Monday, 31 January 2022

পশ্চিম আফ্রিকার বুরকিনা ফাসোতে অভ্যুত্থান … ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ফলাফল

৩১শে জানুয়ারি ২০২২

বুরকিনা ফাসোর রাস্তায় অভ্যুত্থান সমর্থনকারীদের হাতে লেঃ কর্নেল দামিবার পাশে মালির অভ্যুত্থানকারী নেতার ছবি। পশ্চিম আফ্রিকার প্রাক্তন ফরাসি উপনিবেশগুলিতে তিন অভ্যুত্থানের তিন নেতা বেশ ভালোই জনসমর্থন পাচ্ছেন। সেখানকার সেনা অফিসাররা একসময় শুধুমাত্র ফ্রান্সে ট্রেনিংপ্রাপ্ত হলেও তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও ট্রেনিং পেয়েছে। ফলশ্রুতিতে সামরিক বাহিনীগুলি শুধুমাত্র ফ্রান্সের প্রভাবের মাঝে আর নেই। এর মাঝে সেখানে জড়িয়েছে রাশিয়া। রুশরা পশ্চিম আফ্রিকায় রাজনৈতিক প্রভাব না বাড়ালেও সামরিক অভ্যুত্থানের মতোই তারাও ফ্রান্সকে সরিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

 
গত ২৪শে জানুয়ারি পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোতে সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। বুরকিনা ফাসো এক বছরের মাঝে পশ্চিম আফ্রিকার তৃতীয় দেশ যেখানে অভ্যুত্থান সংঘটিত হলো। অভ্যুত্থানের নেতা লেঃ কর্নেল পল হেনরি দামিবা তার প্রথম ভাষণে বলেন যে, দেশের প্রেসিডেন্ট রোশ কাবোরে জঙ্গিবাদ সম্পর্কিত সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা ক্ষমতা নিয়েছেন। সহিংসতায় সেখানে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। জঙ্গিবাদ দমনকে শীর্ষ লক্ষ্য আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন যে, তার সরকার গ্রামাঞ্চল পুনরুদ্ধার করবে এবং ১৫ লক্ষ বাস্তুচ্যুত মানুষকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনবে। ‘সঠিক সময়ে’ তারা দেশকে সাংবিধানিক শাসনে ফেরত নিয়ে আসবেন। সংস্কারে সম্মতি আদায়ের জন্যে সমাজের বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বের সাথে আলোচনা করবেন বলে জানান তিনি। একইসাথে তার দেশের আগের চাইতে আরও বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা দরকার উল্লেখ করে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুরকিনা ফাসোর সংকট কাটাতে সমর্থন দেয়ার আহ্বান জানান। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, কর্নেল দামিবা তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলতে কোন কোন দেশ বুঝিয়েছেন, তা বলেননি। এই ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ কেননা জঙ্গিবাদ দমনে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিকে সহায়তা দানে প্রাক্তন উপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের সাথে রাশিয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালি, নিজের এবং বুরকিনা ফাসোতে ফ্রান্সের কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। অত্র অঞ্চলে ফরাসি সামরিক উপস্থিতি জনগণের অপছন্দ। ইতোমধ্যেই ফরাসিরা মালি থেকে তাদের সেনা সরিয়ে নিচ্ছে; যাদের শূণ্যস্থান পূরণ করছে রাশিয়া। রুশ ভাড়াটে সেনাদের একটা অংশ বুরকিনা ফাসোর অভ্যুত্থান নেতাদের নিরাপত্তা দেয়ার অফার দিয়েছে। ‘বিবিসি’র বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, প্রতিবেশী মালিতে যেমন সামরিক অভ্যুত্থানের পর আঞ্চলিক জোটের সাথে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, বুরকিনা ফাসোর ক্ষেত্রেও সেটারই সম্ভাবনা রয়েছে।

‘বিবিসি’ বলছে যে, অভ্যুত্থান নেতা কর্নেল দামিবা ফ্রান্সের সামরিক একাডেমি থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং ফ্রান্স থেকে অপরাধ বিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। এছাড়াও মার্কিন সামরিক বাহিনীর আফ্রিকা কমান্ডের বরাত দিয়ে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে যে, তিনি ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মাঝে বিভিন্ন মার্কিন সামরিক কোর্স এবং মহড়ায় অংশ নিয়েছেন। তিনি এতদিন জঙ্গিবাদ দমনে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন; এবং সেটার উপর তিনি গতবছর একটা বইও লিখেছেন। অভ্যুত্থানের দু’মাসেরও কম সময় আগে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট কাবোরে দামিবাকে রাজধানী উয়াগাডুগুসহ উত্তরাঞ্চলে জঙ্গিবাদ দমনে নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। গত নভেম্বরে নিরাপত্তা বাহিনীর ৫০ জন সদস্য নিহত হবার পর প্রেসিডেন্টের সেই সিদ্ধান্তকে অনেকেই সামরিক সদস্যদেরকে ঠান্ডা রাখার একটা প্রয়াস হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। সামরিক বাহিনীর এক সূত্র বলছে যে, কর্নেল দামিবা মনে করেন না যে, জঙ্গিবাদের সমস্যা শুধুমাত্র সামরিক অপারেশনের মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব।

পশ্চিম আফ্রিকার প্রাক্তন ফরাসি উপনিবেশগুলিতে তিন অভ্যুত্থানের তিন নেতা বেশ ভালোই জনসমর্থন পাচ্ছেন। বুরকিনা ফাসোর রাজধানীতেও শতশত মানুষ অভ্যুত্থানের পক্ষে আনন্দ করেছে। ‘এএফপি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বুরকিনা ফাসোর রাজধানী উয়াগাডুগুর এক শিক্ষক জুলিয়েন ত্রাওরে বলেন যে, এটা তাদের চোখে কোন অভ্যুত্থান নয়। এটা হলো অক্ষম রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাত থেকে দেশের স্বাধীন হওয়া। উয়াগাডুগুর রাস্তায় কেউ কেউ রুশ পতাকা নিয়ে অভ্যুত্থানকারীদের পক্ষে উল্লাস করেছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, পার্শ্ববর্তী মালিতে রুশ ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর ভাড়াটে সেনারা নিরাপত্তা দিচ্ছে এবং সেখানেও অনেকেই রাস্তায় রাশিয়ার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। ১৫টা ইউরোপিয় দেশ এবং কানাডা ডিসেম্বরে এক যৌথ বিবৃতিতে এব্যাপারে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করে।

 


২৮শে জানুয়ারি পশ্চিম আফ্রিকার জোট ‘ইকনমিক কমিউনিটি অব ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেটস’ বা ‘একোওয়াস’ তৃতীয় দেশ হিসেবে বুরকিনা ফাসোর সদস্যপদ স্থগিত করে। জোটের জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকে গৃহবন্দী ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্টকে অবিলম্বে ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়াও জোটের পক্ষ থেকে বুরকিনা ফাসোর অভ্যুত্থান নেতাদের সাথে আলোচনা করতে একটা প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। জোটের বর্তমান চেয়ারম্যান ঘানার প্রেসিডেন্ট নানা আফুকো আদ্দো বলেন যে, এই অভ্যুত্থান গণতান্ত্রিক চিন্তার সাথে যায় না; এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের দিকে চেয়ে আছে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যে। বার্তাসংস্থা ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, বুরকিনা ফাসোর উপর আরও কোন অবরোধ দেয়া হবে কিনা, সেব্যাপারে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। মালির উপর ইতোমধ্যেই বিমানের ফ্লাইট বন্ধ এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা ছাড়াও বিভিন্ন অবরোধ দিয়েছে ‘একোওয়াস’। তবে ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, মালি এবং গিনির উপর অবরোধ সেখানকার বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারেনি। ‘একোওয়াস’ মালির অভ্যুত্থানকারীদের সাথে ১৮ মাসের মাঝে নির্বাচন দেয়ার চুক্তি করেছিল; যা বাস্তবায়িত না হওয়ায় অনেকেই ‘একোওয়াস’এর সমালোচনা করেছেন। মালির সামরিক নেতৃত্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতির বরাত দিয়ে চার বছর পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছে। বুরকিনা ফাসোর ব্যাপারেও ভিন্ন কিছু ঘটার সম্ভাবনা কম দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

