Thursday, 19 October 2023

অস্তিত্ব সংকটে ইস্রাইল!

২০শে অক্টোবর ২০২৩

গাজা থেকে রকেট ছোঁড়া হচ্ছে ইস্রাইলের দিকে। সাত দশকেও ইস্রাইলিরা ফিলিস্তিনিদেরকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা বুদ্ধিমত্তা, পরিকল্পনা ও কর্মসম্পাদনে ইস্রাইলের প্রযুক্তিগত উতকর্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ইস্রাইলিদের মাঝে প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক - এই সংঘাতের শেষ কি আদৌ সম্ভব? অথবা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইস্রাইলের বিজয় কি আদৌ সম্ভব কিনা?

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে থাকবে। সেদিন সকালে ফিলিস্তিনিরা গাজা উপত্যকা থেকে বের হয়ে এসে দখলদার ইস্রাইলি বাহিনীর উপর হামলা করে বসে এবং ইস্রাইলের ব্যাপারে বহুদিন ধরে তৈরি করা কল্পকাহিনীগুলিকে মিথ্যা প্রমাণ করে। প্রথম কয়েকদিন ধরে পশ্চিমা মিডিয়াতে হামলার ভিডিওগুলি সম্পূর্ণ দেখানো হচ্ছিলো না; কারণ সেখানে ইস্রাইলি বাহিনীর উপর হামলার পদ্ধতিকে সুন্দরভাবে দেখিয়ে দেয়া হচ্ছিলো। তবে একসময় আরব টিভি চ্যানেলগুলিতে এই ভিডিওগুলি ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়লে পশ্চিমা মিডিয়াগুলিও ধীরে ধীরে পুরো ভিডিও দেখাতে থাকে। এর মাঝে আবার ইস্রাইল লবির লোকেরা সোশাল মিডিয়াতে এই ভিডিওগুলির বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে সেগুলির ছড়িয়ে পড়াকে কিছুটা হলেও আটকাবার চেষ্টা করে। পশ্চিমা মিডিয়া ফিলিস্তিনের এই হামলাকে শুধুমাত্র হামাসের হামলা বললেও যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, এখানে হামাস ছাড়াও পুরো গাজাবাসী জড়িত ছিল। স্বতস্ফূর্ত সমর্থন ছাড়া একটা রাজনৈতিক দলের পক্ষে এহেন হামলা সম্ভব ছিল না। কারণ ১৮ই অক্টোবর পর্যন্ত ইস্রাইলি পাশবিক হামলায় সাড়ে ৩ হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যু ঘটলেও ফিলিস্তিনিদের মাঝে হাল ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়নি।

হামলার কারণ এবং সময় হিসেবে অনেকেই ধারণা করছেন সৌদি-ইস্রাইল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া। কারণ সৌদিদের আগে ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বাকি দেশগুলিও ‘আব্রাহাম একর্ড’এর মাধ্যমে মার্কিন মধ্যস্ততায় ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে ফেলেছে। একসময় এটা একটা সমঝোতা ছিল যে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি ইস্রাইলকে স্বীকৃতি দেবে না। কিন্তু সৌদিরাও যখন ইস্রাইলের সাথে মিলে যাচ্ছিলো, তখন এটা পরিষ্কার হচ্ছিলো যে, আরবরা ফিলিস্তিনকে বিক্রি করে দিয়েছে। হামাস বলছে যে, ফিলিস্তিন সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার টেবিল থেকে হারিয়ে যাচ্ছিলো। আরও একটা অতিরিক্ত লক্ষ্য হয়তো হামাসের থাকতে পারে; তা হলো, ইস্রাইলের কারাগারে থাকা প্রায় ৬ হাজার রাজবন্দীর মুক্তি; যাদের মাঝে কিছু ব্যক্তিকে ৪০ বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে। হয়তো দু’শ ইস্রাইলি বন্দীর বিনিময়ে তাদেরকে ফেরত পেতে চাইতে পারে হামাস। এর আগে ২০১১ সালে একজন ইস্রাইলি সেনার বিনিময়ে কয়েক’শ ফিলিস্তিনি কয়েদিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল ইস্রাইল। এর মূল কারণ হলো ইস্রাইলের সেনাবাহিনী হলো গণবাহিনী; যেখানে পেশাদার সেনার সংখ্যা খুবই কম। বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে সার্ভিস দিতে আসা সেনার পরিবার সর্বদাই আশা করে যে সরকার যুদ্ধবন্দীদের যেকোন মূল্যে ফেরত আনবে। এটা না করলে সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকাই দায় হয়ে যাবে।

ব্যর্থ ইস্রাইলের ইন্টেলিজেন্স এবং সামরিক বাহিনী

যে ব্যাপার নিশ্চিত তা হলো, হামাসের এই পরিকল্পনা দুই বছরের। ২০২১ সালের মে মাসে গাজা যুদ্ধের সময় হামাস ইস্রাইলের ‘আয়রন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ সক্ষমতার একটা ধারণা করে ফেলে। খুব সম্ভবতঃ তখনই তারা নিশ্চিত হয়ে যায় যে, ইস্রাইলকে পরাজিত করা সম্ভব। একারণেই এবারের হামলার শুরুটা হয় ৩০ মিনিটে ৫ হাজার রকেট ছোঁড়ার মাধ্যমে; যার বেশিরভাগই ‘আয়রন ডোম’ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। হামাসের সশস্ত্র বিভাগ ‘ইজ্জাদ্দিন আল-কাসাম ব্রিগেড’এর সদস্যরা দুই বছর ধরে ট্রেনিং নিয়েছে। হামাসের ট্রেনিং ভিডিওগুলিতে দেখা যায় যে, তারা ইস্রাইলের লোহার বেড়াগুলি ভেঙ্গে তার মাঝ দিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে যাবার জন্যে প্রস্তুতি নিয়েছে এবং শহরাঞ্চলে ঘর থেকে ঘরে হামলা করে শত্রুদের পরাস্ত করার ব্যাপারেও ট্রেনিং নিয়েছে। প্যারা গ্লাইডার ব্যবহার করে দেয়ালের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে ইস্রাইলি অঞ্চলে ঢুকে পড়ার ট্রেনিংও ছিল এর মাঝে। হামাসের নেভাল কমান্ডোরা বেশ কয়েক বছর ধরেই ইস্রাইলের উপকূলে ঢুকে পড়ার অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছিলো; যেখানে তারা কিছু ক্ষেত্রে সফল বা কিছু ক্ষেত্রে বিফলও হয়েছিল। তবে যে ব্যাপারটা নতুন ছিল তা হলো, কোয়াডকপ্টার ড্রোনের মাধ্যমে ছোট বোমা ফেলে ইস্রাইলি ওয়াচটাওয়ারের উপর গোয়েন্দা ক্যামেরাগুলিকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা। ৭ই অক্টোবরের হামাসের ভিডিওতে দেখা যায় যে, বিকল করে ফেলা ওয়াচটাওয়ারের দিকে ছুটছে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা; কারণ সেই অঞ্চলে ইস্রাইলিরা কিছু সময়ের জন্যে অন্ধ হয়ে গেছে। সমস্যা হওয়া অঞ্চলে ছুটে আসা টহলরত ‘মেরকাভা মার্ক-৪’ ট্যাংকের উপর কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে মর্টার শেল ফেলে সেটাকে পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করে ফেলা হয়। ‘মেরকাভা-৪’এর বর্ম যে উপরের দিকে কতটা দুর্বল, তা এই ঘটনায় পরিষ্কার হয়ে যায়। যেকারণে ইস্রাইল এখন সকল ট্যাঙ্কের উপরে খাঁচা স্থাপন করছে; যাতে করে ট্যাঙ্কগুলিকে ড্রোনের আক্রমণ থেকে বাঁচানো যায়।

সাত দশকেও ইস্রাইলিরা ফিলিস্তিনিদেরকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৪৮ সালে ৭ লক্ষের বেশি ফিলিস্তিনিকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়ার পর ইস্রাইলিরা মনে করেছিলো যে, ফিলিস্তিনিরা হয় ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যাবে অথবা ইস্রাইলের বশ্যতা স্বীকার করে নেবে; ফিলিস্তিনি ছেলেরা পড়াশোনার অভাবে ও কর্মহীনতায় মাদকাসক্ত হয়ে পড়বে। সেটা হয়নি। এরপর ইস্রাইলিরা ফিলিস্তিনি পুরুষদেরকে কারাগারে পুরে মনে করেছিলো যে, ফিলিস্তিনি আন্দোলনের এটাই বুঝি শেষ। কিন্তু ১৯৮৭ সালের ইন্তিফাদার সময় শিশু এবং মহিলারাও রাস্তায় নেমে ইস্রাইলকে ভুল প্রমাণ করেছিলো। মোসাদ যথারীতি ব্যর্থ ছিলো কোনরূপ আগাম সতর্কতা দিতে। ইস্রাইলিরা গুড়িয়ে দিলো ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর। প্রত্যুত্তরে ফিলিস্তিনিরা হাজির হলো রকেট নিয়ে। দ্বিতীয় ইন্তিফাদাও হলো ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত; যেখানে চার বছরে এক হাজার ইস্রাইলি প্রাণ হারালো। ইস্রাইলিরা উঁচু দেয়াল তুলে দিলো। জবাবে ফিলিস্তিনিরা দেয়ালের নিচ দিয়ে সুরঙ্গ খুঁড়লো। সাত দশক পর ২০২৩ সালে সবচাইতে বড় হামলা এলো গাজা থেকে। ইস্রাইলের যেকোন শহর এখন রকেটের পাল্লার ভেতরে। ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা বুদ্ধিমত্তা, পরিকল্পনা ও কর্মসম্পাদনে ইস্রাইলের প্রযুক্তিগত উতকর্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ইস্রাইলিদের মাঝে প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক - এই সংঘাতের শেষ কি আদৌ সম্ভব? অথবা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইস্রাইলের বিজয় কি আদৌ সম্ভব কিনা?

‘মেরকাভা মার্ক-৪’ ট্যাংকের উপর কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে মর্টার শেল ফেলে সেটাকে পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করে ফেলা হয়। ‘মেরকাভা-৪’এর বর্ম যে উপরের দিকে কতটা দুর্বল, তা এই ঘটনায় পরিষ্কার হয়ে যায়। ইস্রাইলের দুর্বলতাগুলি আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের হামলা প্রমাণ করেছে যে, ইস্রাইল কোন অজেয় শক্তি নয়; যা ইস্রাইলকে নিরাপত্তা দিতে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের মাধ্যমে প্রমাণিত।


ভয় পেয়েছে ইস্রাইলিরা

ইস্রাইলের সরকারি হিসেবে ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত ১৪’শ ইস্রাইলি নিহত হয়েছে। ১৯শে অক্টোবর সকাল পর্যন্ত ৩’শ ৬৩ জন সামরিক এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছে। ৩ জন কর্নেলের মাঝে ছিলেন রোই লেভি; যিনি ইস্রাইলের ‘ঘোস্ট ইউনিট’ বলে খ্যাত ‘মাল্টিডোমেইন ইউনিট’ নামের স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডার ছিলেন। এছাড়াও ৪ জন লেঃ কর্নেল, ২১ জন মেজর, ১৮ জন ক্যাপ্টেন, ১৭ জন লেফটেন্যান্ট ছিল মৃতদের মাঝে। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইস্রাইলিরা তাদের নিজেদের এত মৃতদেহ দেখেনি। ইস্রাইলের ‘হারেতস’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বহু ইস্রাইলি ভয়ে প্লেনের টিকেট কেটেছে পালিয়ে যাবার জন্যে। ইস্রাইলে কেউ কেউ হতাশা নিয়ে বলছেন যে, সাত দশকেও এই দেশ তাদেরকে শান্তি ও নিরাপত্তা দিতে পারেনি; এর চাইতে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়াই ভালো। ইস্রাইল নিজেকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন দেশে থাকা ইহুদীদেরকে ইস্রাইলে এসে বসবাস করার জন্যে অনুপ্রাণিত করেছে সর্বদা। কিন্তু ইস্রাইল প্রতিষ্ঠার সাত দশক পরেও নিরাপত্তাহীনতা অনেকের জন্যেই পীড়াদায়ক ঠেকেছে।

এখানে একটা বড় ব্যাপার ছিল ফিলিস্তিনিদের মরণপণ টিকে থাকার সংগ্রাম। বিত্তশালী এবং সুবিধাভোগী ফিলিস্তিনিরা অনেক আগেই ফিলিস্তিন ছেড়ে পালিয়েছিলো। যারা রয়ে গিয়েছিলো, তাদের বিরুদ্ধেই ইস্রাইলি বাহিনী তাদের বর্বরতাকে টার্গেট করেছিল। ইস্রাইলিরা চাইছিলো যে, ফিলিস্তিনিরা যেন অত্যাচারিত হয়ে তাদের ভূমি ছেড়ে পালিয়ে যায়; তাহলে ইস্রাইল পুরো ভূমির দখল নিতে পারবে। কিন্তু কয়েক লক্ষ ফিলিস্তিনি মাটি কামড়ে পড়ে থাকে; ইস্রাইলি হামলায় তাদের পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুবরণ করার পরেও এবং ইস্রাইলিরা তাদের জীবনযাত্রা অস্বাভাবিক রকমের কষ্টকরা করে ফেলার পরেও তারা তাদের ভূমি ছেড়ে যায়নি। ফিলিস্তিন বলতে এখন শুধুই জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর এবং গাজা; বাকি পুরো ফিলিস্তিন এখন ইস্রাইলের দখলে। অস্ত্রের জোরে দখল করে নেয়া এই ভূমিতে ইস্রাইলিরা বসতি স্থাপন করেছে এবং ফিলিস্তিনিরা তাদের উপর হামলা করলে তারা বলছে যে, ফিলিস্তিনিরা সন্ত্রাসী এবং তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্ব যথারীতি ইস্রাইলকে পুরো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এবং ইস্রাইলের সকল কর্মকান্ডকে বৈধতা দান করছে। তবে আশ্চর্য্য ব্যাপার হলো, মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ এবং বিরাট সংখ্যক জনগণ এরপরেও পশ্চিমা দেশগুলিকে মানবাধিকার এবং সুবিচারের উদাহরণ হিসেবে দেখছে এবং তাদেরকে বন্ধু মনে করছে।

ইস্রাইলের নিরাপত্তা তার প্রতিবেশীদের হাতে!

তবে ইস্রাইলের নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব তার আশেপাশের আরব দেশগুলির হাতে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের বন্ধু এই দেশগুলি বিশাল সামরিক শক্তির মালিক হলেও তারা ইস্রাইলের বিরুদ্ধে সেই শক্তিকে ব্যবহার করবে না নীতিতে এগুচ্ছে। মূলতঃ পশ্চিমাদের ইশারাতেই তাদের এই নীতি। ইস্রাইলের সাথে বন্ধুত্বের পুরষ্কারস্বরূপ মিশর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং ট্যাংক পেয়েছে। ‘গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার’এর হিসেবে মিশর বিশ্বের ১৪তম শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং ইস্রাইলের তুলনায় মিশরের শক্তি যথেষ্টই বেশি। এর সাথে জর্ডান যোগ হলে ইস্রাইলের জন্যে যেকোন যুদ্ধে জেতা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ইস্রাইল সবগুলি যুদ্ধে জিতেছে - এই ছুতো দেখিয়ে এই দেশগুলির নেতৃত্ব ইস্রাইলের সাথে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকে। শুধু তা-ই নয়, এবার ফিলিস্তিনি হামলার আগে মিশর ইস্রাইলকে আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছিল বলে খবর বেরিয়ে এসেছে। এতে পরিষ্কার হয় যে, মিশরের সরকার প্রকৃতপক্ষে কাদের বন্ধু। ইস্রাইলের অনুমতি না পেয়ে ১৯শে অক্টোবর পর্যন্ত মিশর গাজার সাথে সীমান্ত বন্ধ করে রেখেছিল। এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ইশারাতেই মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাল এল-সিসি গাজার সীমান্ত খুলে দিতে রাজি হন। অপরদিকে লেবানন এবং জর্ডানে জনগণ ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভ করলে সেই দেশের পুলিশ জনগণের উপর হামলা করে প্রমাণ করে যে, তারা শুধু ইস্রাইলের বন্ধুই নয়, বরং মার্কিনী এবং ইস্রাইলিদের আজ্ঞাবহও বটে।

ইস্রাইল তার নিরাপত্তার জন্যে আশেপাশের দেশগুলির উপর কতটা নির্ভরশীল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ইস্রাইলের সেনাবাহিনীর ফর্মেশনের দিকে তাকালে। ইস্রাইলি সেনাবাহিনীর একটা প্লাটুনে রয়েছে মাত্র দু’টা ট্যাংক; যেখানে বাকি দেশগুলিতে ট্যাংক প্লাটুনে রয়েছে ৩ থেকে ৪টা করে ট্যাংক। একটা ট্যাংক কোম্পানিতে যেখানে ১২ থেকে ১৪টা ট্যাংক থাকার কথা, সেখানে ইস্রাইল রেখেছে ১০টা করে। আর একটা ট্যাংক ব্যাটালিয়নে তিনটা কোম্পানির স্থলে ইস্রাইল রেখেছে মাত্র দু’টা। এর ফলে যেখানে বাকি সকল দেশের ট্যাংক ব্যাটালিয়নে ট্যাংক থাকে ৪০ থেকে ৫০টা, সেখানে ইস্রাইলের ট্যাংক ব্যাটালিয়নে ট্যাংক থাকে মাত্র ২২টা। এর কারণ একটাই - হামাস বা হিযবুল্লাহর সাথে যুদ্ধ করতে তো একটা প্লাটুনে দু’টা বা একটা ব্যাটালিয়নে ২২টার বেশি ট্যাংক দরকার হবে না। অর্থাৎ ইস্রাইলের সেনাবাহিনী কোন রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নয়।
 

