি অনেকদিন থেকেই বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। সরকারি হিসেব বলছে যে, আক্রান্তদের মাঝে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, যা কিনা বিশ্বের সকল দেশের মাঝে সর্বোচ্চ হার। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইতালির জনসংখ্যার একটা বড় অংশ বৃদ্ধ হওয়ায় করোনাভাইরাসে মৃতের হার কমানোটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। মিলানের ‘সাক্কো’ হাসপাতালের ডিরেক্টর প্রফেসর মাসিমো গাল্লি মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ইতালি হলো বৃদ্ধ মানুষের দেশ। অসুস্থ্য বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা এখানে খুবই বেশি। ইতালির মানুষের গড় আয়ু অনেক বেশি; আর সেই গড় আয়ুই এখন করোনাভাইরাসে মৃতের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তুসকানি, পুইলিয়া, সিসিলি এবং সার্দিনিয়াসহ ইতালির ২০টা অঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাঝে উত্তরের লোমবার্ডিতেই বেশিরভাগ আক্রান্ত ব্যক্তি সনাক্ত হয়েছে। ইতালির বাকি অঞ্চলের আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝে বেশিরভাগই গত কয়েক সপ্তাহের মাঝে লোমবার্ডি ঘুরে এসেছিলেন। তবে গাল্লি বলছেন যে, এটা নিশ্চিত নয় যে এই ভাইরাস চীন থেকেই এসেছে; অন্য কোন দেশ হয়েও ইতালিতে এই ভাইরাস ঢুকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ তিনি একজন ব্রিটিন নাগরিকের কথা বলেন, যিনি সিঙ্গাপুর থেকে ফ্রান্সে গিয়ে তার পরিচিতদেরকে সংক্রমিত করেছিলেন। প্রফেসর গাল্লি আরও বলেন যে, অনেকেই ‘কোয়ার‍্যান্টিন’ বা পৃথকীকরণ করায় বেশি শক্ত পদক্ষেপ নেবার জন্যে ইতালির সমালোচনা করেছেন। উত্তরের অনেক অঞ্চলেই যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছে ইতালি সরকার। তারপরেও রোগের সংক্রমণ কমানো সম্ভব হয়নি। ইউরোপের খোলা সীমানাগুলিকেও চাপের মাঝে ফেলেছে করোনাভাইরাস। ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’ আরও বড় প্রশ্ন রেখেছে। পশ্চিমা বিশ্বে যেখানে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিতে সরকারের হাতে খুব কম ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, সেখানে মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে কর্তন করে করোনাভাইরাসের মতো রোগের সংক্রমণ কমানো সম্ভব কিনা।

‘সিএনবিসি’র এক প্রতিবেদনে ইতালিকে ‘সিক ম্যান অব ইউরোপ’ বা ইউরোপের রোগাক্রান্ত ব্যক্তি বলা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২০ সালে ইতালির অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলবে বলেই সকলে আশা করেছিল। ইতালি সরকারের পরিসংখ্যান দপ্তর জানুয়ারি মাসে বলেছিল যে, এবছর প্রবৃদ্ধি দশমিক ২ শতাংশের বেশি হবে না। দেশটার ব্যাংকিং খাত এখনও ব্যাপক সমস্যার মাঝ দিয়ে যাচ্ছে; সেখানে ব্যাবসা বাড়ানোর জন্যে ঋণ পাওয়া কঠিন। এর উপর এখন যোগ হয়েছে করোনাভাইরাসের কারণে ইতালি উত্তরের শিল্পাঞ্চলগুলির অনিশ্চিত অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ। তার সাথে রয়েছে প্রিয়জনদের হারাবার বেদনা এবং অসুস্থ্যদের ব্যাপক চিকিৎসা ব্যয়। ইতালি সরকার এখন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যবসাগুলির জন্যে কর কমানো এবং কর প্রদানে ক্রেডিটের ব্যবস্থা করছে; আর রোগী সনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় অর্থায়ন বাড়াচ্ছে। এসব মিলিয়ে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার প্রণোদনা দেবার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এই অর্থায়ন ইতালির বাজেট ঘাটতিকে আরও চাপের মাঝে ফেলবে। বাজেট ঘাটতি কমাবার বাধ্যবাধকতা নিয়ে ইউরোপিয় ইউনিয়নের সাথে ইতালির ডানপন্থী সরকারের বিতন্ডা চলছে আরও আগ থেকেই। তবে আপাততঃ ইতালির সরকারের খরচা বৃদ্ধিকে ইইউ মেনে নিলেও সামনের দিনগুলিকে বাধা দিতে পারে। কারণ এই প্রণোদনা মানবিক নয়, বরং অর্থনৈতিক। অর্থাৎ এই প্রণোদনা ইতালির শিল্পদ্রব্যগুলিকে মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বাকি ইউরোপের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে সহায়তা দেবে। ইউরোপের বাকি দেশগুলিও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। কিন্তু ইতালির মতো অর্থনৈতিকভাবে ‘সিক ম্যান অব ইউরোপ’এর উপর করোনাভাইরাসের প্রভাব বাকি ইউরোপের দেশগুলির চাইতে বেশি হতে পারে।

