Showing posts with label Space Race. Show all posts
Showing posts with label Space Race. Show all posts

Friday, 19 November 2021

রাশিয়া কেন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মহাকাশে নিজেদের স্যাটেলাইট ধ্বংস করছে?

২০শে নভেম্বর ২০২১

‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করতেই রাশিয়া মহাকাশে স্যাটেলাইট ধ্বংসের প্রকল্পে নেমেছে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রও রুশ কর্মকান্ডকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দিয়ে বিশ্বব্যাপী জনসমর্থন আদায় করছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও মহাকাশে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কথা না বলে রুশ হুমকি মোকাবিলার পাল্টা কৌশলের উপরেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। মহাকাশে কোন আন্তর্জাতিক আইনের অনুপস্থিতি এতকাল সমস্যা সৃষ্টি না করলেও ভেঙ্গে পড়া বিশ্বব্যবস্থায় তা দুশ্চিতার কারণ হচ্ছে।


মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা গত ১৫ই নভেম্বর বলে যে, রাশিয়া একটা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তাদের নিজস্ব একটা পুরোনো স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছে। এর ফলে মহাকাশ জুড়ে হাজারো ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়েছে; যেগুলি অন্যান্য স্যাটেলাইটের জন্যে হুমকির সৃষ্টি করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন প্রশ্ন করেন যে, রুশরা তো জানতো যে এধরণের কর্মকান্ডে কিরকম ধ্বংসাবশেষ তৈরি হবে। তাহলে তারা কি করে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে নিজেদের মহাকাশচারীদেরকেই বিপদে ফেললেন? মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, রুশদের এই কর্মকান্ড ভয়ঙ্কর এবং একপরকার ভন্ডামি। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সাথে নিয়ে এই দায়িত্বজ্ঞানশূণ্য কাজের জবাব দেবে। মার্কিন স্পেস ফোর্সের ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টর মেজর জেনারেল লেয়া লডারবেক একটা মহাকাশ কনফারেন্সে বলেন যে, এটা খুব সম্ভবতঃ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একটা বার্তা ছিল। রাশিয়া ডিটারেন্টকে চিন্তা করে মার্কিন মহাকাশ সক্ষমতাকে প্রতিরোধ এবং দুর্বল করার লক্ষ্যেই রাশিয়া এটা করেছে।

মার্কিন স্পেস কমান্ডের হিসেব মতে, এটা ছিল ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে স্যাটেলাইট ধ্বংস করার চতুর্থ পরীক্ষা। এর আগে ২০০৭ সালে চীনারা প্রথমবারের মতো তাদের ‘ফেনইউন ১সি’ স্যাটেলাইট ধ্বংস করে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘অপারেশন বার্নট ফ্রস্ট’এর মাধ্যমে একটা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ধ্বংস করে। ২০১৮ সালে ভারত তাদের নিজস্ব ‘মাইক্রোস্যাট আর’ ধ্বংস করে। আর সর্বশেষ রুশরা তাদের ‘কসমস ১৪০৮’ স্যাটেলাইট ধ্বংস করলো। মার্কিনীরা বলছে যে, রুশ স্যাটেলাইট ধ্বংসের ফলে তৈরি হওয়া কমপক্ষে ১০ সেন্টিমিটার আকৃতির ১৫’শ ধ্বংসাবশেষ এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। অথচ ২০১৮ সালে ধ্বংস করা মার্কিন স্যাটেলাইট থেকে উৎপন্ন হওয়া ১’শ ৭৩টা ধ্বংসাবশেষের মাঝে একটাও এখন মহাকাশে নেই। ২০০৭ সালে চীনা স্যাটেলাইটের ৩ হাজার ৬’শ ৭৯টা ধ্বংসাবশেষের মাঝে কমপক্ষে ৩ হাজার ১৩টা এখনও মহাকাশে ঘুরছে। ২০১৮ সালের ভারতীয় স্যাটেলাইটের ১’শ ৬৮টা ধ্বংসাবশেষের একটা এখনও মহাকাশে রয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগেই ২০০৭ সালে চীনা স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের সাথে সংঘর্ষ এড়াতে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনকে স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছিল।

