Saturday, 8 July 2023

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালি থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী সরিয়ে নেবার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

০৮ই জুলাই ২০২৩

মালি, সেপ্টেম্বর ২০১৭। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা মিশনে নিহত তিনজন বাংলাদেশী সেনার মৃতদেহ বহণ করছে। শক্তিশালী দেশগুলির ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বলি হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের ৩ শতাধিক সেনা; যারা অর্থের বিনিময়ে মালির মরুভূমিতে শক্তিশালী দেশগুলির স্বার্থরক্ষা করেছে।

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর মিশন ২০২৩এর ৩০ জুন পর্যন্ত থাকার কথা ছিল, যদি সেই মিশনের সময় বৃদ্ধি করা না হতো। কিন্তু জাতিসংঘের অনুরোধ সত্ত্বেও জাতিসংঘে মালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুলায়ে দিওপ মিশনের ইতি টানার কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, মালিতে নিরাপত্তার যেই চ্যালঞ্জগুলি রয়েছে, সেগুলির সমাধান দিতে ব্যার্থ হয়েছে এই মিশন। এছাড়াও মালি সরকার অভিযোগ করে যে, জাতিসংঘ মিশন সেদেশে জাতিগত বিদ্বেষ তৈরি করছে, যেকারণে মালির শান্তি নষ্ট হচ্ছে, এবং দেশের মানুষকে সহিংসতা ভুলে গিয়ে শান্তির পথে এগুতে বাধা সৃষ্টি করছে। অপরদিকে জাতিসংঘ অভিযোগ করছে যে, ২০২২ সালের মার্চে মালির সেনাবাহিনী এবং রুশ ভাড়াটে সেনারা দেশের মধ্যাঞ্চলে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ৫’শরও বেশি বেসামরিক লোককে হত্যা করেছে। এছাড়াও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী অভিযোগ করেছে যে, মালির সরকার শান্তিরক্ষী মিশনের কর্মকান্ডে নিয়মিতভাবে বাধা সৃষ্টি করেছে। এহেন অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৩০শে জুন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ফ্রান্সের প্রস্তাবিত এক রেজোলিউশনে ভোটাভুটির পর সর্বসম্মতিক্রমে ২০২৩এর ৩১শে ডিসেম্বরের মাঝে মালি থেকে শান্তিরক্ষী বাহিনী সরিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত হয়। একইদিনে জাতিসংঘের প্রশাসনিক এবং আর্থিক ৫ম কমিটির সভায় আগামী ছয় মাসের জন্যে মালির মিশনের জন্যে ৫’শ ৯০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়; যা স্বাভাবিক বার্ষিক বাজেটের অর্ধেক।

২০১৩ সালে মালির উত্তরাঞ্চলে ‘আল-কায়েদা’ সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীদের কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেখানে ইতোমধ্যেই মোতায়েন করা ফরাসি বাহিনীর সমর্থনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী গত ফেব্রুয়ারি মাসে মালিতে মোট ১৭ হাজার ৪’শ ৩০ জন বিদেশী শান্তিরক্ষী মোতায়েন ছিল। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, দশ বছর পরেও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন থাকা অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসেনি। বছরে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার খরচে এই মিশনের সাফল্য নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। তবে এই মিশনের সাফল্য পাবার ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা ছিল ২০২০ সালের অগাস্টের সামরিক অভ্যুত্থান; যার প্রধান কারণ ছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করায় ব্যার্থতা। এরপর ২০২১এর মে মাসে দ্বিতীয়বার সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। সেসময় থেকেই মালির সরকার অভিযোগ করতে থাকে মালির পরিস্থতিকে অশান্ত করছে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স।

মালিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন পরিচালনা সত্ত্বেও সহিংতার কমতি হয়নি। মালিতে জাতিসংঘ বাহিনী মোতায়েনের তিন বছর পর ২০১৬ সালের জুন মাসে জাতিসংঘের নিজস্ব মিডিয়া ‘ইউএন ডিসপ্যাচ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের পর শান্তিরক্ষীরাই সেখানে জঙ্গি গোষ্ঠিগুলির প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন এন্ড ইভেন্ট ডাটা’ বা ‘এসিএলইডি’ পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে সহিংসহতার নিয়মিত হিসেব রাখছে। তাদের হিসেবে মালিতে সহিংস ঘটনার সংখ্যা কমেনি; বরং বেড়েছে। ২০২০ সালে প্রায় ৩ হাজার সহিংস ঘটনা থেকে ২০২১ সালে কমে গিয়ে ২ হাজারের নিচে নেমে গেলেও ২০২২ সালে তা সাড়ে ৪ হাজার পেরিয়েছে। একইসাথে জঙ্গি সংগঠনগুলিতে মালির জনগণ রিক্রুটিংও বেড়েছে। গত এক দশকে সেখানে ৩’শরও বেশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী সদস্য নিহত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মালি থেকে এই সংঘাত আশেপাশের দেশ বুরকিনা ফাসো এবং নিজেরএ ছড়িয়ে পড়েছে।

‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, রাশিয়া এবং চীন মালির এই মিশনের সমালোচনা করেছে ও ব্রিটেন এবং সুইডেন সেখানে সেনা মোতায়েনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ২০২২ সালে মালি সরকারের বিরুদ্ধাচরণের ফলস্বরূপ ফ্রান্স মালি থেকে তাদের সেনা সরিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত নেয়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর হতাশা ছিল, মালির সামরিক সরকার দেশটাতে নির্বাচন দিতে দেরি করছে এবং তারা নিরাপত্তার জন্যে রুশ ভাড়াটে সেনাবাহিনী ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর হাজারখানেক সদস্যকে সেখানে মোতায়েন করেছে।

প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন সীমিত করতে চেয়েছিলেন। জো বাইডেন প্রশাসন ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তন করলেও অর্থায়নের ক্ষেত্রে তা অনেক ক্ষেত্রেই মার্কিন কংগ্রেসের উপর নির্ভরশীল। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’ বা ‘সিএফআর’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের বাজেটের ২৭ শতাংশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সমস্যা হলো, ২০০১ সাল থেকে মার্কিন কংগ্রেস জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাজেটের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত দিতে রাজি হয়েছে; এর বেশি অংশ যুক্তরাষ্ট্র দেবে না। একারণেই প্রতিবছরের শান্তিরক্ষী বাজেটে যুক্তরাষ্ট্র বড় একটা অংক বাকি রেখে দিচ্ছে। তবে ৮ বছরের মাঝে তিনগুণ বাড়িয়ে ২০২১ সাল নাগাদ চীন শান্তিরক্ষী বাজেটের ১৫ শতাংশ অর্থায়ন করে। তথাপি শান্তিরক্ষী মিশনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলি তেমন কোন সেনা মোতায়েন করে না। এই শূণ্যস্থান পূরণ করছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ; যারা অর্থের বিনিময়ে মিশনে সেনা পাঠায়।

ব্রিটিশ থিংকট্যাংক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর গবেষক পল মেলি ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, শান্তিরক্ষীরা চলে যাবার ফলে মালির কিছু অঞ্চলে সরকার বিভিন্ন সার্ভিস দিতে ব্যর্থ হবে এবং বিদ্রোহীদের সাথে সরকারের নতুন করে সংঘাত হতে পারে। কিন্তু পল মেলি এড়িয়ে গেছেন যে, এক দশকেও জাতিসংঘ মালিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি। মালি থেকে শান্তিরক্ষী বাহিনী সরিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া এবং চীন সেই প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছে। যা প্রমাণ করে যে, শক্তিশালী দেশগুলির স্বার্থ ছিল মালি থেকে সেনা প্রত্যাহারের পিছনে; যার ঠিক উল্টোটা ছিল মালিতে সেনা মোতায়েনের সময়। শান্তিরক্ষী মিশন যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না, সেই বাস্তবতাটা এক দশক ধরেই ছিল; কিন্তু ২০২৩ সালে শক্তিশালী দেশগুলির স্বার্থ একত্রিত হওয়ায় মিশনের সমাপ্তি ঘটছে। শান্তিরক্ষী মিশনের অর্থায়ন অনেক ক্ষেত্রেই মার্কিন কংগ্রেসের মর্জির উপরে নির্ভরশীল; যা আবার যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সাথে জড়িত। অর্থাৎ শক্তিশালী দেশগুলির ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বলি হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের ৩ শতাধিক সেনা; যারা অর্থের বিনিময়ে মালির মরুভূমিতে শক্তিশালী দেশগুলির স্বার্থরক্ষা করেছে।