পশ্চিম তীরের রামাল্লা শহরে গাজার সমর্থনে বিক্ষোভে ফিলিস্তিনি পুলিশের রায়ট কারের ধাওয়া। শুধু প্রতিবেশী দেশগুলিই নয়; ইস্রাইল ফিলিস্তিনিদেরকেও বিভক্ত করে রেখেছে, যাতে করে এক ফিলিস্তিনি অন্য ফিলিস্তিনির সহায়তায় এগিয়ে না আসে। ইস্রাইলের এই পরিকল্পনাকে বাস্তবতা দিচ্ছে মাহমুদ আব্বাসের ফিলিস্তিন সরকার।

শুধু প্রতিবেশী দেশগুলিই নয়; ইস্রাইল ফিলিস্তিনিদেরকেও বিভক্ত করে রেখেছে, যাতে করে এক ফিলিস্তিনি অন্য ফিলিস্তিনির সহায়তায় এগিয়ে না আসে। একসময় ইয়াসির আরাফাতের ফাতাহ পার্টির জনপ্রিয়তাকে বিভক্ত করতে ইস্রাইল হামাসকে উঠতে দিয়েছে। এরপর ২০০০ সালের পর দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় ইস্রাইল পশ্চিম তীরে হামাসের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করেছে; যাতে করে পশ্চিম তীরে শুধু ফাতাহ থাকে; আর গাজায় থাকে শুধুই হামাস। মোসাদ এবং সিআইএতে অনেকেই হামাসকে সহায়তা দেয়ার বিরোধী ছিল। তবে ইস্রাইলিরা তাদের নীতি চালিয়ে নেয় ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। ইস্রাইল সর্বদাই ফিলিস্তিনের ইস্যুগুলিকে আলাদাভাবে টেবিলে নিয়ে আসে (যদিও আলোচনার ফলাফল সর্বদাই ছিল শূণ্য); যেমন, আল-আকসা ইস্যু, পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি ইস্যু, সীমানা ইস্যু, গাজা ইস্যু, অথবা অন্য কোন ইস্যু। প্রতিটা ইস্যুতে তারা ভিন্ন পক্ষের সাথে বসেছে এবং ফিলিস্তিনিদের মাঝে বিভেদ তৈরি করেছে। এর ফলশ্রুতিতে এখনও দেখা যায় যে, গাজাতে বোমা ফেলার সময় পশ্চিম তীরে খুব একটা বড় কোন ঘটনা ঘটছে না। ইস্রাইলের এই পরিকল্পনাকে বাস্তবতা দিচ্ছে মাহমুদ আব্বাসের ফিলিস্তিন সরকার। যেমন, পশ্চিম তীরে গাজার সমর্থনে বিক্ষোভে আব্বাসের পুলিশ বাহিনী হামলা চালিয়েছে।

ইস্রাইলের সেনাবাহিনী কোন পেশাদার বাহিনী নয়

ইস্রাইলের সামরিক বাহিনী মূলতঃ বাধ্যতামূলক সার্ভিসের উপর ভিত্তি করে গঠিত। সেখানে পেশাদার সেনার সংখ্যা খুবই কম। আর পার্ট-টাইম সেনা হবার কারণেই এই সেনাদের জীবনের নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে ইস্রাইল এতটা উদগ্রীব। ইস্রাইলি সেনাবাহিনীই একমাত্র সেনাবাহিনী, যারা ট্যাংক চ্যাসিসের উপর ভিত্তি করে আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার বা এপিসি তৈরি করে। এই এপিসির কাজ হলো শত্রুর গুলি থেকে নিজেদের সেনাদেরকে কিছুটা রক্ষা করা। একারণে বিশ্বের বেশিরভাগ এপিসি মেশিন গানের গোলা ঠেকাতে পারে। তবে এন্টি-ট্যাঙ্ক অস্ত্রের মুখে এগুলি একেবারেই তুচ্ছ। অপরদিকে ইস্রাইলের সেনাবাহিনীতে রয়েছে হেভি এপিসি - ‘আখজারিট’, ‘নাগমাশন’, ‘নাকপাদন’, ‘নামের’। এগুলি ৫২ টন থেকে শুরু করে ৬৪ টন পর্যন্ত ওজনের। এই বর্মাবৃত গাড়িগুলির চেহাড়া দেখলেও বোঝা যায় যে, এর ভেতর বসে থাকা সেনারা নিজেদের জীবন নিয়ে কতটা ভীত।
 

ইস্রাইলি সেনাবাহিনীর হেভি এপিসি 'নাগমাশন'। ইস্রাইলি সেনাবাহিনীই একমাত্র সেনাবাহিনী, যারা ট্যাংক চ্যাসিসের উপর ভিত্তি করে আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার বা এপিসি তৈরি করে। এগুলি ৫২ টন থেকে শুরু করে ৬৪ টন পর্যন্ত ওজনের। এই বর্মাবৃত গাড়িগুলির চেহাড়া দেখলেও বোঝা যায় যে, এর ভেতর বসে থাকা সেনারা নিজেদের জীবন নিয়ে কতটা ভীত।


ইস্রাইলি সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলির সেনাদের অভিজ্ঞতাও প্রশ্ন করার মতো। একেকটা ট্যাংক প্লাটুনে ৮জন করে সেনা থাকে; যাদের মাঝে একজনের অভিজ্ঞতা থাকে সর্বোচ্চ দুই থেকে ৪ বছর। কারণ তারা সেই মুহুর্তে সেনাবাহিনীতে তাদের সার্ভিসের একেবারে শেষের দিকে রয়েছেন। ইস্রাইলের সেনাবাহিনীতে কোন পেশাদার এনসিও নেই, যাদের অভিজ্ঞতা ৩২ মাসের বেশি। অপরদিকে অন্য যেকোন পেশাদার সেনাবাহিনীতে বেশিরভাগ এনসিওর অভিজ্ঞতা ১০ বছর বা এর চাইতে আরও অনেক বেশি হবে। ইস্রাইলের এই সেনাবাহিনীতে আবার রয়েছে রিক্রুটমেন্ট সমস্যা। ইস্রাইলের গোড়া ইহুদি বা হারেদি জনগোষ্ঠী জায়নিস্ট জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী নয়। তাই তারা সেনাবাহিনীতে সার্ভিস দিতে চায় না। তারা বলে যে, জায়নিস্টরা ইস্রাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে সমস্যা তৈরি করেছে; তাই তৈরি করা সমস্যা তাদেরই মেটানো উচিৎ। হারেদিদের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২ সাল নাগাদ প্রায় ১৩ লক্ষ বা ইস্রাইলের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশের বেশি হয়ে গেছে। এত বড় জনগোষ্ঠীকে সামরিক সার্ভিসের বাইরে রাখতে চাইছে না ইস্রাইল; তাই হারেদিদের সাথে রাষ্ট্রের চলছে দ্বন্দ্ব। রিক্রুটমেন্ট সমস্যা সমাধানে ইস্রাইল ব্যাপক হারে মহিলাদেরকে সামরিক বাহিনীতে নিচ্ছে। কিন্তু এর ফলশ্রুতিতে সামরিক বাহিনীতে নিয়মশৃংখলা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সেনাবাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ মহিলা সদস্য যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। পেশাদার সেনাবাহিনী না হওয়ায় এই বাহিনীতে মহিলা সদস্যদের সামরিক যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠাটা অস্বাভাবিক নয়। সোশাল মিডিয়াতে ইস্রাইলি মহিলা সামরিক সদস্যদের মুখরোচক পোস্টের বন্যাই এর কারণ।

এর বাইরেও ইস্রাইলের ইহুদি সমাজে রয়েছে ব্যাপক বর্ণবাদ। ইউরোপ থেকে আসা শ্বেতাঙ্গ ‘আশকেনাজি’ ইহুদিরা মূলতঃ ক্ষমতাধর এবং ধনী। অপরদিকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার অশ্বেতাঙ্গ ‘মিজরাহি’ ইহুদিরা গরীব এবং নিগৃহীত। রাষ্ট্র প্রথম থেকেই ইউরোপ থেকে আসা ইহুদিদেরকে আলাদা সুবিধা দিয়েছে; আর অশ্বেতাঙ্গ ইহুদীদেরকে প্রায় শরণার্থী শিবিরে রাখার মতো করে দেখাশোনা করেছে। সাত দশক একত্রে থাকার পরেও এই দুই গোত্রের ইহুদিদের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক কম। জনসংখ্যার মাত্র ১৫ শতাংশ এই দুই জনগোষ্ঠীর মিলিত প্রডাক্ট।

ভয় পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও

ইস্রাইলকে সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে দু’টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ করেছে; যা কিনা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায় না। ইস্রাইলি এবং মার্কিনী বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ইরান এবং হিযবুল্লাহর যুদ্ধে জড়াবার সম্ভাবনা খুবই কম; কারণ তারা কেউই সাম্প্রতিক সময়ে তাদের কষ্টার্জিত অবস্থানকে জ্বলাঞ্জলি দিতে চায় না। একারণেই তারা চাইছে গাজাতে ইস্রাইলের স্থল হামলা প্রতিরোধ করতে। কারণ স্থল হামলা হলে প্রাণহানি আরও বাড়বে এবং একইসাথে এই দেশগুলির সরকারগুলিও তাদের নিজস্ব জনগণের চাপের মাঝে পড়বে। ইরান এখনও তার পদক্ষেপকে হুমকির উপরেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। আর হিযবুল্লাহ তার দেড় লক্ষ রকেটকে মজুদে রেখে দিয়ে সীমান্তে ইস্রাইলি গোয়েন্দা ক্যামেরাগুলিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ছে। লেবাননের বাস্তবতাও হিযবুল্লাহর পদক্ষেপকে প্রভাবিত করবে। কারণ লেবানন খুবই বিভক্ত একটা রাষ্ট্র। হিযবুল্লাহ গাজা ইস্যুতে ইস্রাইলের সাথে যুদ্ধে জড়ালে লেবাননের বাকি গ্রুপগুলির সমর্থন তারা না-ও পেতে পারে। কারণ গাজা ইস্যুতে ইস্রাইলের পাল্টা বিমান হামলা নেয়ার মতো মানসিকতা সকলের নেই। ইস্রাইলও কৌশলগত কারণেই একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চাইবে না। তাই তারাও হিযবুল্লাহর সাথে সংঘাতকে সীমান্ত সংঘাতের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাইবে। কাজেই হিযবুল্লাহ এবং ইরানকে আপাততঃ ইস্রাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র মূল হুমকি মনে করছে না।

ইস্রাইলের গোঁড়া 'হারেদি' ইহুদিরা প্রতিবাদ করছে। তারা জায়নিস্ট জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী নয়। তাই তারা সেনাবাহিনীতে সার্ভিস দিতে চায় না। তারা বলে যে, জায়নিস্টরা ইস্রাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে সমস্যা তৈরি করেছে; তাই তৈরি করা সমস্যা তাদেরই মেটানো উচিৎ। ইস্রাইলের জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ এই 'হারেদি'রা সামরিক সার্ভিসে না আসায় মহিলাদের রিক্রুট করে সেনাবাহিনীর আকার ঠিক রাখা হচ্ছে।
 

যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ভয় পাচ্ছে যে, মুসলিম দেশগুলিতে কেউ কেউ তাদের জাতীয়তাবাদকে ভুলে গিয়ে তাদের ফিলিস্তিনি মুসলিম ভাইদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে। অর্থাৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলির সরকার পশ্চিমাদের আজ্ঞাবহ হলেও এই দেশগুলির সামরিক বাহিনীর কোন অংশ যদি নেতৃত্বের আদেশ অমান্য করে ব্যারাক থেকে বের হয়ে আসে, তাহলে ইস্রাইলের গণবাহিনীর জন্যে মহাবিপদ হাজির হবে। এই সম্ভাবনাকে আটকাতেই যুক্তরাষ্ট্র ইস্রাইলে সামরিক সহায়তা পাঠিয়েছে। প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করে নিচ্ছে যে, ইস্রাইলের সামরিক বাহিনী হুমকি মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়। এটা সত্যিই প্রথম বারের মতো ঘটলো।

মার্কিন চিন্তাবিদেরা সকলেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ইস্রাইলের ইন্টেলিজেন্স পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ হয়েছে হামলার পূর্বাভাস দিতে। একইসাথে ইস্রাইলের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে হামাসের পরিকল্পিত আক্রমণকেও অনেকে পেশাদার বাহিনীর কর্মকান্ডের সাথে তুলনা করেছেন। সিআইএর প্রাক্তন একজন ডিরেক্টর ধারণা করছেন যে, ফিলিস্তিনিদের মাঝে মোসাদের এজেন্ট হয়তো ‘কমপ্রোমাইজড’ হয়েছে; অর্থাৎ ধরা পড়ে তথ্যের সোর্স বন্ধ হয়ে গিয়েছে; অথবা ধরা পড়ার পর মোসাদকে ভুল তথ্য সরবরাহ করেছে। এতে হামাসের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স উইংএর প্রশংসা করতেই হয়। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন করছেন যে, ইস্রাইল কি নিশ্চিত যে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে তারা গাজার ভেতর প্রবেশ করবে? ইস্রাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তো বলেছেন যে, তিনি হামাসকে ধ্বংস করবেন। কিন্তু সেটা কিভাবে হবে সেব্যাপারে তিনি কতটা নিশ্চিত? আবার হামাসের হাতে ফিলিস্তিনিদের যে ‘শ’দুয়েক বন্দী রয়েছে, তাদেরকে কিভাবে উদ্ধার করা হবে? এদেরকে উদ্ধার করাটা কি আরেকটা উদ্দেশ্য হবে? আবার অনেকেই হামাসের সুরঙ্গ নেটওয়ার্কের কথাও বলছেন; যা কিনা ইস্রাইলি বাহিনীর জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সাবেক মার্কিন জেনারেল এবং সিআইএর প্রাক্তন ডিরেক্টর ডেভিড পেট্রেয়াস মনে করছেন যে, হামাসকে ধ্বংস করার আগে চিন্তা করা উচিৎ কাকে দিয়ে হামাসকে প্রতিস্থাপিত করা হবে। কারণ ইরাক এবং আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র শিক্ষা নিয়েছে যে, একটা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ধ্বংস করে ফেললে সেখানে নতুন করে আরেকটা নেতৃত্ব তৈরি করাটা বেশ কঠিন কাজ। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্র ৯-১১এর পর বিভিন্ন দেশে হামলা করে পরবর্তীতে দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়েছে; যার ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইস্রাইলকে এই ব্যাপারগুলি ভাবতে হবে; নাহলে পরবর্তীতে পস্তাতে হবে। মার্কিনীদের এহেন চিন্তাগুলি বলে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে না যে, ইস্রাইল গাজার যুদ্ধকে প্রলম্বিত করুক; বরং দ্রুত সমাধান করে কোন একটা সমঝোতায় আসা যায় কিনা, সেদিকেই হাঁটুক ইস্রাইল। 

ইস্রাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে দেখা করতে ওয়াশিংটন থেকে ছুটে এসেছে বাইডেন। মার্কিনীরা বিপদ বুঝেই আলোচনার মাধ্যমে ব্যাপারটা মিটমাট করে ফেলতে চাইছে; কারণ চীন ও রাশিয়ার সমান্তরালে আরেকটা ফ্রন্ট খোলার সামর্থ নেই যুক্তরাষ্ট্রের। একইসাথে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলির নেতৃবৃন্দ পড়েছে বিপাকে। কারণ তাদেরকে ইস্রাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যাওয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সামাল দিতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় না এই দেশগুলিতে বড় কোন পরিবর্তন আসুক, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।


যখন চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে টিকিয়ে রাখতে ব্যাপক সামরিক এবং অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে হচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে না যে, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আরেকটা সমস্যা তৈরি হোক। একসাথে তিনটা এলাকা পাহাড়া দেয়ার মতো সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। রাশিয়া এবং চীন এই ইস্যুকে ব্যবহার করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বারংবার ভোটাভুটির আয়োজন করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ইস্রাইলের পক্ষে ভেটো প্রয়োগ করতে বাধ্য হবে। ইস্রাইলকে সরাসরি সমর্থন দিতে গিয়ে মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী চিন্তা দানা বাঁধবে এবং মার্কিন নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প কোন ব্যবস্থা খোঁজার ক্ষেত্র প্রশস্ত হবে। শুধু তা-ই নয়, স্বল্প মেয়াদেও তা বাইডেন প্রশাসনের জন্যে সমস্যার। কারণ সামনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন; যার আগে মার্কিন ডেমোক্র্যাট শিবির কোন অবস্থাতেই আরেকটা কূটনৈতিক ব্যর্থতা দেখতে চায় না। অপরদিকে রিপাবলিকান শিবির চাইছে ডেমোক্র্যাটদের ব্যর্থতা প্রমাণ করতে।

