১৩ই জানুয়ারি ২০২২
গত ১১ই জানুয়ারি তুরস্কের দক্ষিণের দিয়ারবাকির শহরে ১৮ বছর বয়সী একজন সিরিয় শরণার্থীকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় ছুরিকাঘাত করা হয়। এর আগের দিন তুরস্কের বড় শহর ইস্তাম্বুলের বায়রামপাশা এলাকায় নাঈল আল নাঈফ নামের ১৯ বছর বয়সী আরেকজন সিরিয় শরণার্থীকে গভীর রাতে তার ঘরে ঢুকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এর আগে ৯ই জানুয়ারি একজন তুর্কি নাগরিককে একজন সিরিয় শরণার্থী সিগারেট দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ইস্তাম্বুলের এসেনইয়ুর্ত এলাকায় সিরিয়দের ব্যবহৃত একটা শপিং মলে অনেকজন দুর্বৃত্ত একত্রে হামলা চালিয়ে ক্ষতিসাধন করে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিওতে দেখা যায় যে, কয়েক’শ মানুষ মিছিল করতে করতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে এবং স্লোগান দিচ্ছে ‘এটা তুরস্ক; সিরিয়া নয়’। তারা একসময় রাস্তার পার্শ্ববর্তী শপিং মলে হামলা চালিয়ে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং মলের ভেতরে থাকা সিরিয়দের উপর হামলা করে। তবে সবচাইতে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটে তুরস্কের পশ্চিমের শহর ইজমিরে। ১৬ই নভেম্বর কনস্ট্রাকশন সেক্টরে কাজ করা তিনজন সিরিয় কর্মীকে ঘুমের মাঝে পুড়িয়ে মারা হয়। প্রথমে ঘটনাটা দুর্ঘটনা বলে বলা হলেও পরে এর পিছনে হত্যার লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে থাকে। পুলিশ প্রায় একমাস পর ২১শে ডিসেম্বর কেমাল কোরুকমাজ নামের ৪০ বছর বয়সী একজন তুর্কি নাগরিকের স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে হত্যাকান্ডের তদন্ত শুরু করে। ২৩ বছর বয়সী মামুন আল নাবহান, ২১ বছর বয়সী আহমেদ আল আলী, এবং ১৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল বিশ রাতের বেলায় তাদের ঘরে আগুন লাগলে আর বের হতে পারেননি। গ্রেপ্তারকৃত কেমাল কোরুকমাজ নিজেই ঘটনার দিন আরেক ব্যক্তিকে বলেছিল যে, সে সিরিয়দেরকে খুন করতে চায়। এই সূত্রে পুলিশ তার উপর নজরে রাখার পরেও ঘটনা ঘটে এবং ঘটনার দশ দিন পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, এই ঘটনাগুলি তুরস্কে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মারাত্মক ধারাবাহিকতাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। তবে এই সহিংসতা যে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, তা একটু গভীরে গেলেই বোঝা যাবে।
রাজনীতিবিদেরাই যখন উগ্র জাতীয়তাবাদী
