Monday, 19 September 2022

ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের সাথে দ্বন্দ্বে লজিস্টিক্যাল সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২২
 
ঠান্ডা যুদ্ধের পর থেকে গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের লজিস্টিকস ব্যবস্থা কার্যকারিতার দিকে ফোকাস না দিয়ে কম বাজেটে কম বিনিয়োগে কর্মসম্পাদনের দিকে মনোযোগী হয়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সর্বনিম্ন খরচায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বড় কোন শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামলে এই লজিস্টিকস ব্যবস্থা কেমন কাজ করবে, তা প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে মার্কিন সাপ্লাই ব্যবস্থা বেসামরিক সরবরাহকারীদের উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক বেশি কঠিন হতে পারে।

বিশ্বব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের পিছনে মূল কারণ হিসেবে সকলেই প্রযুক্তিকে ধরে নিলেও এখানে লজিস্টিকসের গুরুত্ব যে অপরিসীম, তা পশ্চিমা চিন্তাবিদদের কাছে অজানা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে সারা বিশ্বে জাহির করতে এবং বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের শতশত সামরিক ঘাঁটিকে বাস্তবিকভাবে কার্যক্ষম রাখতে লজিস্টিকসই মূল ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন সামরিক শক্তির একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো লজিস্টিকস। বাকি বিশ্বের চাইতে মার্কিনীদের অবস্থান এক্ষেত্রে বেশ কিছুটা অন্যরকম। কারণ মার্কিনীরা সারা দুনিয়াতে পুলিশম্যানের দায়িত্ব পালন করলেও তাকে সেটা করতে হচ্ছে নিজেদের দেশ থেকে হাজারো মাইল দূরে। নিজেদের দেশের দুই পাশে দুই মহাসাগর পরিবেষ্টিত হওয়ায় তা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে সুসংহত করলেও সারা দুনিয়ার পুলিশম্যান হবার জন্যে তা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। হাজার মাইল দূরে গিয়ে নিজেদের সেনাদের লজিস্টিকসের সমস্যাগুলি মেটানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এক ব্যাপার। আর সেই চ্যালেঞ্জ ঠান্ডা যুদ্ধের পর থেকে একভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও এখন ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার বাস্তবতায়, বিশেষ করে ইন্দোপ্যাসিফিকে, নতুন করে সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে।

লজিস্টিকসের বাস্তবতা

মার্কিন বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা মাইকেল ট্রিম্বল এবং ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স’এর কর্মকর্তা জোবি টার্নার ‘দ্যা স্ট্র্যাটেজি ব্রিজ’এর এক লেখায় বলছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে লজিস্টিকসের কারণে বাকি দুনিয়ার সামরিক বাহিনী থেকে মার্কিনীরা এগিয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং আফগানিস্তানে স্বল্প সময়ের জন্যে নিজেদের লজিস্টিকস সমস্যার মাঝে পড়লেও কোন শত্রু দীর্ঘ সময়ের জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লজিস্টিকসকে সমস্যায় ফেলতে পারেনি। তবে তারা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সুবিধার কিছু দুর্বলতাও রয়েছে; যেগুলি অনেকেই আলোচনা করছেন না। এই দুর্বলতাগুলি সাম্প্রতিক সময়ে সামনে চলে এসেছে; বিশেষ করে করোনাভাইরাসের লকডাউন এবং এর পরবর্তী সাপ্লাই চেইন সমস্যা শুরুর পর থেকে। তারা বলছেন যে, মার্কিন সামরিক লজিস্টিকসের তিনটা প্রধান বাস্তবতার মাঝে একটা হলো মার্কিন সামরিক বাহিনী উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহণ পর্যন্ত বেসামরিক সরবরাহকারীদের উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। এছাড়াও তারা আরও বলেন যে, দু’টা বাস্তবতা অনেকেই ভুলে যায়; যা কিনা যুদ্ধক্ষেত্রে জয়পরাজয় নির্ধারণ করে ফেলতে পারে। প্রথমতঃ লজিস্টিকস হলো বাস্তবিকপক্ষে এমন কিছু বস্তুর সরবরাহ, যা কিনা দেখা যায়, শোনা যায় এবং অনুভব করা যায়। অর্থাৎ সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাদের হাতে সরবরাহ পৌঁছে দিতে হবে; যা সৈন্যরা ব্যবহার করবে। দ্বিতীয়তঃ লজিস্টিকসের মূল বিষয় হলো মানুষের জন্যে সরবরাহ। যদিও সৈন্যরা যুদ্ধ করার জন্যে অস্ত্রসস্ত্র ব্যবহার করে, তথাপি মানুষ হিসেবে তারা খাদ্য, বস্ত্র এবং অন্যান্য চাহিদার উপর নির্ভরশীল; যেগুলি সরবরাহ না করতে পারলে সৈন্যরা যুদ্ধ করতে পারবে না; এমনকি শত্রুর বুলেটের আঘাত ছাড়াও মারা যেতে পারে। তবে যে প্রকারের সরবরাহই হোক না কেন, মার্কিনীরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, তাদের সাপ্লাই ব্যবস্থার উপর কেউ আক্রমণ করবে না। মূলতঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিনীরা যেসকল শত্রুর মোকাবিলা করেছে, তাদের কেউই যুক্তরাষ্ট্রের লজিস্টিক্যাল ব্যবস্থার উপর হামলা করার মতো সক্ষম ছিল না। আর বেসামরিক সরবরাহকারীদের উপর নির্ভরশীল এই লজিস্টিকস ব্যবস্থা শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যে মোটেই প্রস্তুত নয়।

ইন্দোপ্যাসিফিকে নতুন চিন্তা এবং লজিস্টিকসের নতুন চ্যালেঞ্জ

মার্কিন ম্যারিন কোরের ‘ফোর্স ডিজাইন ২০৩০’এর মূল চিন্তাটা হলো বাহিনীকে ইন্দোপ্যাসিফিকের দ্বীপগুলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়া, যাতে করে চীনারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের বহর ব্যবহার করে কোন বড় আকারের ক্ষতি করতে না পারে। অর্থাৎ বাহিনী ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে যাবার ফলে তাদের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতিও হবে কম। মার্কিন বন্ধুদের হাতে থাকা সেই দ্বীপগুলিকে ব্যবহার করে মার্কিনীরা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে চীনাদের সামরিক টার্গেটে আঘাত হানতে পারবে। তবে ম্যারিন কোরকে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে ফেললে প্রতিটা গ্রুপকে ভালোমতো সরবরাহ করাটা খুবই কঠিন কাজ হয়ে যেতে পারে বলে অনেকেই বলছেন। ‘দ্যা ইউরেশিয়ান টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বাহিনীকে ছড়িয়ে দেয়ার এই চিন্তাটায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্বের ব্যাপারটা চিন্তা করা হয়নি। পেন্টাগনের জন্যে ‘দ্যা র‍্যান্ড কর্পোরেশন’এর করা ভার্চুয়াল যুদ্ধ মহড়ায় মার্কিন এবং তাইওয়ানি বাহিনী চীনাদের সাথে পুরোপুরিভাবে হেরেছে। এর কারণ হলো চীনারা কাছাকাছি হবার কারণে তাদের মূল ভূখন্ড থেকে সাপ্লাই নিয়ে এসে তাদের ক্ষতিগুলিকে দ্রুতই পুষিয়ে উঠতে পেরেছে; যা কিনা মার্কিনীরা পারেনি। এখানে মূল সমস্যা হলো, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দূরবর্তী একটা যুদ্ধক্ষেত্রে অনায়াসে সরবরাহ পাঠানো কঠিন হয়ে যেতে পারে।
 
ম্যারিনদের পরিকল্পনার মূলে রয়েছে ছোট জাহাজ দ্বারা সরবরাহের প্রাপ্তি। জাপান, কোরিয়া এবং ফিলিপাইনের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন দ্বীপগুলিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে; যেখানে মার্কিনীরা আগে থেকেই বিভিন্ন সাপ্লাই জমা করে রাখবে। মার্কিন সামরিক রসদ সরবরাহকারী জাহাজগুলি চীনা ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মাঝে এসে কিভাবে তাদের মালামাল নামাবে, তা চিন্তার বিষয়।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা স্টিমসন সেন্টার’এর এক আলোচনায় মার্কিন ম্যারিন কোরের উপপ্রধান জেনারেল এরিক স্মিথ বলেন যে, ইন্দোপ্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জগুলি হলো বাজে ধরণের গোপন জিনিস, যেগুলি নিয়ে কেউই কথা বলতে ইচ্ছুক নয়। এখানে মূল চ্যালেঞ্জ হলো দৌড়ে পিছিয়ে পড়া। এই মুহুর্তে মার্কিন ম্যারিন কোরের যুদ্ধ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যথেষ্ট লজিস্টিক্যাল সক্ষমতা নেই। ম্যারিনরা এখন বিশাল জাহাজগুলি সাপ্লাই দিয়ে ভরার জন্যে ৩০ দিন অপেক্ষা করতে পারবে না। ম্যারিনদের পরিকল্পনার মূলে রয়েছে ছোট জাহাজ দ্বারা সরবরাহের প্রাপ্তি। জাপান, কোরিয়া এবং ফিলিপাইনের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন দ্বীপগুলিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে; যেখানে মার্কিনীরা আগে থেকেই বিভিন্ন সাপ্লাই জমা করে রাখবে। তবে এই দ্বীপগুলিতে মার্কিন ম্যারিন কোরের সহায়তায় জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের যে পরিকল্পনা তাদের রয়েছে, সেটা বাস্তবায়ন এখনই সম্ভব নয়। আর মার্কিন সামরিক রসদ সরবরাহকারী জাহাজগুলি চীনা ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মাঝে এসে কিভাবে তাদের মালামাল নামাবে, তা চিন্তার বিষয়।

মার্কিন বন্ধুদের কাছ থেকে লজিস্টিক্যাল সহায়তা নেয়ার চিন্তাগত চ্যালেঞ্জ

ম্যারিন কোর পরিকল্পনা করছে যে, অস্ত্র ও গোলাবারুদ বাদে বাকি সাপ্লাইগুলি তারা মার্কিন বন্ধু দেশগুলির থেকেই নেয়ার ব্যবস্থা করবে। এটা মার্কিনীদের অনেকেই পছন্দ না করলেও জেনারেল এরিক স্মিথ বলছেন যে, এর মাধ্যমে দূরবর্তী সাপ্লাই চেইনের উপরে নির্ভরশীলতা কমবে। এই পরিকল্পনার মাঝে রয়েছে ‘লাইট এম্ফিবিয়াস ওয়ারশিপ’ বা ‘এলএডব্লিউ’ নামের ছোট উভচর জাহাজ, যেগুলি ৮০ থেকে ১’শ জনের ছোট গ্রুপে ম্যারিন সেনাদের বিভিন্ন দ্বীপে নামিয়ে দিতে পারবে এবং তাদেরকে সেখানে সকল ধরণের সরবরাহ দেবে। যেখানে মার্কিনীরা যুদ্ধ করবে, সেখান থেকে যতটুকু সম্ভব সাপ্লাই যোগাড় করার চিন্তাটা নতুন নয়। তবে এর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে জনমতের কিছুটা অভাব রয়েছে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন জেনারেল কার্টার বি ম্যাগ্রুডার তার ‘রিকারিং লজিস্টিক প্রবলেমস, এজ আই হ্যাভ অবজার্ভড দেম’ বইতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মার্কিনীদের সাপ্লাই যোগাড় করার শিক্ষাগুলির কথা বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশদের অনুকরণে মার্কিনীরা ইতালিয় সরবরাহকারী এবং ইঞ্জিনিয়ারদেরকে ব্যবহার করে রেললাইন এবং সেতু নির্মাণ করেছিল। এরপর কোরিয়া যুদ্ধের সময় মার্কিনীরা কোরিয় মাছের হ্যাচারি থেকে বিপুল পরিমাণে মাছ কেনে। আর একই সময়ে জাপানিরা মার্কিনীদের জন্যে বিপুল পরিমাণে হার্ডওয়্যার যন্ত্রপাতি ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’এর মাধ্যমে তৈরি করে দিয়ে সময় এবং খরচ বাঁচিয়ে দেয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়েও জাপানিদের এই সহায়তা অব্যহত ছিল। জেনারেল ম্যাগ্রুডার বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য দেশ থেকে সাপ্লাই নেবার ব্যাপারে ভিন্ন মতামত রয়েছে। ব্রিটিশরা নিজেদের দেশে সম্পদের অভাবের কারণে উপনিবেশের সম্পদের উপর নির্ভর করেছে। কিন্তু মার্কিনীরা নিজস্ব সম্পদের উপর নির্ভরশীল থাকার কারণে অন্য কারুর সম্পদ ব্যবহারে খুব একটা আগ্রহী ছল না। অনেক মার্কিনীই মনে করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকিদের পণ্য নিম্নমানের। তবে এই যুক্তি যথেষ্টই দুর্বল হয়ে যায়, যখন জাপান এবং কোরিয়া মার্কিনীদেরকে সরবরাহ করতে গিয়ে মার্কিন স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী বিভিন্ন জিনিস উৎপাদন করতে শুরু করে।

 
ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে লজিস্টিকস কিভাবে চলবে, সেটার একটা কাঠামো বিদ্যমান। দু’জায়গাতেই সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র মূলতঃ স্থলে। যেকারণে সেনাবাহিনী সেই অঞ্চলের কমান্ডে থাকে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাপ্লাই আসার পর সেটা বন্টনের দায়িত্ব সেনাবাহিনীই নিয়ে নেয়। কিন্তু ইন্দোপ্যাসিফিকে সমস্যা হলো, এখানকার বেশিরভাগ এলাকাই সমুদ্র। তাই স্বাভাবিকভাবেই সেই দায়িত্ব নৌবাহিনীর নেয়ার কথা। কিন্তু ইন্দোপ্যাসিফিকের মাঝে এই সাপ্লাই বন্টনের দায়িত্ব নৌবাহিনীকে যেমন দেয়া হয়নি; তেমনি যুদ্ধের সময়ে সেটা কিভাবে কাজ করবে, সেটা নিয়েও কেউই মাথা ঘামায়নি।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর লজিস্টিকসের সংস্কৃতির চ্যালেঞ্জ

মার্কিন সেনাবাহিনীর লজিস্টিক্যাল কর্মকর্তা এবং সেনাবাহিনীর একাডেমিতে শিক্ষক ক্যাপ্টেন ফ্রেড ব্রাউন ‘ওয়েস্ট পয়েন্ট’ একাডেমির ‘মডার্ন ওয়ার ইন্সটিটিউট’এর এক লেখায় বলছেন যে, মার্কিন সেনাবাহিনীতে কয়েকটা সংস্কৃতিগত সমস্যা রয়েছে; যা কিনা লজিস্টিকসকে সর্বদা সমস্যায় জর্জরিত রাখছে। প্রথমতঃ শান্তির সময়ে লজিস্টিকসের জনবলের ট্রেনিংএর জন্যে সময় বের করা যায় না; কাজেই লজিস্টিকসের কোন মহড়া হয় না। কারণ তখন বিভিন্ন ফর্মেশন কমান্ডাররা লজিস্টিকসের মহড়ার চাইতে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের মহড়াকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এর ফলস্বরূপ যখন হঠাৎ করেই সেনাবাহিনীকে কোথাও মোতায়েন করা হয়, তখন লজিস্টিকস ইউনিটগুলি একেবারেই অপ্রস্তুত থাকে। দ্বিতীয়তঃ লজিস্টিকসের ক্ষেত্রে চাহিদা নির্ধারিত হয় কতটুকু স্টক অবশিষ্ট আছে সেটার উপর ভর করে। ফর্মেশন কমান্ডাররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্টক ফুরাবার অনেক আগেই নতুন করে সাপ্লাইএর অর্ডার দিয়ে বসেন এবং সেগুলি ঐ মুহুর্তেই ডেলিভারি প্রত্যাশা করেন। শুধু তাই নয়, লজিস্টিকস অফিসাররা সাধারণতঃ হয় ফর্মেশনের কমান্ডারের অধীনে জুনিয়র অফিসার। কাজেই চাহিদার ব্যাপারটা কোন প্রশ্ন না করেই তাকে বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফর্মেশন কমান্ডাররা লজিস্টিকসের অফিসারদের সাথে কথা বলে তাদের চাহিদা ঠিক করেন না কখনোই। যেকারণে সাপ্লাইয়ের যে অংশটা স্টকে ঘাটতি পড়েছে, যা জানা যায় ঠিকই; কিন্তু কোন অংশ যদি অতিরিক্ত রয়ে যায়, তাহলে সেটা আর জানা সম্ভব হয় না এবং তা অব্যবহৃত থাকে। তৃতীয়তঃ লজিস্টিকস যে সর্বদাই শত্রুর আক্রমণ ছাড়াই নির্বিঘ্নে চলতে পারবে তা কিন্তু নয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে মার্কিন সেনা সদস্যরা যুদ্ধক্ষেত্রেই নিজেদের চেষ্টায় তাদের ট্রাকগুলিকে বর্মাবৃত করেছিল এবং সেগুলির উপর অস্ত্র বসিয়েছিল সাপ্লাই মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে। কিন্তু সেই শিক্ষাগুলি সেনাবাহিনী নেয়নি। ২০০৩ সালে ইরাকে ৫০৭তম মেইনটেন্যান্স কোম্পানির গাড়ি বহরে হামলায় ১১ জন সেনা নিহত হয়েছিল। সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যা শেখে, তা শান্তিকালীন সময়ে ভুলে যায়। সামনের দিনগুলিতে লজিস্টিকসের উপর শত্রুর হামলা হলে আবারও বিপদে পড়তে হতে পারে। চতুর্থতঃ নতুন কোন প্রযুক্তি আসার সাথেসাথেই সেনাবাহিনী সেটা বাহিনীর অন্তর্গত করতে উঠেপড়ে লেগে যায়। কেউই চিন্তা করে না যে, সেটা কতটুকু ব্যবহার করা সম্ভব হবে। যেকারণে কিছুদিন পরেই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে সকলেই বিমুখ হয়ে পড়ে এবং একসময় সেটা সকলেই ভুলে যায়। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ফর্মেশনগুলি বেশ ভালো করে। কিন্তু লজিস্টিকস ইউনিটগুলির নতুন প্রযুক্তির ব্যাপারে ট্রেনিং নেয়ার সময়ও নেই। আর ফর্মেশন কমান্ডাররাও কখনোই চান না যে লজিস্টিকসের জনবল ট্রেনিংএ ব্যস্ত থাকুক। অথবা যখন তারা ট্রেনিংএ ব্যস্ত থাকবে, তখন তাদের জন্যে অতিরিক্ত জনবলের ব্যবস্থা করার ব্যাপারেও কেউই ইচ্ছুক নয়। কারণ এতে করে ফর্মেশনগুলিতেই জনবলের সংকট হতে পারে।