ইস্রাইলের দুর্বলতাগুলি আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের হামলা প্রমাণ করেছে যে, ইস্রাইল কোন অজেয় শক্তি নয়; যা ইস্রাইলকে নিরাপত্তা দিতে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের মাধ্যমে প্রমাণিত। মার্কিনীরা বিপদ বুঝেই আলোচনার মাধ্যমে ব্যাপারটা মিটমাট করে ফেলতে চাইছে; কারণ চীন ও রাশিয়ার সমান্তরালে আরেকটা ফ্রন্ট খোলার সামর্থ নেই যুক্তরাষ্ট্রের। একইসাথে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলির নেতৃবৃন্দ পড়েছে বিপাকে। কারণ তাদেরকে ইস্রাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যাওয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সামাল দিতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় না এই দেশগুলিতে বড় কোন পরিবর্তন আসুক, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। ২০২১ সালের গাজা যুদ্ধ যেমন প্রমাণ করেছিলো যে, সংঘাত নিরসনে ইস্রাইল আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের উপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়েছে; তেমনি ২০২৩ সালের যুদ্ধ প্রমাণ করলো যে, ইস্রাইল সংঘাত নিরসনে যাদের উপর নির্ভর করছে, তারাও তাদের মুসলিম জনগণের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হিমসিম খাচ্ছে। মোটকথা যুক্তরাষ্ট্র, ইস্রাইল এবং ইস্রাইলের প্রতিবেশী পশ্চিমাদের অনুগত দেশগুলির কেউই মুসলিম ভূখন্ডগুলির বাস্তবিক পরিবর্তনকে না পারছে নিয়ন্ত্রণ করতে, না পারছে এড়িয়ে যেতে। বাস্তবতা হলো, এই গন্তব্য একমুখী। আর এটা একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণকে আরও দুর্বল করছে, তেমনি ইস্রাইলকে অস্তিত্ব সংকটের দিকে ধাবিত করছে।



সূত্রঃ

‘Hamas releases dramatic footage claiming to show dawn raid on Israeli compound’ in The Times, 07 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=FnS9ejxEajo)
‘إنزال جوي .. شاهد القسام توثق مقاطع لوحدة سرب صقر العسكرية المشاركة في معركة طوفانالأقصى’ in Al-ArabyTV, 07 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=AgVUcKpImK0)
‘شاهد .. كتائب القسام تنشر فيديو لمنظومة "رجوم" الصاروخية التي استخدمتها لبدء هجومها علىإسرائيل’ in Al-ArabyTV, 07 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=SIcvYblTttg)
‘Israel war: Hamas used motor-powered hang gliders to infiltrate Israel’ in The Telegraph, 07 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=KF5vPfqtJBM)
‘Hamas Takes Cue From Ukraine War; Blows Up Israeli Tank With Drone-dropped Munition’ in The Hindustan Times, 07 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=ty3eiLGORc4&t=146s)
‘شاهد.. لحظة اقتحام كتائب القسام لموقع عسكري إسرائيلي وقتل وأسر من فيه من جنود’ in Al-ArabyTV, 08 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=bdwiCSyXExw&t=1s)
‘سرايا القدس تعرض مشاهد للاستيلاء على موقع ناحل عوز العسكري شرق غزة’ in Al-Jazeera, 08 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=L60jRdOjyN4)
‘How the Hamas Attack on Israel Unfolded’ in The Wall Street Journal, 08 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=KjhMAMAPgeM&t=1s)
‘Israel-Palestine: How Hamas gunmen broke through the Gaza border’ in The Telegraph, 09 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=B3_yQ4mgOks)
‘Hamas official: 'We have not killed any civilians', in SkyNews, 09 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=Egipqa0ZhUk)
‘القسام تعرض مشاهد من تدريبات مقاتلي سلاح الهندسة الذين شاركوا في معركة طوفان الأقصى’ in Al-ArabyTV, 10 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=kO9GN01JVHg)
‘Hamas' New Weapons and Tactics | Project Force’ in Al-Jazeera English, 11 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=nC3pnw54Ro4)
‘مشاهد من تدريبات مقاتلي سلاح الهندسة المشاركين في عملية طوفان الأقصى’ in Al-Jazeera, 11 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=0OwZvqQPqK4)
‘Hamas boasted it could use EU-funded pipelines to attack Israel’ in The Telegraph, 11 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=MvvqBcA-9yA)
‘Why US believes Israel and Saudi Arabia negotiations could be factor in Hamas attacks’ in BBC News, 12 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=22LjM_9hmmA&t=156s)
‘5 أشياء تجعل "طوفان الأقصى" علامة فارقة في تاريخ فلسطين’ in AJ+ Arabic, 10 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=aJ6_1qGD8sE&t=365s)
‘Israel-Hamas war: Could Israel face a two-front problem?’ in SkyNews, 09 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=k33w-EaB_mw)
‘'Absolutely predictable': Analyst on why Hamas attacked Israel’ in CNN, 09 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=1d5bWuCNczE)
‘Prime Minister Netanyahu denies reports that Egypt had warned Israel of Hamas attack’ in CNBC, 09 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=aApFtE6iQWk)
‘'Netanyahu Knew About Hamas' Assault Plan': Israel's Neighbour Drops A Bombshell’ in The Hindustan Times, 11 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=45SYtXnFkqQ)
‘Did Egypt warn Israel about attacks?’ in Fox News, 12 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=I5vEdImeLsc)
‘Retired colonel breaks down 'key indicators' for ground incursion in Gaza’ in CNN, 09 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=Uy2qVAHywig)
‘Military expert shows on map where Israeli forces will face challenges in Gaza’ in CNN, 10 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=Cy6vewZo3jY)
‘Retired colonel explains how Hamas caught Israel off-guard during attack’ in CNN, 08 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=hjFeFIG4bks)
‘Inside the Hamas ‘Terror Tunnels’ Israel Has Been Bombing’ in VICE News, 08 October 2021 (https://www.youtube.com/watch?v=W4gDfSNMRx4&t=419s)
‘My life as a Palestinian fighter | Close Up’ in Al-Jazeera English, 22 March 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=mSS51ZVhcA0&t=376s)
‘Israel-Hamas war: Israel offensive 'fraught with danger' in SkyNews, 12 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=Qc-D-LGosCM&t=27s)
‘The underground tunnels of Gaza: Hamas' tactical advantage’ in Scripps News, 12 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=Vvu8R3Lg2wc&t=12s)
‘Ex-CIA director has a warning about a potential 'end result' in Israel-Hamas conflict’ in CNN, 13 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=56hhh0E-wMw&t=163s)
‘شاهد: حماس تنشر فيديو لتدريبات في وضح النهار تحضيراً لهجوم طوفان الأقصى’ in EuroNews Arabic, 13 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=MdZVv9_vBeQ)
‘Blowback: How Israel Helped Create Hamas’ in The Intercept, 20 February 2018 (https://www.youtube.com/watch?v=o7grSsuFSS0&t=6s)
‘Problems with Merkava tank’ in RedEffectChannel, 19 April 2019 (https://www.youtube.com/watch?v=TaD55iDxx3c)
‘Inside Israel’s Weird Tank Units (Merkava)’ in Battle Order, 29 May 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=Rr2qaKt-P3I&t=552s)
‘بعد صاروخ "عياش 250".. "كتائب القسام" تكشف عن قذيفة "الياسين" in Al-Mashhad, 15 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=ibkK6iOptuI)
‘Trey Yingst reveals Hamas weaponry recovered by Israeli military’ in Fox News, 15 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=qGYOdP_2f58)
‘حزب الله يستهدف مدرعات لجيش الاحتلال الإسرائيلي في موقع حانيتا عند الحدود اللبنانيةالفلسطينية’ in Al-ArabyTV, 16 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=hZeUZCElFCM)
‘حزب الله يستهدف مواقع للاحتلال الإسرائيلي على الحدود اللبنانية الفلسطينية’ in Al-ArabyTV, 16 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=LU9uZhodPo0)
‘Hamas Introduces 'Merkava Tank Killer' In War Against Israel; How Made-in-Gaza 'Al-Yassin' Works’ in The Hindustan Times, 16 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=ANczYpLFNxw&t=57s)
‘إصابة مباشرة.. شاهد المقاومة في لبنان تستهدف دبابة ميركافا إسرائيلية بمنطقة الضهيرة’ in Al-ArabyTV, 17 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=I9lSAfOitxs)
‘Hamas seeks Palestinian prisoners' release, calls non-Israeli captives 'guests' in Reuters, 17 October 2023 (https://www.reuters.com/world/middle-east/former-hamas-chief-meshaal-says-israeli-captives-include-high-ranking-officers-2023-10-16/)
‘CNN tours Israeli military base filled with seized Hamas weapons’ in CNN, 18 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=qGFzeKG3_r4&t=43s)
‘'Orders of magnitude more difficult': Petraeus on urban combat’ in CNN, 18 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=RYtxWLVwH_Q)
‘متظاهرون غاضبون يحاولون الوصول للسفارة الإسرائيلية في عمان تنديدا بمجازر إسرائيل في غزة’ in OrientNews, 18 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=LimMR2Z9zHA)
‘شاهد .. الجيش اللبناني يتدخل لفض المظاهرات الغاضبة في محيط السفارة الأميركية’ in Al-ArabyTV, 18 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=iIROFrwd4OY)
‘استهداف كاميرات الجمع الحربي بمواقع إسرائيلية عند الحدود اللبنانية’ in Al-Jazeera, 19 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=LiSkpSNfRK4)
‘الأردن.. مظاهرة حاشدة دعما للفلسطينيين ومطالبة بإلغاء كل الاتفاقيات مع إسرائيل’ in Al-ArabyTV, 19 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=r8ce4DVkHAo)
‘Why Egypt hasn't opened the Rafah crossing with Gaza’ in CBC The National, 18 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=alUO8NX2xUk)
‘Biden says Egypt will open Gaza border crossing to allow humanitarian aid’ in The Guardian, 19 October 2023 (https://www.youtube.com/watch?v=G8BtQjTWwxg)
‘Authorities name 304 soldiers, 57 police officers killed in 2023 terror clashes’ in Times of Israel, updated 18 October 2023 (https://www.timesofisrael.com/authorities-name-44-soldiers-30-police-officers-killed-in-hamas-attack/)
‘Fight Hamas or Flight: The Israelis Fleeing the Country During the War’ in Haaretz, 16 October 2023 (https://www.haaretz.com/israel-news/2023-10-16/ty-article-magazine/.premium/fight-or-flight-after-hamas-attacked-these-israelis-fled-the-country/0000018b-3876-d450-a3af-797e47690000)
‘2023 Egypt Military Strength’ in Global Firepower (https://www.globalfirepower.com/country-military-strength-detail.php?country_id=egypt)
‘Comparison of Egypt and Israel Military Strengths (2023)’ in Global Firepower (https://www.globalfirepower.com/countries-comparison-detail.php?country1=egypt&country2=israel)
‘IDF exemption for Haredim expires — but nothing’s likely to change, for now’ in The Times of Israel, 1 February 2021 (https://www.timesofisrael.com/idf-exemption-for-haredim-expires-but-nothings-likely-to-change-for-now/)
‘Haredi population growing twice as fast as overall Israeli population — report’ in The Times of Israel, 31 December 2020 (https://www.timesofisrael.com/haredi-population-growing-twice-as-fast-as-total-israeli-population-report/)
‘Statistical Report on Ultra-Orthodox Society in Israel’ in The Israel Democracy Institute (https://en.idi.org.il/haredi/2022/)
‘A Third of Israeli Female Soldiers Were Sexually Harassed in 2021, Report Says’ in Haaretz, 28 November 2022 (https://www.haaretz.com/israel-news/2022-11-28/ty-article/.premium/a-third-of-israeli-female-soldiers-were-sexually-harassed-in-2021-report-says/00000184-bee1-d136-affd-fff5ac590000)
‘Inequality between Israel’s Mizrahi, Ashkenazi Jews to be measured in new statistics’ in The Times of Israel, 10 September 2022 (https://www.timesofisrael.com/inequality-between-mizrahi-ashkenazi-jews-to-be-measured-with-new-statistics/)
‘Israeli tanks add drone protection cages, a lesson from Ukraine war’ in The Washington Post, 17 October 2023 (https://www.washingtonpost.com/national-security/2023/10/17/israel-tanks-drone-protection-gaza/)

Friday, 8 September 2023

ভারত মিয়ানমারকে শক্তিশালী করছে কেন?

০৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৩

মিয়ানমারের প্রথম ফ্রিগেট 'অংজেয়া' ২০১৬ সালে ভারতের বিশাখাপত্নম সফরে। জাহাজের উপরে ভারতে তৈরি রাডার দৃশ্যমান। এই রাডার এবং এর সাথে সোনার ও এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো মিয়ানমারের এই জাহাজগুলিকে যথেষ্ট শক্তিশালী করেছে; যা কিনা চোরাচালান বা সন্ত্রাস দমনে নয়, বরং অন্য রাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাথে যুদ্ধে ব্যবহৃত হবে।

মিয়ানমারকে কে অস্ত্র দিচ্ছে না? তবে এক্ষেত্রে ভারত যে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এগুচ্ছে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ভারত মূলতঃ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা কিছু অস্ত্র রপ্তানি শুরু করেছে। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পীস রিসার্চ ইন্সটটিউট’ বা ‘সিপরি’র হিসেবে ভারত ২০০৮ থেকে ২০২২এর মাঝে ৫’শ ১৩ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করেছে। এর মাঝে সর্বোচ্চ ২’শ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৯ শতাংশ তারা রপ্তানি করেছে মিয়ানমারে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলংকা (১৮ শতাংশ) এবং মরিশাস (১৫ শতাংশ)। শুধুমাত্র ২০২০ সালেই ভারত মিয়ানমারের কাছে ১’শ ৪৮ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে। ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মাঝে মিয়ানমার ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অস্ত্র আমদানি করেছে। এর মাঝে বেশিভাগটাই বা ৪৯ শতাংশ এসেছে চীন থেকে; যা অবাক কোন ব্যাপার নয়। কারণ চীন কয়েক যুগ ধরেই মিয়ানমারের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এসেছে রাশিয়া থেকে; ১৮ শতাংশ। তবে ২০০৮ থেকে ২০২২এর মাঝে হিসেব করলে তা ৩৫ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ এসেছে ভারত থেকে; যা ১৪ শতাংশ। ২০১৪ সাল পর্যন্তও ভারত মিয়ানমারের অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশগুলির মাঝে কোন অবস্থানেই ছিল না। ২০০৮ থেকে ২০১৪এর মাঝে মিয়ানমার মোট ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি অস্ত্র আমদানি করেছিল; যার মাঝে চীন থেকে এসেছিল ৫০ শতাংশ এবং রাশিয়া থেকে ৪২ শতাংশ। ভারত থেকে এসেছিল মাত্র ১ শতাংশ।

মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করা ভারতের কৌশলগত চিন্তার অংশ

২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে মিয়ানমারের সাথে ভারতের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় ওঠে এবং মিয়ানমারে অস্ত্র রপ্তানি নতুন এক চেহারা পায়। একারণেই ২০১৬-১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে গণহত্যা চালাবার পর ১০ লক্ষ মুসলিম শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ভারতের অবস্থান ছিল সরাসরিভাবে মিয়ানমারের পক্ষে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালে প্রথমবার এবং ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয়বার মিয়ানমার সফর করেন। দ্বিতীয় সফর উপলক্ষে ভারতের ‘ইকনমিক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, রাখাইনে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর উপর সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত মিয়ানমারের সাথে নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে চাইছে। মোদির মিয়ানমার সফরের অল্প কিছুদিন আগেই ২০১৭ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমারের সামরিক শাসক জেনারেল মিন অং হিলাইং ৮ দিনের জন্যে ভারত সফর করেন। ‘দ্যা ইকনমিক টাইমস’ বলে যে, মিয়ানমার জেনারেলের এই ভারত সফরের আগেই ভারত মিয়ানমারকে যেসকল অস্ত্র সরবরাহ করছিল, তার মাঝে ছিল ১০৫মিঃমিঃ আর্টিলারি কামান, রকেট লঞ্চার, রাইফেল, রাডার, মর্টার, বেইলি ব্রিজ, কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি, নাইট ভিশন ডিভাইস, ওয়ার-গেমিং সফটওয়্যার, রাস্তা তৈরির যন্ত্রপাতি, নৌবাহিনীর গানবোট, সোনার, একুস্টিক ডোম, ডিরেক্টিং গিয়ার, ইত্যাদি। এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে মিয়ানমারকে সাবমেরিন ধ্বংসী টর্পেডো সরবরাহ করছে ভারত। দুই দেশের মাঝে উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক, সামরিক এবং বেসামরিক নেতৃবর্গের সফরের সংখ্যাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের নৌবাহিনী নিয়মিতভাবে মিয়ানমার সফর করছে এবং একত্রে যৌথ মহড়ার আয়োজন করছে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে জেনারেল হিলাইং আবারও দিল্লী সফর করেন এবং সেই সফরে দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতার এক সহঝোতা সাক্ষরিত হয়।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ২০২২এর ২৭শে অক্টোবর ভারতীয় সরকারি কোম্পানি ‘ইয়ানত্রা ইন্ডিয়া’র পশ্চিমবঙ্গের ইশাপুরের মেটাল এন্ড স্টীল ফ্যাক্টরিতে তৈরি ২০টা ১২২মিঃমিঃ কামানের ব্যারেলের প্রথম চালান মিয়ানমারে আনুষ্ঠানিকভাবে সরবরাহ করা হয়। ২০২২এর মে মাসে, অর্থাৎ অভ্যুত্থানের পরেই মিয়ানমারের সামরিক সরকারের কাছ থেকে এই অস্ত্রের অর্ডার নেয় ভারত, যার অংক ছিল প্রায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজার ডলার। ২০২৩এর মে মাসে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ভারতের ২২টা আলাদা কোম্পানি মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। এই কোম্পানিগুলির মাঝে রয়েছে সরকারি কোম্পানি ‘ভারত ডাইনামিক্স’, ‘ভারত ইলেকট্রনিক্স’ এবং ‘ইয়ানত্রা ইন্ডিয়া’। বেসরকারি কোম্পানিগুলির মাঝে রয়েছে ‘সান্দীপ মেটালক্রাফট’ এবং ‘লারসেন এন্ড টুব্রো’। এই অস্ত্রগুলির মাঝে গুরুত্বপূর্ণগুলির মাঝে রয়েছে বিভিন্ন সার্ভেইল্যান্স যন্ত্র, আর্টিলারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র বা এর যন্ত্রাংশ। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ভারতের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেবার কথা না বলে বরং ভারত সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানানো হয়। ভারত সরকার জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের জবাবে বলে যে, ভারত মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী নয়। আর মিয়ানমারকে বর্তমানে সরবরাহ করা অস্ত্রগুলি সামরিক অভ্যুত্থানের আগেই গণতান্ত্রিক সরকার থাকার সময়েই সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। আর এই অস্ত্র সরবরাহ ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা চিন্তার একটা অংশ।