মার্কিন বিবৃতির প্রত্যুত্তরে রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই সোইগু বলেন যে, মহাকাশের এই ধ্বংসাবশেষ মহাকাশের কোন কর্মকান্ডকেই হুমকির মাঝে ফেলবে না। ১৯৮০এর দশকের একটা স্যাটেলাইটকে রুশরা নিখুঁতভাবে ধ্বংস করেছে। তবে ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এরকম স্যাটেলাইট ধ্বংসকারী পরীক্ষা মহাকাশে ধ্বংসাবশেষের আরও বড় সমস্যার মাঝে একটামাত্র। মহাকাশে মানুষের পদচারণা বাড়ছেই; যা এই সমস্যাকে আরও গভীর করছে। মহাকাশে বর্তমানে বিশাল এক জঙ্গল অবস্থান করছে। এর মাঝে রয়েছে বিভিন্ন স্টেজের রকেট; যেগুলি কয়েক দশক ধরে মহাকাশে ঘুরতে থাকে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স ওয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, রাশিয়ার মহাকাশের পরীক্ষার পর পেন্টাগন মহাকাশে তাদের সম্পদগুলিকে রক্ষা করার জন্যে নড়েচড়ে বসেছে। ১৭ই নভেম্বর মার্কিন স্পেস ফোর্সের লেঃ জেনারেল নিনা আরমাইনো লাস ভেগাসে একটা মহাকাশ কনফারেন্সে বলেন যে, রাশিয়া মূলতঃ একটা অস্ত্র পরীক্ষা দেখিয়েছে। তারা যদি একটা রুশ স্যাটেলাইট ধ্বংস করতে পারে, তাহলে একটা মার্কিন স্যাটেলাইটও ধ্বংস করতে পারবে। শুধু রাশিয়া নয়; চীনও এটা পারবে। প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, গত জুলাই মাসে চীনারা একটা হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে, যা মহাকাশে পুরো পৃথিবী ঘুরে এসেছে। রাশিয়া এবং চীনের এই পরীক্ষাগুলি পেন্টাগনের টনক নড়িয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব অস্টিন সাংবাদিকদের বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশের ‘সশস্ত্রীকরণ’এর ব্যাপারে চিন্তিত। যুক্তরাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ সাধ্যমতো বিভিন্ন প্রকারের হুমকি মোকাবিলায় কাজ করছে। জেনারেল আরমাইনো বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইবে তাদের মহাকাশের সম্পদগুলিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন করে ফেলা অথবা সেগুলিকে বাজে টার্গেট হিসেবে পেশ করা। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্র তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে; একইসাথে কক্ষপথের ভিন্নভিন্ন স্তর তৈরি করবে; হাইব্রিড সক্ষমতাসহ ছোট স্যাটেলাইট ডেভেলপ করবে; এবং বাণিজ্যিক সক্ষমতাকেও এর সাথে যুক্ত করবে। এগুলি করতে রাশিয়ার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র পূর্বাভাষ সক্ষমতাকে টার্গেট করা কঠিন হয়ে যাবে।

কানাডার ‘অটাওয়া ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর পল রবিনসন রুশ মিডিয়া ‘আরটি’র এক লেখায় বলছেন যে, এই মুহুর্তে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধে কোন চুক্তি নেই। অর্থাৎ মহাকাশ এখন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখন মহাকাশে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকে সমর্থন করে না। কিন্তু রুশ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা দেখিয়ে দেয় যে, হয়তো যুক্তরাষ্ট্র এব্যাপারে চিন্তা করলে ভালো করবে। রবিনসন বলছেন যে, যদিও রুশ এই পরীক্ষা মহাকাশের ধ্বংসাবশেষের সমস্যাকে খারাপ করেছে, তথাপি আন্তর্জাতিক কোন আইন না থাকার কারণে বলা যাচ্ছে না যে, রুশরা বেআইনী কিছু করেছে। তিনি বলছেন যে, মহাকাশের ‘সামরিকীকরণ’ এবং ‘সশস্ত্রীকরণ’এর মাঝে পার্থক্য রয়েছে। সামরিক যোগাযোগের জন্যে মহাকাশ বহু আগে থেকেই ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ‘সশস্ত্রীকরণ’ মাত্র শুরু হতে চলেছে, যার মাধ্যমে মহাকাশে ধ্বংস সক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে। মার্কিনীরা মনে করছে যে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকতে থাকতে তাদের উচিৎ মহাকাশে এগিয়ে যাওয়া; কারণ মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শেষপর্যন্ত কেউই আটকাতে পারবে না।

