১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২২
‘রয়টার্স’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, গত ১৩ই সেপ্টেম্বর তুরস্কের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্রে ৫ জন শিশু ও একজন মহিলাসহ মোট ৬ জন অভিবাসন প্রত্যাশী ডুবে মৃত্যুবরণ করে। তুর্কি কোস্ট গার্ড এক বিবৃতিতে বলে যে, এই মানুষগুলি লেবানন থেকে ইতালি যাবার চেষ্টা করছিল। মোট ৭৩ জনকে তুর্কিরা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। লেবানন থেকে রওয়ানা হয়ে তুরস্কের উপকূলের কাছে গ্রিক মালিকানায় থাকা রোডস দ্বীপের কাছে এসে তারা জ্বালানি নেবার চেষ্টা করে। তুর্কিরা বলছে যে, অভিবাসীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গ্রিক কোস্ট গার্ড তাদের কাছে যায় ঠিকই; কিন্তু তাদেরকে চারটা লাইফ বোটে তুলে দিয়ে তুর্কি উপকূলের কাছে ছেড়ে দেয়। তবে গ্রিক কোস্ট গার্ড এক বিবৃতিতে এই ঘটনাটা পুরোপুরিভাবে অস্বীকার করে। অভিবাসন প্রত্যাশীদের ব্যাপারে তুরস্ক ও গ্রিসের নীতি সাংঘর্ষিক অবস্থানে থাকায় তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে চাপের মাঝে ফেলেছে।
এর মাত্র দুই দিন আগে গ্রিক কোস্ট গার্ড ইজিয়ান সাগরের তুর্কি দ্বীপ বজকাদাএর ২০ কিঃমিঃ দূরে আন্তর্জাতিক সমুদ্রে একটা তুর্কি পরিবহণ জাহাজকে লক্ষ্য করে গুলি করে। গ্রিক কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, তারা তুর্কি দ্বীপ বজকাদাএর প্রায় ৬০ কিঃমিঃ দক্ষিণে গ্রিক দ্বীপ লেসবসএর কাছাকাছি জাহাজটাকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে সাবধান করার জন্যে গুলি ছোঁড়ে। যেহেতু ইজিয়ান সাগর দিয়ে যাওয়া অনেক জাহাজেই ইউরোপ অভিমুখে যাওয়া অভিবাসন প্রত্যাশীরা থাকে, তাই তারা অনেক সময়েই সন্দেহজনক মনে হলে জাহাজগুলির উপর নজরদারি করে থাকে।
‘আল জাজিরা’র প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুরস্কের কথায়, গ্রিকরা ইজিয়ান সাগরের ক্রিট দ্বীপে রুশ নির্মিত ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে তুর্কি যুদ্ধবিমানগুলিকে হুমকির মাঝে রাখছে; যা গ্রিকরা অস্বীকার করেছে। এছাড়াও গ্রিক যুদ্ধবিমানও ইজিয়ান সাগরে তুর্কি যুদ্ধবিমানকে হুমকি দিয়েছে। তুর্কিরা এও অভিযোগ করেছে যে, গ্রিকরা তুরস্কের কুর্দি বিদ্রোহী গ্রুপ ‘পিকেকে’র সদস্যদেরকে গোপনে সামরিক ট্রেনিং দিচ্ছে; যা তারা গ্রেপ্তার হওয়া ‘পিকেকে’ সদস্যদের কাছ থেকে জানতে পেরেছে। অপরদিকে গ্রিকরা বলছে যে, ইজিয়ান সাগরে গ্রিসের মালিকানায় থাকা রোডস এবং কস দ্বীপের মতো দ্বীপগুলি পর্যটন শিল্পের জন্যে গ্রীসের কাছে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই দ্বীপগুলি যেখানে গ্রিক মূল ভূখন্ড থেকে অনেক দূরে, সেখানে সেগুলি তুরস্কের মূল ভূখন্ড থেকে মাত্র ৫ থেকে ১৫ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। গ্রিকরা এই দ্বীপগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে।
গত ৩রা সেপ্টেম্বর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান গ্রিক বিমানের তুর্কি আকাশসীমানা লঙ্ঘনের অভিযোগ করে বলেন যে, যদি গ্রিকরা ইজিয়ান সাগরে তুর্কি বিমানকে হুমকি প্রদান করে যেতে থাকে, তাহলে গ্রিকদেরকে ক্ষতির সন্মুখীন হতে হবে। অপরদিকে গ্রিক প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস বলেন যে, তুর্কি প্রেসিডেন্টের কথাগুলি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে তিনি উত্তেজনা হ্রাসে তুর্কি নেতার সাথে আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, অক্টোবরে ইইউএর বৈঠকে হয়তো এরকম একটা সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সপ্তাহখানেক আগে গ্রিক সরকার ন্যাটো, ইইউ এবং জাতিসংঘের কাছে চিঠি দিয়ে তুর্কি আগ্রাসী মনোভাবের নিন্দা জানাতে অনুরোধ করে। চিঠিতে আশংকা প্রকাশ করা হয় যে, এহেন পরিস্থিতি সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। গ্রিকরা তাদের সমর্থন পাচ্ছে ফ্রান্সের কাছ থেকে। ‘গ্রিক সিটি টাইমস’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, গ্রিক প্রধানমন্ত্রী মিতসোতাকিস প্যারিস সফর করার সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর কাছ থেকে সমর্থন পান। ১২ই সেপ্টেম্বর এক যৌথ সংবাদ সন্মেলনে ম্যাক্রঁ বলেন যে, তুরস্কের বিবৃতি এবং কর্মকান্ড একবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং তিনি একইসাথে গ্রিসের সাথে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ব্যাপারে সন্তোষ প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স গ্রিকদেরকে ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছে এবং নৌবাহিনীর জন্যে ফ্রিগেট দিচ্ছে; সাথে ঋণ সুবিধাও দেয়া হচ্ছে।
দুই ন্যাটো সদস্য দেশের মাঝে উত্তেজনা ন্যাটোর ঐক্যের মাঝেও প্রশ্ন তুলেছে। ন্যাটোর অফিশিয়াল টুইটার বার্তায় ১৯২২ সালে দখলদারি গ্রিক বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভের শততম বার্ষিকীতে তুরস্ককে অভিনন্দন জানাবার পর গ্রিকরা প্রতিবাদ করে। ফলস্বরূপ ন্যাটো সেই বার্তা মুছে ফেললে তুর্কিরা নাখোশ হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, দুই ন্যাটো সদস্যের দ্বন্দ্ব মোটেই সুবিধা বয়ে আনবে না। আর ইজিয়ানের দ্বীপগুলির উপর গ্রিসের সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে কোন প্রশ্নই নেই।
প্রাক্তন মার্কিন সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব জিম টাউনসেন্ড ‘ভয়েস অব আমেরিকা’কে বলছেন যে, যদিও এই মুহুর্তে দুই দেশের উত্তেজনা নিরসনে কারুর মধ্যস্ততা প্রয়োজন, তথাপি তিনি কাছাকাছি সময়ে তা দেখছেন না। দুই দেশের কেউ যদি নিজেদের পক্ষ সমর্থনে ন্যাটোকে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়, তাহলে ন্যাটোর ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আর এই অনৈক্যকে মস্কো ব্যবহার করতে চাইবে। প্রাক্তন ন্যাটো সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা মার্কিন জেনারেল ফিলিপ ব্রীডলাভ বলছেন যে, যদিও দুই দেশের উত্তেজনা নতুন নয়, তথাপি তুরস্কের নেতৃত্ব দেশটাকে এমন একটা দিকে নিয়ে যেতে চাইছে, যা কিনা বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও টানাপোড়েনের মাঝে ফেলেছে। তবে যেহেতু দুই দেশেরই সামনে নির্বাচন, তাই উত্তেজক কথাগুলি হয়তো কিছুটা হলেও অভ্যন্তরীণ জনগণকে টার্গেট করে বলা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলকে যেভাবে দেখতে চাইছে, সেক্ষেত্রে তুরস্কের চাইতে গ্রিস অপেক্ষাকৃতভাবে এগিয়ে আছে।