Monday, 3 July 2023

‘ব্রিকস’এর সম্প্রসারণের সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক ফলাফল

০৩রা জুলাই ২০২৩

কেপ টাউন। ০২রা জুন ২০২৩। 'ব্রিকস' পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক। নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে অনেক দেশ ‘ব্রিকস’এর সদস্য হতে চাইলেও পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হয়ে ওঠার মতো অবস্থান ‘ব্রিকস’ তৈরি করতে পারেনি। ভারত এবং চীনের মতো কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টা দেশ ‘ব্রিকস’এর সদস্য হওয়ায় সংস্থার লক্ষ্যের দৃঢ়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংস্থার রাজনৈতিক কর্মকান্ড এখনও কিছু বিবৃতির মাঝেই সীমাবদ্ধ।

গত ২রা জুন সাউথ আফ্রিকার কেপ টাউনে ‘ব্রিকস’ জোটের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়ে গেলো। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, পশ্চিমা বৈশ্বিক নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার উদ্দেশ্য নিয়ে হয়ে যাওয়া এই বৈঠকে প্রতিষ্ঠাতা দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং সাউথ আফ্রিকা সংস্থাটার সম্প্রসারণ নিয়ে কথা বলেছে। একসময় বিশ্বের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে থাকা পাঁচটা রাষ্ট্রের হাল্কা বন্ধনের উপরে গঠিত সংস্থা বলে মনে করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের প্রচেষ্টায় এর কর্মকান্ড নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করতে থাকে। আর ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়াও সংস্থাটাকে শক্তিশালী করতে আগ্রহী হয়েছে। গত বছর ‘ব্রিকস’এর এক অনলাইন বৈঠকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়া ইয়ি বলেন যে, চীন চাইছে ‘ব্রিকস’এর সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া শুরু করতে এবং ধীরে ধীরে এব্যাপারে সদস্য দেশগুলির মাঝে একটা সমঝোতায় পৌঁছতে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, চীনের এই প্রস্তাবের পর থেকে সদস্য দেশগুলি সম্প্রসারণের জন্যে নিজেদের মনোনীত দেশগুলির নামের তালিকা দিতে শুরু করেছে।

ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কিউবা, ডি আর কঙ্গো, কমোরুজ, গ্যাবন এবং কাজাখস্তান এবারের বৈঠকে ‘ফ্রেন্ডস অব ব্রিকস’ আলোচনার জন্যে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল। এছাড়াও মিশর, আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, গিনি বিসাউ এবং ইন্দোনেশিয়া এবারের বৈঠকে ভার্চুয়ালি অংশ নেয়। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর সাংবাদিকদের বলেন যে, ‘ব্রিকস’এর বৈঠকে আলোচনা হয়েছে যে, সংস্থার সদস্যপদ পেতে কি রকমের নীতি, মানদন্ড বা শর্ত থাকবে, এবং কোন পদ্ধতিতে সম্প্রসারণ হবে। আগামী অগাস্টে জোহান্সবার্গে ‘ব্রিকস’এর শীর্ষ বৈঠকের আগে এই ব্যাপারগুলি নিয়ে আলোচনা চলবে।

‘ব্রিকস’এ যোগ দেয়ার জন্যে বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ রয়েছে; যার মাঝে আর্থিক বিনিয়োগই প্রধানতম। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সৌদি আরব ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ বা ‘এনডিবি’র সদস্য হিসেবে যুক্ত হবে কিনা, সেব্যাপারে আলোচনা চলছে বলে ব্যাংকের এক বিবৃতিতে বলা হয়। ‘এনডিবি’ হলো ‘ব্রিকস’এর আর্থিক সংস্থা; যাকে কিনা বিশ্বব্যাংক এবং ‘আইএমএফ’এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতিষ্ঠাতা দেশ রাশিয়ার অর্থনৈতিক সমস্যা ‘এনডিবি’র অর্থের উৎসকে চাপের মাঝে ফেলেছে; কারণ এই ব্যাংকে রাশিয়ার ১৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। ইতোমধ্যেই ‘এনডিবি’ ‘ব্রিকস’এর বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, বাংলাদেশ এবং উরুগুয়েকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ৩৩ বিলিয়ন ডলার এই দেশগুলিতে বিনিয়োগ করেছে। ব্যাংকের ডিরেক্টর জেনারেল আশওয়ানি মুথু এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, এই মুহুর্তে অর্থের যোগান সংস্থার জন্যে বড় চ্যালেঞ্জ। একারণে চীনা মুদ্রা ইউয়ান এবং সাউথ আফ্রিকার মুদ্রা র‍্যান্ডে ব্যাংক অর্থ যোগাড় করছে।

‘ব্রিকস’এর সম্প্রসারণ একবার ইতোমধ্যেই হয়ে গিয়েছে। ফ্রান্সের ‘লে মন্ড’ পত্রিকার এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ এবং ‘গোল্ডমান সাকস’এর অর্থনীতিবিদ জিম ওনীল ২০০১ সালে যখন সর্বপ্রথম ভবিষ্যতের চারটা বড় অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন, তখন তার মাঝে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চীন থাকলেও সাউথ আফ্রিকা ছিল না। অর্থাৎ চারটা দেশকে একত্রে ওনীল ‘ব্রিক’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার দীর্ঘ সময়ের কূটনীতির ফলাফলস্বরূপ দেশটা নতুন এই সংস্থার অন্তর্ভুক্ত হয় এবং এর নাম পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায় ‘ব্রিকস’। ওনীল বলেছিলেন যে, সাউথ আফ্রিকার এই সংস্থায় যুক্ত হওয়াটা অর্থহীন। তবে যদি দেশটাকে পুরো আফ্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ব্যাপারটা অন্যরকম। ওনীলএর এই চিন্তাটা সাউথ আফ্রিকার চিন্তাবিদেরা কিভাবে দেখছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ‘প্রিটোরিয়া ইউনিভার্সিটি’র লায়াল হোয়াইট বলছেন যে, সাউথ আফ্রিকার ভবিষ্যৎ হলো আফ্রিকার বাজার ধরা; এখানে বাইরের কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিয়ে আসাটা বিপজ্জনক।

ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষক ইন্দ্রানি বাগচি ‘দ্যা টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক লেখায় বলছেন যে, ‘ব্রিকস’এর সম্প্রসারণ উভয় সংকট তৈরি করতে পারে। যেহেতু ‘ব্রিকস’এর সদস্য রাষ্ট্রগুলি পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণকে পাশ কাটিয়ে একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বব্যবস্থা চাইছে, সেহেতু রাশিয়া এবং চীন উভয়কেই সাবধান হতে হবে যে, ‘ব্রিকস’এর নতুন সদস্য দেশগুলির মাঝে কোন একটাকে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে কিনা। যুক্তরাষ্ট্র তার পুরোনো বন্ধু দেশগুলির সাথে সম্পর্কে টানাপোড়েন হলে সেখান থেকে পরিস্থতি ঘুরিয়ে ফেলতে পরিপক্ক। তিনি বিশেষ করে সৌদি আরবের কথা উল্লেখ করেন।