ইন্দোপ্যাসিফিকে লজিস্টিকসের কাঠামোগত সমস্যা

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা র‍্যান্ড কর্পোরেশন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্কিনীরা ইন্দোপ্যাসিফিকে লজিস্টিকসের ব্যাপারে তেমন কোন চিন্তা করেনি। বিশেষ করে ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলের ভেতরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সাপ্লাই কিভাবে নেয়া হবে, তা নিয়ে কেউই চিন্তা করেনি। মূল সমস্যাটা শুরু হয় কৌশলগত সাপ্লাই পৌঁছাবার পর। কৌশলগত সাপ্লাই হলো যেগুলি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জাহাজে বা বিমানে করে পৌঁছায়। সেখান থেকে ঐ অঞ্চলের বাকি এলাকাগুলিতে সেই সাপ্লাই কি করে পৌঁছাবে, সেখানেই চ্যালেঞ্জ। ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে লজিস্টিকস কিভাবে চলবে, সেটার একটা কাঠামো বিদ্যমান। দু’জায়গাতেই সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র মূলতঃ স্থলে। যেকারণে সেনাবাহিনী সেই অঞ্চলের কমান্ডে থাকে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাপ্লাই আসার পর সেটা বন্টনের দায়িত্ব সেনাবাহিনীই নিয়ে নেয়। কারণ ভূমির উপর দিয়ে পরিবহণ করতে গেলে সেটা রেলগাড়ি বা ট্রাকের মাধ্যমে করতে হবে; যা কিনা সেনাবাহিনীর দায়িত্বের মাঝে পড়ে। কিন্তু ইন্দোপ্যাসিফিকে সমস্যা হলো, এখানকার বেশিরভাগ এলাকাই সমুদ্র। তাই স্বাভাবিকভাবেই সেই দায়িত্ব নৌবাহিনীর নেয়ার কথা। কিন্তু ইন্দোপ্যাসিফিকের মাঝে এই সাপ্লাই বন্টনের দায়িত্ব নৌবাহিনীকে যেমন দেয়া হয়নি; তেমনি যুদ্ধের সময়ে সেটা কিভাবে কাজ করবে, সেটা নিয়েও কেউই মাথা ঘামায়নি। যদি সেখানে লজিস্টিকসের জন্যে ব্যবহার করা জাহাজের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতেও দেয়া হয়, সেটাও তো নির্দিষ্ট করেই দিতে হবে। নৌবাহিনী মূলতঃ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাপ্লাই কিভাবে ইন্দোপ্যাসিফিকে আসবে, সেটা নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু সেই সাপ্লাইয়ের বন্টনের ক্ষেত্রে কে বেশি গুরুত্ব পাবে, সেটা নির্দিষ্ট নয়। যেমন, বিমান বাহিনী সাধারণতঃ সাপ্লাইয়ের একটা বড় অংশ পায়। বিমান বাহিনীর সাপ্লাইগুলি কে কিভাবে বন্টন করবে? ইন্দোপ্যাসিফিকে নিজেদের সাপ্লাই কতটা প্রয়োজন, সেটা কেউই যেমন সংগঠিতভাবে হিসেব করতে পারছে না, তেমনি কে সাপ্লাইয়ের কতটা পাবে, সেটার ব্যাপারেও কোন কনসেপ্ট নেই।

 
৪৬টা জাহাজ রয়েছে পরিবহণ দপ্তরের ‘ম্যারিটাইম এডমিনিস্ট্রেশন’ বা ‘মারাড’এর অধীনে। এগুলি অনেক ক্ষেত্রেই ৩০ বছরের বেশি পুরোনো। 'মারাড' একটা মহড়া দিয়েছিল পরীক্ষা করার জন্যে যে, হঠাত করে নির্দেশ দিলে কয়টা পরিবহণ জাহাজ সমুদ্রে যেতে পারে। এর ফলাফল ছিল খুবই খারাপ। মাত্র ৪০ শতাংশ জাহাজ সমুদ্রে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

মার্কিনীদের সমুদ্র পরিবহণের সংকট

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড বাজেটারি এসেসমেন্টস’ বা ‘সিএসবিএ’র ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের পুরো ম্যারিটাইম শিল্পের অবস্থা খুবই খারাপ পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মালিকানায় থাকা পরিবহণ জাহাজগুলির অবস্থা সঙ্গীন, অপদিকে বেসরকারি শিপইয়ার্ডগুলি, যারা জাহাজ তৈরি করার অর্ডার পাচ্ছে, তাদের অবস্থাও ভালো নয়। এছাড়াও যারা এই পরিবহণ জাহাজগুলি পরিচালনা করবে, তারাও খুব ভালো নেই। যুক্তরাষ্ট্রকে যদি কোন বড় আকারের সামরিক মিশনে যেতে হয়, তাহলে মার্কিন জাহাজগুলি পেন্টাগনের রসদপাতি এবং জ্বালানি পরিবহণের চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে না। এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোন সংঘাতে জড়ায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ড থেকে মালামাল পরিবহণ করতে হবে দুই সংস্থার জাহাজে; ৪৬টা জাহাজ, যা কিনা পরিবহণ দপ্তরের ‘ম্যারিটাইম এডমিনিস্ট্রেশন’ বা ‘মারাড’এর অধীনে; আর ১৫টা জাহাজ, যা কিনা ‘মিলিটারি সীলিফট কমান্ড’ বা ‘এমএসসি’র অধীনে। দ্বিতীয় ধাপে মালামাল নেয়ার জন্যে ওয়াশিংটনকে নির্ভর করতে হবে মার্কিন মালিকানায় থাকা বেসরকারি পরিবহণ জাহাজের উপরে। এছাড়াও বিদেশী জাহাজও মার্কিন সরকার চার্টার করতে পারে।

মার্কিন সরকারের অধীনে থাকা জাহাজগুলি অনেক ক্ষেত্রেই ৩০ বছরের বেশি পুরোনো। আর এদের ক্রুরাও অনেক ক্ষেত্রেই বয়সের ক্ষেত্রে তরুণ নয়। সকল জাহাজ একত্রে চালাতে গেলে লোকবল বর্তমানে ২ হাজার কম রয়েছে। এছাড়াও শিপইয়ার্ডগুলিতেও সক্ষমতার ব্যাপক অভাব রয়েছে। মার্কিন মালিকায়া থাকা বেসরকারি জাহাজের সংখ্যাও কমে গেছে। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় সরকারের কর নীতি, বিদেশী শিপিং লাইনের সাথে পেরে না ওঠা এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনীতি। ২০২০এর জানুয়ারিতে ‘মারাড’এর কর্মকর্তা প্রাক্তন রিয়ার এডমিরাল মার্ক বুজবি এক সিম্পোজিয়ামে বলেন যে, তারা একটা মহড়া দিয়েছিলেন পরীক্ষা করার জন্যে যে, হঠাত করে নির্দেশ দিলে কয়টা পরিবহণ জাহাজ সমুদ্রে যেতে পারে। এর ফলাফল ছিল খুবই খারাপ। মাত্র ৪০ শতাংশ জাহাজ সমুদ্রে যেতে সক্ষম হয়েছিল। এছাড়াও ‘সিএসবিএ’র প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সরকারি সকল জাহাজ কার্যকর করা গেলেও আরও ৫ লক্ষ বর্গফুট জায়গার ঘাটতি থাকবে, যা কিনা মার্কিন বা বিদেশী বেসরকারি জাহাজ দিয়ে পুরণ করতে হবে। এছাড়াও নিজেদের বাহিনীর জন্যে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করতে যত জাহাজ প্রয়োজন, তার মাঝে মাত্র ১০ শতাংশ এখন মার্কিন সরকারের কাছে রয়েছে। পেন্টাগনকে আরও ৭৬টা জ্বালানিবাহী ট্যাংকার জাহাজ চার্টার করতে হবে। আর এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে; কারণ এক দশকের মাঝেই সরকারি বেশিরভাগ জাহাজ রিটায়ার করিয়ে দিতে হবে। আর ম্যারিন কোর সামনের দিনে যে নতুন নীতির দিকে এগুচ্ছে, তাতে জ্বালানি আরও বেশি প্রয়োজন হবে। এর সমাধান হিসেবে প্রতিবেদনে মার্কিন সরকারকে আরও জাহাজ কেনার এবং মার্কিন মালিকানায় আরও বেসরকারি জাহাজ আনার ব্যবস্থা করতে বলা হয়।

‘ডিফেন্স নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ১৯৯১ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সকল রসদপাতি পরিবহণ করতে ৩’শ জাহাজের পাঁচ মাস লেগেছিল। শুধু তাই নয়, এরপরেও বহু অভিযোগ ছিল। ‘আমেরিকান সোসাইটি অব নেভাল ইঞ্জিনিয়ার্স’এর এক অনুষ্ঠানে কংগ্রেসম্যান রব উইটম্যান বলেন যে, এই মুহুর্তে তাইওয়ান ইস্যুতে কোন জরুরি প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো প্রথম ধাপে দ্রুত রসদপাতি ইন্দোপ্যাসিফিকে নিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু জাহাজের সংখ্যা এবং বয়সের কারণে পরের ধাপে রসদ পাঠানো খুবই কঠিন হয়ে যাবে। চীনকে মোকাবিলায় অনেক কিছুকেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু লজিস্টিকসকে একেবারেই আমলে নেয়া হয়নি। অপরদিকে নৌবাহিনী যখন পুরোনো জাহাজ কেনার কথা বলছিল, সেখানেও ছিল অনেক সমস্যা। যেমন, বেসামরিক জাহাজ, যেগুলিতে গাড়ি বহণ করা হয়, সেগুলির ভেতরে প্রায় অর্ধেক জায়গাতেই সামরিক গাড়ি বহণ করা যায় না। কারণ হয় ডেকগুলি সামরিক ভাড়ি গাড়ি বহণের জন্যে যথেষ্ট মজবুত নয়; অথবা ছাদ অতিরিক্ত নিচু; অথবা গাড়ি ঘোরাবার স্থান খুব কম; অথবা গাড়ি ওঠানামার জন্যে র‍্যাম্পগুলি খুবই খাড়া। শুধু তাই নয়, পুরোনো জাহাজগুলিকে যেকোন সময় দরকারে ডাকার জন্যে সরকার ১৮ বছর ধরে বেসারকারি কোম্পানিকে প্রতি বছর ৫ মিলিয়ন ডলার করে অর্থায়ন করে এবং এরপর তারা সেগুলিকে পুরোপুরি কিনে ফেলে। এই সমস্যাগুলিকে মাথায় রেখেই গত জুন মাসে মার্কিন কংগ্রেস ২০২৩ সাল থেকে ১০টা নতুন জাহাজ মার্কিন শিপইয়ার্ডগুলিতে তৈরি করার জন্যে বিল পাস করেছে। একেকটা জাহাজে দেড় লক্ষ বর্গফুট জায়গা থাকবে এবং একেকটা জাহাজের জন্যে খরচ হবে প্রায় ৩’শ ৩০ মিলিয়ন ডলার। একটা শিপইয়ার্ড কাজ করলে বছরে একটা করে জাহাজ ডেলিভারি দেবে। আর সকল শিপইয়ার্ড একত্রে কাজ করলে ১৫ বছরে ৪০টা জাহাজ তৈরি সম্ভব। তবে সেখানে কংগ্রেসের কাছ থেকে অর্থায়ন এখনও নিশ্চিত নয়। অপরদিকে পুরোনো জাহাজ কিনতে গিয়ে একেকটা জাহাজে খরচ হচ্ছে ৪৫ মিলিয়ন ডলার। কংগ্রেসম্যান উইটম্যান মনে করছেন যে, শেষ পর্যন্ত কিছু নতুন এবং কিছু পুরাতন জাহাজ কিনেই হয়তো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

‘নিকেই এশিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর মনে করছে যে, এশিয়াতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে জ্বালানি ও রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে বিরাট ঘাটতি রয়েছে। গত এপ্রিল মাসে কংগ্রেসের কাছে দেয়া ‘প্যাসিফিক ডিটারেন্স ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘পিডিআই’এর অধীনে এক প্রকল্প পরিকল্পনায় বলা হচ্ছে যে, ইন্দোপ্যাসিফিকে কোনপ্রকার যুদ্ধাবস্থার মাঝে সামরিক বাহিনীকে সাপ্লাই দিয়ে কর্মক্ষম রাখা কঠিন হবে। ‘পিডিআই’এর অধীনে পেন্টাগন ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু করে পাঁচ বছরের মাঝে ২৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে চাইছে; যার মাঝে ১ বিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে লজিস্টিকসের জন্যে। যেকোন যুদ্ধের মাঝে চীনারা ইন্দোপ্যাসিফিকে মার্কিন সামরিক সাপ্লাই আসতে বাধা দেবে। মার্কিন পরিবহণ এবং ট্যাঙ্কার বিমানগুলি নিঃসন্দেহে চীনাদের আক্রমণের শিকার হবে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, একারণে আগে থেকেই অত্র এলাকায় রসদপাতি, জ্বালানি, মেডিক্যাল দ্রব্যাদি এবং খাবার যথেষ্ট পরিমাণে মজুদ করে রাখতে হবে। জাপানের টোকিও এবং ইওয়াকুনির কাছে মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে যথেষ্ট পরিমাণে জেট ফুয়েল মজুদের কথা বলা হয়েছে। এগুলি জ্বালানিবাহী জাহাজ পৌঁছাবার আগ পর্যন্ত কাজে লাগবে।

যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারছে যে, চীনাদেরকে সময় দিলে তারা সামনের দিনগুলিতে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, সামরিক দিক থেকেও অতিক্রম করে যাবে। একারণেই চীনারা প্রস্তুত হবার আগেই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। লজিস্টিকস কোন ‘গ্ল্যামারাস’ কাজ নয়; তাই কেউই এটার পিছনে সময় ব্যয় করতে ইচ্ছুক নয়। কিন্তু এই ব্যাপারটাকে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখার কোন সুযোগই নেই। ইতিহাসে জয়ের পিছনে লজিস্টিকস ভালো থাকার অনেক উদাহরণ রয়েছে। তবে লজিস্টিকসের জন্যেই কেউ জিতেছে, তেমনটা হয়তো কেউ দেখাতে পারবে না। তথাপি লজিস্টিকস ভালো না থাকার কারণে হারতে হয়েছে, এমন উদাহরণ রয়েছে বহু। ‘দ্যা র‍্যান্ড কর্পোরেশন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ঠান্ডা যুদ্ধের পর থেকে গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের লজিস্টিকস ব্যবস্থা কার্যকারিতার দিকে ফোকাস না দিয়ে কম বাজেটে কম বিনিয়োগে কর্মসম্পাদনের দিকে মনোযোগী হয়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সর্বনিম্ন খরচায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বড় কোন শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামলে এই লজিস্টিকস ব্যবস্থা কেমন কাজ করবে, তা প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে মার্কিন সাপ্লাই ব্যবস্থা বেসামরিক সরবরাহকারীদের উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক বেশি কঠিন হতে পারে। মার্কিন সামরিক বাহিনী চিন্তাগত, সংস্কৃতিগত, কাঠামোগত এবং জাহাজের সংখ্যার সমস্যাগুলিকে কতটা শুধরে নিতে পারবে, তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও যে ব্যাপারটা নিশ্চিত তা হলো, মার্কিনীদের কাছে এখন নিজেদের প্রস্তুতি নয়, বরং চীনের সাথে প্রস্তুতির প্রতিযোগিতার দৌড় এবং সেই দৌড়ের টাইমলাইন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ঘড়ির কাঁটা দ্রুত সংঘাতের দিকেই এগুচ্ছে।



সূত্রঃ

‘Asymmetric Advantage or Achilles Heel: Logistics in the U.S. Military’ by Michael Trimble and Jobie Turner, in The Strategy Bridge, 14 June 2022

‘America’s ‘Dirty Secret’- USMC General Admits ‘Wicked’ Logistics Problems In Western Pacific To Battle China’ in The Eurasian Times, 19 June 2022

‘The Four Logistics Dilemmas Awaiting the Army on the Modern Battlefield’ by Captain Fred Brown in Modern War Institute at West Point, 29 November 2018

‘The Problem of Intra-Theater Lift: Moving Things Around in the Pacific Area of Responsibility’ in The RAND Corporation, 06 September 2022

‘Lethal and Effective: Marine Corps Force Design 2030 and U.S. – Japan Defense Cooperation’ in The Henry L Stimson Center, 16 June 2022

‘Recurring Logistic Problems: As I have Observed Them’ by General Carter B Magruder, 1991

‘Military and Defense-Related Supply Chains’ in The RAND Corporation, 22 June 2021

‘U.S. lacks Asian logistics support for armed conflict: Pentagon’ in Nikkei Asia, 04 May 2022

‘Report: U.S. Sealift Lacks Personnel, Hulls, National Strategy’ in USNI News, 14 February 2020

‘House defense bill calls for US-built ships to modernize strategic sealift fleet’ in Defense News, 24 June 2022

Friday, 16 September 2022

চীনের ‘এ২এডি’ কৌশল কতটা শক্তিশালী?