দুই দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন এই দ্বন্দ্বে ইন্ধন যোগালেও তুরস্ক ও গ্রিসের দ্বন্দ্ব তাদের জন্মকাল থেকেই। ইজিয়ান সাগরের প্রায় সবগুলি দ্বীপই পশ্চিমারা গ্রিসকে বিভিন্ন সময়ে দিয়েছে। যেকারণে ইজিয়ান সাগরের প্রায় পুরোটাই গ্রিসের হাতে; যা নিয়ে তুরস্ক গ্রিসের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে তুরস্ক পশ্চিমাদের জন্যে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজকে ততটা নয়। যেকারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপিয়রা তুরস্ককে সামরিক প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতে পারছে এবং গ্রিসের পক্ষও নিতে পারছে। ফ্রান্স ইতোমধ্যেই তুরস্ককে ব্যালান্স করতে গ্রিসকে সামরিক সহায়তাও দিচ্ছে। অপরদিকে রাশিয়ার উপর পশ্চিমা অবরোধের মাঝেও তুরস্ক রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝেও ন্যাটোর সদস্যদেশগুলির সাংঘর্ষিক লক্ষ্য সংস্থার ঐক্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
Showing posts with label Aegean Sea. Show all posts
Showing posts with label Aegean Sea. Show all posts
Thursday, 15 September 2022
তুরস্ক ও গ্রিসের মাঝে উত্তেজনা কোন দিকে যাচ্ছে?
Labels:
Aegean Sea,
EU,
France,
Geopolitics,
Greece,
New World Order,
Russia,
Turkey,
Ukraine War,
USA
Saturday, 19 September 2020
গ্রীস ও তুরস্কের দ্বন্দ্ব ইউরোপিয়দের শক্তি প্রদর্শনেরই ফলাফল
১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২০
১৮ই সেপ্টেম্বর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান ঘোষণা দেন যে, তুরস্ক প্রস্তুত রয়েছে গ্রীসের নেতৃত্বের সাথে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তেল গ্যাস আহরণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা প্রসমণে আলোচনা করতে। গত কয়েক মাস ধরেই ন্যাটোর দুই সদস্য প্রতিবেশী এই দেশগুলি দ্বন্দ্বের উপর ভরত করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ঘনঘন সামরিক মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে এরদোগান বলেন যে, বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দুই পক্ষ কি নিয়ে আলোচনা করবে এবং কোন কাঠামোর মাঝে এই আলোচনা হবে। তিনি আরও বলেন যে, তিনি মধ্যস্ততাকারী দেশগুলিকে জানিয়েছেন যে, দুই দেশের মাঝে সুসম্পর্ক থাকলে আলোচনা হতে পারে। ভিডিওকনফারেন্সিংএর মাধ্যমে বা তৃতীয় কোন দেশে এই আলোচনা হতে পারে। ‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, দুই দেশের মাঝে গত মাস থেকে উত্তেজনা শুরু হয়, যখন তুরস্ক তার সার্ভে জাহাজ ‘ওরুচ রাইস’কে গ্রীক দ্বীপ কাস্তেলোরিতসোর কাছাকাছি সমুদ্রের বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে নৌবাহিনীর প্রহরায় পাঠায়। এক মাস সমুদ্রে কাজ করার পর গত ১৩ই সেপ্টেম্বর জাহাজটা বন্দরে ফিরে যায় মেইনটেন্যান্স এবং জ্বালানির জন্যে। এরদোগান বলেন যে, যদি ‘ওরুচ রাইস’কে তুরস্ক বন্দরে ফেরত নিয়ে আসে, তাহলে নিশ্চয়ই এর একটা অর্থ রয়েছে। তুরস্ক চাইছে আলোচনাকে একটা সুযোগ দিতে। তবে জাহাজটার মিশন শেষ হয়ে গিয়েছে, এটা বলা যাবে না। এরদোগানের কথাগুলি এমন সময়ে এলো, যখন তুর্কি এবং গ্রীক সামরিক নেতৃবৃন্দ ন্যাটোর মধ্যস্ততায় ব্রাসেলসে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। চেক রাজধানী প্রাগে গ্রীসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোস দেনদিয়াস বলেন যে, তুরস্ক তার উস্কানিমূলক কর্মকান্ড থামালে গ্রীস অবশ্যই তুরস্কের সাথে আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক। তবে তুরস্কের ড্রিলিং জাহাজ ‘ইয়াভুজ’ অক্টোবরের ১২ তারিখ পর্যন্ত সাইপ্রাসের অদূরে ড্রিলিংএর কাজ চালিয়ে যাবে, যদিও ইউরোপিয়রা এই কাজের ঘোর বিরোধী। তুরস্ক কেনই বা শক্তি প্রদর্শনের পথে এগুলো এবং কেনইবা আবার আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হলো?