তুরস্কে বর্তমানে ৬০ লাখের মতো অভিবাসী এবং শরণার্থী রয়েছে; যাদের মাঝে প্রায় ৩৬ লাখ হলো সিরিয়। তুরস্কের রাজনৈতিক মহলে অনেকেই বলতে শুরু করেছে যে, তুরস্কের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্যে সিরিয় শরণার্থীরাই দায়ী। ২০২১ সালে তুরস্কের একটা আদালত ইস্তাম্বুলের পূর্বের শহর বোলুর মেয়রের শরণার্থী বিরোধী কিছু সিদ্ধান্তকে খোলাখুলিভাবে বর্ণবাদী আখ্যা দিয়ে বাতিল ঘোষণা করে। তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল ‘রিপাবলিকান পিপলস পার্টি’ বা ‘সিএইচপি’র সদস্য মেয়র তানজু ওজকান সিরিয় শরণার্থীদের জন্যে ১১ গুণ বেশি মূল্যে পানি সরবরাহ করার পরিকল্পনা করেন; একইসাথে সিরিয়দের বিয়ের লাইসেন্স ১ লক্ষ লিরা ধার্য করেন। তিনি বলেন যে, এই সিদ্ধান্তের পিছনে তার উদ্দেশ্য হলো সিরিয় শরণার্থীদেরকে তার শহর থেকে তাড়ানো। ‘সিএইচপি’র নেতৃত্ব ওজকানের এহেন বর্ণবাদী সিদ্ধান্তের সমর্থন না করলেও তুর্কি রাজনীতিবিদেরা অনেকেই তাদের শরণার্থী বিরোধী কথা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানুয়ারির শুরুতেই তুরস্কের পুলিশ ডানপন্থী দল ‘জাফের পার্টি’র প্রধান উমিত ওজদাগএর বিরুদ্ধে ‘মানুষের মাঝে ঘৃণা ছড়ানো’র অভিযোগ আনে। অথচ অভিযোগ দায়ের কথার তিন বছরেরও বেশি সময় আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ওজদাগ দাবি করেছিলেন যে, সিরিয় শরণার্থীরা স্থূলকায় হয়ে যাচ্ছে; যেখানে তুর্কিরা দারিদ্র্যের মাঝে পতিত হচ্ছে। ওজদাগ একদিন একটা সিরিয় মালিকানার দোকানে ঢুকে ট্যাক্সের কাগজ এবং পরিচয়পত্র দেখতে চান এবং পুরো ব্যাপারটাকে ভিডিও করে অনলাইনে প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দোকান মালিককে তুর্কি ভাষা না বলতে পারার জন্যে তিরস্কার করেন। তিনি টুইটারে লেখেন যে, এই দোকান মালিকের মতো আরও ৯ লক্ষ লোক তুরস্কে রয়েছে; যারা তুরস্কের জন্যে হুমকি। আরেকটা ঘটনায় গত নভেম্বরে তুরস্কের বিরোধী দল ‘আইওয়াইআই পার্টি’র সদস্য ইলায় আসকোয় ৪৫ জন সিরিয়কে তুরস্কের অর্থনীতিকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক ভিডিও তৈরির অভিযোগে দেশ থেকে বের করে দেয়ার ব্যাপারে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন। তুর্কি মিডিয়া ‘আহভাল’ বলে যে, গত অক্টোবরে তুরস্কের রাস্তায় এক ব্যক্তি মিডিয়াকে বলে যে, তুর্কিরা অর্থনৈতিকভাবে খুব খারাপ রয়েছে; অথচ তুরস্কে থাকা সিরিয়রা বেশ রয়েছে। তিনি বলেন যে, তিনি কলা কিনতে পারছেন না; অথচ সিরিয়রা কেজি কেজি কলা কিনতে পারছে। এই সাক্ষাতের পর তুরস্কে বসবাসরত কয়েকজন সিরিয় অনলাইনে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে কলা খাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করে।
‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২১এর অগাস্টে আঙ্কারার আলতিনদাগ এলাকায় সিরিয় শরণার্থী এবং তুর্কিদের মাঝে দ্বন্দ্ব হানাহানিতে পরিণত হয়। এর মাঝে দু’জন তুর্কি ছুরিকাহত হয়; যাদের একজন পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করে। ঘটনার পর শতশত তুর্কি শহরের সিরিয় বাড়িঘর, দোকানপাট এবং গাড়ি ভাংচুর করে। এই ভাংচুরের দৃশ্য অনেকেই টুইটারে লাইভ প্রকাশ করে। ভিডিওগুলিতে অনেককেই দেখা যায় উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান ব্যবহার করতে। কেউ কেউ তাদের হাত দিয়ে ‘উলফ স্যালুট’ দিচ্ছিলো; যা হলো তুর্কি উগ্রপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘উলকুচু’ বা ‘গ্রে উল্ভস’ গ্রুপের চিহ্ন। দাঙ্গার পর ‘আমরা সিরিয়দেরকে চাই না’, ‘আমরা কোন আফগান চাইনা’ এবং ‘তুরস্ক হলো শুধুমাত্র তুর্কিদের জন্যে’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে সোশাল মিডিয়া ভরে যায়।