১৬ই সেপ্টেম্বর ২০২২
 
পারমাণবিক অস্ত্র নয়, বরং প্রচলিত বিস্ফোরক ব্যবহার করার কারণেই চীনাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হুমকি হিসেবে ঠেকেছে। কারণ এতে ইন্দোপ্যাসিফিক, তথা গোটা বিশ্বের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ঢিলে হয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দেবে। পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার হবে না নিশ্চিত জেনেই দুই পক্ষ এই অস্ত্রের খেলায় এগুচ্ছে। একারণেই ইন্দোপ্যাসিফিকে যুদ্ধের সম্ভাবনা অনেক বেশি

চীনের ‘এন্টি একসেস, এরিয়া ডিনাইয়াল’ বা ‘এ২এডি’ কৌশল হলো ভূমি, সমুদ্র এবং আকাশ থেকে বহু ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার বন্ধুদের সামরিক শক্তিকে চীনের আশেপাশের অঞ্চলে ঢুকতে অথবা অবস্থান করতে বাধা দেয়া। চীন তার ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে নতুন নতুন প্রযুক্তি দ্বারা সজ্জিত করছে; যেগুলি এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির সক্ষমতাকে অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং একইসাথে চীনাদের ‘এ২এডি’ কৌশলকে আরও শক্ত ভিতের উপরে দাঁড় করাচ্ছে। চীনাদের এই সক্ষমতা চীনের কাছাকাছি সাগরগুলিতে মার্কিন সামরিক শক্তির ভিত্তি নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ এবং ভূমিতে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী বিমান ঘাঁটিগুলিকে হুমকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। এছাড়াও চীনাদের হাতে স্বল্প সংখ্যক পারমাণবিক আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। তবে চীনাদের ডেভেলপ করা প্রচলিত বিস্ফোরক সজ্জিত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি পারমাণবিক যুদ্ধ ছাড়া ব্যবহার করার জন্যে ডেভেলপ করা হচ্ছে; যা কিনা ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে যুদ্ধের সম্ভাবনা বিশ্লেষণের জন্যে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের ক্ষেপণাস্ত্রের বহর

চীনের ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে মোটামুটিভাবে সাত ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমতঃ রয়েছে স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র; যেগুলির পাল্লা মোটামুটিভাবে ৩’শ কিঃমিঃ থেকে ১ হাজার কিঃমিঃএর মাঝে। দ্বিতীয়তঃ রয়েছে মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র; যেগুলির পাল্লা ২ হাজার কিঃমিঃএর মতো। তৃতীয় ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র হলো ‘ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ’ বা মাধ্যমিক পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলির পাল্লা মোটামুটিভাবে ৪ হাজার কিঃমিঃ থেকে সাড়ে ৫ হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত। এগুলি মূলতঃ পারমাণবিক যুদ্ধের জন্যে তৈরি করা হলেও প্রচলিত যুদ্ধেও এগুলির ব্যবহার অসম্ভব নয়। চতুর্থতঃ রয়েছে আন্ত মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ‘আইসিবিএম’। এগুলির পাল্লা মোটামুটিভাবে ৭ হাজার কিঃমিঃ থেকে ১৫ হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত। আর এগুলি মূলতঃ পারমাণবিক ডিটারেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর সাথে পঞ্চম ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র হলো সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া ‘আইসিবিএম’, যেগুলিকে বলা হয় ‘এসএলবিএম’। এগুলির কাজও ‘আইসিবিএম’এর মতোই; শুধুমাত্র সাবমেরিক থেকে ছোঁড়ার কারণে এগুলি কোথা থেকে ছোঁড়া হচ্ছে, তা আগে থেকে বোঝা কঠিন। এগুলির পাল্লা প্রায় ৯ হাজার কিঃমিঃএর মতো। ষষ্ঠতঃ রয়েছে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলির রয়েছে জেট ইঞ্জিন; এবং এগুলি বিমানের মতো উড়ে গিয়ে টার্গেটে আঘাত হানে। এগুলির পাল্লা মোটামুটিভাবে ৫০ কিঃমিঃ থেকে শুরু করে ৩ হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত। আর শেষতঃ রয়েছে নতুন প্রকারের অস্ত্র; যার নাম ‘হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল’ বা ‘এইচজিভি’; যা শব্দের গতির প্রায় ৫ থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত গতিতে চলতে সক্ষম। এটা মূলতঃ একটা মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র; আকাশে অনেক উচ্চতায় যাবার পর এর সাথে জুড়ে থাকা ‘এইচজিভি’ আলাদা হয়ে গিয়ে টার্গেটে অতি দ্রুততার সাথে আঘাত করে। এগুলির পাল্লা আড়াই হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত হতে পারে।

স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র


মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ বা ‘সিএসআইএস’ চীনা ক্ষেপণাস্ত্রগুলির একটা বিশদ বর্ণনা দিয়েছে। স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলি চীনের কাছাকাছি টার্গেটগুলির জন্যে ডেভেলপ করা হয়েছে। এই টার্গেটের মূলে রয়েছে তাইওয়ান এবং চীনের আশেপাশের দেশ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াতে মার্কিন ঘাঁটিগুলি। প্রায় আড়াই’শ লঞ্চারের এই বাহিনীর কাছে রয়েছে আনুমানিক সাড়ে ৭’শ থেকে দেড় হাজার পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র। ‘ডং ফেং-১১’ বা ‘ডিএফ-১১’, ‘ডিএফ-১২’, ‘ডিএফ-১৫’ এবং ‘ডিএফ-১৬’ ধরণের ক্ষেপণাস্ত্রগুলি এই ভূমিকা নেবে।

প্রায় ৪ টন ওজনের ‘ডিএফ-১১’ সার্ভিসে এসেছে ১৯৯২ সালে। গাড়ির উপর থেকে ছোঁড়া সম্ভব এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৩’শ কিঃমিঃ এবং ওয়ারহেড ৫’শ থেকে ৮’শ কেজি পর্যন্ত। গাড়ির উপর বহণ করা যায় বলে এগুলি খুব দ্রুত জায়গা পরিবর্তন করতে এবং নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে সক্ষম। অপরদিকে ৪’শ ২০ কিঃমিঃ পর্যন্ত পাল্লার ‘ডিএফ-১২’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৪’শ ৮০ কেজি ওজনের ওয়ারহেড বহণ করতে সক্ষম। ২০১৩ সালে সার্ভিসে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলির ওজন প্রায় ৪ টন এবং এগুলি গাড়ির উপরে বহণ করা যায়। চীনারা এগুলি কাতারের কাছেও বিক্রি করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি টার্গেটের ৩০ মিটার থেকে ৫০ মিটারের মাঝে আঘাত হানতে সক্ষম বলে ধারণা করা হয়।

‘ডিএফ-১৫’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলির পাল্লা প্রায় ৯’শ কিঃমিঃ পর্যন্ত। ১৯৯০ সালে সার্ভিসে আসা এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির ওজন ৬ টনের বেশি এবং গাড়ির উপরে বহণ করা যায়। ‘ডিএফ-১৬’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ৫’শ কেজি থেকে ১ টন পর্যন্ত ওয়ারহেড নিয়ে ১ হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। ২০১১ সালে সার্ভিসে আসা এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি গাড়ির উপরে বহণ করা হয়। স্বল্প পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির সবগুলিই প্রায় ৫’শ কেজি ওজনের ওয়ারহেড বহণে সক্ষম। ‘ডিএফ-১৬’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি চীনের গুয়াংডং প্রদেশে মোতায়েন রয়েছে; যেখান থেকে এগুলি তাইওয়ান ও ভিয়েতনামে আঘাত হানতে পারবে। ব্রিটিশ থিংকট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, চীনারা তখন পর্যন্ত ডজনখানেক ‘ডিএফ-১৬’ সার্ভিসে এনেছে।

 
মধ্যম পাল্লার 'ডিএফ-২১ডি' হলো সমুদ্রে জাহাজ ধ্বংস করার জন্যে ডেভেলপ করা প্রথম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। টার্গেটের কাছাকাছি এসে দিক পরিবর্তনে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি টার্গেটের মাত্র ২০ মিটারের মাঝে আঘাত হানতে সক্ষম। এর ফলে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলিও এই ক্ষেপণাস্ত্রের টার্গেটে পরিণত হতে পারে।

মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র

স্বল্প পাল্লার বাইরের টার্গেটে আঘাত হানার জন্যে রয়েছে মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। চীনের মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে একটাই, ‘ডিএফ-২১’। প্রায় ২১’শ কিঃমিঃ পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানতে পারবে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। আনুমানিক দেড়’শ লঞ্চারের সাথে তাদের রয়েছে কমপক্ষে দেড়’শ থেকে সাড়ে ৪’শ পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র। ১৯৯১ সালে সার্ভিসে আসা প্রায় ১৫ টন ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্র গাড়ির উপর থেকে ছোঁড়া যায়। আর কঠিন জ্বালানি ব্যবহারের ফলে এগুলি যেকোন স্থান থেকে খুব দ্রুততার সাথে তেমন কোন প্রস্তুতি ছাড়াই ছুঁড়ে দেয়া সম্ভব। এগুলির ওয়ারহেডের ওজন প্রায় ৬’শ কেজি। এগুলি টার্গেটের প্রায় ৭’শ মিটারের মাঝে আঘাত করে। অর্থাৎ এগুলি খুব বেশি একটা নিখুঁত নয়। এর অর্থ হলো, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি খুব সম্ভবতঃ পারমাণবিক ওয়ারহেড ছাড়া ব্যবহার করলে ভালো কোন ফলাফল আসবে না। ২০১৬ সালে ‘বুলেটিন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, চীনারা হয়তো ৮০টার মতো পারমাণবিক ওয়ারহেড সমৃদ্ধ ‘ডিএফ-২১’ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে।

তবে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির বিভিন্ন ভার্সন ডেভেলপ করার সাথেসাথে এগুলির সক্ষমতা বহুগুণে বেড়ে যেতে থাকে। ১৯৯৬ সালে সার্ভিসে আসা ‘ডিএফ-২১এ’ ভ্যারিয়্যান্ট টার্গেটের ৫০ মিটারের মাঝে আঘাত করতে পারে। তবে এটার ওয়ারহেড মূলতঃ পারমাণবিক। এরপর ২০০৬ সালে আসে ‘ডিএফ-২১সি’ ভার্সন; যা ২১’শ কিঃমিঃ দূরের টার্গেটের ৪০ থেকে ৫০ মিটারের মাঝে আঘাত হানতে সক্ষম। এগুলির ওয়ারহেড মূলতঃ প্রচলিত বিস্ফোরক। অপেক্ষাকৃত ভালো নিশানায় টার্গেটিংই বলে দিচ্ছে যে, চীনারা পারমাণবিক যুদ্ধ ছাড়াও ভূমিতে শত্রুর স্থায়ী টার্গেটের বিরুদ্ধে এগুলি ব্যবহার করার অপশন রেখেছে। ২০১০ সালে ‘ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, কিছু ‘ডিএফ-২১সি’ ক্ষেপণাস্ত্রকে চীনের পশ্চিমাঞ্চলে ভারতের বিপরীতে মোতায়েন করা হয়েছে।

২০০৬ সালে আসে ‘ডিএফ-২১ডি’ ভার্সন; যেগুলি সমুদ্রে জাহাজ ধ্বংস করার জন্যে ডেভেলপ করা প্রথম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। টার্গেটের কাছাকাছি এসে দিক পরিবর্তনে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি টার্গেটের মাত্র ২০ মিটারের মাঝে আঘাত হানতে সক্ষম। এর ফলে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলিও এই ক্ষেপণাস্ত্রের টার্গেটে পরিণত হতে পারে। ব্রিটিশ সামরিক ম্যাগাজিন ‘আইএইচএস জেন্স’ বলে যে, ২০১৩ সালে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মতো একটা টার্গেটের বিরুদ্ধে এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা হয়।

‘ডিএফ-২১সি’ এবং ‘ডিএফ-২১ডি’এর মাধ্যমেই চীনের ‘এ২এডি’ কৌশলের শুরু। ২০০৬ সাল থেকে সার্ভিসে আসা এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি একদিকে যেমন টার্গেটের ৫০ থেকে ২০ মিটারের মাঝে আঘাত হানতে পারে, আরেকদিকে টার্গেটে আঘাত হানার ঠিক আগ মুহুর্তে এগুলি দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম। এই বৈশিষ্ট্যগুলি এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে শুধুমাত্র পারমাণবিক অস্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা থেকে বের করে নিয়ে আসে। এগুলি স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার বাইরে গিয়ে যেমন টার্গেটে আঘাত হানতে পারবে, একইসাথে মার্কিন বিমানবাহী জাহাজের মতো বড় চলমান টার্গেটের উপরেও এগুলি আঘাত হানার সক্ষমতা তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে চীন তার মূল ভূখন্ড থেকে ১ হাজার কিঃমিঃএর বেশি দূরত্বে অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী বা চলমান টার্গেটের উপর মোটামুটি নিখুঁতভাবে আঘাত করার একটা সক্ষমতা অর্জন করেছে।
 
মাধ্যমিক পাল্লার 'ডিএফ-২৬' ক্ষেপণাস্ত্র। ১২’শ থেকে ১৮’শ কেজির বিশাল একটা প্রচলিত বিস্ফোরকের ওয়ারহেড এগুলিকে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটিগুলির উপর হামলা করার সক্ষমতা দিয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে চীন প্রথমবারের মতো গুয়ামে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপর হামলা করার সক্ষমতা অর্জন করে।

মাধ্যমিক পাল্লার (ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র

১৯৮০এর দশকে সার্ভিসে আসা ‘ডিএফ-৪’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি লিকুইড জ্বালানি ব্যবহার করে সাড়ে ৫ হাজার কিঃমিঃ দূরের টার্গেটে হামলা করতে সক্ষম। এগুলির বেশিরভাগই ইতোমধ্যেই রিটায়ার করে ফেলা হয়েছে। প্রায় ৮২ টন ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি চীনের পারমাণবিক ডিটারেন্টের অংশ।

২০১৬ সালে ‘ডিএফ-২৬’ সার্ভিসে আসার সাথেসাথে পারমাণবিক যুদ্ধের বাইরে গিয়ে দূরবর্তী টার্গেটে চীনের আঘাত হানার সক্ষমতাকে আরেকটা নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় ৪ হাজার কিঃমিঃ পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ২০ টন ওজনের এবং গাড়ির উপর বহণযোগ্য। আর ১২’শ থেকে ১৮’শ কেজির বিশাল একটা প্রচলিত বিস্ফোরকের ওয়ারহেড এগুলিকে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটিগুলির উপর হামলা করার সক্ষমতা দিয়েছে। ‘ইউএস-চায়না ইকনমিক এন্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন’এর ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে চীন প্রথমবারের মতো গুয়ামে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপর হামলা করার সক্ষমতা অর্জন করলো।