তুরস্কের সাথে গ্রীসের এই দ্বন্দ্বে ফ্রান্স ইতোমধ্যেই গ্রীসের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধজাহাজ এবং যুদ্ধবিমান প্রেরণ করেছে। ইউরোপিয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলিও তুরস্কের বিরুদ্ধে অবরোধের হুমকি দিচ্ছে। গ্রীসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেনদিয়াস বলছেন যে, গ্রীস চাইছে তাদের ইইউএর বন্ধুরা তুরস্কের বিরুদ্ধে কি কি ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেটার একটা খসরা তৈরি করুক, যা কিনা তুরস্কের জন্যে একটা উদাহরণ হিসেবে থাকবে যে, বেআইনী কাজ করলে কি ধরনের অবরোধ আসতে পারে। তবে অপরদিকে এরদোগান বলছেন যে, তুরস্ককে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করতে ব্যর্থ হবার পরই গ্রীস আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। তুরস্কের উপর সকল হুমকি বিফল হয়েছে।
গ্রীস বলছে যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গ্রীসের প্রতিটা দ্বীপের চারিদিকে আঞ্চলিক সাগর এবং ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ গ্রীসের পাওনা। অপরদিকে তুরস্ক বলছে যে, গ্রীস ইউরোপিয় দেশগুলির চাপে তুরস্কের উপর চাপ সৃষ্টি করতেই তুরস্কের পাওনা সমুদ্রাঞ্চলকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করতে চাইছে। গ্রীসের অনেকগুলি দ্বীপ তুরস্কের উপকূলের একেবারে কাছে থাকায় গ্রীসের দাবি অনুসারে তুরস্কের উপকূলের বেশিরভাগ অঞ্চলই তুরস্কের অধীনে থাকছে না। এতে তুরস্ক ইজিয়ান সাগর এবং ভূমধ্যসাগরে খনিজ আহরণ থেকেই শুধু বঞ্চিত হবে না, তুরস্কের নৌবাহিনী ইজিয়ান সাগরে অপারেট করার নূন্যতম অধিকারও হারাবে, যা কিনা কৌশলগত দিক থেকে তুরস্কের সক্ষমতাকে একবারেই সংকীর্ণ করে ফেলবে। এই পরিস্থিতি কি করে তৈরি হলো, তা বুঝতে হলে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বর্তমান গ্রীসের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।
১৮৩২ সালে ইউরোপিয়দের সামরিক সহায়তায় গ্রীস উসমানি খিলাফত থেকে আলাদা হয়ে নতুন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। সেই সীমানায় উত্তর গ্রীসের থেসালি, এপিরাস, মেসিডোনিয়া এবং থ্রেস অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ইজিয়ান সাগরের পূর্ব দিকের বেশিরভাগ দ্বীপও সেই সীমানার মাঝে পড়েনি। ক্রীট এবং সাইপ্রাসও ছিল না; দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জও ছিল না। বর্তমান তুরস্কের উপকূলে অবস্থিত থাসস, লিমনস, সামোথরাকি, লেসবস, চিয়স, সারা, সামোস, আর্মেনিসটিস দ্বীপগুলিও গ্রীসের ছিল না। এই সবগুলি দ্বীপই বর্তমান গ্রীস-তুরস্কের সমুদ্রসীমা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৯৭ সালে স্থলযুদ্ধে গ্রীসের পরাজয় হলেও ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে ক্রীট দ্বীপ উসমানি খিলাফত থেকে আলাদা হয়ে গ্রীসের সাথে যুক্ত হয়। ১৯১১-১২ সালে ইতালি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। এই দ্বীপগুলির মাঝে রয়েছে রোডস, কস, পাতমোস, এবং আরও ১২টা প্রধান দ্বীপ। ১৯২৩ সালে এই দ্বীপগুলিকে গ্রীসের হাতে তুলে দেয়া হয়। ১৯১২ সালের ডিসেম্বরে ‘এলি’র যুদ্ধে ইউরোপিয় সমর্থনপুষ্ট গ্রীক নৌবাহিনী উসমানি নৌবাহিনীকে পরাজিত করে ইজিয়ান সাগরে লেসবস, চিয়স, লেমনস