অনেক প্রশ্ন থাকলেও ‘ব্রিকস’কে অনেকেই পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে দেখার চেষ্টা করছে। সাউথ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নালেদি পান্ডর কেপ টাউনের বৈঠকে বলেন যে, করোনা মহামারির সময়ে ধনী দেশগুলি এবং বৈশ্বিক সংস্থাগুলি যখন উন্নয়নশীল দেশগুলিকে উপেক্ষা করেছিল, তখন ‘ব্রিকস’ এই দেশগুলির পাশে দাঁড়িয়েছে। উন্নত দেশগুলি কথা দিয়ে কথা রাখেনি এবং তারা সকল দায় উন্নয়নশীল দেশগুলির উপরে চাপিয়ে দিয়েছে। ডি আর কঙ্গোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফে লুতুনদুলা আপালা বলেন যে, তার দেশ নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করে পরিবর্তন আনার জন্যে ‘ব্রিকস’কে উৎসাহ যোগাবে; কারণ সামষ্টিক শান্তি এবং উন্নয়নে উন্নত দেশগুলির কোন রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘দ্যা গ্লোবাল টাইমস’ বলছে যে, নতুন সদস্য যুক্ত হলে ‘ব্রিকস’ আরও শক্তিশালী হবে।

নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে অনেক দেশ ‘ব্রিকস’এর সদস্য হতে চাইলেও পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হয়ে ওঠার মতো অবস্থান ‘ব্রিকস’ তৈরি করতে পারেনি। ভারত এবং চীনের মতো কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টা দেশ ‘ব্রিকস’এর সদস্য হওয়ায় সংস্থার লক্ষ্যের দৃঢ়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংস্থার রাজনৈতিক কর্মকান্ড এখনও কিছু বিবৃতির মাঝেই সীমাবদ্ধ। তথাপি অর্থায়নের জন্যে চীনের উপর নির্ভরশীলতা এবং মার্কিন ডলার-কেন্দ্রিক পশ্চিমা পুঁজিবাদী আর্থিক ব্যবস্থাকে বাইপাস করতে না পারাটাও সংস্থার বড় দুর্বলতা। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, ‘ব্রিকস’এর ব্যাংক ‘এনডিবি’ এবং চীনা নেতৃত্বের ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ বা ‘এআইআইবি’ ইতোমধ্যেই পশ্চিমা ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির চাপে পড়ে অর্থায়নের খরচ কমাতে রাশিয়াতে তাদের বিনিয়োগ কার্যক্রমকে স্থগিত করেছে। ডলার-ভিত্তিক ঋণ নেয়াকে সহজ করতেই ‘এনডিবি’র নীতিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে আবির্ভাবের কথা বললেও মার্কিন ডলারের উপরে নির্ভরশীলতাকে এড়াতে পারেনি ‘ব্রিকস’।

Saturday, 1 July 2023

ফ্রান্সে আবারও বিক্ষোভ… সামাজিক অবিচার, নাকি দুর্বল রাষ্ট্রের উদাহরণ?

০১লা জুলাই ২০২৩

সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন এবং পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পর এবারের বর্ণবাদ-বিরোধী বিক্ষোভ শুধুমাত্র সামাজিক অবিচারকেই তুলে ধরে না, রাষ্ট্রের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।

গত ২৭শে জুন ফ্রান্সের নঁতেরে শহরে ১৭ বছর বয়সী এক যুবককে পুলিশ গুলি করে হত্যা করার পর থেকে পুরো ফ্রান্স জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। ভিডিওতে ধারণ করা এই ঘটনায় দেখা যায় যে, পুলিশ একটা ট্রাফিক সিগনালে খুব কাছে থেকে কাউকে গুলি করছে। সকাল ৯টার দিকে দু’জন পুলিশ গাড়িটা আটকাবার পর চালক গাড়ি চালিয়ে চলে যাবার চেষ্টা করলে পুলিশ তার বুকে গুলি করে। প্রতিবাদের কারণ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ফ্রান্সের ‘সোশালিস্ট পার্টি’র নেতা অলিভিয়ের ফাউরে ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, পুলিশের কথায় কেউ যদি না থামে, এর অর্থ এই নয় যে, তাকে গুলি করা যাবে। প্রত্যেক ব্যক্তিরই সুবিচার পাবার অধিকার রয়েছে।

নিহত যুবকের স্মরণে শোকমিছিল থেকেই শুরু হয় বিক্ষোভ। পহেলা জুলাই পর্যন্ত চার দিনের বিক্ষোভে ফ্রান্সজুড়ে ১৩’শ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভবন এবং গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ছাড়াও বিভিন্ন দোকানপাটে লুটপাট হয়েছে। ফ্রান্সজুড়ে সাঁজোয়া গাড়িসহ প্রায় ৪৫ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সরকার বলছে যে, কঠোর অবস্থান নেবার কারণে সহিংসতা কিছুটা হলেও কমে আসছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এই বিক্ষোভকে অযৌক্তিক বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং নাগরিকদেরকে তাদের সন্তানদের বিক্ষোভের দায় নিতে বলেন। একইসাথে তিনি ‘টিকটক’ এবং ‘স্ন্যাপচ্যাট’এর মতো সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে সহিংসতা ছড়ানো বন্ধ করার পদক্ষেপ নেবার কথা বলেন। সংবেদনশীল তথ্য সোশাল মিডিয়া থেকে সরিয়ে না দেয়ার জন্যে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলিকে তিনি দোষারোপ করেন।

নঁতেরে শহরের সরকারি উকিল পাসকাল প্রাশ সাংবাদিকদের বলেন যে, প্রাথমিক তদন্তে তার মনে হয়েছে যে, আইনগতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার যে শর্তগুলি রয়েছে, সেগুলি উপেক্ষিত হয়েছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ফ্রান্সের আইন অনুযায়ী একজন পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার অর্থ হলো বিচারক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্ত প্রমাণ পেয়েছেন। তবে বিচারকার্য শুরু করার আগে এতে যথেষ্ট সময় দেয়া হয়।