সামরিক অভ্যুত্থানের পরেও ফুটবল খেলার জন্যেই আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে বুরকিনা ফাসোর নাম আসছে। এ থেকেই বোঝা যায় যে, মিডিয়ার কাছে আফ্রিকার অভ্যুত্থানগুলি অনেকটা গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল তো ইতোমধ্যেই বলেছেন যে, নতুন বছরে সামরিক অভ্যুত্থান ছোঁয়াচে রোগের মতো ছড়াতে পারে! ১৭ মাসের মাঝে পশ্চিম আফ্রিকায় চতুর্থ অভ্যুত্থানের পটভূমি মূলতঃ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। প্রাক্তন ফরাসি উপনিবেশের এলাকাগুলিতে ফ্রান্সের প্রভাব প্রতিদিনই কমছে। জঙ্গিবাদ দমনে ফরাসিরা প্রথমে মালিতে সেনা মোতায়েন করলেও সহিংসতা এখন পুরো পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছে; এবং যুদ্ধ বন্ধের কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল থেকে ফরাসি সেনা সরিয়ে নেয়ার জন্যে চাপ সৃষ্টি হওয়ায় সেই শূণ্যস্থান পূরণের প্রতিযোগিতা চলছে। সেখানকার সেনা অফিসাররা একসময় শুধুমাত্র ফ্রান্সে ট্রেনিংপ্রাপ্ত হলেও তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও ট্রেনিং পেয়েছে। ফলশ্রুতিতে সামরিক বাহিনীগুলি শুধুমাত্র ফ্রান্সের প্রভাবের মাঝে আর নেই। এর মাঝে সেখানে জড়িয়েছে রাশিয়া। রুশরা পশ্চিম আফ্রিকায় রাজনৈতিক প্রভাব না বাড়ালেও সামরিক অভ্যুত্থানের মতোই তারাও ফ্রান্সকে সরিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

Sunday, 30 January 2022

ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলি বিভক্ত কেন?

৩১শে জানুয়ারি ২০২২

কানাডিয় সেনাসদস্য ইউক্রেনিয় সেনাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যখন পশ্চিমা আদর্শকে কাবুল বিমান বন্দরে রেখে এসেছে, তখন ইউক্রেনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র যে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না, সেটাই স্বাভাবিক। ব্রিটেনও বলছে যে, তারাও ইউক্রেনে সরাসরি যুদ্ধ করবে না। তথাপি ইউক্রেন সীমান্তে পশ্চিমা আদর্শকে রক্ষার দায়িত্ব কেবল ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার ব্রিটেন এবং কানাডাকেই যেন নিতে হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেন্সকি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনকে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে মানা করছেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে সামরিক সহায়তা দেয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ ইউক্রেনকে রক্ষা নয়, বরং ইউক্রেনের ধ্বংসস্তূপের মাঝেই পশ্চিমা আদর্শকে রক্ষার ‘পবিত্র’ দায়িত্ব পালন করবে।

পূর্ব ইউরোপে সামরিক শক্তি মোতায়েনের ঘোষণা দেয়ার পরদিন ৩০শে জানুয়ারি ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব লিজ ট্রাস ‘বিবিসি’কে বলেন যে, তার দেশ ইউক্রেনে হামলা হলে রাশিয়ার উপর অবরোধের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে; যার অধীনে বিভিন্ন রুশ আর্থিক ও জ্বালানি কোম্পানিও থাকবে। রাশিয়ার আগ্রাসনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মত দেন। তিনি বলেন যে, একারণেই রুশ হামলা মোকাবিলায় কূটনীতির পাশাপাশি ডিটারেন্স তৈরি করার জন্যে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। ‘স্কাই নিউজ’এর সাথে আরেক সাক্ষাতে তিনি ব্রিটেনে রুশ বিলিয়নায়ারদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন রুশ হামলার ব্যাপারে যতটা নিশ্চিত, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সকি ততটা নন। জেলেন্সকির কথায়, রাশিয়া ‘মনস্তাত্বিক চাপ’ প্রয়োগের চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি পশ্চিমা দেশগুলিকে আতঙ্ক ছড়াতে মানা করেন; কারণ তা ইউক্রেনের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অপরদিকে ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্র ফ্রান্স, জার্মানি এবং নরওয়ে মনে করছে যে, কূটনীতির মাধ্যমে একটা ছাড় দেয়ার পদ্ধতি বের হবেই। একইদিনে রুশ নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান নিকোলাই পাত্রুশেভ ইউক্রেনে রুশ হামলার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়ে বলেন যে, রাশিয়া যুদ্ধ চায় না। রুশ হামলার সম্ভাবনার মুখে পশ্চিমা দেশগুলির মাঝে মতবিরোধ এখন পরিষ্কার। পশ্চিমাদের মাঝে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনই ইউক্রেনে তাদের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেবার নির্দেশনা দিয়েছে।

ন্যাটোর মাঝে ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়া ব্রিটেনের অবস্থান বাকি ইউরোপ থেকে পুরোপুরি আলাদা। এক সপ্তাহের মাঝেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে কথা বলবেন বলে আশা করা হচ্ছে; এবং তিনি অত্র অঞ্চলের দেশগুলিতে ভ্রমণ করবেন বলেও ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ট্রাসও রাশিয়া এবং ইউক্রেন সফর করবেন। ব্রিটিশ সরকার বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘প্রিন্স অব ওয়েলস’কে স্বল্প সময়ের নোটিশে মোতায়েন করার জন্যে প্রস্তুত রেখেছে। তবে পররাষ্ট্র সচিব ট্রাস বলেছেন যে, ব্রিটিশ সেনাদের রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তারা হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের ২০ হাজার সেনাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে, এবং দেশটার নৌবাহিনীকে সহায়তা দিয়েছে। এই মুহুর্তে পূর্ব ইউরোপের এস্তোনিয়াতে ৯’শ ব্রিটিশ সেনা, পোল্যান্ডে দেড়’শ এবং ইউক্রেনে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্যে ১’শ সেনা মোতায়েন রয়েছে। বল্টিক রাষ্ট্র এস্তোনিয়াতে আর্টিলারি রকেট মোতায়েন ছাড়াও কৃষ্ণ সাগরে দু’টা যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে ব্রিটেন। রোমানিয়া এবং বুলগেরিয়ার আকাশসীমার নিরাপত্তা দিতে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জনসন বলছেন যে, পূর্ব ইউরোপে অতিরিক্ত সামরিক শক্তি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নরডিক এবং বল্টিকে বন্ধু রাষ্ট্রগুলির প্রতি ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতি রাখার লক্ষ্যে।