তুরস্কের শরণার্থী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘হেপিমিজ গোচমেনিজ’এর একজন সদস্য য়িলদিজ ওনেন ‘আল জাজিরা’কে বলেন যে, ‘আইওয়াইআই পার্টি’ বা ‘সিএইচপি’র সদস্য বোলুর মেয়র বা উমিত ওজদাগএর মতো লোকেরা যখন বারংবার বলতে থাকে যে শরণার্থীরা তুরস্কের প্রধান সমস্যা, তখন কিছু উগ্রপন্থী লোক শরণার্থীদের উপর হামলা করার কারণ পেয়ে যায়। এটা শুধু কয়েক ব্যক্তির কর্মকান্ড নয়, বরং পুরো দেশে কয়েক মাস ধরে চলা রাজনৈতিক পরিবেশই এসকল ঘটনার জন্যে দায়ী। ওনেন বলছেন যে, সবচাইতে মারাত্মক ব্যাপার হলো, এই ঘটনাগুলি তুরস্কের সরকার বা মিডিয়ার কাছে তেমন কোন গুরুত্বই পায়নি; অথচ লক্ষ লক্ষ তুর্কি, যারা জার্মানিতে বসবাস করে জাতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, তাদের ব্যাপারগুলি পুরোপুরি আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে। যখন জার্মানিতে তুর্কিদের উপর হামলা হয়, তখন রাজনীতিবিদেরা এবং সরকার কঠোর বিবৃতি দেয়; অনেকেই রাস্তায় প্রতিবাদ সমাবেশ করে। অথচ ইস্তাম্বুলের এসেনইয়ুর্ত এলাকার ভিডিওতে যখন শতশত মানুষকে সিরিয় দোকানে হামলা করতে দেখা গেলো, তখন মাত্র সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো!
ইজমিরের নৃশংসতা
তুর্কি পত্রিকা ‘ইয়েনি সাফাক’ বলছে যে, ইজমিরের হত্যাকান্ডের স্বীকারোক্তি দেয়া কেমাল কোরুকমাজ ঘটনার ১০ দিন পর গত ২৬শে নভেম্বর দু’জন ব্যক্তিকে আলাদাভাবে ছুরিকাঘাত করে। পুলিশের সামনে সে গর্ব করে স্বীকার করে যে, এর আগে তিনজন সিরিয় নাগরিককে সে নিজেই আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। তুর্কি মিডিয়া ‘এভরেনসেল’ বলছে যে, কোরুকমাজ পুলিশকে বলে যে, সে দুই দশক আগে তুরস্কের সামরিক ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘জেআইটিইএম’এর অধীনে গোপন মিশনে কাজ করতো। সে বলে যে, সে তার গাড়ির উইন্ডশিল্ডের উপর সিরিয়দেরকে হত্যা করার ব্যাপারে পরপর তিনটা নির্দেশনা পাবার পরেই কাজটার পরিকল্পনা শুরু করে। সে অভিযোগ করে যে, সিরিয়রা আসার পর থেকে সে চাকুরি পাচ্ছিলো না। সে মৃত ব্যক্তিদের সাথে একই বাড়িতে থাকা শুরু করে, যা কংক্রিট কোম্পানি ‘বিরলিক বেটন’এর মালিকানায় ছিলো। ঘটনার রাতে সে বের হয়ে গিয়ে পাঁচ লিটার পেট্রোল কিনে এনে বাড়িতে আগুন লাগায়।
