Saturday, 25 February 2023

ইউক্রেন যুদ্ধ… চীন আসলে কোন পক্ষে?

২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০২৩

মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে চীনা শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ইয়ি। সামনের দিনগুলিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যে একটা দ্বন্দ্ব হতে চলেছে সেব্যাপারে চীন নিশ্চিত। এমতাবস্থায় চীন রাশিয়ার মতো একটা বন্ধুকে পাশে চাইছে। তাই নিরপেক্ষ থাকার কথা বলেও চীনারা কিছুটা রাশিয়ার দিকেই ঝুঁকে রয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের এক বছর পূর্তিতে চীন ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কাজ করতে ইচ্ছুক। ২৪শে ফেব্রুয়ারি চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নীতিপত্রে যুদ্ধের ব্যাপারে চীনের অবস্থানকে তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয় যে, এই যুদ্ধ কারুর জন্যেই সুবিধা বয়ে নিয়ে আসছে না। কাজেই সকলেরই উচিৎ স্বাভাবিক চিন্তা প্রয়োগ করা, যাতে করে এই যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে না ফেলে। ‘আল জাজিরা’র এই বিশ্লেষণে চীনা প্রস্তাবের বিশেষ দিকগুলিকে তুলে ধরা হয়; যার মাঝে ছিল মানবিক করিডোরের মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকদের সরানোর ব্যবস্থা করা, সারা দুনিয়াতে খাদ্যশষ্যের মূল্য স্থিতিশীল করতে শস্য রপ্তানি পুনরায় চালু করা। তবে এর মাঝে চীনারা বহুকাল ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের যে অবস্থানকে তুলে ধরেছে, সেগুলিকেই নিয়ে আসা হয়; যেমন, যেকোন দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং ভৌগোলিক সীমানার নিশ্চয়তা দেয়া। একইসাথে প্রস্তাবে পারমাণবিক কেন্দ্রগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। তবে একইসাথে সেখানে ‘ঠান্ডা যুদ্ধের মানসিকতা’ পরিহার করতে বলা হয়; যার মাধ্যমে চীনারা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকেই বোঝায়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সকি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে চীনের এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, এখানে শুধুমাত্র ইউক্রেনের সীমারেখাই লঙ্ঘন করা হয়েছে। ইউক্রেনের ভূমি ছেড়ে যেতে রুশদের রাজি করাতে তিনি চীনাদের সচেষ্ট দেখতে চান। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সিনিয়র উপদেষ্টা মিখাইলো পদোলিয়াক এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ইউক্রেনের সীমানা থেকে রুশ সেনা প্রত্যাহার না করেই যদি কোন যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়, তাহলে সেটা শান্তি হবে না; হবে যুদ্ধকে একটা অবস্থানে থামিয়ে রাখা।

মার্কিন মিডিয়া ‘সিএনএন’ বলছে যে, চীনা নীতিপত্রের অধিকাংশ অংশেই পশ্চিমাদের টার্গেট করা হয়েছে এবং পশ্চিমাদের সামরিক জোটের পরিধি বৃদ্ধি করার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টার বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভান ‘সিএনএন’কে বলেন যে, চীনা প্রস্তাবে যখন বলা হয়েছে সকল দেশের সার্বভৌমত্বকে মেনে চলা উচিৎ, তখনই ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দেয়া উচিৎ ছিল যে। কারণ ইউক্রেন, ন্যাটো বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই রাশিয়ার উপরে হামলা করেনি; হামলা করেছেন পুতিন। অপরদিকে বেইজিংএ ইইউএর প্রতিনিধি সাংবাদিকদের বলেন যে, চীনের এই প্রস্তাব কোন শান্তি প্রস্তাব নয়। তবে ইইউ এই প্রস্তাবকে খুঁটিয়ে দেখছে।

‘সিএনএন’ বলছে যে, এর আগের সপ্তাহেই মিউনিখে নিরাপত্তা আলোচনাতে চীনা শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ইয়ি এই নীতিপত্রের ব্যাপারে কথা বলেন। একই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ওয়াং মস্কো সফর করে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে দেখা করেন। পুতিন তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা দেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাইলফলকে পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেন। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে দুই দেশের সহযোগিতার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন। তবে ওয়াং তার বক্তব্যে বলেন যে, দুই দেশ বিভিন্ন সময়ে সমস্যার মাঝ দিয়ে যায়; যেখানে সম্পর্কোন্নয়নে নতুন সুযোগের সৃষ্টি হয়। তিনি উভয় দেশের পরিবর্তনগুলিকে স্বেচ্ছায় তুলে ধরে সেগুলির ব্যাপারে অগ্রগামী ভূমিকা নেয়ার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকার কথা বলেন। অস্ট্রেলিয়ার ‘নিউ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটি’র আলেক্সান্ডার করোলেভ ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, ওয়াং তার ইউরোপ সফরে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং হাঙ্গেরি গিয়েছে; যে দেশগুলি ইউক্রেনকে সহায়তা করার ব্যাপারে কিছুটা হলেও দোদুল্যমান ছিল। চীনারা হয়তো দেখতে চাইছে যে, ইউরোপের কিছু অংশকে তারা তাদের পক্ষে আনতে পারে কিনা।
 
জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজের সাথে চীনা শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ইয়ি। ওয়াং তার ইউরোপ সফরে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং হাঙ্গেরি গিয়েছে; যে দেশগুলি ইউক্রেনকে সহায়তা করার ব্যাপারে কিছুটা হলেও দোদুল্যমান ছিল। চীনারা হয়তো দেখতে চাইছে যে, ইউরোপের কিছু অংশকে তারা তাদের পক্ষে আনতে পারে কিনা।

 যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইয়েল ‘ল স্কুল’এর ‘পল সাই চায়না সেন্টার’এর ফেলো নিকোলাস বেকেলিন ‘আল-জাজিরা’কে বলছেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চীন বড় ধরণের সমস্যায় পড়েছে; তার অর্থনীতি বিপদে রয়েছে, ইউরোপের সাথে তার সম্পর্ক টানাপোড়েনে পড়েছে। একইসাথে সামনের দিনগুলিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যে একটা দ্বন্দ্ব হতে চলেছে সেব্যাপারে চীন নিশ্চিত। এমতাবস্থায় চীন রাশিয়ার মতো একটা বন্ধুকে পাশে চাইছে। তাই নিরপেক্ষ থাকার কথা বলেও চীনারা কিছুটা রাশিয়ার দিকেই ঝুঁকে রয়েছে।

সাংহাইএর ‘ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিট’র ঝাং শিন ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, যদিও পশ্চিমারা বলছে যে, চীনারা রাশিয়াকে অস্ত্র দিতে চাইছে, তথাপি সেটা যে চীনের স্বার্থের বিরুদ্ধ, সেব্যাপারে চীনারা অবগত রয়েছে; কারণ চীনের বেশিরভাগ বাণিজ্যই পশ্চিমাদের সাথে। একইসাথে তা অনেক দেশকেই যুক্তরাষ্ট্রের আরও কাছে নিয়ে যাবে। যেটা বরং সম্ভাব্য তা হলো, চীনারা রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য চালিয়ে যাবে; যা রাশিয়ার উপর পশ্চিমা অবরোধের বিরুদ্ধাচরণ। ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড’এর সিনিয়র ফেলো এন্ড্রু স্মল ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, চীনারা হয়তো ঘুরপথে রাশিয়াকে সহায়তা দিতে পারে; যাতে করে তারা বলতে পারে যে, তারা ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না। যেমন উত্তর কোরিয়ার মাধ্যমে এমন সকল প্রযুক্তি তারা রাশিয়াকে সরবরাহ করতে পারে, যেগুলি সামরিক এবং বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। তবে যুদ্ধ যেভাবে চলছে, তাতে একটা সময় চীনাদেরকে ঠিক করতেই হবে যে, তারা রাশিয়াকে সহায়তা দিতে আরও কতদূর যাবে।

‘বিবিসি’র বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এক বছর ধরেই পশ্চিমারা চাইছিল চীনারা যেন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে সহায়তা দেয়। এখন চীনের প্রস্তাব আসার পর সেটা পশ্চিমাদের মনঃপুত হয়নি। পশ্চিমারা হয়তো চীনাদের প্রস্তাবে খুশি হয়নি; তবে পশ্চিমাদের রাজি করানোটা হয়তো বেইজিংএর লক্ষ্য ছিল না। বেইজিং এই নীতিপত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কথা উল্লেখ করে উন্নয়নশীল বিশ্বকেই বুঝিয়েছে; যেখানে চীনারা যুক্তরাষ্ট্রের একটা বিকল্প হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে চাইছে। উন্নয়নশীল বিশ্ব যখন ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে উৎকণ্ঠার সাথে চেয়ে রয়েছে, তখন চীনারা মার্কিন নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার একটা বিকল্প দেখাবার চেষ্টা করছে। আলেক্সান্ডার করোলেভ বলছেন যে, চীনারা আরও বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, পশ্চিমাদের সাথে দ্বন্দ্বে রাশিয়া একা নয়; একইভাবে চীনের সাথে পশ্চিমাদের দ্বন্দ্বের সময়েও চীনারা একা থাকবে না। চীনারা ইচ্ছে করলে আরও আগেই এই প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারতো; ঠিক যুদ্ধের বর্ষপূর্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করতো না।

Thursday, 16 February 2023

তুরস্ক ও সিরিয়ার ভূমিকম্পে ত্রাণ সহায়তার কূটনীতি

১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৩

তুরস্ক ও সিরিয়ার ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিশ্বের বহু দেশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকেরা সকলেই একমত যে, সহযোগিতার এই উদাহরণগুলি কতদিন এই দেশগুলির মাঝে সম্পর্ককে উষ্ণ রাখবে, তা বলা মুস্কিল। পশ্চিমা চিন্তার উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সেকুলার বিশ্বব্যবস্থায় সকল রাষ্ট্রই জাতীয় স্বার্থকে সকলকিছুর উপরে স্থান দেয়; যেখানে মানবতার দিকগুলি সর্বদাই থাকে পিছনের সাড়িতে।

তুরস্ক ও সিরিয়ার ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। তুরস্ক সরকারের হিসেবে ৮০ হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে, আর ১০ লক্ষের বেশি মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতে বাস করছে। প্রচন্ড শীত ও বৃষ্টির মাঝে উদ্ধারকাজ যেমন কঠিন হয়েছে, তেমনি বেঁচে যাওয়া মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণও হয়েছে চ্যালেঞ্জিং। বিশ্বের বহু দেশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে তুর্কি সরকারি মিডিয়া ‘টিআরটি’ জানাচ্ছে যে, ১৩ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বের মোট ১’শটা দেশ তুরস্ককে সহায়তা দিতে চেয়েছে। এই মুহুর্তে তুরস্কের মাটিতে ৮১টা দেশের ৯ হাজার ৪’শ ৫৬ জন উদ্ধার ও ত্রাণকর্মী কাজ করছে। এছাড়াও আরও ৭’শ ৪৭ জন ত্রাণকর্মী আসার পথে রয়েছে। এই সহায়তা কতটা মানবতার জন্যে, আর কতটা জাতীয় স্বার্থ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে, সেটা নিরূপণ করা না গেলেও এই সহায়তার সাথে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কথাগুলি আলোচনায় আসা শুরু হয়েছে। একইসাথে রাজনৈতিক কারণেই আবার সিরিয়ার অভ্যন্তরে ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধারকাজ নিয়ে আলোচনা প্রায় নেই বললেই চলে।