এবং সামোস দ্বীপ দখল করে ফেলে। ১৯১৫-১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ-ফরাসী নৌবাহিনী কাস্তেলোরিতসো দ্বীপ দখল করে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে পুরো দোদেকানিজ ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। ১৯৪৭ সালে ইতালির সাথে সাক্ষরিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শান্তি চুক্তি মোতাবেক দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ গ্রীসকে দিয়ে দেয়া হয়। এর মাঝে কাস্তেলোরিতসো দ্বীপও ছিল। ১৮৭৮ সালের রাশিয়ার সাথে যুদ্ধের পর উসমানিরা ইস্তাম্বুলকে মুক্ত রাখতে ব্রিটেনকে সাইপ্রাসে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে দেয়। তবে দ্বীপের মালিকানা তখনও উথমানিদের হাতেই থাকে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানিরা জার্মানির পক্ষে যোগ দিলে ব্রিটেন অফিশিয়ালি সাইপ্রাস নিজের দখলে নিয়ে নেয়। ১৯৬০ সালে ব্রিটেন সাইপ্রাসকে স্বাধীন বলে স্বীকৃতি দেয়। তবে সেখানে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলি থেকেই যায়।
বর্তমান গ্রীস তৈরিই হয়েছে ইউরোপিয়দের শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। এখন পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুর্কিরা সেই পথেই এগুবার চেষ্টা করছে। কিন্তু নিজেদের কাছ থেকে দখল করা দ্বীপগুলিকে তুর্কিরা শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফেরত পাবার সাহস দেখাতে পারবে কি? গ্রীকরা তাদের স্বাধীনতা পেতে ইউরোপিয়দের উপর নির্ভর করেছিল; তুরস্কের সাথে যেকোন সম্ভাব্য যুদ্ধে গ্রীস তাদের সহায়তাই চাইবে। ইউরোপিয় মধ্যস্ততায় তুর্কিদের সাথে গ্রীসের আলোচনা শক্তি ব্যবহারের পথে বাধাগুলিকেই দেখিয়ে দেয়। গ্রীস তৈরি হবার পর সীমানা নির্ধারণের যে আইনগুলিকে তুরস্ক মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল, সেই আইন অমান্য করাটাই এখন জাতিরাষ্ট্র তুরস্কের জন্যে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।
১৮ই সেপ্টেম্বর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান ঘোষণা দেন যে, তুরস্ক প্রস্তুত রয়েছে গ্রীসের নেতৃত্বের সাথে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তেল গ্যাস আহরণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা প্রসমণে আলোচনা করতে। গত কয়েক মাস ধরেই ন্যাটোর দুই সদস্য প্রতিবেশী এই দেশগুলি দ্বন্দ্বের উপর ভরত করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ঘনঘন সামরিক মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে এরদোগান বলেন যে, বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দুই পক্ষ কি নিয়ে আলোচনা করবে এবং কোন কাঠামোর মাঝে এই আলোচনা হবে। তিনি আরও বলেন যে, তিনি মধ্যস্ততাকারী দেশগুলিকে জানিয়েছেন যে, দুই দেশের মাঝে সুসম্পর্ক থাকলে আলোচনা হতে পারে। ভিডিওকনফারেন্সিংএর মাধ্যমে বা তৃতীয় কোন দেশে এই আলোচনা হতে পারে। ‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, দুই দেশের মাঝে গত মাস থেকে উত্তেজনা শুরু হয়, যখন তুরস্ক তার সার্ভে জাহাজ ‘ওরুচ রাইস’কে গ্রীক দ্বীপ কাস্তেলোরিতসোর কাছাকাছি সমুদ্রের বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে নৌবাহিনীর প্রহরায় পাঠায়। এক