২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২১
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা মস্কো ঘুরে এলেন। সফরে শ্রিংলা রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ২০২০ সালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক বাতিল হয়ে যাওয়ায় শ্রিংলার সফরের গুরুত্ব ছিল বেশি। সফরকালীন আলোচনার বিষয়বস্তুর মাঝে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের সাথে ভারতের কৌশলগত যোগাযোগ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন মিডিয়াতে হাইলাইট করা হয়। ভারতীয় অর্থনৈতিক মিডিয়া ‘মিন্ট’ বলছে যে, এই সফরের একটা মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘চেন্নাই ভ্লাডিভস্টক ম্যারিটাইম করিডোর’এর চিন্তাটাকে আরও এগিয়ে নেবার মাধ্যমে দু’দেশের মাঝে বাণিজ্য বৃদ্ধি করা; যা বর্তমানে ১০ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলারের মাঝে রয়েছে। রুশ পত্রিকা ‘কমারস্যান্ট’এর সাথে এক সাক্ষাতে শ্রিংলা বলেন যে, এই ম্যারিটাইম করিডোরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরকে শুধু প্রশান্ত মহাসাগরই নয়, রাশিয়ার উত্তরের ‘নর্দার্ন সি রুট’এর সাথে যুক্ত করা যাবে। শ্রিংলা মনে করিয়ে দেন যে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে নরেন্দ্র মোদি ভ্লাডিভস্টকে পুতিনের সাথে আলোচনার সময় রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের বন্দর ভ্লাডিভস্টককে ইউরেশিয়ার সাথে ইন্দোপ্যাসিফিকের যোগসূত্র বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যকে নিয়ে ভারতের এই পরিকল্পনার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আসলে কতটুকু?
ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ভিভেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অজয় কুমার চতুর্বেদি বলেন যে, ‘চেন্নাই ভ্লাডিভস্টক ম্যারিটাইম করিডোর’কে এগিয়ে নেবার মাধ্যমে ভারত চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’কে চ্যালেঞ্জ করবে। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের সাখালিন দ্বীপে এবং ভিয়েতনামের উপকূলে তেল গ্যাস প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে ভারত এই কর্মকান্ডকে এগিয়ে নিচ্ছে। সাখালিনের প্রকল্পে বিনিয়োগের সময় ভারতের ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলে যে, রাশিয়ার তেল গ্যাস নিয়ে ভারত এবং চীন প্রতিযোগিতা করছে।
‘সাখালিন ১’ প্রকল্পে ভারত যেমন নতুন নয়, তেমনি ভারত একাও এখানে তেমন শক্তিশালী কোন বিনিয়োগকারী নয়। ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকার এক খবরে বলা হচ্ছে যে, এই প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা হলো মার্কিন কোম্পানি ‘এক্সন মোবিল’। ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ নিয়ে তারাই মূলত এই প্রকল্পের অপারেটর। জাপানের ‘সোডেকো’র হাতে রয়েছে ৩০ শতাংশ মালিকানা; ভারতের ‘ওএনজিসি’র হাতে রয়েছে ২০ শতাংশ মালিকানা; আর রাশিয়ার ‘রজনেফত’এর হাতে রয়েছে বাকি ২০ শতাংশ। ২০০১ সালে ‘ওএনজিসি’ ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে এই প্রকল্পের ২০ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয়। ২০১৭ সালে নতুন করে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ২০৫১ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়।
প্রকল্পের ওয়েবসাইট বলছে যে, ১৯৯৬ সালে এখানে তেল গ্যাসের জন্যে ড্রিলিং শুরু হয় এবং ২০০১ সালে তেল গ্যাস আহরণ শুরু হয়। ২০০৪ সালে সাখালিন দ্বীপের খনির সাথে ২’শ ৩০ কিঃমিঃ পাইপলাইন যুক্ত করে ‘দে কাস্ত্রি’ নামের টার্মিনালের সাথে যুক্ত করা হয়। ২০০৬ সাল থেকে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তেলের জাহাজ ভর্তি করা শুরু হয়। দৈনিক আড়াই লক্ষ ব্যারেল উৎপাদন সক্ষমতার এই প্রকল্প থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৩’শ ৮০টা জাহাজ ভর্তি করে তেল রপ্তানি করা হয়েছে। টার্মিনালে সাড়ে ৬ লক্ষ ব্যারেল তেল ধরে রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মোট ৫টা তেলের জাহাজ এই প্রকল্পের অধীনে তৈরি করা হয়; যেগুলির একেকটার ধারণক্ষমতা ১ লক্ষ টন, এবং এগুলি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে শীতকালে যখন সমুদ্র বরফাচ্ছাদিত থাকবে, তখনও যেন তেল রপ্তানি করা যায়। এছাড়াও শীতকালে অপারেশন চালাবার জন্যে দু’টা আইসব্রেকার জাহাজও রাখা হয়েছে এই প্রকল্পের অধীনে। এভাবে সারা বছর তেলের সরবরাহ নিশ্চিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
‘সাখালিন ১’ এখানে একমাত্র তেল গ্যাস প্রকল্প নয়। এর পাশেই ‘সাখালিন ২’ প্রকল্প হলো ব্রিটিশ কোম্পানি ‘শেল’এর তরলীকৃত গ্যাস বা এলএনজি প্রকল্প। কোম্পানির ওয়েবসাইট বলছে যে, ‘শেল’এর বিনিয়োগ এখানে সাড়ে ২৭ শতাংশ; রাশিয়ার ‘গ্যাজপ্রম’এর বিনিয়োগ ৫০ শতাংশ; জাপানের ‘মিতসুই’ সাড়ে ১২ শতাংশ; এবং ‘মিতসুবিশি’ ১০ শতাংশ। প্রায় ১ কোটি ১৫ লক্ষ টনের বাৎসরিক সক্ষমতার এই প্রকল্পের গ্যাস রপ্তানি শুরু হয় ২০০৮ সাল থেকে। মূলতঃ জাপান, কোরিয়া এবং চীন হলো এই প্রকল্পের গ্যাসের সবচাইতে বড় ক্রেতা। বিশ্বের মোট এলএনজি রপ্তানির ৪ শতাংশ এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে। এটা পরিষ্কার যে, সাখালিনের দু’টা প্রকল্পের মূল বিনিয়োগকারী হলো মার্কিন কোম্পানি ‘এক্সন মোবিল’ এবং ব্রিটিশ কোম্পানি ‘শেল’। রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের বরফাচ্ছাদিত এই এলাকায় পশ্চিমা বিনিয়োগের ব্যাপারে কথা হয়েছে খুব কমই। চীনের সীমানার বেশ কাছাকাছি হওয়ায় পশ্চিমাদের জন্যে এখানে প্রভাব ধরে রাখাটা রাশিয়ার সাথে শত্রুতার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘কার্নেগি মস্কো সেন্টার’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যে যত বিনিয়োগ হয়, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই নামে বা বেনামে চীনা বিনিয়োগ। দূরপ্রাচ্যের মার্কিন বন্ধু দেশ জাপান এবং কোরিয়ার বিনিয়োগকারীরা একদিকে যেমন চাইছে অত্র অঞ্চলে চীনা প্রভাব কমাতে; অন্যদিকে রাশিয়ার উপর মার্কিন অবরোধের কারণে এধরনের কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে চীনের সাথে মার্কিন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কারণে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করাটা রাশিয়াকে চাপের মাঝে রাখার চাইতে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। রাশিয়াও চাইছে দূরপ্রাচ্যে চীন ছাড়াও অন্যরা বিনিয়োগে এগিয়ে আসুক। ‘কার্নেগি’র প্রতিবেদনে কয়েকটা পক্ষের চিন্তার সমন্বয় লক্ষ্যনীয়। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যে ভারতের বিনিয়োগকে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই ভালো চোখে দেখছে। ভূরাজনৈতিক দিক থেকে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই চাইছে অত্র অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। ভারত এই ভূরাজনৈতিক খেলায় একজন অংশগ্রহণকারী মাত্র। দূরপ্রাচ্যে নিজস্ব বিনিয়োগ করে পশ্চিমাদের সহায়তা ছাড়া সেটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা ভারতের কতটুকু রয়েছে, তা বিতর্কসাপেক্ষ। তেমনি ভারত মহাসাগরেই যেখানে চীনা প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সহায়তায় ‘কোয়াড’ জোটের উপর নির্ভরশীল হচ্ছে ভারত, সেখানে দূরপ্রাচ্যে চীনা বিনিয়োগকে প্রতিস্থাপিত করে ভারতের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এজেন্ডা বাস্তবায়ন বাস্তবতার সাথে যায় না; বরং এহেন প্রকল্পে অংশ নেবার মাধ্যমে নিজেদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপর ভারতের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
Saturday, 27 February 2021
Tuesday, 23 February 2021
মার্কিন সোশাল মিডিয়ার বিরুদ্ধে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর যুদ্ধ ঘোষণার উদ্দেশ্য কি?