ব্রিটেনের মতো একই ধারায় রয়েছে কানাডা। উভয় দেশই আন্তর্জাতিক আইনকে সমুন্নত রাখতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইছে। অর্থাৎ ব্রিটেনের মতোই, জাতীয় স্বার্থ নয়, বরং পশ্চিমা আদর্শকে সমুন্নত রাখাকেই কানাডা প্রাধান্য দিচ্ছে। ইউরোপ বিভাজিত হলেও কানাডায় ইউক্রেনের পক্ষে যথেষ্ট সমর্থন রয়েছে। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার অন্তর্গত কানাডার জাস্টিন ট্রুডোর লিবারাল সরকার ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা না করলেও প্রশিক্ষণ সহায়তা দিচ্ছে। ২৬শে জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো ঘোষণা দেন যে, ইউক্রেনে ‘অপারেশন ইউনিফাইয়ার’এর অধীনে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ২’শ কানাডিয় সেনার সাথে আরও ৬০ জন অতি শীঘ্রই যোগ দিচ্ছে। তিনি তার মন্ত্রীসভার সাথে বৈঠকের পর বলেন যে, সৈন্যসংখ্যা ৪’শ পর্যন্ত যেতে পারে। কানাডার সরকার ইউক্রেনকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, মেটাল ডিটেক্টর, থার্মাল বাইনোকুলার, লেজার রেঞ্জ ফাইন্ডার, সার্ভেইল্যান্স প্রযুক্তি এবং মেডিক্যাল সরঞ্জাম দিচ্ছে। এছাড়াও কানাডার ইলেকট্রনিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘কমিউনিকেশন্স সিকিউরিটি এস্টাবলিশমেন্ট’ ইউক্রেনের ইলেকট্রনিক এবং সাইবার নিরাপত্তায় সহায়তা দিচ্ছে। এই সহায়তাগুলির মূল্যমান প্রায় ২’শ ৬৬ মিলিয়ন ডলার। এছাড়াও কানাডা ইউক্রেনকে ৩৯ মিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তা এবং ৯৪ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দেয়া ছাড়াও কূটনৈতিক সহায়তা বৃদ্ধি করেছে। কানাডার ‘সিবিসি নিউজ’ বলছে যে, এ পর্যন্ত ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন ছাড়াও ছোট্ট বল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়া অস্ত্র সহায়তা দিয়েছে। বিরোধী কনজারভেটিভ দল ইউক্রেনকে অস্ত্র দেয়ার জন্যে সরকারের উপর চাপ দিচ্ছে। তারা আরও চাইছেন যে, ২০১৪ সাল থেকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের সরকার ইউক্রেনকে স্যাটেলাইট ইমেজ দিয়ে যে সহায়তা দিচ্ছিলো, তা আবারও চালু করা হোক। কানাডায় বসবাসরত ১৩ লক্ষ ইউক্রেনিয়ানের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ‘ইউক্রেনিয়ান ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস’ও ইউক্রেনকে অস্ত্র দেয়ার জন্যে লবিং করছে।

ইউক্রেন উত্তেজনার মাঝে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সাথে কথা বলবেন। উদ্দেশ্য হলো, রাশিয়ার বিকল্প হিসেবে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র গ্যাসের জন্যে রাশিয়ার উপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে। জার্মানি রুশ গ্যাসের উপর সবচাইতে বেশি নির্ভরশীল থাকায় তারা ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধের কথা বললেও ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেবার পক্ষপাতি নয়। যেখানে ব্রিটেন এবং কানাডা পশ্চিমা আদর্শিক লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিচ্ছে, সেখানে জার্মানি তার জাতীয় স্বার্থকে জ্বলাঞ্জলি দিয়ে এগুতে চাইছে না। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সাথে এক সাক্ষাতে ন্যাটোর প্রত্যুত্তরকে ‘আদর্শ দ্বারা প্ররোচিত’ বলে আখ্যা দেন। ল্যাভরভ মূলতঃ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং কানাডার আদর্শিক অবস্থানকে লক্ষ্য করেই কথাগুলি বলেছেন। শুধুমাত্র পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার সীমান্তে ছোট্ট দেশগুলিই এদের সাথে রয়েছে। ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো বড় ইউরোপিয় শক্তিরা সরাসরি নিজেদেরকে জড়াতে নারাজ। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যখন পশ্চিমা আদর্শকে কাবুল বিমান বন্দরে রেখে এসেছে, তখন ইউক্রেনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র যে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না, সেটাই স্বাভাবিক। ব্রিটেনও বলছে যে, তারাও ইউক্রেনে সরাসরি যুদ্ধ করবে না। তথাপি ইউক্রেন সীমান্তে পশ্চিমা আদর্শকে রক্ষার দায়িত্ব কেবল ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার ব্রিটেন এবং কানাডাকেই যেন নিতে হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেন্সকি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনকে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে মানা করছেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে সামরিক সহায়তা দেয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ ইউক্রেনকে রক্ষা নয়, বরং ইউক্রেনের ধ্বংসস্তূপের মাঝেই পশ্চিমা আদর্শকে রক্ষার ‘পবিত্র’ দায়িত্ব পালন করবে।

Wednesday, 26 January 2022

ইউক্রেন নিয়ে যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী?

২৬শে জানুয়ারি ২০২২

জানুয়ারি ২০২২। ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়ায় রুশ সৈন্য। ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলি থেকে দূরে রাখতেই হুমকি দিচ্ছেন, ইউক্রেনকে দখল করতে নয়; কারণ পশ্চিমা ঘেঁষা ইউক্রেনই রাশিয়ার জন্যে হুমকি।

 
ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর প্রতিমন্ত্রী জেইমস হিপ্পে ২৫শে জানুয়ারি ‘দ্যা সান’ পত্রিকার এক লেখায় বলেন যে, ব্রিটিশ সরকারের কাছে ইন্টেলিজেন্স রয়েছে যে, রুশ সামরিক বাহিনীর সাথে যুক্ত বহু ব্যক্তি এই মুহুর্তে ইউক্রেনের ভেতরে অবস্থান করছে। এর আগে ২২শে জানুয়ারি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস বলেন যে, ক্রেমলিন ইউক্রেনে একটা রুশ সমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যেই ইউক্রেনের উপর রুশ হামলার আশংকায় পশ্চিমা দেশগুলি ইউক্রেনকে প্রচুর অস্ত্র সরবরাহ করছে। এই অস্ত্রের মাঝে রয়েছে ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, গ্রেনেড লঞ্চার, মেশিন গান, গোলাবারুদ, ইত্যাদি। এগুলি রুশ সামরিক আগ্রাসন থামাতে না পারলেও রাশিয়ার জন্যে সামরিক অপারেশনকে আরও কঠিন করে ফেলবে। রুশ হুমকির প্রত্যুত্তরে ন্যাটো সদস্যদেশগুলি বল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়াতে যুদ্ধবিমান মোতায়েন ছাড়াও রোমানিয়াতে সৈন্য বৃদ্ধি এবং কৃষ্ণ সাগরে যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ করছে। তবে রাশিয়াও তার সামরিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি করে চলেছে। ইউক্রেনের পূর্ব সীমানায় ১ লক্ষ সেনা মোতায়েন ছাড়াও উত্তরের সীমানায় বেলারুশের সাথে যৌথ মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেনে সাইবার হামলার জন্যেও রুশদেরকে দায়ী করা হচ্ছে। যুদ্ধের শংকায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের পরিবারবর্গকে সরিয়ে নেবার আদেশ দেয়া হয়েছে।

ইউক্রেন ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া কে কিভাবে দেখছে?

