Monday, 1 February 2021

পোল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনায় গর্ভপাতের আইন পশ্চিমা চিন্তার অসঙ্গতিরই ফলাফল

১লা ফেব্রুয়ারি ২০২১

আইন করে পোল্যান্ডে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা, বা আর্জেন্টিনায় গর্ভপাত বৈধ করার ফলে তাদের সমাজের অসঙ্গতি চলে যাচ্ছে না। ক্যাথোলিক বিশ্বাসের দেশ হলেও সেকুলার চিন্তা বাস্তবায়নের কারণে নারী পুরুষের অবাধ যৌনাচার এই দেশগুলিতে অবৈধ নয়। একদিকে বামপন্থী লিবারালরা সেকুলার চিন্তা বাস্তবায়নের পক্ষে লড়ছে; অপরদিকে ডানপন্থী রক্ষণশীলরা ধর্মীয় বিশ্বাসকে রক্ষায় বদ্ধপরিকর। কিন্তু কেউই সমাজে অবাধ যৌনাচারের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি।

 
পূর্ব ইউরোপের দেশ পোল্যান্ডে গর্ভপাত বিরোধী আইন পাসের পর থেকেই রাজধানী ওয়ারস’র রাস্তায় কনকনে ঠান্ডা এবং করোনা মহামারির কারণে কড়াকড়ি উপেক্ষা করে চলছে বিক্ষোভ। ‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আইন কার্যকর হবার পর থেকে তিন দিন ধরে নারীবাদী সংগঠনগুলি বিক্ষোভ করছে। এর আগে সাংবিধানিক আদালতে গর্ভপাত বিরোধী রুলিং দেয়া হয় অক্টোবর মাসে; যার পর থেকে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলেছে রাস্তায়। এই আইনের অধীনে ধর্ষণের ক্ষেত্রে এবং যেখানে গর্ভধারিনীর স্বাস্থ্যহানির আশংকা রয়েছে সেক্ষেত্রেও গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইউরোপের সেকুলার চিন্তাধারার দেশ হলেও ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারগুলি দেশটাকে বিভক্ত করেছে।

পোল্যান্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেব থেকে দেখা যায় যে, দেশটার কমিউনিস্ট শাসনামলে ১৯৮০এর দশকে প্রতিবছর ১ লক্ষ ২০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৪০ হাজার পর্যন্ত আইনগতভাবে বৈধ গর্ভপাত করা হতো। তবে কমিউনিস্ট শাসন থেকে বের হয়ে আসার পর ১৯৯০ সালে এক আইনের মাধ্যমে গর্ভপাত কঠিন করে দেয়া হয়। এরপর ১৯৯৩ সালের আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র ‘কঠিন জীবন’এর কারণ দেখিয়ে গর্ভপাত করা যেতো। শুধুমাত্র গর্ভধারিনীর স্বাস্থ্য বা জীবনের প্রতি হুমকি তৈরি হলে বা ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটলেই গর্ভপাত করার অনুমতি দেয়া হতো। এরপর ১৯৯৬ সালে আইন করে সামাজিক কারণে গর্ভপাত করার অনুমতি দেয়া হয়। তবে ১৯৯৭ সালে সাংবিধানিক আদালতে সেই আইন বতিলও করা হয়। একুশ শতকে পোল্যান্ডে ডানপন্থী ‘ল এন্ড জাস্টিস’ এবং ‘পোল্যান্ড কামস ফার্স্ট’ দলগুলি গর্ভপাত পুরোপুরি বাতিল করার পক্ষে লবিং শুরু করে। অপরপক্ষে বামপন্থী ‘ডেমোক্র্যাটিক লেফট এলায়েন্স’ গর্ভপাত সমর্থন করে লবিং শুরু করে। পোল্যান্ডের বর্তমান পার্লামেন্টের ৪’শ ৬০টা আসনের মাঝে ১’শ ৯৮টা আসনই এখন ডানপন্থী ‘ল এন্ড জাস্টিস’ দলের দখলে। আর সরকার গঠন করা ডানপন্থী ‘ইউনাইটেড রাইট’এর আসন রয়েছে ২’শ ৩৪টা। বামপন্থী দলগুলির আসন রয়েছে ৪৮টা; যার মাঝে গর্ভপাতের পক্ষে থাকা ‘ডেমোক্র্যাটিক লেফট এলায়েন্স’এর আসন ২৪টা। অর্থাৎ গর্ভপাতবিরোধী ডানপন্থী দলগুলি পার্লামেন্টে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ডানপন্থীদের মূল ভিত হলো পোল্যান্ডের রোমান ক্যাথোলিক খ্রিস্টান ঐতিহ্য। ৯০ শতাংশের বেশি ক্যাথোলিক এই দেশ তাদের খ্রিস্টান ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে। ইউরোপের আর কোন দেশের জনসংখ্যার এত বড় অংশ ক্যাথোলিক নয়। কিন্তু ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করলেও পোল্যান্ডের সামাজিক অবস্থা গর্ব করার মতো নয়। ১৯৯০এর দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত পোল্যান্ডে প্রতি বছর এক থেকে দুই হাজার বৈধ গর্ভপাত হয়ে থাকে। তবে নারীবাদী এনজিও ‘ফেডারেশন ফর উইমেন এন্ড ফ্যামিলি প্ল্যানিং’এর মতে পোল্যান্ডে প্রতিবছর ৮০ হাজার থেকে ২ লক্ষ অবৈধ গর্ভপাত হচ্ছে। ‘বিবিসি’ বলছে এই সংখ্যা ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ২০ হাজার। ‘দ্যা ল্যানসেট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় ৭৫ হাজার থেকে ৩ লক্ষ গর্ভপাতের কথা বলা হচ্ছে। ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মহিলা গর্ভপাতের জন্যে পার্শ্ববর্তী জার্মানি, স্লোভাকিয়া এবং চেক রিপাবলিকে যায়। পোল্যান্ডে ধর্ষণের ঘটনা গত কয়েক বছরে বেশ কমে এসে ৭’শ নিচে এসে দাঁড়িয়েছে, যা ইউরোপের মাঝে ১১তম। কিন্তু লাখো গর্ভপাতের সংখ্যা পোল্যান্ডকে শান্তি দেয় না। ক্যাথোলিক বিশ্বাস এই সংখ্যাগুলির সামনে এসে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ধর্মীয়ভাবে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে থাকার দাবি করলেও প্রতি বছর লাখো গর্ভপাতের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে পোল্যান্ডের সমাজে। শুধুমাত্র আইন করে নিজের ক্যাথোলিক সত্ত্বার প্রমাণ দেয়ার চেষ্টাই করে যাচ্ছে পোল্যান্ডের ডানপন্থী নেতৃত্ব।

অপরদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনাতেও শুরু হয়েছে অস্থিরতা। মূলতঃ ইউরোপিয় বংশোদ্ভূত স্প্যানিশ ভাষাভাষী এই দেশে ৩০শে ডিসেম্বর পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে আইন পাস করে গর্ভপাত বৈধ করে দেয়া হয়। আর্জেন্টিনায় গর্ভপাত একটা সংবেদনশীল বিষয়। পার্লামেন্টে ম্যারাথন বাকবিতন্ডার পর এই সিদ্ধান্ত এসেছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, সিনেটে ৩৮ জন গর্ভপাতের পক্ষে ভোট দেন; বিপক্ষে ভোট দেন ২৯ জন। এর আগে ২০১৮ সালে পার্লামেন্টে আইন করার একটা চেষ্টা ভেস্তে গেলেও এবারে ক্ষমতাসীন মধ্য বামপন্থী ‘ফ্রেন্তে দে তোদোস’ কোয়ালিশন সরকার গর্ভপাতের পক্ষে থাকার কারণে আইন পাস হয়। কেউ কেউ ২০১৮ সালে বিপক্ষে ভোট দিলেও এবারে পক্ষে ভোট দেন। ক্ষমতাসীন ‘ফ্রেন্তে দে তোদোস’এর পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে শক্ত অবস্থান রয়েছে। সেখানে ৭২টা আসনের ৪১টাই তাদের। তবে নিম্নকক্ষে ২’শ ৫৭টা আসনের মাঝে মাত্র ১’শ ১৯টা তাদের। ডিসেম্বরের শুরুতে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইএর পর ১’শ ৩১ বনাম ১’শ ১৮ ভোটে এই আইন পাস হয়েছিল। প্রতিটা দলের মাঝেই কিছু সাংসদ পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন; কিছু দিয়েছিলেন বিপক্ষে। ২০১৮ সালের ভোটে নিম্নকক্ষে গর্ভপাতের পক্ষে ছিল ১’শ ২৯ জন; বিপক্ষে ছিল ১’শ ২৫ জন। আর উচ্চকক্ষে গর্ভপাতের পক্ষে ছিল ৩১ জন; বিপক্ষে ছিল ৩৭ জন। ফলে সেবারে আইন পাস করা যায়নি। তবে এর মাধ্যমে গর্ভপাতের মতো বিষয়ে আর্জেন্টিনার সমাজের বিভক্তিটা পরিষ্কার হয়ে যায়।