ফ্রান্সে অ-শ্বেতাঙ্গদের সুবিচার পাওয়া নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ২০০৫ সালে প্যারিসের কাছাকাছি এক স্থানে পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্যে উত্তর আফ্রিকার বংশোদ্ভূত দু’জন মুসলিম যুবক এক বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে লুকাতে গেলে বিদ্যুৎপিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিক্ষোভ তিন সপ্তাহ ধরে চলে এবং শেষ পর্যন্ত ফরাসি সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। সেই ঘটনায় দু’জন পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হলেও ১০ বছরের দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া শেষে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সেই বিক্ষোভের পিছনে বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল; যার মাঝে ছিল মুসলিম সংখ্যালঘুদের মাঝে ব্যাপক বেকারত্ব এবং পুলিশের বৈষম্যমূলক জুলুম। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ৯/১১এর ঘটনার পর থেকে ফ্রান্সে মুসলিম-বিদ্বেষী চিন্তার প্রসারকেও সেই বিক্ষোভের একটা কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এবারের ঘটনাও মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধেই ঘটেছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, আলজেরিয় বংশোদ্ভূত নাহেল তার মায়ের একমাত্র সন্তান; যে কিনা পণ্য ডেলিভারি দেয়ার কাজ করতো। একইসাথে গত তিন বছর ধরে সে একটা রাগবি ক্লাবেও খেলতো। ইলেকট্রিশিয়ান হবার জন্যে একটা কলেজেও ভর্তি হয়েছিলো সে; যদিও কলেজে খুব বেশি একটা সময় সে দিতে পারেনি। নাহেলের বিরুদ্ধে পুলিশের কোন ক্রিমিনাল রেকর্ড না থাকলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গাড়ি চালাবার অভিযোগ ছিল। দরিদ্র্য পরিবারদের নিয়ে কাজ করা এনজিও ‘ওভাল সিটোইয়েঁ’র প্রধান জেফ পুয়েশ ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, নাহেল সমাজে সকলের সাথে মিশে চলার মতো ছেলে ছিলো। মাদকাসক্তি বা অপরাধের সাথে জড়াবার মতো ব্যক্তি সে ছিলো না। নাহেলকে বহণকারী এম্বুলেন্সের মেডিকেল কর্মী মারুয়ানি বলছেন যে, তিনি নাহেলকে দেখেই চিনতে পেরেছেন এবং তিনি জানতেন যে এই ছেলে কারুর দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলার মতো নয়। নাহেলের মা ‘ফ্রান্স ৫ টিভি’র সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, পুলিশ হয়তো তার ‘আরব চেহারা’ দেখেই তাকে হত্যা করতে চেয়েছে।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, যুবকের হত্যার ঘটনাটা ফ্রান্সে পুলিশের সাথে দরিদ্র্য এলাকার মানুষের উত্তেজনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সে অ-শ্বেতাঙ্গ যুবকদের বিরুদ্ধে পুলিশের কৌশল নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এক যুবক ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, প্রায় প্রতিদিনই পুলিশের সহিংসতা চলছে; বিশেষ করে কেউ যদি আরব বা কৃষ্ণাঙ্গ হয়। নাহেলের আইনজীবী ইয়াসিনে বুজরুউ অবশ্য পুলিশের বর্ণবাদের বিষয়টাকে সামনে না এনে বলছেন যে, ফ্রান্সের আইন এবং বিচারব্যবস্থা পুলিশকে বিশেষ রকমের সুরক্ষা দিয়ে থাকে; যেকারণে অনেকেই নিজেকে বিচারের উর্ধ্বে মনে করতে থাকে। বুজরুউএর বর্ণবাদকে পাশ কাটিয়ে যাবার এই চেষ্টাটাকেই অনেকে মারাত্মক বলে আখ্যা দিচ্ছেন। ‘আল জাজিরা’র এক লেখায় নিউ ইয়র্কের ‘স্টোন ব্রুক ইউনিভার্সিটির’ প্রফেসর ক্রিস্টাল ফ্লেমিং বলছেন যে, ফ্রান্সের সমাজে বর্ণবাদের কারণে নাহেলের জীবন গেছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ জানেন যে, নাহেলের মৃত্যু ব্যাখ্যার বাইরে নয়। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত না তারা ফ্রান্সের বর্ণবাদকে স্বীকার করে না নেবেন, ততদিন পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। ৩০শে জুন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক অফিসের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, সময় এসেছে ফ্রান্সের বর্ণবাদ এবং আইন শৃংখলা বাহিনীর বর্ণবাদজনিত বৈষম্যের গভীর সমস্যাকে স্বীকার করা। পাল্টা বিবৃতিতে ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে।

‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক লেখায় ফরাসি সাংবাদিক রোখায়া দিয়াল্লো বলছেন যে, ফ্রান্সের দারিদ্র্যপীড়িত শহরাঞ্চলে পুলিশের দ্বারা অপরাধগুলি দেশটার অনেকগুলি দাঙ্গার মূল কারণ। বহু বছর ধরে মিছিল, প্রতিবাদপত্র, অনুরোধ-আহ্বানে কোন কাজ না হওয়ায় একজন যুবকের সামনে সহিংসতা ছাড়া কোন পথ খোলা থাকে না। প্রশ্ন করতেই হয় যে, এতটা সহিংসতা না হলে নাহেলের হত্যাকান্ডকে নিয়ে কেউ কোন কথা বলতো? রোখায়া দিয়াল্লোর কথাগুলি ফ্রান্সের গভীরের এমন এক সমস্যার কথা তুলে ধরে, যা কিনা ফরাসি রিপাবলিকের সেকুলার স্তম্ভকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন এবং পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পর এবারের বর্ণবাদ-বিরোধী বিক্ষোভ শুধুমাত্র সামাজিক অবিচারকেই তুলে ধরে না, রাষ্ট্রের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।

Monday, 26 June 2023

‘ওয়াগনার’-কান্ডের ভূরাজনৈতিক ফলাফল কি হতে পারে?

২৭শে জুন ২০২৩

রুশ শহর রস্টোভের রাস্তায় প্রিগোজিনের 'ওয়াগনার' বাহিনীর ট্যাংক। ভ্লাদিমির পুতিন ‘ওয়াগনার’এর বিদ্রোহকে ১৯১৭ সালের গৃহযুদ্ধের সাথে তুলনা করেছেন। ১৯১৭ সালের সেই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই; এবং তা গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে বেশ কয়েক মাস লেগেছিলো। যেটা এখন দেখতে হবে তা হলো, আগামী কয়েক মাসের মাঝে ‘ওয়াগনার’কে উদাহরণ ধরে রুশ বাহিনীর অন্যান্য অংশ থেকে কি কি দাবি উত্থাপিত হয়।

গত ২৩শে জুন রাশিয়ার ভাড়াটে সামরিক বাহিনী ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর নেতা ইয়েভগেনি প্রিগোজিন ঘোষণা দেন যে, তার সেনারা সুবিচার আদায়ের লক্ষ্যে মার্চ শুরু করেছে। ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইন থেকে সরে গিয়ে তারা রুশ শহর রস্টোভের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং মস্কো অভিমুখে রওয়ানা দেয়। এর মাঝে রুশ বিমান বাহিনী তাদেরকে টার্গেট করে বোমাবর্ষণ করে। মাত্র ২৪ ঘন্টার মাথায় প্রিগোজিন ঘোষণা দেন যে, তিনি তার বাহিনীকে ইউক্রেনে ফিরিয়ে নিচ্ছেন এবং বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কোর মধ্যস্ততায় রাজি হয়ে তিনি রাশিয়া ছেড়ে বেলারুশে চলে যাচ্ছেন। ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর এক দিনের এই নাটক কেনই বা ঘটলো এবং এর ফলাফলগুলিই বা কেমন হবে, সেব্যাপারে নিশ্চিত হতে যে আরও অনেকদিন লাগবে, তাতে সকলেই একমত। তথাপি ঘটনার ব্যাপারে অনেকেরই কিছু বিশ্লেষণ এবং মতামত রয়েছে, যা আলোচনায় আসছে।

‘ওয়াগনার গ্রুপ’ আলোচনায় আসলো কিভাবে?

মার্কিন ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’এর এক লেখায় জর্জ ফ্রীডম্যান প্রশ্ন করেছেন যে, ‘ওয়াগনার গ্রুপ’ ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে কি করছিলো? একটা ভাড়াটে বাহিনী হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের কর্মকান্ড একেবারেই আলাদা। সেখানে তারা নিয়মিত সেনাবাহিনীর সমান্তরালে যুদ্ধ করেছে। প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনকে পরাজিত করতে না পারার কারণেই ‘ওয়াগনার’এর মতো ভাড়াটে যোদ্ধাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করতে হয়েছিল; যা কিনা পরবর্তীতে দ্বন্দ্ব এবং বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছে। ‘ওয়াগনার’কে কাজে লাগানোটাই ছিল বড় সমস্যা।

ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র এক লেখায় সামরিক বিশ্লেষক জ্যাক ওয়াটলিং বলছেন যে, ‘ওয়াগনার’কে রুশ নেতৃত্ব বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করেছে; যেখানে তারা রুশ রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর স্থলাভিষিক্ত হয়ে কাজ করেছে। তবে এই বাহিনীতে রুশ সামরিক বাহিনী এবং সামরিক ইন্টেলিজেন্স ‘জিআরইউ’এর সদস্যরা কাজ করেছে। আর ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে তারা এমন একটা বাহিনী মোতায়েন করতে পেরেছিল, যা কিনা অনেক ক্ষেত্রেই রুশ সেনাবাহিনীর চাইতে বেশি কার্যকর ছিল। রুশ বিচার বিভাগের সহায়তাতেই ‘ওয়াগনার’ সাজাপ্রাপ্ত আসামীদেরকে এই বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিল। মোটকথা রাশিয়ার রাষ্ট্রযন্ত্র ‘ওয়াগনার’কে সকল ধরণের সহায়তা দিয়েছে। আর এই সহায়তার ক্ষেত্রে প্রথমেই ছিলেন ‘জিআরইউ’এর জেনারেল ভ্লাদিমির স্তেপানোভিচ আলেক্সেইয়েভ। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছের লোক ইউরি কোভালচুক এবং সের্গেই কিরিয়েঙ্কো ‘ওয়াগনার’ তৈরির সপক্ষের চিন্তাগুলিকে সাজিয়েছিলেন। তবে রাশিয়ার ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘এফএসবি’ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই বাহিনীকে ব্যবহারের বিপক্ষে ছিল। এই দুই গ্রুপকে ঠান্ডা করতে গিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ‘ওয়াগনার’ সেনাদের মোতায়েন করার পর দু’টা ভিন্ন কমান্ড কাঠামো গঠন করতে হয়েছিল।

‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়েভগেনি প্রিগোজিন কেন এই কাজটা করলেন, সেটার একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন ‘কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টার’এর সিনিয়র ফেলো তাতিয়ানা স্তানোভায়া। টুইটারে এক বিশ্লেষণে তিনি বলছেন যে, প্রিগোজিনের বিদ্রোহ রাশিয়ার সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা ছিল না। ক্রেমলিনের শক্তিধর ব্যাক্তিদের চাপের মুখে তিনি ইউক্রেনে একঘরে হয়ে পড়েছিলেন এবং ‘ওয়াগনার’কে টিকিয়ে রাখা তার জন্যে কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। তিনি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছিলেন; যাতে করে ‘ওয়াগনার’এর কাজ, নিরাপত্তা এবং অর্থায়নের ব্যাপারে কিছুটা নিশ্চয়তা তিনি পেতে পারেন। তিনি ইউক্রেনে তার সেনাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের ব্যাপারটাকে তুলে ধরে তার দাবি আদায় করতে চেয়েছিলেন। তবে আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, তার অবদানগুলির কারণে তিনি এই সমস্যা থেকে বেঁচে বের হয়ে আসতে পেরেছেন; কিন্তু রাশিয়াতে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিনিময়ে।

প্রিগোজিনের বিদ্রোহ রাশিয়ার সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা ছিল না। ক্রেমলিনের শক্তিধর ব্যাক্তিদের চাপের মুখে তিনি ইউক্রেনে একঘরে হয়ে পড়েছিলেন এবং ‘ওয়াগনার’কে টিকিয়ে রাখা তার জন্যে কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। তিনি ইউক্রেনে তার সেনাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের ব্যাপারটাকে তুলে ধরে তার দাবি আদায় করতে চেয়েছিলেন। তবে আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, তার অবদানগুলির কারণে তিনি এই সমস্যা থেকে বেঁচে বের হয়ে আসতে পেরেছেন; কিন্তু রাশিয়াতে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিনিময়ে।

ইউক্রেন যুদ্ধের উপরে কি প্রভাব পড়বে?

‘পলিটিকো’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধে গত শীতে যখন ইউক্রেনিয়রা পাল্টা আক্রমণ করে খারকিভ এবং খেরসন পুনর্দখল করে নেয়, তখন ক্রেমলিন যুদ্ধক্ষেত্রে দুর্বল অবস্থানগুলিকে শক্তিশালী করতে ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর সদস্যদের মোতায়েন করে। শীতের মাঝে ‘ওয়াগনার’ সদস্যরা যখন ফ্রন্টলাইন ধরে রেখেছিল, তখন রুশরা নতুন সেনা এবং রসদ যোগাড় করতে পেরেছিল। এছাড়াও বাখমুতের যুদ্ধে ‘ওয়াগনার’ সেনারা বড় ভূমিকা রেখেছিল।

২৪শে জুন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সকি এক বার্তায় বলেন যে, এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, রুশ নেতৃত্ব কোনকিছুরই নিয়ন্ত্রণে নেই। একদিনের মাঝে তারা অনেকগুলি শহরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এবং দেখিয়ে দিয়েছে যে, রাশিয়ার শহর এবং অস্ত্রের ভান্ডার দখল করে নেয়াটা কত সহজ।

তবে জেলেন্সকি ‘ওয়াগনার’এর ঘটনা থেকে কতটা সুবিধা নিতে পারবেন, তা প্রশ্নবিদ্ধ। ‘রুসি’র রাজনৈতিক বিশ্লেষক মার্ক গ্যালিয়টি ‘ইন মস্কোস শ্যাডো ১০৫’ নামের এক নিয়মিত পডকাস্ট বিশ্লেষণে বলছেন যে, এই ঘটনায় ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে বড় কোন পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয়না; কারণ অন্ততঃ এখন পর্যন্ত ইউক্রেনে রুশ সেনাদের মাঝে অস্ত্র ছেড়ে দেবার বা যুদ্ধ থেকে সরে আসার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এছাড়াও ‘ওয়াগনার’কে থামাবার জন্যে যেহেতু কোন রুশ ইউনিটকে ইউক্রেন থেকে সরাবার প্রয়োজন হয়নি, তাই এই ঘটনার সরাসরি সুবিধা ইউক্রেন খুব কমই পাবে। বরং প্রিগোজিনের কারণে ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে নেতৃত্বের কোন সমস্যা যদি হয়ে থাকে, সেটা এখন নেই; যা ইউক্রেনকে খুশি করার কথা নয়।

ক্রেমলিনের নিয়ন্ত্রণ কি দুর্বল হলো?

‘পলিটিকো’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইয়েভগেনি প্রিগোজিনের অধীন ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর সদস্যরা যেভাবে রুশ জমি দখল করে ফেলতে পারলো, মস্কোর ২’শ কিঃমিঃএর মাঝে পৌঁছে গেলো, এবং জনগণের সমর্থন পেলো, তা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকার খুব শক্ত ভিতের উপরে প্রতিষ্ঠিত নয়। রস্টোভ শহরে ‘ওয়াগনার’এর পক্ষে মানুষের সমর্থন দেখিয়ে দেয় যে, ক্রেমলিনের ক্ষমতাধর প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কমান্ডার জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভএর উপর জনগণের আস্থা কমে গেছে। অপরদিকে মার্ক গ্যালিয়টি বলছেন যে, যদিও বেশিরভাগ বিশ্লেষকেরাই বলবেন যে, এই ঘটনার মাধ্যমে পুতিনের নেতৃত্ব দুর্বল হয়েছে, তথাপি ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষে খুব সম্ভবতঃ এর চাইতে ভালো কিছু করার ছিলো না; কারণ একদিকে তিনি সমস্যাটার সমাপ্তি টেনেছেন এবং একইসাথে প্রিগোজিনকে কিনে নিয়েছেন। কারণ ‘ওয়াগনার’ বনাম রুশ সেনাবাহিনীর যুদ্ধ পুরো রাষ্ট্রের জন্যে মারাত্মক হতো। বিশেষ করে ক্রেমলিন নির্দেশ দিলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা রুশ ভাড়াটে বাহিনীর উপর গুলি করতে কতটা প্রস্তুত ছিলো, সেটা বরং পুতিনের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতো।

ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষে খুব সম্ভবতঃ এর চাইতে ভালো কিছু করার ছিলো না; কারণ একদিকে তিনি সমস্যাটার সমাপ্তি টেনেছেন এবং একইসাথে প্রিগোজিনকে কিনে নিয়েছেন। কারণ ‘ওয়াগনার’ বনাম রুশ সেনাবাহিনীর যুদ্ধ পুরো রাষ্ট্রের জন্যে মারাত্মক হতো। বিশেষ করে ক্রেমলিন নির্দেশ দিলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা রুশ ভাড়াটে বাহিনীর উপর গুলি করতে কতটা প্রস্তুত ছিলো, সেটা বরং পুতিনের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতো।