 
মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তারা ভারতের সোনার ফ্যাক্টরি ভিজিট করছেন। ভারত বলছে যে, মিয়ানমারকে সরবরাহ করা অস্ত্র ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা চিন্তার একটা অংশ।

পশ্চিমারাও মিয়ানমারে ভারতীয় অস্ত্র সরবরাহের সাথে জড়িত

‘দ্যা ওয়্যার’এর এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গ্রুপগুলির বৈশ্বিক বাণিজ্য তথ্যের ভান্ডার ‘পাঞ্জিভা’র ডাটাবেসের উপর গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয় যে, ২০২২এর নভেম্বর থেকে ২০২৩এর এপ্রিল পর্যন্ত ৬ মাসে ভারতের সরকারি কোম্পানি ‘ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড’ বা ‘বিইএল’ মিয়ানমারে ৫ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করেছে। এই সরঞ্জামগুলি মোট ৭টা শিপমেন্টে আলাদাভাবে পাঠানো হয়েছে; যার ৩টা মিয়ানমার সরকারকে সরাসরি পাঠানো হয়েছে; আর বাকিগুলির মাঝে ৩টা ‘মেগা হিল জেনারেল ট্রেডিং’এর এবং ১টা ‘এলায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস’এর হাত ঘুরে মিয়ানমার সারকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। ‘বিইএল’এর প্রধান শেয়ারহোল্ডার ভারত সরকার হলেও এতে মার্কিন এবং কানাডিয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে; যার মাঝে রয়েছে মার্কিন কোম্পানি ‘গোল্ডমান সাক্স’, বিনিয়োগ জায়ান্ট ‘ভ্যানগার্ড’ ও ‘ব্ল্যাকরক’; রয়েছে ‘কানাডা পেনশন প্ল্যান’, ‘ক্যালিফোর্নিয়া পাবলিক এমপ্লয়িজ রিটায়ারমেন্ট সিস্টেম’ এবং ‘ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট টিচার্স রিটায়ারমেন্ট সিস্টেম’। অর্থাৎ শুধু ভারত সরকারই নয়, ভারতের সামরিক শিল্পে বিনিয়োগকারী পশ্চিমারাও মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহের সাথে জড়িত। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ২০২২এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারত মিয়ানমারকে কমপক্ষে ৫১ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয় একই সময়ে বহু কোম্পানির নামে সিঙ্গাপুর থেকে ২’শ ৫৪ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে; থাইল্যান্ড থেকে সরবরাহ করা হয়েছে আরও ২৮ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র। এই সময়ে মিয়ানমারের মোট অস্ত্র আমদানি ছিল প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের। এই অস্ত্রের বাণিজ্য সম্ভব হচ্ছে, কারণ জাতিসংঘের কোন সদস্য রাষ্ট্র ‘মিয়ানমার ফরেন ট্রেড ব্যাংক’ বা ‘এমএফটিবি’র উপর অবরোধ দেয়নি। এই ব্যাংক ব্যবহার করেই মিয়ানমার খুব সহজেই অস্ত্র কেনার পেমেন্ট দিতে পারছে।

পশ্চিমারা কখনোই মিয়ানমারকে ভারতের সরবরাহকৃত অস্ত্রের সাথে নিজেদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করতে পারে না। ভারত যেসকল অস্ত্র নিজেরা তৈরি করে, তার অনেকগুলিই পশ্চিমা কোম্পানিগুলির কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে তৈরি করা । অর্থাৎ এগুলি অন্য কারুর কাছে রপ্তানি করতে হলে সেই কোম্পানির কাছ থেকে অনুমতি লাগবে। আর সেই কোম্পানি যেই দেশে অবস্থিত, সেই দেশের রাজনৈতিক অনুমোদন ছাড়া তারা ভারতকে অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি দেবে না। এটা পশ্চিমা দেশগুলির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভারত এই প্রক্রিয়ার অধীনে একটা দেশ মাত্র। মিয়ানমার সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওয়েবসাইট ‘জাস্টিস ফর মিয়ানমার’ তথ্য প্রকাশ করে যে, ২০১৯ সালে ভারতীয় কোম্পানি ‘সান্দীপ মেটালক্রাফট’ মিয়ানমারে সুইডিশ ৮৪মিঃমিঃ এন্টি-ট্যাঙ্ক অস্ত্র ‘এম৪ কার্ল গুস্তাফ’এর জন্যে ফিউজ সরবরাহ করেছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পরেও খুব সম্ভবতঃ আরেকটা শিপমেন্ট গিয়েছে মিয়ানমারে। ২০২৩এর ২৯শে মার্চ সুইডিশ পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী টোবিয়াস বিলিস্ট্রোমকে এব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, সুইডেন ভারতের কাছে ‘এম৪ কার্ল গুস্তাফ’ এন্টি-ট্যাঙ্ক অস্ত্র রপ্তানি করেছিল এবং ২০২২ সালে সুইডিশ কোম্পানি ‘সাব’ ভারতে এই অস্ত্রের কারখানা স্থাপন করে। এর মাঝ থেকে কিছু অস্ত্র মিয়ানমারের কাছে যেতে থাকতে পারে। ২০১২ সালে এব্যাপারে একটা তদন্ত হয়েছিল এবং সেই তদন্তে উঠে এসেছিল যে, ভারত তাদের লাইসেন্সের শর্ত মেনে চলছে। তবে ২০১২ সালের পর আর কোন তদন্ত হয়নি। অর্থাৎ গত এক দশকে ভারত এই অস্ত্রগুলি মিয়ানমারের কাছে বিক্রি করেছে কিনা, সেব্যাপারে সুইডিশ সরকারের খুব বেশি একটা মাথাব্যাথা নেই।

 
মিয়ানমারের সাবমেরিন-চেজারের উপর ভারতে তৈরি 'শায়েনা' টর্পেডোর লঞ্চার। বাংলাদেশেও অনেকেই বিদেশী মিডিয়ার রিপোর্টিংএর সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন যে, ভারত মিয়ানমারকে অস্ত্র দিচ্ছে চীনকে ব্যালান্স করার জন্যে। কিন্তু তারা পুরোপুরিভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন যে, এই অস্ত্র কাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। মিয়ানমারকে ভারত চোরাচালান ও সন্ত্রাস দমনে অত্যাধুনিক রাডার, সোনার, টর্পেডো এবং সাবমেরিন সরবরাহ করছে - এই কথাগুলি বিশ্বাস করা উন্মাদীয়।

মিয়ানমারের জন্যে ভারতীয় অস্ত্রের ধরণ আলাদা

তবে মিয়ানমারে সরবরাহ করা ভারতীয় অস্ত্রের ধরণ বেশ কিছুটাই অন্যরকম। ২০১৩ সালে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘জেনস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সেবছরের জানুয়ারি মাসে ভারতীয় কোম্পানি ‘বিইএল’ মিয়ানমার নৌবাহিনীর জন্যে রাডার এবং সোনার সরবরাহের চুক্তি করে। এর মাঝে রয়েছে ৩টা ‘আরএডব্লিউএল-০২ মার্ক৩’ এল-ব্যান্ডের টু-ডি লং-রেঞ্জ রাডার; যা কিনা ডাচ কোম্পানি ‘সিগনাল’এর ডিজাইন করা ‘এলডব্লিউ-০৮’ রাডারের লাইসেন্স কপি। এছাড়াও এই চুক্তির মাঝে রয়েছে ন্যাভিগেশন রাডার এবং সাবমেরিন খোঁজার সোনার। এই সোনার খুব সম্ভবতঃ ‘এইচইউএমএসএ’ বা ‘হুমসা’ সোনার সিস্টেম। এটাও পশ্চিমা টর্পেডোর আদলে ভারতীয় ডেভেলপমেন্ট। এগুলি মিয়ানমারের ফ্রিগেটগুলিতে লাগানো হবে। এই চুক্তির আগেই মিয়ানমারের প্রথম ফ্রিগেট ‘অংজেয়া’র উপর ভারতে তৈরি ‘আরএডব্লিউএল-০২’এর আগের ভার্সনের একটা রাডার লাগানো হয়েছে। দ্বিতীয় ফ্রিগেটটা ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে পানিতে ভাসানো হয়েছিল। আর তৃতীয় ফ্রিগেটটা ২০১০ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০১২ সাল নাগাদ পানিতে ভাসানোর জন্যে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। ‘জেনস’এর ধারণা ছিল যে, হয়তো মিয়ানমার তিনটা নতুন ফ্রিগেট তৈরি করছে; যেগুলির জন্যে এই রাডারগুলি কিনেছে তারা। তবে পরবর্তীতে দেখা যায় যে, ২০১৬ সাল নাগাদ মিয়ানমারের তৃতীয় কর্ভেট ‘তাবিনশোয়েহতি’তে এই একই রাডার শোভা পায়। মিয়ানমারে এই রাডারের রপ্তানি বিষয়ে ডাচ কোম্পানি পর্যন্ত ব্যাপারটা গড়ালেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল সময়ক্ষেপণ মাত্র। পত্রিকায় সমালোচনা সত্ত্বেও ভারত রাডারগুলি মিয়ানমারকে ডেলিভারি দিয়ে যেতে থাকে এবং ইউরোপ থেকেও ভারতের উপরে কোনরূপ নিষেধাজ্ঞা আসেনি।

২০১৯এর ১২ই জুলাই ভারতীয় কোম্পানি ‘ভারত ডাইনামিক্স লিমিটেড’ বা ‘বিডিএল’ ঘোষণা দেয় তারা মিয়ানমারকে তাদের নিজস্ব ডেভেলপ করা ‘শায়েনা’ এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডোর ডেলিভারি দিয়েছে। ভারতীয় বিশ্লেষণধর্মী ম্যাগাজিন ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ বলছে যে, এই ডেলিভারি ২০১৭ সালের ৩৮ মিলিয়ন ডলারের অর্ডারের অংশ। তবে ঘোষণার আগেই ২০১৯ সালের মে মাসে মিয়ানমার নৌবাহিনীর মহড়ায় তাদের ফ্রিগেট ‘কায়ান সিত্তার’ এবং ‘সিন ফায়ু শিন’এ উপর এই ভারতীয় টর্পেডো দেখা যেতে থাকে। এই একই টর্পেডো দেখা যায় মিয়ানমারের দু’টা সাবমেরিন চেজার জাহাজে; যেগুলি ২০২০এর ডিসেম্বরে কমিশনিং করা হয়। প্রতিপক্ষের সাবমেরিন ধ্বংসের জন্যে এগুলির একেকটাতে ৬টা করে টর্পেডো লঞ্চার যুক্ত করা হয়। তবে সেই দিনের সবচাইতে বড় আলোচ্য বিষয় ছিল মিয়ানরের প্রথম সাবমেরিনের কমিশনিং। রাশিয়ায় তৈরি ‘কিলো-ক্লাস’এর সাবমেরিন হলেও ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের ব্যবহারের পর এই সাবমেরিন মিয়ানমারকে উপহার হিসেবে দেয়।

চোরাচালান এবং সন্ত্রাস দমনে রাডার, সোনার, টর্পেডো এবং সাবমেরিন?

ভারতীয় বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, মিয়ানমারের উপকূলে মৎস্য সম্পদ পাহাড়া দিতে, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে এবং সন্ত্রাসী দমনে ভারত মিয়ানমার নৌবাহিনীকে সহায়তা দিচ্ছে। এবং একইসাথে তারা বলছেন যে, ভারত মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করার মাধ্যমে সেই দেশে চীনের প্রভাবকে ব্যালান্স করছে। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না কিভাবে ভারতের এয়ার ডিফেন্স রাডার, সাবমেরিন খোঁজার সোনার এবং এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো মিয়ানমারের চোরাচালান ও সন্ত্রাসী দমনে সহায়তা করবে। তারা এ-ও ব্যাখ্যা করছেন না যে, মিয়ানমার নৌবাহিনীর জাহাজে অত্যাধুনিক রাডার, সোনার এবং টর্পেডো বসালে কোন পদ্ধতিতে মিয়ানমারের উপকূল থেকে চীন বিতাড়িত হবে। মিয়ানমারকে ভারত যে সাবমেরিন দিয়েছে, সেটাই বা কিভাবে মিয়ানমারের মৎস্য সম্পদ রক্ষা করবে এবং চীনের প্রভাবকে কমাবে, সেটাও তারা পরিষ্কার করেননি। যতোই উদ্ভট হোক না কেন, এই যুক্তিগুলিই ভারতীয়রা দিচ্ছেন এবং পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা এই যুক্তিগুলিই তুলে ধরছেন তাদের বিশ্লেষণে এবং একইসাথে পশ্চিমা মিডিয়াগুলিও এই কথাগুলিই কপি-পেস্ট করছে!