ব্রাজিলসহ ক্যাথোলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ ল্যাটিন আমেরিকার বেশিরভাগ দেশে গর্ভপাত অবৈধ। শুধুমাত্র উরুগুয়ে, কিউবা, গায়ানা এবং মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটিতে গর্ভপাত বৈধ। সেই হিসেবে সাড়ে ৪ কোটি জনসংখ্যার আর্জেন্টিনাই দক্ষিণ আমেরিকার সবচাইতে বড় দেশ, যেখানে গর্ভপাত বৈধ করা হলো। ভ্রুণের ১৪ সপ্তাহ বা সাড়ে তিন মাস বয়স পর্যন্ত গর্ভপাত করা যবে, এই মর্মে পাস করা আইনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন গ্রুপ সোচ্চার হয়েছে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, দক্ষিণ আমেরিকার নারীবাদী গ্রুপগুলি আর্জেন্টিনার এই আইনকে অত্র অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্যে একটা উদাহরণ হিসেবে দেখতে চাইছে। গর্ভপাতের পক্ষে কাজ করা গ্রুপগুলি বলছে যে, আর্জেন্টিনার অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল রাজ্যগুলি থেকে মামলা হতে পারে; আর বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক গর্ভপাত করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। আর্জেন্টিনার নারী বিষয়ক মন্ত্রী এলিজাবেথ গোমেজ আলকর্তা বলছেন যে, এই আইন বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হবে। আর্জেন্টিনার ‘কনসোর্টিয়াম অব ক্যাথোলিক ডক্টরস’ এবং ‘ক্যাথোলিক ল’ইয়ার্স কর্পোরেশন’সহ বিভিন্ন রক্ষণশীল গ্রুপ এই আইনের বিরুদ্ধে অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে। গর্ভপাত বিরোধী বড় গ্রুপ ‘ইউনিদাদ প্রোভিদা’ ডাক্তারদেরকে নিজেদের বিবেক ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়েছে। অপরদিকে ‘দ্যা ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর দ্যা রাইট টু লিগ্যাল, সেইফ এন্ড ফ্রি এবোরশন’ নামের গর্ভপাতের পক্ষে কাজ করা সংস্থার মুখপাত্র লরা সালোমে বলছেন যে, তারা আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কাজ করবেন।

ক্যাথোলিক আর্জেন্টিনাতে প্রতিবছর ৩ থেকে ৪ হাজার ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে; যদিও দেশটাতে মানুষের যৌনাচারের যথেষ্ট স্বাধীনতা রয়েছে। এই সংখ্যা প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝে ৮ থেকে সাড়ে ৮এর মতো। পার্শ্ববর্তী ব্রাজিলে এই সংখ্যা আরও অনেক ভয়াবহ; প্রতি লক্ষ জনসংখ্যায় তা ২৪এর উপর! ব্রাজিলের মিডিয়া ‘ফোলিয়া ডে সাও পাওলো’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সেখানে ২০১৮ সালে ৬৬ হাজার ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে; যা দিনের ১’শ ৮০টার সমকক্ষ। এর মাঝে ৫৪ শতাংশের বয়স ১৩ বছরের নিচে। আর আর্জেন্টিনাতে প্রতিবছর কত আইন বহির্ভূত গর্ভপাত হচ্ছে, তার হিসেব মেলা কঠিন। ২০০৫ সালে প্রকাশ করা সর্বশেষ এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে, প্রতিবছর ৩ লক্ষ ৭০ হাজার থেকে ৫ লক্ষ ২০ হাজার গর্ভপাত হয় আর্জেন্টিনায়। আর ২০১৪ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব উইমেনস হেলথ’এর প্রকশিত এক রিপোর্টে বলা হয় যে, ব্রাজিলে প্রতি বছর ৪৮ হাজার অবৈধ গর্ভপাতের ঘটনা ঘটছে। অপরপক্ষে গর্ভপাতের পক্ষে কাজ করা সংস্থাগুলি বলছে যে, ব্রাজিলে প্রতিবছর ৫ লক্ষ আইনবহির্ভূত গর্ভপাত ঘটছে।

ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে গর্ভপাত নিষিদ্ধ থাকায় সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে তা সাংঘর্ষিক অবস্থানে রয়েছে। তবে পশ্চিমা সেকুলার চিন্তা যে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়গুলিকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি, তা পোল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনার ঘটনাগুলি দেখলে বোঝা যায়। সমাজের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে যে, এই দ্বন্দ্বের সমাধান পশ্চিমা বিশ্ব এখনও পায়নি। আইন করে পোল্যান্ডে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা, বা আর্জেন্টিনায় গর্ভপাত বৈধ করার ফলে তাদের সমাজের অসঙ্গতি চলে যাচ্ছে না। ক্যাথোলিক বিশ্বাসের দেশ হলেও সেকুলার চিন্তা বাস্তবায়নের কারণে নারী পুরুষের অবাধ যৌনাচার এই দেশগুলিতে অবৈধ নয়। বেশিরভাগ গর্ভপাতের কারণ হিসেবে ধর্ষণ বা গর্ভধারিনীর স্বাস্থ্য বা ভ্রুণের সমস্যা নয়, বরং বৈবাহিক সম্পর্ক বহির্ভূত যৌনাচারই সামনে আসছে। পোল্যান্ডে ৭’শর কম ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও গর্ভপাতের ঘটনা ঘটছে লাখে। আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও একই। একদিকে বামপন্থী লিবারালরা সেকুলার চিন্তা বাস্তবায়নের পক্ষে লড়ছে; অপরদিকে ডানপন্থী রক্ষণশীলরা ধর্মীয় বিশ্বাসকে রক্ষায় বদ্ধপরিকর। কিন্তু কেউই সমাজে অবাধ যৌনাচারের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। পশ্চিমা বিশ্বে ডানপন্থীদের উত্থান মূলত পশ্চিমা আদর্শের উপর জনগণের আস্থাহীনতার কারণেই। জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রের সেকুলার চিন্তার এহেন সাংঘর্ষিক অবস্থানই পশ্চিমা চিন্তার অসংগতিকে তুলে ধরে। একইসাথে ডানপন্থী বনাম লিবারাল আদর্শিক এই দ্বন্দ্ব পশ্চিমা সমাজের নড়বড়ে ভিতের দিকেই ইঙ্গিত দেয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় এই রাজনৈতিক মেরুকরণ পশ্চিমা বিশ্বকে ব্যতিব্যস্ত রাখবে সামনের দিনগুলিতে।

Friday, 29 January 2021

‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’ পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থার বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত দেয়

২৯শে জানুয়ারি ২০২১

 
‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’এর পরিস্থিতি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যাবস্থায় আদর্শ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থই সকল সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে। একইসাথে মানুষের জীবন নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাবই জাতীয় সিদ্ধান্তের পিছনে মূল প্রেরণা।


করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন সরবরাহ নিয়ে ব্রিটেন এবং ইউরোপিয় ইউনিয়নের দ্বন্দ্ব এখন বেশ পরিষ্কার। ব্রিটিশ সুইডিশ কোম্পানি ‘এসট্রাজেনেকা’ বলছে যে, তারা ইইউএর কাছে যে পরিমাণ ভ্যাকসিন ২০২১ সালের মার্চের মধ্যে সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা তারা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হচ্ছে না। ২৬শে জানুয়ারি ইতালিয় পত্রিকা ‘লা রিপাবলিকা’র সাথে এক সাক্ষাতে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী পাসকাল সোরিঅট বলেন যে, চুক্তি অনুযায়ী ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা’ দেয়ার জন্যে কোম্পানির বাধ্যবাধকতা রয়েছে; তবে নির্দিষ্ট তারিখের মাঝে সকল ভ্যাকসিন সরবরাহ করার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ইইউ ‘এসট্রাজেনেকা’র এই বক্তব্য মানতে নারাজ। ইইউএর স্বাস্থ্য কমিশনার স্টেলা কিরিয়াকিদেস ২৭শে জানুয়ারি সাংবাদিকদের বলেন যে, কোম্পানির ব্রিটিশ কারখানাগুলি ইইউএর সাথে করা চুক্তির অংশ। যেহেতু ব্রিটিশ কারখানাগুলির সরবরাহ ভালোমতো চলছে, তাই কোম্পানি তার প্রতিশ্রুতি রাখতে বাধ্য। পরদিন এক টুইটার বার্তায় তিনি বলেন যে, ইইউ ‘এসট্রাজেনেকা’র চলমান অস্বচ্ছ সরবরাহ শিডিউলে ব্যাথিত। কিরিয়াকিদেস সাংবাদিকদের বলেন যে, কোম্পানি চুক্তিকে যেভাবে ব্যাখ্যা করছে, তা ভুল এবং অগ্রহণযোগ্য। এর সপ্তাখানেক আগে কোম্পানি বলে যে, মার্চের মাঝে তারা তাদের প্রতিশ্রুত ৮ কোটি ভ্যাকসিনের মাঝে মাত্র ৩ কোটি ১০ লক্ষ সরবরাহ করতে পারবে। কারণ হিসেবে কোম্পানিটা বলছে যে, তাদের ইইউএর ভূমিতে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের কারখানাগুলি সরবরাহ দিতে হিমসিম খাচ্ছে। এছাড়াও কোম্পানির দু’টা কারখানা রয়েছে ব্রিটেনে। ইইউএর সাথে ‘এসট্রাজেনেকা’র দ্বন্দ্বের মাঝে ব্রিটিশ ক্যাবিনেট অফিসের মন্ত্রী মাইকেল গোভ বলেন যে, ইইউএর সাথে ‘এসট্রাজেনেকা’র যে দ্বন্দ্বই থাকুক না কেন, ব্রিটিশ জনগণের ভ্যাকসিন পেতে কোন সমস্যাই হবে না। তিনি সাংবাদিকদের বলেন যে, ব্রিটেনের কাছে ‘পূর্ণ নিশ্চয়তা’ রয়েছে যে, ব্রিটেন তার ভ্যাকসিন ঠিকমতোই পাবে। আর ব্রিটেনের ভ্যাকসিন প্রকল্প সম্পূর্ণ সফলতা পাবার পরই ইইউএর দেশগুলিকে সহায়তা দেবার কথা আসবে। তিনি আরও বলেন যে, ইউরোপিয়ান কমিশনের চাপ সত্ত্বেও ‘এসট্রাজেনেকা’ ব্রিটেনকে নিশ্চিত করেছে যে, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রাখবে। ভ্যাকসিন নিয়ে ইইউ এবং ব্রিটিশ সরকারের পরস্পরবিরোধী কথাগুলি ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’এর আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসছে, যার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।

ইইউ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এবং ভ্যাকসিন প্রকল্প বাস্তবায়নে হিমসিম খাচ্ছে। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইইউ তার প্রায় ৪৫ কোটি জনসংখ্যার জন্যে এখন পর্যন্ত মোট ২’শ ৩০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন অর্ডার করেছে। এর মাঝে ‘এসট্রাজেনেকা’র কাছ থেকে অর্ডার করেছে ৪০ কোটি। ইইউ কর্মকর্তারা বলছেন যে, ইইউএর কাছ থেকে কোম্পানি যে অর্থ পেয়েছে, তা দিয়েই কোম্পানির ব্রিটিশ কারখানার উন্নয়ন করা হয়েছে। ইইউএর সাথে চুক্তিতে বলা হয়েছে যে, কোম্পানির মূল কারখানা ব্রিটেনে; বেলজিয়াম আর নেদারল্যান্ডসের কারখানাগুলি দ্বিতীয় সারির। ‘এসট্রাজেনেকা’ ছাড়াও মার্কিন কোম্পানি ‘ফাইজার’ ও জার্মান কোম্পানি ‘বায়োএনটেক’এর জয়েন্ট ভেঞ্চার থেকে ইইউ অর্ডার করেছে ৬০ কোটি ডোজ; আর মার্কিন কোম্পানি ‘মডার্না’র কাছ থেকে অর্ডার করেছে ১৬ কোটি ডোজ। ‘ফাইজার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ২০২০এর ডিসেম্বরের মাঝে তারা ১ কোটি ২৫ লক্ষ ডোজ সরবরাহ করবে। কোম্পানির বেলজিয়ান কারখানা সম্প্রসারণের কাজ চলায় তারা সিডিউলে কয়েক সপ্তাহ পিছিয়ে রয়েছে বলে বলছে। এর ফলাফলস্বরূপ স্পেন সরকার ২৭শে জানুয়ারি ঘোষণা দেয় যে, ভ্যাকসিনের অভাবে মাদ্রিদ এলাকায় ভ্যাকসিন দেয়ার কর্মকান্ড দুই সপ্তাহের জন্যে স্থগিত করা হয়েছে। কাতালোনিয়াতেও ভ্যাকসিন কর্মকান্ড বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইতালি সরকার ইতোমধ্যেই ‘এসট্রাজেনেকা’র বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছে। অপরদিকে জার্মান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেন্স স্পাহন ইউরোপিয়ান কমিশনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন যাতে ভ্যাকসিন কারখানাগুলি ইইউএর যে সদস্য রাষ্ট্রের সীমানার মাঝে অবস্থিত, তাদের সরকারের অনুমতি ব্যাতীত যেন ভ্যাকসিন রপ্তানি করতে না পারে।

‘এসট্রাজেনেকা’ এবং ইইউএর দ্বন্দ্ব বলে দিচ্ছে যে, ভ্যাকসিনের কারখানা কোন দেশের জাতীয় সীমানার মাঝে রয়েছে, তা এখন যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব দেশের মাটিতে তো কারখানা নেই; বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। ২৬শে জানুয়ারি ‘প্যান আফ্রিকানিস্ট’ সাংবাদিক সন্মেলনে ধনকুবের বিল গেটস বলেন যে, মহামারি থেকে উদ্ধার পেতে আরও অনেক ভ্যাকসিন কারখানা চালু করতে হবে এবং সব দেশের মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। গেটস বলেন যে, তিনি বিশ্বের ভ্যাকসিন কারখানাগুলিকে অর্থায়ন করছেন, যাতে করে ভ্যাকসিন ডেভেলপ করা বায়োটেকনলজি কোম্পানিগুলির ভ্যাকসিন অনেকগুলি কারখানায় তৈরি করা সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটেনের ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র ডেভেলপ করা ভ্যাকসিন তৈরি করছে ‘এসট্রাজেনেকা’; আর ‘এসট্রাজেনেকা’র সহায়তা নিয়ে ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে ভারতের ‘সিরাম ইন্সটিটিউট’। তবে গেটস বিশ্বের সকল স্থানে কারখানা তৈরিকেও আবার সমর্থন করছেন না। এক প্রশ্নের জবাবে গেটস বলেন যে, আফ্রিকায় একটা ভ্যাকসিন কারখানা করতে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগবে; কাজেই এটা বরং ভবিষ্যতের কোন মহামারির প্রস্তুতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশেগুলির বড় কারখানাগুলির উপর নির্ভর করা ছাড়া গতি নেই। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ভ্যাকসিন কারখানার জন্যে ধনী দেশগুলির বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেন।

‘ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স’এর গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, বিশ্বব্যাপী সব দেশে ভ্যাকসিন প্রকল্প চালু করা না গেলে বিশ্ব অর্থনীতি ৯ হাজার ২’শ বিলিয়ন বা ৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার হারাবে। বিল গেটস বলছেন যে, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব যেখানে ২৮ হাজার বিলিয়ন বা ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়েছে, সেই তুলনায় ভ্যাকসিনের জন্যে নতুন কারখানার পিছনে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ কিছুই নয়। কিন্তু গেটসএর কথায় এটা পরিষ্কার যে, কেউই আসলে এই মুহুর্তে আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল অঞ্চলে ভ্যাকসিন কারখানার কথা চিন্তা করছেন না। আর ‘এসট্রাজেনেকা’র কোন কারখানা কোন দেশের সীমানার মাঝে অবস্থিত, তা যখন ব্রিটেন এবং ইইউএর মাঝে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করছে, তখন আফ্রিকাসহ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ভ্যাকসিন কারখানা তৈরি করাটা অবাস্তবই শোনাবে। ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’এর এই পরিস্থিতি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যাবস্থায় আদর্শ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থই সকল সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে। একইসাথে মানুষের জীবন নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাবই জাতীয় সিদ্ধান্তের পিছনে মূল প্রেরণা।

Saturday, 23 January 2021

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বন্দ্বের সমাধান বাইডেন প্রশাসনের হাতে নেই