তাতিয়ানা স্তানোভায়া বলছেন যে, প্রিগোজিন খুব সম্ভবতঃ পুতিনের কঠোর বক্তব্য আশা করেননি। কারণ তিনি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীর ভূমিকা নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। মার্ক গ্যালিয়টি বলছেন যে, শেষ পর্যন্ত এটা মনে হয়নি যে, রুশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা ব্যাপক হারে ‘ওয়াগনার’এ যোগ দিয়েছিলো। হয়তো সেটা প্রিগোজিনের সরে দাঁড়ানোর পিছনে একটা কারণ হতে পারে। মস্কোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীগুলিকে ‘ওয়াগনার’ পরাজিত করতে পারতো কিনা, সেখানেও সন্দেহ রয়েছে। কারণ যদিও রুশ সেনাবাহিনী ‘ওয়াগনার’এর মতো দ্রুতগামী কোন বাহিনী নয়; তথাপি সেনাবাহিনীর ভারি অস্ত্রের বিরুদ্ধে ‘ওয়াগনার’এর হাল্কা বাহিনী কতটুকু সফল হতো, তা প্রশ্নবিদ্ধ। আর মস্কোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রিগোজিন কি করতেন, সেটা কি নিশ্চিত? তবে জনগণের একটা বড় অংশ ‘ওয়াগনার’কে থামাবার চেষ্টা করেনি; যা কিনা রাষ্ট্রের নেতৃত্বের দুর্বলতা তুলে ধরে। তথাপি প্রশ্ন থেকেই যায়, রুশ ইন্টেলিজেন্স ‘এফএসবি’ কি করছিলো? নিঃসন্দেহে এখানে ‘এফএসবি’র কাজে ঘাটতি ছিলো কিনা, তা খতিয়ে দেখার ব্যাপার হবে। তবে পুতিনের নেতৃত্বের অধীনে ‘এফএসবি’কে ব্যার্থতার জন্যে খুব বড় কোন খেসারত না-ও দিতে হতে পারে। কারণ এর আগেও ‘এফএসবি’ অনেক ভুল করলেও পুতিন তাদের কিছু করেননি।

গ্যালিয়টি বলছেন যে, প্রিগোজিন ১৯৯০এর দশক থেকেই ক্রেমলিনের সমর্থন পেয়ে ধাপে ধাপে উঠে এসেছেন। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রিগোজিন ব্যাক্তিগতভাবে লাভবান হলেও তিনি প্রকৃতপক্ষে ক্রেমলিনেরই ইচ্ছার ফলাফল। এটা অসম্ভব নয় যে, প্রিগোজিন বেলারুশে বসে আফ্রিকায় ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড পরিচালনা করবেন। কারণ আফ্রিকাতে রুশ প্রভাব ধরে রাখার পিছনে ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আর রুশ সরকারের সমর্থন রয়েছে বলেই অনেক ক্ষেত্রে ‘ওয়াগনার’ সফলতা পেয়েছে। সমস্যা পুতিনের নিজেরই সৃষ্টি। কারণ তিনি প্রিগোজিনের সাথে রুশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের দ্বন্দ্বকে চলতে দিয়েছেন। আর এই দ্বন্দ্ব বাজে আকারে পরিণত হবার আগেই তিনি হস্তক্ষেপ করতে ব্যার্থ হয়েছেন।

জর্জ ফ্রীডম্যান প্রশ্ন করছেন যে, ‘ওয়াগনার’এর কারণে যদি ধরে নেয়া হয় যে, পুতিন দুর্বল হয়েছেন, তাহলে এই দুর্বল হওয়ার অর্থ প্রকৃতপক্ষে কি, সেটা দেখতে হবে। যদি তার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়, তার অর্থ হলো, তিনি খুব সহজেই কোন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিতে পারবেন না। আর যদি তার নির্দেশনা দেয়ার সক্ষমতা কমে যায়, তাহলে রুশ সামরিক বাহিনীর কমান্ড ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু এর অর্থ দাঁড়াবে অন্য কেউ পুতিনকে তার স্থান থেকে সরিয়ে দেবে। অথচ এখন পর্যন্ত এমন কোন ব্যক্তিকে দেখা যাচ্ছে না যে কিনা পুতিনকে সরাবার মতো অবস্থানে এসেছে। আর এরকম কেউ না আসার আগ পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না যে মাত্র একদিনের ব্যার্থ অভ্যুত্থানে পুতিন দুর্বল হয়েছেন। জ্যাক ওয়াটলিং বলছেন যে, একদিক দিয়ে চিন্তা করলে রুশ উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের উপরে পুতিনের নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়ে গেলো। কারণ ক্রেমলিনের কোন দলই বেঁচে থাকার জন্যে পুতিনকে ছাড়া শক্তিশালী নয়।

রাশিয়া এবং ইউক্রেনে ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড শেষ হয়ে গেছে; যদিও বাকি বিশ্বে হয়তো তা এখনও বিদ্যমান। এমনও হতে পারে যে, প্রিগোজিনের সাথে ক্রেমলিনের শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তিই হয়েছে। তবে শোইগু নিঃসন্দেহে ‘ওয়াগনার’কে রাশিয়াতে থাকতে দেবেন না। সংস্থাটার ইউনিটগুলি হয়তো রুশ সামরিক বাহিনীর মাঝে বিলীন হয়ে যাবে।

বিশ্বব্যাপী রাশিয়ার অবস্থান দুর্বল হবে কি?

তাতিয়ানা স্তানোভায়া মনে করছেন যে, প্রিগোজিনকে হয়তো পুতিন ছেড়ে দিয়েছেন এই শর্তে যে, তিনি বেলারুশে চুপচাপ থাকবেন। তবে মার্ক গ্যালিয়টি বলছেন যে, আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, রাশিয়া এবং ইউক্রেনে ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড শেষ হয়ে গেছে; যদিও বাকি বিশ্বে হয়তো তা এখনও বিদ্যমান। এমনও হতে পারে যে, প্রিগোজিনের সাথে ক্রেমলিনের শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তিই হয়েছে। তবে শোইগু নিঃসন্দেহে ‘ওয়াগনার’কে রাশিয়াতে থাকতে দেবেন না। সংস্থাটার ইউনিটগুলি হয়তো রুশ সামরিক বাহিনীর মাঝে বিলীন হয়ে যাবে।

বিশ্বব্যাপী কোন কোন দেশে ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর কর্মকান্ড রয়েছে, তার একটা তালিকা তুলে ধরেছে ‘ডয়েচে ভেলে’। ইউক্রেনে ২০১৪ সালে সর্বপ্রথম ‘ওয়াগনার’এর সদস্যদের দেখা যায় রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিতে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের হিসেবে প্রিগোজিনের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ হাজার সদস্য ছিল। বিদ্রোহের সময় তিনি নিজেই বলেছিলেন যে, তার সাথে ২৫ হাজার সদস্য রয়েছে। বাখমুতের যুদ্ধে এই গ্রুপের সদস্যরা বড় ভূমিকা রেখেছিল; যেখানে অনেকেই ছিল সাজাপ্রাপ্ত আসামি অথবা সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া সেনাসদস্য। ২০১৫ সাল থেকে ‘ওয়াগনার’এর সদস্যরা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে অংশ নিচ্ছে বলে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে; কারণ গ্রুপের কিছু সদস্য একনায়ক বাশার আল-আসাদের বিরোধীদের হাতে নিহত হয়েছে। গৃহযুদ্ধের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তে সেখানে ৫ হাজারের বেশি ‘ওয়াগনার’ সদস্য ছিল বলে ধারণা করা হয়; যাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