মাস সমুদ্রে কাজ করার পর গত ১৩ই সেপ্টেম্বর জাহাজটা বন্দরে ফিরে যায় মেইনটেন্যান্স এবং জ্বালানির জন্যে। এরদোগান বলেন যে, যদি ‘ওরুচ রাইস’কে তুরস্ক বন্দরে ফেরত নিয়ে আসে, তাহলে নিশ্চয়ই এর একটা অর্থ রয়েছে। তুরস্ক চাইছে আলোচনাকে একটা সুযোগ দিতে। তবে জাহাজটার মিশন শেষ হয়ে গিয়েছে, এটা বলা যাবে না। এরদোগানের কথাগুলি এমন সময়ে এলো, যখন তুর্কি এবং গ্রীক সামরিক নেতৃবৃন্দ ন্যাটোর মধ্যস্ততায় ব্রাসেলসে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। চেক রাজধানী প্রাগে গ্রীসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোস দেনদিয়াস বলেন যে, তুরস্ক তার উস্কানিমূলক কর্মকান্ড থামালে গ্রীস অবশ্যই তুরস্কের সাথে আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক। তবে তুরস্কের ড্রিলিং জাহাজ ‘ইয়াভুজ’ অক্টোবরের ১২ তারিখ পর্যন্ত সাইপ্রাসের অদূরে ড্রিলিংএর কাজ চালিয়ে যাবে, যদিও ইউরোপিয়রা এই কাজের ঘোর বিরোধী। তুরস্ক কেনই বা শক্তি প্রদর্শনের পথে এগুলো এবং কেনইবা আবার আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হলো?
তুরস্কের সাথে গ্রীসের এই দ্বন্দ্বে ফ্রান্স ইতোমধ্যেই গ্রীসের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধজাহাজ এবং যুদ্ধবিমান প্রেরণ করেছে। ইউরোপিয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলিও তুরস্কের বিরুদ্ধে অবরোধের হুমকি দিচ্ছে। গ্রীসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেনদিয়াস বলছেন যে, গ্রীস চাইছে তাদের ইইউএর বন্ধুরা তুরস্কের বিরুদ্ধে কি কি ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেটার একটা খসরা তৈরি করুক, যা কিনা তুরস্কের জন্যে একটা উদাহরণ হিসেবে থাকবে যে, বেআইনী কাজ করলে কি ধরনের অবরোধ আসতে পারে। তবে অপরদিকে এরদোগান বলছেন যে, তুরস্ককে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করতে ব্যর্থ হবার পরই গ্রীস আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। তুরস্কের উপর সকল হুমকি বিফল হয়েছে।
গ্রীস বলছে যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গ্রীসের প্রতিটা দ্বীপের চারিদিকে আঞ্চলিক সাগর এবং ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ গ্রীসের পাওনা। অপরদিকে তুরস্ক বলছে যে, গ্রীস ইউরোপিয় দেশগুলির চাপে তুরস্কের উপর চাপ সৃষ্টি করতেই তুরস্কের পাওনা সমুদ্রাঞ্চলকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করতে চাইছে। গ্রীসের অনেকগুলি দ্বীপ তুরস্কের উপকূলের একেবারে কাছে থাকায় গ্রীসের দাবি অনুসারে তুরস্কের উপকূলের বেশিরভাগ অঞ্চলই তুরস্কের অধীনে থাকছে না। এতে তুরস্ক ইজিয়ান সাগর এবং ভূমধ্যসাগরে খনিজ আহরণ থেকেই শুধু বঞ্চিত হবে না, তুরস্কের নৌবাহিনী ইজিয়ান সাগরে অপারেট করার নূন্যতম অধিকারও হারাবে, যা কিনা কৌশলগত দিক থেকে তুরস্কের সক্ষমতাকে একবারেই সংকীর্ণ করে ফেলবে। এই পরিস্থিতি কি করে তৈরি হলো, তা বুঝতে হলে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বর্তমান গ্রীসের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।