বেশি গড় আয়ু এখন আর গর্ব করার বিষয় থাকছে না। বেশি বয়সের জনসংখ্যাই ইতালির ভাইরাস সংক্রমণকে অন্যদের থেকে বেশি ভয়াবহ করেছে। অন্যদিকে অসুস্থ্য মানুষের মানবাধিকার প্রতিযোগিতা করছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির বাজারে টিকে থাকার চাহিদার সাথে। অর্থনৈতিকভাবে ‘সিক ম্যান অব ইউরোপ’ হবার কারণে ইতালির সরকার আর্থিক প্রণোদনা দেবার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাগুলিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে, যারা প্রণোদনাকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপের মুক্ত বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চেষ্টা করবে। আবার একইসাথে ব্যাপক ‘কোয়ার‍্যান্টিন’ বা পৃথকীকরণ ছাড়াও জীবনযাত্রার উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে; কারণ তা ইউরোপের মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খর্ব করছে। মানবাধিকার, মুক্ত বাজার অর্থনীতি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো পশ্চিমা আদর্শের ভিতগুলিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে করোনাভাইরাস। এগুলি পুরো পশ্চিমা বিশ্বের জন্যে চ্যালেঞ্জ হলেও ইতালি হয়তো সেক্ষেত্রে সবচাইতে বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে আসছে।

Thursday, 5 March 2020

ইদলিবের যুদ্ধ সিরিয়ায় ইরানের অবস্থানকে দুর্বল করছে

০৫ই মার্চ ২০২০
 
 
সুলাইমানির হত্যার পর একটা দুর্বল অবস্থানে থেকে ইরানের পক্ষে আলোচনায় মধ্যস্ততা করাটা কতটুকু সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়া এবং তুরস্কের ভূরাজনৈতিক খেলায় ইরানের কোন ভূমিকাই নেই। এমতাবস্থায় শুধুমাত্র সিরিয়ার যুদ্ধকে ব্যবহার করে ইরানের পক্ষে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব নয়। কাসেম সুলাইমানি-পরবর্তী সময়ের আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক হিসেবনিকেশে ইরানের দুর্বলতর অবস্থানের সুযোগ অনেকটাই তুরস্ক নেবে।
 

ইরানের ‘ক্বোম নিউজ’এর বরাত দিয়ে ‘রেডিও ফারদা’ জানাচ্ছে যে, সিরিয়ার ইদলিবে ৩৪ জন তুর্কি সেনা নিহত হবার পর তুর্কিদের প্রতিশোধমূলক আক্রমণে সিরিয় সেনাদের সাথেসাথে ২১ জন ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া নিহত হয়। এই সেনাদের রিক্রুট করা হয়েছিল আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান থেকে। এর মাঝে ১৮ জন ছিল পাকিস্তানের ‘জেইনাবিউন ব্রিগেড’এর, আর ৩ জন ছিল আফগানিস্তানের ‘ফাতেমিউন ব্রিগেড’এর। পহেলা মার্চ ইরানের শিয়াদের পবিত্র শহর ক্বোমএ এই ২১ জনের শেষকৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। হিযবুল্লাহর ১৪ জন সদস্যও ইদলিবে নিহত হয়েছে, যাদের শেষকৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় লেবাননের রাজধানী বৈরুতে। ২৯শে ফেব্রুয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের সাথে ফোনালাপ করেন। ফোনালাপে তিনি ২০১৮ সালের আস্তানা আলোচনার ছায়ায় তুরস্ক এবং রাশিয়াকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানান। পরদিন পহেলা মার্চ সিরিয়াতে ইরানের ‘মিলিটারি এডভাইজরি সেন্টার’ বা ‘এমএসি’র এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, ইরানিরা তুর্কিদের টার্গেট না করলেও তুর্কিরা ইরানিদেরকে টার্গেট করছে। একইসাথে বিবৃতিতে হুমকি দিয়ে বলা হয় যে, তুর্কিদের জেনে রাখা উচিৎ যে, তারা ‘এমএসি’র অস্ত্রের পাল্লার মাঝেই রয়েছে। এতে আরও বলা হয় যে, ইচ্ছে করলেই ইরানিরা তুর্কিদের উপর প্রতিশোধ নিতে পারতো; কিন্তু নেয়নি। বিবৃতির শেষে বলা হয় যে, যতদিন সিরিয়াতে সন্ত্রাসীরা থাকবে, ততদিন ইরান সিরিয়াতে থাকবে। ‘এমএসি’র এই ঘোষণা অনেককেই অবাক করেছে; কারণ প্রায় কেউই এতকালে ‘এমএসি’র নাম শোনেনি। তুর্কি মিডিয়া ‘ইয়েনি সাফাক’এর ৪ঠা মার্চের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে লন্ডনভিত্তিক প্রেস মনিটরিং সংস্থা ‘মিডলইস্ট মনিটর’ বলছে যে, ইরান ইদলিবের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর সারাকিবে ‘আল কুদস ফোর্স’এর ২ হাজার সেনা প্রেরণ করেছে; আর সারাকিবের দক্ষিণে মা’রাত আল নুমানে ‘ফাতেমিউন ব্রিগেড’এর সদস্যরা পৌঁছেছে ২’শ গাড়িতে করে। হিযবুল্লাহও সারাকিবে তাদের যোদ্ধাদের পাঠিয়েছে।