২০০৮ সালে চীন এবং রাশিয়া ‘ট্রিটি অন প্রিভেনশন অব দ্যা প্লেসমেন্ট অব ওয়েপন্স ইন আউটার স্পেস’ এবং ‘থ্রেট অর ইউজ অব ফোর্স এগেইনস্ট আউটার স্পেস অবজেক্ট’ নামে দু’টা চুক্তির খসরা তৈরি করলেও যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর থেকে জাতিসংঘেও দুই পক্ষ মহাকাশ নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশ প্রযুক্তিতে ব্যাপকভাবে এগিয়ে আছে এবং বিশ্বব্যাপী তার সামরিক কর্মকান্ড মহাকাশের উপর যথেষ্টই নির্ভরশীল। তাই তারা রাশিয়া বা চীনের সাথে মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের কোন চুক্তিতে যেতে অনিচ্ছুক। এমতাবস্থায় ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করতেই রাশিয়া মহাকাশে স্যাটেলাইট ধ্বংসের প্রকল্পে নেমেছে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রও রুশ কর্মকান্ডকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দিয়ে বিশ্বব্যাপী জনসমর্থন আদায় করছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও মহাকাশে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কথা না বলে রুশ হুমকি মোকাবিলার পাল্টা কৌশলের উপরেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। মহাকাশে কোন আন্তর্জাতিক আইনের অনুপস্থিতি এতকাল সমস্যা সৃষ্টি না করলেও ভেঙ্গে পড়া বিশ্বব্যবস্থায় তা দুশ্চিতার কারণ হচ্ছে।

Wednesday, 13 January 2021

রাশিয়া কেন মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করতে চাইছে?

১৪ই জানুয়ারি ২০২১ 

রাশিয়ার উপর পশ্চিমা অবরোধের কারণে রাশিয়ার জন্যে কিছু প্রযুক্তি যোগাড় করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, যেগুলি মহাকাশে রাশিয়ার পক্ষে যথেষ্ট সংখ্যক স্যাটেলাইট রাখাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এমতাবস্থায় রাশিয়া চাইছে মহাকাশে হুমকি তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাজনৈতিক দরকষাকষি করতে। যুক্তরাষ্ট্র বহুবছর ধরে চেষ্টা করেও তাদের স্যাটেলাইট ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। হয়তো এই সুযোগটাই রাশিয়া নিতে চাইছে। বিশেষ করে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল টার্গেট যখন চীন, তখন রাশিয়া তার দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ফেরাতে সবকিছুই করবে। 


গত ১৬ই ডিসেম্বর মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্পেস কমান্ডের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, রাশিয়া মহাকাশকে একটা যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে তৈরি করার দিকে এগুচ্ছে। রাশিয়া নতুন করে একটা স্যাটেলাইট ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়। এটা ২০২০ সালে রাশিয়ার এরকম তৃতীয় পরীক্ষা। স্পেস কমান্ড বলছে যে, এরকম ক্ষেপণাস্ত্র নিম্ন কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইট ধ্বংস করতে সক্ষম। আর এরকম একটা স্যাটেলাইট ধ্বংস হলে এর ধ্বংসাবশেষ আশেপাশের স্যাটেলাইটের জন্যে হুমকি তৈরি করবে। মার্কিন স্পেস কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল জেমস ডিকিনসন এক বিবৃতিতে বলেন যে, রাশিয়া মুখে বলছে যে তারা মহাকাশে যুদ্ধ চায় না; কিন্তু তারপরেও তারা মহাকাশ এবং ভূপৃষ্ঠে বিভিন্ন সক্ষমতা তৈরি করছে, যা স্যাটেলাইটের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরশীলতাকে দুর্বলতা হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছে যে, রাশিয়া দুই ধরনের স্যাটেলাইট ধ্বংসী অস্ত্র ডেভেলপ করছে। এর একটা হলো ‘ডিরেক্ট এসেন্ট এন্টি স্যাটেলাইট’, যা মূলত ভূমি থেকে ছোঁড়া একটা ক্ষেপণাস্ত্র। আর দ্বিতীয়টা হলো ‘কো অরবিটাল এন্টি স্যাটেলাইট’, যার মাধ্যমে মহাকাশে একটা স্যটেলাইট আরেকটা স্যটেলাইটের উপর হামলা করে। রাশিয়ার মহাকাশ ভিত্তিক এই পরীক্ষাগুলির উদ্দেশ্য বুঝতে হলে এই প্রকল্পগুলির বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