মার্কিন মিডিয়া ‘সিবিএস’এর সাথে এক সাক্ষাতে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিংকেন বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই বলে আসছে যে, যদি রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসান চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ একত্রে দ্রুত এবং মারাত্মক প্রত্যুত্তর দেবে। তিনি আরও বলেন যে, ইউক্রেন বা অন্য কোন দেশে সেনা না পাঠিয়ে রাশিয়া যদি ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’, সাইবার হামলা বা সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করে, তাহলেও তিনি আত্মবিশ্বাসী যে ইউরোপিয় মিত্রদেরকে একত্রিত করে দ্রুত প্রত্ত্যুত্তর দেবেন তারা। তবে এই প্রত্যুত্তরের মাঝে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকবে কিনা, সেব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। ব্লিংকেন অর্থনৈতিক অবরোধ ছাড়াও ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেয়া এবং ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করার কথা বলেন। তিনি ‘সিএনএন’কে বলেন যে, ন্যাটো বাস্তবসম্মত এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবে; যার মাঝে সামরিক অপশনও থাকবে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার কি স্বার্থ রয়েছে? রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনের গুরুত্বই বা কতটুকু? যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ভার্চুয়াল টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ম্যাককুইস্টিয়ন টিভি’র সাথে এক সাক্ষাতে ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, সপ্তদশ শতাব্দীর পর থেকে পশ্চিম থেকে রাশিয়া চারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে; দক্ষিণ থেকে আক্রমণ হয়েছে দু’বার। রাশিয়ার অস্তিত্ব নির্ভর করছে এই সীমানাগুলির উপর। এই সীমানাগুলিকে শক্তিশালী করতে রাশিয়া পশ্চিমে পোল্যান্ড ও বেলারুশের সমতলভূমি, আর দক্ষিণে ককেশাস এলাকা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার নিরাপত্তার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে মূলতঃ ইউক্রেন। ইউক্রেন যদি পশ্চিমা ঘেঁষা না হতো, তাহলে রাশিয়ার কোন সমস্যা ছিল না। ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া এব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছিলোনা বলেই তারা ইউক্রেনে জড়িয়েছে।

 
সপ্তদশ শতাব্দীর পর থেকে পশ্চিম থেকে রাশিয়া চারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে; দক্ষিণ থেকে আক্রমণ হয়েছে দু’বার। রাশিয়ার অস্তিত্ব নির্ভর করছে এই সীমানাগুলির উপর। এই সীমানাগুলিকে শক্তিশালী করতে রাশিয়া পশ্চিমে পোল্যান্ড ও বেলারুশের সমতলভূমি, আর দক্ষিণে ককেশাস এলাকা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার নিরাপত্তার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে মূলতঃ ইউক্রেন। ইউক্রেন যদি পশ্চিমা ঘেঁষা না হতো, তাহলে রাশিয়ার কোন সমস্যা ছিল না। ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া এব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছিলোনা বলেই তারা ইউক্রেনে জড়িয়েছে।

কে কি করতে পারে?

মার্কিন থিংকট্যাংক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খুব সম্ভবতঃ তার কমান্ডারদের কাছ থেকে ইউক্রেনে হামলার পরিকল্পনা চেয়েছেন। তবে এর মানে এই নয় যে, তিনি হামলা করবেন। তিনি তার অপশনগুলি খোলা রাখতে চাইছেন। তবে কূটনৈতিক দিক থেকে সফলতা না আসলে হয়তো উত্তেজনা আরও বাড়বে। তিনি বলছেন যে, তিনি মনে করতে পারেন না যে, সাম্প্রতিক সময়ে কবে কোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মার্কিন রাজনীতিবিদেরা এতটা একমত হতে পেরেছিল। রুশ দাবিগুলি মার্কিন রাজনৈতিক মতামতকে একত্রিত করেছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, মার্কিন নীতি সফল হবে। কারণ ইউক্রেনের ব্যাপারে রাশিয়া যতটা চিন্তিত, মার্কিনীরা ততটা চিন্তিত নয়। ইউরোপের উপর রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রভাব যতটা রয়েছে, তার কিছুই যুক্তরাষ্ট্রের উপর নেই। এর ফলশ্রুতিতে ইউক্রেনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে খুব কম বাধাই রয়েছে। তবে সারা বিশ্বের ‘পুলিশম্যান’ থাকার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে অনীহা দেখিয়েছে, তাতে মার্কিনীদের নেতৃত্বে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটা কোয়ালিশন তৈরি করা কঠিন হবে। তিনি পরিষ্কার করে দেন যে, যদিও অনেকেই সোশাল মিডিয়াতে ‘স্ট্যান্ড উইথ ইউক্রেন’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছে, তথাপি এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে রক্ষা করতে যুদ্ধ করবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলি ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু সরাসরি ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার যুদ্ধ, বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবার কোন সম্ভাবনা নেই বলে তিনি বলেন।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’এর এক লেখায় জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, রাশিয়া ইউক্রেনের উপর সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিয়েও হামলা না করে বরং আলোচনা করতে চাইছে। রাশিয়া দাবি করছে যে, ন্যাটো ইউক্রেনকে যেন কখনোই সদস্য হিসেবে গ্রহণ না করে; এবং ন্যাটো যেন রাশিয়ার সীমানায় অস্ত্র মোতায়েন নিয়ন্ত্রণ করে। রাশিয়া এমন একটা দাবি করেছে, যা তারা খুব ভালো করেই জানে যে, যুক্তরাষ্ট্র সেব্যাপারে কিছুতেই রাজি হবে না। কারণ এতে করে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরিভাবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। চাপের মুখে রাশিয়ার কাছে নতি স্বীকার করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একেবারেই সমীচিন নয়। ফলাফল হিসেবে এর প্রভাব পড়বে বিশ্বব্যাপী। অভ্যন্তরীণভাবেও তা যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করবে, যা কিনা মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সামরিক মিশনের প্রস্তুতি নিয়ে বসে থাকার মানে হয় না। কারণ প্রতি মুহুর্তে ন্যাটো ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে; এবং রাশিয়ার জন্যে মিশনটা প্রতি মুহুর্তে কঠিনতর হচ্ছে। তাহলে রাশিয়া কি পুরো কাজটাই করছে তথ্যযুদ্ধ হিসেবে? কিন্তু সমস্যা হলো, আরেকটা দেশে সামরিক হামলা করলে জনমত নিজের পক্ষে নিয়ে আসাটা বেশ কঠিন। হামলা করার সবচাইতে ভালো সময়টাতে হামলা না করে বসে থেকে হামলার হুমকি দেয়ার অর্থ হলো, রাশিয়া আসলে ইউক্রেনে হামলা করতে চায় না। যুদ্ধ করার নিয়ম হলো, সর্বোচ্চ সুবিধাজনক পর্যায়ে হামলা করা; এবং শত্রুকে কোন সুবিধা না দেয়া। আর কূটনীতির নিয়ম হলো, সমঝোতায় পৌঁছাবার আগে যথেষ্ট হুমকি দেয়া।

 
নভেম্বর ২০২১। ইউক্রেনের বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ। যদিও অনেকেই সোশাল মিডিয়াতে ‘স্ট্যান্ড উইথ ইউক্রেন’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছে, তথাপি এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে রক্ষা করতে যুদ্ধ করবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলি ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু সরাসরি ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার যুদ্ধ, বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবার কোন সম্ভাবনা নেই। 

