০৩রা ডিসেম্বর ২০২০
২০শে নভেম্বর সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুলআজিজের সাথে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের ফোনালাপের পর তুর্কি প্রেসিডেন্টের অফিসের এক বার্তায় বলা হয় যে, দুই দেশ তাদের মাঝে বিরোধ নিরসন এবং সম্পর্কোন্নয়ন করার লক্ষ্যে আলোচনার পথ খোলা রাখার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। পরদিনই সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত ‘জি২০’ জোটের শীর্ষ বৈঠকে এরদোগান ভার্চুয়াল ভাষণ দেন। এরপর ২৭শে নভেম্বর ‘ওআইসি’র ৪৭তম বৈঠকের সাইডলাইনে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সউদএর সাথে মিলিত হন। কাভুসোগলু এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, দুই দেশের শক্তিশালী সম্পর্ক শুধু তাদের জন্যে নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যেই সুবিধাজনক। নভেম্বরের কয়েকদিনের ভেতরেই দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মাঝে সম্পর্কোন্নয়নের আভাস দেখা যাওয়াকে অনেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভূরাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে দেখছেন।
‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলছে যে, বিশ্লেষকেরা তুরস্ক এবং সৌদি আরবের দ্বন্দ্বকে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় চলমান সংঘাতের পিছনে দায়ি করছেন। তবে মার্কিন নির্বাচনে জো বাইডেনের জয়লাভের পর তুরস্ক এবং সৌদি আরব নিজেদের সম্পর্ককে নতুন করে চিন্তা করতে চাইছে। কাতারে তুরস্কের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মিতহাত রেন্দে মত দিচ্ছেন যে, জো বাইডেনের প্রশাসন সৌদিদের সাথে সম্পর্ককে নতুন করে সাজাবে বলেই সৌদিরা প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে। এর ফলে সৌদিরা এবং তুর্কিরা উভয়েই চিন্তা করতে শুরু করেছে যে, দু’দেশের মাঝে বৈরিতার সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আঙ্কারার ‘মিডলইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক হুসাইন বাগচি বলছেন যে, অতীতে সৌদিরা তুরস্কে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। এখন তুরস্কের বর্তমান অর্থনৈতিক দৈন্যদশার মাঝে তারা আবারও সৌদি বিনিয়োগ আশা করছে। ১৫ই নভেম্বর তুর্কি মিডিয়াতে বলা হয় যে, তুর্কি গোমাংস, খাশি, পোল্ট্রি, মাছ, দুধ, ডিম, মধু এবং আরও কিছু পণ্যের উপর সৌদিরা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর আগ থেকেই সৌদিরা তুর্কি পণ্যের উপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা চালাচ্ছিল বলে বলছে তুর্কি মিডিয়া ‘ডেইলি সাবাহ’। ‘টারকিশ এক্সপোর্টার্স এসেম্বলি’ বলছে যে, এবছরের অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে তুর্কি পণ্যের রপ্তানি ১৬ শতাংশ কমে ২ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ২০১৯ সালে সৌদিরা তুরস্ক থেকে ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল। তবে তুর্কি বাণিজ্যমন্ত্রী রুশার পেকান ‘ডেইলি সাবাহ’র সাথে সাক্ষাতে বলছেন যে, দুই দেশের বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যাগুলি নিরসনে তারা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আশা করছেন। তিনি বলেন যে, সৌদিরা তাকে বলেছেন যে, সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তুর্কি পণ্যের ব্যাপারে আলাদা কোন সিদ্ধান্তই হয়নি। তুর্কি সরকারি বার্তা সংস্থা ‘আনাদোলু এজেন্সি’ বলছে যে, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল ইতোমধ্যেই কাতারের উপর সৌদি অবরোধ তুলে নেবার আভাস দিয়েছেন। ২০১৭ থেকে উপসাগরীয় দেশগুলি কাতারের উপর অবরোধ দিয়েছে, এবং কাতারের পক্ষ নেবার কারণে তুরস্কেরও বিরোধিতা করেছে।
‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকান্ডের পর থেকে তুরস্ক সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে শক্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র এমরে চালিসকান বলছেন যে, এতদিন খাশোগির হত্যাকান্ড নিয়ে সরব থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তুর্কিরা খুব সম্ভবতঃ তাদের ভাষা পরিবর্তন করে অপেক্ষাকৃত নরম সুরে কথা বলছে। ইস্তাম্বুলের এক আদালতে সৌদিদের অনুপস্থিতিতে খাশোগি হত্যার বিচার চলছে। তুর্কি সরকার বরাবরই এই মামলার শুনানির ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা চালালেও নভেম্বরের শেষের দিকে শুনানির ব্যাপারে তুর্কি সরকার বা কোন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কোন কথা বলা থেকে বিরত থাকেন। আগামি মার্চ মাস পর্যন্ত এই মামলার শুনানি মুলতুবি করা হয়েছে। চালিসকান বলছেন যে, এরদোগান বাস্তববাদিতার চ্যাম্পিয়ন। কাজেই তুর্কি এবং সৌদিরা অবশ্যই একত্রে কাজ করার ব্যাপারে সুযোগ বের করে নেবে।
‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক বিশ্লেষণে জনাথন ফেনটন হারভি বলছেন যে, একসময় বিভিন্ন ইস্যুতে তুরস্ক এবং সৌদি আরব একত্রে কাজ করেছে; বিশেষ করে সিরিয়ার যুদ্ধে বাশার আল আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী গ্রুপগুলিকে সহায়তা দিয়েছে উভয়েই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুবরাজ বিন সালমান ক্ষমতাশালী হবার পর থেকেই তুরস্কের সাথে সৌদিদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। সিরিয়ার বাশার সরকারের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন এবং লিবিয়াতে জেনারেল খলিফা হাফতারকে সমর্থন প্রদান আঞ্চলিকভাবে সৌদি আরবকে তুরস্কের বিপক্ষে দাঁড় করায়। সৌদি মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়িক সংগঠনগুলির মাঝেও তুরস্ক বিরোধী মনোভাব দানা বাঁধতে থাকে। দুই দেশের রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের মাঝে বিভেদ বেশ খানিকটা। তুরস্কের কর্মকর্তাদের মাঝে কেউ কেউ এখনই সৌদিদের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে উপসংহার না টেনে আরও কিছুদিন দেখার পক্ষপাতি। সৌদিরাও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি তুরস্কের ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’র সমর্থনকে ভুলে যেতে পারছে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণার সময়েই জো বাইডেন বলেছেন যে, তিনি সৌদিদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে পুনর্বিবেচনা করবেন; বিশেষ করে জামাল খাশোগি হত্যা এবং ইয়েমেনের যুদ্ধ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারগুলিকে তিনি প্রাধান্য দেবেন। এটা পরিষ্কার যে, তুরস্ক আর সৌদি আরবের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। সাম্প্রতিক চরম বিরোধপূর্ণ মার্কিন নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে যেব্যাপারে সকলেই নিশ্চিত তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন অভ্যন্তরীণভাবে বিভাজিত। সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাব হারাবার সাথে সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত হতে পারছে না। একারণে সৌদি আরব এবং তুরস্কের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী বন্ধু দেশগুলি ওয়াশিংটনের নীতির উপর নির্ভর করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে করা কর্মকান্ডই এখন ওয়াশিংটনের চোখে ভিন্নরূপে দেখা দিচ্ছে, যা সৌদি এবং তুর্কিদের বিচলিত করেছে। বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় আরোহণের আগেই এই অস্থিরতাগুলি সামনে চলে আসছে এবং আবারও ভূরাজনৈতিক ব্যালান্স পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।




