তুরস্কের ভূমিকম্পে জরুরি সহায়তা দিয়েছে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। উভয় দেশই ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ন্যাটোর সদস্যপদ পাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের সদস্যপদ পাবার পথে বাধা হয়েছে তুরস্ক। তুরস্ক বলছে যে, এই দুই দেশ তুরস্কের অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্নতাবাদী বামপন্থী সংগঠন ‘কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি’ বা ‘পিকেকে’কে বিভিন্নভাবে সমর্থন করে যাচ্ছে; যদিও ‘পিকেকে’কে শুধু তুরস্ক নয়, পশ্চিমা দেশগুলিও সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছে। কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থক অনেককেই নরডিক এই দেশগুলি আশ্রয় দিয়েছে এবং সেখান থেকে তারা রাজনৈতিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এদের মাঝে কেউ কেউ আবার সুইডেনের পার্লামেন্ট সদস্যও হয়েছে। তুরস্ক চাইছে যে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থক ১’শ ৩০ জনকে এই দেশগুলি তুরস্কের কাছে হস্তান্তর করুক। এখন পর্যন্ত তুরস্কের দাবি ফিনল্যান্ড তুরস্কের শর্ত মানার ক্ষেত্রে অগ্রগামী হয়েছে; তবে সুইডেন পিছিয়ে রয়েছে।

‘ইউরোনিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুরস্কের দুর্যোগে সহায়তাদানের পর আঙ্কারার পররাষ্ট্রনীতিতে এর প্রভাব কতটুকু পড়বে, তা নিয়ে সুইডেন ও ফিনল্যান্ডে মতবিরোধ রয়েছে। ফিনল্যান্ডের তুর্কি বংশোদ্ভূত রাজনীতিবিদ ওজান ইয়ানার ‘ইউরোনিউজ’কে বলছেন যে, ভূমিকম্পে তুরস্কের যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাতে সামনের বেশ অনেকদিন তুরস্কে অন্য কোন ইস্যু নিয়ে কথা বলা যাবে না। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ন্যাটোর সদস্যপদ পাওয়া থেকে সুইডেনকে বঞ্চিত করার তুর্কি যেকোন পরিকল্পনাকে তুর্কি জনগণ ভূমিকম্প থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে নেবার প্রয়াস হিসেবেই দেখবে। অপরদিকে সুইডেনের ‘স্টকহোম ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর পল লেভিন মনে করছেন যে, ভূমিকম্প তুর্কি নেতা রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের চিন্তাকে পরিবর্তন করাতে পারবে না। কারণ ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধারকাজে ধীরগতিকে ঘিরে তুরস্কে যথেষ্ট পরিমাণে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এমতাবস্থায় জনগণের ক্রোধকে ক্ষমতাসীন দলের উপর থেকে সরাতে এরদোগান হয়তো আবারও সুইডেনের বিরুদ্ধাচরণে সোচ্চার হবেন। এমনকি খুব কঠিন পরিস্থিতিতে পতিত হলে তিনি নির্বাচনের দিনও পরিবর্তন করতে পারেন।

মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’ বা ‘সিএফআর’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সিরিয়ার অভ্যন্তরের রাজনীতিকে এই ভূমিকম্প যথেষ্ট প্রভাবিত করতে পারে। সিরিয়ায় ভূমিকম্পের সবচাইতে বড় আঘাতটা এসেছে ইদলিব অঞ্চলে; যার অনেকটাই যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এবং এখন তা বিদ্রোহী গ্রুপগুলির হাতে রয়েছে। এখানে আবার তুর্কি সেনারা সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের সরকারি বাহিনী আর বিদ্রোহী গ্রুপগুলির মাঝে বাফার জোন তৈরি করেছে। এতকাল তুরস্কের সাথে শুধুমাত্র একটা সীমান্ত রাস্তার মাধ্যমে ইদলিবের লক্ষ লক্ষ বাস্তুহারা মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছাতে পারছিল। সিরিয় সরকার এই অঞ্চলে কার কাছে ত্রাণ পৌঁছাবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। সিরিয়াতে তুরস্ক বাশার সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক সিরিয়ার সরকারের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ত্রাণকর্মীদের হিসেবে সিরিয়ায় নিহত সাড়ে ৩ হাজার মানুষের মাঝে শুধু ইদলিবেই ১৩ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ২২’শর বেশি মানুষের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গিয়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে সিরিয়াতে ৫৩ লক্ষ মানুষ বর্তমানে গৃহহারা।