২০২০ সালের অগাস্টে চীনারা ‘ডিএফ-২৬’এর একটা জাহাজ ধ্বংসী ভার্সন ‘ডিএফ-২৬বি’ পরীক্ষা করে। পরীক্ষার সময় ক্ষেপণাস্ত্রটা একটা চলমান টার্গেটকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয় বলে বলা হয়। এখনও পর্যন্ত এটা পরিষ্কার নয় যে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির গাইড্যান্স সিস্টেম কেমন। তবে ধারণা করা হয় যে, এগুলি টার্গেটের ১’শ ৫০ থেকে ৪’শ ৫০ মিটারের মাঝে আঘাত হানতে পারে। তবে ‘ডিএফ-২৬বি’ ভার্সন সম্ভবতঃ টার্গেটে আঘাত হানার আগ মুহুর্তে আলাদা কোন গাইড্যান্স সিস্টেম ব্যবহার করে তার টার্গেট নিশানা ঠিক করে। ২০২০ সাল নাগাদ চীনারা প্রায় ২’শ থেকে সাড়ে ৩’শ মাধ্যমিক পাল্লার লঞ্চার মোতায়েন করেছে বলে ধারণা করা হয়; যার মাঝে ‘ডিএফ-২৬’ রয়েছে। ‘ডিএফ-২৬’ লঞ্চারের সংখ্যা ৮০ থেকে ১০০টা হতে পারে বলে অনুমিত। ২০২০ সাল নাগাদ চীনারা ইউনান, গুয়াংডং, শিনইয়াং এবং শিনজিয়াং প্রদেশে ‘ডিএফ-২৬’ মোতায়েন করেছে।

আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র

আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র বা ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল’ বা ‘আইসিবিএম’ চীনের পারমাণবিক ডিটারেন্ট। ১৯৮১ সালে ‘ডিএফ-৫’ নামে চীনের আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র সার্ভিসে আসে। ১’শ ৮৩ টন ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি লিকুইড জ্বালানি ব্যবহার করে এবং ১৩ হাজার কিঃমিঃ দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ২০০৬ সালে সার্ভিসে আসে ‘ডিএফ-৩১’। গাড়ির উপরে পরিবহণযোগ্য ৪২ টন ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করে এবং প্রায় ১২ হাজার কিঃমিঃ দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এখনও ডেভেলপমেন্টে রয়েছে ‘ডিএফ-৪১’; যার পাল্লা হবে প্রায় ১৫ হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত। ৮০ টন ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি গাড়ি এবং রেলের মাধ্যমে পরিবহণ করা যাবে।

সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপিত আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র

‘আইসিবিএম’এর মাঝে যেগুলি সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপিত হয়, সেগুলিকে ‘সাবমেরিন লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল’ বা ‘এসএলবিএম’ বলা হয়। চীনাদের বর্তমান ‘এসএলবিএম’ হলো ‘জেএল-২’। ২০১৫ সালে সার্ভিসে আসা এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ৯ হাজার কিঃমিঃ দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। একেকটা ক্ষেপণাস্ত্র একসাথে ৩ থেকে ৮টা পর্যন্ত ওয়ারহেড বহণ করতে সক্ষম। প্রায় ৪২ টন ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি বহণ করে চীনাদের ‘চিন-ক্লাস’ সাবমেরিন। চীনা নৌবাহিনীর চারটা ‘চিন-ক্লাস’এর প্রতিটা ১২টা করে ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে পারে। ‘জেএল-২’ ক্ষেপণাস্ত্র এর আগের ‘শিয়া-ক্লাস’এর সাবমেরিনে বাহিত পুরোনো ‘জেএল-১’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে প্রতিস্থাপিত করেছে।

'ওয়াইজে-১৮' ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বিশ্লেষকেরা চীনের ‘এ২এডি’ কৌশলের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে। কেউ কেউ এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি মার্কিন ‘ঈজিস’ কমব্যাট সিস্টেম সজ্জিত ডেস্ট্রয়ারগুলিকে হারাবার জন্যে তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করছেন।‘ওয়াইজে-১৮সি’ হলো আরেকটা ভার্সন, যা ডেভেলপ করা হচ্ছে ভূমির টার্গেটের জন্যে। তবে এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর লঞ্চার হলে বাণিজ্যিক কনটেইনার।

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র

১৯৯৬ সাল থেকে সার্ভিসে আসা ‘হং নিয়াও’ বা ‘এইচএন’ সিরিজের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলির উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক ওয়ারহেড বহণে সক্ষম ৩ হাজার কিঃমিঃ পাল্লা পর্যন্ত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করা। ৪’শ কেজি ওয়ারহেড বহণে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি টারবোজেট এবং টারবোফ্যান ইঞ্জিনের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। ১২’শ কেজি ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি একাধারে ভূমি, জাহাজ, সাবমেরিন এবং আকাশ থেকে ছোঁড়া সম্ভব। রুশ ‘কেএইচ-৫৫’ এবং মার্কিন ‘টোমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো দেখতে এই ক্ষেপণাস্ত্র সিরিজের প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র ‘এইচএন-১’; যা ১৯৯৬ সালে সার্ভিসে আসে। ভূমি থেকে ছোঁড়া ‘এইচএন-১এ’এর পাল্লা ৬’শ কিঃমিঃ; আর ‘বি-৬ডি’ বোমারু বিমান থেকে ছোঁড়া ‘এইচএন-১বি’এর পাল্লা সাড়ে ৬’শ কিঃমিঃ। ‘এইচএন-১বি’ ভার্সন সম্ভবতঃ ২০০২ সালে সার্ভিসে আসে।

‘এইচএন-২’ ক্ষেপণাস্ত্র অনেকটাই ‘টোমাহক’এর রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংএর উপর তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। রুশ ‘কেএইচ-৫৫’ ক্ষেপণাস্ত্রের ‘টিআরডিডি-৫০’ ইঞ্জিনের উপর ভিত্তি করে নিজেরাই ইঞ্জিন তৈরি করে চীনারা। ভূমি এবং জাহাজ থেকে ছোঁড়া ভার্সনের পাল্লা প্রায় ১৮’শ কিঃমিঃ; আর সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া ‘এইচএন-২সি’ ভার্সনের পাল্লা ১৪’শ কিঃমিঃ। ২০০২ সালে সার্ভিসে আসা এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ১৪’শ কেজি ওজনের এবং টার্গেটের ৫ মিটারের মাঝে আঘাত করতে সক্ষম। ২০১০ সালে মার্কিনীরা ধারণা করে যে সেসময় ২’শ থেকে ৫’শ পারমাণবিক ওয়ারহেড সম্পন্ন ‘এইচএন-২’ ক্ষেপণাস্ত্র চীনের হাতে ছিল।

‘এইচএন-৩’ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ৩ হাজার কিঃমিঃ। সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া ‘এইচএন-৩বি’এর পাল্লা ২২’শ কিঃমিঃ। ২০০৭ সালে সার্ভিসে আসা এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ১৮’শ কেজি ওজনের এবং টার্গেটের ৫ মিটারের মাঝে আঘাত হানতে সক্ষম।

‘ওয়াইজে-১৮’ জাহাজ ধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সম্ভবতঃ রুশ ‘৩এম৫৪ই ক্লাব’ ক্ষেপণাস্ত্রের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা। তবে এর আগের চীনা জাহাজ ধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলির চাইতে এই ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা অনেক বেশি। প্রায় ১৬’শ কেজি ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রের রয়েছে দেড়’শ থেকে ৩’শ কেজি ওয়ারহেড এবং এর পাল্লা ৫’শ ৪০ কিঃমিঃ পর্যন্ত। সমুদ্র সমতলের অল্প কিছু ওপড় দিয়ে ওড়ার সময় এটা শব্দের গতির নিচ দিয়ে চললেও টার্গেটে আঘাত হানার কিছু আগে এটা শব্দের গতির আড়াই থেকে ৩ গুণ পর্যন্ত দ্রুতি পেয়ে যায়; যা এটাকে গুলি করে ধ্বংস করাকে অনেক কষ্টকর করে ফেলে। ২০১৪ সালে সার্ভিসে আসা এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বিশ্লেষকেরা চীনের ‘এ২এডি’ কৌশলের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে। কেউ কেউ এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি মার্কিন ‘ঈজিস’ কমব্যাট সিস্টেম সজ্জিত ডেস্ট্রয়ারগুলিকে হারাবার জন্যে তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করছেন। মূলতঃ চীনা যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিনগুলি থেকে ছোঁড়ার জন্যেই এই ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করা হয়েছে। ‘ওয়াইজে-১৮বি’ ভার্সন ডেভেলপ করা হয়েছে ভূমির টার্গেট ধ্বংস করতে। ‘ওয়াইজে-১৮সি’ হলো আরেকটা ভার্সন, যা ডেভেলপ করা হচ্ছে ভূমির টার্গেটের জন্যে। তবে এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর লঞ্চার হলে বাণিজ্যিক কনটেইনার। রাশিয়া ইতোমধ্যেই কনটেইনারের ভেতর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পরীক্ষা চালিয়েছে।

হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র 'ডিএফ-১৭'। কেউ ধারণা করছেন যে, ‘ডিএফ-১৭’ হয়তো চীনের জন্যে নতুন আরেকটা জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপের সুযোগ এনে দিয়েছে। ২০১৯ সালে একজন চীনা সামরিক কর্মকর্তা বলেন যে, তারা একটা হাইপারসনিক জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করছে। চীনারা এখনও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র সার্ভিসে আনা থেকে কতটা দূরে রয়েছে সেটা না জানা গেলেও চীনা সামরিক প্যারেডে এর অবির্ভাব পশ্চিমা বিশ্লেষকদের অনেককেই চিন্তায় ফেলেছে।

হাইপারসনিক অস্ত্র এবং ‘এ২এডি’র ভবিষ্যৎ

চীনের সর্বশেষ প্রযুক্তি হলো ‘হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল’ বা ‘এইচজিভি’। ‘ডিএফ-১৭’ নামের এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রকৃতপক্ষে একটা মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র; যা কিনা একটা ‘এইচজিভি’ বহণ করে আকাশে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে ছেড়ে দেয়। এই উচ্চতা থেকে নেমে আসার সময় ‘এইচজিভি’ হাইপারসনিক গতি অর্জন করে। প্রায় আড়াই হাজার কিঃমিঃ পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির ৫ গুণ থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত দ্রুতিতে চলতে সক্ষম। এই ক্ষেপণাস্ত্র চীনারা ডেভেলপ করছে ২০১৪ সাল থেকে। আর এর মূল উদ্দেশ্য হলো বহুদূর থেজে টার্গেটের উপর নিখুঁতভাবে হামলা করা, এবং এত দ্রুত এই কাজটা করা, যাতে ক্ষেপণাস্ত্রটাকে কেউ বাধা দিতে না পারে। যদিও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি এর চাইতেও বেশি গতিতে চলে, তথাপি হাইপারসনিক অস্ত্র তার দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম এবং নিচু দিয়ে ওড়ার কারণে এগুলি কোথা দিয়ে কিভাবে উড়বে, সেটা আগে থেকে বলা মুশকিল।

এই ক্ষেপণাস্ত্রে খুব সম্ভব ‘ডিএফ-১৬’ ক্ষেপণাস্ত্রের বুস্টার রকেট ব্যবহার করা হয়েছে। অনেকেই বলছেন যে, এই ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানা কয়েক মিটারের মাঝে। আর এটা আকাশে যথেষ্ট পরিমাণে দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম; যা কিনা এটাকে গুলি করে ধ্বংস করা অনেক কঠিন করে ফেলেছে। কেউ কেউ ধারণা করছেন যে, ‘ডিএফ-১৭’ হয়তো চীনের জন্যে নতুন আরেকটা জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপের সুযোগ এনে দিয়েছে। এটা করা সম্ভব হলে চীনের আশেপাশের সাগরে মার্কিন জাহাজ ঢোকা আরও কঠিন হয়ে যাবে। ২০১৯ সালে একজন চীনা সামরিক কর্মকর্তা বলেন যে, তারা একটা হাইপারসনিক জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করছে। চীনারা এখনও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র সার্ভিসে আনা থেকে কতটা দূরে রয়েছে সেটা না জানা গেলেও চীনা সামরিক প্যারেডে এর অবির্ভাব পশ্চিমা বিশ্লেষকদের অনেককেই চিন্তায় ফেলেছে।

চীনারা একদিকে যেমন চাইছে না যে পুরো ইন্দোপ্যাসিফিকে চীন ছাড়া আর কেউ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুক, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও চাইছে না যে সারা দুনিয়ার মতো ইন্দোপ্যাসিফিকেও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কারুর উপর কোন দেশ নির্ভরশীল থাকুক। উভয় পক্ষের জাতীয় স্বার্থ পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রগুলিতে সাংঘর্ষিক অবস্থানে রয়েছে। এই সমুদ্রগুলিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলি এবং মার্কিন সামরিক বিমান ঘাঁটিগুলিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই চীনারা তাদের ‘এ২এডি’ কৌশল ডেভেলপ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে গত এক দশকে চীনারা তাদের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে যথেষ্ট উন্নত করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে; যা কিনা মার্কিনীদের চিন্তাতে ‘এ২এডি’র ব্যাপারে একটা ভীতির সঞ্চার করেছে; যদিও চীনাদের এই সক্ষমতা মার্কিনীদের আস্তিত্বকে কোন অবস্থাতেই হুমকির মাঝে ফেলেনি। যুক্তরাষ্ট্র জানে যে, চীনের পারমানবিক ডিটারেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্যে কোন হুমকি বহণ করে না। উল্টো, পারমাণবিক অস্ত্র নয়, বরং প্রচলিত বিস্ফোরক ব্যবহার করার কারণেই চীনাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হুমকি হিসেবে ঠেকেছে। কারণ এতে ইন্দোপ্যাসিফিক, তথা গোটা বিশ্বের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ঢিলে হয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দেবে। পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার হবে না নিশ্চিত জেনেই দুই পক্ষ এই অস্ত্রের খেলায় এগুচ্ছে। একারণেই ইন্দোপ্যাসিফিকে যুদ্ধের সম্ভাবনা অনেক বেশি। বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পলায়ন এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধে জড়াবার ফলে ইন্দোপ্যাসিফিকে যুদ্ধের সম্ভাবনা আগের চাইতে শুধু বেড়েই যায়নি, এর সময়ও এগিয়ে এসেছে।



সূত্রঃ

‘Missiles of China’ in CSIS, last updated 12 April 2021 (https://missilethreat.csis.org/country/china/)
‘IHS Jane’s Weapons: Strategic 2015-2016’
‘DF-21 / DF-21A (CSS-5) / DF-21B medium-range road-mobile ballistic missile’ in Army Recognition, 29 September 2018
‘DF-21C Missile Deploys to Central China’ in Federation of American Scientists, 28 September 2010 (https://fas.org/blogs/security/2010/09/df21c/)
‘Military and Security Developments Involving the People’s Republic of China 2010: Annual Report to Congress’ by Office of the Secretary of Defense, 2010
‘China Fields New Intermediate-Range Nuclear Missile’ by Bill Gertz in The Washington Free Beacon, March 3, 2014 (https://freebeacon.com/national-security/china-fields-new-intermediate-range-nuclear-missile/)
‘Panel I: China’s Hypersonic and Maneuverable Re-Entry Vehicle Programs,’ Testimony before Hearing on China’s Advanced Weapons, U.S.-China Economic and Security Review Commission, February 23, 2017
‘China’s Nuclear Forces and Weapons of Mass Destruction’ in Center for Strategic and International Studies, 20 July, 2016
‘Showtime: China Reveals Two ‘Carrier-Killer’ Missiles,’ in The National Interest, 03 September, 2015
‘China’s ‘aircraft-carrier killer’ missile successfully hit target ship in South China Sea, PLA insider claims’ in The South China Morning Post, 04 November 2020
‘China’s rocket force tests ‘carrier killer’ DF-26 ballistic missiles’ in The South China Morning Post, 10 June, 2021
‘Defense Intelligence Ballistic Missile Analysis Committee, Ballistic and Cruise Missile Threat 2020’ by Department of Defense, 2020
‘China’s New DF-26 Missile Shows Up At Base In Eastern China’ in Federation of American Scientists, 21 January 2020
‘Military and Security Developments Involving the People’s Republic of China 2020: Annual Report to Congress’ by Office of the Secretary of Defense, 2020
‘DF-26 TELs sighted at new PLARF training facility’ in IHS Jane’s, 10 January 2019
‘China’s Expanding Ability to Conduct Conventional Missile Strikes on Guam’ in US-China Economic & Security Review Commission, 05 October 2016 (https://www.uscc.gov/research/chinas-expanding-ability-conduct-conventional-missile-strikes-guam)
‘C-602 (HN-1/-2/-3/YJ-62/X-600/DH-10/CJ-10/HN-2000)’ in IHS Jane’s Weapons: Strategic 2015-2016
‘A Potent Vector: Assessing Chinese Cruise Missile Developments’ by Dennis M. Gormley, Andrew S. Erickson, and Jingdong Yuan in National Defense University, October 2014
‘China Eagle 18 missile has four major advantages, the attack area is expanded 600 times’ in Chinese MilitaryNews, 20 September 2019
‘China’s ‘New’ Carrier Killer Subs’ by Franz-Stefan Gad in The Diplomat, 06 April 2015
‘Ship killers: New anti-ship cruise missiles raise the stakes in Northeast Asia’ in Jane’s Navy International, April 2018
‘China’s New YJ-18 Antiship Cruise Missile: Capabilities and Implications for U.S. Forces in the Western Pacific’ by Michael Pilge in U.S.-China Economic and Security Review Commission, 28 October 28 2015
‘Cruise missiles are ‘useful’ sea defense’ by Zhao Lei in China Daily, 10 November 2015
‘China Building Long-Range Cruise Missile Launched From Ship Container’ by Bill Gertz in The Washington Free Beacon, 27 March 2019
‘DF-17 ballistic missile makes debut at National Day parade’ by Yang Sheng and Liu Xuanzun in Global Times, 01 October 2019
‘China Tests New Weapon Capable of Breaching US Missile Defense Systems’ by Franz-Stefan Gady in The Diplomat, 28 April 2016
‘U.S. Navy Sees Chinese HGV As Part Of Wider Threat’ by Bradley Perrett, Bill Sweetman, Michael Fabey in Aviation Week, 27 January, 2014
‘Military and Aerospace Electronics’ in ‘The emerging China hypersonic weapons threat to surface vessels at sea’, 24 April 2019
‘Is China’s DF-100 Missile Good Enough To Kill America’s Navy?’ by Sebastien Roblin in The National Interest, 17 November 2019

Thursday, 15 September 2022

তুরস্ক ও গ্রিসের মাঝে উত্তেজনা কোন দিকে যাচ্ছে?