ইজমিরে পুড়ে মারা যাওয়া সিরিয়দের একজনের ভাই আহমেদ আল বিশ তুরস্কের কুর্দি মিডিয়া ‘রুদাউ’কে বলেন যে, ভবিষ্যতে যাতে এধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য তিনি ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’, তুরস্কের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছেন। এধরনের হামলা জাতীয়তাবাদীরা করছে বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। মৃত আরেকজনের ভাই আহমেদ আল নাবহান তুর্কি মিডিয়া ‘দুভার’কে বলেন যে, পুলিশ তাকে বলেছিল যাতে সে ঘটনার ব্যাপারে চুপ থাকে। পুলিশ এক ব্যক্তিকে সন্দেহ করছে; এবং সেই ব্যক্তি গ্রেপ্তার হবার আগ পর্যন্ত যেন সে কাউকে কিছু না বলে। আল নাবহান আরও বলেন যে, তিনি চান সরকার যাতে সুষ্ঠু বিচার করে এবং বর্ণবাদ রোধে দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা দেয়। তিনি বলেন যে, তুর্কি, সিরিয়, ইরাকি, জর্ডানিয়ানরা সকলেই মুসলিম। তুরস্কের ১৩টা মানবাধিকার সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে বলে যে, ইজমিরের ঘটনাটা ছিল পুরোপুরিভাবে বর্ণবাদী চিন্তা প্রসূত। তারা ঘটনা তুরস্কের জনগণ এবং মৃতদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার জন্যে তুর্কি সরকারকে দায়ী করেন। তুরস্কের মানবাধিকার এসোসিয়েশন ‘আইএইচডি’র প্রধান জাফের ইনসে বলেন যে, তারা জানেন যে, আইন শৃংখলা বাহিনী এবং অগ্নি নির্বাপক বাহিনীর সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। তবে দায়ী ব্যক্তি নিজেই স্বীকার করেছে যে, সে এক মারাত্মক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই কাজটা করেছে। যদিও এখনও তদন্ত শুরুর দিকে রয়েছে, তথাপি এটা বোঝা যাচ্ছে যে, অনেক লোক এই ঘটনায় জড়িত।
তুরস্কের শরণার্থী রাজনীতি
২০২১এর জুলাইএ তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল ‘সিএইচপি’র প্রধান কেমাল কিলিশদারোগলু বলেন যে, তার দলের পাঁচটা মূল লক্ষ্যের একটা হলো সিরিয় শরণার্থীদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো। তারা ক্ষমতায় যাবার দুই বছরের মাঝেই সকল শরণার্থীকে ফেরত পাঠাবেন; এবং এব্যাপারে তাদের সকল পরিকল্পনা করাই আছে। এর জবাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান বলেন যে, তিনি তুরস্কে আশ্রয় খোঁজা ‘আল্লাহতে বিশ্বাসী’ মানুষদেরকে খুনিদের হাতে তুলে দেবেন না। তবে এরদোগানের এই কথাগুলির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করেন অনেকেই। ‘মাইগ্রেশন পলিসি ইন্সটিটিউট’এর লেখায় বলা হচ্ছে যে, ২০১৬ সালে তুরস্ক ইইউএর সাথে সিরিয় শরণার্থীদের ব্যাপারে একটা চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক তুরস্ক ইইউএর সীমানা থেকে শরণার্থীদেরকে দূরে রাখবে। ইইউ শরণার্থীদের জন্যে ডেবিট কার্ড ইস্যু করে তাদেরকে অর্থ সহায়তা দিতে থাকে; যা ব্যবহার করে শরণার্থীরা বাজার থেকে কেনাকাটা করতে থাকে। চুক্তির ফলে ইইউতে শরণার্থী আসা অনেক কমে যায়। চুক্তিতে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে ইইউএর উপর চাপ সৃষ্টি করতে তুরস্ক ২০২০এর প্রথমাংশে কয়েক লক্ষ শরণার্থীকে গ্রিসে পাঠানোর হুমকি দেয়। এই ঘটনা বলে দিচ্ছে যে, ইইউ এবং তুরস্কের মাঝে শরণার্থী চুক্তি একটা অস্বস্তিকর চুক্তি, যা রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত।