এদিকে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ১৩ই ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সংস্থার ত্রাণ কর্মকান্ডের প্রধান মার্টিন গ্রিফিথস জানিয়েছেন যে, সিরিয়ার বিদ্রোহী গ্রুপগুলির নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়ার সুবিধার্থে সিরিয়ার বাশার সরকার তিন মাসের জন্যে তুরস্কের সাথে আরও দু’টা সীমান্ত সংযোগ চালু করার অনুমতি দিয়েছে। অর্থাৎ রাশিয়া এবং চীন ত্রাণ কর্মকান্ডকে বাধা দেয়নি; যদিও ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, কিছুদিন আগ পর্যন্তও রাশিয়া বলেছে যে, ইদলিবে ত্রাণ পৌঁছাবার জন্যে একটা সীমান্ত রাস্তাই যথেষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মিডিয়া ‘দ্যা মিডিয়া লাইন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে ইইউএর সাথে তুরস্কের সম্পর্ক বেশ খানিকটাই শীতল যাচ্ছিলো। কিন্তু ভূমিকম্পের সহায়তা হিসেবে ইইউএর ২০টা দেশ ২৯টা উদ্ধারকারী দল এবং ৫টা মেডিক্যাল দল পাঠিয়েছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের মাঝেও টানাপোড়েন চলছিল। ওয়াশিংটন তুরস্কে দেড়’শ উদ্ধারকারী দল এবং ৭৭ টন যন্ত্রপাতি পাঠিয়েছে। ইস্রাইলের সাথেও তুরস্কের রাজনৈতিক সম্পর্ক বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পার হয়েছে। তবে ইস্রাইল তুরস্কে ৪’শ সদস্যের বিশাল উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। জেরুজালেমের ‘হিব্রু ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর ইয়োনাটান ফ্রীম্যান বলছেন যে, জরুরি সহায়তা দেয়ার ব্যাপারগুলি একটা রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে যেমন তুলে ধরে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে তার প্রভাবও বৃদ্ধি করে। এই সহায়তাগুলি নিঃশর্ত হলেও এর মাধ্যমে দু’টা রাষ্ট্রের জনগণের মাঝে সুসম্পর্ক গড়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়। তবে বিশ্লেষকেরা সকলেই একমত যে, সহযোগিতার এই উদাহরণগুলি কতদিন এই দেশগুলির মাঝে সম্পর্ককে উষ্ণ রাখবে, তা বলা মুস্কিল। ১৯৯৯ সালে তুরস্কের ভূমিকম্পের পর গ্রিস সহায়তা দিয়েছিল; যার ফলশ্রুতিতে বেশ কয়েক বছর দুই দেশের মাঝে উত্তেজনা কমেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের সমস্যাগুলি আবারও সামনে চলে আসে। পশ্চিমা চিন্তার উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সেকুলার বিশ্বব্যবস্থায় সকল রাষ্ট্রই জাতীয় স্বার্থকে সকলকিছুর উপরে স্থান দেয়; যেখানে মানবতার দিকগুলি সর্বদাই থাকে পিছনের সাড়িতে।

Sunday, 5 February 2023

বেলুন কান্ড ও এর সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক ফলাফল

০৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৩

যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনের বিশাল বেলুনকে অতিক্রম করছে মার্কিন বিমান বাহিনীর 'এফ-২২' যুদ্ধবিমান। মার্কিন গোয়েন্দা বিমানগুলি যখন নিয়মিতভাবেই চীনের কাছাকাছি ঘুরে চীনাদের অস্বস্তির মাঝে ফেলছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনের বেলুনের অবাঞ্ছিত প্রবেশকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়; যা চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমান্বয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যের দিকেই নির্দেশ করে।

মার্কিন আকাশসীমায় চীনের তৈরি বিশাল একটা বেলুনের প্রবেশকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন যে, বেলুনটা সর্বপ্রথম ২৮শে জানুয়ারি প্রায় ৬০ হাজার ফুট উঁচু দিয়ে আলাস্কার আকাশে ঢোকে। এর তিনদিন পর কানাডার আকাশসীমায় চলে গেলেও ৩১শে জানুয়ারি তা আবারও যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে প্রবেশ করে। এরপর পুরো যুক্তরাষ্ট্রের উপর দিয়ে ওড়ার পরে ৫ই ফেব্রুয়ারি আটলান্টিক মহাসাগরের উপরে বেলুনটাকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তারা এটাকে গোয়েন্দা বেলুন বলে আখ্যা দিচ্ছেন। আর চীনারা বলছে যে, বেলুনটা ছিল আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহের জন্যে তৈরি; যা কিনা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে চলে গিয়েছে। ‘সিএনএন’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, বেলুনটা ভূপাতিত হবার আগে পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার উপর দিয়ে উড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো’র এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংএর প্রফেসর ইয়াইন বয়েড ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, বেলুনটা খুব সম্ভবতঃ আবহাওয়ার ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছিল না। কারণ আবহাওয়া বেলুনের আকৃতি অনেক ছোট হয়। এটা বিশ্বাস করাটা কঠিন যে, চীনারা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি বাতাসের তাপমাত্রা বা চাপ মাপার চেষ্টা করবে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’র প্রাক্তন কর্মকর্তা ট্রেসি ওয়াল্ডার মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ‘এমএসএনবিসি’কে বলছেন যে, এই বেলুন খুব সম্ভবতঃ ছবি তোলার জন্যে পাঠানো হয়নি। কারণ চীনের বেশকিছু গোয়েন্দা স্যাটেলাইট রয়েছে, যেগুলি হাই রেজোলিউশনের ছবি তুলতে পারে। এই বেলুন হয়তো ইলেকট্রনিক সিগনালস ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ করছিল। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে তেজষ্ক্রিয়তা কতটুকু বা আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারের কর্মকান্ড কেমন, এগুলি জানতে হলে স্যাটেলাইটের চাইতে আরও কম উচ্চতায় উড়তে হবে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন জেনারেল ব্যারি ম্যাকাফরে ‘এমএসএনবিসি’কে বলছেন যে, এটা নিঃসন্দেহে গত ৫০ বছরের মাঝে চীনা ইন্টেলিজেন্সের সবচাইতে ‘গোঁয়াড়’ কর্মকান্ড ছিল। তার ধারণা, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা নিশ্চয়ই এটা সম্পর্কে জানতেন না। এটাও হতে পারে যে, চীনের সামরিক বাহিনীর উপর রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ নেই। জেনারেল ম্যাকাফরে মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে সামরিক দিক থেকে চীনের চেয়ে বহু এগিয়ে রয়েছে। এখানে তাইওয়ানের সামরিক সক্ষমতা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে রয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের সামরিক শক্তি। এবং অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনে নতুন করে ৯টা সামরিক ঘাঁটি পাবার অবস্থানে পৌঁছেছে; যার মাধ্যমে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কৃত্রিম দ্বীপভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটা ডিটারেন্ট তৈরি হবে। কাজেই চীনারা মারাত্মক ভুল না করলে যুদ্ধ হবার সম্ভাবনা নেই। ট্রেসি ওয়াল্ডার বলছেন যে, গোয়েন্দা সংস্থাতে তিনি চীনা ইন্টেলিজেন্স ঠেকাতে কাজ করেছেন; কিন্তু কখনোই চীনাদের এহেন খোলামেলা কর্মকান্ড প্রত্যক্ষ করেননি। সাধারণতঃ চীনারা খুব সন্তর্পণে কাজ করে; সহজে তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’র প্রাক্তন প্রধান লিয়ন প্যানেট্টা ‘সিএনএন’কে বলছেন যে, বেলুনের ধ্বংসাবশেষ থেকে যদি বুঝতে পারা যায় যে, এটা কি প্রকারের তথ্য সংগ্রহ করছিল এবং আকাশে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল কিনা, তাহলে বোঝা যাবে যে এটা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে গোয়েন্দাবৃত্তির জন্যেই এসেছিল কিনা। প্যানেট্টা মনে করছেন যে, যদি মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব বুঝেই থাকে যে, বেলুনটা একটা গোয়েন্দা বেলুন, তাহলে এটাকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার উপর দিয়ে উড়তে দেয়াটা উচিৎ হয়নি; বরং এটাকে আরও আগেই ভূপাতিত করা উচিৎ ছিল। প্যানেট্টা বলছেন যে, চীন কিভাবে কাজটা করেছে, তা নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হলেও চীনে কেন এই কাজটা করেছে, সেটা নিয়ে খুব কমই কথা হচ্ছে। চীনারা নিঃসন্দেহে জানতো যে, মার্কিনীরা এটা খুঁজে পাবে এবং এর প্রত্যুত্তর দেবে। তারা হয়তো বার্তা দিতে চাইছিলো যে, মার্কিনীরা যদি চীনের উপরে গোয়েন্দাবৃত্তি করে, তাহলে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের উপরে গোয়েন্দাবৃত্তি করতে সক্ষম। কারণ মার্কিনীরা নিয়মিতভাবেই চীনের সীমানার খুব কাছ দিয়ে গোয়েন্দা বিমান ওড়ায় এবং সেগুলি বেশ নিয়মিতভাবেই চীনারা বাধা দিতে আসে। কারণ চীনারা এই কর্মকান্ডকে মোটেই ভালো চোখে দেখে না।