২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২১
গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি ‘ফেইসবুক’ অস্ট্রেলিয়ার ব্যবহারকারীদের জন্যে সংবাদ মিডিয়ার কনটেন্ট দেখা বা শেয়ার করার সক্ষমতা বন্ধ করে দেয়। কয়েক মাস ধরে অস্ট্রেলিয়ার সাথে ‘ফেইসবুক’এর যে টানাপোড়েন চলছিল, তার ফলাফল ছিল এটা। অস্ট্রেলিয়ার আইনপ্রণেতারা আলোচনা করছেন যে, সংবাদ মিডিয়া এবং সোশাল মিডিয়ার মাঝে সম্পর্ককে নতুন করে কিভাবে ব্যালান্স করা যায়। প্রস্তাবিত নতুন আইনের অধীনে ‘ফেইসবুক’ এবং ‘গুগল’এ সার্চ রেজাল্টে বা নিউজ ফিডে সংবাদ কনটেন্ট দেখালে সংবাদ মাধ্যমকে অর্থ দেবে সোশাল মিডিয়া কোম্পানি। ২৩শে ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার ট্রেজারার বা অর্থমন্ত্রী জশ ফ্রাইডেনবার্গ সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, তিনি মার্ক জুকারবার্গের সাথে কথা বলেছেন এবং জুকারবার্গ তাকে আশ্বাস দিচ্ছেন যে, সামনের দিনগুলিতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যবহারকারীদের উপর থেকে ফেইসবুকের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে; কারণ ‘ফেইসবুক’ আবারও অস্ট্রেলিয়াকে বন্ধু হিসেবে নিচ্ছে।
‘বিবিসি’ বলছে যে, অস্ট্রেলিয়ার আইনপ্রণেতারা মনে করছেন যে, ডিজিটাল যুগে আয়ের বন্টনে সমতা আসা প্রয়োজন। কারণ সোশাল মিডিয়ার আবির্ভাবের পর থেকে সংবাদ মাধ্যমগুলির আয়ে ভাটা পড়েছে। ‘ফেইসবুক’ বলছে যে, মিডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে তারা আর্থিকভাবে খুব বেশি লাভবান না হওয়ায় কোম্পানিগুলির সাথে চুক্তি করতে চাইছে না তারা। ‘ফেইসবুক’এর মাত্র ৪ শতাংশ পোস্ট মিডিয়া থেকে আসা। ‘ফেইসবুক অস্ট্রেলিয়া’র প্রধান নির্বাহী উইলিয়াম ইসটন বলছেন যে, বিগত বছরে ‘ফেইসবুক’ অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়া কোম্পানিগুলিকে ৫ বিলিয়ন ‘ক্লিক’ যোগাড় করে দিয়েছে; যা দিয়ে মিডিয়া কোম্পানিগুলির পোস্ট বহু মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। সেই হিসেবে ‘ফেইসবুক’এরই মিডিয়া কোম্পানিগুলির কাছ থেকে ৪’শ ৭ মিলিয়ন ডলার পাওয়া উচিৎ। বর্তমানে মার্কিন এবং ব্রিটিশ ব্যবহারকারীদের জন্যে ‘ফেইসবুক’ ‘নিউজ ট্যাব’ তৈরি করেছে; যার মাধ্যমে মিডিয়া কোম্পানিগুলির খবর শেয়ার করছে ‘ফেইসবুক’ এবং বিনিময়ে মিডিয়া কোম্পানিগুলি অর্থ পাচ্ছে।
সার্চ ইঞ্জিন কোম্পানি ‘গুগল’ ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্ক কর্তনের চিন্তা করার পর আবারও ছাড় দেয়ার মানসিকতা দেখাচ্ছে। তবে গত কয়েকদিনের মাঝেই ‘গুগল’ অস্ট্রেলিয়ার বেশ কয়েকটা মিডিয়া কোম্পানির সাথে চুক্তি করেছে। সার্চ ইঞ্জিনে মিডিয়া কোম্পানিগুলির কনটেন্ট যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মিডিয়া এসোসিয়েশন ‘নিউজ মিডিয়া এলায়েন্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৮ সালে নিউজ মিডিয়ার কারণে ‘গুগুল’ ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। ‘গুগল’এর ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবহার করে ‘গুগল’ যে আরও আয় করে, তা এই হিসেবে ধরা হয়নি। অথচ পুরো যুক্তরাষ্ট্রের নিউজ মিডিয়া একত্রে সেবছর আয় করেছে মাত্র ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। ‘নিউজ মিডিয়া এলায়েন্স’এর প্রেসিডেন্ট ডেভিড চ্যাভার্ন বলছেন যে, তথ্য চায় বিনা খরচায় পাঠকের কাছে পৌঁছাতে; কিন্তু সাংবাদিকদের তো এই কাজের বিনিময়ে অর্থ দরকার। যদি মিডিয়া কোম্পানিগুলি সাংবাদিকতার উন্নয়নে কাজ করে আর সোশাল মিডিয়া এর বিনিময়ে কোন অর্থ দিতে না চায়, তাহলে মিডিয়ার কাজ কঠিন হয়ে যায়। ‘গুগল’ বলছে যে, এই প্রতিবেদনে সঠিক তথ্য ফুটে ওঠেনি। ‘গুগল’ প্রতিমাসে মিডিয়া কোম্পানিগুলিকে ১০ বিলিয়ন ‘ক্লিক’ দিচ্ছে। এই ‘ক্লিক’ ব্যবহার করে মিডিয়া কোম্পানিগুলি পাঠক পাচ্ছে এবং বিজ্ঞাপন পাচ্ছে। ‘কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর বিল গ্রুসকিন ‘দ্যা গার্ডিয়ান’কে বলেন যে, এই গবেষণার ভিত বেশ দুর্বল। তিনি বলছেন যে, সোশাল মিডিয়াকে আরও নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। তবে মিডিয়া গ্রুপগুলিরও উচিৎ আরও শক্ত তথ্যের উপর তাদের প্রতিবেদনকে দাঁড় করানো।
‘ফেইসবুক’ অস্ট্রেলিয় মিডিয়াকে আটকাতে গিয়ে তাদের ডোমেইন বন্ধ করেনি; বরং ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘এআই’এর মাধ্যমে মিডিয়া কনটেন্ট বন্ধ করতে চেয়েছে। এখানেই হয়ে গেছে বিপত্তি। ‘ফেইসবুক’এর ‘এআই’ নিউজ মনে করে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি কিছু পেইজ বন্ধ করে দেয়। এর মাঝে ছিল অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য দপ্তর এবং জরুরি সেবাদানকারী সংস্থার ফেইসবুক পেইজ। অনেকেই কোম্পানির এহেন সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক’ বা ‘একনায়কোচিত’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কেউ কেউ এই দাবিও করতে শুরু করেছেন যে, মিডিয়াগুলি বন্ধ করে দেয়ায় মিথ্যা বানোয়াট খবরে ভরে যাচ্ছে ‘ফেইসবুক’। তবে উল্টোদিকে কেউ কেউ বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তাবিত আইনের পিছনে মিডিয়া টাইকুন রুপার্ট মারডকের হাত রয়েছে। মারডকের ‘নিউজ কর্প’ অস্ট্রেলিয়ার প্রধান পত্রিকাগুলির অনেকগুলিরই মালিক। অস্ট্রেলিয়ার বৃহৎ মিডিয়া কোম্পানি ‘নাইন এন্টারটেইনমেন্ট’ বলছে যে, অস্ট্রেলিয়ার সরকার ও ‘ফেইসবুক’এর আলোচনার খবরে তারা খুশি হয়েছে। তারা আশা করছে যে, অচিরেই এই আলোচনা নতুন একটা বাণিজ্যিক চুক্তির দিকে এগুবে। তবে এই পুরো ব্যাপারটা ‘ফেইসবুক’এর দুর্নামের কারণ হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন যে, ‘ফেইসবুক’ গায়ের জোরে নিজের স্বার্থকে ধরে রাখতে চাইছে। আর অস্ট্রেলিয়ার সাথে সমমনা দেশগুলি ব্যাপারটাকে খুব মনোযোগ সহকারে দেখছে, এবং তাদের দেশেও একই ধরনের আইন তৈরি করার ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়াকে উদাহরণ হিসেবে দেখছে।
গত ১৯শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, ‘ফেইসবুক’এর সাথে অস্ট্রেলিয়া সরকারের দ্বন্দ্বকে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটা বেসরকারি কোম্পানির সাথে অস্ট্রেলিয় সরকারের ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে দেখছে। এই ব্যবসায়িক লেনদেনের মাঝে যারা যুক্ত রয়েছে, তারাই যেকোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। প্রাইসের কথায় পরিষ্কার যে, মার্কিন সরকার এই দ্বন্দ্বে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে দাঁড়াতে চাইছে না। ‘ফেইসবুক’ এবং ‘গুগল’এর মালিক ‘এলফাবেট’ উভয়েই মার্কিন কোম্পানি। ২০২০ সালে ‘এলফাবেট’ আয় করে প্রায় ১’শ ৮২ বিলিয়ন ডলার। আর ‘ফেইসবুক’ আয় করে ৮৬ বিলিয়ন ডলার। ‘গ্লোবাল ফিনান্স ম্যাগাজিন’এর হিসেবে ২০২০ সালের শেষে ‘এলফাবেট’এর বাজারমূল্য ছিল ১১’শ ১৬ বিলিয়ন ডলার; আর ‘ফেইসবুক’এর বাজারমূল্য ছিল ৭’শ ৯৫ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের সবচাইতে দামি কোম্পানিগুলির মাঝে ‘এলফাবেট’ ৫ম; আর ‘ফেইসবুক’ ৭ম। সবচাইতে দামি ১০টা কোম্পানির মাঝে ৬টাই মার্কিন; যার মাঝে ‘এপল’, ‘আমাজন’ এবং ‘মাইক্রোসফট’ও রয়েছে।
অপরদিকে ব্রিটেন সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে কথা বলেছে এবং সোশাল মিডিয়াকে একটা শৃংখলার মাঝে আনার প্রচেষ্টার আভাস দিয়েছে। ১৯শে ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস ক্লেভারলি ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, ব্রিটেন অবশ্যই অস্ট্রেলিয়ার সাথে ‘ফেইসবুক’এর সমস্যার সমাধান চায়। তবে শেষ পর্যন্ত এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, একটা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের মাঝে যেন একটা ব্যালান্স থাকে। ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’ বলছে যে, আরও কিছু দেশ অস্ট্রেলিয়াকে অনুসরণ করতে যাচ্ছে। ব্রিটিশ কমনওয়েলথের আরেক সদস্যরাষ্ট্র কানাডা অস্ট্রেলিয়াকে অনুসরণ করতে চাইছে। কানাডার মন্ত্রী স্টিফেন গাইলবল্ট বলেন যে, ‘ফেইসবুক’ যা করেছে তা একেবারেই ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’। কানাডা এই যুদ্ধের সন্মুখে রয়েছে; এবং ভীত হবে না। ‘ফেইসবুক’ এবং ‘গুগল’কে আয় শেয়ার করতে বাধ্য করতে কিছুদিন আগেই গাইলবল্ট অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ফিনল্যান্ডের মন্ত্রীদের সাথে বসে একটা কোয়ালিশন তৈরি করতে চেয়েছেন। তিনি আশা করছেন যে, ১৫টা দেশ এই কোয়ালিশনে যুক্ত হতে পারে। তিনি প্রশ্ন করেন যে, ‘ফেইসবুক’ কি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি এবং অন্যান্য সকল রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে? ক্লেভারলি এবং গাইলবল্টের কথাগুলি বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, ব্রিটিশ কমনওয়েলথের দেশগুলি ‘ফেইসবুক’ এবং ‘গুগল’এর বিরুদ্ধে একটা আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন তৈরি করতে চাইছে; যার মূলে থাকবে নতুন কিছু আইন। আন্তর্জাতিক আইনকে নিজের প্রভাব বৃদ্ধিতে ব্যবহার করতে চাইছে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’। এক্ষেত্রে ইউরোপিয় পুঁজিবাদের পুরোনো স্তম্ভ সংবাদ মাধ্যমকে ব্যবহার করে আইনগত নেতৃত্ব নেয়ার মাধ্যমে মূলতঃ মার্কিন নেতৃত্বে থাকা সোশাল মিডিয়ার বিরুদ্ধে বাকি দুনিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশকে তাদের সাথে চাইছে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ কোন সুযোগই হাতছাড়া করতে চাইছে না; বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে, যার মাধ্যমে ব্রিটেন একসময় দুনিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছে।
Labels:
Australia,
Britain,
Canada,
Facebook,
Geopolitics,
Global Britain,
Google,
New World Order,
Social Media,
USA
Saturday, 20 February 2021
ফ্রান্স কি উগ্রপন্থী সেকুলার রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে?