তুরস্কের চাপের মুখে ২০২১এর জুনে ইইউ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, তারা শরণার্থীদের জন্যে তুরস্ককে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আরও ৩ বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দেবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইইউ গত ডিসেম্বরে ঘোষণা দেয় যে, ১৫ লক্ষ শরণার্থীর ডেবিট কার্ডে ৩’শ ২৫ মিলিয়ন ইউরো দেয়া হবে; যা ব্যবহার করে তারা তাদের দরকারি খাদ্য, বাড়িভাড়া, পরিবহণ এবং ঔষধ কেনাকাটা করতে পারবে। ইইউএর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কমিশনার জানেজ লেনারসিচ বলেন যে, এই অর্থ সহায়তার ফলে শরণার্থীরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে, তাদের কোন জিনিসটা সবচাইতে বেশি দরকার; এবং একইসাথে তারা তুরস্কের অর্থনীতিকে সহায়তা দিতে পারবে।
‘ডেইলি সাবাহ’ বলছে যে, ইইউএর শরণার্থী দূরে রাখার প্রবণতা এবং তুরস্কে শরণার্থীদের অর্থায়নে ইইউএর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ব্যাপারে তুর্কি রাজনীতিবিদেরা সর্বদাই সমালোচনার ঝড় তুলেন। এরদোগানের তুর্কি সরকারের অভিযোগ যে, ইইউ তুরস্ককে যে পরিমাণ অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা না দিয়ে গ্রিসকে অর্থায়ন করে যাচ্ছে। চুক্তির পাঁচ বছর পর শরণার্থী নীতির ব্যাপারে ইইউ আগের চাইতে অনেক বেশি বিভাজিত; এবং চুক্তির শর্তগুলি এখন ভেঙ্গে পড়ছে।
তুরস্কের উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তার নেপথ্যে
‘ডেইলি সাবাহ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১১ সালে সিরিয়াতে গৃহযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত তুরস্কে ৬০ হাজার অভিবাসী প্রত্যাশী ছিল। এখন তুরস্কে প্রায় ৬০ লক্ষ অভিবাসী বসবাস করছে; যার মাঝে প্রায় ৪০ লক্ষই এসেছে সিরিয়া থেকে। আর ২০১৬ সালে ইইউএর সাথে শরণার্থী চুক্তি করার পর তুরস্কে আরও ২০ লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় নেয়। রেড ক্রিসেন্ট বলছে যে, তুরস্কে শরণার্থীদের অর্ধেকই প্রয়োজনীয় খাদ্য যোগাড় করতে পারছে না। আর করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে শরণার্থীদের উপর ঋণের বোঝা আগের চাইতে দ্বিগুণ হয়েছে। আর গত অগাস্টে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পলায়নের পর তুরস্কে আবারও নতুন করে শরণার্থী আসার শংকা শুরু হয়। এই শংকাকে কেন্দ্র করে তুরস্কে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের আরেক দফা শরণার্থী বিরোধী কর্মকান্ড দানা বাঁধে। তুরস্কের ‘রিসার্চ সেন্টার ফর এসাইলাম এন্ড ইমিগ্রেশন’ বা ‘আইজিএএম’এর প্রধান মেতিন কোরাবাতির ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, তুরস্কের উগ্র জাতীয়তাবাদের পিছনে রাজনীতিবিদদের একটা বড় অবদান রয়েছে। তারা অনেকেই ২০২৩ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখেই শরণার্থীদেরকে দেশে ফেরত পাঠাবার কথা বলছেন। সমাজ গবেষক উলাস সুনাতাও বলছেন যে, রাজনীতিবিদেরা যখন বারংবার বলছেন যে, শরণার্থীরা দেশে ফেরত পাঠানো হবে, তখন সামনের দিনগুলিতে আরও মারাত্মক সহিংসতা অপেক্ষা করবে।