‘সিআইএ’র আরেক প্রাক্তন প্রধান জন ব্রেনান ‘এমএসএনবিসি’কে বলছেন যে, এটা এখনও পরিষ্কার নয় যে, চীনারা প্রকৃতপক্ষে কি চিন্তা করছিল। একটা বেলুন ৬০ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে কিছু কাজ করতে পারে, যা কিনা একটা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট আরও বেশি উচ্চতা থেকে করতে পারে না। তবে এই বেলুন কে উৎক্ষেপণ করেছিল এবং এর প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই বা কতটুকু ছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে চীনারা জানতো যে, যুক্তরাষ্ট্র এটাকে খুঁজে পাবে এবং ব্যবস্থা নেবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের আলোচনার অনেকগুলি বিষয় রয়েছে, যেগুলি এখন ব্যাহত হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু সেটাই চীনারা চেয়েছিল কিনা, সেব্যাপারে এখনও কেউই নিশ্চিত নয়।

ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’এর প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল মাইকেল ক্লার্ক ব্রিটেনের ‘স্কাই নিউজ’কে বলছেন যে, এই বেলুনের মাধ্যমে চীনারা এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ইন্টেলিজেন্স পাবে না, যা কিনা তারা ইতোমধ্যেই পাচ্ছে না। বরং দেখতে হবে যে, এর মাধ্যমে চীনাদের বার্তাটা কি ছিল। ক্লার্ক বলছেন যে, তারা ধারণা কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনে যে ঘাঁটি তৈরির চুক্তি করেছে, এটা সেই চুক্তিরই প্রত্যুত্তর।

মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন বেলুনের ঘটনাকে একটা ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ কর্মকান্ড বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ইতোমধ্যেই ৫ই ফেব্রুয়ারি তার বেইজিং সফর বাতিল করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, তারা চীনের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে ইচ্ছুক নয়, তথাপি ব্লিনকেনের বেইজিং সফর বাতিল করা দেখিয়ে দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র বেলুনের ইস্যুটাকে ব্যবহার করতে চাইছে। অথচ মাত্র কিছুদিন আগেই ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি তৈরির যে ঘোষণা দিয়েছে, সেটাকে তারা চীনের অসন্তুষ্ট হবার কোন কারণই দেখছে না। আর মার্কিন গোয়েন্দা বিমানগুলি যখন নিয়মিতভাবেই চীনের কাছাকাছি ঘুরে চীনাদের অস্বস্তির মাঝে ফেলছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনের বেলুনের অবাঞ্ছিত প্রবেশকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়; যা চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমান্বয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যের দিকেই নির্দেশ করে।

Tuesday, 31 January 2023

ইরানের অস্ত্র কারখানায় ড্রোন হামলা আঞ্চলিক উত্তেজনায় নতুন মাত্রা

৩১শে জানুয়ারি ২০২৩

২৮শে জানুয়ারি ২০২৩। ইরানের ইসফাহান শহরে অস্ত্রের কারখানায় ড্রোন হামলা। এই হামলার মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিলো নিঃসন্দেহে।