বাংলাদেশেও অনেকেই বিদেশী মিডিয়ার রিপোর্টিংএর সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন যে, ভারত মিয়ানমারকে অস্ত্র দিচ্ছে চীনকে ব্যালান্স করার জন্যে। কিন্তু তারা পুরোপুরিভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন যে, এই অস্ত্র কাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। মিয়ানমারকে ভারত চোরাচালান ও সন্ত্রাস দমনে অত্যাধুনিক রাডার, সোনার, টর্পেডো এবং সাবমেরিন সরবরাহ করছে - এই কথাগুলি বিশ্বাস করা উন্মাদীয়। একইসাথে যখন মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্যে ভারতের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের কোন উচ্চবাচ্য নেই, তখন পশ্চিমারা বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থানরত মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত মুসলিম শরণার্থীদেরকে ফেরত পাঠাতে ‘বাংলাদেশের সাথে আছে’ - এই কথাগুলি শুধু হাস্যকরই নয়, বরং কপটতার স্বাক্ষর। ভারতের মতোই বঙ্গোপসাগরে পশ্চিমা প্রতিটা দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। আর সেই স্বার্থের কেন্দ্রে রয়েছে বঙ্গোপসাগর তথা ভারত মহাসাগরে ভারত ব্যাতীত কোন সামরিক শক্তি, বিশেষ করে নৌশক্তির আবির্ভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা। সেই লক্ষ্যে তারা একদিকে যেমন চীনা নৌবাহিনীর ভারত মহাসাগরে বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, ঠিক তেমনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ডেভেলপমেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এই দুই লক্ষ্য একত্র হচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইনে; যেখানে রয়েছে চীনা গভীর সমুদ্র বন্দর, মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের সমুদ্রতট ও সমুদ্রবন্দরের নৈকট্য। বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সাথে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে বঙ্গোপসাগরে একটা নৌশক্তির উত্থান ঠেকাতে চাইছে ভারত এবং তার পেছনে থাকা পশ্চিমা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি। মিয়ানমারে বাংলাদেশ সংঘাতে জড়ালে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ক খারাপ হবে এবং চীন বাংলাদেশের শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এহেন পরিস্থিতিতে ভারত এবং পশ্চিমারা বাংলাদেশের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে এগিয়ে আসবে, যাতে করে বাংলাদেশী সেনারা নিজেদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করে নেয়। মিয়ানমারের তথাকথিত মানবাধিকারের ধোঁয়াশা ভেদ করে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির এই ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য বেরিয়ে আসছে; যা এখন এড়িয়ে যাবার কোন পদ্ধতিই নেই।




সূত্রঃ



‘India supplying fuzes to Myanmar military, deepening complicity in its atrocity crimes’ in Justice for Myanmar, 15 July 2022 (https://www.justiceformyanmar.org/stories/india-supplying-fuzes-to-myanmar-military-deepening-complicity-in-its-atrocity-crimes)

‘Swedish Arms Exported to Myanmar via India Despite EU Embargo: JFM’ in Irrawaddy, 21 June 2023

‘PM Narendra Modi's visit to expand strategic and economic footprint in Myanmar’ in The Economic Times, 31 August 2017

‘India rolls out the red carpet for Myanmar military chief, with an eye firmly on China’ in The Economic Times, 08 July 2017

‘India and Myanmar Sign Mou on Defence Co-Operation’ in Ministry of Defence, India, 29 July 2019 (https://pib.gov.in/PressReleasePage.aspx?PRID=1580637)

‘India supporting Myanmar junta atrocities through supply of gun barrels’ in Justice for Myanmar, 01 March 2023 (https://www.justiceformyanmar.org/stories/india-supporting-myanmar-junta-atrocities-through-supply-of-gun-barrels)

‘How India is supporting Myanmar's military with arms’ in DW, 25 May 2023

‘China, Russia arming Myanmar junta: UN rights expert’ in DW, 22 February 2022

‘Indian PSU Sold Arms, Equipment Worth Over $5 Million to Myanmar Junta in 6 Month Period: Report’ in The Wire, 21 June 2023

‘‘Death trade’. India supplied ₹422 crore worth arms to Myanmar junta: UN’ in The Hindu Business Line, 19 May 2023

‘Indian Torpedoes Delivered to Myanmar Navy’ in The Irrawaddy, 15 July 2019 (https://www.irrawaddy.com/news/burma/indian-torpedoes-delivered-myanmar.html)

‘India Delivers Initial Batch of Indigenously Built Torpedoes to Myanmar Navy’ in The Diplomat, 16 July 2019

‘India to Supply Torpedoes to Myanmar’ in The Diplomat, 31 March 2017

‘Indian manufacturer continues supplying vital technology to Myanmar junta, arms brokers’ in Myanmar Now, 22 June 2023 (https://myanmar-now.org/en/news/indian-manufacturer-continues-supplying-vital-technology-to-myanmar-junta-arms-brokers/)

‘India's BEL Signs Sensor Deal with Myanmar Navy’ by Janes quoted in Defense Studies, 14 March 2013 (http://defense-studies.blogspot.com/2013/03/indias-bel-signs-sensor-deal-with.html)

‘Myanmar Navy has commissioned seven new warships and one submarine’ in Navy Recognition, 26 December 2020

‘The Kilo impact’ by Commodore (ret) Mohammad Abdur Razzak, in New Age, 19 November 2020 (https://www.newagebd.net/article/121954/the-kilo-impact)

Monday, 4 September 2023

মিয়ানমার নৌবাহিনীর লক্ষ্য কি?

০৪ঠা সেপ্টেম্বর ২০২৩

মিয়ানমার নৌবাহিনীর ফ্ল্যাগশিপ সাড়ে ১২ হাজার টনের ডক ল্যান্ডিং শিপ 'মোয়াত্তামা', যা চুপিসারে তৈরি করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়া মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে সক্ষমতার দিক থেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। চীন মিয়ানমারকে অনেক অস্ত্রই দিয়েছে; কিন্তু সেগুলি বাংলাদেশের থেকে এগিয়ে যাবার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। অপরদিকে ভারতের দেয়া সাবমেরিন, রাডার, সোনার, এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো, ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দেয়া ডক ল্যান্ডিং শিপ মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে ‘ব্লু-ওয়াটার নেভি’ হিসেবে গড়ে দিয়েছে। মিয়ানমারের নৌবাহিনীর লক্ষ্য হলো বঙ্গোপসাগরে বড় বড় শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্যের একপ্রকারের খিচুরি।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্ম এবং মিয়ানমারের প্রতি হুমকি

মিয়ামমারের নৌবাহিনীর কথা বলতে গেলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কথা বলতে হবে। কারণ মিয়ানমার নৌবাহিনীর ডেভেলপমেন্ট মূলতঃ বাংলাদেশের সাথে পাল্লা দিয়েই হয়েছে। কাজেই এই দুই দেশের মাঝে কূটনৈতিক সম্পর্কের সাথে এর ডেভেলপমেন্ট ওঁতোপ্রোতোভাবে জড়িত। বাংলাদেশের নিরাপত্তা চিন্তার সাথে মিয়ানমারের নৌশক্তির ডেভেলপমেন্ট জড়িত। একারণেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা চিন্তাটাকে একটু কাছে থেকে দেখতে হবে। ১৯৭০এর দশকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার মূল চিন্তা ছিল কিভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ প্রতিহত করা যায়। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আকার দ্রুত বৃদ্ধি করার শুরু হয়; যাতে করে ভারতের পক্ষে বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করাটা জটিল সমীকরণে পরিণত হয়। ১৯৮০এর দশকে গিয়ে ঠিক সেটাই হয়েছিল। ভারত তার নিরাপত্তা চিন্তার মাঝ থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সামরিক হস্তক্ষেপকে বাদ দিতে বাধ্য হয়। তবে ঠিক এই সময়ের মাঝেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা চিন্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়। যদি ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সামরিক হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে দিল্লী বাংলাদেশের উপরে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে কি কি পন্থা নেবে? প্রথমতঃ প্রক্সি যুদ্ধ; যার কেন্দ্রে থাকবে সাবভার্সন। যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত সংঘাতে ইন্ধন যোগানো এবং বাংলাদেশের রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার জন্ম দিয়ে রাজনৈতিক এবং সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করা; যাতে করে ভারতের ‘চিকেন নেক’এর উপর হুমকি কমানো সম্ভব হয়। দ্বিতীয়তঃ অর্থনৈতিক বা নৌ অবরোধ; যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মূল সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামকে পঙ্গু করে ফেলা যায়। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ নিজেদের নৌবাহিনীর আক্রমণভাগ গড়তে থাকে; যা কিনা একপ্রকার ডিটারেন্ট। অর্থাৎ আক্রান্ত হলে আক্রমণকারীর এমন ক্ষতিসাধন করা, যাতে করে সে অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হয়। ১৯৮০এর দশকে এই ডিটারেন্টের চেহারা ছিল মিসাইল বোট স্কোয়াড্রন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পিছনে যেসকল যুক্তি ছিল, তার মাঝে একটা ছিল পাকিস্তানের নৌবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না থাকা। কারণ এদেশের বেশিরভাগ চিন্তাবিদেরাই বাংলাদেশকে ‘ম্যারিটাইম নেশন’ হিসেবে চিন্তা করেছে; যা ইসলামাবাদের নেতৃত্বের চিন্তায় ছিল না। একারণে স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ তার নৌবাহিনীকে ‘ব্লু-ওয়াটার নেভি’ হিসেবে দেখতে চেয়েছে। ১৯৭৬ সালেই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় প্রাক্তন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ‘টাইপ ৬১ স্যালসবুরি-ক্লাস’এর ফ্রিগেট। ২১ বছরের পুরোনো এই ফ্রিগেট ছিল নবীন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে বিরাট একটা পদক্ষেপ। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরে প্রবেশ করা বাণিজ্য জাহাজগুলির নিরাপত্তা দেয়াই ছিল এই ফ্রিগেটের মূল উদ্দেশ্য। অন্যকথায়, বাংলাদেশের সমুদ্রবাণিজ্যের সাথে ফ্রিগেট ক্রয় জড়িত।

অপরদিকে মিয়ানমার তার জন্মের পর থেকেই নিজেদের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে যুদ্ধরত। তাই তাদের নিরাপত্তা চিন্তার মাঝে অভ্যন্তরীণ শৃংখলাই ছিল সবার উপরে। এক্ষেত্রে নৌবাহিনীর গুরুত্ব ছিল খুবই কম। তবে তাদের ১৪’শ কিঃমিঃএর বিশাল সমুদ্র সৈকতের নিরাপত্তা এবং দূরবর্তী অঞ্চলের (মূলতঃ রাখাইন রাজ্য এবং দক্ষিণের আন্দামান সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলের) সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে মিয়ানমার বড় সংখ্যক প্যাট্রোল বোট এবং পরিবহণ বা লজিস্টিকস জাহাজ যোগাড়ে মনোযোগী হয়। অর্থাৎ তাদের চিন্তায় দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সবচাইতে বড় হুমকি ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন; পার্শ্ববর্তী দেশের নৌবাহিনী নয়।

সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে হলেও নৌশক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চিত হয়েছিলেন ১৯৭৮ সালে। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ চীন থেকে 'টাইপ ০৫৩এইচ১' ফ্রিগেট 'ওসমান' কেনে। যদিও বাংলাদেশ নৌবাহিনী আরও আগ থেকেই এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তাদের মিসাইল বোটগুলিতে ব্যবহার করছিলো, তথাপি ফ্রিগেটে এই ক্ষেপণাস্ত্র বহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে বন্দর থেকে অনেক দূরের টার্গেটে হামলা করার সক্ষমতা চলে আসে। এর বিরুদ্ধে মিয়ানমার নৌবাহিনীর কোন জবাব ছিলো না।

নিজেদের দুর্বলতাকে বুঝতে পারা - ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০

তবে বাংলাদেশের জন্মের পরপরই মিয়ানমার সরকারকে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর শক্তির সামনে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হলো। প্রথমবারের মতো তারা রাখাইন উপকূলে বাংলাদেশের ফ্রিগেট দেখতে পেলো ১৯৭৬ সালে; যদিও তখন পর্যন্ত সেটার গুরুত্ব অতটা গভীর ছিল না। তবে পরিস্থিতি পাল্টে গেলো যখন রাখাইন প্রদেশে মুসলিম জনগণের উপরে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন শুরু হলো। ১৯৭৮ সালের শুরুতেই রাখাইনে সামরিক অভিযানের প্রেক্ষিতে প্রায় ১ লক্ষ মুসলিম জনগণ শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এপ্রিল-মে নাগাদ বাংলাদেশ মিয়ানমারের উপরে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করলেও তাতে কাজ হয়নি। অবশেষে ৯ই জুলাই মিয়ানমার বাংলাদেশের শান্তি প্রস্তাব মেনে নিয়ে শরণার্থীদের ফেরত নিতে রাজি হয়। যদিও এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গুরুত্ব সরাসরি দেখানো যাবে না, তথাপি শান্তি প্রতিষ্ঠার মাত্র তিনদিন আগে ৬ই জুলাই যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী তাদের দ্বিতীয় ব্রিটিশ ফ্রিগেট ‘আলী হায়দার’ অন্তর্ভুক্ত করে, তা উল্লেখ করতেই হয়।

সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে হলেও নৌশক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চিত হয়েছিলেন ১৯৭৮ সালে। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় তৃতীয় ব্রিটিশ ফ্রিগেট ‘আবু বকর’। এই ফ্রিগেটগুলিতে খুব একটা শক্তিশালী অস্ত্র না থাকলেও বিভিন্ন কারণে এগুলি ছিল গুরুত্বপূর্ণ; যেমন - দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান করে কমান্ড এন্ড কন্ট্রোলের কাজ করা, শক্তিশালী দূরপাল্লার রাডারের মাধ্যমে শত্রুর বিমান এবং জাহাজের উপরে নজরদারি, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের মাধ্যমে শত্রুর রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপারে আগাম সতর্কবার্তা দেয়া, এবং সর্বোপরি শক্তিশালী ১১৩মিঃমিঃ এবং ৪০মিঃমিঃ কামানের মাধ্যমে গোলাবর্ষণ করা। এই জাহাজগুলির ‘স্ট্রাইকিং পাওয়ার’ হিসেবে ১৯৮৩ সালে যুক্ত হয় চীনা ৪টা ‘টাইপ ০২৪’ মিসাইল বোট; যেগুলির একেকটা বহণ করছিলো ২টা করে ‘এসওয়াই-২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; যা ‘সিল্কওয়ার্ম’ নামেও পরিচিত ছিল। সোভিয়েত ‘পি-১৫ টারমিট’এর চীনা সংস্করণ এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ইরান পারস্য উপসাগরে ১৯৮৭ সালে ব্যাপক সফলতার সাথে ব্যবহার করেছিল। প্রায় নিয়মিতভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ১’শ কিঃমিঃএর বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছিল। ইরানের প্রয়োগ চীনা এই ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে বাজার তৈরি করে; যার মাঝে বাংলাদেশও ছিল। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত ৪টা ‘টাইপ ০২১’ মিসাইল বোট সংগ্রহ করে; এগুলি একেকটা বহণ করছিলো ৪টা করে ‘সিল্কওয়ার্ম’। ১৯৮৮ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রধান ডিটারেন্ট ফোর্স ছিল নৌবাহিনীর এই মিসাইল বোটগুলি; যা কিনা যেকোন নৌ অবরোধ তুলে নেবার বিরুদ্ধে আক্রমণের দ্বায়িত্ব নেবে। ৩টা ফ্রিগেট এবং ৮টা মিসাইল বোটকে (মোট ২৪টা ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার) আরও সহায়তা দেয়ার জন্যে ১৯৮৫ সালে সিঙ্গাপুর থেকে ২টা প্যাট্রোল ক্রাফট তৈরি করে নিয়ে আসা হয়। ‘মেঘনা’ এবং ‘যমুনা’ নামের এই জাহাজগুলিতে ছিল শক্তিশালী ৫৭মিঃমিঃ কামান। একই বছরে চীন থেকে নিয়ে আসা হয় ‘টাইপ ০৩৭’এর দু’টা সাবমেরিন চেজার ‘দুর্জয়’ এবং ‘নির্ভয়’।

১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সরকার চীন থেকে তাদের প্রথম গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট কেনে। ১৯৮৭ সালে চীনা নৌবাহিনীতে কমিশন পাবার পর ১৯৮৮ সালে ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সফলতার সাথে অংশ নেয় ‘শিয়াংতান’ জাহাজটা; যা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে ‘ওসমান’ নামে কমিশনপ্রাপ্ত হয়। ‘টাইপ ০৫৩এইচ১’ ক্লাসের এই জাহাজগুলিতে ছিল ৬টা করে ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র। যদিও বাংলাদেশ নৌবাহিনী আরও আগ থেকেই এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তাদের মিসাইল বোটগুলিতে ব্যবহার করছিলো, তথাপি ফ্রিগেটে এই ক্ষেপণাস্ত্র বহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে বন্দর থেকে অনেক দূরের টার্গেটে হামলা করার সক্ষমতা চলে আসে।

২০০৪ সালে মিয়ানমারের নিজস্ব শিপইয়ার্ডে তৈরি '৫-সিরিজ'এর মিসাইল বোট '৫৬২'। ১৯৯১ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে আবারও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। এসময়েই মিয়ানমার সরকার তাদের নৌবাহিনীকে নতুন করে তৈরি করার লক্ষ্য স্থির করে।


মিসাইল যুগে মিয়ানমারের ‘নতুন’ নৌবাহিনী - ১৯৯১-২০০৮

১৯৯১ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে আবারও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয় এবং যথারীতি মিয়ানমার সরকার বিচারবুদ্ধিহীনভাবে সাধারণ মুসলিম জনগণের উপরে হামলা করে। এতে রাখাইনের কমপক্ষে আড়াই লক্ষ মুসলিম শরণার্থী বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকায় আশ্রয় নেয়। এই শরণার্থী ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের উত্তেজনা তুমুল আকার ধারণ করে। তবে ১৯৭০এর দশকের মতো কূটনৈতিকভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। কাজেই উত্তেজনার প্রশমন হয় না এবং পুরো ১৯৯০এর দশক জুড়েই রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সংঘর্ষ চলতে থাকে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পিছনে পশ্চিমা ইন্ধন থাকার সম্ভাবনাকে এড়ানো সম্ভব নয়। ১৯৮৯ সালে বেইজিংএর তিয়ানানমেন স্কয়ারের ঘটনার পর পশ্চিমাদের সাথে চীনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সেই হিসেবেই চীনকে বিচলিত করতে মিয়ানমারের রাখাইনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকতে পারে। এসময়েই মিয়ানমার সরকার তাদের নৌবাহিনীকে নতুন করে তৈরি করার লক্ষ্য স্থির করে। আর তাদেরকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে চীন। মিয়ানমার ১৯৯১-৯২ সালের মাঝে চীন থেকে ৯টা ‘টাইপ ০৩৭’ সাবমেরিন চেজার ডেলিভারি পায়। বাংলাদেশ নৌবাহিনীও ১৯৮৫ সালে এরকম দু’টা জাহাজ কিনেছিল। এই জাহাজগুলি ২টা করে শক্তিশালী টুইন ৫৭মিঃমিঃ কামান দ্বারা সজ্জিত ছিল এবং একইসাথে এদের ৩০ নটিক্যাল মাইল গতি প্রথমবারের মতো মিয়ানমার নৌবাহিনীকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে কিছুটা হলেও যুদ্ধ সক্ষমতা দেয়।