২০শে ফেব্রুয়ারি ২০২১
ফ্রান্সের পার্লামেন্টে নতুন একটা আইন পাস করা নিয়ে আলোচনার সূচনা হয়েছে। গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ৩’শ ৪৭ ভোট বনাম ১’শ ৫১ ভোটে ‘প্রজাতন্ত্রের ভিত্তিগুলির উপর সন্মানের সমর্থনে’ এই নতুন বিল পাস হয়। ৬৫ জন ভোট দানে বিরত থাকে। এই আইনের মাধ্যমে ফ্রান্সের মসজিদ, স্কুল এবং স্পোর্টস ক্লাবগুলির উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হবে। এটা প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রকল্পের অংশ, যার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে উগ্রবাদী ইসলাম থেকে ফ্রান্সকে এবং ফ্রান্সের সেকুলার আদর্শকে রক্ষা করা। বার্তা সংস্থা ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, নিম্নকক্ষের পর এই বিল উচ্চকক্ষে যাবে ৩০শে মার্চ; যেখানে এই বিল প্রায় নিশ্চিতভাবেই পাস হবে। তবে ফ্রান্সের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর এই আইন ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে বলে মনে করছেন অনেকেই। একইসাথে ইসলামের প্রতি ফরাসিদের উগ্রপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিরও বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে এতে।
এই আইনের বিপক্ষে থাকা রাজনীতিবিদেরা বলছেন যে, আইনে যা প্রস্তাব করা হয়েছে, তা মূলতঃ অন্যান্য আইনে ইতোমধ্যেই রয়েছে। এখানে অন্য কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকতে পারে। বিল উত্থাপন করা ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন পার্লামেন্টে ভোটাভুটির কিছুদিন আগেই বিরোধী দলীয় উগ্র ডানপন্থী নেতা মারিন লা পেনএর দিকে আঙ্গুল তাক করে বলেন যে, লা পেন উগ্রবাদী ইসলামের প্রতি বেশ ‘নরম’ অবস্থান নিয়েছেন। তার ‘ভিটামিন দরকার’। এই মন্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল এটা প্রমাণ করা যে, ম্যাক্রঁর সরকার উগ্রবাদী ইসলামের ব্যাপারে উগ্র ডানপন্থীদের চাইতে বেশি শক্ত অবস্থান নিয়েছে। ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে ডানপন্থী ভোটারদেরকে ম্যাক্রঁর দিকে টেনে আনা এর লক্ষ্য হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। অপরদিকে মারিন লা পেন নতুন আইনকে দুর্বল বলছেন। ‘বিএফএম’ টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে লা পেনের উগ্র ডানপন্থী ‘ন্যাশনাল র্যালি পার্টি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট জরডান বারডেলা বলছেন যে, নতুন আইন ‘টার্গেট মিস’ করেছে; কারণ এটা উগ্রবাদী ইসলামী আদর্শকে সরাসরি আক্রমণ করেনি। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, নতুন বিলে মুসলিম বা ইসলামের নাম উচ্চারিত হয়নি। সমর্থকেরা বলছেন যে, এই বিলে ফ্রান্সের সেকুলার আদর্শ এবং লিঙ্গ সমতাকেই রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে। ম্যাক্রঁ এই বিলকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আইন বলছেন; কারণ উগ্রবাদীদেরকে তিনি ফ্রান্সের সমাজের বিরোধিতাকারী হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
নতুন আইনে তিন বছর বয়স থেকে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে সেকুলার আদর্শ শেখাতে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে; যাতে করে শিশুর পরিবার নিজ বাড়িতে আলাদা করে কোন আদর্শিক শিক্ষা দিতে না পারে। বাড়িতে শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। এতে বাড়িতে শিক্ষা নেয়া ৬২ হাজার শিশুর শিক্ষা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসবে। সরকারি অর্থে চলা মসজিদ এবং মসজিদের ব্যবস্থাপনায় থাকা বিভিন্ন এসোসিয়েশনকে সেকুলারিজম মেনে চলার জন্যে ফরাসি সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে। নিয়মের বাইরে গেলে সরকারি অর্থ ফেরত দিতে হবে। আর দেশের বাইরে থেকে অর্থায়ন হলেও ১২ হাজার ডলারের বেশি অর্থ পেলে সরকারকে জানাতে হবে; এবং বছরওয়ারি খরচের হিসেব দিতে হবে সরকারকে। পুলিশ অফিসার এবং কারাগারের কর্মচারীদের ফ্রান্সের সেকুলার সংবিধান এবং আদর্শের প্রতি নতুন করে আনুগত্য প্রকাশ করে শপথ নিতে হবে। সরকারি অফিসে কাজ করা বা সরকারের জন্যে কাজ করা কোন ব্যক্তি তার বিশ্বাস বোঝা যায়, এমন কোন কাপড় পরতে পারবে না। এর মাধ্যমে মূলতঃ মুসলিম মহিলাদের হিজাব পরাকেই বারন করা হয়েছে। একইসাথে সকল সরকারি কর্মচারীদেরকেও সেকুলারিজমের প্রশিক্ষণ দেবার কথা বলা হয়েছে। যেসকল খেলাধূলার এসোসিয়েশনকে উগ্রপন্থী বলে মনে হবে, সেগুলিকেও রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে আনা হবে। কোন ডাক্তার যদি কোন নারীর কুমারিত্বের সার্টিফিকেট দেয়, তবে তাকে ১৮ হাজার ডলার জরিমানা এবং ১ বছরের কারাদন্ড দেয়া হবে। কোন ব্যক্তির একসাথে দুই স্ত্রী থাকবে পারবে না; যদি কোন অভিবাসী এটা করে, তবে তাকে থাকার অনুমতি দেয়া হবে না। কোন বিবাহকে যদি জোরপূর্বক বলে মনে হয়, তাহলে আইনশৃংখলা বাহিনীকে অবহিত করা যাবে। নতুন এই আইনকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ১৯০৫ সালের সেকুলারিজম আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে; যার মাধ্যমে চার্চ এবং রাষ্ট্রকে আলাদা করা হয়েছিল।
বিল পাস হবার আগেই শ’দেড়েক মানুষ প্যারিসের রাস্তায় বিলের বিপক্ষে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করে। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে গত অক্টোবরে নিহত হওয়া ফরাসি শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটির এলাকার বাসিন্দা জেইনেব বুয়াবিবি বলছেন যে, এক ব্যাক্তির কর্মকান্ডের জন্যে পুরো মুসলিম সমাজকে আক্রমণ করাটা একেবারেই অনুচিত। তিনি বলছেন যে, মুসলিম নাম হবার কারণে ইউনিভার্সিটিতে এবং কর্মক্ষেত্রে তাকে বিদ্বেষের শিকার হতে হয়েছে। অনেকেই তাকে বলেছেন যে, ‘তুমি তোমার দেশে ফেরত যাও’; যদিও বুয়াবিবির জন্ম ফ্রান্সে। আর এরকম আইন পাস হলে মুসলিমবিদ্বষ আরও বেড়ে যেতে পারে। গত ১০ই ফেব্রুয়ারি এই বিলের বিপক্ষে এক খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন ১’শ জন ইমাম, ৫০ জন মুসলিম শিক্ষক এবং ৫০ জন এসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট।
ফ্রান্সে কত মুসলিম রয়েছে, তার সঠিক হিসেব কেউ দিতে না পারলেও তা ৩০ থেকে ৬৫ লক্ষের মাঝে হতে পারে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ফ্রান্সের সেকুলার আইনে জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা জিজ্ঞেস করা যায় না। ফরাসি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্সটিটুট মনটেইন’এর করা এক জনমত জরিপে বলা হচ্ছে যে, ফ্রান্সের মুসলিমদের ২৯ শতাংশ ইসলামের শরীয়া আইনকে ফরাসি রিপাবলিকের আইনের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। ৬৫ শতাংশ মুসলিম হিজাব পরার পক্ষে। উল্টোদিকে ‘লে মন্ড’ পত্রিকার জন্যে করা এক জরিপে বলা হচ্ছে যে, ৬০ শতাংশ ফরাসি মনে করে যে, ফ্রান্সের সেকুলার আদর্শের সাথে ইসলাম সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এমতাবস্থায় ফ্রান্সের নতুন আইন নিশ্চিতভাবেই মুসলিমদের বিশ্বাসগত বাধ্যবাধকতার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে যাচ্ছে, যা কিনা পশ্চিমা সেকুলার আদর্শের স্তম্ভ ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী। অপরপক্ষে ম্যাক্রঁর সরকার যখন নির্বাচনে জিততে উগ্র ডানপন্থীদের দলে টানার চেষ্টা করছেন, তখন গণতান্ত্রিকভাবেই এক উগ্রপন্থী সেকুলার রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে ফ্রান্স।