ইউক্রেনের ব্যাপারে ইউরোপের অনৈক্য

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন, জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর সাথে কথা বলার পর ২৫শে জানুয়ারি পার্লামেন্ট সদস্যদেরকে বলেন যে, ইউরোপের কিছু দেশ রাশিয়ার গ্যাসের উপর প্রচন্ডভাবে নির্ভরশীল হবার কারণে রাশিয়ার উপর মারাত্মক কোন অর্থনৈতিক অবরোধের ব্যাপারে চিন্তিত। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জনসন মূলতঃ জার্মানিকেই বোঝাচ্ছিলেন। তিনি আরও বলেন যে, তাদের এখন কাজ হলো চিন্তিত রাষ্ট্রগুলিকে বুঝিয়ে যতদূর সম্ভব নিয়ে যাওয়া; যাতে করে রাশিয়ার উপর একটা শক্ত অর্থনৈতিক অবরোধ দেয়া যায়। জনসন বলেন যে, রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক আন্ত ব্যাংকিংএর মানি ট্রান্সফার ব্যবস্থা ‘সুইফট’ থেকে বের করে দেয়া যায় কিনা, সেব্যাপারে মিত্র দেশগুলির মাঝে কথা হলেও সেটা যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া সম্ভব নয়। আর এব্যাপারে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক ইতোমধ্যেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। জনসন বলেন যে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ রুশ ব্যক্তিত্ব এবং কোম্পানির উপরেই মূলতঃ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হবে। একইসাথে তিনি বলেন যে, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা করলে ব্রিটেন পূর্ব ইউরোপে তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে পারে। ‘নিউজউইক’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানি ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিতে চাইছে না। তাদের কথা বলা হলো, এটা ইউক্রেনের জন্যে সহায়ক হবে না। বার্লিন এর বদলে ইউক্রেনকে মেডিক্যাল সহায়তা দিতে চাইছে। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, জার্মানির অবস্থান ঐক্যের বিরুদ্ধে এবং এতে পুতিন ইউক্রেনে নতুন করে হামলা করতে আগ্রহী হবেন। কিন্তু ব্লিংকেন ‘এনবিসি’কে বলেন যে, জার্মান চ্যান্সেলর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তার সাথে একমত এবং দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারেও যে তারা একমত, সেব্যাপারেও তার কোন সন্দেহ নেই।

তবে ফ্রীডম্যান বলছেন যে, ইউরোপ রাশিয়ার ব্যাপারে একমত নয়। ইউরোপিয়রা শত শত বছর ধরে শুধু যুদ্ধই করেছে। এখনও সেই প্রতিদ্বন্দ্বিত বিদ্যমান। জার্মানি চাইছে রাশিয়ার অর্থনৈতিক পশ্চাতগামীতাকে নিজের পক্ষে কাজে লাগাতে। অপরদিকে পোল্যান্ড মনে করছে যে, তারা ১৯৩৯ সালে দেখেছে যে কিভাবে জার্মানি এবং রাশিয়া পোল্যান্ডকে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। ফ্রান্স আবার মনে করছে এই সুযোগে জার্মানিকে সরিয়ে দিয়ে ইউরোপকে নিজেদের প্রভাবে নিয়ে আসা যায় কিনা। ইউরোপ এবং ন্যাটোর দেশগুলির মাঝে দ্বন্দ্বের সুযোগটাই রাশিয়া নিতে চাইছে। তবে এই মুহুর্তে দুনিয়ার অপর প্রান্তে চীন নিজের অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় রাশিয়ার দিকে সকলের চোখ যাচ্ছে।

ইউক্রেন ইস্যুতে চীনের অবস্থানের একটা গুরুত্ব রয়েছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর ডিরেক্টর ক্রিস মিলার এক লেখায় বলছেন যে, বিভিন্ন সময়ে উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ মান্য করা নিয়ে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব চলেছে। চীন অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে অবরোধ মান্য করতে বাধ্য হয়েছে; যা কিনা চীনের দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া ইস্যুতে পশ্চিমারা রাশিয়ার উপর যে অবরোধ দিয়েছিল, তা খুব একটা কঠোর ছিল না। চীন এবং রাশিয়ার বাণিজ্য সম্পর্কের উপর এই অবরোধের প্রভাব ছিল না বললেই চলে। কিন্তু এবারে যে সেটার ব্যতিক্রম হবে, তা নিশ্চিত। এবারে চীন যদি যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ মেনে নেয়, তাহলে সকলের চোখেই চীনের অর্থনৈতিক শক্তি যথেষ্ট দুর্বল মনে হবে; আর যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক শক্তিও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার চাইতে রাশিয়ার অর্থনীতি অনেক বড়। তাই ঐ দুই দেশের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কর্তনের জন্যে ক্ষতি খুব কম হলেও রাশিয়ার বেলায় সেটা হবে না। রাশিয়ার উপর অবরোধ চীনের অর্থনীতিকে নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একারণেই এবারে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক কর্তনে রাজি নাও হতে পারে। যদি চীন এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে রাশিয়া তার দুর্যোগের মাঝে অনেক বড় একটা বন্ধু পাবে; আর পশ্চিমাদেরকেও একত্রে দুই ফ্রন্টে আর্থিক যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে।

ধোঁকা না সত্যিকারের হুমকি?

ইউক্রেন রাশিয়ার জন্যে অস্তিত্বের প্রশ্ন; অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে এটা বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। যদিও আফগানিস্তান থেকে পলায়নের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’ থাকতে চাইছে না, তথাপি রাশিয়ার দাবির কাছে নতি স্বীকার করে বাকি বিশ্ব, বিশেষ করে চীনের কাছে একটা উদাহরণ তৈরি করতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপের অনৈক্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটা কোয়ালিশন তৈরি করতে হিমসিম খাচ্ছে। তবে রাশিয়ার হামলা বাস্তবতায় রূপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ঐকমত্য তৈরি করা অপেক্ষাকৃত সহজ হবে। ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলি থেকে দূরে রাখতেই হুমকি দিচ্ছেন, ইউক্রেনকে দখল করতে নয়; কারণ পশ্চিমা ঘেঁষা ইউক্রেনই রাশিয়ার জন্যে হুমকি। পুতিন হয়তো তার হুমকিকে শক্ত ভিত দিতেই সামরিক পরিকল্পনার ব্যাপারে যত্নবান হয়েছেন; যাতে তার আগ্রাসী ইচ্ছাটাই পশ্চিমাদের চোখে ভেসে ওঠে। কিন্তু তার দাবিকে যুক্তরাষ্ট্র যখন অবাস্তব মনে করছে, তখন পুতিন কি বাধ্য হবেন সামরিক মিশনে যেতে? তাতে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র কিছু না হারালেও রাশিয়া যথেষ্টই ক্ষতির মুখে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র চীনকেও রাশিয়ার কাছ থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করবে; যদিও এবারে চীন রাশিয়ার উপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ নাও মানতে পারে। প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে সামরিক মিশনে যেতে বাধ্য করতে পারলে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে অনেক বড় কৌশলগত বিজয়; যা কিনা তার আফগানিস্তানে দুই দশকের ব্যর্থতাকে ভুলতে কিছুটা হলেও সহায়তা করবে।

Sunday, 23 January 2022

‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ কি একটা দিবাস্বপ্ন?

২৩শে জানুয়ারি ২০২২

পশ্চিমা আদর্শের অধঃপতনের ফলস্বরূপ ব্রিটেনের নাগরিকেরা যখন নিজেদের স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে সামরিক বাহিনীতে যেতে ইচ্ছুক নয়, তখন সামরিক বাহিনী আকারে ছোট হতে থাকলেও প্রযুক্তির কারণে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে, এহেন বক্তব্য হয়তো সেই চিন্তাটার অবাস্তবতাকে ঢেকে রাখার জন্যেই। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের চিন্তাটাও সেই আঙ্গিকে দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।