তবে ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড সবচাইতে বেশি ছড়িয়ে রয়েছে আফ্রিকাতে; যেখানে গ্রুপের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে ব্যাপক। উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে ‘ওয়াগনার’ জড়িয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ত্রিপোলি সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত জেনারেল খলিফা হাফতারের অধীনে ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’র পক্ষে ‘ওয়াগনার’ সদস্যরা নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ করছে বলে জানা যায়। একসময় প্রায় ২ হাজারের মতো ‘ওয়াগনার’ সদস্য লিবিয়াতে ছিল। এখান থেকেই সুদানসহ আফ্রিকার অন্যান্য দেশে ‘ওয়াগনার’এর কর্মকান্ড ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন কর্মকর্তারা অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে, সুদানে ‘ওয়াগনার’এর সদস্যরা সেদেশের সামরিক শাসকদের সহায়তায় খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

২০২১ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির ক্ষমতা নেয়া সামরিক শাসকেরাও ‘ওয়াগনার’কে সেদেশে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। জাতিসংঘ অভিযোগ করছে যে, মালির সামরিক বাহিনীর সাথে সহযোগী হিসেবে ‘ওয়াগনার’ সেখানে মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত। এছাড়াও মধ্য আফ্রিকার দেশ সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকেও রয়েছে ‘ওয়াগনার’এর শক্ত অবস্থান। এবছরের ফেব্রুয়ারিতে সেদেশে রুশ রাষ্ট্রদূত এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, ১ হাজার ৮’শ ৯০ জন রুশ সামরিক উপদেষ্টা সেখানে কাজ করছে। ‘ওয়াগনার’এর সদস্যরা সেখানে প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ফস্টিন আরসাঞ্জএর নিরাপত্তায় কাজ করছে। এর বিনিময়ে ‘ওয়াগনার’ সেদেশের খনিজ সম্পদের ভাগ পেয়েছে বলে বলছেন কেউ কেউ। এছাড়াও ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ২০১৯ সাল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ‘ওয়াগনার’ কাজ করছে। সেদেশের স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদেরকেও প্রশিক্ষণ দিয়েছে ‘ওয়াগনার’।

‘ওয়াগনার’এর পর কি?

জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, কাউকে কাউকে বলতে শোনা যাচ্ছে যে, পুরো ব্যাপারটাই ছিল একটা বানানো ষড়যন্ত্র। যদি তা-ই হয়, তাহলে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট, রুশ জেনারেল স্টাফ, পুতিনের অফিসের স্টাফ, এবং ‘ওয়াগনার’এর কিছু লোককেও এই প্রকল্পে যুক্ত করতে হবে। এতগুলি ব্যক্তি যদি এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জানে, তাহলে সেটা গোপন থাকার প্রশ্নই আসে না। অপরদিকে মার্ক গ্যালিয়টি বলছেন যে, মার্কিন ইন্টেলিজেন্স জুনের মাঝামাঝি থেকেই ‘ওয়াগনার’এর ব্যাপারে বিদ্রোহের মতোই কিছু একটা আশা করছিলো বলে শোনা যাচ্ছে; যা প্রকৃতপক্ষে অবাস্তব নয়। কারণ ইন্টেলিজেন্স সংস্থাগুলি সর্বদাই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা ধারণা রাখার চেষ্টা করে। এটাকে আলাদাভাবে দেখার কিছু নেই।

‘রুসি’র জ্যাক ওয়াটলিং বলছেন যে, ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর উৎপত্তি একটা চিন্তা থেকে; যার মাঝে রয়েছে বাণিজ্যিক সংস্থার নিজস্ব বাহিনী তৈরি করা; যেমন ‘গ্যাজপ্রম’ এবং ‘রসকসমস’ তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী তৈরি করছে। এগুলির বিশেষত্ব হলো, সংস্থাগুলি বিশ্বব্যাপী তাদের আয় থেকেই এই বাহিনীগুলিকে চালাবে। সমস্যা হলো, অর্থায়নের জন্যে এই বাহিনীগুলি রুশ সরকারের উপরে সরাসরি নির্ভরশীল না থাকায় এগুলির উপরে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্যে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সমরাস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে; যা কিনা প্রিগোজিনের ‘ওয়াগনার’এর সাথে দ্বন্দ্বের কারণ হয়েছে।

‘পলিটিকো’ বলছে যে, পুতিন তার ভাষণে ‘ওয়াগনার’এর বিদ্রোহকে ১৯১৭ সালের রুশ গৃহযুদ্ধের সাথে তুলনা দিয়েছেন, যখন বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ছিল রাশিয়া। তবে এখানে আরও ভালো উদাহরণ ছিল ১৯৯১ সালের অগাস্টে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গরবাচেভের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা; যখন কট্টরপন্থীরা গরবাচেভের সংস্কারের বিরোধিতা করেছিল। তবে সেই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় সমাজতান্ত্রিক সরকারের উপর জনগণের আস্থা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল; যার ফলশ্রুতিতে কয়েক মাসের মাঝে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায়। জ্যাক ওয়াটলিং বলছেন যে, ‘ওয়াগনার’এর একদিনের বিদ্রোহ হয়তো রুশ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের উপর ভ্লাদিমির পুতিনের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে দিয়েছে; কিন্তু তা ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্যার সমাধান দেয়নি। সেখানে যথেষ্ট সক্ষম একটা বাহিনীর অভাব থেকেই যাচ্ছে; যা কিনা যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার জয়লাভ করাকে চ্যালেঞ্জের মাঝে ফেলছে। পুতিন ‘ওয়াগনার’এর বিদ্রোহকে ১৯১৭ সালের গৃহযুদ্ধের সাথে তুলনা করেছেন। ১৯১৭ সালের সেই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই; এবং তা গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে বেশ কয়েক মাস লেগেছিলো। যেটা এখন দেখতে হবে তা হলো, আগামী কয়েক মাসের মাঝে ‘ওয়াগনার’কে উদাহরণ ধরে রুশ বাহিনীর অন্যান্য অংশ থেকে কি কি দাবি উত্থাপিত হয়।

Saturday, 17 June 2023

‘আইএমএফ’এর ছোবলে দিশেহারা নাইজেরিয়ার জনগণ

১৭ই জুন ২০২৩

নাইজেরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট তিনুবু সর্বদাই ছিলেন ব্যবসা-বান্ধব একজন রাজনীতিবিদ। প্রেসিডেন্ট হবার পর তার স্বাগত বক্তব্যে তিনুবু ঘোষণা দেন যে, তিনি দেশটার মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেবেন। পশ্চিমা প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে জাতীয় মুদ্রা নাইয়ারাকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেয়ার কারণে জনগণকে আমদানি করা খাদ্য বহুগুণ বেশি মূল্যে ক্রয় করতে হবে। ফলস্বরূপ, ‘আইএমএফ’এর উপদেশ মেনে নাইজেরিয়ার ব্যবসা-বান্ধব সরকার এখন জনগণকে কষ্ট সহ্য করতে বলছে।


গত ১৪ই জুন আফ্রিকার সবচাইতে বড় জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির দেশ নাইজেরিয়ার সরকার দেশের জাতীয় মুদ্রা নাইয়ারা-র উপর থেকে সকল নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে সেটাকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে একদিনের মাঝে ডলারের বিপরীতে নাইয়ারা-র মূল্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গিয়ে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ডলারপ্রতি ৭’শ ৫৫তে গিয়ে দাঁড়ায়। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন যে, এতে দেশের জনগণের উপর স্বল্পমেয়াদে কষ্ট বয়ে নিয়ে আসলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নাইজেরিয়ার জন্যে ভালো হবে। নাইজেরিয়ার জাতীয় মুদ্রার মূল্য এতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতো। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানি করা দ্রব্যের জন্যে ডলারের বিপরীতে মুদ্রার মূল্য অপেক্ষাকৃত উচ্চতর রেখেছিল; যাতে করে আমদানি করা দ্রব্য সাধারণ মানুষের ক্রমক্ষমতার মাঝে থাকে। নাইজেরিয়া আমদানি করা গমের উপরে যথেষ্ট নির্ভরশীল; যা ডলারের বিনিময়ে আমদানি করা হয়।