ফ্রান্সের পার্লামেন্টে নতুন একটা আইন পাস করা নিয়ে আলোচনার সূচনা হয়েছে। গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ৩’শ ৪৭ ভোট বনাম ১’শ ৫১ ভোটে ‘প্রজাতন্ত্রের ভিত্তিগুলির উপর সন্মানের সমর্থনে’ এই নতুন বিল পাস হয়। ৬৫ জন ভোট দানে বিরত থাকে। এই আইনের মাধ্যমে ফ্রান্সের মসজিদ, স্কুল এবং স্পোর্টস ক্লাবগুলির উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হবে। এটা প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রকল্পের অংশ, যার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে উগ্রবাদী ইসলাম থেকে ফ্রান্সকে এবং ফ্রান্সের সেকুলার আদর্শকে রক্ষা করা। বার্তা সংস্থা ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, নিম্নকক্ষের পর এই বিল উচ্চকক্ষে যাবে ৩০শে মার্চ; যেখানে এই বিল প্রায় নিশ্চিতভাবেই পাস হবে। তবে ফ্রান্সের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর এই আইন ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে বলে মনে করছেন অনেকেই। একইসাথে ইসলামের প্রতি ফরাসিদের উগ্রপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিরও বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে এতে।
এই আইনের বিপক্ষে থাকা রাজনীতিবিদেরা বলছেন যে, আইনে যা প্রস্তাব করা হয়েছে, তা মূলতঃ অন্যান্য আইনে ইতোমধ্যেই রয়েছে। এখানে অন্য কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকতে পারে। বিল উত্থাপন করা ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন পার্লামেন্টে ভোটাভুটির কিছুদিন আগেই বিরোধী দলীয় উগ্র ডানপন্থী নেতা মারিন লা পেনএর দিকে আঙ্গুল তাক করে বলেন যে, লা পেন উগ্রবাদী ইসলামের প্রতি বেশ ‘নরম’ অবস্থান নিয়েছেন। তার ‘ভিটামিন দরকার’। এই মন্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল এটা প্রমাণ করা যে, ম্যাক্রঁর সরকার উগ্রবাদী ইসলামের ব্যাপারে উগ্র ডানপন্থীদের চাইতে বেশি শক্ত অবস্থান নিয়েছে। ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে ডানপন্থী ভোটারদেরকে ম্যাক্রঁর দিকে টেনে আনা এর লক্ষ্য হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। অপরদিকে মারিন লা পেন নতুন আইনকে দুর্বল বলছেন। ‘বিএফএম’ টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে লা পেনের উগ্র ডানপন্থী ‘ন্যাশনাল র্যালি পার্টি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট জরডান বারডেলা বলছেন যে, নতুন আইন ‘টার্গেট মিস’ করেছে; কারণ এটা উগ্রবাদী ইসলামী আদর্শকে সরাসরি আক্রমণ করেনি। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, নতুন বিলে মুসলিম বা ইসলামের নাম উচ্চারিত হয়নি। সমর্থকেরা বলছেন যে, এই বিলে ফ্রান্সের সেকুলার আদর্শ এবং লিঙ্গ সমতাকেই রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে। ম্যাক্রঁ এই বিলকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আইন বলছেন; কারণ উগ্রবাদীদেরকে তিনি ফ্রান্সের সমাজের বিরোধিতাকারী হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
নতুন আইনে তিন বছর বয়স থেকে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে সেকুলার আদর্শ শেখাতে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে; যাতে করে শিশুর পরিবার নিজ বাড়িতে আলাদা করে কোন আদর্শিক শিক্ষা দিতে না পারে। বাড়িতে শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। এতে বাড়িতে শিক্ষা নেয়া ৬২ হাজার শিশুর শিক্ষা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসবে। সরকারি অর্থে চলা মসজিদ এবং মসজিদের ব্যবস্থাপনায় থাকা বিভিন্ন এসোসিয়েশনকে সেকুলারিজম মেনে চলার জন্যে ফরাসি সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে। নিয়মের বাইরে গেলে সরকারি অর্থ ফেরত দিতে হবে। আর দেশের বাইরে থেকে অর্থায়ন হলেও ১২ হাজার ডলারের বেশি অর্থ পেলে সরকারকে জানাতে হবে; এবং বছরওয়ারি খরচের হিসেব দিতে হবে সরকারকে। পুলিশ অফিসার এবং কারাগারের কর্মচারীদের ফ্রান্সের সেকুলার সংবিধান এবং আদর্শের প্রতি নতুন করে আনুগত্য প্রকাশ করে শপথ নিতে হবে। সরকারি অফিসে কাজ করা বা সরকারের জন্যে কাজ করা কোন ব্যক্তি তার বিশ্বাস বোঝা যায়, এমন কোন কাপড় পরতে পারবে না। এর মাধ্যমে মূলতঃ মুসলিম মহিলাদের হিজাব পরাকেই বারন করা হয়েছে। একইসাথে সকল সরকারি কর্মচারীদেরকেও সেকুলারিজমের প্রশিক্ষণ দেবার কথা বলা হয়েছে। যেসকল খেলাধূলার এসোসিয়েশনকে উগ্রপন্থী বলে মনে হবে, সেগুলিকেও রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে আনা হবে। কোন ডাক্তার যদি কোন নারীর কুমারিত্বের সার্টিফিকেট দেয়, তবে তাকে ১৮ হাজার ডলার জরিমানা এবং ১ বছরের কারাদন্ড দেয়া হবে। কোন ব্যক্তির একসাথে দুই স্ত্রী থাকবে পারবে না; যদি কোন অভিবাসী এটা করে, তবে তাকে থাকার অনুমতি দেয়া হবে না। কোন বিবাহকে যদি জোরপূর্বক বলে মনে হয়, তাহলে আইনশৃংখলা বাহিনীকে অবহিত করা যাবে। নতুন এই আইনকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ১৯০৫ সালের সেকুলারিজম আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে; যার মাধ্যমে চার্চ এবং রাষ্ট্রকে আলাদা করা হয়েছিল।
বিল পাস হবার আগেই শ’দেড়েক মানুষ প্যারিসের রাস্তায় বিলের বিপক্ষে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করে। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে গত অক্টোবরে নিহত হওয়া ফরাসি শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটির এলাকার বাসিন্দা জেইনেব বুয়াবিবি বলছেন যে, এক ব্যাক্তির কর্মকান্ডের জন্যে পুরো মুসলিম সমাজকে আক্রমণ করাটা একেবারেই অনুচিত। তিনি বলছেন যে, মুসলিম নাম হবার কারণে ইউনিভার্সিটিতে এবং কর্মক্ষেত্রে তাকে বিদ্বেষের শিকার হতে হয়েছে। অনেকেই তাকে বলেছেন যে, ‘তুমি তোমার দেশে ফেরত যাও’; যদিও বুয়াবিবির জন্ম ফ্রান্সে। আর এরকম আইন পাস হলে মুসলিমবিদ্বষ আরও বেড়ে যেতে পারে। গত ১০ই ফেব্রুয়ারি এই বিলের বিপক্ষে এক খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন ১’শ জন ইমাম, ৫০ জন মুসলিম শিক্ষক এবং ৫০ জন এসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট।
ফ্রান্সে কত মুসলিম রয়েছে, তার সঠিক হিসেব কেউ দিতে না পারলেও তা ৩০ থেকে ৬৫ লক্ষের মাঝে হতে পারে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ফ্রান্সের সেকুলার আইনে জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা জিজ্ঞেস করা যায় না। ফরাসি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্সটিটুট মনটেইন’এর করা এক জনমত জরিপে বলা হচ্ছে যে, ফ্রান্সের মুসলিমদের ২৯ শতাংশ ইসলামের শরীয়া আইনকে ফরাসি রিপাবলিকের আইনের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। ৬৫ শতাংশ মুসলিম হিজাব পরার পক্ষে। উল্টোদিকে ‘লে মন্ড’ পত্রিকার জন্যে করা এক জরিপে বলা হচ্ছে যে, ৬০ শতাংশ ফরাসি মনে করে যে, ফ্রান্সের সেকুলার আদর্শের সাথে ইসলাম সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এমতাবস্থায় ফ্রান্সের নতুন আইন নিশ্চিতভাবেই মুসলিমদের বিশ্বাসগত বাধ্যবাধকতার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে যাচ্ছে, যা কিনা পশ্চিমা সেকুলার আদর্শের স্তম্ভ ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী। অপরপক্ষে ম্যাক্রঁর সরকার যখন নির্বাচনে জিততে উগ্র ডানপন্থীদের দলে টানার চেষ্টা করছেন, তখন গণতান্ত্রিকভাবেই এক উগ্রপন্থী সেকুলার রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে ফ্রান্স।
Labels:
French Republic,
Islam,
Muslims,
New World Order,
secularism
Thursday, 18 February 2021
ডলার ছাপিয়ে চলছে যুক্তরাষ্ট্র ..... কিন্তু এভাবে কতদিন?