 
ব্রিটেনের বৈশ্বিক ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘এমএই ৬’এর নতুন প্রধান অনেকটা নিয়ম ভেঙ্গেই জনসন্মুখে এসে কথা বলছেন। ২০২১এর ডিসেম্বরে সংস্থার প্রধান রিচার্ড মুর ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক অনুষ্ঠানে পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের ভূমিকা নিয়ে এক বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন ঠিকমতো কাজ করছে না এবং বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীরা আগের চাইতে বেশি আত্মবিশ্বাসী; তারা কম বাধার সন্মুখীন হচ্ছে; এবং তারা আগের চাইতে বেশি সম্পদ কাজে লাগাতে পারছে। একারণেই তারা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতাগুলিকে কাজে লাগাচ্ছে। তিনি রাশিয়া, চীন, ইরান এবং সন্ত্রাসবাদকে তাদের বড় ফোকাস বলে উল্লেখ করেন। একইসাথে জলবায়ু পরিবর্তন এবং মহামারির মতো বৈশ্বিক সমস্যাও রয়েছে। তিনি চীনের প্রভাব বিস্তারকে ‘এমআই ৬’এর সবচাইতে বড় প্রাধান্য হিসেবে আখ্যা দিলেও চীনের সাথে বৈশ্বিক ইস্যু এবং বাণিজ্যের ব্যাপারে সহযোগিতার কথা বলেন। কারণ চীনের কর্মকান্ড এবং নীতি অনেক ক্ষেত্রেই ব্রিটেনের নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। তিনি আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে, রাশিয়ার কর্মকান্ডকে, বিশেষ করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে প্রতিহত করার জন্যে সকলকে আহ্বান জানান। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাকে ইরানের প্রভাব বিস্তারের কথা উল্লেখ করেন; এবং এর ফলে ব্রিটেন এবং ব্রিটেনের বন্ধু রাষ্ট্রদের প্রতি হুমকিকে মোকাবিলায় সহায়তা দেয়ার কথা বলেন। এছাড়াও আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাতে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ব্রিটেনের কাজ করার কথা বলেন তিনি। প্রতিটা বিষয়েই তিনি নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। মুরের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, একুশ শতকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিটেন একটা বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজের নামকে সামনে আনতে চাইছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেনের এই ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ে সমন্বিত নীতিপত্র প্রকাশের পর থেকে ব্রিটেনের লক্ষ্যকে অনেকেই অতি উচ্চাভিলাসী বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন’এর প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক লেখায় ব্রিটেনের ‘ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথ’এর সামরিক বিষয়ের শিক্ষক ক্রিস মরিস বলছেন যে, ব্রিটিশ নেতৃবৃন্দ দেশের সম্পদের অপ্রতুলতাকে বিবেচ্য বিষয় না ধরে বরং বৈশ্বিক বাস্তবতাকে নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করছে। ফলশ্রুতিতে ব্রিটেন যা করতে চাইছে, তার জন্যে যথেষ্ট শক্তি সে যোগাড় করতে পারছে না। একারণে ব্রিটেন তার সামরিক শক্তির কিছু অংশকে শক্তিশালী করতে গিয়ে বাকিগুলিকে একেবারেই কমিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে বলা হচ্ছে যে, কিছু সামরিক শক্তিকে কমিয়ে ফেলে অর্থ বাঁচিয়ে সেই অর্থ দিয়ে প্রযুক্তিগত দিক থেকে ব্রিটেন সকলের চাইতে এগিয়ে থাকবে। কিন্তু যেটা সকলেই ভুলে যাচ্ছে তা হলো, ব্রিটেনের বন্ধু এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে আরও অনেক বেশি সম্পদ রয়েছে; যেকারণে তারা কেন ব্রিটেনের থেকে প্রযুক্তির দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকবে? ব্রিটেনের ছোট করে ফেলা সামরিক বাহিনীকে সামনের দিনগুলিতে আরও ঘনঘন এবং আরও বেশি সময়ের জন্যে বিশ্বব্যাপী মোতায়েন করতে হবে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীরও কাগজে কলমে যতটুকু সক্ষমতা রয়েছে, বাজে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পনার কারণে সেটাও পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করতে পারছে না।

 
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর রিক্রুটিং বিজ্ঞাপণ, যেখানে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। তবে নাগরিকেরা বলছে যে, অনেক জায়গাতেই আত্মবিশ্বাস পাওয়া যেতে পারে; সেটা সেনাবাহিনীতে নাও হতে পারে। কেউ কেউ বলছেন যে, সেনাবাহিনীতে যোগদানের অর্থ হলো অনেক বড় একটা প্রতিশ্রুতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা; যা অনেকেই করতে ইচ্ছুক নয়। তারা নিজেদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ধরে রাখতেই বেশি আগ্রহী।

কাগজে কলমে ব্রিটেনের সামরিক বাজেট বিশ্বের মাঝে চতুর্থ। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত ব্রিটেনের চাইতে এগিয়ে আছে। করোনা মহামারির আগে ২০১৯ সালেও ৭৮ বিলিয়ন ডলার নিয়ে সৌদি আরব এবং ৬১ বিলিয়ন ডলার নিয়ে রাশিয়া ব্রিটেনের থেকে এগিয়ে ছিল। তখন ব্রিটেনের বাজেট ছিল প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০২০ সালে বাজেট বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়ার পর ব্রিটেনের সামরিক বাজেট ৬১ বিলিয়ন ডলার পেরিয়ে গেলে এবং রাশিয়ার বাজেট কিছুটা কমানো হলে ব্রিটেন চতুর্থ অবস্থানে চলে আসে। আর সেবছর সৌদি আরব তেলের বাজারে মারাত্মক ধ্বসের কারণে সামরিক বাজেট কমিয়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে কমিয়ে আনে। ফ্রান্স তার বাজেট ৫২ থেকে ৫৫ বিলিয়নে উন্নীত করলেও তা রাশিয়ার পিছনে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকে। ‘আইআইএসএস’এর সিনিয়ন ফেলো অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বেন ব্যারি বলছেন যে, সামরিক বাজেটের র‍্যাংকিংএর কারণে ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্রিটেনের সামরিক শক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। তবে এর মাধ্যমে ব্রিটেনের সামরিক শক্তি খুব বেড়ে যাচ্ছে না। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সে নতুন কোন স্কোয়াড্রনও যুক্ত হচ্ছে না। রয়াল নেভির যে আকার পরিকল্পনা করা হতো, সেদিকে নিয়ে যাবার একটা চেষ্টা চলছে। বরিস জনসন যখন বলেছেন যে, ব্রিটিশ রয়াল নেভি হবে ইউরোপের মাঝে সবচাইতে বড়, তখন কথাটা ঠিক। তবে এর মানে এই নয় যে, নৌবাহিনী অনেক বড় হয়ে যাবে। একইসাথে এই বাজেট বৃদ্ধির মানে এই নয় যে, বিশ্বব্যাপী মোতায়েন করার জন্যে ব্রিটেনের সেনা ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

ব্রিটিশ সামরিক শক্তির সমস্যা বহু প্রকারের। এর মাঝে সবচাইতে বড় সমস্যাগুলির একটা হলো রিক্রুটিং। ব্রিটেনের ‘স্কাই নিউজ’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বশেষ রিক্রুটিং বিজ্ঞাপণে জনগণকে বিজ্ঞাপণ এবং সোশাল মিডিয়াতে হাল্কা লাইফস্টাইল বক্তব্য থেকে সরে আসতে আহ্বান জানানো হচ্ছে; যখন টানা নয় বছর ধরে সেনাবাহিনী ছোট হচ্ছে। রিক্রুটিং সমস্যা বহুদিন ধরেই চলছে। ২০০৬ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটা গ্রুপ মাউন্ট এভারেস্ট আরোহন করতে গিয়েছিল জনগণকে অনুপ্রাণিত করতে। সেই মিশন সফল হয়নি। যারা সেনাবাহিনীর জন্যে নাম লেখায়, তাদের মাঝে মাত্র ১০ শতাংশ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ পর্যন্ত যেতে পারে। এই সমস্যার সমাধান করতে সেনাবাহিনী আগ্রহীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শারীরিক সক্ষমতাকে সামরিক মাপকাঠিতে নিয়ে আনার জন্যে কাজ করছে। তবে এর চাইতে বড় সমস্যা হলো, গবেষণা বলছে যে, ব্রিটিশ ছেলেমেয়েরা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছে। এটাকে মাথায় রেখেই সর্বশেষ রিক্রুটিং ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই ভিডিও দেখে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়নি। নাগরিকেরা বলছে যে, অনেক জায়গাতেই আত্মবিশ্বাস পাওয়া যেতে পারে; সেটা সেনাবাহিনীতে নাও হতে পারে। কেউ কেউ বলছেন যে, সেনাবাহিনীতে যোগদানের অর্থ হলো অনেক বড় একটা প্রতিশ্রুতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা; যা অনেকেই করতে ইচ্ছুক নয়। তারা নিজেদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ধরে রাখতেই বেশি আগ্রহী।