১৮৩২ সালে ইউরোপিয়দের সামরিক সহায়তায় গ্রীস উসমানি খিলাফত থেকে আলাদা হয়ে নতুন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। সেই সীমানায় উত্তর গ্রীসের থেসালি, এপিরাস, মেসিডোনিয়া এবং থ্রেস অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ইজিয়ান সাগরের পূর্ব দিকের বেশিরভাগ দ্বীপও সেই সীমানার মাঝে পড়েনি। ক্রীট এবং সাইপ্রাসও ছিল না; দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জও ছিল না। বর্তমান তুরস্কের উপকূলে অবস্থিত থাসস, লিমনস, সামোথরাকি, লেসবস, চিয়স, সারা, সামোস, আর্মেনিসটিস দ্বীপগুলিও গ্রীসের ছিল না। এই সবগুলি দ্বীপই বর্তমান গ্রীস-তুরস্কের সমুদ্রসীমা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৯৭ সালে স্থলযুদ্ধে গ্রীসের পরাজয় হলেও ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে ক্রীট দ্বীপ উসমানি খিলাফত থেকে আলাদা হয়ে গ্রীসের সাথে যুক্ত হয়। ১৯১১-১২ সালে ইতালি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। এই দ্বীপগুলির মাঝে রয়েছে রোডস, কস, পাতমোস, এবং আরও ১২টা প্রধান দ্বীপ। ১৯২৩ সালে এই দ্বীপগুলিকে গ্রীসের হাতে তুলে দেয়া হয়। ১৯১২ সালের ডিসেম্বরে ‘এলি’র যুদ্ধে ইউরোপিয় সমর্থনপুষ্ট গ্রীক নৌবাহিনী উসমানি নৌবাহিনীকে পরাজিত করে ইজিয়ান সাগরে লেসবস, চিয়স, লেমনস এবং সামোস দ্বীপ দখল করে ফেলে। ১৯১৫-১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ-ফরাসী নৌবাহিনী কাস্তেলোরিতসো দ্বীপ দখল করে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে পুরো দোদেকানিজ ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। ১৯৪৭ সালে ইতালির সাথে সাক্ষরিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শান্তি চুক্তি মোতাবেক দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ গ্রীসকে দিয়ে দেয়া হয়। এর মাঝে কাস্তেলোরিতসো দ্বীপও ছিল। ১৮৭৮ সালের রাশিয়ার সাথে যুদ্ধের পর উসমানিরা ইস্তাম্বুলকে মুক্ত রাখতে ব্রিটেনকে সাইপ্রাসে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে দেয়। তবে দ্বীপের মালিকানা তখনও উথমানিদের হাতেই থাকে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানিরা জার্মানির পক্ষে যোগ দিলে ব্রিটেন অফিশিয়ালি সাইপ্রাস নিজের দখলে নিয়ে নেয়। ১৯৬০ সালে ব্রিটেন সাইপ্রাসকে স্বাধীন বলে স্বীকৃতি দেয়। তবে সেখানে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলি থেকেই যায়।
বর্তমান গ্রীস তৈরিই হয়েছে ইউরোপিয়দের শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। এখন পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুর্কিরা সেই পথেই এগুবার চেষ্টা করছে। কিন্তু নিজেদের কাছ থেকে দখল করা দ্বীপগুলিকে তুর্কিরা শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফেরত পাবার সাহস দেখাতে পারবে কি? গ্রীকরা তাদের স্বাধীনতা পেতে ইউরোপিয়দের উপর নির্ভর করেছিল; তুরস্কের সাথে যেকোন সম্ভাব্য যুদ্ধে গ্রীস তাদের সহায়তাই চাইবে। ইউরোপিয় মধ্যস্ততায় তুর্কিদের সাথে গ্রীসের আলোচনা শক্তি ব্যবহারের পথে বাধাগুলিকেই দেখিয়ে দেয়। গ্রীস তৈরি হবার পর সীমানা নির্ধারণের যে আইনগুলিকে তুরস্ক মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল, সেই আইন অমান্য করাটাই এখন জাতিরাষ্ট্র তুরস্কের জন্যে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।
Labels:
Aegean Sea,
EU,
Europe,
Geopolitics,
Greece,
Mediterranean Sea,
Turkey
Subscribe to:
Posts (Atom)