২৩শে জানুয়ারি ২০২১

১৯১০ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানি ঔপনিবেশিক সময়ে কোরিয়দেরকে জোরপূর্বক কারখানায় কাজ করাবার ব্যাপারে আদালতের রায়ের পর জাপানি দূতাবাসের বাইরে কোরিয়দের বিক্ষোভ। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় চীনকে নিয়ন্ত্রণে জাপান এবং কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের দরকার। কিন্তু দুই দেশের দ্বন্দ্ব এতটাই গভীর যে, বাইডেন প্রশাসনের পক্ষে এর সমাধান দেয়া সম্ভব নয়।


গত ৮ই জানুয়ারি জাপান সরকারের মন্ত্রীসভা দক্ষিণ কোরিয়াতে নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে কোয়িচি আইবোশিকে নিয়োগ দেয়। ‘নিকেই এশিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তিনি ২০১৮ সাল থেকে ইস্রাইলে জাপানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। আইবোশি এর আগে দু’বার কোরিয়াতে কূটনীতিবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৯৯ সাল থেকে তিনি কোরিয়াতে জাপানি দূতাবাসের সেক্রেটারি ছিলেন। এরপর ২০০৬ সাল থেকে তিনি সেখানে আবারও নিয়োগ পান রাজনীতি বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে। সেসময় কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন রোহ মুন হিউন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন তখনকার প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ ছিলেন। জাপানি সরকার আইবোশির সেই অভিজ্ঞতাগুলিকেই কাজে লাগাতে চাইছে। তবে অনেকেই বলছেন যে, কোয়িচি আইবোশির কাজ খুব একটা সহজ হবে না। কেননা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে জাপানের সাথে কোরিয়ার সম্পর্ক বেশ খারাপই যাচ্ছে। যেদিন আইবোশির নিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সেদিনই দক্ষিণ কোরিয়াতে জাপান বিরোধী আবেগ নতুন করে জেগে ওঠে। সিউলের জেলা আদালতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনাদের যৌন সম্ভোগের জন্যে ব্যবহৃত ১২ জন মহিলার পক্ষে এক রায় দেয়া হয়। রায়ে জাপানি সরকারকে বেঁচে থাকা একেকজন মহিলাকে এবং মৃত মহিলাদের পরিবারকে ৯১ হাজার ডলার সমমূল্যের ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়। ২০১৩ সালে ‘কমফোর্ট উইমেন’ বলে পরিচিত এই মহিলারা জাপান সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করে। আদালত বলে যে, জাপান রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দায় এড়াতে পারে না; এবং এটা মানবাধিকার বিরোধী। জাপানি প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে শুগা এই মামলা বাতিল করে দেয়ার জন্যে অনুরোধ করেছিলেন কোরিয়দের কাছে। শুগা বলেছিলেন যে, একটা স্বার্বভৌম রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের আদালতের রায় মানতে বাধ্য থাকতে পারে না। শুগা বলেন যে, জাপান এই রায় কোনভাবেই মানবে না; কারণ এটা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। অপরদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, কোরিয় সরকার আদালতের রায়কে শ্রদ্ধা করে এবং অত্যাচারিত মহিলাদের সন্মান রক্ষার্থে সরকার সকলকিছু করবে। দুই দেশের পক্ষ হতে এই ইস্যুতে ভিন্নমত আসার কারণে এবং কোরিয়ার জনগণের কাছে এটা আবেগের ইস্যু হবার কারণে সামনের দিনগুলিতে দুই দেশের সম্পর্কে উষ্ণতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। আর একারণেই এ দ্বন্দ্বের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৫ সালে উভয় দেশ কোরিয়ার ‘কমফোর্ট উইমেন’দের ব্যাপারটা চিরতরে সমাধান করে বলে ঘোষণা দেয়। সেসময় তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ব্যক্তিগতভাবে এই মহিলাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং তাদের জন্যে জাপান সরকারের ৯ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেবার ঘোষণা দেন। সেসময় কিছু মহিলার পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করে বলা হয় যে, এই সিদ্ধান্ত তাদের সাথে কথা না বলেই নেয়া হয়েছে; এবং এতে তাদের সাংবিধানিক অধিকার ব্যাহত হয়েছে। ২০১৭ সালে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন এব্যাপারে নতুন নীতিতে এগুলে দুই দেশের মাঝে সম্পর্কের অবণতি হয়। জাপান সরকার বলছে যে, ১৯৬৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী এই ইস্যু সমাধান হয়ে যায়। সেসময় কোরিয়াকে জাপান প্রায় ৩’শ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়; যার বর্তমান মূল্য প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার। সেই অর্থ কোরিয়ার অর্থনীতি গড়ে তোলায় বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু মুন জে ইনএর সরকার বলে যে, সেই চুক্তিতে ব্যক্তিগত কষ্ট সহ্য করার ব্যাপারটাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বরে কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতা ইউন মী হিয়াংএর বিরুদ্ধে ‘কমফোর্ট উইমেন’দের জন্যে জাপান থেকে আসা ফান্ড অন্য খাতে সরনোর অভিযোগ ওঠে। এছাড়াও ২০১৮ সালে কোরিয়ার আদালতে কয়েকটা রায়ে ১৯১০ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কোরিয়াতে জাপানি ঔপনিবেশিক সময়ে কোরিয়ার জনগণকে জোরপূর্বক কারখানা এবং খনিতে কাজ করানোর জন্যে জাপানি কোম্পানিগুলিকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়। ২০১৯ সালে জাপান সরকার কোরিয়ার সাথে প্রযুক্তি সরবরাহে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেবার হুমকি দিলে দুই দেশের মাঝে সম্পর্ক এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, দুই দেশ তাদের মাঝে স্বাক্ষরিত ইন্টেলিজেন্স আদানপ্রদানের চুক্তি থেকে বের হয়ে যাবার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। মার্কিন হস্তক্ষেপে শেষ মুহুর্তে কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বর্তমান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটা দেশের আদালত আরেকটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে না। কিন্তু কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন বলছেন যে, আদালতের উপর তিনি হস্তক্ষেপ করবেন না। ‘অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’র বিশ্লেষক লরেন রিচার্ডসন বলছেন যে, দুই দেশ এতটাই ভিন্নপথে চিন্তা করছে যে, এদেরকে কাছাকাছি আনাটা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সরকারের জন্যে বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, যুদ্ধকালীন সময়ে জাপানি কোম্পানিতে কোরিয়দের জোরপূর্বক কাজ করানোর ইস্যুটা দুই দেশের সম্পর্ককে বেশি পরীক্ষার মাঝে ফেলবে। কারণ কোরিয়ার আদালত জাপানি কোম্পানিগুলির বিরুদ্ধে রায় বাস্তবায়ন করতে পারবে। জাপান সরকার জাপানি কোম্পানির বিরুদ্ধে কোরিয়ার ব্যবস্থা নেয়াকে ভালো চোখে দেখবে না। ‘কোবে ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর কান কিমুরা ‘জাপান টাইমস’কে বলছেন যে, বাইডেন প্রশাসনের চোখে ভালো থাকার জন্যেই কোরিয়রা জাপানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে অগ্রসর হবে, যাতে উত্তর কোরিয়ার সাথে আলোচনা অব্যাহত রাখা যায়। অপরদিকে ‘ইউনিভার্সিটি অব শিজুওকা’র প্রফেসর সুসুমু কোহারি বলছেন যে, জাপানি প্রধানমন্ত্রী শুগা কোরিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়নে আগ বাড়িয়ে কিছু করবেনা না। ২০১৫ সালের চুক্তি মান্য না করার কারণে শুগা কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুনকে বিশ্বাস করেন না। তাছাড়া উভয় দেশের নেতারাই ছাড় দিয়ে নিজ দেশে ভোট ব্যাংক হারাতে চান না। ২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন জো বাইডেন ‘দ্যা আটলান্টিক’এর সাথে সাক্ষাৎকারে বলেন যে, দুই দেশের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাটা হলো ‘তালাকের আইনজীবী’র মতো। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় চীনকে নিয়ন্ত্রণে জাপান এবং কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের দরকার। কিন্তু দুই দেশের দ্বন্দ্ব এতটাই গভীর যে, বাইডেন প্রশাসনের পক্ষে এর সমাধান দেয়া সম্ভব নয়।

Sunday, 17 January 2021

ভূরাজনীতিতে করোনা মহামারির প্রভাব কতটুকু?