১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২২
 
ইজিয়ান সাগরের প্রায় সবগুলি দ্বীপই পশ্চিমারা গ্রিসকে বিভিন্ন সময়ে দিয়েছে। যেকারণে ইজিয়ান সাগরের প্রায় পুরোটাই গ্রিসের হাতে; যা নিয়ে তুরস্ক গ্রিসের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে তুরস্ক পশ্চিমাদের জন্যে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজকে ততটা নয়। যেকারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপিয়রা তুরস্ককে সামরিক প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতে পারছে এবং গ্রিসের পক্ষও নিতে পারছে।

‘রয়টার্স’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, গত ১৩ই সেপ্টেম্বর তুরস্কের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্রে ৫ জন শিশু ও একজন মহিলাসহ মোট ৬ জন অভিবাসন প্রত্যাশী ডুবে মৃত্যুবরণ করে। তুর্কি কোস্ট গার্ড এক বিবৃতিতে বলে যে, এই মানুষগুলি লেবানন থেকে ইতালি যাবার চেষ্টা করছিল। মোট ৭৩ জনকে তুর্কিরা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। লেবানন থেকে রওয়ানা হয়ে তুরস্কের উপকূলের কাছে গ্রিক মালিকানায় থাকা রোডস দ্বীপের কাছে এসে তারা জ্বালানি নেবার চেষ্টা করে। তুর্কিরা বলছে যে, অভিবাসীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গ্রিক কোস্ট গার্ড তাদের কাছে যায় ঠিকই; কিন্তু তাদেরকে চারটা লাইফ বোটে তুলে দিয়ে তুর্কি উপকূলের কাছে ছেড়ে দেয়। তবে গ্রিক কোস্ট গার্ড এক বিবৃতিতে এই ঘটনাটা পুরোপুরিভাবে অস্বীকার করে। অভিবাসন প্রত্যাশীদের ব্যাপারে তুরস্ক ও গ্রিসের নীতি সাংঘর্ষিক অবস্থানে থাকায় তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে চাপের মাঝে ফেলেছে।

এর মাত্র দুই দিন আগে গ্রিক কোস্ট গার্ড ইজিয়ান সাগরের তুর্কি দ্বীপ বজকাদাএর ২০ কিঃমিঃ দূরে আন্তর্জাতিক সমুদ্রে একটা তুর্কি পরিবহণ জাহাজকে লক্ষ্য করে গুলি করে। গ্রিক কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, তারা তুর্কি দ্বীপ বজকাদাএর প্রায় ৬০ কিঃমিঃ দক্ষিণে গ্রিক দ্বীপ লেসবসএর কাছাকাছি জাহাজটাকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে সাবধান করার জন্যে গুলি ছোঁড়ে। যেহেতু ইজিয়ান সাগর দিয়ে যাওয়া অনেক জাহাজেই ইউরোপ অভিমুখে যাওয়া অভিবাসন প্রত্যাশীরা থাকে, তাই তারা অনেক সময়েই সন্দেহজনক মনে হলে জাহাজগুলির উপর নজরদারি করে থাকে।

‘আল জাজিরা’র প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুরস্কের কথায়, গ্রিকরা ইজিয়ান সাগরের ক্রিট দ্বীপে রুশ নির্মিত ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে তুর্কি যুদ্ধবিমানগুলিকে হুমকির মাঝে রাখছে; যা গ্রিকরা অস্বীকার করেছে। এছাড়াও গ্রিক যুদ্ধবিমানও ইজিয়ান সাগরে তুর্কি যুদ্ধবিমানকে হুমকি দিয়েছে। তুর্কিরা এও অভিযোগ করেছে যে, গ্রিকরা তুরস্কের কুর্দি বিদ্রোহী গ্রুপ ‘পিকেকে’র সদস্যদেরকে গোপনে সামরিক ট্রেনিং দিচ্ছে; যা তারা গ্রেপ্তার হওয়া ‘পিকেকে’ সদস্যদের কাছ থেকে জানতে পেরেছে। অপরদিকে গ্রিকরা বলছে যে, ইজিয়ান সাগরে গ্রিসের মালিকানায় থাকা রোডস এবং কস দ্বীপের মতো দ্বীপগুলি পর্যটন শিল্পের জন্যে গ্রীসের কাছে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই দ্বীপগুলি যেখানে গ্রিক মূল ভূখন্ড থেকে অনেক দূরে, সেখানে সেগুলি তুরস্কের মূল ভূখন্ড থেকে মাত্র ৫ থেকে ১৫ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। গ্রিকরা এই দ্বীপগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে।

গত ৩রা সেপ্টেম্বর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান গ্রিক বিমানের তুর্কি আকাশসীমানা লঙ্ঘনের অভিযোগ করে বলেন যে, যদি গ্রিকরা ইজিয়ান সাগরে তুর্কি বিমানকে হুমকি প্রদান করে যেতে থাকে, তাহলে গ্রিকদেরকে ক্ষতির সন্মুখীন হতে হবে। অপরদিকে গ্রিক প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস বলেন যে, তুর্কি প্রেসিডেন্টের কথাগুলি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে তিনি উত্তেজনা হ্রাসে তুর্কি নেতার সাথে আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, অক্টোবরে ইইউএর বৈঠকে হয়তো এরকম একটা সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সপ্তাহখানেক আগে গ্রিক সরকার ন্যাটো, ইইউ এবং জাতিসংঘের কাছে চিঠি দিয়ে তুর্কি আগ্রাসী মনোভাবের নিন্দা জানাতে অনুরোধ করে। চিঠিতে আশংকা প্রকাশ করা হয় যে, এহেন পরিস্থিতি সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। গ্রিকরা তাদের সমর্থন পাচ্ছে ফ্রান্সের কাছ থেকে। ‘গ্রিক সিটি টাইমস’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, গ্রিক প্রধানমন্ত্রী মিতসোতাকিস প্যারিস সফর করার সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর কাছ থেকে সমর্থন পান। ১২ই সেপ্টেম্বর এক যৌথ সংবাদ সন্মেলনে ম্যাক্রঁ বলেন যে, তুরস্কের বিবৃতি এবং কর্মকান্ড একবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং তিনি একইসাথে গ্রিসের সাথে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ব্যাপারে সন্তোষ প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স গ্রিকদেরকে ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছে এবং নৌবাহিনীর জন্যে ফ্রিগেট দিচ্ছে; সাথে ঋণ সুবিধাও দেয়া হচ্ছে।

দুই ন্যাটো সদস্য দেশের মাঝে উত্তেজনা ন্যাটোর ঐক্যের মাঝেও প্রশ্ন তুলেছে। ন্যাটোর অফিশিয়াল টুইটার বার্তায় ১৯২২ সালে দখলদারি গ্রিক বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভের শততম বার্ষিকীতে তুরস্ককে অভিনন্দন জানাবার পর গ্রিকরা প্রতিবাদ করে। ফলস্বরূপ ন্যাটো সেই বার্তা মুছে ফেললে তুর্কিরা নাখোশ হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, দুই ন্যাটো সদস্যের দ্বন্দ্ব মোটেই সুবিধা বয়ে আনবে না। আর ইজিয়ানের দ্বীপগুলির উপর গ্রিসের সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে কোন প্রশ্নই নেই।

প্রাক্তন মার্কিন সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব জিম টাউনসেন্ড ‘ভয়েস অব আমেরিকা’কে বলছেন যে, যদিও এই মুহুর্তে দুই দেশের উত্তেজনা নিরসনে কারুর মধ্যস্ততা প্রয়োজন, তথাপি তিনি কাছাকাছি সময়ে তা দেখছেন না। দুই দেশের কেউ যদি নিজেদের পক্ষ সমর্থনে ন্যাটোকে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়, তাহলে ন্যাটোর ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আর এই অনৈক্যকে মস্কো ব্যবহার করতে চাইবে। প্রাক্তন ন্যাটো সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা মার্কিন জেনারেল ফিলিপ ব্রীডলাভ বলছেন যে, যদিও দুই দেশের উত্তেজনা নতুন নয়, তথাপি তুরস্কের নেতৃত্ব দেশটাকে এমন একটা দিকে নিয়ে যেতে চাইছে, যা কিনা বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও টানাপোড়েনের মাঝে ফেলেছে। তবে যেহেতু দুই দেশেরই সামনে নির্বাচন, তাই উত্তেজক কথাগুলি হয়তো কিছুটা হলেও অভ্যন্তরীণ জনগণকে টার্গেট করে বলা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলকে যেভাবে দেখতে চাইছে, সেক্ষেত্রে তুরস্কের চাইতে গ্রিস অপেক্ষাকৃতভাবে এগিয়ে আছে।

দুই দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন এই দ্বন্দ্বে ইন্ধন যোগালেও তুরস্ক ও গ্রিসের দ্বন্দ্ব তাদের জন্মকাল থেকেই। ইজিয়ান সাগরের প্রায় সবগুলি দ্বীপই পশ্চিমারা গ্রিসকে বিভিন্ন সময়ে দিয়েছে। যেকারণে ইজিয়ান সাগরের প্রায় পুরোটাই গ্রিসের হাতে; যা নিয়ে তুরস্ক গ্রিসের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে তুরস্ক পশ্চিমাদের জন্যে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজকে ততটা নয়। যেকারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপিয়রা তুরস্ককে সামরিক প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতে পারছে এবং গ্রিসের পক্ষও নিতে পারছে। ফ্রান্স ইতোমধ্যেই তুরস্ককে ব্যালান্স করতে গ্রিসকে সামরিক সহায়তাও দিচ্ছে। অপরদিকে রাশিয়ার উপর পশ্চিমা অবরোধের মাঝেও তুরস্ক রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝেও ন্যাটোর সদস্যদেশগুলির সাংঘর্ষিক লক্ষ্য সংস্থার ঐক্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

Tuesday, 13 September 2022

নিজেদের ডেভেলপ করা ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তুরস্ককে গুরুত্বপূর্ণ করছে

১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২২
 
তুরস্কের 'বায়রাকতার আকিনচি' ড্রোন এবং এর বহনযোগ্য অস্ত্রসমুহ। তুরস্কের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পের সবচাইতে বড় সাফল্য হলো তাদের ড্রোনগুলিকে “দাঁত” সরবরাহ করা। অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা রাষ্ট্রগুলি এই ড্রোনগুলির সহায়তায় আকাশ শক্তির মালিক হয়েছে। আর ড্রোনগুলির সবচাইতে বড় শক্তি হলো এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি; যেগুলি টার্গেটের উপর নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম এবং সেই আক্রমণের ভিডিও ছবি তুলে প্রচার করার সুবিধাও দিচ্ছে।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। মাত্র এক দশকের মাঝে দেশটার সামরিক শিল্প অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। তুরস্কের উপর পশ্চিমাদের বিভিন্ন রকমের নিষেধাজ্ঞা এবং অবরোধের কারণে তুরস্ক নিজস্ব অস্ত্র ডেভেলপ করতে বাধ্য হয়েছে। একইসাথে এই শিল্পগুলিকে বাণিজ্যিকভাবে টিকিয়ে রাখতে তারা বিভিন্ন সামরিক পণ্যকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করার দিকে ঝুঁকেছে। ন্যাটোর অংশ হবার কারণে এবং দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা বিশ্বের জন্যে বিভিন্ন সামরিক উপকরণ তৈরি করতে গিয়ে তুরস্ক নিজস্ব সামরিক প্রযুক্তিকে একটা শক্তিশালী ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছে। এর ফলে প্রয়োজন চলে আসায় তারা বেশ দ্রুতই বিভিন্ন প্রকারের সামরিক পণ্য ডেভেলপ করে উৎপাদনে যেতে পেরেছে।

তুরস্কের ডেভেলপ করা প্রযুক্তিগুলি বহু প্রকারের হলেও যে জিনিসগুলি তুরস্কের সামরিক শিল্পের প্রতি সমীহ যুগিয়েছে তা হলো এগুলির ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন যুদ্ধে তুর্কি সামরিক পণ্য ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে; যার মাঝে রয়েছে সিরিয়া, লিবিয়া, আজেরবাইজান এবং ইউক্রেন। প্রতিটা ক্ষেত্রেই তুর্কি পণ্য যুদ্ধের মাঝে বড় অবদান রাখতে পেরেছে শত্রুপক্ষের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারার জন্যে। এই ক্ষয়ক্ষতিগুলি অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে তুর্কিদের ডেভেলপ করা বিভিন্ন প্রকারের ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে। সকলে খেয়াল না করলেও এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তুর্কিদের প্রতিরক্ষা শিল্পের দুনিয়ার সামনে চলে আসার অন্যতম প্রধান কারণ। প্রায় সকল ধরণের ক্ষেপণাস্ত্রই তুর্কিরা ডেভেলপ করছে। তাই এই পুরো সেক্টরের সম্যক ধারণা পেতে ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটা প্রকারের গভীরে গিয়ে পর্যালোচনা প্রয়োজন।

ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র

‘রকেটসান’ হলো তুরস্কের মূল ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। কোম্পানির নিজস্ব মাল্টি ব্যারেল রকেট লঞ্চারকে ব্যবহার করেই তারা বেশ কয়েকটা ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করেছে। ‘টিআরজি-৩০০’ নামের ক্ষেপণাস্ত্রটার ব্যারেল ৩’শ মিঃমিঃ এবং পাল্লা ৯০ থেকে ১’শ ২০ কিঃমিঃ পর্যন্ত। ‘ব্লক-২’ ভার্সনের ওজন ৬’শ ৬০ কেজি এবং ওয়ারহেড ১’শ ৮০ কেজি। অপদিকে ‘ব্ল-৩’ ভার্সনের ওজন ৫’শ ৮৫ কেজি এবং এর ওয়ারহেড ১’শ ৫ কেজি। টার্গেটের ১০ মিটারের মধ্যে আঘাত হানার সক্ষমতা এই ক্ষেপণাস্ত্রের রয়েছে। ‘টিআরজি-২৩০’ নামের পরবর্তী ২’শ ৩০ মিঃমিঃ ক্ষেপণাস্ত্রটার ওজন ২’শ ১৫ কেজি। এর পাল্লা ৭০ কিঃমিঃ এবং ওয়ারহেড ৪২ কেজি। প্রায় একই আকৃতির ‘টিআরএলজি-২৩০’ ক্ষেপণাস্ত্রের গাইড্যান্সে লেজার যোগ করা হয়েছে। আরও ছোট আকৃতির ১’শ ২২ মিঃমিঃ ক্ষেপণাস্ত্র হলো ‘টিআরএলজি-১২২’; যার ওজন ৭৬ কেজি এবং পাল্লা ৩০ কিঃমিঃ। লেজার গাইড্যান্সের মাধ্যমে সাড়ে ১৩ কেজি ওয়ারহেডের এই ক্ষেপণাস্ত্র টার্গেটের ২ মিটারের মাঝে আঘাত করতে সক্ষম।