তুরস্কের জাতীয়তাবাদীরা সিরিয় শরণার্থীদেরকে তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্যে দায়ী করছে। কিন্তু যে ব্যাপারটা অনেকেই এড়িয়ে যাচ্ছেন তা হলো, শরণার্থী সমস্যার মাঝেই তুরস্কের জিডিপি ২০০৯ সালে সাড়ে ৬’শ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৩ সাল নাগাদ সাড়ে ৯’শ বিলিয়নে পৌঁছায়। তবে অর্থনৈতিক অবব্যস্থাপনার কারণে তুরস্কের জিডিপি কমে এখন ৭’শ বিলিয়নে নেমে এসেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সাল থেকে তুর্কি লিরার ব্যাপক দরপতন ঠেকাতে না পারার ফলশ্রুতিতে মারাত্মক মূল্যস্ফীতি গ্রাস করেছে তুরস্কের অর্থনীতিকে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, তুরস্কের অর্থনীতি যখন ভালো ছিল, তখন কেউ শরণার্থী নিয়ে কথা বলেনি; অর্থনীতি খারাপ হবার সাথেসাথেই অনেকেই এর জন্যে শরণার্থীদের দায়ী করতে থাকে।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং তার ‘একে পার্টি’ শরণার্থীদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কোন সুযোগই হাতছাড়া করেনি। এরদোগান একদিকে যেমন সিরিয় শরণার্থীদেরকে সীমানা অতিক্রম করে ইউরোপে যাবার ট্রানজিট দিয়ে ইইউকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করেছেন, তেমনি সিরিয় শরণার্থীদেরকে তিনি ‘আল্লাহতে বিশ্বাসী’ শরণার্থী বলেই থাকতে দিয়েছেন বলে তুর্কি জনগণের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়েছেন। একইসাথে বিরোধী জাতীয়তাবাদী দলগুলিকে তিনি আক্রমণ করেছেন ‘বিশ্বাসী জনগণ’কে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করার জন্যে। এগুলি তিনি করেছেন তার ভোট ব্যাংক বাড়াবার উদ্দেশ্যেই। এরদোগানের সরকার শরণার্থীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে কতটা আন্তরিক, তা ইজমিরে তিনজন সিরিয় কর্মীকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাকে তার সরকারের প্রায় একমাস গোপন রাখার মাঝেই বোঝা যায়। অপরদিকে তুরস্কের বিরোধী উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলিও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না পেয়ে দায়ভার চাপিয়েছে শরণার্থীদের উপর; যা কিনা তাদেরকে ডানপন্থীদের ভোট পেতে সহায়তা করবে। মোটকথা সিরিয় শরণার্থীরা এবং ডানপন্থী উগ্রবাদীরা এখন তুরস্কের রাজনৈতিক ময়দানে খেলার গুটি ছাড়া আর কিছুই নয়।
Thursday, 13 January 2022
তুরস্কে ডানপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন?