১৯শে ফেব্রুয়ারি ২০২১
নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন করোনাভাইরাসের মহামারি এবং এর ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট মহামন্দা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বাঁচাতে ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১৯’শ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ প্রস্তাব করেছেন। এর মাঝে ১ ট্রিলিয়ন বা ১ হাজার বিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ সহায়তা হিসেবে খেটে খাওয়া মানুষকে দেয়া হবে। ৪’শ বিলিয়ন খরচ করা হবে ভ্যাকসিন এবং মেডিক্যাল ব্যবস্থার উন্নয়নের পিছনে। আরও ৪’শ ৪০ বিলিয়ন ডলার দেয়া হবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং ছোট ব্যবসাগুলিকে, যারা পুঁজি বাজার থেকে ঋণ পাবে না। ‘কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস’ বা ‘সিবিও’এর হিসেবে এই প্রণোদনা প্যাকেজ ২০২১ সালের পুরো মার্কিন জিডিপির প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে সমস্যা সেখানে নয়, ‘সিবিও’ হিসেব করে বলছে যে, ২০২১ সালে সরকারের পুরো রাজস্ব হবে খুব বেশি হলে সাড়ে ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩৫’শ বিলিয়ন ডলার হবে। অর্থাৎ ১৯’শ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ মার্কিন সরকারের বাৎসরিক রাজস্বের ৫৪ শতাংশ। অথচ এই ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ আসলে করোনাভাইরাসের কারণে বেড়ে যাওয়া খরচের উপরে যোগ হওয়া খরচ। ২০২১ সালে সরকারের বাজেট ঘাটতি হবে ২৩’শ বিলিয়ন ডলার; যা জিডিপির ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। আর রাষ্ট্রীয় ঋণ দাঁড়াচ্ছে জিডিপির ১’শ শতাংশ বা জিডিপির সমান। এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ।
‘সিএনএন’এর এক লেখায় ‘কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর জেফরি সাক্স বলছেন যে, বাইডেন তার করোনা প্রণোদনার ব্যাপারে বেশ শক্ত যুক্তি রেখেছেন; এবং একইসাথে দীর্ঘমেয়াদী উত্তোরণের পিছনেও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থ আসবে কোত্থেকে? বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো উন্নয়নে আরও ২ ট্রিলিয়ন বা ২ হাজার বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাক্স বলছেন যে, তিন পদ্ধতিতে এই কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। প্রথমতঃ মার্কিন সরকার আরও ঋণ করতে পারে। দ্বিতীয়তঃ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বা ‘ফেড’ আরও ডলার ছাপাতে পারে। আর তৃতীয়তঃ সরকার ট্যাক্স বাড়াতে পারে। সরকার ঋণ করতেই পারে। কিন্তু যখন রাষ্ট্রীয় ঋণ জিডিপির সমান, তখন ঋণ করার সীমা নিয়ে প্রশ্ন আসতেই পারে। আর ‘ফেড’ ফেব্রুয়ারি ২০২০ থেকে জানুয়ারি ২০২১ সালের মাঝে প্রায় ১৮’শ বিলিয়ন ডলার ছাপিয়েছে! বর্তমানে বাজারে থাকা মোট ডলার হলো ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন বা ৫২’শ বিলিয়ন। অর্থাৎ ২০২০ সালের এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র বাজারের মোট ডলারের ৩৪ শতাংশ ছাপিয়েছে! ২০০৮ সালে ‘ফেড’এর মোট ছাপানো ডলারের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮’শ ৪৭ বিলিয়ন ডলার। সাক্স বলছেন যে, ঋণ করার যেমন সীমা রয়েছে, তেমনি ডলার ছাপানোরও সীমা রয়েছে। কারণ ডলার বেশি ছাপালে মুদ্রাস্ফীতি হবে। তিনি বলছেন যে, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বেড়েছে, যা কিনা সামনের দিনগুলিতে আরও বেশি মুদ্রাস্ফীতির দিকেই ইঙ্গিত দেয়। এটা নিশ্চিত যে, ঋণ করে আর ডলার ছাপিয়ে সরকারের বাজেট ঘাটতি দূর করা যাবে না। তাই জনগণের উপর করের বোঝাও বাড়াতে হবে।
জেফরি সাক্সের কথার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যের মূল্যের দিকে তাকালে। ‘গোল্ড হাব’এর হিসেবে, ২০২০এর অগাস্টে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য আউন্স প্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পেরিয়ে যায়। ২০১৯এর ডিসেম্বরে তা ছিল প্রায় ১৪’শ ৭৯ ডলার। অর্থাৎ ২০২০ সালের আট মাসে স্বর্ণের মূল্য ৩৭ শতাংশ বেড়ে যায়! তবে এরপর কিছুটা কমে এসে স্বর্ণের মূল্য ২০২১এর ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১৭’শ ৮০ ডলার হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের মূল্যও বেড়েছে। ‘ট্রেডিং ইকনমিকস’এর হিসেবে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে গমের মূল্য যেখানে ছিল সর্বোচ্চ ৫’শ ৮০ ডলার, সেখানে ২০২১এর জানুয়ারিতে তা ৬’শ ৭৮ ডলারে উঠে যায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গমের মূল্য বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গমের মূল্য ৬’শ ৪৮ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা সর্বোচ্চ ৫’শ ৬৩ ডলার ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসেও মূল্য ১৫ শতাংশ বেশি রয়েছে।
‘ইউএসএ টুডে’র এক প্রতিবেদনে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেড’এর ডলার ছাপানোকে ‘জাদু’র সাথে তুলনা করা হয়। যখনই ডলারের দরকার পরবে, তখনই ‘ফেড’ কম্পিউটারের কিছু বাটন চাপ দিয়ে একেবারে শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে নেয়। ইলেকট্রনিক ডিপোজিটের মতো ‘ফেড’ ‘ভার্চুয়াল প্রিন্টিং’এর মাধ্যমে ডলার তৈরি করে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের কাছে পাঠিয়ে দেয়। ‘অক্সফোর্ড ইকনমিক্স’ বলছে যে, এটা করোনা মহামারি এবং এর ফলশ্রুতিতে মহামন্দা থেকে উত্তোরণের জন্যে একটা উপায়। নিউ ইয়র্কের ‘বার্ড কলেজ’এর অর্থনীতিবিদ পাভলিনা চেরনেভা বুঝিয়ে বলেন যে, একজন ব্যক্তি অর্থ দরকার হলে যেভাবে চেক লিখে একাউন্ট থেকে অর্থ তুলতে পারে, তেমনি বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিও ‘ফেড’ থেকে ঋণ নিতে পারে। মার্কিন কংগ্রেস বিশাল রাষ্ট্রীয় ঋণের অনুমোদন দিচ্ছে; আর সেটা পূরণ করে দিচ্ছে ‘ফেড’। ‘ফেড’এর ডলার ছাপানোর এই পদ্ধতির সমালোচক প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেনশনিয়াল প্রার্থী রন পল ‘ইউএসএ টুডে’কে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মিথ্যা অর্থ দিয়ে কাজ করছে। এখানে মাপকাঠিটাও বানোয়াট; যা কিনা সত্যিকার অর্থেই অবিশ্বাস্য! ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের ক্রেডিট কার্ডের বিল একটা বাটন চেপেই দিয়ে দিয়ে পারছেন না; নিজেদের কষ্ট করে আয় করে সেখান থেকে দিতে হচ্ছে। অথচ মার্কিন সরকার একটা বাটন চেপেই তার ঋণ পরিশোধ করে ফেলতে পারছে; কারণ সরকারের নিজস্ব ব্যাংক ডলার ছাপাচ্ছে!
মার্কিন সরকার ঋণ নেবার জন্যে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে। সেটা কিনে নেয় বিনিয়োগকারীরা। এর বিনিময়ে তারা সরকার থেকে সুদ আয় করে। মার্কিন সরকারের ‘গভর্নমেন্টে একাউন্টাবিলিটি অফিস’ বা ‘জিএও’এর ২০১৯ সালের হিসেবে সরকারের ইস্যু করা মোট ট্রেজারি বন্ডের প্রায় ১৪ শতাংশ ‘ফেড’ কিনেছে; বাকিটা কিনেছে মার্কিন এবং অন্য দেশের বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু গত মার্চ মাস থেকে মার্কিন সরকারের ইস্যু করা বেশিরভাগ ট্রেজারি বন্ড কিনেছে মার্কিন সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’। অর্থাৎ মার্কিন সরকারের একটা প্রতিষ্ঠান আরেকটা সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিচ্ছে! আর সেই ঋণের অর্থ এসেছে শূণ্য থেকে! রন পল বলছেন যে, এভাবে ডলার ছাপানোর অর্থ হলো অর্থনীতি ফুলে ফেঁপে বেলুনের মতো হয়ে যাবে। বাজারে পণ্য যা রয়েছে, তার চাইতে ডলার বেশি হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে মুদ্রাস্ফীতি হবে। এক ডলারে আগে যত পণ্য কেনা যেত, এখন তার চাইতে অনেক কম কেনা যাবে। রন পলের উল্টো কথা বলছেন ‘মডার্ন মনেটারি থিওরি’র অনুসারীরা। তারা বলছেন যে, বর্তমান ব্যবস্থায় ডলার ছাপিয়ে সরকার সর্বদাই তার ঋণগুলি শোধ করতে পারবে। কাজেই বাজেট ঘাটতি বা অনেক বেশি ঋণ কোন সমস্যা নয়। কিন্তু বিশ্বের সকল দেশ দরকার হলেই নিজের অর্থ নিজে ছাপিয়ে নিতে পারে না। আর বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ঋণ পেতে পারে, তা দুনিয়ার আর কেউ পেতে পারে না। সকলেই মার্কিন সরকারের ট্রেজারি বন্ড কিনতে চায়। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে?