তবে এই সিরিজের সবচাইতে বড় ক্ষেপণাস্ত্রটা হলো ‘খান’; যার পাল্লা ২’শ ৮০ কিঃমিঃ পর্যন্ত। ৬’শ ১০ মিঃমিঃ ব্যারেলের এই ক্ষেপণাস্ত্রের ওজন আড়াই টন এবং এর বিশাল ওয়ারহেডের ওজন ৪’শ ৭০ কেজি। পাল্লা বেশি হলেও টার্গেটের মাত্র ১০ মিটারের মাঝে এটা আঘাত হানতে সক্ষম। তুরস্ক ‘খান’ (আরেকটা নাম হলো ‘বরা’) ক্ষেপণাস্ত্র ২০১৭ সালের মে মাসে কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে পরীক্ষা করে। এর মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০১৯ সালের মে মাসে উত্তর ইরাকে কুর্দী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এটা ব্যবহার করা হয়।

তুর্কি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইডিএএম’এর ডিরেক্টর ক্যান কাসাপোগলু ‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক লেখায় বলছেন যে, এই ক্ষেপণাস্ত্রের শুরু হয়েছিল ১৯৯০এর দশকে চীনের সাথে তুরস্কের সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে। চীনা ‘বি-৬১১’ ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে তৈরি করা তুর্কি ক্ষেপণাস্ত্র থেকেই শেষ পর্যন্ত এই ‘বরা’ বা ‘খান’ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হয়েছে। চীনা ক্ষেপণাস্ত্রগুলির চাইতে তুর্কিদের এই ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানা অপেক্ষাকৃত নিখুঁত। এরকম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার যে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ, তা ইয়েমেন এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে। এছাড়াও সর্বশেষ প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রগুলি টার্গেটে আঘাত করার ঠিক আগ মুহুর্তে দিক পরিবর্তন করতে পারে এবং এগুলির নিশানাও অনেক ভালো; যা কিনা যুদ্ধক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল এনে দিতে পারে। তুর্কিরা এখন সেই প্রযুক্তির লক্ষ্য নিয়েই কাজ করবে।

তুর্কি ক্ষেপণাস্ত্রগুলি আন্তর্জাতিক আইনের মাঝে থাকার কারণে ৩’শ কিঃমিঃএর ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকছে। এই পাল্লা গুরুত্বপূর্ণ কোন কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে সম্ভব হবে না; যেটা ইয়েমেনের যুদ্ধে দেখা গিয়েছে। হুথিরা সৌদি আরবের রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করে; যা কিনা ইয়েমেন থেকে প্রায় ১ হাজার কিঃমিঃ দূরে। জেদ্দার তেল স্থাপনাগুলিও ইয়েমেন থেকে প্রায় ৮’শ কিঃমিঃ দূরে ছিল। সেপ্টেম্বর ২০১৯এর আবকাইক এবং খুরাইসএর তেল স্থাপনার উপর হামলা ছিল সবচাইতে মারাত্মক। সেই স্থাপনা ইয়েমেন থেকে প্রায় ১৩’শ কিঃমিঃ দূরে। কাজেই তুর্কি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলির কৌশলগত গুরুত্ব যথেষ্টই কম থাকছে।

 
তুর্কি যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোঁড়া হচ্ছে 'আতমাকা' ক্ষেপণাস্ত্র। তুর্কি ‘আতমাকা’ ক্ষেপণাস্ত্র ইজিয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগরে তুর্কিদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা ‘হারপুন’ ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিস্থাপন করার পর তুরস্ক অনেক ক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র সামরিক মিশনের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে; যদিও তুরস্কের বাস্তবাদী পররাষ্ট্রনীতির কারণে রাজনৈতিকভাবে সেগুলির ব্যবহার প্রশ্নবিদ্ধই থাকবে। তথাপি এগুলির জন্যে রপ্তানি ক্রেতা পাওয়া সহজ হবে।

জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র

তুর্কিদের ডেভেলপ করা জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ‘আতমাকা’ (অর্থ বাজ পাখি) ইতোমধ্যেই মিডিয়াতে যথেষ্ট নাম করে ফেলেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ‘ডিফেন্স নিউজ’এর এক খবরে বলা হয় যে, তুর্কিরা ‘আতমাকা’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পুরোনো মার্কিন নির্মিত ‘হারপুন’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে প্রতিস্থাপন করতে যাচ্ছে। তুরস্কের নৌবাহিনীর সূত্র বলছে যে, সামনের কয়েক বছরের মাঝেই তুর্কি নৌবাহিনীর জাহাজগুলিতে ‘আতমাকা’ স্থান পাবে। ক্ষেপণাস্ত্রের ডেভেলপার ‘রকেটসান’এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলছেন যে, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মাঝেই প্রায় সাড়ে ৩’শ ‘হারপুন’ ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিস্থাপন করা যাবে। ২০০৯ সালে রকেটসান এই ক্ষেপণাস্ত্রের কনট্রাক্ট পায়। ২০২০ সালের জুলাই মাসে তুর্কি নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘কিনালিয়াদা’ থেকে সফলভাবে ‘আতমাকা’র পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়। ‘রকেটসান’ বলছে যে, যেহেতু ‘আতমাকা’র খরচ ‘হারপুন’এর অর্ধেক, তাই তুর্কিরা প্রায় ৫’শ মিলিয়ন ডলার অর্থ বাঁচাতে পারবে। ২’শ ২০ কিঃমিঃ পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রের রয়েছে ২’শ ৫০ কেজি ওয়ারহেড। যেকোন আবহাওয়ায় সমুদ্রের সমতল ঘেঁষে ওড়া এই ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এড়াতে সক্ষম বলে বলা হচ্ছে। পরীক্ষার সময় ‘আতমাকা’ সমুদ্রের পানি থেকে মাত্র ১০ ফুট উপর দিয়ে উড়েছে বলে বলা হয়। শুধু সমুদ্রের টার্গেটই নয়; ভূমির টার্গেটেও এই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানতে সক্ষম। সামনের দিনগুলিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র ‘আদা-ক্লাস’ কর্ভেট, ‘ইস্তাম্বুল-ক্লাস’ ফ্রিগেট ও ভবিষ্যতের ‘টিএফ-২০০০’ ডেস্ট্রয়ার বহণ করবে।

গত মার্চ মাসে তুরস্ক ঘোষণা দেয় যে, তারা ছোট আকারের আরেকটা জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করেছে। সরকারি মিডিয়া ‘আনাদোলু এজেন্সি’ বলছে যে, এখনও ‘চাকির’ নামের এই ক্ষেপণাস্ত্র ডিজাইনের মাঝেই রয়েছে এবং ২০২২এর মাঝেই প্রথম পরীক্ষা হতে পারে। ১’শ ৫০ কিঃমিঃ পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র ভূমি, জাহাজ, বিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন থেকে ছোঁড়া সম্ভব। এই ক্ষেপণাস্ত্র একসাথে কয়েকটা ছোঁড়া হতে পারে; যেগুলি উড়ন্ত অবস্থাতেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমন্বয় করে অনেকগুলি টার্গেটে আঘাত হানতে পারবে। টার্গেট পরিবর্তন করা এবং মাঝপথে ক্ষেপণাস্ত্রের নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন করা সম্ভব হবে। যেমন একটা জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পর সেটার নিয়ন্ত্রণ একটা বিমানের কাছে হস্তান্তর করতে পারবে। শত্রুর শক্ত অবস্থানগুলিকে এড়িয়ে যাওয়া অথবা উপকূলের টার্গেটে আঘাত হানতে গিয়ে ভূমির উপর দিয়ে ওড়া, শেষ মুহুর্তে দিক পরিবর্তন করে ফেলা, ইত্যাদি পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে এই ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে ভিন্ন রকমের সক্ষমতা হাজির করবে। অপেক্ষাকৃত ছোট এবং কমদামি হবার কারণে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি একসাথে অনেকগুলি ছুঁড়ে দিয়ে শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলা সম্ভব। ২০২৩ সালে এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের সাথে যুক্ত করা শুরু হবে। এই ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে ইঞ্জিন হবে ‘কালে আরএন্ডডি’এর ডেভেলপ করা ‘কেটিজে-১৭৫০’।

তুর্কি ‘আতমাকা’ ক্ষেপণাস্ত্র ইজিয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগরে তুর্কিদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা ‘হারপুন’ ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিস্থাপন করার পর তুরস্ক অনেক ক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র সামরিক মিশনের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে; যদিও তুরস্কের বাস্তবাদী পররাষ্ট্রনীতির কারণে রাজনৈতিকভাবে সেগুলির ব্যবহার প্রশ্নবিদ্ধই থাকবে। তথাপি এগুলির জন্যে রপ্তানি ক্রেতা পাওয়া সহজ হবে।

ড্রোনের জন্যে ক্ষেপণাস্ত্র

তুরস্কের ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনগুলি নাগোর্নো কারাবাখের যুদ্ধ, সিরিয়া ও লিবিয়ার যুদ্ধ এবং সর্বশেষ ইউক্রেনের যুদ্ধে সকলের দৃষ্টি কেড়েছে। কিন্তু যে ব্যাপারটা এই ড্রোনের কাজগুলিকে সম্ভব করেছে তা হলো তুরস্কের নিজস্ব ডেভেলপ করা কিছু অস্ত্র, যা ছোট্ট এই ড্রোনগুলি মারাত্মক নিখুঁতভাবে ব্যবহার করেছে। ‘রকেটসান’ কোম্পানির ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে যে, ‘এমএএম-সি’ বা ‘ম্যাম-সি’ নামের মাত্র সাড়ে ৬ কেজি ওজনের লেজার গাইডেড বোমাগুলি প্রথম ‘টিবি-২’ ড্রোনগুলিকে ৮ কিঃমিঃ দূর থেকে আঘাত করার শক্তি দিয়েছে। এরপর এসেছে ২২ কেজি ওজনের ‘এমএএম-এল’ বা ‘ম্যাম-এল’ বোমা; যেগুলি ১৫ কিঃমিঃ দূর থেকে নিখুঁতভাবে টার্গেটে আঘাত করতে পারছে। এছাড়াও ৯৫ কেজি ওজনের ‘ম্যাম-টি’ ডেভেলপ করা হয়েছে; যার পাল্লা ৩০ কিঃমিঃএর উপর। ‘বায়রাকতার আকিনচি’ ড্রোনগুলি এই বোমাগুলি বহণে সক্ষম।

২০২১এর শেষের দিকে ‘তুবিতাক সেইজ’ নিজস্ব কিছু ছোট আকারের ক্ষেপণাস্ত্রের ডেভেলপমেন্ট শুরু করেছে। ‘কুজগুন’ নামের একটা ১’শ কেজি ওজনের ‘গাইডেড মডিউলার মিউনিশন ফ্যামিলি’ তারা তৈরি করছে, যা বিভিন্ন রকমের ইঞ্জিন, ন্যাভিগেশন ও গাইড্যান্স এবং ওয়ারহেড বহণ করতে পারবে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স টার্কি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ‘তুবিতাক সেইজ’এর কর্মকর্তা বলেন যে, তারা আরও আগ থেকেই যেহেতু ‘এফ-১৬’ এবং ‘এফ-৪ই’ বিমানের জন্যে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে আসছিলেন, তাই তুরস্কের ড্রোনগুলির জন্যে ২০১৯ সালে তারা যখন ছোট আকারের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে গেলেন, তখন অনেক কাজই সহজ হয়ে গিয়েছিল। ‘কুজগুন ফ্যামিলি’র ক্ষেপণাস্ত্রগুলি একইরকম এভিওনিক্স এবং মেকানিক্যাল বডি ব্যবহার করছে।

২০২২এর জুনে ‘তুবিতাক সেইজ’ ঘোষণা দেয় যে, তারা ‘টিবি-২’ ড্রোনগুলির জন্যে ‘বজক’ নামের ‘সেমি একটিভ লেজার’ গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে। ‘ডিফেন্স নিউজ’ বলছে যে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির পাল্লা ৯ কিঃমিঃ থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ কিঃমিঃ করা হয়েছে। ১৬ কেজি ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ‘ম্যাম-এল’ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় সমান লম্বা হলেও ওজনে প্রায় ৬ কেজি কম।

তুরস্কের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পের সবচাইতে বড় সাফল্য হলো তাদের ড্রোনগুলিকে “দাঁত” সরবরাহ করা। সাধারণ সার্ভেইল্যান্স ড্রোনগুলির সাথে বড় পার্থক্য তৈরি করা এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সারা দুনিয়ায় একেবারেই আলাদা। মানবচালিত ফাইটার বিমান কেনা, সেগুলি অপারেট করা এবং মেইনটেইন করায় যে খরচ হয়, তার একটা ছোট্ট অংশ ব্যয় করে এই ড্রোনগুলিকে অপারেট করা সম্ভব। অর্থাৎ এই ড্রোনগুলি স্বল্প খরচে একটা রাষ্ট্রকে যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশ থেকে আক্রমণের সক্ষমতা দিচ্ছে। অন্যকথায় বলতে গেলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা রাষ্ট্রগুলি এই ড্রোনগুলির সহায়তায় আকাশ শক্তির মালিক হয়েছে। আর ড্রোনগুলির সবচাইতে বড় শক্তি হলো এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি; যেগুলি টার্গেটের উপর নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম এবং সেই আক্রমণের ভিডিও ছবি তুলে প্রচার করার সুবিধাও দিচ্ছে।

বিমান ও হেলিকপ্টার থেকে ভূমিতে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র

‘রকেটসান’ সাধারণ বোমার উপর গাইড্যান্স কিট লাগিয়ে সেগুলিকে নিখুঁতভাবে টার্গেটে আঘাত হানার জন্যে প্রস্তুত করেছে। ‘তেবার’ নামে পরিচিত এই গাইড্যান্স কিটের সহায়তায় ১’শ ৫৫ কেজি অথবা ২’শ ৭০ কেজি একটা সাধারণ বোমা ২ থেকে ২৮ কিঃমিঃ দূর থেকে নিখুঁত নিশানায় ছোঁড়া যাচ্ছে। জিপিএস বা ইনারশিয়াল মেজারমেন্টের মাধ্যমে এই গাইড্যান্স সম্ভব হচ্ছে।

‘ডেইলি সাবাহ’ জানাচ্ছে যে, ২০২১এর জুনে তুর্কি বিমান বাহিনী নতুন প্রকারের অস্ত্রের ডেলিভারি পাওয়া শুরু করেছে। ‘এইচজিকে-৮২'’নামের এই অস্ত্র মূলতঃ সাধারণ ২’শ ২৬ কেজি ‘মার্ক-৮২’ বোমার সাথে কিছু উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়। ‘তুবিতাক সেইজ’, ‘আসেলসান’ এবং ‘আফসাত’ ২০২২ সালের অগাস্টের মাঝে প্রায় ১ হাজার এরকম বোমা সরবরাহ করবে বলে বলা হয়। প্রথমবারের মতো নিজস্ব ডেভেলপ করা ‘কাসিফ’ জিপিএস রিসিভার যুক্ত করার মাধ্যমে বোমাগুলিকে বিদেশী সরবরাহ থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। প্রায় ২৮ কিঃমিঃ দূর থেকে এই বোমাগুলি টার্গেটে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়াও ‘এইচজিকে-৮৩' (৪’শ ৫৩ কেজি) এবং ‘এইচজিকে-৮৪’ (৯’শ ৭ কেজি)এর ক্ষেত্রে আরও বড় আকারের বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ‘এলএইচজিকে-৮৪’ ডেভেলপ করা হয়েছে লেজার গাইডেড বোমা হিসেবে।

২০২০এর জুনে তুরস্ক ঘোষণা দেয় যে, ‘তুবিতাক সেইজ’এর ডেভেলপ করা ‘এসএআরবি-৮৩’ বোমা উৎপাদনে গিয়েছে। এই বোমাগুলি কংক্রিটের অবকাঠামো ধ্বংস করতে সক্ষম। বিশেষভাবে ডেভেলপ করা ওয়ারহেড কংক্রিট বাংকার, রানওয়ে, মাটির নিচের লুকিয়ে থাকা স্থাপনা, কংক্রিটের এয়ারক্রাফট হ্যাংগার, নদীর উপরে বাঁধ, ইত্যাদি শক্ত টার্গেট ধ্বংস করতে পারবে। পরীক্ষার সময় এই বোমা প্রায় ৫ ফুট পুরু কংক্রিট ভেদ করে, যার শক্তি ছিল প্রায় ৫ হাজার পিএসআই। এই বোমাগুলি তৈরি করা হয়েছে ‘তুবিতাক’এর ‘এনইবি পেনেট্রেটর বম্ব’এর উপর ভিত্তি করে; যা ৮’শ ৭০ কেজি বোমা ব্যবহার করে। এই বোমার সাথে যেকোন গাইড্যান্স কিট জুড়ে দেয়া যায়।