পশ্চিমা সংস্থাগুলি বলছে যে, নতুন নীতির ফলে নাইজেরিয়ায় বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের উপরে প্রতিষ্ঠা করবে। সাম্প্রতিক সময়ে নাইজেরিয়া ব্যাপক মূল্যস্ফীতি এবং মারাত্মক বেকারত্ব সমস্যার মাঝ দিয়ে যাচ্ছে। ‘আফ্রিকা নিউজ’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে আন্তর্জাতিক কনসালট্যান্সি কোম্পানি ‘প্রাইস ওয়াটারহাউজ কুপার্স’ বা ‘পিডব্লিউসি’র নাইজেরিয়া অফিসের বিশ্লেষক তাইয়ো ওইয়েদেলে বলছেন যে, ডলারের বিপরীতে ভিন্ন ভিন্ন বিনিময় হার রাখার ফলে এতকাল বাজারে সকল ব্যবসায়ীদের জন্যে একরকম অধিকার নিশ্চিত হয়নি। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অফিশিয়াল বিনিময় হারে ডলার বিক্রি করতে বাধ্য থাকতো; এবং একইসাথে দেশের বাইরে থেকে ডলার বিনিয়োগ আনতে পারছিলো না। মারাত্মক ডলার সংকটের ফলে নাইজেরিয়ায় ব্যবসা করা বিদেশী কোম্পানিগুলি তাদের আয় করা অর্থ দেশের বাইরে নিতে পারছিলো না। শুধুমাত্র বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলিই সাড়ে ৪’শ মিলিয়ন ডলারের আয় নাইজেরিয়ার বাইরে নিয়ে যেতে পারছে না। একারণেই নাইজেরিয়াতে বিদেশী বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

নাইজেরিয়ার নতুন মুদ্রানীতিকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ‘আইএমএফ’। ১৬ই জুন ‘আইএমএফ’এর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, বহুদিন ধরে নাইজেরিয়ার মুদ্রা ব্যবস্থার ব্যাপারে ‘আইএমএফ’এর যে উপদেশ ছিল, সেটার বাস্তবায়নের কারণে সংস্থাটা দেশের সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে এবং এই নীতি বাস্তবায়নে সরকারকে সহায়তা দেবে ‘আইএমএফ’। নাইজেরিয়ার এনজিও ‘সেন্টার ফর দ্যা প্রোমোশন অব প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজেস’ বা ‘সিপিপিই’এর প্রতিষ্ঠাতা মুদা ইউসুফ এক বিবৃতিতে এই নীতির সমর্থন জানিয়ে বলেন যে, এতে বিনিয়োগ, পুঁজি এবং কর্মসংস্থান বাড়বে এবং ব্যবসা-বান্ধব পরিস্থিতি তৈরি হবে।

প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু সর্বদাই ছিলেন ব্যবসা-বান্ধব একজন রাজনীতিবিদ। ‘বাজ নাইজেরিয়া’ বলছে যে, ১৯৫২ সালে লেগোসের বড় ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নেয়া এই রাজনীতিবিদ ১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান পড়াশোনার জন্যে। সেখানে স্কুল শেষ করে ১৯৭৯ সালে হিসাবরক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি নেন। পাস করে বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানিতে কাজ করে ১৯৮৩ সালে দেশে ফিরে আসেন এবং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি ‘মোবিল’এ কাজ শুরু করেন। ১৯৯১ সালে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ৪০ বছর বয়সে তিনি তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। লেগোস রাজ্যের গভর্নর ছাড়াও তিনি সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবছরের পহেলা মার্চ তিনুবু প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২৯শে মে প্রেসিডেন্ট হবার পর তার স্বাগত বক্তব্যে তিনুবু ঘোষণা দেন যে, তিনি দেশটার মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেবেন।

এর ঠিক দুই দিন আগে ‘বিজনেস ইনসাইডার আফ্রিকার’ এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, নাইজেরিয়াতে ‘আইএমএফ’এর প্রতিনিধি আরি আইসেন এক ভার্চুয়াল আলোচনায় বলেন যে, নাইজেরিয়ার মূল সমস্যা হলো, সরকার কর থেকে যত আয় করছে, তার চাইতে বেশি ব্যয় করছে; যেকারণে ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে দেশটা যদি আয়ের অধিক ব্যয় করতে থাকে, তাহলে কোন একদিন দাতারা ঋণের অর্থ ফেরত চাইবে, অথবা নতুন ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেবে।

পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমদানি ব্যয় মেটাতে হিমসিম খাচ্ছে নাইজেরিয়া। ‘অবজারভেটরি অব ইকনমিক কমপ্লেক্সিটি’ বা ‘ওইসি’র হিসেবে নাজেরিয়া ২০২১ সালে প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং প্রায় ৫ বিলয়ন ডলারের সেবা রপ্তানি করেছিল। এর বিপরীতে দেশটা একইবছর প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারের সেবা আমদানি করে। ৫০ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত খনিজ তেল ও গ্যাস রপ্তানি করলেও নাইজেরিয়া প্রায় সাড়ে ১১ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধিত তেল আমদানি করে। এছাড়াও দেশটা বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যায়ে গম, গাড়ি, ঔষধ, যন্ত্রপাতি, ইত্যাদি আমদানি করে। বিদেশী ব্যবসায়িক সেবা, ব্যক্তিগত ভ্রমণ এবং পরিবহণ সেবা খাতে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার প্রতিবছর নাইজেরিয়া থেকে চলে যাচ্ছে। এছাড়াও এপ্রিল মাসে কনসাল্টিং কোম্পানি ‘কেপিএমজি’ বলে যে, দেশটার বেকারত্বের হার ২০২২ সালে যেখানে ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ, তা ২০২৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪১ শতাংশে ঠেকবে। তারা বলে যে, শিল্পায়ন না হওয়ায় এবং ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ না বাড়ায় বেকারত্বের সমস্যা থেকেই যাবে।

উপনিবেশ না হয়েও ঔপনিবেশিক নীতি যেন ছাড়ছে না নাইজেরিয়াকে। রেকর্ড মূল্যে জ্বালানি তেল রপ্তানি করলেও দেশটা এখন ব্যাপকভাবে ঋণগ্রস্ত। পরিশোধিত জ্বালানি এলপিজি রপ্তানি করে নাইজেরিয়রা নিজেদের বাসাবাড়িতে রান্নার জন্যে আমদানি করা পরিশোধিত কেরোসিন তেল ব্যবহার করে। শিল্পায়ন না হওয়ায় বেকারত্বের হার আকাশচুম্বী। ‘আফ্রিকা নিউজ’ বলছে যে, নতুন প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু দেশের অর্থনীতিকে ঘোরাবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর গডউইন এমেফিয়েল এবং অর্থনৈতিক ও আর্থিক দুর্নীতি দমন সংস্থার প্রধান আব্দুলরশীদ বাওয়া-কে পদচ্যুত ও গ্রেপ্তার করেছেন, এবং জ্বালানির উপর থেকে ভর্তুকি সরিয়ে নিয়েছেন। এতে ‘আইএমএফ’ খুশি হলেও পরিবহণ খরচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জেনারেটরের খরচ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন পশ্চিমা প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে জাতীয় মুদ্রা নাইয়ারাকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেয়ার কারণে জনগণকে আমদানি করা খাদ্য বহুগুণ বেশি মূল্যে ক্রয় করতে হবে। ফলস্বরূপ, ‘আইএমএফ’এর উপদেশ মেনে নাইজেরিয়ার ব্যবসা-বান্ধব সরকার এখন জনগণকে কষ্ট সহ্য করতে বলছে। পশ্চিমা ঋণের শর্তে নিষ্পেষিত পশ্চিম আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ নাইজেরিয়ার অর্থনৈতিক দৈন্যতা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করবে নিঃসন্দেহে।