১৭ই জানুয়ারি ২০২১


করোনা মহামারির সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী ৯ কোটি ৫০ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে; যার মাঝে ২০ লক্ষ ৩২ হাজার ৭’শ ৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শুধুমাত্র ১৫ই জানুয়ারি এক দিনেই মৃত্যুবরণ করেছে ১৪ হাজার ৯’শ ১৩ জন। এর তুলনায় গত এপ্রিলের ১৭ তারিখে মৃতের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৫’শ ২৭ জন। অর্থাৎ প্রথম ঢেউএর তুলনায় দ্বিতীয় ঢেউএ মৃতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত জুলাই মাসে এই সংখ্যা বেশ বাড়লেও তা ২২শে জুলাইএর ৭ হাজার ৩’শ ২৬ জনের বেশি ছিল না। সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে; ৪ লক্ষ ৫ হাজার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্রাজিলে; ২ লক্ষ ৯ হাজার। তৃতীয় সর্বোচ্চ ভারতে; ১ লক্ষ ৫২ হাজার। চতুর্থ সর্বোচ্চ মেক্সিকোতে; ১ লক্ষ ৪০ হাজার। এরপর রয়েছে ব্রিটেন ৮৮ হাজার; ইতালি ৮২ হাজার; ফ্রান্স ৭০ হাজার; রাশিয়া ৬৫ হাজার; ইরান ৫৭ হাজার; স্পেন ৫৩ হাজার; কলম্বিয়া ৪৮ হাজার; জার্মানি ৪৭ হাজার; আর্জেন্টিনা ৪৫ হাজার; পেরু ৩৯ হাজার; দক্ষিণ আফ্রিকা ৩৭ হাজার; পোল্যান্ড ৩৩ হাজার। প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে বেলজিয়ামে; ১’শ ৭৫ জন মানুষের। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্লোভেনিয়া ১’শ ৫৩ জন; ইতালি ১’শ ৩৫ জন। জনসংখ্যার বিচারে মৃত্যুর সংখ্যা ইউরোপে সবচাইতে বেশি। প্রথম ১০টা দেশের সবগুলিই ইউরোপের। ১১তম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়াও ১৫তম স্থানে পেরু, ১৮তম স্থানে পানামা এবং ১৯তম স্থানে মেক্সিকো ছাড়া প্রথম ২০টা দেশের ১৬টাই ইউরোপের। বলাই বাহুল্য যে, ইউরোপ এবং আমেরিকা করোনা মহামারিতে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

করোনা মহামারির প্রভাব সারা বিশ্বের উপর পরলেও সকল ক্ষেত্রে এর প্রভাব এক নয়। ভূরাজনীতিতে মহামারির প্রভাব হিসেব করতে গেলে ইউরোপ এবং আমেরিকার কথাই আসবে শুরুতে। একইসাথে সেই অঞ্চলগুলিতে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ের কথাগুলি আসবে, যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। তবে করোনার সরাসরি প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধ্বস নামায় বিশ্বের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলির কথাও চলে আসবে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনকে নিয়ে থাকবে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। এছাড়াও আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে সবচাইতে বড় সরবরাহকারী মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়েও কথা হবে। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার নিম্নগামিতাকে করোনাভাইরাস আরও দ্রুতগামী করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক দুর্বলতার সময়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলি ভূরাজনৈতিক শূণ্যস্থানগুলি পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে। এতে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও প্রবল হয়েছে। এই প্রতিযোগিতার অনেকটাই মহামারির আগে থেকেই চললেও এর উপর মহামারির প্রভাব উল্লেখ করার মতো।

মহামারির মাঝেও চলেছে লিবিয়ার যুদ্ধ; যেখানে তুরস্ক হস্তক্ষেপ করে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়েছে। নাগোর্নো কারাবাখ নিয়ে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে চলেছে যুদ্ধ; সেখানেও তুরস্ক হস্তক্ষেপ করেছে। হিমালয়ের পাদদেশে ভারত এবং চীনের মাঝে হয়েছে সংঘর্ষ; যদিও তা পুরোদস্তর সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়নি। ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হর্ন অব আফ্রিকা’র ইথিওপিয়াতে শুরু হয়েছে গৃহযুদ্ধ। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থান। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। সৌদি গ্রুপের দেশগুলিও তুরস্কের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে যাচ্ছে। এই ঘটনাগুলির উপর মহামারির সরাসরি প্রভাব না থাকলেও পরোক্ষ প্রভাব কিছুটা হলেও ছিল।

পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ

মার্কিন ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রীডম্যান ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স এন্ড সাসটেইনেবাল ডেভেলপমেন্ট’এর এক লেখায় বলছেন যে, মহামারির সমাধান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাছে চাওয়া হলেও তারা সেই মুহুর্তে কোন প্রতিষেধক বা ঔষধ দিতে সক্ষম হয়নি। তদুপরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যখন ভেন্টিলেটর, মাস্ক এবং টেস্টিং কিটের মতো জিনিসগুলি চাওয়া শুরু করলো, তখন তা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং সামাজিক ব্যবস্থাকেও চাপের মাঝে ফেলে দিলো। আর পুরো ব্যাপারটার দায় রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর থাকার কারণে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও চাপের মাঝে পড়ে গেলো। মহামারি মারাত্মক আকার ধারণ করায় তখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে আসা সামাজিক সমাধানকেই বেছে নেয়া হলো; যেটাকে বলা হলো লকডাউন। কিন্তু এর ফলে অর্থনীতির চাকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলো। অর্থাৎ এই মুহুর্তে সহজলভ্য মেডিক্যাল সমাধান অর্থনৈতিক ধ্বস ডেকে আনছে। তবে জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, অর্থনীতি স্থবির করে ফেলার ফলাফল হলো দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতিকেই ধ্বংস করে ফেলা। কাজেই মেডিক্যাল সমাধানের চাপ সহ্য করার জন্যে স্বল্প মেয়াদে রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে দেয়া হলো অর্থনৈতিক প্রণোদনা। ফ্রীডম্যান বলছেন যে, অর্থনীতি স্থবির করে দিয়ে লকডাউনের সমাধান কোন টেকসই সমাধান নয়। জনগণকে ঘরের মাঝে আটকে থাকতে বাধ্য করলে অর্থনৈতিক, পারিবারিক, মনস্তাত্বিক এবং সামাজিক চাপে পড়ে একসময় তারা নিয়ম ভেঙ্গে বের হয়ে আসবেই। জোরপূর্বক লকডাউন বাস্তবায়নের ফলাফল হবে ভয়াবহ সামাজিক অসন্তোষ। এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি ছাড়াও সামাজিক সংস্থাগুলির উপর মানুষের আস্থা বিলুপ্ত হবে। মানুষের কাছে মনে হতে থাকবে যে, এর কোন সমাধান কেউ দিতে পারেনি।

‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব শুধু ব্যাপকই ছিল না, এটা হবে সুদূরপ্রসারী। আর চীনে যখন রোগের প্রদুর্ভাব শুরু হয়, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন যে, ‘লকডাউন’এর মতো একটা সমাধানের পথে এগুলে রোগের সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব হবে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো যে, লকডাউন পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশে মোটামুটি কাজ করলেও ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়াতে তেমন সফল হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং ব্রাজিল মিলেই গোটা বিশ্বের মোট সংক্রমণের এক তৃতীয়াংশ হয়ে গিয়েছে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক বিশ্লেষণে করোনা পরবর্তী বিশ্বের একটা মলিন ছবি আঁকা হয়। সেখানে লেখা হয় যে, মার্কিন নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি করা বিশ্বব্যবস্থা এখন হুমকির মুখে। এই বিশ্বব্যবস্থার মাঝে রয়েছে লিবারাল গণতান্ত্রিক ভাবধারার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আইনের শাসন, মুক্ত বাজার অর্থনীতি, এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশগুলির মদদে গড়ে ওঠা কতগুলি আন্তর্জাতিক সংস্থা। পশ্চিমা দেশগুলির অর্থনীতি সমস্যায় পতিত হবার সাথেসাথে চীনের উত্থান হচ্ছে। এবং একইসাথে বৈশ্বিক মহামন্দার মাঝে একেকটা দেশ নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিতে তৈরি করা সংস্থাগুলি নিজেদের ব্যর্থতাকে লুকাতে সক্ষম হয়নি। আটলান্টিকের দুই পাড়ের দেশগুলি নিজেকে বাঁচাতে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে। বিশ্বে আইনের শাসন, চিন্তার স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শক্ত পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া আর কোন গতি নেই বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই সেরকম পদক্ষেপ নেবার সক্ষমতা রাখে? অন্ততঃ ২০২০এর নভেম্বরে চরম বিরোধপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর এক বিভক্ত রাষ্ট্রকে মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র সেই সক্ষমতা কতটুকু দেখাতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

 