এছাড়াও ‘তুবিতাক সেইজ’ ডেভেলপ করেছে ‘উইং এসিসটেড গাইড্যান্স কিট’; যা মূলতঃ সাধারণ বোমার উপর বসানো ডানা। এই ডানার উপর ভর করে বোমাগুলি ১১ কিঃমিঃ থেকে ১’শ ১১ কিঃমিঃ পর্যন্ত দূরের টার্গেটে আঘাত হানতে সক্ষম। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বহণকারী বিমান শত্রুর প্রতিরক্ষার মাঝে না গিয়েই বোমা ফেলতে সক্ষম হবে।

‘তুবিতাক সেইজ’এর ডেভেলপ করা বোমাগুলি এবং ‘রকেটসান’এর ডেভেলপ করা ‘তেবার’ গাইড্যান্স কিটের সহায়তায় তুর্কি বিমান বাহিনীর ‘এফ-১৬’ বিমানগুলির সক্ষমতা অনেকাংশেই বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নির্মিত বোমার উপর তুরস্কের নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই কমবে।

‘রকেটসান’এর ডেভেলপ করা আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হলো ‘উমটাস’ নামের দূরপাল্লার ট্যাংক ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। প্রায় ৩৮ কেজি ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি প্রায় ৮ কিঃমিঃ দূরে একটা ট্যাংককে ধ্বংস করতে সক্ষম। হেলিকপ্টার, বিমান অথবা ভূমি এমনকি সমুদ্রের নৌযান থেকেও এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া সম্ভব। এর মূল গাইড্যান্স হলো ‘ইমেজিং ইনফ্রারেড’। তবে ‘এল-উমটাস’ নামে আরও একটা ভার্সন তৈরি করা হয়েছে, যার গাইড্যান্স হলো ‘সেমি একটিভ লেজার’এর। এছাড়াও মধ্যম পাল্লার (৪ কিঃমিঃ) ‘ওমটাস’ নামের আরেকটা ভার্সনও ডেভেলপ করা হয়েছে।

 
কৌশলগত দিক থেকে ‘রকেটসান’এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হলো ‘স্ট্যান্ড অফ মিসাইল’ বা ‘এসওএম’ বা ‘সম’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম বিধায় এগুলির গুরুত্ব যথেষ্ট। এগুলি তুরস্কের অস্ত্র কূটনীতিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

কৌশলগত দিক থেকে ‘রকেটসান’এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হলো ‘স্ট্যান্ড অফ মিসাইল’ বা ‘এসওএম’ বা ‘সম’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। আড়াই’শ কিঃমিঃ পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র ২’শ ৩০ কেজি ওয়ারহেড দ্বারা সজ্জিত, যা কিনা শত্রুর শক্ত অবস্থানগুলির উপর হামলা করতে পারবে। এই ক্ষেপণাস্ত্রের তিনটা ভার্সন মোট ছয় প্রকারের ন্যাভিগেশন ও গাইড্যান্স সিস্টেম বহণ করতে সক্ষম; যা শত্রুর প্রতিরক্ষাকে নাকাল করার জন্যে যথেষ্ট। ২০০৬ সালে ‘রকেটসান’ এর ডেভেলপমেন্ট শুরু করে এবং ২০১১ সালে প্রথম এটা জনসন্মুখে আনে। ‘এয়ারফোর্স টেকনলজি’র এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ২০১২ সাল থেকে ‘সম’ তুর্কি বিমান বাহিনীর সার্ভিসে রয়েছে। ২০১২ সালে ‘কালে এরো’ কোম্পানিকে কাজ দেয়া হয় এই ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে নিজস্ব একটা টারবোজেট ইঞ্জিন ডেভেলপ করার জন্যে। তবে ৬’শ কেজি ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোট আকারের বিমান বা ড্রোনের পক্ষে বহণ সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ‘বায়রাকতার আকিনচি’ ড্রোনে ‘সম’ ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

‘সম’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি আজেরবাইজানের কাছে বিক্রয় করার খবর পাওয়া যায়। তবে এগুলি আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহৃত হবার কোন প্রমাণ মেলেনি। তথাপি এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম বিধায় এগুলির গুরুত্ব যথেষ্ট। এগুলি তুরস্কের অস্ত্র কূটনীতিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

তুরস্কের আরেকটা ক্ষেপণাস্ত্র হলো স্বল্প পাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ‘সুঙ্গুর’; যা মূলতঃ একজন সৈন্য তার কাঁধের উপর থেকে ছুঁড়তে পারে। নিচু দিয়ে ওড়া ড্রোন, হেলিকপ্টার, বিমান এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এর টার্গেট। ‘আর্মি টেকনলজি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ‘সুঙ্গুর’ ক্ষেপণাস্ত্র তুর্কিরা মূলতঃ মার্কিন নির্মিত ‘স্টিংগার’ ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিস্থাপনে ব্যবহার করবে। ২০১৩ সালে ‘রকেটসান’এর সাথে স্বাক্ষরিত কনট্রাক্ট অনুযায়ী এই ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করা হয়। ২০১৮ সালে এটা প্রথম উড্ডয়ন করে। ২০২০এর জুলাই মাসে সকল পরীক্ষা শেষে ‘সুঙ্গুর’ তুর্কি সামরিক বাহিনীর ব্যবহারের জন্যে সার্টিফিকেট পায়। এই ক্ষেপণাস্ত্রের টার্গেটিংএর জন্যে ‘ইনফ্রারেড সীকার’ সরবরাহ করেছে তুর্কি কোম্পানি ‘আসেলসান’। এছাড়াও এই ক্ষেপণাস্ত্রকে একটা সাঁজোয়া যানের উপরে ‘লেজার ডেজিগনেটর’ (যা দিন বা রাতে চারিদিকের একটা পরিষ্কার ছবি তুলে ধরে) ও ‘রেঞ্জ ফাইন্ডার’ (যা নিখুঁতভাবে টার্গেট খুঁজে পেতে সহায়তা করে) সহ বসানো হয়েছে। এই গাড়ি একসাথে চারটা ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করে এবং চলন্ত অবস্থায় ৮ কিঃমিঃএর মাঝে যেকোন টার্গেটকে ধ্বংস করতে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্র টার্গেট সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য পাবে ‘আসেলসান’এর ডেভেলপ করা ‘হেরিকস-৬’ কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল সিস্টেম থেকে; যা অন্যান্য রাডার থেকে ‘সুঙ্গুর’ ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে টার্গেট খুঁজে দেবে।

‘ডেইলি সাবাহ’ বলছে যে, ১৫ কিঃমিঃ পাল্লার ‘হিসার-এ’ ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যেই তুর্কি সামরিক বাহিনীর সার্ভিসে এসেছে। আর ২৫ কিঃমিঃ পাল্লার ‘হিসার-ও’ এখন উৎপাদনে গিয়েছে। ‘আর্মি রেকগনিশন’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ২০০৭ সাল থেকে ডেভেলপমেন্ট শুরু হবার পর ২০১৪ সালের জুলাই মাসে ‘হিসার-ও’ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম পরীক্ষা চালানো হয়। ২০১৭ সালে ‘হিসার-ও’এর প্রথমবারের মতো ‘ভার্টিক্যাল লঞ্চিং’ সম্পন্ন করা হয়। ২০২১এর মার্চে তুরস্ক ‘হিসার-ও প্লাস’ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। ‘সিপার’ ডেভেলপ করার আগ পর্যন্ত এটাই ছিল তুরস্কের ডেভেলপ করা সর্বোচ্চ পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এরপর মে মাসে ‘হিসার-এ প্লাস’এরও পরীক্ষা সম্পাদন করা হয়। ২০২১এর ডিসেম্বরে ‘হিসার-ও প্লাস’ তুর্কি সামরিক বাহিনীর সার্ভিসে ঢোকার আগে শেষ পরীক্ষা সম্পাদন করে। অবশ্য জুলাই মাসেই সরকার ঘোষণা দেয় যে, ‘হিসার-ও প্লাস’ উৎপাদনে যাবার জন্যে প্রস্তুত। আর ২০২২এর জানুয়ারি মাসে তুর্কি সামরিক বাহিনী ঘোষণা দেয় যে, ‘হিসার-ও প্লাস’ সার্ভিসে এসেছে।

 
তুরস্কের প্রথম দূরপাল্লার বিমান ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র 'সিপার'। আকাশ প্রতিরক্ষায় তুরস্ক অনেকগুলি ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করলেও দূরপাল্লার এবং বিশেষ করে শত্রুর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সক্ষমতা থেকে এখনও কিছুটা দূরে রয়েছে। এই ঘাটতি সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ককে শক্তিশালী কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক মিশনে যেতে বাধা দিতে পারে। বিশেষ করে তুরস্কের প্রতিবেশী দেশগুলির অনেকগুলিই যখন মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মালিক, তখন তা তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিকে খাঁচায় বন্দী করতে পারে।

২০২১এর নভেম্বরে তুরস্ক ঘোষণা দেয় যে, তারা প্রথমবারের মতো একটা দূরপাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। ‘সিপার’ নামের এই ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করেছে ‘আসেলসান’, ‘রকেটসান’ এবং ‘তুবিতাক সেইজ’। তুরস্কের ‘প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ’এর প্রধান ইসমাঈল দেমির এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ২০২৩ সাল নাগাদ এই ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হবে। তিনি আরও বলেন যে, তুরস্ক ৬টা আলাদা ধরণের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ডেভেলপ করছে। ২০২২এর অগাস্টে এক পরীক্ষায় ‘সিপার’ ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ৯০ কিঃমিঃএর বেশি দূরের এবং ২৬ হাজার ফুট উচ্চতায় ওড়া একটা সুপারসনিক টার্গেটকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এই ক্ষেপণাস্ত্রের পরবর্তী ভার্সনগুলি ১’শ থেকে ১’শ ৫০ কিঃমিঃ পর্যন্ত পাল্লা হবে বলে বলা হচ্ছে।

‘ডেইলি সাবাহ’র সাথে এক সাক্ষাতে ইসমাঈল দেমির বলেন যে, ‘হিসার’এর মতোই ‘সিপার’এরও ‘ডুয়াল পালস’ ইঞ্জিন, ‘একটিভ রাডার সীকার’ এবং ‘ইমেজিং ইনফ্রারেড সীকার’ রয়েছে। ‘আসেলসান’এর ওয়েবসাইট বলছে যে, মার্কিন ‘প্যাট্রিয়ট’ ও রুশ ‘এস-৪০০’ সিস্টেমের মতোই ‘সিপার’ কৌশলগত অবকাঠামোগুলির সুরক্ষা দেবে। আর সেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির মতোই ‘সিপার’ও কয়েক প্রকারের ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে পারবে। ২০২২এর মে মাসে আজেরবাইজানের ‘টেকনোফেস্ট’এর সাইডলাইনে ‘আনাদোলু এজেন্সি’র সাথে এক সাক্ষাতে দেমির বলেন যে, ‘সিপার’ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো আমদানি করা সিস্টেমের উপর থেকে তুরস্কের নির্ভরতা সরিয়ে ফেলা। জুলাই মাসে ‘ওন্দোকুজ মায়িজ ইউনিভার্সিটি’র এক সেমিনারে দেমির বলেন যে, মাত্র ছয় বছর আগেও তুরস্কের নিজস্ব কোন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই ছিল না। এর মাঝে ‘কোরকুত’, ‘সুঙ্গুর’, ‘হিসার-এ’, ‘হিসার-ও’ এবং ‘সিপার’ সিস্টেমগুলি ডেভেলপ করেছে তুরস্ক। ‘কোরকুত’ হলো স্বল্প পাল্লার (৪ কিঃমিঃ) ৩৫মিঃমিঃএর একটা অটোম্যাটিক বিমান বিধ্বংসী কামান; যা ২০১৩ সালে প্রথম ঘোষণা দেয়ার পর ২০১৯ সালে উৎপাদন শুরু হয়।

আকাশ প্রতিরক্ষায় তুরস্ক অনেকগুলি ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করলেও দূরপাল্লার এবং বিশেষ করে শত্রুর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সক্ষমতা থেকে এখনও কিছুটা দূরে রয়েছে। এই ঘাটতি সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ককে শক্তিশালী কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক মিশনে যেতে বাধা দিতে পারে। বিশেষ করে তুরস্কের প্রতিবেশী দেশগুলির অনেকগুলিই যখন মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মালিক, তখন তা তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিকে খাঁচায় বন্দী করতে পারে।

আকাশ থেকে আকাশে

গত জুলাই মাসে তুরস্কের ‘প্রেসিডেন্সি ফর ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ’এর পক্ষ থেকে বলা হয় যে, তুরস্ক প্রথমবারের মতো দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা করেছে। ‘গোকদোগান’ নামের এই ‘রাডার গাইডেড’ ক্ষেপণাস্ত্র দৃষ্টির অগোচরে থাকা টার্গেটেও আঘাত হানতে পারবে। প্রেসিডেন্সির প্রধান ইসমাঈল দেমির এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ‘গোকদোগান’ এবং ‘বজদোগান’ ক্ষেপণাস্ত্র ২০২২ সালের মাঝেই তুর্কি সামরিক বাহিনীর হাতে দেয়া হবে। ‘বজদোগান’ ক্ষেপণাস্ত্র হলো স্বল্প পাল্লার ‘ইনফ্রারেড হোমিং’ ক্ষেপণাস্ত্র। দু’টা ক্ষেপণাস্ত্রই মূলতঃ তুর্কি বিমান বাহিনীর ‘এফ-১৬’ বিমান এবং ভবিষ্যতের ‘হুরজেট’ ও ‘টিএফ-এক্স’ বিমানের জন্যে ডেভেলপ করা হয়েছে। ‘এয়ার রেকগনিশন’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ‘গোকদোগান’ ক্ষেপণাস্ত্র মুলতঃ ‘একটিভ রাডার সীকার’এর উপর নির্ভরশীল। এছাড়াও এতে রয়েছে ‘কাউন্টার ইলেকট্রনিক কাউন্টারমেজার’; যা শত্রুপক্ষের জ্যামিং বা অন্যান্য ব্যবস্থাকে প্রতিরোধ করতে পারে। উভয় ক্ষেপণাস্ত্রই ২০১৮ সালে প্রথম পরীক্ষা করা হয়।

‘গোকদোগান’ এবং ‘বজদোগান’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তুরস্কের বিমান বাহিনীর সক্ষমতাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করতে পারে। ‘বজদোগান’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত ‘এআইএম-৯ সাইডওয়াইন্ডার’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে প্রতিস্থাপিত করবে। অপরদিকে ‘গোকদোগান’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তুর্কিদেরকে নতুন সক্ষমতা দেবে। ২০১৪ সালে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ‘এফ-১৬’ বিমানগুলির জন্যে ১’শ ৫ কিঃমিঃ পাল্লার ১’শ ৪৫টা অত্যাধুনিক ‘এআইএম-১২০সি-৭ এমরাম’ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু তুরস্কের উপর অবরোধ দেয়ার ফলে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সরবরাহ করেনি ওয়াশিংটন। এর ফলশ্রুতি প্রায় আড়াই’শ ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমান থাকার পরেও এগুলির সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধই রয়ে গেছে। নিজস্ব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রথমবারের মতো তুরস্ককে আকাশে শক্তিশালী দেশগুলির ফাইটার বিমানকে মোকাবিলার সক্ষমতা প্রদান করবে। অবশ্য সেটাও ‘এফ-১৬’ বিমানের ব্যবহারের উপর তুরস্কের কতটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সেটার উপর নির্ভর করবে।

 
তুর্কি 'এফ-১৬' বিমানের ডানার নিচে 'গোকদোগান' এবং 'বজদোগান' ক্ষেপণাস্ত্র। তুরস্কের উপর অবরোধ দেয়ার ফলে দূরপাল্লার অত্যাধুনিক 'এমরাম' ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সরবরাহ করেনি ওয়াশিংটন। এর ফলশ্রুতি প্রায় আড়াই’শ ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমান থাকার পরেও এগুলির সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধই রয়ে গেছে। নিজস্ব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রথমবারের মতো তুরস্ককে আকাশে শক্তিশালী দেশগুলির ফাইটার বিমানকে মোকাবিলার সক্ষমতা প্রদান করবে। অবশ্য সেটাও ‘এফ-১৬’ বিমানের ব্যবহারের উপর তুরস্কের কতটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সেটার উপর নির্ভর করবে।

ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন ডেভেলপমেন্ট

তুর্কি কোম্পানি ‘কালে আরএন্ডডি’ ২০২১এর সেপ্টেম্বরে ঘোষণা দেয় যে, তারা তুরস্কের প্রথম নিজস্ব টারবোজেট ইঞ্জিন সরবরাহ করেছে। ‘ডিফেন্স নিউজ’ বলছে যে, ‘কেটিজে-৩২০০’ নামের এই ইঞ্জিন তুরস্কের দু’টা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ‘স্ট্যান্ডঅফ মিসাইল’ বা ‘সম’ এবং ‘আতমাকা’ জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত হবে। এই ইঞ্জিনের উৎপাদন শুরুর কনট্রাক্ট স্বাক্ষরিত হয় সেই বছরের অগাস্টে। ২০১২ সালে যখন এই ইঞ্জিনের ডেভেলপমেন্ট শুরু হয়, তখন একইসাথে ‘আতমাকা’ ক্ষেপণাস্ত্রের ডেভেলপমেন্টও চলছিল; যেকারণে এই ইঞ্জিন ‘আতমাকা’ ক্ষেপণাস্ত্রেও ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছিল। ফরাসি ‘টিআর-৪০’ ইঞ্জিনের মতো হলেও ‘কেটিজে-৩২০০’এর চাইতে ‘টিআর-৪০’ ইঞ্জিনে জ্বালানি খরচ আরও কিছুটা কম হয়। তবে ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুব বেশি একটা পার্থক্য হয় না। সবচাইতে বড় কথা হলো, ‘কেটিজে-৩২০০’ তৈরি হয়েছে তুরস্কের নিজস্ব সক্ষমতা ব্যবহার করে। এখানে বুঝতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ যে, এই ইঞ্জিনের সাথে তুরস্কে ডেভেলপ চলতে থাকা বিমানের ইঞ্জিনের কোন সম্পর্ক নেই। কারণ বিমানের ইঞ্জিনে মূল বিষয় হলো বহু ঘন্টা ধরে কোন সমস্যা ছাড়াই ইঞ্জিনের চলতে পারা। অপরদিকে ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিনকে চলতে হয় মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্যে।

এছাড়াও আরও টারবোজেট ইঞ্জিন ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে; যেগুলি ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহার করা যাবে। ‘তুবিতাক সেইজ’, ইঞ্জিন কোম্পানি ‘তুসাস ইঞ্জিন ইন্ডাস্ট্রিজ’ বা ‘টিইআই’ এবং ‘রকেটসান’এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে ‘টিজে-৩০০’ ইঞ্জিন। ২০২১এর এপ্রিলে ২’শ ৪০ মিঃমিঃ ব্যাসের আকৃতির মাঝে এই ইঞ্জিন ১ হাজার ৩’শ ৪২ নিউটন শক্তি উৎপাদন করে বিশ্ব রেকর্ড স্থাপন করে। ‘ডেইলি সাবাহ’ বলছে যে, ২’শ ৩০ থেকে ২’শ ৫০ মিঃমিঃ ব্যাসের ইঞ্জিনের শক্তি সাধারণতঃ হয় সর্বোচ্চ সাড়ে ১২’শ নিউটনের মতো। ‘টিজে-৩০০’ ইঞ্জিন শব্দের গতির ৯০ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারবে এবং ৫ হাজার ফুট উচ্চতায়ও উঠতে পারবে। এই ইঞ্জিন ডেভেলপমেন্টের সময় বলা হয়েছিল যে, এর মূল উদ্দেশ্য হবে মধ্যম পাল্লার জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহার করা।

তুর্কি ক্ষেপণাস্ত্রের ভবিষ্যৎ

গত ৩০শে জুন এক সংবাদ সন্মেলনে তুর্কি বিমান বাহিনী জানায় যে, তারা তাদের ভবিষ্যতের ‘টিএফ-এক্স’ পঞ্চম জেনারেশনের বিমান ডেভেলপ করার মাঝ দিয়ে সেই বিমানের ব্যবহারের জন্যে বিভিন্ন অস্ত্রও ডেভেলপ করছে। সেই আঙ্গিকে তুর্কি প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘রকেটসান’ নতুন একটা সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করছে। ‘আকবাবা’ (অর্থ শকুন) নামের এই ক্ষেপণাস্ত্র হলো ‘এন্টি র‍্যাডিয়েশন’ ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রের কাজ হলো শত্রুপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডারের থেকে আসা রাডার রশ্মিকে ব্যবহার করে সেই রাডারকে আক্রমণ করা। তবে ‘ডিফেন্স নিউজ’এর খবরে বলা হচ্ছে যে, ‘আকবাবা’ প্রকল্পটা তুরস্ক গোপন রেখেছে। কারণ ‘রকেটসান’এর ওয়েবসাইটে এই অস্ত্রের কোন উল্লেখ নেই। ‘রকেটসান’এর পক্ষ থেকে ৮ই জুলাই বলা হয় যে, জাতীয় নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তারা ‘আকবাবা’ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপারে কোন তথ্য দিতে পারবে না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন তুর্কি কর্মকর্তা ‘ডিফেন্স নিউজ’কে বলেন যে, নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা ‘এজিএম-৮৮’ ‘হাই স্পীড এন্টি র‍্যাডিয়েশন মিসাইল’ বা ‘হার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিস্থাপন করবে। বিমান বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বলেন যে, ‘আকবাবা’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবে বিমান বাহিনীর ‘১৫১তম “ব্রোঞ্জ” স্কোয়াড্রন’; যা ‘এফ-১৬সি/ডি’ বিমান অপারেট করে; এবং যার মূল কাজ হলো ‘হার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা। বর্তমানে তুরস্কের হাতে যে ১’শ ‘হার্ম’ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, সেগুলি ‘আকবাবা’ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে গেলে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে।

 
তুরস্কের ২'শ ৮০ কিঃমিঃ পাল্লার 'খান' বা 'বরা' ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ভূমিতে আঘাত করতে সক্ষম ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করার দিক দিয়ে তুরস্ক পশ্চিমা আইনের লঙ্ঘন করতে সাহস পাচ্ছে না; যেকারণে ৩’শ কিঃমিঃ পাল্লার বাইরে তারা যেতে পারছে না। তুর্কি ক্ষেপণাস্ত্রগুলি বেশ নিখুঁত নিশানায় টার্গেটে আঘাত হানতে পারলেও পাল্লা কম হওয়ায় এগুলির কৌশলগত গুরুত্ব বেশ কমই থাকবে।

২০২১ সালের নভেম্বরেই তুর্কি সরকারের শিল্প ও প্রযুক্তি মন্ত্রী মুস্তাফা ভারাঙ্ক সংসদীয় কমিটির সামনে বলেন যে, তুরস্কের প্রথম আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ‘গোকদোগান’ এবং ‘বজদোগান’ ইতোমধ্যেই প্রথমবারের মতো আকাশে উড়েছে। আর ২০২২ সালের মাঝেই ‘র‍্যামজেট’ ইঞ্জিনের ‘গোখান’ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম প্রোটোটাইপ তৈরি হয়ে হবে। তুর্কি প্রতিরক্ষা বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘তুরডেফ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ‘র‍্যামজেট’ ইঞ্জিন নিয়ে তুর্কি প্রতিরক্ষা গবেষণা ইন্সটিটিউট ‘তুবিতাক সেইজ’ আরও আগ থেকেই কাজ করছে। বিশেষ করে লিকুইড ফুয়েল ব্যবহার করা ‘র‍্যামজেট’ ইঞ্জিনের দিক থেকে তারা সকলের চাইতে এগিয়ে থাকতে চাইছে।

এবছরের মার্চে তুর্কি মিডিয়া ‘সাভুনমা সানায়ি এসটি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ‘তুবিতাক সেইজ’এর ডিরেক্টর গুরকান ওকুমুস জানান যে, তার সংস্থা বর্তমানে একটা ‘র‍্যামজেট’ ইঞ্জিনের ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কাজ করছে। এবং ২০২২ সালের মাঝেই এই ইঞ্জিন জনসন্মুখে আনা হবে। এছাড়াও তারা আরেকটা ‘স্ক্র্যামজেট’ ইঞ্জিনের ধারণা নিয়ে প্রাথমিকভাবে কাজ করছেন। তারা একটা ‘ট্রাইসনিক উইন্ড টানেল’ তৈরি করছেন; যা ২০২৪ সালের মাঝে নির্মিত হবে। এই টানেলে ‘সাবসোনিক’, ‘ট্রানসোনিক’ এবং ‘সুপারসনিক’ গতির যন্ত্র পরীক্ষা করা যাবে। ওকুমুস জানাচ্ছেন যে, এই প্রচেষ্টার ফলাফলস্বরূপ তারা উচ্চ সুপারসনিক এবং হাইপারসনিক সিস্টেমগুলি নিয়ে কাজ করবেন। এর জন্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তাদের হাতে চলে আসছে।

ড্রোনগুলির জন্যে তৈরি করা ছোট্ট ‘ম্যাম-সি’ ও ‘ম্যাম-এল’ লেজার গাইডেড বোমা থেকে শুরু করে মধ্যম পাল্লার ‘সম’ ও ‘আতমাকা’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘খান’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্ককে সামরিক শিল্পের ক্ষেত্রে সন্মান এনে দিয়েছে। ‘রকেটসান’ এক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা নিলেও ‘আসেলসান’ ও ‘তুবিতাক সেইজ’এর ইলেকট্রনিক্স এবং ‘কালে আরএন্ডডি’র টারবোজেট ইঞ্জিনের কথা উল্লেখ করতেই হবে। তবে এখনও কিছু ক্ষেত্রে তুর্কিরা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চাইতে পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ভূমিতে আঘাত করতে সক্ষম ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করার দিক দিয়ে তুরস্ক পশ্চিমা আইনের লঙ্ঘন করতে সাহস পাচ্ছে না; যেকারণে ৩’শ কিঃমিঃ পাল্লার বাইরে তারা যেতে পারছে না। তুর্কি ক্ষেপণাস্ত্রগুলি বেশ নিখুঁত নিশানায় টার্গেটে আঘাত হানতে পারলেও পাল্লা কম হওয়ায় এগুলির কৌশলগত গুরুত্ব বেশ কমই থাকবে। এছাড়াও আকাশ প্রতিরক্ষায় তুর্কিরা এখনও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের দিক দিয়ে নতুন খেলোয়াড়। এধরণের ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে যখন প্রশ্ন উঠবে যে, তুরস্ক শত্রুর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিজেকে বাঁচাতে কতটা সক্ষম। তুরস্কের সামরিক শিল্প এখন এমন একটা অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে পরবর্তী উচ্চতায় যেতে হলে বাইরে থেকে কিছু প্রযুক্তি তাকে যোগাড় করতে হবে, এবং পশ্চিমা আইনগুলিকে বাইপাস করার জন্যে ছুতো খুঁজতে হবে। তবে এর জন্যে যে রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র প্রয়োজন, তা তুরস্ক কতটা অর্জন করতে পারবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।



সূত্রঃ
‘Turkey’s New UCAV AKINCI engages sea target for the 1st time’ in Naval News, 24 April 2022
‘SOM Air-to-Surface Cruise Missile’ in Air Force Technology, 24 March 2015 (https://www.airforce-technology.com/projects/som-air-to-surface-cruise-missile/)
‘Turkish firm unveils new cruise missile Cakir’ in Anadolu Agency, 31 March 2022
‘Turkey’s own Atmaca missile to replace Harpoons on its Navy ships’ in Defense News, 10 February 2022
‘Turkey successfully tests its future air-to-air missile Gokdogan’ in Air Recognition, 11 July 2022
‘Türkiye successfully tests air-to-air missile Gokdogan with radar seeker’ in TRT World, 11 July 2022
‘Korkut Self-propelled Short-Range Air Defense 35mm Gun System’ in Army Recognition, 15 August 2020
‘Turkey Successfully Test Fires HISAR O+ Mid-Range Missile’ in The Defense Post, 28 December 2021
‘HISAR-O HISAR-O+ Aselsan – Roketsan’ in Army Recognition, 21 January 2022
‘Turkiye test-fires SIPER area air defence missile’ in Naval News, 28 August 2022
‘SIPER Air Defence Missile System About to Enter Inventory’ in C4Defence (https://www.c4defence.com/en/siper-air-defence-missile-system-about-to-enter-inventory/)
‘Long Range Air and Missile Defense System – SİPER’ (https://www.aselsan.com.tr/en/capabilities/air-and-missile-defense-systems/air-and-missile-defense-systems/long-range-air-and-missile-defense-system-siper)
‘Turkey successfully test-fires air defense missile Siper, rival to S-400’ in Daily Sabah, 06 November 2021
‘Turkey’s local air defense system hits target in longest range test’ in Daily Sabah, 09 March 2021
‘Sungur Air Defence Missile System, Turkey’ in Army Technology, 05 August 2022
‘Turkey’s Roketsan develops missile to replace Raytheon weapon’ in Defense News, 09 July 2021
‘Turkey Targets Hypersonic, Supersonic Missile Development’ in The Defense Post, 24 March 2022
‘Ramjet Gökhan Prototype Will Be Available Soon’ in TurDef, 03 November 2021 (https://www.turdef.com/Article/ramjet-gokhan-prototype-will-be-available-soon/840)
‘Turkey’s 1st local medium-range missile engine breaks world record’ in Daily Sabah, 16 April 2021
‘Firing Tests of the TÜBİTAK SAGE KUZGUN Guided Modular Munition Family Will Start in the Last Quarter of 2021!’ in Defence Turkey, October 2021
‘Turkish science-tech council showcases new UAV missiles’ in Anadolu Agency, 19 August 2021
‘Turkish firm Kale delivers homemade turbojet engine for missiles’ in Defense News, 21 September 2021
‘Turkey’s Bora missile saw combat debut: What next?’ by Dr. Can Kasapoglu, in Anadolu Agency, 16 June 2019
The KHAN Missile , provides accurate and effective fire power on strategic targets in the battlefield. (https://www.roketsan.com.tr/en/products/khan-missile)
TRLG-122 Laser Guided Missile (https://www.roketsan.com.tr/en/products/trlg-122-laser-guided-missile)
TRLG-230 Laser Guided Missile (https://www.roketsan.com.tr/en/products/trlg-230-laser-guided-missile)
TRG-230 Guided Missile (https://www.roketsan.com.tr/en/products/trg-230-guided-missile)
TRG-300 Guided Missile (https://www.roketsan.com.tr/en/products/trg-300-guided-missile)
MAM-T Munition (https://www.roketsan.com.tr/en/products/mam-t-munition)
OMTAS Medium-Range Anti-Tank Missile System (https://www.roketsan.com.tr/en/products/omtas-medium-range-anti-tank-missile-system)
L-UMTAS Laser Guided Long-Range Anti-Tank Missile System (https://www.roketsan.com.tr/en/products/l-umtas-laser-guided-long-range-anti-tank-missile-system)
UMTAS Long-Range Anti-Tank Missile System (https://www.roketsan.com.tr/en/products/umtas-long-range-anti-tank-missile-system)
TEBER Guidance Kit (https://www.roketsan.com.tr/en/products/teber-guidance-kit)
SOM Stand-Off Missile (https://www.roketsan.com.tr/en/products/som-stand-missile)
MAM-L Smart Micro Munition (https://www.roketsan.com.tr/en/products/mam-l-smart-micro-munition)
MAM-C Smart Micro Munition (https://www.roketsan.com.tr/en/products/mam-c-smart-micro-munition)
HİSAR Air Defence Missiles (https://www.roketsan.com.tr/en/products/hisar-air-defence-missiles)
‘Turkey starts mass production of miniature drone missile’ in Defense News, 07 June 2022
‘Bozok: The Bayraktar TB2 Drone Has a New Mini Missile’ in 1945, 09 June 2022 (https://www.19fortyfive.com/2022/06/bozok-the-bayraktar-tb2-drone-has-a-new-mini-missile/)
‘New generation AMRAAM to boost Turkey’s air firepower’ in Hurriyet Daily News, 10 September 2014
‘Why the Turkish Air Force Still Has No Modern Air to Air Missiles: 250 F-16s Can’t Fire Far Enough’ in Military Watch, 03 February 2022 (https://militarywatchmagazine.com/article/why-the-turkish-air-force-still-has-no-modern-air-to-air-missiles-250-f-16s-can-t-fire-far-enough)
‘Turkish forces add domestically sourced smart bomb mod to arsenal’ in Daily Sabah, 24 June 2021
Precision Guidance Kit (HGK) (https://www.sage.tubitak.gov.tr/en/urunler/precision-guidance-kit-hgk)
‘Turkey's domestic SARB-83 penetrator bomb ready for mass production’ in Daily Sabah, 06 July 2020
Penetrator Bomb (NEB) (https://www.sage.tubitak.gov.tr/en/urunler/penetrator-bomb-neb)
Wing Assisted Guidance Kit (KGK) (https://www.sage.tubitak.gov.tr/en/urunler/wing-assisted-guidance-kit-kgk)