গত ২৮শে জানুয়ারি ইরানের মধ্যাঞ্চলের শহর ইসফাহানের একটা ‘ওয়ার্কশপে’ ড্রোন হামলা হয়েছে বলে ইরানের সরকারি গণমাধ্যমে বলা হয়। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে যে, মোট তিনটা ড্রোন কারখানায় হামলা করে; যার মাঝে দু’টাকে ভূপাতিত করা হয়। একটা ড্রোন তার বহনকৃত বোমা কারখানার উপরে ফেলতে সক্ষম হয়। তবে এতে কারখানার ছাদের উপর সামান্য ক্ষতি ছাড়া তেমন কিছু হয়নি। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ইরানের টেলিভিশনে কারখানার ছাদের ভিডিও প্রকাশ করে হাল্কা ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয় এবং একইসাথে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ দেখানো হয়; যেগুলি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত ড্রোনের সদৃশ। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ জানাচ্ছে যে, ড্রোনগুলি ছিল ‘কোয়াড কপ্টার’; যেগুলি হলো চারটা পাখা দ্বারা ওড়া ছোট আকারের ড্রোন। এগুলি সাধারণতঃ স্বল্প দূরত্ব থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে চালানো হয়। অর্থাৎ এই ড্রোনগুলি ইরানের বাইরে থেকে উড়ে আসেনি। কেউ এখন পর্যন্ত হামলার দায় স্বীকার না করলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে যে, ইস্রাইল এই হামলা করেছে। অনেকেই ধারণা করছেন যে, ইসফাহানের এই কারখানায় খুব সম্ভবতঃ ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ প্রস্তুত করা করা।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২২এর অক্টোবরে ইরানের টেলিভিশনে কিছু ব্যক্তির বক্তব্য প্রকাশ করা হয়; যেখানে বলা হয় যে এই বক্তব্য ছিল আটককৃত কুর্দি বিদ্রোহী গ্রুপ ‘কোমালা’র সদস্যদের, যারা কিনা ইস্রাইলের ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘মোসাদ’এর ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং তারা ইসফাহান শহরে সামরিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করছিলো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে এরূপ ঘটনার গুরুত্ব বেড়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ইরানের কুর্দী বংশোদ্ভূত মহিলা মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুরো ইরানজুড়ে চলছে সহিংসতা। আর ইতোমধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ইরান সুইসাইড ড্রোন সরবরাহ করায় ইরানকে নিয়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং পারমাণবিক প্রকল্পে কাজ করা গবেষকদের হত্যার জন্যে অনেকেই ইস্রাইলকেই দায়ী মনে করছেন। ইরানের সরকার পারমাণবিক প্রকল্পে ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্ট বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করার ঘোষণা দেয়ার পর থেকে ইস্রাইলের পক্ষ থেকে ইরান-বিরোধী বক্তব্য যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইস্রাইলের যৌথ মহড়ার পরিধিও বেড়েছে। এখানে আজেরবাইজানের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজেরবাইজান ইরানের প্রতিবেশী দেশ এবং ইস্রাইলের সাথে আজেরবাইজানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ইরানিরা বারংবার অভিযোগ করেছে যে, ইস্রাইলি ইন্টেলিজেন্স আজেরবাইজানকে ব্যবহার করে ইরানের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে। 

ড্রোনগুলি সাধারণতঃ স্বল্প দূরত্ব থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে চালানো হয়। অর্থাৎ এগুলি ইরানের বাইরে থেকে উড়ে আসেনি। আজেরবাইজান ইরানের প্রতিবেশী দেশ এবং ইস্রাইলের সাথে আজেরবাইজানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ইরানিরা বারংবার অভিযোগ করেছে যে, ইস্রাইলি ইন্টেলিজেন্স আজেরবাইজানকে ব্যবহার করে ইরানের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে।


ইসফাহানে ড্রোন হামলার একদিন আগেই তেহরানে আজেরবাইজানের দূতাবাসে হামলা হয়। আজেরবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, ২৭শে জানুয়ারি সকাল ৮টার সময় এক ব্যাক্তি স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের মাধ্যমে দূতাবাসে হামলা করে। এতে দূতাবাসের নিরাপত্তা প্রধান নিহত হন এবং এবং আরও দু’জন নিরাপত্তারক্ষী আহত হন। সোশাল মিডিয়া ‘টেলিগ্রাম’এ প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায় যে, এক অস্ত্রধারী ব্যক্তি হঠাৎ করেই দূতাবাসের মুখে গাড়ি পার্ক করে বন্দুক নিয়ে হামলা করে। পরবর্তীতে দূতাবাসের ভেতরে তার সাথে কর্মকর্তারা তাকে ধরে ফেলে। ভিডিওতে কোন শিশু দৃশ্যমান না হলেও তেহরানের পুলিশ প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন রাহিমি ইরানি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম’কে বলেন যে, আক্রমণকারী ব্যক্তি তার দু’জন শিশু সন্তানকে নিয়ে দূতাবাসে এসেছিলেন। তিনি বলেন যে, আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, ব্যাপারটা ছিল ব্যাক্তিগত এবং পারিবারিক কলহ। তবে আজেরবাইজানের বিবৃতি বলছে যে, এই ঘটনা মোটেই পারিবারিক কলহ ছিল না। ঘটনার অনেক আগে থেকেই ইরানের অভ্যন্তরে আজেরবাইজান-বিরোধী কর্মকান্ডের ফলে আজেরবাইজানের পক্ষ থেকে তেহরানে তাদের দূতাবাসের নিরাপত্তা বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছিল। ইরানিরা সেই দাবি আমলে না নেয়ায় এখন আজেরবাইজান দূতাবাসের কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তেহরানের হামলার পর যে দেশগুলি আজেরবাইজানকে সমবেদনা জানিয়েছে, তার মাঝে ইস্রাইল ছিল সর্বাগ্রে।