তবে মিয়ানমার এতেই স্বস্থির নিঃস্বাস ফেলতে পারেনি। কারণ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে তখন ছিল ৮টা মিসাইল বোট; যার মাঝে ‘টাইপ ০২৪’ বোটগুলি (১৯৮৩) ২টা করে এবং ‘টাইপ ০২১’ বোটগুলি (১৯৮৮) ৪টা করে ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতো। শুধু উপকূলীয় অঞ্চলের জন্যে উপযুক্ত হলেও ৩৫ থেকে ৩৮ নটিক্যাল মাইল গতিবেগের দ্রুতগামী বোটগুলি ছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান ডিটারেন্ট। এর সাথে ১৯৮৯ সালে যুক্ত হয়েছিল ফ্রিগেট ‘ওসমান’; যা আরও ৬টা ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করছিলো। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে ছিল ৩০টা ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার; যার বিপক্ষে মোতায়েন করার মতো কিছুই ছিল না মিয়ানমারের। এই কঠিন বাস্তবতা এড়াতে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সালের মাঝে চীন থেকে ৬টা ‘হাউশিন-ক্লাস’এর মিসাইল বোটের ডেলিভারি পায় মিয়ানমার। ৬৩ মিটার লম্বা ৪’শ ৭৮ টনের এই জাহাজগুলি প্রকৃতপক্ষে ‘টাইপ ০৩৭’ সাবমেরিন চেজারের এন্টি-শিপ ভার্সন; যা ৪টা করে ১’শ ২০কিঃমিঃ পাল্লার ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মিয়ানমার বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজকে বাধা দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। মাত্র ৬ বছরের মাঝে ‘টাইপ ০৩৭’এর ৯টা জাহাজের সাথে এই ৬টা ‘হাউশিন-ক্লাস’এর জাহাজ মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে বেশ খানিকটা শক্তিশালী করে ফেলে। এসময় তাদের হাতে ছিল নতুন যুগের ২৪টা ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার। অপরদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে এসময়ে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ‘মধুমতি’ নামের একটা লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট তৈরি করে আনা হয় এবং ৫টা মাইনসুইপার কেনা হয় ব্রিটেন ও চীন থেকে। ‘মধুমতি’ জাহাজটার পাল্লা প্রায় ৬ হাজার নটিক্যাল মাইল; এতে রয়েছে ৫৭মিঃমিঃ শক্তিশালী কামান। আর ‘রিভার-ক্লাস’এর মাইনসুইপারগুলি ব্রিটিশরা ডিজাইন করেছিল এমনভাবে, যাতে করে এগুলি গভীর সমুদ্রে লম্বা সময় ধরে থাকতে পারে। এতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গভীর সমুদ্রে অবস্থান করার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং একইসাথে শত্রুপক্ষের মাইন অপসারণের সক্ষমতা তৈরি হয় প্রথমবারের মতো। তবে নিজেদের নৌবাহিনীর আক্রমণ সক্ষমতা আগের জায়গায়ই থেকে যায়। ১৯৯১ সালের ঘুর্নিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি এবং কিছু নতুন প্রতিস্থাপনের পর তাদের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারের সংখ্যা তখন ৩২; যার সবগুলিই পুরোনো জেনারেশনের ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র।

তবে মিয়ানমার কিন্তু থেকে থাকেনি। তারা নিশ্চিতভাবে বুঝেছিল যে বাংলাদেশের সাথে তাদের সংঘাত আবারও হতে পারে। ২০০০ সালের পর থেকে মিয়ানমার তার উপকূলে হাইড্রোকার্বন খোঁজার বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিল। ২০০৬ সাল নাগাদ ১৩টা বিদেশী কোম্পানি মিয়ানমারে ৩৩টা প্রকল্পে কাজ করছিলো। একইসাথে রাখাইনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে সংঘর্ষে বিদেশী ইন্ধনের কারণে মিয়ানমার নিরাপত্তা নিয়ে বিচলিত ছিলো। তাই তারা তাদের নৌবাহিনীর জন্যে চাইছিলো ‘ব্লু ওয়াটার’ সক্ষমতা। অর্থাৎ আরও বড় জাহাজ; যা কিনা গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ৪টা ফ্রিগেটকে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে এবং সমুদ্রে আরও বেশি সময় ধরে অবস্থান করতে পারবে। বিদেশী কোম্পানিগুলিও সেটাই চাইছিলো। কারণ তারা চাইছিলো না যে মিয়ানমারের নৌ-দুর্বলতার কারণে তাদের বিপুল বিনিয়োগ ভেস্তে যাক। মিয়ানমারের টার্গেট ছিল কর্ভেট অথবা ফ্রিগেট। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের সবচাইতে বড় সুবিধা ছিল তাদের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের অভিজ্ঞতা। তারা বহু বছর আগে থেকেই নিজস্ব প্যাট্রোল বোট তৈরি করে আসছিলো; যদিওবা সেগুলি ছিল অভ্যন্তরীণ নদীপথ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে; অন্য কোন নৌবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার জন্যে নয়।

ব্রিটিশ সামরিক ম্যাগাজিন ‘জেনস ইন্টেলিজেন্স রিভিউ’এর ২০০০ সালের এক প্রতিবেদনে একটা ধারণা দেয়া হয় যে, কিভাবে মিয়ানমার তার প্রথম কর্ভেটগুলি তৈরি করতে পেরেছিল। ১৯৯০এর দশকে মিয়ানমারের সরকার চীন থেকে রিটায়ার করা পুরোনো দু’টা বা তিনটা ‘টাইপ ০৬৫’ কামান সজ্জিত এন্টি-সাবমেরিন ফ্রিগেট অথবা অপেক্ষাকৃত নতুন ‘এসওয়াই-১’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত ‘টাইপ ০৫৩’ গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু এগুলির জন্য চীন তাদেরকে যে ‘স্পেশাল বন্ধুত্বের’ মূল্য দিতে বলেছিল, তা মিয়ানমার সরকার দিতে প্রস্তুত ছিল না। তাই মিয়ানমার চীনের সহায়তায় ৩টা ৭৭ মিটারের জাহাজ ক্রয় করে; যেগুলির হাল ছাড়া কিছুই তারা কেনেনি। এই হালগুলিকে নিজেদের শিপইয়ার্ড পর্যন্ত নিয়ে এসে হালের উপরের সুপারস্ট্রাকচারের অংশ তারা নিজেরা তৈরি করে। জাহাজের প্রধান অস্ত্র থাকে ইতালিতে তৈরি দু’টা ‘অটো মেলারা’ ৭৬মিঃমিঃ অটোম্যাটিক কামান। অস্ত্র অবরোধকে বাইপাস করে তৃতীয় কোন পক্ষকে ব্যবহার করে তারা ইউরোপ থেকে এই কামানগুলি আমদানি করে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মিয়ানমার নৌবাহিনীর হাতে মধ্যম ক্যালিবারের আটোম্যাটিক কামান চলে আসে। যদিও ‘জেনস’ তাদের রিপোর্টে ধারণা করে যে, জাহাজগুলি সম্ভবতঃ ইস্রাইলি ইলেকট্রনিক্সে সজ্জিত করা হবে, তথাপি পরবর্তীতে এর পক্ষে প্রমাণ পাওয়া কঠিন হয়। ২০০১ সালে কোনরূপ ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াই ১১’শ টনের প্রথম জাহাজটা ‘আনাওরাহতা’ নামে কমিশনিং করা হয়। তবে জাহাজের অস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক্স নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চলতে থাকে। কারণ অস্ত্র অবরোধের মাঝে তারা কোনটা কখন পাবে, সেটা নিশ্চিত ছিল না কখনোই। পরবর্তীতে কামানগুলির পেছনেরটা সরিয়ে ফেলা হয় এবং ৪টা চীনা ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করা হয়। একইসাথে এতে চীনে নির্মিত সার্চ এবং ট্র্যাকিং রাডার যুক্ত করা হয়। স্বল্প পাল্লার বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবস্থাও এতে রাখা হয় বলে অনেকে অনুমান করেন। দুই বছর পর ২০০৩ সালে দ্বিতীয় কর্ভেট ‘বায়িনং’ কমিশনিং করা হয়। তবে এই জাহাজের অস্ত্র ও ইলেকট্রনিক্স নিয়েও চলতে থাকে এক্সপেরিমেন্ট; এবং শিগগিরই এতে যুক্ত করা হয় ৪টা ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র।

১৯৯০এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী একধাপ এগিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯৮ সালের মার্চে তারা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সর্বশেষ প্রযুক্তির একটা ফ্রিগেট অর্ডার করে; যা কিনা বঙ্গোপসাগরে ভাসমান যেকোন যুদ্ধজাহাজকে মান্ধাতার আমলের বানিয়ে ফেলার জন্যে যথেষ্ট। ২০০১ সালে এই জাহাজটা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে যুক্ত হলেও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির উদাহরণ হিসেবে জাহাজটাকে ডিকমিশন করা হয়। এতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আক্রমণ করার সক্ষমতা আগের অবস্থানেই থাকে; কিন্তু মিয়ানমারের এগিয়ে যাওয়া অব্যাহত থাকে। ২০০০এর প্রথম দিকে মিয়ানমার নৌবাহিনীর হাতে দু’টা কর্ভেটে যোগ হয় মোট ৮টা ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ১৯৯০এর দশকে নিজেদের জাহাজ তৈরির সক্ষমতা তারা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করে। তারা ‘৫-সিরিজ’এর ৪৭ মিটার লম্বা ১১টা জাহাজ তৈরি করে ফেলে ২০০৪ সাল নাগাদ। এর মাঝে ৩টা জাহাজকে তারা সজ্জিত করে ৪টা করে ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা। ২০০৮ সাল নাগাদ আরও ৬টা বোট যুক্ত হয়; যার মাঝে ২টা বোটে ২টা করে ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র দেয়া হয়। অর্থাৎ ২০০৮ সাল নাগাদ মিয়ানমারের নৌবাহিনীতে আরও ১৬টা জাহাজ-ধ্বংসী ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার যুক্ত হয়; যা তাদের মোতায়েনকৃত মোট ‘সি-৮০২’ লঞ্চারের সংখ্যা ৪৮-এ নিয়ে যায়।

অপরদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ২০০০ সালের পর থেকে কিছু পদক্ষেপ নেয়; যা তাদের গভীর সমুদ্রে অবস্থান করার সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করে। ব্রিটেন থেকে ৫টা পুরোনো ‘আইল্যান্ড-ক্লাস’ অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল যুক্ত হয় ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মাঝে। সাড়ে ১২’শ টনের এই জাহাজগুলি খুব বেশি অস্ত্র বহণ না করলেও এগুলি গভীর সমুদ্রে এক মাসেরও বেশি সময় অনায়াসে সার্ভেইল্যান্স চালাতে সক্ষম; যা কিনা ক্ষেপণাস্ত্রবাহী স্বল্প পাল্লার জাহাজগুলিকে সুযোগ বুঝে মোতায়েন করার সুবিধা করে দেয়। এবং একইসাথে ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে টার্গেট খুঁজে দিতে সহায়তা দেয়। এছাড়াও ২০০৮ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ‘বঙ্গবন্ধু’ জাহাজটাকে পুনরায় কমিশনিং করে এবং ২১ বছরের পুরোনো ‘টাইপ ০৫৩এইচ১’ ফ্রিগেট ‘ওসমান’এর ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে ৮টা ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপন করে। শুধু তা-ই নয়, নৌবাহিনী বঙ্গোপসাগরে ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্রের লাইভ ফায়ারিংএর মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতার জানান দেয়। কাজেই ২০০৮ সাল নাগাদ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে থাকে ৯টা মিসাইল বোট; যেগুলি মোট ২৬টা ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করছিলো। ‘ওসমান’এর ৮টা ক্ষেপণাস্ত্রসহ মোট ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার ছিল ৩৪টা; যা মিয়ানমারের তুলনায় বেশ খানিকটাই কম। মিয়ানমারের ১১টা মিসাইল বোটে তখন ছিল ৪০টা ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র; কর্ভেট দু’টাতে ছিল আরও ৮টা। প্রায় ১৮ বছরের চেষ্টায় মিয়ানমার নৌবাহিনী কতটুকু এগুলো, তার প্রমাণ পেতে তাদের নৌবাহিনী বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল ২০০৮ সালের অক্টোবরের শেষে।

মিয়ানমার নৌবাহিনীর আধুনিক ডিজাইনের ফ্রিগেট 'সিন ফায়ু শিন'; ডিজাইনের দিক থেকে যা সকলের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। কারণ জাহাজটাতে সর্বশেষ প্রযুক্তির বিভিন্ন রকমের স্টেলথ বৈশিষ্ট্য বাস্তবায়িত ছিল; যাতে এই জাহাজ শত্রু রাডারে অপেক্ষাকৃত ছোট একটা জাহাজ হিসেবে অবির্ভূত হয়। ভারতের সামরিক চিন্তাবিদদের মাঝে অনেকেই মিয়ানমারকে সামরিক সহায়তা দেয়ার জন্যে উঠেপড়ে লেগে যায়। বিশেষ করে মিয়ানমারের নতুন ফ্রিগেটের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ এয়ার ডিফেন্স রাডার এবং সাবমেরিন খোঁজার সোনার সরবরাহ করার জন্যে বলতে থাকে তারা।

ফ্রিগেট যুগে প্রবেশ - ২০০৮-২০১৫

২০০৭ সাল নাগাদ মিয়ানমার গ্যাস রপ্তানি করে আড়াই বিলিয়ন ডলার আয় করছিলো। ২০০৮ সালে মিয়ানমারের জিডিপি ছিল ২৩ বিলিয়ন ডলার। আর এর বিপরীতে বাংলাদেশের জিডিপি তখন ছিল প্রায় ৯২ বিলিয়ন ডলার। একদিকে গ্যাস বিক্রির অর্থ মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে যেমন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিচ্ছিলো, তেমনি নৌবাহিনীকে ঢেলে সাজানোর কাজটাও তাদের জন্যে বেশ সহজ হয়ে গিয়েছিল। মিয়ানমারের রাখাইনের উপকূলে ২০০৮এর অক্টোবরের শেষে গ্যাস ড্রিলিং করার জন্যে ৪টা জাহাজ মোতায়েন করে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি ‘দাইয়ু’। মিয়ানমারের নৌবাহিনী তাদেরকে কাভার করছিলো। জায়গাটা বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ থেকে ৫০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে। নভেম্বরের ২ তারিখ থেকে বাংলাদেশ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলে যে, জায়গাটা বাংলাদেশের। সমুদ্র সীমানা নির্দিষ্ট না থাকায় কেউই তাদের দাবি ছেড়ে দিতে চায়নি। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ তিনটা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে - ৩৩ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ ফ্রিগেট ‘আবু বকর’; লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট ‘মধুমতি’ এবং ‘টাইপ ০৩৭’ সাবমেরিন চেজার ‘নির্ভয়’। আরও কিছু জাহাজ কাছাকাছি ছিলো নিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারকে বলে যে, সংঘাত হলে কোরিয়ার জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে; কাজেই তাদের উচিৎ হবে মিয়ানমার সরকারকে পিছু হঠতে রাজি করানো। অবশেষে এই হুমকিতেই কাজ হলো।