 
বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনের প্রধান প্রধান সামরিক অবস্থান। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাটাকে বাস্তবায়ন করতেই বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনকে সামরিক উপস্থিতি রাখতে হচ্ছে। এই সামরিক অবস্থানগুলিকে ধরে রাখতে বৈশ্বিকভাবে ব্রিটেন অনেক দেশের সরকারকেই নিজেদের প্রভাবের অধীনে রাখতে চাইছে। এটা পরিষ্কার যে, সামরিক শক্তির অপ্রতুলতাকে কাটাতে রাজনৈতিক এবং ইন্টেলিজেন্স প্রভাবকেই ব্রিটেন প্রাধান্য দিতে চাইছে।

ইউরোপে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান লেঃ জেনারেল বেঞ্জামিন হজেস ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মিডিয়া ‘ফোর্সেস নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতোই বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইন্দোপ্যাসিফিক, ইউরোপ সকল ক্ষেত্রেই ব্রিটেনের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব রয়েছে। ২০১০ সালে যখন আফগানিস্তানে সেনাসংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল, তখন ব্রিটেন মাত্র তিনটা দেশের মাঝে একটা হিসেবে সেটাকে সমর্থন করেছিল। সেই তুলনায় ব্রিটেনের সেনাবাহিনীর আকার মারাত্মক ছোট হয়ে গেছে। পৃথিবীর সকল মানুষই স্থলে বাস করে; কাজেই স্থলভাগে মানুষ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা দিতে স্থলবাহিনীর প্রয়োজন। তিনি বলেন যে, বাইরের একজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি খুবই চিন্তিত হবেন জেনে যে, ব্রিটেনের সেনাবাহিনীর আকার মেঝের নিচে নামিয়ে আনা হচ্ছে।

ক্যারিবিয়ান সাগর, দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ, ভূমধ্যসাগরের জিবরালটার ও সাইপ্রাস, মধ্যপ্রাচ্যে বাহরাইন এবং ওমান ছাড়াও পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাই; এবং আফ্রিকার কেনিয়া ও উত্তর আমেরিকার কানাডাতে ব্রিটেনের সামরিক অবস্থান রয়েছে। এর বাইরেও ইউরোপের নরওয়ে, তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি এবং পশ্চিম আফ্রিকার মালিতে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মিশন রয়েছে। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাটাকে বাস্তবায়ন করতেই বিশ্বব্যাপী ব্রিটেনকে সামরিক উপস্থিতি রাখতে হচ্ছে। এই সামরিক অবস্থানগুলিকে ধরে রাখতে বৈশ্বিকভাবে ব্রিটেন অনেক দেশের সরকারকেই নিজেদের প্রভাবের অধীনে রাখতে চাইছে। ‘এমআই ৬’এর প্রধানের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, সামরিক শক্তির অপ্রতুলতাকে কাটাতে রাজনৈতিক এবং ইন্টেলিজেন্স প্রভাবকেই ব্রিটেন প্রাধান্য দিতে চাইছে। একটা আদর্শিক শক্তি হিসেবে দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশের রাজনৈতিক সীমানা এবং সংবিধানকে ব্রিটেন তৈরি করেছে, অথবা প্রভাবিত করেছে। পশ্চিমা আদর্শিক চিন্তাগুলি ব্রিটেনই একসময় উপনিবেশের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ আইনকানুনই ব্রিটেনের হাতে তৈরি অথবা সেখানে ব্রিটেনের প্রভাব ছিল। এমনকি বিশ্বের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষাও ব্রিটেনের মানুষের মাতৃভাষা। ব্রিটেন নিজে সুপারপাওয়ার থাকার সময়েই এই কাজগুলির বেশিরভাগ সম্পাদন করেছিল। সেই ঐতিহাসিক প্রভাবটাকে ব্যবহার করেই ব্রিটেন আবারও শক্তিশালী হতে চাইছে। বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী আকৃতি দিতে; অথবা অন্যের সক্ষমতাকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক উদ্দেশ্যগুলিকে বাস্তবায়ন করতে চাইছে তারা। তবে সকলেই বুঝতে পারছেন যে, অতি ক্ষুদ্র একটা সামরিক বাহিনী দিয়ে একটা পরিবর্তনশীল লাগামহীন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করাটা অবাস্তব চিন্তা। পশ্চিমা আদর্শের অধঃপতনের ফলস্বরূপ ব্রিটেনের নাগরিকেরা যখন নিজেদের স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে সামরিক বাহিনীতে যেতে ইচ্ছুক নয়, তখন সামরিক বাহিনী আকারে ছোট হতে থাকলেও প্রযুক্তির কারণে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে, এহেন বক্তব্য হয়তো সেই চিন্তাটার অবাস্তবতাকে ঢেকে রাখার জন্যেই। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের চিন্তাটাও সেই আঙ্গিকে দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।

Saturday, 22 January 2022

বাইডেন কি ইয়েমেন যুদ্ধের ব্যাপারে তার নীতি পাল্টেছেন?

২২শে জানুয়ারি ২০২২

এক বছর ধরে ইয়েমেনে মানবাধিকার রক্ষার আদর্শিক লক্ষ্য এবং আরব দেশগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মার্কিন জাতীয় স্বার্থরক্ষার লক্ষ্যের মাঝামাঝি যে একটা অস্পষ্ট নীতিকে তিনি লালন করছিলেন, তার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। আফগানিস্তানের পর এখন ইয়েমেনে পশ্চিমা আদর্শকে জ্বলাঞ্জলি দেয়ার এই নীতিকে বাইডেনের বামপন্থী লিবারাল ও প্রগ্রেসিভ মিত্ররা পছন্দ করছে না; যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাইডেনের দুর্বল অবস্থানকে দুর্বলতর করবে।

 
২১শে জানুয়ারি ইয়েমেনের উত্তরে হুথি বিদ্রোহী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা সাদা শহরের এক অস্থায়ী কারাগারের উপর বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক এনজিও ‘মেডিসিনস সাঁস ফ্রন্টিয়ের’ বার্তাসংস্থা ‘এএফপি’কে বলছে যে, হামলায় মহিলা ও শিশুসহ কমপক্ষে ৭০ জন নিহত এবং ১’শ ৩৮ জন আহত হয়েছে। এই অস্থায়ী কারাগারটা শরণার্থী শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিলো। হুথিরা এই বিমান হামলার জন্যে সৌদি আরবকে দায়ী করলেও সৌদি নেতৃত্বের কোয়ালিশন এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে। কোয়ালিশনের একজন মুখপাত্র বলেন যে, জায়গাটা জেনেভা কনভেনশনের অধীনে আক্রমণ থেকে দূরে রাখার স্থানের মাঝে পড়ে না। তারা শীঘ্রই ঘটনার ব্যাপারে সত্যটা ছাড়াও হুথিদের মিডিয়াতে বানোয়াট খবরের ব্যাপারে তথ্য দেবেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, গত ১৭ই জানুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবু ধাবি বিমানবন্দর এবং তেলের স্টোরেজ ট্যাঙ্কে ড্রোন হামলার পর থেকে কোয়ালিশনের বোমা হামলা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৮ই জানুয়ায়রি ইয়েমেনের রাজধানী সানাতে এক বিমান হামলায় কমপক্ষে ১৪ জন নিহত হয়। ‘সেভ দ্যা চিলড্রেন’ বলছে যে, দক্ষিণের হোদেইদা শহরে একটা টেলিকম স্থাপনায় সৌদি বিমান হামলার সময় কাছেই খেলতে থাকা ৩ জন শিশু নিহত হয়। বোমা হামলার ঘটনায় মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন এক বার্তায় যুদ্ধের তীব্রতার ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়ে উভয় পক্ষকে সহিংসতা কমাতে আহ্বান জানান। তবে এর আগে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সউদএর সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলির নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অব্যহত রাখার কথা বলেন। অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইয়েমেনের ব্যাপারে তার নীতি পরিবর্তন করেছেন কিনা।