‘ইউরেশিয়ানেট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তেহরানে হামলার কয়েক ঘন্টার পরেই বাকুতে ইস্রাইলের রাষ্ট্রদূত জর্জ ডীক এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, তার সাথে আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিকমাত হাজিইয়েভের সাথে অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। তেহরানে আজেরি দূতাবাসে হামলার আগে থেকেই আজেরবাইজান-ইরান সম্পর্কে উত্তেজনা চলছিল। ২০২০ সালে নাগোর্নো কারাবাখের যুদ্ধের সময় আজেরবাইজান অভিযোগ করে যে, ইরান আর্মেনিয়াকে জ্বালানি এবং অন্যান্য সহায়তা দেয়। অপরদিকে তেহরান দুশ্চিন্তায় রয়েছে যে, আজেরবাইজান তাদের নাখচিভান ছিটমহলকে মূল ভূখন্ডের সাথে যুক্ত করার জন্যে যে করিডোর আর্মেনিয়ার কাছে দাবি করছে, সেটা ইরানের সাথে আর্মেনিয়া এবং রাশিয়ার স্থলযোগাযোগের পথকে হুমকির মাঝে ফেলতে পারে। এছাড়াও ইরানের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ জাতিগতভাবে আজেরি হওয়ায় তা তেহরান এবং বাকুর মাঝে দড়িটানাটানির কারণ হয়েছে। তেহরানে আজেরবাইজানের দূতাবাসে হামলার পর আজেরবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বলা হয় যে, এই ঘটনার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও চাপের মাঝে পড়বে। ২০২২এর নভেম্বরে আজেরবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভ এক অনুষ্ঠানে বলেন যে, তার সরকার আজেরবাইজান এবং আজেরবাইজানের বাইরে সকল আজেরিদের সেকুলার জীবনযাত্রাকে রক্ষার চেষ্টা করবে; এমনকি ইরানের অভ্যন্তরে যে আজেরিরা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও। আলিইয়েভ ইরানের অভ্যন্তরের আজেরিদেরকে ‘আজেরবাইজানের জনগণ’ বলে আখ্যা দেন।

তেহরানে আজেরি দূতাবাসে হামলার পর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, আজেরবাইজান কখনও একা নয়। ‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ঐতিহাসিকভাবেই আজেরবাইজান তুরস্কের সবচাইতে কাছের বন্ধু। নাগোর্নো কারাবাখ যুদ্ধে আজেরিদের বিজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল তুরস্ক এবং ইস্রাইল। তুরস্ক আবার আঞ্চলিকভাবে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী। তদুপরি, ইরান সর্বদাই অভিযোগ করে আসছে যে, আজেরবাইজান ইরানের অভ্যন্তরের আজেরিদের মাঝে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাকে উস্কে দিচ্ছে। একইসাথে ইরান সন্দেহ করে যে, ইরানের অভ্যন্তরে ইস্রাইলের ইন্টেলিজেন্স কাজ করার জন্যে আজেরবাইজানকে ব্যবহার করছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের ইসফাহান অস্ত্র কারখানায় হামলা মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিলো নিঃসন্দেহে।

Saturday, 28 January 2023

আফ্রিকাকে ঘিরে চীন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ঘনীভূত হচ্ছে

২৮শে জানুয়ারি ২০২৩

জানুয়ারি ২০২৩। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট রামাফোসার সাথে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভ। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আফ্রিকার দেশগুলির সমর্থন না পেয়ে ২০২৩ সালে বাইডেন প্রশাসন যে আফ্রিকার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, তা নিশ্চিত। তবে রাশিয়া এবং চীনের যৌথ প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করাটা যে খুব সহজ হবে না, সেব্যাপারেও সকলেই একমত। আফ্রিকার দেশগুলিকে নিজেদের বলয়ে নিয়ে আসতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন হয়তো গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ব্যাপারে তার আদর্শিক অবস্থান থেকে বেশ খানিকটা সরে আসতে বাধ্য হবেন।

মাত্র কিছুদিন হলো চীনের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিন গাং আফ্রিকার পাঁচটা দেশ ভ্রমণ করেছেন। আর রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের মাত্র একদিন পরই সেখানে হাজির হয়েছে মার্কিন বাণিজ্য সচিব জ্যানেট ইয়েলেন। এছাড়াও জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি লিন্ডা থমাস গ্রীনফিল্ড পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা সফরে গিয়েছেন। ‘এনপিআর’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই বলছেন যে, আফ্রিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসন আফ্রিকার দিকে খুব একটা তাকায়নি। এখন জো বাইডেনের প্রশাসন আফ্রিকায় তাদের কার্যক্রম বৃদ্ধি করায় ব্রতী হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসিতে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই বৈঠকে নীতি বিষয়ক কোন দিকনির্দেশনা ছিল না; বরং আফ্রিকার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সেতু তৈরিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। এখন বলা হচ্ছে যে, ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজে এবং তার ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালা হ্যারিসও আফ্রিকা সফর করতে পারেন। তবে বর্তমানে আফ্রিকার সাথে মার্কিন বাণিজ্য যতটুকু, চীনের সাথে আফ্রিকার বাণিজ্য তার চারগুণ! মার্কিনীরা চীনা ঋণের ফাঁদের কথা বললেও চীনের বিপরীতে তারা আফ্রিকাকে কি দিতে পারে সেটা পরিষ্কার করতে পারেনি। অপরদিকে আফ্রিকার দেশগুলি ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমা চাপের মুখে রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক কর্তনের ক্ষেত্রেও আগ্রহী হয়নি।