মিয়ানমার নৌবাহিনী বুঝতে পারে যে, ৪৮টা ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার থাকাটাই যথেষ্ট নয়। কারণ সকল সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার সুযোগ না-ও হতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়লে নিজেদের ক্ষতিই বেশি হতে পারে। কারণ যুদ্ধ শুরু হলে মিয়ানমার সমুদ্রে তার বিদেশী বিনিয়োগ হারাতো। বাংলাদেশের মূল নৌঘাঁটি চট্টগ্রাম থেকে সংঘাতের স্থান ছিল প্রায় ১’শ ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরে। সেই তুলনায় জায়গাটা মিয়ানমারের সিতওয়ে (আকিয়াব) এবং কিউকপিউ থেকে অপেক্ষাকৃত অনেক কাছে ছিল। তথাপি প্রায় এক সপ্তাহ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলি অনায়াসে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছিলো; যা কিনা মিয়ানমার নৌবাহিনীকে নতুন কিছু শেখায়। বাংলাদেশের ফ্রিগেট ‘আবু বকর’ কমান্ড শিপ হিসেবে কাজ করেছিলো। অপরদিকে মিয়ানমারের হাতে ‘আনাওরাহতা’ এবং ‘বায়িনং’ কর্ভেটগুলির বাইরে ছিল মিসাইল বোটগুলি, ‘টাইপ ০৩৭’ সাবমেরিন চেজার এবং ৪৭ মিটার প্যাট্রোল ক্রাফট। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, দক্ষিণ কোরিয় ড্রিলিং জাহাজের ক্রুদের ভয় দেখাবার জন্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলির দিবারাত্র সার্ভেইল্যান্সই যথেষ্ট ছিল; তাদেরকে মিসাইল দেখাতে হয়নি। একবার গোলাগুলি শুরু হলে এই জাহাজগুলিই নিখুঁতভাবে মিসাইলের জন্যে টার্গেট খুঁজে দিতো। তখন কেউ চিন্তা করতো না যে মিসাইলগুলি কোথা থেকে ছোঁড়া হয়েছে। সার্ভেইল্যান্স এবং টার্গেট খোঁজার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে মিয়ানমারের চাইতে অনেক এগিয়ে রয়েছে, তা মিয়ানমার হারে হারে বুঝেছিল। ২০০৮ সালের এই ঘটনা একারণেই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ব্যাপারটা এমন নয় যে, ২০০৮এর আগে মিয়ানমার ফ্রিগেটের গুরুত্ব বোঝেনি। ২০০৮ সালেই মিয়ানমারের শিপইয়ার্ডে পানিতে নামানো নয় তাদের প্রথম নিজস্ব ডিজাইনের ফ্রিগেট। ‘অংজেয়া’ নামে জাহাজটার কমিশনিং হতে লেগে গেছে আরও দুই বছর। তবে এই ফ্রিগেটের ইলেকট্রনিক্স প্রায় কিছুই ছিল না। ২০১২ সালে মিয়ানমার সফরে যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তখন ভারতের সামরিক চিন্তাবিদদের মাঝে অনেকেই মিয়ানমারকে সামরিক সহায়তা দেয়ার জন্যে উঠেপড়ে লেগে যায়। বিশেষ করে মিয়ানমারের নতুন ফ্রিগেটের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ এয়ার ডিফেন্স রাডার এবং সাবমেরিন খোঁজার সোনার সরবরাহ করার জন্যে বলতে থাকে তারা। কারণ ২০১২ সালের এপ্রিলে চীনারা মিয়ানমারকে দু’টা ‘টাইপ ০৫৩এইচ১’ ফ্রিগেট সরবরাহ করে মিয়ানমার নৌবাহিনীর সাথে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর করে। প্রায় সাথেসাথেই এই জাহাজগুলিকে আপগ্রেড করে এতে ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূর পাল্লার ‘টাইপ ৫১৭’ ‘এ-ব্যান্ড’এর ভিএইচএফ রাডার সংযুক্ত করা হয়। অপরদিকে ভারত চাইছিলো সেখানে চীনের প্রভাবকে প্রতিস্থাপিত করতে। আর ইতোমধ্যেই প্রচার হয়ে গেছে যে মিয়ানমার নৌবাহিনী আরও দুই খানা ফ্রিগেট পানিতে ভাসিয়েছে; যার মাঝে প্রথমটা, ‘কায়ান সিত্তার’ ২০১৪ সালের মার্চে এবং ‘সিন ফায়ু শিন’ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে কমিশনিং করা হয়। উভয় জাহাজই ডিজাইনের দিক থেকে সকলের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। কারণ জাহাজগুলিতে সর্বশেষ প্রযুক্তির বিভিন্ন রকমের স্টেলথ বৈশিষ্ট্য বাস্তবায়িত ছিল; যাতে জাহাজগুলি শত্রু রাডারে অপেক্ষাকৃত ছোট একটা জাহাজ হিসেবে অবির্ভূত হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ মিয়ানমারের তিনটা ফ্রিগেটই ভারতে তৈরি রাডারে সজ্জিত হিসেবে দেখা যায়। ডাচ কোম্পানি ‘সিগনাল’এর কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে তৈরি করা ২’শ ৭০কিঃমিঃ পাল্লার ‘এল-ব্যান্ড’এর ‘আরএডব্লিউএল-০২ মার্ক৩’ রাডারগুলি তৈরি করেছে ভারতীয় কোম্পানি ‘ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড’ বা ‘বিইএল’। এই একই রাডার ১৯৯০এর দশকে তৈরি জার্মান নৌবাহিনীর ‘ব্র্যান্ডেনবার্গ-ক্লাস’ ফ্রিগেটে ব্যবহার করা হয়েছে। অপেক্ষাকৃত পুরোনো প্রযুক্তির হলেও এই রাডার এখনও যথেষ্টই কার্যকর; বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে তাদের প্রতিযোগী ধরলে।

একইসাথে ভারত মিয়ানমারের এই তিন জাহাজের জন্যে সাবমেরিন খোঁজার সোনার বিক্রি করে। জাহাজগুলিতে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ইতালিতে তৈরি ‘আটো মেলারা সুপার র‍্যাপিড’ ৭৬মিঃমিঃ কামান; যা মিনিটে ১’শ ২০ রাউন্ড গোলা ছুঁড়তে সক্ষম। এর তুলনায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ‘বঙ্গবন্ধু’ জাহাজের ৭৬মিঃমিঃ ‘অটো মেলারা কমপ্যাক্ট’ কামান মিনিটে ৮৫ রাউন্ড গুলি ছুঁড়তে সক্ষম। প্রতিপক্ষের জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিজেকে রক্ষা করতে এতে যুক্ত হয়েছে ডেকয় সিস্টেম এবং তিনটা করে ৩০মিঃমিঃ গ্যাটলিং গান। তিনটা জাহাজেই চীনা নির্মিত ‘সি-৮০২’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বসানো হয়। বিমান প্রতিরক্ষার জন্যে এগুলিতে বসানো হয়েছে অতি স্বল্প (৬কিঃমিঃ) পাল্লার ‘ইগলা’ ক্ষেপণাস্ত্র। জাহাজগুলির ইঞ্জিন হলো ফ্রান্সে তৈরি ‘এসইএমটি পিয়েলস্টিক ১৬ পিএ৬ এসটিসি’, যা মোট ২২ হাজার ৮’শ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। বাংলাদেশের ‘বঙ্গবন্ধু’ জাহাজ থেকে যা ৩৬ শতাংশ বেশি শক্তি দেবে। একারণে ৩ হাজার টনের এই জাহাজগুলির সর্বোচ্চ গতিবেগ বলা হচ্ছে ঘন্টায় প্রায় ৩০ নটিক্যাল মাইল এবং এগুলির পাল্লা হবে প্রায় ৩ হাজার ৮’শ নটিক্যাল মাইল। এছাড়াও জাহাজগুলিতে যুক্ত করা হয়েছে ব্রিটেনে তৈরি ‘সেইলর’ স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন সিস্টেম। প্রতিটা জাহাজে রয়েছে হেলিকপ্টার বহণ করার জন্যে হেলিপ্যাড এবং হ্যাঙ্গার।

মিয়ানমার নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র কম নেই। ফ্রিগেটগুলি তৈরির আগেই তাদের কাছে ছিল ৪৮টা ‘সি-৮০২’ লঞ্চার। পাঁচ বছরের মাঝে পাঁচটা ফ্রিগেট এবং ২০১৫ সালে ৪৯ মিটার লম্বা একটা স্টেলথ ডিজাইনের মিসাইল বোট যুক্ত হওয়ায় আরও ৪৪টা ‘সি-৮০২’ লঞ্চার যুক্ত হয় তাদের নৌবাহিনীতে; যা কিনা ২০১৫ সাল নাগাদ মোট ‘সি-৮০২’ লঞ্চারের সংখ্যা নিয়ে যায় ৯২টাতে। ২০০৯ সাল নাগাদ বাংলাদেশ নৌবাহিনী অবশেষে মিয়ানমারের দৌড়ের ব্যাপারটা আমলে নিয়েছিল। চীন থেকে অর্ডার করা হয় ‘দুর্জয়-ক্লাস’এর ২টা লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট, যেগুলি মিয়ানমারের ছোট মিসাইল বোটগুলিকে টার্গেট করে অপেক্ষাকৃত ছোট (১’শ ৩০ কেজি ওয়ারহেড) ৩৫কিঃমিঃ পাল্লার ‘সি-৭০৪’ ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত করা হয়। ‘টাইপ ০২১’ মিসাইল বোটগুলিতে ৪টা করে ‘সি-৭০৪’ দ্বারা ‘সিল্কওয়ার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিস্থাপিত করা হয়। ব্রিটেন থেকে ‘ক্যাসল-ক্লাস’এর দু’টা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল কিনে এনে সেগুলিকে ৪টা করে ‘সি-৭০৪’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটা করে ৭৬মিঃমিঃ কামান দ্বারা সজ্জিত করে কর্ভেটে রূপান্তর করা হয়। ২টা ‘টাইপ ০৫৩এইচ২’ ফ্রিগেট কেনা হয় চীন থেকে; যেগুলি ১’শ ২০কিঃমিঃ পাল্লার ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা সজ্জিত। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দু’টা ‘হ্যামিল্টন-ক্লাস’ কাটার বা ফ্রিগেট কেনা হলেও সেগুলি মূলতঃ ট্রেনিং জাহাজ হিসেবেই সার্ভিসে যুক্ত করা হয়। তাই এগুলিতে নতুন করে কোন অস্ত্র সজ্জিত করা হয়নি; বরং দ্রুত নাবিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করাটাই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালের মাঝেই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় চীন থেকে তৈরি করে আনা দু’টা ‘টাইপ ০৫৬’ কর্ভেট; যেগুলি ৪টা করে ১’শ ৮০কিঃমিঃ পাল্লার ‘সি-৮০২এ’ ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা সজ্জিত। ২০১৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে মোট ৮২টা জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার যুক্ত হয়েছে; যার মাঝে রয়েছে ৮টা ‘অটোম্যাট’, ২৪টা ‘সি-৮০২’, ১০টা ‘সিল্কওয়ার্ম’, ৩২টা ‘সি-৭০৪’ এবং ৮টা ‘সি-৮০২এ’। এছাড়াও চীন থেকে অর্ডার করা হয় আরও দু’টা ‘টাইপ ০৫৬’ কর্ভেট এবং প্রথমবারের মতো খুলনা শিপইয়ার্ড থেকে অর্ডার করা হয় দু’টা ‘দুর্জয়-ক্লাস’ লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট; যেগুলি ক্ষেপণাস্ত্রের স্থলে বহণ করছে ৬টা করে সাবমেরিন ধ্বংসী টর্পেডো টিউব। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এন্টি-সাবমেরিন জাহাজ তৈরি করলো বাংলাদেশ। এর মূল কারণ হলো, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই তাদের প্রথম সাবমেরিন অর্ডার করেছিল এবং শোনা যাচ্ছিলো যে, মিয়ানমারও সাবমেরিন পেতে চাইছে। চীনের কাছ থেকে ২টা ‘টাইপ ০৫৩এইচ৩’ পাওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল; যেগুলি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতাকে, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতাকে আবারও একধাপ এগিয়ে নেয়। ২০১৯-২০ অবধি এই ফ্রিগেট, কর্ভেট এবং এলপিসিগুলির ডেলিভারি পাওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদশ নৌবাহিনী মিয়ানমার নৌবাহিনী থেকে কিছুটা পিছিয়েই থাকে।

তবে মিয়ানমারের ফ্রিগেটগুলির রাডার এবং সোনার তাদেরকে এমন কিছু সক্ষমতা দিয়েছে, যা তাদেরকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে। এটা ছিল ভারতের তৃতীয় নিরাপত্তা চিন্তা - প্রক্সি হিসেবে মিয়ানমারকে ব্যবহার। বাংলাদেশ সাবমেরিন পেতে চাইছে জানার পর থেকেই ভারত উঠেপড়ে লাগে মিয়ানমারের জাহাজগুলিকে এন্টি-সাবমেরিন সোনার দিয়ে সজ্জিত করতে। এর আগে বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের নীতি ফেলে দিতে বাধ্য হওয়ায় এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনী ভারতের দ্বিতীয় নিরাপত্তা চিন্তা অর্থনৈতিক অবরোধকে এড়াতে নিজেকে শক্তিশালী করতে থাকায় এই তৃতীয় চিন্তাতে যেতে বাধ্য হয় ভারত।

২০২০ সাল। মিয়ানমারের প্রথম সাবমেরিন; যা তারা পায় ভারত থেকে। মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্যে কাউকেই যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের সন্মুখীন হতে হয়নি। অথচ যুক্তরাষ্ট্র জানে যে, মিয়ানমারের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ এখন ভারত। এহেন দ্বিমুখী নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো মিয়ানমারে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা ও রাখাইনে চীনের গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি; এবং একইসাথে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের নৌ-উত্থান নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে অত্র অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের নৌ-আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়ে।

ত্রিমাত্রিক মিয়ানমার নৌবাহিনী - ২০০৬-২০২০

২০১৬ সালে আবারও মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সংঘাত শুরু হয়; যেখানে পশ্চিমা ইন্টেলিজেন্সের ইন্ধন থাকার কথা বলেছেন অনেকেই। মিয়ানমারে অনেকেই বিশ্বাস করতে থাকে যে, বাংলাদেশ পশ্চিমা প্রক্সি হয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সদস্যের উপরে হামলার কাজ করেছে। তবে মিয়ানমারের সরকার এই সুযোগে ১০ লক্ষের বেশি মুসলিমকে রাখাইন প্রদেশ থেকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। একইসাথে হাজারো মানুষকে হত্যা করে গণহত্যার উদাহরণ তৈরি করে তারা। পরবর্তীতে মিয়ানমারের নোবেল প্রাইজ জয়ী গণতান্ত্রিক নেতা অং সান সু কি আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন। রাখাইনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলি জানতো যে, মিয়ানমার সরকারি বাহিনীর উপর হামলা এই পরিস্থতির জন্ম দেবে। যাদেরকে হত্যা করা হবে এবং শরণার্থী বানানো হবে, তারা তো তাদেরই ভাই-বোন-সন্তান। কাজেই এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, মিয়ানমার বাহিনীর উপর হামলা পশ্চিমা ইন্ধনেই হয়েছে। এই ঘটনা মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের মাঝে সম্পর্ককে স্বায়ীভাবে নষ্ট করে এবং বঙ্গোপসাগরে অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে ইন্ধন যোগায়; যদিও মিয়ানমার ২০১৬ সালের আগে থেকেই নিজেকে অস্ত্রসজ্জিত করছিলো।

২০০৬ সালে মিয়ানমারকে ভারত ২টা ‘ব্রিটেন-নরমান বিএন-২ আইল্যান্ডার’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান দেয়। ব্রিটেনে তৈরি এই বিমানগুলি ভারতীয় নৌবাহিনী ব্যবহার করছিলো অনেক বছর ধরে। পুরোনো এই বিমানগুলি মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে দিয়ে বঙ্গোপসাগরে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করছে ভারত। পরের বছর তারা আরও দু’টা বিমান সরবরাহ করে। এই বিমানগুলির মাধ্যমে মিয়ানমারের নৌবাহিনী প্রথমবারের মতো আকাশ থেকে সার্ভেইল্যান্স করা এবং তাদের জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলির জন্যে টার্গেট খোঁজার সক্ষমতা পায়। অপরদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে প্রথমবারের মতো দু’টা ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান (ডর্নিয়ার ডিও-২২৮এনজি) যুক্ত হয় ২০১৩ সালে। এর আগে দু’টা ‘আগুস্টা এডব্লিউ ১০৯’ হেলিকপ্টার যুক্ত হয় ২০১১ সালে। ২০২০ সালে মিয়ানমার নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় অস্ট্রিয়ায় নির্মিত ‘শাইবেল এস-১০০ ক্যামকপ্টার’ ম্যারিটাইম সার্ভেইল্যান্স ড্রোন। এই ড্রোনগুলি মিয়ানমারের ফ্রিগেট এবং কর্ভেটগুলির টার্গেট খুঁজে পাবার সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও ২০১৭ সালে মিয়ানমার বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয় ‘এটিআর-৪২’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান। এগুলিও মিয়ানমার নৌবাহিনীকে সার্ভেইল্যান্সের মাধ্যমে সহায়তা দিতে পারবে। বিমান সংযোজন ছিল নৌবাহিনীর দ্বিতীয় মাত্র। তবে তৃতীয় মাত্রাটা ছিল কৌশলগত দিক থেকে সবচাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে সাবমেরিন যুক্ত হয় ২০১৬ সালে। ভারতের নীতিনির্ধারকদের মাঝে অনেকেই এটা মেনে নিতে পারেনি। বিশেষ করে বাংলাদেশ চীন থেকে সাবমেরিন কেনায় দিল্লীর মাথাব্যাথা শুরু হয়ে যায়। বাংলাদেশের নৌবাহিনী থেকে ভারতের নৌবাহিনী কমপক্ষে ৫০ গুণ শক্তিশালী হবার পরেও বাংলাদেশের সাবমেরিনকে নিয়ন্ত্রণ করতে মিয়ানমারকে সাবমেরিন খোঁজার সোনার এবং এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো সরবরাহ করতে উঠেপড়ে লাগে ভারত। একইসাথে নিজেদের বাহিনী থেকে রিটায়ার করা রুশ নির্মিত ‘কিলো-ক্লাস’এর সাবমেরিন মিয়ানমারকে দেয়ার জন্যে অগ্রগামী হয় ভারত। ২০২০ সালে মিয়ানমার নৌবাহিনীতে ‘কিলো-ক্লাস’এর সাবমেরিন যুক্ত হবার মাধ্যমে মিয়ানমার নৌবাহিনী ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে পরিণত হয়। শুধু তা-ই নয়, মিয়ানমারে ভারতের প্রভাবকে ব্যালান্স করতে চীনও মিয়ানমারকে ‘টাইপ ০৩৫জি’ সাবমেরিন সরবরাহ করে ২০২১ সালে।

 