Labels:
EU,
Extremism,
Geopolitics,
Nationalism,
refugee,
Right Wing,
Syria,
Turkey
Tuesday, 11 January 2022
ইউরোপজুড়ে ভ্যাকসিন বিরোধী আন্দোলন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাকেই তুলে ধরে
১২ই জানুয়ারি ২০২২
নতুন বছরের শুরুতেই পুরো ইউরোপ উত্তপ্ত হয়েছে ভ্যাকসিন বিরোধী আন্দোলনে। ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইতালি, বেলজিয়াম, চেক রিপাবলিকসহ ইউরোপের দেশগুলিতে করোনার ভ্যাকসিনের বিষয়ে সরকারি বাধ্যবাধতার বিরুদ্ধে চলছে এই বিক্ষোভ। বেশিরভাগ স্থানেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও কিছু শহরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। বিক্ষোভকারীরা ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাপারটাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, এর আগে গত ১৮ই ডিসেম্বর ফ্রান্সে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, এবারের বিক্ষোভ তার চাইতে চার গুণ বড় ছিল।
‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ৮ই জানুয়ারি ভ্যাকসিনের বাধ্যবাধকতার বিরোধিতা করে ফ্রান্সে ১ লক্ষ ৫ হাজার মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করে। পুলিশ বলছে যে, রাজধানী প্যারিসে প্রচন্ড ঠান্ডা এবং বৃষ্টি উপেক্ষা করে ১৮ হাজার মানুষ ‘সত্য’, ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘ভ্যাকসিন পাস মানি না’ লেখা প্লাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করে। অনেকেই তাদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রেখেছিল ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁকে। এক সপ্তাহ আগেই ম্যাক্রঁ ‘লে প্যারিসিয়ান’ পত্রিকার সাথে সাক্ষাতে ভ্যাকসিন বিরোধীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত খারাপ শব্দ ব্যবহার করে হুমকি দেন যে, যারা ভ্যাকসিন নেবে না তিনি তাদের জীবন এতটাই দুর্বিসহ করে ফেলবেন যে, তারা বাধ্য হবে ভ্যাকসিন নিতে। আন্দোলনকারীরা ম্যাক্রঁর বিরুদ্ধেও একই ধরনের খারাপ শব্দ ব্যবহার করে প্রতিবাদ করে। একজন বিক্ষোভকারী ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, এটা ছিল ম্যাক্রঁর ‘শেষ চেষ্টা’। বিক্ষোভকারীরা বলছে যে, সরকার তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা ছাড়াও নাগরিকদের মাঝে পার্থক্য করছে।
এই বিক্ষোভ এমন সময়ে এলো, যখন এক সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো ফ্রান্সে ‘ওমিক্রন’ ভ্যারিয়্যান্টের কারণে একদিনে ৩ লাখের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। অথচ ইউরোপের দেশগুলির মাঝে ফ্রান্স সবচাইতে বেশি ভ্যাকসিন দেয়া দেশগুলির একটা। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ১২ বছরের বেশি বয়সের জনগণের ৯০ শতাংশকেই পুরোপুরি ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। আইসিইউগুলি ভর্তি হয়ে যাচ্ছে; হাসপাতালগুলি চাপের মাঝে রয়েছে। আর এর আগের দিন ৬ই জানুয়ারি ফ্রান্সের পার্লামেন্টে আইন পাস করে বলা হয় যে, জনগণকে রেস্টুরেন্টে খেতে, আন্তশহর বাসে চড়তে বা কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হলে পুরোপুরিভাবে ভ্যাকসিন নিতে হবে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ফরাসি সিনেটে বিরোধী দলের শক্তি বেশি থাকায় সেখানে বিল পাস হতে কিছু সময় লাগতে পারে। এই আইন ১৫ই জানুয়ারি থেকেই বাস্তবায়িত হবার কথা রয়েছে। প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে পুলিশ ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। ১০ জন পুলিশ অফিসারও কিছুটা আহত হয়। মঁপেলিয়ে শহরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে।