অর্থনৈতিক মহামন্দা এবং সামাজিক অসন্তোষ

অস্ট্রেলিয়ার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের আগেই বিশ্ব অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। ২০১৯ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ। বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, জিডিপির নিম্নগামিতা, ধনী দরিদ্রের বৈষম্যের ব্যাপক বৃদ্ধি, এক রাষ্ট্রের সাথে আরেক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপক পার্থক্য, ইত্যাদি সমস্যা বিশ্বে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করার ক্ষেত্র তৈরি করেই রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যুর পর যে ব্যাপক বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তার ভিতও ছিল মূলতঃ অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মহামারির মাঝে ব্যাপক বেকারত্বের করাল গ্রাসের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বব্যাপী অনেক দেশেই বিক্ষোভ এবং সহিংসতার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যেগুলির ফলাফল অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে; আর একনায়কোচিত দেশগুলিতে সরকারগুলি হয়তো ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রতিবাদী জনগণের উপর আরও বেশি করে চড়াও হবে।

তুরস্কের আনতালিয়া বিলিম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর তারিক ওগুজলু ‘ডেইলি সাবাহ’ পত্রিকার এক লেখায় বলছেন যে, বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বহুগুণে বেড়ে যাবার কারণেই মূলতঃ করোনাভাইরাস সারা দুনিয়াতে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাসের সংক্রমণে চীনের অর্থনীতি স্থবির হবার সাথে সাথেই চীনের সাপ্লাই চেইনের উপর নির্ভরশীল দেশগুলিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা

‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে বাণিজ্য যুদ্ধ এবং বিশ্বায়নের বিরুদ্ধাচরণ করে জাতীয়তাবাদের উত্থান মহামারির আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের একে অপরকে দোষারোপ করে দ্বন্দ্বে জড়ানোটা করোনার কারণে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে। তবে প্রতিবেদনে আরও বলা হচ্ছে যে, ২০০৮ সালে বৈশ্বিক মন্দার পরপর যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের অর্থনীতিকে পুনরায় দাঁড় করাতে এবং বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ জড়িয়ে ব্যস্ত ছিল, সেই সুযোগে চীন শূণ্যস্থান পূরণে মনোযোগী হয়েছিল। ঠিক একইভাবে করোনা মহামারির মাঝে পশ্চিমা শক্তিরা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, সেসময় চীনারা দক্ষিণ চীন সাগর এবং পূর্ব চীন সাগরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে নিতে চাইছে। এর সমান্তরালে হংকংএর আন্দোলনকারীদের যখন চীনা সরকার জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, তখন পশ্চিমা দেশগুলি আন্দোলনকারীদের পক্ষাবলম্বণ করে চীনের সাথে দ্বন্দ্বকে আরও গভীর করছে। এর ফলশ্রুতিতে মার্কিন কোম্পানিগুলি চীন ছাড়তে শুরু করেছে এবং ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমছে। তবে হংকংএর আন্দোলন চীনের উইঘুর এবং তিব্বতের মতো অঞ্চলগুলিতে যেনো ছড়িয়ে না পড়ে, সেব্যাপারে চীনা সরকার যথেষ্ট সাবধান থাকতে চাইবে।

মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘হাডসন ইন্সটিটিউট’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, করোনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের প্রযুক্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে। চীনারা করোনা নিয়ন্ত্রণে ‘বিগ ডাটা’, ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’, ‘ফেশিয়াল রেকগনিশন’ এবং ড্রোনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চীনকে প্রযুক্তিতেই শুধু এগিয়ে নেবে না, নিজ জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ আরও বৃদ্ধি করবে। চীনারা ‘মেইড ইন চায়না ২০২৫’ প্রকল্পের অধীনে অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকার উদ্দেশ্যে আরও বিনিয়োগ করবে। আর উল্টোদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলি চীনের উপর প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা কমাতে অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের সাথে দূরত্ব তৈরি করতে থাকবে। তবে মার্কিনীরা চীন থেকে তাদের শিল্পগুলিকে সরিয়ে নেবার যে ইচ্ছা ব্যক্ত করছে, তা বাস্তবায়ন করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে খুব সহজ হবে না। আর চীনের বড় বাজার হারিয়ে কোন কোম্পানিই নিজেদের আয় কমাতে চাইবে না।

তারিক ওগুজলু বলছেন যে, মহামারির কারণে ‘গ্লোবালাইজেশন’ বা বিশ্বায়ন হয়তো কিছুটা স্থবির হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার কারণে চীন আঞ্চলিকভাবে নিজস্ব একটা ‘বিশ্বায়ন’এর দিকে এগুবে। সাপ্লাই চেইনের মাঝে নিজেদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ না হলে কঠিন সময়ে তা কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দেখেছে। সেই হিসেবেই তারা চাইবে পারস্পরিক একটা নির্ভরশীলতা তৈরি করতে, যাতে ভবিষ্যতে আবারও বিপদে পড়তে না হয়। চীনের আশেপাশের দেশগুলি চীনের আগ্রাসী তৎপরতাতে ভীত হলেও এটা তারা বুঝতে পারছে যে, মহামারির পর অর্থনৈতিকে পুনরায় জাগাতে চীনের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউএর উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করাটা মোটেই সমীচিন নয়। বৈশ্বিকভাবে চীনা এবং মার্কিনী মডেলের প্রতিযোগিতা হবে। স্বাস্থ্য, টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য বিমোচন, ইত্যাদি বিষয়ে এই প্রতিযোগিতা হবে। উভয় দেশই নিজেদের উন্নয়নের মডেল অন্যান্য দেশের কাছে বিক্রি করতে চাইবে। চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’ আলোচনায় আসতেই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘মার্শাল প্ল্যান’এর মতো কোন পরিকল্পনা নিয়ে আসতে না পারে, তাহলে চীনকে সরিয়ে দিয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে কষ্টকরই হবে।

এশিয়ায় ব্রিটেনের প্রত্যাবর্তন

করোনা মহামারির মাঝে ইইউ থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাবার প্রক্রিয়া বন্ধ থাকেনি। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার সুযোগ নিতে এবং একইসাথে ব্যাপক অর্থনৈতিক মন্দা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে ব্রিটেন ইইউএর গন্ডি থেকে বের হয়ে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চাইছে। ব্রিটেনের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেন ইন্দোপ্যাসিফিককে আরও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর ইন্দোপ্যাসিফিকের জন্যে নতুন একজন ডিরেক্টর জেনারেল নিয়োগ দিচ্ছে। একইসাথে ব্রিটেন তার ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশলকে একটা ‘ফ্রেমওয়ার্ক’এর মাঝে সাজাচ্ছে। এশিয়াতে সামরিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার জন্যে ব্রিটিশ সরকার সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করেছে। এই সামরিক অবস্থানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ভারত মহাসাগর ও মধ্যপ্রাচ্য হলেও তা দক্ষিণ চীন সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে দ্বন্দ্ব এবং তেলের বাজারে অস্থিরতা

‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি ঘোষণা করার ঠিক আগে আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কুদস ফোর্সের জেনারেল কাসেম সুলাইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যা করে। এছাড়াও লেবানন এবং ইরাকের রাস্তায় হাজারো মানুষের বিক্ষোভ গোটা অঞ্চলকে অস্থির করে রেখেছিলো আরও আগ থেকেই। শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং নিম্নগামী অর্থনীতি মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছিলো। এছাড়াও সিরিয়া, ইয়েমেন এবং লিবিয়ার যুদ্ধও চলমান ছিলো। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় ইরানের সাথে সৌদি আরব এবং তুরস্কের সাথে আমিরাতের দ্বন্দ্ব বেড়েই চলছিল। ইরান এবং তুরস্ক উভয়েই আঞ্চলিকভাবে তাদের প্রভাব বিস্তারে ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে একইসাথে তেলের বাজারে দরপতনের কারণে তেল রপ্তানির উপর নির্ভরশীল ধনী দেশগুলির অর্থনীতি যেমন ধাক্কা খেয়েছে, তেমনি এই দেশগুলিতে মানবসম্পদ রপ্তানির উপর নির্ভরশীল দেশগুলিও সমস্যায় পতিত হয়েছে। আর অর্থনৈতিক দৈন্যতা ও অব্যাবস্থাপনার ফলশ্রুতিতে শাসকশ্রেণীর উপর জনগণের আক্রোশ বেড়েই চলেছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের আবির্ভাব পুরো অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’ বলছে যে, করোনা মহামারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ এবং ভাইরাসের চাপে পড়ে ইরান হয়তো আঞ্চলিকভাবে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এতে সৌদি গ্রুপের দেশগুলির সাথে যেমন ইরানের সংঘাত বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে, একইসাথে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইস্রাইলও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে।