ইদলিবের যুদ্ধ পরিস্থিতি - ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২০

  

‘জার্মান ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এন্ড সিকিউরিটি এফেয়ার্স’এর ফেলো হামিদরেজা আজিজি ওয়াশিংটনভিত্তিক আরবের পত্রিকা ‘আল মনিটর’এর এক লেখায় বলছেন যে, ইদলিবের যুদ্ধে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের মৃত্যু যুদ্ধকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। ইরান এতকাল সিরিয়ার যুদ্ধে তার জড়িত থাকার ব্যাপারটাকে প্রচার না করলেও এখন সে আর তা গোপন রাখতে চাইছে না। সিরিয়ার দামাস্কাস আর আলেপ্পোর মাঝে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর চলে যাওয়া ‘এম ৫’ হাইওয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়াটা ইরানের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা লক্ষ্য বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এই হাইওয়ের সাথে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী লাতাকিয়া থেকে আসা ‘এম ৪’ হাইওয়ে মিশেছে সারাকিব শহরে, যা কিনা ইতোমধ্যেই চলমান ইদলিবের যুদ্ধের মাঝে দু’বার হাতবদল হয়েছে। ২০১৮ সালে সিরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার সময় রাশিয়ার ভূমিকাকে মেনে নিয়েছিল ইরান। কিন্তু এবারে সিরিয়ার বাশার সরকারকে রক্ষা করতে যথেষ্ট চেষ্টা না করায় ইরান কিছুটা অসন্তুষ্ট। ইরানিরা ধারণা করছে যে, রাশিয়া এবং তুরস্কের মাঝে সম্ভবতঃ একটা সমঝোতা হয়েছে, যা কিনা সন্মুখে আসেনি। ‘রাশান ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স কাউন্সিল’এর নন-রেসিডেন্ট বিশেষজ্ঞ ম্যাক্সিম সুচকভের মতে, রাশিয়া এবং তুরস্কের সম্পর্কের মাঝে অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, তুরস্কের মাঝ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে রুশ তেল ও গ্যাস সরবরাহের সহযোগিতা, রুশ সহায়তায় আক্কুইউতে তুরস্কের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, এবং রুশ ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ। এই প্রকল্পগুলি দুই দেশের জন্যে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, সেই তুলনায় সিরিয়ার যুদ্ধ দুই দেশকে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবার জন্যে যথেষ্ট নয়।