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চলছে ঋণের উপর। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ২০১৯ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি ঋণ ছিল জিডিপির প্রায় ১’শ ৯২ শতাংশ! মার্কিন ‘ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট’এর হিসেব বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ঋণ প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন বা ২৭ হাজার বিলিয়ন ডলার! ‘ফ্রেড ইকনমিক ডাটা’ বলছে যে, এই ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ১’শ ২৭ শতাংশ! অর্থাৎ সরকারি ও বেসরকারি মিলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ দেশটার জিডিপির ৩’শ ১৯ শতাংশ বা তিন গুণেরও বেশি! এই ঋণের বেশিরভাগটাই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে আসেনি। যখনই দরকার হয়েছে, তখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বা ‘ফেড’ শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে দিয়েছে! এই ডলারই ১৯৭১ সাল থেকে সারা বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে চলছে। সেবছরের অগাস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ১৯৪৪ সালে করা ‘ব্রেটন উডস’ চুক্তি থেকে বের হয়ে যায়। সেই চুক্তি মোতাবেক মার্কিন ডলারের মূল্য স্বর্ণের সাথে যুক্ত করা ছিল। স্বর্ণকে মুদ্রা ব্যবস্থার মাপকাঠি হিসেবে রাখাকে বলা হতো ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’। কিন্তু চুক্তি থেকে বের হয়ে যাবার পর মার্কিন ডলারের মূল্যের কোন হদিসই থাকলো না। বরং অন্যান্য মুদ্রার মূল্য নির্ধারিত হতে থাকলো মার্কিন ডলারের বিপরীতে। ডলারই হয়ে গেল বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থার মাপকাঠি। ‘ম্যাক্রোট্রেন্ডস’এর এক হিসেবে দেখানো হচ্ছে যে, ১৯৪৪ সালে এক আউন্স স্বর্ণ কিনতে লাগতো প্রায় ৫’শ ডলারের মতো। সেটা ২০২১ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি ছিল ১৭’শ ৭২ ডলার ৮০ সেন্ট। এর মাঝে স্বর্ণের মূল্য বহুবার কমেছে বা বেড়েছে। আসলে স্বর্ণ আগের জায়গাতেই আছে; ডলারের মূল্য কমেছে বা বেড়েছে। ‘ফেড’ যখন ইচ্ছে ডলার ছাপিয়ে বা বাজার থেকে ডলার কিনে বাজারে ডলারের মূল্য ঠিক রাখার চেষ্টা করেছে। মার্কিন সরকারের নিজের ব্যাংক থেকে ইচ্ছেমতো ঋণ নেয়া এবং শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে ঘাটতি পূরণ করার এহেন কাহিনী গায়ের জোরে এক মুদ্রাব্যবস্থাকে ধরে রাখাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ এই ব্যবস্থাকে সমর্থনও করে যাচ্ছেন এই ভেবে যে, এটা কখনোই ভেঙ্গে পড়বে না। কিন্তু করোনা মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের গায়ের জোর কেন, কোনকিছুই আসলে স্থায়ী নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ডলারের স্থায়িত্ব কতদিন, তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও ডলারের উপর বিশ্ব অর্থনীতির নির্ভরশীলতা কতদিন যুক্তরাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখবে, সেব্যাপারে আলোচনা হতে পারে।
নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন করোনাভাইরাসের মহামারি এবং এর ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট মহামন্দা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বাঁচাতে ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১৯’শ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ প্রস্তাব করেছেন। এর মাঝে ১ ট্রিলিয়ন বা ১ হাজার বিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ সহায়তা হিসেবে খেটে খাওয়া মানুষকে দেয়া হবে। ৪’শ বিলিয়ন খরচ করা হবে ভ্যাকসিন এবং মেডিক্যাল ব্যবস্থার উন্নয়নের পিছনে। আরও ৪’শ ৪০ বিলিয়ন ডলার দেয়া হবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং ছোট ব্যবসাগুলিকে, যারা পুঁজি বাজার থেকে ঋণ পাবে না। ‘কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস’ বা ‘সিবিও’এর হিসেবে এই প্রণোদনা প্যাকেজ ২০২১ সালের পুরো মার্কিন জিডিপির প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে সমস্যা সেখানে নয়, ‘সিবিও’ হিসেব করে বলছে যে, ২০২১ সালে সরকারের পুরো রাজস্ব হবে খুব বেশি হলে সাড়ে ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩৫’শ বিলিয়ন ডলার হবে। অর্থাৎ ১৯’শ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ মার্কিন সরকারের বাৎসরিক রাজস্বের ৫৪ শতাংশ। অথচ এই ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ আসলে করোনাভাইরাসের কারণে বেড়ে যাওয়া খরচের উপরে যোগ হওয়া খরচ। ২০২১ সালে সরকারের বাজেট ঘাটতি হবে ২৩’শ বিলিয়ন ডলার; যা জিডিপির ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। আর রাষ্ট্রীয় ঋণ দাঁড়াচ্ছে জিডিপির ১’শ শতাংশ বা জিডিপির সমান। এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ।
‘সিএনএন’এর এক লেখায় ‘কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর জেফরি সাক্স বলছেন যে, বাইডেন তার করোনা প্রণোদনার ব্যাপারে বেশ শক্ত যুক্তি রেখেছেন; এবং একইসাথে দীর্ঘমেয়াদী উত্তোরণের পিছনেও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থ আসবে কোত্থেকে? বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো উন্নয়নে আরও ২ ট্রিলিয়ন বা ২ হাজার বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাক্স বলছেন যে, তিন পদ্ধতিতে এই কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। প্রথমতঃ মার্কিন সরকার আরও ঋণ করতে পারে। দ্বিতীয়তঃ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বা ‘ফেড’ আরও ডলার ছাপাতে পারে। আর তৃতীয়তঃ সরকার ট্যাক্স বাড়াতে পারে। সরকার ঋণ করতেই পারে। কিন্তু যখন রাষ্ট্রীয় ঋণ জিডিপির সমান, তখন ঋণ করার সীমা নিয়ে প্রশ্ন আসতেই পারে। আর ‘ফেড’ ফেব্রুয়ারি ২০২০ থেকে জানুয়ারি ২০২১ সালের মাঝে প্রায় ১৮’শ বিলিয়ন ডলার ছাপিয়েছে! বর্তমানে বাজারে থাকা মোট ডলার হলো ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন বা ৫২’শ বিলিয়ন। অর্থাৎ ২০২০ সালের এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র বাজারের মোট ডলারের ৩৪ শতাংশ ছাপিয়েছে! ২০০৮ সালে ‘ফেড’এর মোট ছাপানো ডলারের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮’শ ৪৭ বিলিয়ন ডলার। সাক্স বলছেন যে, ঋণ করার যেমন সীমা রয়েছে, তেমনি ডলার ছাপানোরও সীমা রয়েছে। কারণ ডলার বেশি ছাপালে মুদ্রাস্ফীতি হবে। তিনি বলছেন যে, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বেড়েছে, যা কিনা সামনের দিনগুলিতে আরও বেশি মুদ্রাস্ফীতির দিকেই ইঙ্গিত দেয়। এটা নিশ্চিত যে, ঋণ করে আর ডলার ছাপিয়ে সরকারের বাজেট ঘাটতি দূর করা যাবে না। তাই জনগণের উপর করের বোঝাও বাড়াতে হবে।
জেফরি সাক্সের কথার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যের মূল্যের দিকে তাকালে। ‘গোল্ড হাব’এর হিসেবে, ২০২০এর অগাস্টে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য আউন্স প্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পেরিয়ে যায়। ২০১৯এর ডিসেম্বরে তা ছিল প্রায় ১৪’শ ৭৯ ডলার। অর্থাৎ ২০২০ সালের আট মাসে স্বর্ণের মূল্য ৩৭ শতাংশ বেড়ে যায়! তবে এরপর কিছুটা কমে এসে স্বর্ণের মূল্য ২০২১এর ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১৭’শ ৮০ ডলার হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের মূল্যও বেড়েছে। ‘ট্রেডিং ইকনমিকস’এর হিসেবে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে গমের মূল্য যেখানে ছিল সর্বোচ্চ ৫’শ ৮০ ডলার, সেখানে ২০২১এর জানুয়ারিতে তা ৬’শ ৭৮ ডলারে উঠে যায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গমের মূল্য বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গমের মূল্য ৬’শ ৪৮ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা সর্বোচ্চ ৫’শ ৬৩ ডলার ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসেও মূল্য ১৫ শতাংশ বেশি রয়েছে।
‘ইউএসএ টুডে’র এক প্রতিবেদনে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেড’এর ডলার ছাপানোকে ‘জাদু’র সাথে তুলনা করা হয়। যখনই ডলারের দরকার পরবে, তখনই ‘ফেড’ কম্পিউটারের কিছু বাটন চাপ দিয়ে একেবারে শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে নেয়। ইলেকট্রনিক ডিপোজিটের মতো ‘ফেড’ ‘ভার্চুয়াল প্রিন্টিং’এর মাধ্যমে ডলার তৈরি করে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের কাছে পাঠিয়ে দেয়। ‘অক্সফোর্ড ইকনমিক্স’ বলছে যে, এটা করোনা মহামারি এবং এর ফলশ্রুতিতে মহামন্দা থেকে উত্তোরণের জন্যে একটা উপায়। নিউ ইয়র্কের ‘বার্ড কলেজ’এর অর্থনীতিবিদ পাভলিনা চেরনেভা বুঝিয়ে বলেন যে, একজন ব্যক্তি অর্থ দরকার হলে যেভাবে চেক লিখে একাউন্ট থেকে অর্থ তুলতে পারে, তেমনি বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিও ‘ফেড’ থেকে ঋণ নিতে পারে। মার্কিন কংগ্রেস বিশাল রাষ্ট্রীয় ঋণের অনুমোদন দিচ্ছে; আর সেটা পূরণ করে দিচ্ছে ‘ফেড’। ‘ফেড’এর ডলার ছাপানোর এই পদ্ধতির সমালোচক প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেনশনিয়াল প্রার্থী রন পল ‘ইউএসএ টুডে’কে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মিথ্যা অর্থ দিয়ে কাজ করছে। এখানে মাপকাঠিটাও বানোয়াট; যা কিনা সত্যিকার অর্থেই অবিশ্বাস্য! ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের ক্রেডিট কার্ডের বিল একটা বাটন চেপেই দিয়ে দিয়ে পারছেন না; নিজেদের কষ্ট করে আয় করে সেখান থেকে দিতে হচ্ছে। অথচ মার্কিন সরকার একটা বাটন চেপেই তার ঋণ পরিশোধ করে ফেলতে পারছে; কারণ সরকারের নিজস্ব ব্যাংক ডলার ছাপাচ্ছে!
মার্কিন সরকার ঋণ নেবার জন্যে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে। সেটা কিনে নেয় বিনিয়োগকারীরা। এর বিনিময়ে তারা সরকার থেকে সুদ আয় করে। মার্কিন সরকারের ‘গভর্নমেন্টে একাউন্টাবিলিটি অফিস’ বা ‘জিএও’এর ২০১৯ সালের হিসেবে সরকারের ইস্যু করা মোট ট্রেজারি বন্ডের প্রায় ১৪ শতাংশ ‘ফেড’ কিনেছে; বাকিটা কিনেছে মার্কিন এবং অন্য দেশের বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু গত মার্চ মাস থেকে মার্কিন সরকারের ইস্যু করা বেশিরভাগ ট্রেজারি বন্ড কিনেছে মার্কিন সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’। অর্থাৎ মার্কিন সরকারের একটা প্রতিষ্ঠান আরেকটা সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিচ্ছে! আর সেই ঋণের অর্থ এসেছে শূণ্য থেকে! রন পল বলছেন যে, এভাবে ডলার ছাপানোর অর্থ হলো অর্থনীতি ফুলে ফেঁপে বেলুনের মতো হয়ে যাবে। বাজারে পণ্য যা রয়েছে, তার চাইতে ডলার বেশি হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে মুদ্রাস্ফীতি হবে। এক ডলারে আগে যত পণ্য কেনা যেত, এখন তার চাইতে অনেক কম কেনা যাবে। রন পলের উল্টো কথা বলছেন ‘মডার্ন মনেটারি থিওরি’র অনুসারীরা। তারা বলছেন যে, বর্তমান ব্যবস্থায় ডলার ছাপিয়ে সরকার সর্বদাই তার ঋণগুলি শোধ করতে পারবে। কাজেই বাজেট ঘাটতি বা অনেক বেশি ঋণ কোন সমস্যা নয়। কিন্তু বিশ্বের সকল দেশ দরকার হলেই নিজের অর্থ নিজে ছাপিয়ে নিতে পারে না। আর বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ঋণ পেতে পারে, তা দুনিয়ার আর কেউ পেতে পারে না। সকলেই মার্কিন সরকারের ট্রেজারি বন্ড কিনতে চায়। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে?