এর আগে ২০১৯ সালে মিয়ানমার নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় সাড়ে ১২ হাজার টনের উভচর মিশনের জাহাজ ডক ল্যান্ডিং শিপ বা এলপিডি ‘মোয়াত্তামা’। জাহাজটা তৈরি করে দক্ষিণ কোরিয়া; যে কিনা যুক্তরাষ্ট্রের খুবই কাছের বন্ধু দেশ। মিয়ানমার নৌবাহিনীর সবচাইতে বড় এই জাহাজ ২৫টা ট্যাংক এবং ৫’শ ২০ জন সেনা বহণ করতে পারে এবং একাধিক হেলিকপ্টার ল্যান্ডিং এবং বহণের সুবিধা রয়েছে এতে। ‘মোয়াত্তামা’ জাহাজটাকে প্রথমবারের মতো মিশনে পাঠানো হয় ২০২২ সালের জুন মাসে। জাহাজটা রাখাইন প্রদেশের কিউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে নোঙ্গর করে। পরে জাহাজটা সিতওয়ের উত্তরে মায়ু নদীর মোহনায় আহ নগু মাও জেটিতে সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেয়। সুউচ্চ এবং দুর্গম আরাকান পর্বতের কারণে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ বাকি মিয়ানমার থেকে প্রায় আলাদা। তাই মিয়ানমারের বাকি এলাকা থেকে রাখাইনে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর মূল পদ্ধতিই হলো সমুদ্রপথ। ‘মোয়াত্তামা’ জাহাজ এখন মিয়ানমার নৌবাহিনীর ফ্ল্যাগশিপ। এতে রয়েছে অত্যাধুনিক কমিউনিকেশন সরঞ্জাম। পশ্চিমারা যা-ই বলুক না কেন, তাদের তৈরি করা সামরিক কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি মিয়ানমারের হাতে পোঁছানোটা তাদের গোপন ইচ্ছারই প্রতিফলন। এই জাহাজে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় তৈরি ‘ব্যারেট ৪০৫০’ এইচএফ ট্রানসিভার, ইতালিতে তৈরি ‘এলমান আরএক্সএইচ-৮১৬১আর’ এমএফ-এইচএফ রিসিভার, চীনা কোম্পানি ‘হাইটেরা’র তৈরি ‘এমআর-৯৫৬০’ ভিএইচএফ ট্রানসিভার এবং জাপানে তৈরি ‘আইকম আইসিএম-৭১০’ এমএফ-এইচএফ ট্রানসিভার।

‘মোয়াত্তামা’ জাহাজটাকে সমর্থন দিচ্ছে পুরোনো ১২টা ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং মিয়ানমারের নিজস্ব তৈরি ৬টা এলসিএম (৫৬ মিটার লম্বা; ৪টা ট্যাংক বহণ করে) এবং ২০টা এলসিটি (২৯ মিটার লম্বা; ২টা ট্যাংক বহণ করে)। এলসিএম-গুলি তৈরি করা হয় ২০০৫ থেকে ২০২০ সালের মাঝে। আর এলসিটি-গুলি তৈরি করা হয় ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মাঝে। এই জাহাজগুলি মূলতঃ মার্কিন ল্যান্ডিং ক্রাফটের অনুসারে ডিজাইন করা হয়েছে। এই ডিজাইনের বিশেষত্ব হলো, এই বোটগুলি বড় উভচর জাহাজের পিছনের ডকের ভিতরে ঢুকে যায় এবং জাহাজের ভেতর থেকে সামরিক গাড়িগুলি সরাসরি এই বোটগুলিতে উঠে যায়। যেকারণে এগুলির সুপারস্ট্রাকচার থাকে ছোট এবং নিচু; গাড়ি ওঠাবার সুবিধা থাকে বেশি। মোটকথা উভচর সক্ষমতা তৈরিতে মিয়ানমার যুক্তরাষ্ট্রকেই অনুসরণ করেছে। ‘মোয়াত্তামা’ জাহাজ থেকে সেনা, গাড়ি এবং রসদ দ্রুত উপকূলে নামাবার জন্যে এই ল্যান্ডিং ক্রাফটগুলি সহায়তা করবে। অপরদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ল্যান্ডিং ক্রাফটগুলি চওড়া এবং সুপারস্ট্রাকচার বেশ বড় এবং উঁচু। এগুলিকে ডিজাইন করা হয়েছে উপকূলের একস্থান থেকে অন্যস্থানে সৈন্য নিয়ে যাওয়ার জন্যে।

ইস্রাইলের কাছ থেকে কিছু ‘সুপার ভোরা’ প্যাট্রোল ক্রাফটও কিনেছে মিয়ানমার। ২০১৬ সালে যুক্ত হয়েছে কর্ভেট ‘তাবিনশোয়েতি’; যেটাতে ৪টা ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে যুক্ত হয়েছে ভারতীয় রাডার, সোনার এবং এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো। ২০২০ সালে তারা যুক্ত করেছে ২টা সাবমেরিন চেজার; যেগুলির একেকটা ৬টা করে ভারতীয় ‘শায়েনা’ এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো দ্বারা সজ্জিত; বাংলাদেশের সাবমেরিন যেগুলির টার্গেট। ২০২০ সালে যুক্ত হয়েছে স্টেলথ ডিজাইনের ২য় ৪৯ মিটার লম্বা মিসাইল বোট; যেগুলিতে বহণ করা হচ্ছে ৪টা করে ‘সি-৮০২’ ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৭ এবং ২০২১ সালে যুক্ত হয়েছে দু’টা ওপিভি।


মিয়ানমার নৌবাহিনী - একটা বিশ্লেষণ

এখনও মিয়ানমার নৌবাহিনীর একটা বড় অংশ হলো প্যাট্রোল বোট এবং লজিস্টিকস জাহাজ। ১৩টা মিসাইল বোটের সাথে রয়েছে মোটামুটিভাবে বড় আকারের ৪০টা প্যাট্রোল ক্রাফট। ছোট আকারের বোট রয়েছে বহু। এগুলি দেখিয়ে দেয় মিয়ানমারের ১৪’শ কিঃমিঃ উপকূল এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা। কিন্তু ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান, ম্যারিটাইম ড্রোন, সাবমেরিন, ডক ল্যান্ডিং শিপ, ফ্রিগেট, কর্ভেট, মিসাইল বোট, ইত্যাদি সকল কিছুই গত তিন দশকের মাঝে যুক্ত হয়েছে মিয়ানমার নৌবাহিনীতে। ১৯৮০এর দশকের সেই মিয়ানমার নৌবাহিনী এখন আর নেই; যখন বাংলাদেশের নৌবাহিনীর ধারেকাছেও ছিল না তাদের সক্ষমতা। তখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং বিশাল উপকূলে আইন শৃংখলা বজায় রাখাই ছিল মিয়ানমার নৌবাহিনীর মূল কাজ। অপরদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রথম থেকেই ফ্রিগেট, কর্ভেট, ওপিভি এবং অন্যান্য দূর পাল্লার জাহাজের উপরে নির্ভর করেছে। কারণ বাংলাদেশের নৌ-চিন্তাতে সমুদ্র বাণিজ্যের নিরাপত্তা সবসময় প্রাধান্য পেয়েছে।

কিন্তু ১৯৯০এর দশক থেকেই মিয়ানমার নৌবাহিনী বাংলাদেশকে টার্গেট করে নিজেদের ডেভেলপ করতে থাকে। রাখাইন প্রদেশে ১৯৯১ সাল থেকে শুরু হওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে বাংলাদেশ পশ্চিমাদের প্রক্সি হয়ে ইন্ধন যোগাচ্ছে - এটা মিয়ানমারের অনেকেই বিশ্বাস করে। এছাড়াও ২০০৮ সালের নৌ-উত্তেজনা দেখিয়ে দেয় যে, মিয়ানমার তার সমুদ্র সম্পদ আহরণের নিরাপত্তা দিতেও সমধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ এটা তাদের অর্থনীতিতে বিরাট অংকের বৈদেশিক মুদ্রা যোগাচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও চাইছে মিয়ানমারের নৌবাহিনী শক্তিশালী হোক। একারণে ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়া মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে সক্ষমতার দিক থেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। চীন মিয়ানমারকে অনেক অস্ত্রই দিয়েছে; কিন্তু সেগুলি বাংলাদেশের থেকে এগিয়ে যাবার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। অপরদিকে ভারতের দেয়া সাবমেরিন, রাডার, সোনার, এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো, ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দেয়া ডক ল্যান্ডিং শিপ মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে ‘ব্লু-ওয়াটার নেভি’ হিসেবে গড়ে দিয়েছে। মিয়ানমারের নৌবাহিনীর লক্ষ্য হলো বঙ্গোপসাগরে বড় বড় শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্যের একপ্রকারের খিচুরি।

পশ্চিমা দেশগুলি মিয়ানমারকে নামে বেনামে বিভিন্নভাবে অস্ত্র, ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের তৈরি করা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সুবিধা নিয়েই মিয়ানমার এগুলি করেছে। মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্যে কাউকেই যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের সন্মুখীন হতে হয়নি। অথচ যুক্তরাষ্ট্র জানে যে, মিয়ানমারের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ এখন ভারত। এহেন দ্বিমুখী নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো মিয়ানমারে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা ও রাখাইনে চীনের গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি; এবং একইসাথে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের নৌ-উত্থান নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে অত্র অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের নৌ-আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে কাছের বন্ধু দক্ষিণ কোরিয়া চুপিসারে মিয়ানমারের জন্যে সাড়ে ১২ হাজার টনের বিশাল ডক ল্যান্ডিং শিপ তৈরি করে দিয়েছে; যা এখন রাখাইনে গণহত্যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ করছে। এবং একইসাথে এই জাহাজের মাধ্যমে মিয়ানমার প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের উপর সত্যিকারের হুমকি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই জাহাজের কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি এসেছে অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, জাপান এবং চীন থেকে। মিয়ানমার নৌবাহিনীর বড় যুদ্ধজাহাজগুলির বেশিরভাগই এখন ইতালিতে তৈরি ৭৬মিঃমিঃ কামান, ভারতে তৈরি রাডার, সোনার ও টর্পেডো এবং ব্রিটেনে তৈরি স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি দ্বারা সজ্জিত। ভারত আবার এই রাডার তৈরি করেছে ডাচ কোম্পানি ‘সিগনাল’ (বর্তমানে থালেস)এর লাইসেন্স নিয়ে। অথচ বাংলাদেশ চীন থেকে সাবমেরিন কেনার পর সারা দুনিয়ার মিডিয়ায় যেন ভূমিকম্প হয়ে গিয়েছিল! চীনের সহায়তায় কক্সবাজারের পেকুয়াতে বাংলাদেশের ‘সাবমেরিন ফ্লীট হেডকোয়ার্টার্স’ তৈরিও ভারত ও পশ্চিমারা পছন্দ করেনি। কারণ বাংলাদেশের হাতে ‘সাবমেরিন ফ্লীট’ বা শক্তিশালী নৌবাহিনী পশ্চিমাদের বঙ্গোপসাগর নিয়ন্ত্রণ-চেষ্টার বিরুদ্ধে। এখন তারা চাইছে মিয়ানমারকে প্রক্সি হিসেবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে; যাতে করে কোন একটা সময় মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যুদ্ধ লাগিয়ে বাংলাদেশের সামরিক শক্তিকে নিঃশেষ করে ফেলা যায়। একারণেই তারা রাখাইনের মুসলিম শরণার্থীদের নিজেদের ভূমিতে ফেরত যাবার বিরোধী। তারা চাইছে এই মানুষগুলিকে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে অমানুষিক পরিবেশে রেখে দিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সাবভার্সনে ব্যবহার করতে এবং মিয়ানমারের সাথে সংঘর্ষে জ্বালানি হিসেবে পোড়াতে। চিন্তাহীন মিয়ানমারও না বুঝেই সেই পথেই হাঁটছে। ১৯৯১ সাল থেকে মিয়ানমার নৌবাহিনীর একটাই কাজ - বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করা; যা কিনা বঙ্গোপসাগরে পশ্চিমা আদর্শিক শক্তিদের লক্ষ্যের বাস্তবায়নে একটা অধ্যায়।



সূত্রঃ


‘BNS Abu Bakar - Ex RN Frigates (BNS UF,AB,AH)’ in Global Security (https://www.globalsecurity.org/military/world/bangladesh/bns-abu-bakr.htm)

‘Rohingya exodus in 1978: A history of systematic eviction’ by Probir Kumar Sarker, Dhaka Tribune, 31 August 2021

‘Myanmar and Israel develop military pact’ by William Ashton in Jane's Intelligence Review, 01 March 2000

‘Myanmar Navy Latest Corvette UMS Tabinshwehti Likely Operational’ in Navy Recognition, 15 November 2016

‘Daewoo to explore more gas in Myanmar’ in Mint, 06 April 2007

‘Bangladesh and Burma send warships into Bay of Bengal’ in The Guardian, 04 November 2008

‘Myanmar stops disputed gas exploration -Bangladesh officials’ in Reuters, 06 November 2008

‘Navy decommissions first two frigates’ in Dhaka Tribune, 22 January 2014

‘Upsurge in Indo-Myanmar Naval Cooperation’ by Rear Admiral (ret) Sushil Ramsay in SP’s Naval Forces, Issue 4, 2013

‘Tự đóng chiến hạm tàng hình cỡ lớn, CNQP Myanmar đã vượt mặt VN’ in SOHA, 11 December 2015 (in Vietnamese) (https://soha.vn/quan-su/tu-dong-chien-ham-tang-hinh-co-lon-cnqp-myanmar-da-vuot-mat-vn-20151211001902439.htm)

‘RAWL-02’ in Radar Tutorial (https://www.radartutorial.eu/19.kartei/07.naval2/karte038.en.html)

‘LW 08 “Jupiter”’ in Radar Tutorial (https://www.radartutorial.eu/19.kartei/07.naval/karte005.en.html)

‘Update: Myanmar Navy commissions its first LPD amphibious assault ship’ in Janes, 27 December 2019

‘Myanmar Navy has commissioned seven new warships and one submarine’ in Navy Recognition, 26 December 2020

‘Myanmar Navy commissions Type 35B Ming-class submarine’, in Naval Technology, 27 December 2021

‘Myanmar Navy commissions Type 035 Ming-class submarine’ in Naval Today, 27 December 2021

‘75th Anniversary Tatmadaw (Navy): Commissioning Ceremony of Navy Vessels’ in MITV, 24 December 2022

‘Myanmar gets India's maritime aircraft’ in Hindustan Times, 12 May 2007

‘Bangladesh Navy Do228NG emerges from its stable’ in Scramble, 20 October 2021

‘S-100 Camcopter Operating Onboard of Myanmar Navy's Ships’ in Defense Studies, 27 July 2020 (http://defense-studies.blogspot.com/2020/07/s-100-camcopter-operating-onboard-of.html)

‘Myanmar: Fact-finding mission identifies businesses linked to the military that is accused of serious rights violations; some companies respond’ in Business and Human Right Resource Centre, 13 February 2020 (https://www.business-humanrights.org/en/latest-news/myanmar-fact-finding-mission-identifies-businesses-linked-to-the-military-that-is-accused-of-serious-rights-violations-some-companies-respond/)

‘Chinese Supply Submarines to Bangladesh (Gravitas)’ in WION, 19 November 2016 (https://www.youtube.com/watch?v=hc-J96QmJ_o)

‘India’s World- Chinese submarines and Sino-Bangladesh defence ties’ in SansadTV, 22 November 2016 (https://www.youtube.com/watch?v=2BOqaLnIZ6s)

‘Bangladesh in Submarine Era : Amb. Muhammad Zamir and Maj. Gen. Abdur Rashid’ in EkattorTV, 29 March 2017 (https://www.youtube.com/watch?v=FpFPcYOUaOw&t=14s)

‘The Myanmar military are using Australian radios to commit atrocities’ in Justice for Myanmar, 18 October 2021 (https://www.justiceformyanmar.org/stories/the-myanmar-military-are-using-australian-radios-to-commit-atrocities)

‘What Myanmar’s New Amphibious Ship Says About Its Naval Ambitions’ by Mohammad Rubaiyat Rahman in The Diplomat, 09 November 2019

‘India gifts a submarine to Myanmar, gains edge over China’ in The Hindustan Times, 21 October 2020

‘With an eye on China, India gifts submarine to Myanmar’ in Nikkei Asia, 22 October 2020

‘Myanmar Navy boosts amphibious capability, adds UAV’ in Janes, 03 January 2019

‘Myanmar Navy flagship supports troop buildup in western Rakhine’ in Janes, 06 June 2022

‘Landing Craft, Mechanized and Utility - LCM/LCU’ in America’s Navy, updated 17 Jan 2019 (https://www.navy.mil/Resources/Fact-Files/Display-FactFiles/Article/2171588/landing-craft-mechanized-and-utility-lcmlcu/)

‘Myanmar Navy commissions seven new vessels’ in Mizzima, 29 December 2017

‘Myanmar Navy Commissions Some Asset’ in Defense Studies, 27 December 2016 (http://defense-studies.blogspot.com/2016/12/myanmar-navy-commissions-some-asset.html)

‘Myanmar Strengthens Navy’ in TurDef, 23 January 2023

‘Australian, Italian Chinese & Japanese biz provided comms systems for Myanmar Navy’s UMS Mottama warship’ by Justive for Myanmar, 24 May 2023 (https://twitter.com/JusticeMyanmar/status/1661314128991092737)