জেনারেল কাসেম সুলাইমানির (ডানে) সাথে সিরিয়াতে আফগান শিয়াদের ‘ফাতেমিউন ব্রিগেড’এর নেতা আলিরেজা তাভাসোলি (মাঝে)। তাভাসোলি সিরিয়ার দেরাতে যুদ্ধে নিহত হন; আর সুলাইমানি বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন
ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত আরবের পত্রিকা ‘দ্যা এরাব উইকলি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, সিরিয়ার বিষয়ে এর আগে আস্তানা এবং সোচিতে যে সমঝোতা হয়েছিল, তাতে শান্তি ধরে রাখার মূল নিশ্চয়তা দানকারী ছিল রাশিয়া, তুরস্ক এবং ইরান। কিছুদিন আগ পর্যন্তও ব্যাপারটা এমন থাকলেও এখন তা পরিবর্তন হচ্ছে। কারণ ইদলিবের সংঘর্ষ থামাবার ব্যাপারে আলোচনাতে শুধুমাত্র আঙ্কারা এবং মস্কোর নামই শোনা যাচ্ছে; তেহরান এক্ষেত্রে অনুপস্থিত। ইউফ্রেতিসের পূর্বাঞ্চলের ব্যাপারে আলোচনাতে উপস্থিত ছিল তুরস্ক, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র; সেখানেও ইরান ছিল অনুপস্থিত। সিরিয়াতে কাজ করার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে যে ম্যান্ডেট দিয়েছিল, ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহারের সাথে সাথে সরিয়ে নেন। সেসময় থেকেই সিরিয়াতে ইরানি সশস্ত্র গ্রুপগুলি ইস্রাইলসহ অন্য যেকোন বিরোধী শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হবার ভয়ে রয়েছে। ইরানের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞাও এই গ্রুপগুলিকে দুর্বল করছে। এই পুরো ব্যাপারটা তেহেরানের জন্যে আরও কঠিন হয়ে যায় নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে ইরানি জেনারেল কাসেম সুলাইমানির হত্যাকান্ডের পর। ইরানের ‘আইআরজিসি’র ‘আল কুদস ফোর্স’এর এই কমান্ডার সিরিয়াতে ইরান সমর্থিত বাহিনীরগুলিকে একত্রে ধরে রাখার জন্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা তার হত্যার পরই বোঝা যাচ্ছে। সিরিয়াতে সেনাবাহিনী এবং হিযবুল্লাহর কাজগুলি এখন কিছু কমান্ডারের ব্যক্তিগত চেষ্টার ফলাফল; তেহেরানের সমর্থিত কোন সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ নয়, যা কিনা সুলাইমানি নিশ্চিত করতেন। সুলাইমানি তেহেরানে সরাসরি যোগাযোগ না করেও অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। সিরিয়ার আকাশের নিয়ন্ত্রণ মস্কোর হাতে; তাই মস্কোর সাথে লিয়াঁজো রক্ষাও তিনিই করতেন। ইদলিবই হলো সুলাইমানিকে হারাবার পর সিরিয়াতে ইরানের জন্যে প্রথম চ্যালেঞ্জ।

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ, ধ্বংসাত্মক মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও এর ফলশ্রুতিতে দেশব্যাপী জনবিক্ষোভ, নিজভূমে লিবারাল এবং কনজার্ভেটিভদের মাঝে দ্বন্দ্ব, লেবানন ও ইরাকে ব্যাপক জনরোষের মুখে ইরানের প্রভাবের ক্ষয়ে যাবার সম্ভাবনা ছাড়াও আঞ্চলিকভাবে ইস্রাইল, তুরস্ক এবং সৌদি গ্রুপের আগ্রাসী কর্মকান্ডে ইরান যথেষ্টই ক্ষতির মুখে পড়েছে। এমনই এক সময়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ইদলিবের ব্যাপারে আলোচনার জন্যে রাশিয়া এবং তুরস্কের কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন। রাশিয়া এবং তুরস্ক উভয়েই ইরানের বর্তমান দুর্বল অবস্থানের ব্যাপারে অবগত। তুর্কিরা সিরিয়াতে রুশ টার্গেটে হামলা করা থেকে বিরত থাকলেও ইরানি টার্গেট সেখান থেকে বাদ পড়ে যায়নি। অপরদিকে রুশরা তুর্কিদেরকে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জন্যে ডাকলেও সেখানে ইরানকে যোগ দেবার জন্যে বলেনি। সুলাইমানির হত্যার পর একটা দুর্বল অবস্থানে থেকে ইরানের পক্ষে আলোচনায় মধ্যস্ততা করাটা কতটুকু সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়া এবং তুরস্কের ভূরাজনৈতিক খেলায় ইরানের কোন ভূমিকাই নেই। এমতাবস্থায় শুধুমাত্র সিরিয়ার যুদ্ধকে ব্যবহার করে ইরানের পক্ষে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব নয়। কাসেম সুলাইমানি-পরবর্তী সময়ের আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক হিসেবনিকেশে ইরানের দুর্বলতর অবস্থানের সুযোগ অনেকটাই তুরস্ক নেবে।