উত্তর ইয়েমেনের সাদা শহরে বিমান হামলার পরপরই বাইডেনের ডেমোক্র্যাট শিবিরের মিত্র মার্কিন কংগ্রেসের বামপন্থীদের সর্ববামের সংগঠন ‘কংগ্রেশনাল প্রগ্রেসিভ ককাস’এর এক টুইটার বার্তায় বলা হয় যে, বাইডেন প্রশাসনকে অবশ্যই অবৈধভাবে সৌদিদের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়া বন্ধ করতে হবে; এবং বোমাবর্ষণ ও অবরোধ শেষ করতে হবে। বিশ্বব্যাপী মার্কিন শক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পক্ষে কথা বলা থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কুইন্সি ইন্সটিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট’এর এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ক্ষমতা নেবার পর থেকে বাইডেন প্রশাসন ১৩ বার হুথিদের কর্মকান্ডের সমালোচনা করলেও ইয়েমেনে সৌদিদের বোমা হামলার একবারও সমালোচনা করেনি।

২০২১এর ফেব্রুয়ারিতে বাইডেন হোয়াইট হাউজের এক প্রেস ব্রিফিংএ বলেছিলেন যে, ইয়েমেনের যুদ্ধ শেষ হতেই হবে। তিনি বলেছিলেন যে, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র অংশগ্রহণকারী দেশগুলিকে ‘আক্রমণাত্মক অস্ত্র’ বিক্রি করা বন্ধ করবে। কিন্তু এক বছর পর ২০২১এর ডিসেম্বরে বাইডেন প্রশাসন সাড়ে ৬’শ মিলিয়ন ডলারে সৌদি আরবের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করার জন্যে কংগ্রেসের অনুমতি নিলে অনেকেই বাইডেনের নীতির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেন। বাইডেন প্রশাসন বলছে যে, ক্ষেপণাস্ত্রগুলি আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য; যার অর্থ হলো, সেগুলি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা ঠেকাতে ব্যবহৃত হবে; ইয়েমেনের ভূমিতে বোমা হামলার জন্যে নয়। ১৯শে জানুয়ারি এক সংবাদ সন্মেলনে জো বাইডেন এক প্রশ্নের জবাবে বলেন যে, ইয়েমেনের যুদ্ধ বন্ধে দুই পক্ষের মাঝে সমঝোতা হতে হবে; যা কিনা যথেষ্টই কঠিন একটা কাজ। একইসাথে তিনি বলেন যে, তিনি হুথিদেরকে পুনরায় ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেয়ার জন্যে চিন্তা করছেন। ২০২১ সালের শুরুতে বাইডেন হুথিদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন ঘোষণার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছিলেন।

 
সৌদি বিমান বাহিনীর মার্কিন নির্মিত 'এফ-১৫' যুদ্ধবিমান।  যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সৌদিদেরকে ইন্টেলিজেন্স, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষনাবেক্ষণ, এবং অস্ত্র সরবাহ করছে, সেটা ‘আক্রমণাত্মক’ বা ‘প্রতিরক্ষামূলক’ই হোক, যুদ্ধের ভয়াবহতা আরও বাড়বে। এটা এখন পরিষ্কার যে, বাইডেন ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্পের নীতিতে যেতে চাইছেন। কিন্তু হোয়াইট হাউজে আসার এক বছরেও যখন তিনি সৌদি আরব এবং আমিরাতের যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কোন চেষ্টাই করেননি, তখন তার নীতির কতটুকু পরিবর্তন হলো, তা বলা কঠিন।

২০১৮ সালে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যার পর থেকে মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্য সৌদিদের সাথে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করার জন্যে এবং ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদিদের সহায়তা না দেয়ার জন্যে সরকারের উপর চাপ দিতে থাকে। তবে এখনও পর্যন্ত সৌদি কোয়ালিশন মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করেই ইয়েমেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন লিবারাল রাজনীতিবিদ এবং শিক্ষক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রোহিত ‘রো’ খান্না বাইডেনের বক্তব্যের সমালোচনা করে এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ট্রাম্পের পুরোনো নীতিতে ফিরে গিয়ে যুদ্ধকে আরও উস্কে দেয়া নয়, বরং ইয়েমেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা করতে হবে। হুথিদের ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা দিয়ে তাদের কর্মকান্ডকে থামানো যাবে না; বরং এতে লাখো মানুষের খাবার ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাবে। মার্কিন সাংবাদিক এবং লেখক স্পেনসার একারম্যান এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, বাইডেন এবং তার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা যে যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই যুদ্ধে সৌদি আর আমিরাতের যেকোন বিমান হামলায় মার্কিন হাত রয়েছে। তিনি আশা করেন যে, ইয়েমেনে নিহত শিশুদেরকে মার্কিন কর্মকর্তারা যেন রাতে স্বপ্নের মাঝে দেখতে পান।

‘ভোক্স’ ম্যাগাজিন বলছে যে, মার্কিনীরা সৌদি বিমান বাহিনীর বিমানগুলির রক্ষণাবেক্ষণ করছে; যেগুলি ইয়েমেনে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২১এর ফেব্রুয়ারিতে ৪১ জন কংগ্রেসম্যান সৌদি আরবের জন্যে মার্কিন সামরিক সহায়তার ব্যাপারে জানতে চাইলে বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা দুই মাস পর ধোঁয়াশা উত্তর দেন। কংগ্রেসম্যান পিটার ডেফাজিও ‘মিডলিস্ট আই’কে বলছেন যে, বাইডেন এক বছরেও তার ইয়েমেন নীতিকে পরিষ্কার করেননি। মার্কিন এনজিও ‘ফ্রেন্ডস কমিটি অন ন্যাশনাল লেজিসলেশন’এর ডিরেক্টর হাসান এল তাইয়াব বলছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সৌদিদেরকে ইন্টেলিজেন্স, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষনাবেক্ষণ, এবং অস্ত্র সরবাহ করছে, সেটা ‘আক্রমণাত্মক’ বা ‘প্রতিরক্ষামূলক’ই হোক, যুদ্ধের ভয়াবহতা আরও বাড়বে। এটা এখন পরিষ্কার যে, বাইডেন ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্পের নীতিতে যেতে চাইছেন। কিন্তু হোয়াইট হাউজে আসার এক বছরেও যখন তিনি সৌদি আরব এবং আমিরাতের যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কোন চেষ্টাই করেননি, তখন তার নীতির কতটুকু পরিবর্তন হলো, তা বলা কঠিন। বরং এক বছর ধরে ইয়েমেনে মানবাধিকার রক্ষার আদর্শিক লক্ষ্য এবং আরব দেশগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মার্কিন জাতীয় স্বার্থরক্ষার লক্ষ্যের মাঝামাঝি যে একটা অস্পষ্ট নীতিকে তিনি লালন করছিলেন, তার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। আফগানিস্তানের পর এখন ইয়েমেনে পশ্চিমা আদর্শকে জ্বলাঞ্জলি দেয়ার এই নীতিকে বাইডেনের বামপন্থী লিবারাল ও প্রগ্রেসিভ মিত্ররা পছন্দ করছে না; যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাইডেনের দুর্বল অবস্থানকে দুর্বলতর করবে।