গত জুলাই মাসে মার্কিন স্পেস কমান্ড জানায় যে, রাশিয়া আরও একটা স্যাটেলাইট ধ্বংসী ব্যবস্থার পরীক্ষা চালিয়েছে। ‘কসমস ২৫৪৩’ নামের এই স্যাটেলাইট মহাকাশে গিয়ে আরেকটা বস্তুকে মহাকাশে ছেড়েছে। এর মাধ্যমে কোনকিছু ধ্বংস করা ছাড়াই রুশরা একটা ‘কো অরবিটাল এন্টি স্যাটেলাইট’ ব্যবস্থার পরীক্ষা চালালো। এর আগে এপ্রিল মাসে রাশিয়া ডিসেম্বরের মতোই একটা এন্টি স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছিল। ২০২০এর ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলে যে, দু’টা রুশ স্যটেলাইট মহাকাশে মার্কিন গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের উপর নজরদারি করছে। এর মাঝে একটা স্যাটেলাইট ছিল সেই ‘কসমস ২৫৪৩’, যা নিজের পেটের ভেতর থেকে আরেকটা স্যাটেলাইটের ‘জন্ম’ দেয়। রুশ স্যাটেলাইটগুলি মার্কিন স্যাটেলাইটের মাত্র ১’শ ৬০ কিঃমিঃএর মাঝে চলে আসে। মার্কিন জেনারেল জন রেইমন্ড ‘টাইম’ ম্যাগাজিনকে বলেন যে, রুশ স্যাটেলাইটের এহেন কর্মকান্ড খুবই অদ্ভুত এবং বিরক্তিকর। তিনি বলেন যে, মার্কিনীরা কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে রুশদের কাছে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। রুশ কর্মকর্তারা রুশ বার্তা সংস্থা ‘তাস’কে বলছেন যে, এই স্যাটেলাইট ছিল ইন্সপেক্টর স্যাটেলাইট, যার কাজ হলো অন্য রুশ স্যাটেলাইটের টেকনিক্যাল অবস্থা পরীক্ষা করা।

মহাকাশ গবেষক মাইকেল থম্পসন প্রথমবারের মতো রুশ স্যাটেলাইটের এই কর্মকান্ডকে অবলোকন করে টুইটারে পোস্ট দেন। তিনি বলেন যে, রুশ স্যটেলাইট মার্কিন গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ‘ইউএসএ ২৪৫’এর কাছাকাছি কক্ষপথে নিজের অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন স্যাটেলাইটটা হলো মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘ন্যাশনাল রেকনাইস্যান্স অফিস’এর ‘কেএইচ ১১’ স্যাটেলাইট। ‘কীহোল’ প্রকল্পের অধীন এই স্যাটেলাইটের কাজ হলো মহাকাশ থেকে ভূমির হাই রেজোলিউশন অপটিক্যাল ও ইনফ্রারেড ছবি তোলা। মার্কিন মহাকাশ সংস্থা ‘নাসা’র ওয়েবসাইট বলছে যে, ২০১৩ সালে মহাকাশে পাঠানো এই স্যাটেলাইটের কর্মকান্ড গোপনীয়। ক্রিস পীটের ব্যবস্থাপনায় চলা স্যাটেলাইট মনিটরিং ওয়েবসাইট ‘হেভেন্স এবাভ’এর এক বিশ্লেষণে দেখানো হচ্ছে যে, মার্কিন স্যাটেলাইট ‘ইউএসএ ২৪৫’এর কক্ষপথ রাশিয়ার পূর্বদিকের শ্বেত সাগর থেকে শুরু করে কৃষ্ণ সাগরের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলির উপর দিয়ে যায়। দিনে ১৫ বার এটা পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে।