‘ইউনিভার্সিটি অব ডেনভার’এর এর প্রফেসর হায়দার খান ‘আল জাজিরা’তে এক লেখায় বলছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ব্যাপক দরপতনের সময় রাশিয়া নিজেকে বেশ ভালোই মানিয়ে নিয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে রাশিয়া নিজের অর্থনীতিকে বেশ কিছুটা বহুমুখীকরণ করে নিয়েছে। তেলের মূল্য কমে যাবার কারণে আমদানিকারক হিসেবে চীন বেশ লাভবান হয়েছে। অপরদিকে করোনার কারণে স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতিতে ব্যাপক বিপর্যয়ের কারণে তেলের বাজার নিয়ে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নগামিতা গতিশীল হতে পারে এবং চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা ঢুকে পড়তে পারে। চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সিদ্ধান্তগুলি সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িতে দিতে পারে।

 

উদ্দেশ্যবিহীন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং জাতীয়তাবাদের উত্থান

‘হাডসন ইন্সটিটিউট’ বলছে যে, করোনাভাইরাস ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অস্তিত্বকেই হুমকির মাঝে ফেলে দিচ্ছে। ইইউ তৈরি হয়েছিল এমন একটা সমঝোতার মাঝ দিয়ে, যার মাধ্যমে ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে কোন ঝামেলা থাকবে না। সদস্য দেশগুলি এটা মেনে নেবে কারণ এর বিনিময়ে তারা ইইউএর অন্য দেশগুলির বাজারে কোন বাধা ছাড়াই ঢুকতে পারবে। কিন্তু বর্তমান ইইউএর মূল সমস্যা হলো জনগণের আনুগত্য ইইউএর প্রতি নয়, বরং তাদের নিজ দেশের প্রতি। যতদিন ইইউ তার সদস্য দেশগুলিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখাতে পেরেছে, ততদিন তারা ইইউএর সদস্য থাকার পিছনে শক্তিশালী কারণ পেয়েছে। তবে সিরিয়া, লিবিয়া ও মালির যুদ্ধের ফলে ইউরোপে শরণার্থীর ঢল এবং অর্থনৈতিক মহামন্দায় ইইউএর অস্তিত্ব প্রশ্নের মাঝে পড়েছে। উত্তর এবং দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলির মাঝে বৈষম্য সকলের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীদের উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে, যারা বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলছে। ইউরোপের দেশগুলিতে রাজনৈতিক দলগুলি জনগণের ভোট পেতে জাতীয়তাবাদকেই ব্যবহার করবে। তারা সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে ইউরোপিয় সমাধান নয়; জাতীয় সমাধানের পথ খুঁজবে। মহামারি ব্যবস্থাপনায় ইইউএর দুর্বল পদক্ষেপগুলি জনগণের কাছে ইইউএর চিন্তাটাকে অবান্তর করে তুলবে। আর করোনাভাইরাসের কারণে মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির উপর নির্ভরশীল ইউরোপের অর্থনীতি, বিশেষ করে জার্মানির অর্থনীতি, চাপের মুখে পড়বে।

জর্জ ফ্রীডম্যান আরও ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, মহামারির সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে ইউরোপের জনগণ তাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দিকেই তাকাবে; কারণ সেই নেতৃবৃন্দের তাদের জনগণের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে। ব্রাসেলসের ইইউ নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে জনগণ এই সমস্যার সমাধান আশা করে না। জাতীয় দুর্যোগের সময় জনগণের কাছে জাতীয় পরিচয় এবং স্বশাসনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেকারণেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি জাতীয় নেতৃবৃন্দই নিচ্ছে; ইইউ নিচ্ছে না। যদিও ইইউএর সব দেশেই মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে, তথাপি তারা নিজেদের জান মালের নিরাপত্তা দিতে অন্য দেশের সাথে সীমানা আটকে রাখার পথেই এগিয়েছে। এক্ষেত্রে ইইউএর সীমানাবিহীন চিন্তা কাজ করেনি। একটা জোট কতটা ভালোভাবে কাজ করছে, তা বুঝতে হলে দেখতে হবে তারা খারাপ সময়ে কিভাবে কাজ করে। কঠিন সময়ে ইউরোপের দেশগুলি নিজেদের স্বার্থকেই প্রথমে দেখেছে; তারপর অন্যের স্বার্থ দেখেছে। নিজ ভাষা, ইতিহাস এবং বিশ্বাসের মাঝেই ইউরোপিয় দেশগুলি নিজেদের গন্ডিকে সীমাবদ্ধ করেছে। বাকিরা সবসময়ই কম প্রাধান্য পেয়েছে। ইইউ তৈরি হয়েছিল এই দেয়ালগুলি ভেঙ্গে ফেলার জন্যে; তা সফল হয়নি। ইউরোপিয়ান পরিচয় তৈরি করার চেষ্টাটা যতটা সফল হবে বলে ভাবা হয়েছিল, তা হয়নি।

ফ্রীডম্যান শুধু ইইউএর মাঝেই দেয়াল তোলার কথা বলেননি। তিনি বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের একটা রাজ্য আরেকটা রাজ্যের সাথে প্রায় একই ধরণের ব্যবহার করেছে। যেমন টেক্সাসের গভর্নর পার্শ্ববর্তী লুইজিয়ানা রাজ্যের সাথে যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছিল, কারণ টেক্সাসের চাইতে লুইজিয়ানায় সংক্রমণ বেশি ছিল তখন। কিন্তু লুইজিয়ানার সাথে সীমানা বন্ধ করেও টেক্সাস তার সংক্রমণ থামাতে পারেনি। ফ্রীডম্যান বলছেন যে, দেয়াল তুলে দেয়ার ব্যাপারটা ইউরোপের একার নয়। তবে ইউরোপের ক্ষেত্রে এর পিছনে একটা লম্বা ইতিহাস রয়েছে। এক দেশ আরেক দেশের সাথে যুদ্ধ করেছে; সর্বদা সংঘাতের ভয় তাদের গ্রাস করেছে। টেক্সাস এবং লুইজিয়ানার মাঝে মনোমালিন্য খুব বেশিদূর হয়তো যাবে না; তবে ইইউএর সদস্য দেশগুলির জন্যে এই বিভেদ মারাত্মক। একইসাথে মার্কিনীদের চোখে বাকি বিশ্বের প্রতি অবিশ্বাসও হবে মারাত্মক। বৈশ্বিক সংস্থাগুলির উপর মানুষের আস্থাটাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

Wednesday, 13 January 2021

রাশিয়া কেন মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করতে চাইছে?

১৪ই জানুয়ারি ২০২১ 

রাশিয়ার উপর পশ্চিমা অবরোধের কারণে রাশিয়ার জন্যে কিছু প্রযুক্তি যোগাড় করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, যেগুলি মহাকাশে রাশিয়ার পক্ষে যথেষ্ট সংখ্যক স্যাটেলাইট রাখাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এমতাবস্থায় রাশিয়া চাইছে মহাকাশে হুমকি তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাজনৈতিক দরকষাকষি করতে। যুক্তরাষ্ট্র বহুবছর ধরে চেষ্টা করেও তাদের স্যাটেলাইট ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। হয়তো এই সুযোগটাই রাশিয়া নিতে চাইছে। বিশেষ করে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল টার্গেট যখন চীন, তখন রাশিয়া তার দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ফেরাতে সবকিছুই করবে। 


গত ১৬ই ডিসেম্বর মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্পেস কমান্ডের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, রাশিয়া মহাকাশকে একটা যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে তৈরি করার দিকে এগুচ্ছে। রাশিয়া নতুন করে একটা স্যাটেলাইট ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়। এটা ২০২০ সালে রাশিয়ার এরকম তৃতীয় পরীক্ষা। স্পেস কমান্ড বলছে যে, এরকম ক্ষেপণাস্ত্র নিম্ন কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইট ধ্বংস করতে সক্ষম। আর এরকম একটা স্যাটেলাইট ধ্বংস হলে এর ধ্বংসাবশেষ আশেপাশের স্যাটেলাইটের জন্যে হুমকি তৈরি করবে। মার্কিন স্পেস কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল জেমস ডিকিনসন এক বিবৃতিতে বলেন যে, রাশিয়া মুখে বলছে যে তারা মহাকাশে যুদ্ধ চায় না; কিন্তু তারপরেও তারা মহাকাশ এবং ভূপৃষ্ঠে বিভিন্ন সক্ষমতা তৈরি করছে, যা স্যাটেলাইটের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরশীলতাকে দুর্বলতা হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছে যে, রাশিয়া দুই ধরনের স্যাটেলাইট ধ্বংসী অস্ত্র ডেভেলপ করছে। এর একটা হলো ‘ডিরেক্ট এসেন্ট এন্টি স্যাটেলাইট’, যা মূলত ভূমি থেকে ছোঁড়া একটা ক্ষেপণাস্ত্র। আর দ্বিতীয়টা হলো ‘কো অরবিটাল এন্টি স্যাটেলাইট’, যার মাধ্যমে মহাকাশে একটা স্যটেলাইট আরেকটা স্যটেলাইটের উপর হামলা করে। রাশিয়ার মহাকাশ ভিত্তিক এই পরীক্ষাগুলির উদ্দেশ্য বুঝতে হলে এই প্রকল্পগুলির বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