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চলছে ঋণের উপর। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ২০১৯ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি ঋণ ছিল জিডিপির প্রায় ১’শ ৯২ শতাংশ! মার্কিন ‘ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট’এর হিসেব বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ঋণ প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন বা ২৭ হাজার বিলিয়ন ডলার! ‘ফ্রেড ইকনমিক ডাটা’ বলছে যে, এই ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ১’শ ২৭ শতাংশ! অর্থাৎ সরকারি ও বেসরকারি মিলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ দেশটার জিডিপির ৩’শ ১৯ শতাংশ বা তিন গুণেরও বেশি! এই ঋণের বেশিরভাগটাই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে আসেনি। যখনই দরকার হয়েছে, তখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বা ‘ফেড’ শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে দিয়েছে! এই ডলারই ১৯৭১ সাল থেকে সারা বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে চলছে। সেবছরের অগাস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ১৯৪৪ সালে করা ‘ব্রেটন উডস’ চুক্তি থেকে বের হয়ে যায়। সেই চুক্তি মোতাবেক মার্কিন ডলারের মূল্য স্বর্ণের সাথে যুক্ত করা ছিল। স্বর্ণকে মুদ্রা ব্যবস্থার মাপকাঠি হিসেবে রাখাকে বলা হতো ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’। কিন্তু চুক্তি থেকে বের হয়ে যাবার পর মার্কিন ডলারের মূল্যের কোন হদিসই থাকলো না। বরং অন্যান্য মুদ্রার মূল্য নির্ধারিত হতে থাকলো মার্কিন ডলারের বিপরীতে। ডলারই হয়ে গেল বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থার মাপকাঠি। ‘ম্যাক্রোট্রেন্ডস’এর এক হিসেবে দেখানো হচ্ছে যে, ১৯৪৪ সালে এক আউন্স স্বর্ণ কিনতে লাগতো প্রায় ৫’শ ডলারের মতো। সেটা ২০২১ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি ছিল ১৭’শ ৭২ ডলার ৮০ সেন্ট। এর মাঝে স্বর্ণের মূল্য বহুবার কমেছে বা বেড়েছে। আসলে স্বর্ণ আগের জায়গাতেই আছে; ডলারের মূল্য কমেছে বা বেড়েছে। ‘ফেড’ যখন ইচ্ছে ডলার ছাপিয়ে বা বাজার থেকে ডলার কিনে বাজারে ডলারের মূল্য ঠিক রাখার চেষ্টা করেছে। মার্কিন সরকারের নিজের ব্যাংক থেকে ইচ্ছেমতো ঋণ নেয়া এবং শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে ঘাটতি পূরণ করার এহেন কাহিনী গায়ের জোরে এক মুদ্রাব্যবস্থাকে ধরে রাখাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ এই ব্যবস্থাকে সমর্থনও করে যাচ্ছেন এই ভেবে যে, এটা কখনোই ভেঙ্গে পড়বে না। কিন্তু করোনা মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের গায়ের জোর কেন, কোনকিছুই আসলে স্থায়ী নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ডলারের স্থায়িত্ব কতদিন, তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও ডলারের উপর বিশ্ব অর্থনীতির নির্ভরশীলতা কতদিন যুক্তরাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখবে, সেব্যাপারে আলোচনা হতে পারে।
Labels:
coronavirus,
COVID-19,
currency,
Federal Reserve,
Joe Biden,
New World Order,
US Dollar,
USA,
USD
Monday, 15 February 2021
তুরস্ক কেন বাইডেন প্রশাসনকে ছাড় দিতে চাইছে?
১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২১
গত ১০ই ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, রুশ নির্মিত ‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর যে অবরোধ দিয়েছে, তা উঠিয়ে নেয়া হবে না। এব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তন হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে আহ্বান জানাচ্ছে যাতে তুরস্ক এই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না রাখে। ‘আল মনিটর’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তা আসলো তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের একদিন পরই, যেখানে তিনি ‘এস ৪০০’এর ব্যাপারে আলোচনায় বসার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। একইসাথে বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তুর্কি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলে যে, ‘এস ৪০০’ ইস্যুতে তুরস্ক ছাড় দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্দিষ্ট গন্ডির মাঝে এগুলিকে ব্যবহার করার মাধ্যমে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে। গত ডিসেম্বরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তুরস্কের প্রতিরক্ষা ক্রয় দপ্তরের উপর অবরোধ আরোপ করে। নতুন বাইডেন প্রশাসনের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক বেশ ঠান্ডাভাবেই শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বা পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন এখনও তুরস্কের নেতৃত্বের সাথে সরাসরি কথা বলেননি। তবে ফেব্রুয়ারির শুরুতেই মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভান কথা বলেছেন তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইব্রাহিম কালিনের সাথে। তুরস্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মূল দরকষাকষির জায়গাটা ‘এস ৪০০’এর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; এখানে কুর্দি প্রশ্নটাও জড়িত।
২০১৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার কুর্দি সশস্ত্র গ্রুপ ‘ওয়াইপিজি’কে ‘সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস’ বা ‘এসডিএফ’ নামে ডাকে। তুরস্ক বলছে যে, ‘ওয়াইপিজি’র মূল নেতৃত্ব হলো ‘পিকেকে’র হাতে; যাদের বিরুদ্ধে তুরস্ক সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের আভিযোগ করে আসছে বহুদিন থেকেই। তুরস্কের দুশ্চিন্তা হলো, ‘ওয়াইপিজি’র জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন শেষ পর্যন্ত সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে একটা আলাদা কুর্দি সায়ত্বশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করবে। ৯ই ফেব্রুয়ারি তুরস্কের ‘হুরিয়েত ডেইলি নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে তুর্কি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকার বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের সবচাইতে সংবেদনশীল দিক হলো ‘ওয়াইপিজি’র জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন। ‘ওয়াইপিজি’ হলো ‘পিকেকে’র সিরিয় অংশ মাত্র। আইসিসের সাথে যুদ্ধ করার নিমিত্তে যুক্তরাষ্ট্র ‘ওয়াইপিজি’কে সমর্থন দিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র যে বলছে যে, ‘ওয়াইপিজি’র সাথে ‘পিকেকে’র কোন যোগাযোগ নেই, এটা পুরোপুরি ভিত্তিহীন একটা কথা। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স ‘ওয়াইপিজি’ এবং ‘পিকেকে’র মাঝে যোগাযোগ সম্পর্কে অবগত নয়, এটা বিশ্বাসযোগ্য ব্যাপার নয়। হুলুসি আকার বলেন যে, তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রকে বারংবার বলেছে যে, আইসিসের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে তুরস্কের সাথে সহযোগিতা করতে; ‘ওয়াইপিজি’র সাথে নয়। তবে ‘এস ৪০০’এর ব্যাপারে ছাড় দেবার আভাস দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন যে, ন্যাটোর অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্র, যেগুলি একসময় সোভিয়েত ব্লকে ছিল, তারা এখনও রুশ অস্ত্র ব্যবহার করছে। এবং সেগুলি ন্যাটোর সিস্টেমের মাঝেই অপারেট করছে। গ্রিস রাশিয়ার কাছ থেকে ‘এস ৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনে সেগুলিকে ক্রিট দ্বীপে মোতায়েনের মাধ্যমে একটা সমাধানে পৌঁছেছে। তুরস্কও তেমনি একটা সমাধানে পৌঁছার জন্যে আলোচনা করতে রাজি আছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে, এই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বদাই অপারেশনাল রাখতে হবে। বরং হুমকি বিবেচনায় এগুলিকে অপারেশনাল করা হবে। এগুলি অপারেশনাল রাখার ব্যাপারে তুরস্কই সিদ্ধান্ত নেবে।
আঙ্কারার ‘ফরেন পলিসি ইন্সটিটিউট’এর প্রফেসর হুসেইন বাগচি ‘ডেইলি সাবাহ’র সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, তুরস্কের রুশ ‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র মূলতঃ ন্যাটোর সমস্যা; যা এতো সহজেই সমাধান হয়ে যাচ্ছে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে তুরস্ককে কোনরূপ ছাড় দেয়ার দরকার মনে করছে না। তুরস্ক এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে প্রাধান্য নয়; প্রাধান্য এখন চীন, ইইউ, ন্যাটো এবং রাশিয়া। অপরদিকে তুরস্ক চাইছে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের দ্বন্দ্বের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হলো কুর্দি গ্রুপগুলি। কুর্দি গ্রুপ ‘ওয়াইপিজি’র সাথে তুরস্কের অভ্যন্তরের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত ‘পিকেকে’র সরাসরি যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ‘ওয়াইপিজি’কে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তুরস্ক এব্যাপারে ছাড় না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সমস্যা তৈরি করতে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সমস্যার আসলেই যেন কোন শেষ নেই। ৯ই ফেব্রুয়ারি মার্কিন সিনেটররা একটা চিঠি দেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে। চিঠিটা লেখেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর রন ওয়াইডেন এবং রিপাবলিকান সিনেটর মার্কো রুবিও। ৫৪ জন সিনেটর সেটাতে স্বাক্ষর করেন। চিঠিতে অভিযোগ করা হয় যে, তুরস্ক ক্রমেই একটা একনায়কোচিত নেতৃত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সেখানে বিরোধীদেরকে চাপের মুখে রাখা হচ্ছে। এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে অথবা চুপ করিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই চিঠির জবাবে তুরস্কের পার্লামেন্টের ৮৭ জন সদস্য একটা বিবৃতি দেন। এরা সকলেই ‘টার্কি ইউএস পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’এর সদস্য। তারা সমালোচনা করে বলেন যে, কৌশলগত সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা এটা আশা করেন না। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পারস্পরিক সন্মান প্রদর্শনের ব্যাপারটা মনে করিয়ে দেন। একইসাথে তারা বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ৬ই জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেসে হামলাকারীদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দিলেও ২০১৬ সালে তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত থাকা ফেতুল্লা গুলেনের অনুসারীদেরকে মানবাধিকার কর্মী বলে আখ্যা দিচ্ছে। সেই অভ্যুত্থান চেষ্টায় ২’শ ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গুলেনের সমর্থকদের কথাগুলিকে তুলে ধরে মার্কিন সিনেটররা একাধারে যেমন দ্বিমুখী নীতি নিয়েছেন, তেমনি তা ২০১৬ সালের সেই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় জড়িত না থাকার মার্কিন বিবৃতিগুলিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তুর্কি পার্লামেন্টের সদস্যরাও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখারই পক্ষপাতি। পার্লামেন্টের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটরদের চিঠির সমালোচনা করেছেন সম্পর্কোন্নয়নের উদ্দেশ্যেই; শত্রু ভেবে নয়। তারা বলেছেন যে, ২০১৬ সালের অভ্যুত্থান চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র জড়িত ছিল; তবুও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বন্ধু হিসেবেই দেখতে চাইছেন। তারা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে দ্বিমুখী আচরণ করছে; তবুও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে চাইছেন। তুরস্ক সরকার ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপারে বাইডেন প্রশাসনকে ছাড় দিতে চাইছে; যদিও যুক্তরাষ্ট্র কুর্দি গ্রুপ ‘ওয়াইপিজি’কে সমর্থন দিয়ে আসছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পের সহযোগিতা হারাতে চাইছে না তুরস্ক। হুসেইন বাগচি বলছিলেন যে, তুরস্ক এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু তুরস্ক কি সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবার আশাই করে যাবে? নাকি ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের কক্ষপথ থেকে বের হবার চেষ্টা করবে? পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় তুরস্ক আঞ্চলিকভাবে এবং বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব বিস্তারে মনোনিবেশ করলেও এখনও যে তা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে বাইপাস করতে পারেনি, তা পরিষ্কার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের জনগণের মাঝে যে ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষার উদ্ভব হয়েছে, তা কতোদিন মার্কিন নীতির শৃংখলের মাঝে আটকে থাকবে, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। বাস্তবিকপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী প্রভাব হারাবার বাস্তবতায় সেটাই মূল আলোচ্য বিষয়।