‘ডিফেন্স নিউজ’এর এক লেখায় রাশিয়া বিশ্লেষক পাভেল লুজিন বলছেন যে, রাশিয়া মহাকাশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ‘ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েনটিস্টস’এর হিসেবে মহাকাশে ২ হাজার ২’শর বেশি স্যাটেলাইট রয়েছে, যার মাঝে ১ হাজারের বেশি মার্কিন। তন্মধ্যে ১’শ ৮৯টা সামরিক স্যাটেলাইট। রাশিয়ার ১’শ ৬০টা স্যাটেলাইটের মাঝে সামরিক স্যাটেলাইট ১’শটার মতো। চীনের ৩’শ ২০টা স্যাটেলাইটের মাঝে ১’শ ৫টা সামরিক। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের অর্থনীতি স্যাটেলাইটের উপর যথেষ্টই নির্ভরশীল; তবে রাশিয়া ততটা নয়। রাশিয়ার সামরিক স্যাটেলাইটগুলির মাঝে ৫১টাই যোগাযোগ স্যাটেলাইট; আর মাত্র ১৬টা হলো ভূমির ছবি তোলার স্যাটেলাইট। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে রয়েছে ৫৬টা ছবি তোলা স্যাটেলাইট, যোগাযোগ স্যাটেলাইট রয়েছে মাত্র ৪৯টা। চীনের ক্ষেত্রেও ছবি তোলার স্যাটেলাইট ৫৭টা হলেও যোগাযোগের স্যাটেলাইট মাত্র ৩টা। অর্থাৎ ছবি তোলার স্যাটেলাইট, যেগুলি মূলত ইন্টেলিজেন্সের জন্যে ব্যবহৃত হয়, সেখানেই রাশিয়া প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছে। লুজিন বলছেন যে, রাশিয়ার উপর পশ্চিমা অবরোধের কারণে রাশিয়ার জন্যে কিছু প্রযুক্তি যোগাড় করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, যেগুলি মহাকাশে রাশিয়ার পক্ষে যথেষ্ট সংখ্যক স্যাটেলাইট রাখাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এমতাবস্থায় রাশিয়া চাইছে মহাকাশে হুমকি তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাজনৈতিক দরকষাকষি করতে। রাশিয়া জ্যামিং এবং এন্টি স্যাটেলাইটের মতো প্রযুক্তি ডেভেলপ করতে চাইছে, যেগুলির উদ্দেশ্য হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্যাটেলাইটের নেটওয়ার্ক ব্যবহারে বাধা প্রদান করা।

প্রতিপক্ষের শতশত স্যাটেলাইট টার্গেট করাটা একটা অর্থহীন কর্মকান্ড। ‘ইউনাইটেড নেশনস ইন্সটিটিউট ফর ডিজআর্মামেণ্ট রিসার্চ’এর সিরিয়র রিসার্চ ফেলো পাভেল পডভিগ এক সেমিনারে মত দিচ্ছেন যে, ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই এন্টি স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ডেভেলপ করতে চেয়েছিল। কিন্তু উভয়েই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, এরূপ ব্যবস্থা ডেভেলপ করে ফলাফল পাওয়া কঠিন। কেননা প্রতিপক্ষ বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে এন্টি স্যাটেলাইটের সফলতাকে কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হবে। এরপরও উভয়েই এন্টি স্যাটেলাইটের প্রযুক্তি একেবারে ফেলে দেয়নি। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ‘এসএম ৩’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে একটা কক্ষপথচ্যুত স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছিল। ২০২০ সালের এপ্রিলে রাশিয়ার পরীক্ষা করা ‘নুডল’ এন্টি স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্রও এধরণেরই একটা অস্ত্র। তবে মহাকাশ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘সিকিউর ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন’এর ডিরেক্টর ব্রায়ান উইডেন মনে করছেন যে, বিভিন্ন কারণে একটা দেশের পক্ষে নিজস্ব স্যাটেলাইট ব্যবস্থাকে আঘাত সহ্য করার মতো করে তৈরি করাটা খুব সহজ হয় না। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বহুবছর ধরে চেষ্টা করেও তাদের স্যাটেলাইট ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। হয়তো এই সুযোগটাই রাশিয়া নিতে চাইছে। বিশেষ করে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল টার্গেট যখন চীন, তখন রাশিয়া তার দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ফেরাতে সবকিছুই করবে।