‘ভয়েস অব আমেরিকা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা অস্বীকার করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকাতে রুশ এবং চীনা প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে; যদিও ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আফ্রিকার দেশগুলি যখন রুশদের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন ওয়াশিংটন আফ্রিকার দেশগুলির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। মার্কিনীরা বলছে যে, তারা বাণিজ্য, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা বিষয়েই আফ্রিকার দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নে বেশি আগ্রহী। মার্কিন বাণিজ্য সচিব জ্যানেট ইয়েলেন আফ্রিকা সফরের সময় বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত নয়; শুধুমাত্র আফ্রিকার সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী। কিন্তু আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের চেয়ারপার্সন মুসা ফাকি মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, পশ্চিমা দেশগুলি একসময় আফ্রিকাকে উপনিবেশ হিসেবে শাসন করেছে। আফ্রিকানরা এখন সকলের সাথেই সহযোগিতা করতে চায়; যতক্ষণ পর্যন্ত তারা আফ্রিকানদের স্বার্থকে সন্মান করবে। চীনের সাথে আফ্রিকার সহযোগিতা এই চিন্তাগুলির উপরেই স্থাপিত।

তবে শক্তিশালী দেশগুলি আফ্রিকাকে নিয়ে প্রতিযোগিতা বরং বাড়িয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হচ্ছে যে, আগামী ১৭ থেকে ২৭শে ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে ভারত মহাসাগরে রাশিয়া এবং চীনের সাথে এক যৌথ নৌমহড়ার আয়োজন করা হয়েছে। ‘মোসি-২’ নামের এই মহড়াটা ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম বার্ষিকীকে স্পর্শ করবে। ‘সিবিএস নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই এই মহড়ার ব্যাপারে তার উদ্বেগ জানিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নালেদি পান্ডর সমালোচকদের বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে বলেন যে, এটা শুধু কিছু বন্ধু দেশের সাথে মহড়া মাত্র। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের দেশ ব্রিটেন, চীন, নাইজেরিয়া, এমনকি এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের সময় বলেন যে, এই মহড়াটা পুরোপুরি স্বচ্ছতা বজায় রেখে করা হচ্ছে এবং মহড়া সম্পর্কে সকল তথ্যই আগে থেকেই দেয়া হয়েছে। রুশ বার্তা সংস্থা ‘তাস’ বলছে যে, এই মহড়ায় একটা রুশ যুদ্ধজাহাজ প্রথমবারের মতো সর্বাধুনিক ‘হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র’ বহণ করবে।

‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর ডেপুটি ডিরেক্টর পলিন ব্যাক্স ‘সিবিএস’কে বলছেন যে, এই মহড়ার পরিকল্পনা বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই করা হয়েছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের বর্ষপূর্তিতে এই মহড়া কিছুটা ভিন্নরকম। কূটনৈতিক জটিলতা এড়াতে দক্ষিণ আফ্রিকা হয়তো অন্য কোন দিন দেখতে পারতো।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর গবেষক ক্যামেরন হাডসন ‘ভয়েস অব আমেরিকা’কে বলছেন যে, যদিও মার্কিনীরা বলছে যে, তারা শুধুমাত্র আফ্রিকার উন্নয়নের সহযোগী হতে চায়, প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা এর চাইতে আরও জটিল। উন্নয়ন সহযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে আলাদা করা যাবে না। মার্কিনীরা একদিকে যেমন চাইছে যে, আফ্রিকার দেশগুলি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন এবং রাশিয়ার প্রভাবকে এড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হোক, তেমনি তারা আফ্রিকায় রুশ এবং চীনা কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। হাডসন প্রশ্ন করছেন যে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন আফ্রিকা সফর করতে গেলে গণতন্ত্রকে তুলে ধরার যে আদর্শিক ব্রত তিনি দেখিয়েছিলেন সেটাকে আঁকড়ে ধরে রাখবেন কিনা। আফ্রিকার দেশগুলি যখন গণতন্ত্র থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি কি আফ্রিকার সরকারগুলির সরাসরি সমালোচনা করবেন, নাকি জাতিসংঘে আফ্রিকার দেশগুলির সমর্থন পেতে আপাততঃ সমালোচনাকে পিছনের সারিতে রাখবেন?

‘মরগ্যান স্ট্যানলি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীনারা তাদের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’এর আওতায় বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১ হাজার বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর মাঝে চীনারা বেশ শক্তভাবে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলাবার নীতিতে অটল রয়েছে। চীনের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিন গাং আফ্রিকা সফরের সময় বলেন যে, কোন দেশের অধিকার নেই আফ্রিকার দেশগুলিকে কোন বিশেষ পক্ষালম্বন করার জন্যে চাপ দেয়ার। আফ্রিকার হওয়া উচিৎ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র; শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়।

‘এনপিআর’ বলছে যে, আফ্রিকার সাধারণ জনগণ আফ্রিকাকে নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে ভালো চোখে দেখছে না। কিন্তু যখন আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশই বাইরের সহায়তার উপর নির্ভরশীল, তখন এই মহাদেশকে নিয়ে যে শক্তিশালী দেশগুলির মাঝে প্রতিযোগিতা হবে, সেটাই স্বাভাবিক। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আফ্রিকার দেশগুলির সমর্থন না পেয়ে ২০২৩ সালে বাইডেন প্রশাসন যে আফ্রিকার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, তা নিশ্চিত। তবে রাশিয়া এবং চীনের যৌথ প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করাটা যে খুব সহজ হবে না, সেব্যাপারেও সকলেই একমত। আফ্রিকার দেশগুলিকে নিজেদের বলয়ে নিয়ে আসতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন হয়তো গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ব্যাপারে তার আদর্শিক অবস্থান থেকে বেশ খানিকটা সরে আসতে বাধ্য হবেন।