গত ১০ই ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, রুশ নির্মিত ‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর যে অবরোধ দিয়েছে, তা উঠিয়ে নেয়া হবে না। এব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তন হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে আহ্বান জানাচ্ছে যাতে তুরস্ক এই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না রাখে। ‘আল মনিটর’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তা আসলো তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের একদিন পরই, যেখানে তিনি ‘এস ৪০০’এর ব্যাপারে আলোচনায় বসার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। একইসাথে বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তুর্কি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলে যে, ‘এস ৪০০’ ইস্যুতে তুরস্ক ছাড় দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্দিষ্ট গন্ডির মাঝে এগুলিকে ব্যবহার করার মাধ্যমে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে। গত ডিসেম্বরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তুরস্কের প্রতিরক্ষা ক্রয় দপ্তরের উপর অবরোধ আরোপ করে। নতুন বাইডেন প্রশাসনের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক বেশ ঠান্ডাভাবেই শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বা পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন এখনও তুরস্কের নেতৃত্বের সাথে সরাসরি কথা বলেননি। তবে ফেব্রুয়ারির শুরুতেই মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভান কথা বলেছেন তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইব্রাহিম কালিনের সাথে। তুরস্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মূল দরকষাকষির জায়গাটা ‘এস ৪০০’এর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; এখানে কুর্দি প্রশ্নটাও জড়িত।
২০১৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার কুর্দি সশস্ত্র গ্রুপ ‘ওয়াইপিজি’কে ‘সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস’ বা ‘এসডিএফ’ নামে ডাকে। তুরস্ক বলছে যে, ‘ওয়াইপিজি’র মূল নেতৃত্ব হলো ‘পিকেকে’র হাতে; যাদের বিরুদ্ধে তুরস্ক সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের আভিযোগ করে আসছে বহুদিন থেকেই। তুরস্কের দুশ্চিন্তা হলো, ‘ওয়াইপিজি’র জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন শেষ পর্যন্ত সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে একটা আলাদা কুর্দি সায়ত্বশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করবে। ৯ই ফেব্রুয়ারি তুরস্কের ‘হুরিয়েত ডেইলি নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে তুর্কি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকার বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের সবচাইতে সংবেদনশীল দিক হলো ‘ওয়াইপিজি’র জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন। ‘ওয়াইপিজি’ হলো ‘পিকেকে’র সিরিয় অংশ মাত্র। আইসিসের সাথে যুদ্ধ করার নিমিত্তে যুক্তরাষ্ট্র ‘ওয়াইপিজি’কে সমর্থন দিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র যে বলছে যে, ‘ওয়াইপিজি’র সাথে ‘পিকেকে’র কোন যোগাযোগ নেই, এটা পুরোপুরি ভিত্তিহীন একটা কথা। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স ‘ওয়াইপিজি’ এবং ‘পিকেকে’র মাঝে যোগাযোগ সম্পর্কে অবগত নয়, এটা বিশ্বাসযোগ্য ব্যাপার নয়। হুলুসি আকার বলেন যে, তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রকে বারংবার বলেছে যে, আইসিসের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে তুরস্কের সাথে সহযোগিতা করতে; ‘ওয়াইপিজি’র সাথে নয়। তবে ‘এস ৪০০’এর ব্যাপারে ছাড় দেবার আভাস দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন যে, ন্যাটোর অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্র, যেগুলি একসময় সোভিয়েত ব্লকে ছিল, তারা এখনও রুশ অস্ত্র ব্যবহার করছে। এবং সেগুলি ন্যাটোর সিস্টেমের মাঝেই অপারেট করছে। গ্রিস রাশিয়ার কাছ থেকে ‘এস ৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনে সেগুলিকে ক্রিট দ্বীপে মোতায়েনের মাধ্যমে একটা সমাধানে পৌঁছেছে। তুরস্কও তেমনি একটা সমাধানে পৌঁছার জন্যে আলোচনা করতে রাজি আছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে, এই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বদাই অপারেশনাল রাখতে হবে। বরং হুমকি বিবেচনায় এগুলিকে অপারেশনাল করা হবে। এগুলি অপারেশনাল রাখার ব্যাপারে তুরস্কই সিদ্ধান্ত নেবে।
আঙ্কারার ‘ফরেন পলিসি ইন্সটিটিউট’এর প্রফেসর হুসেইন বাগচি ‘ডেইলি সাবাহ’র সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, তুরস্কের রুশ ‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র মূলতঃ ন্যাটোর সমস্যা; যা এতো সহজেই সমাধান হয়ে যাচ্ছে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে তুরস্ককে কোনরূপ ছাড় দেয়ার দরকার মনে করছে না। তুরস্ক এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে প্রাধান্য নয়; প্রাধান্য এখন চীন, ইইউ, ন্যাটো এবং রাশিয়া। অপরদিকে তুরস্ক চাইছে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের দ্বন্দ্বের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হলো কুর্দি গ্রুপগুলি। কুর্দি গ্রুপ ‘ওয়াইপিজি’র সাথে তুরস্কের অভ্যন্তরের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত ‘পিকেকে’র সরাসরি যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ‘ওয়াইপিজি’কে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তুরস্ক এব্যাপারে ছাড় না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সমস্যা তৈরি করতে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সমস্যার আসলেই যেন কোন শেষ নেই। ৯ই ফেব্রুয়ারি মার্কিন সিনেটররা একটা চিঠি দেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে। চিঠিটা লেখেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর রন ওয়াইডেন এবং রিপাবলিকান সিনেটর মার্কো রুবিও। ৫৪ জন সিনেটর সেটাতে স্বাক্ষর করেন। চিঠিতে অভিযোগ করা হয় যে, তুরস্ক ক্রমেই একটা একনায়কোচিত নেতৃত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সেখানে বিরোধীদেরকে চাপের মুখে রাখা হচ্ছে। এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে অথবা চুপ করিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই চিঠির জবাবে তুরস্কের পার্লামেন্টের ৮৭ জন সদস্য একটা বিবৃতি দেন। এরা সকলেই ‘টার্কি ইউএস পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’এর সদস্য। তারা সমালোচনা করে বলেন যে, কৌশলগত সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা এটা আশা করেন না। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পারস্পরিক সন্মান প্রদর্শনের ব্যাপারটা মনে করিয়ে দেন। একইসাথে তারা বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ৬ই জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেসে হামলাকারীদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দিলেও ২০১৬ সালে তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত থাকা ফেতুল্লা গুলেনের অনুসারীদেরকে মানবাধিকার কর্মী বলে আখ্যা দিচ্ছে। সেই অভ্যুত্থান চেষ্টায় ২’শ ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গুলেনের সমর্থকদের কথাগুলিকে তুলে ধরে মার্কিন সিনেটররা একাধারে যেমন দ্বিমুখী নীতি নিয়েছেন, তেমনি তা ২০১৬ সালের সেই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় জড়িত না থাকার মার্কিন বিবৃতিগুলিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তুর্কি পার্লামেন্টের সদস্যরাও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখারই পক্ষপাতি। পার্লামেন্টের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটরদের চিঠির সমালোচনা করেছেন সম্পর্কোন্নয়নের উদ্দেশ্যেই; শত্রু ভেবে নয়। তারা বলেছেন যে, ২০১৬ সালের অভ্যুত্থান চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র জড়িত ছিল; তবুও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বন্ধু হিসেবেই দেখতে চাইছেন। তারা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে দ্বিমুখী আচরণ করছে; তবুও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে চাইছেন। তুরস্ক সরকার ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপারে বাইডেন প্রশাসনকে ছাড় দিতে চাইছে; যদিও যুক্তরাষ্ট্র কুর্দি গ্রুপ ‘ওয়াইপিজি’কে সমর্থন দিয়ে আসছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পের সহযোগিতা হারাতে চাইছে না তুরস্ক। হুসেইন বাগচি বলছিলেন যে, তুরস্ক এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু তুরস্ক কি সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবার আশাই করে যাবে? নাকি ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের কক্ষপথ থেকে বের হবার চেষ্টা করবে? পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় তুরস্ক আঞ্চলিকভাবে এবং বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব বিস্তারে মনোনিবেশ করলেও এখনও যে তা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে বাইপাস করতে পারেনি, তা পরিষ্কার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের জনগণের মাঝে যে ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষার উদ্ভব হয়েছে, তা কতোদিন মার্কিন নীতির শৃংখলের মাঝে আটকে থাকবে, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। বাস্তবিকপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী প্রভাব হারাবার বাস্তবতায় সেটাই মূল আলোচ্য বিষয়।
Labels:
Geopolitics,
Joe Biden,
New World Order,
S-400,
Turkey,
USA
Subscribe to:
Posts (Atom)