গত জুলাই মাসে মার্কিন স্পেস কমান্ড জানায় যে, রাশিয়া আরও একটা স্যাটেলাইট ধ্বংসী ব্যবস্থার পরীক্ষা চালিয়েছে। ‘কসমস ২৫৪৩’ নামের এই স্যাটেলাইট মহাকাশে গিয়ে আরেকটা বস্তুকে মহাকাশে ছেড়েছে। এর মাধ্যমে কোনকিছু ধ্বংস করা ছাড়াই রুশরা একটা ‘কো অরবিটাল এন্টি স্যাটেলাইট’ ব্যবস্থার পরীক্ষা চালালো। এর আগে এপ্রিল মাসে রাশিয়া ডিসেম্বরের মতোই একটা এন্টি স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছিল। ২০২০এর ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলে যে, দু’টা রুশ স্যটেলাইট মহাকাশে মার্কিন গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের উপর নজরদারি করছে। এর মাঝে একটা স্যাটেলাইট ছিল সেই ‘কসমস ২৫৪৩’, যা নিজের পেটের ভেতর থেকে আরেকটা স্যাটেলাইটের ‘জন্ম’ দেয়। রুশ স্যাটেলাইটগুলি মার্কিন স্যাটেলাইটের মাত্র ১’শ ৬০ কিঃমিঃএর মাঝে চলে আসে। মার্কিন জেনারেল জন রেইমন্ড ‘টাইম’ ম্যাগাজিনকে বলেন যে, রুশ স্যাটেলাইটের এহেন কর্মকান্ড খুবই অদ্ভুত এবং বিরক্তিকর। তিনি বলেন যে, মার্কিনীরা কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে রুশদের কাছে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। রুশ কর্মকর্তারা রুশ বার্তা সংস্থা ‘তাস’কে বলছেন যে, এই স্যাটেলাইট ছিল ইন্সপেক্টর স্যাটেলাইট, যার কাজ হলো অন্য রুশ স্যাটেলাইটের টেকনিক্যাল অবস্থা পরীক্ষা করা।

মহাকাশ গবেষক মাইকেল থম্পসন প্রথমবারের মতো রুশ স্যাটেলাইটের এই কর্মকান্ডকে অবলোকন করে টুইটারে পোস্ট দেন। তিনি বলেন যে, রুশ স্যটেলাইট মার্কিন গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ‘ইউএসএ ২৪৫’এর কাছাকাছি কক্ষপথে নিজের অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন স্যাটেলাইটটা হলো মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘ন্যাশনাল রেকনাইস্যান্স অফিস’এর ‘কেএইচ ১১’ স্যাটেলাইট। ‘কীহোল’ প্রকল্পের অধীন এই স্যাটেলাইটের কাজ হলো মহাকাশ থেকে ভূমির হাই রেজোলিউশন অপটিক্যাল ও ইনফ্রারেড ছবি তোলা। মার্কিন মহাকাশ সংস্থা ‘নাসা’র ওয়েবসাইট বলছে যে, ২০১৩ সালে মহাকাশে পাঠানো এই স্যাটেলাইটের কর্মকান্ড গোপনীয়। ক্রিস পীটের ব্যবস্থাপনায় চলা স্যাটেলাইট মনিটরিং ওয়েবসাইট ‘হেভেন্স এবাভ’এর এক বিশ্লেষণে দেখানো হচ্ছে যে, মার্কিন স্যাটেলাইট ‘ইউএসএ ২৪৫’এর কক্ষপথ রাশিয়ার পূর্বদিকের শ্বেত সাগর থেকে শুরু করে কৃষ্ণ সাগরের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলির উপর দিয়ে যায়। দিনে ১৫ বার এটা পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে।

‘ডিফেন্স নিউজ’এর এক লেখায় রাশিয়া বিশ্লেষক পাভেল লুজিন বলছেন যে, রাশিয়া মহাকাশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ‘ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েনটিস্টস’এর হিসেবে মহাকাশে ২ হাজার ২’শর বেশি স্যাটেলাইট রয়েছে, যার মাঝে ১ হাজারের বেশি মার্কিন। তন্মধ্যে ১’শ ৮৯টা সামরিক স্যাটেলাইট। রাশিয়ার ১’শ ৬০টা স্যাটেলাইটের মাঝে সামরিক স্যাটেলাইট ১’শটার মতো। চীনের ৩’শ ২০টা স্যাটেলাইটের মাঝে ১’শ ৫টা সামরিক। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের অর্থনীতি স্যাটেলাইটের উপর যথেষ্টই নির্ভরশীল; তবে রাশিয়া ততটা নয়। রাশিয়ার সামরিক স্যাটেলাইটগুলির মাঝে ৫১টাই যোগাযোগ স্যাটেলাইট; আর মাত্র ১৬টা হলো ভূমির ছবি তোলার স্যাটেলাইট। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে রয়েছে ৫৬টা ছবি তোলা স্যাটেলাইট, যোগাযোগ স্যাটেলাইট রয়েছে মাত্র ৪৯টা। চীনের ক্ষেত্রেও ছবি তোলার স্যাটেলাইট ৫৭টা হলেও যোগাযোগের স্যাটেলাইট মাত্র ৩টা। অর্থাৎ ছবি তোলার স্যাটেলাইট, যেগুলি মূলত ইন্টেলিজেন্সের জন্যে ব্যবহৃত হয়, সেখানেই রাশিয়া প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছে। লুজিন বলছেন যে, রাশিয়ার উপর পশ্চিমা অবরোধের কারণে রাশিয়ার জন্যে কিছু প্রযুক্তি যোগাড় করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, যেগুলি মহাকাশে রাশিয়ার পক্ষে যথেষ্ট সংখ্যক স্যাটেলাইট রাখাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এমতাবস্থায় রাশিয়া চাইছে মহাকাশে হুমকি তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাজনৈতিক দরকষাকষি করতে। রাশিয়া জ্যামিং এবং এন্টি স্যাটেলাইটের মতো প্রযুক্তি ডেভেলপ করতে চাইছে, যেগুলির উদ্দেশ্য হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্যাটেলাইটের নেটওয়ার্ক ব্যবহারে বাধা প্রদান করা।

প্রতিপক্ষের শতশত স্যাটেলাইট টার্গেট করাটা একটা অর্থহীন কর্মকান্ড। ‘ইউনাইটেড নেশনস ইন্সটিটিউট ফর ডিজআর্মামেণ্ট রিসার্চ’এর সিরিয়র রিসার্চ ফেলো পাভেল পডভিগ এক সেমিনারে মত দিচ্ছেন যে, ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই এন্টি স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ডেভেলপ করতে চেয়েছিল। কিন্তু উভয়েই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, এরূপ ব্যবস্থা ডেভেলপ করে ফলাফল পাওয়া কঠিন। কেননা প্রতিপক্ষ বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে এন্টি স্যাটেলাইটের সফলতাকে কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হবে। এরপরও উভয়েই এন্টি স্যাটেলাইটের প্রযুক্তি একেবারে ফেলে দেয়নি। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ‘এসএম ৩’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে একটা কক্ষপথচ্যুত স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছিল। ২০২০ সালের এপ্রিলে রাশিয়ার পরীক্ষা করা ‘নুডল’ এন্টি স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্রও এধরণেরই একটা অস্ত্র। তবে মহাকাশ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘সিকিউর ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন’এর ডিরেক্টর ব্রায়ান উইডেন মনে করছেন যে, বিভিন্ন কারণে একটা দেশের পক্ষে নিজস্ব স্যাটেলাইট ব্যবস্থাকে আঘাত সহ্য করার মতো করে তৈরি করাটা খুব সহজ হয় না। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বহুবছর ধরে চেষ্টা করেও তাদের স্যাটেলাইট ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। হয়তো এই সুযোগটাই রাশিয়া নিতে চাইছে। বিশেষ করে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল টার্গেট যখন চীন, তখন রাশিয়া তার দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ফেরাতে সবকিছুই করবে।