অস্ট্রিয়ার পুলিশ বলছে যে, রাজধানী ভিয়েনাতে ৪০ হাজার মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করে। সেখানে আগামী মাস থেকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জার্মানিতেও অনেকগুলি শহরে বিক্ষোভ চলে। এর মাঝে সবচাইতে বড় বিক্ষোভ হয় হামবুর্গ শহরে; যেখানে ১৩ হাজার মানুষ রাস্তায় ছিল। সেখানে প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘যথেষ্ট হয়েছে; আমাদের সন্তানদেরকে রেহাই দাও’। একজন বিক্ষোভকারী তার গায়ে ইহুদিদের ‘স্টার অব ডেভিড’ বহন করছিলেন; যেখানে লেখা ছিল ‘ভ্যাকসিন নেয়া হয়নি’। এর মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে ইহুদিদের গায়ে বাধ্যতামূলকভাবে ‘স্টার অব ডেভিড’ এঁকে রাখার নির্দেশনার সাথে তুলনা দেয়া হয়। জার্মানিতে ভ্যাকসিন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা চলছে। সেখানে এক মাস আগে থেকে ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদেরকে ভ্যাকসিন দেয়া শুরু হয়েছে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, ৯ই জানুয়ারি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ৫ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। পুলিশ ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করে। বিক্ষোভকারীদের প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘ভ্যাকসিন একনায়কতন্ত্র’। বেলজিয়ামে রেস্টুরেন্ট, বার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কোভিড পাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেখানে এক সপ্তাহে নতুন সংক্রমণ বেড়েছে ৯৬ শতাংশ। চেক রিপাবলিকে ৬০ বছরের উপরে জনগণ, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ভ্যাকসিন নিতে বাধ্য করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দেশটার নতুন কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতা নেবার আগে এই পরিকল্পনাগুলির বিরোধিতা করেছিল। এখন ক্ষমতায় গিয়ে নীতি পরিবর্তন করে তারা বিভিন্ন প্রফেশনালদের বাধ্যতামূলক ভ্যাকসিনের পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে চাইছে।
ইতালির তুরিন শহরেও শতশত মানুষ বিক্ষোভ করে। সেখানে ৫০ বছরের বেশি বয়সী সকল ব্যক্তির ভ্যাকসিন নেয়া বাধ্যমূলক করা হয়েছে। আর ১১ই জানুয়ারি থেকে ইতালিতে ভ্যাকসিন না নিলে কেউ রেস্টুরেন্টে ঢুকতে পারবে না, অথবা গণপরিবহণে চড়তে পারবে না। জার্মানির স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্ল লাউটারবাক ‘ডাই আম সনটাগ’ পত্রিকাকে বলেন যে, স্বল্প সংখ্যক মানুষ সকল বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে উপেক্ষা করে সেচ্ছায় মিথ্যা তথ্যের মাঝে ডুবে থাকতে চাইছে। তিনি বলেন যে, ভ্যাকসিন বিরোধীরা এবং করোনাভাইরাসকে ষড়যন্ত্র আখ্যা দেয়া মানুষেরা সকল মাপকাঠি এবং লক্ষ্য হারিয়ে ফেলেছে।
‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, জার্মানির মিনডেন শহরে আড়াই হাজার এবং ড্রেসডেন শহরে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে মানব বন্ধন করে। তাদের বক্তব্য ছিল, তারা ভ্যাকসিন বিরোধীদের আক্রমণের শিকার। এর মাঝে ৭ই জানুয়ারি অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর কার্ল নেহামার পুরোপুরি ভ্যাকসিন নেবার পর বুস্টার ডোজ নিয়েও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা নেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। অপরদিকে ফ্রান্সের বিক্ষোভগুলি এমন সময়ে এসেছে, যখন কিছুদিন পরেই সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ ভ্যাকসিন বিরোধীদের বিরুদ্ধে খারাপ শব্দ ব্যবহার করে বেশ বড় একটা ঝুঁকি নিয়েছেন।
ইউরোপের সরকারগুলি করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগের নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের দুই শতকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ভিত্তিক চিন্তাকে জ্বলাঞ্জলি দিচ্ছে। রাস্তায় বিক্ষোভকারীরা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে তুলে ধরতে চাইলেও সরকার তাদের সংখ্যাকে ছোট বলে এড়িয়ে যেতে চাইছে। ডোজের পর ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া সত্ত্বেও যখন ‘ওমিক্রণ’এর সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠতাই রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি; লিবারাল আদর্শ নয়। ফ্রান্স এবং চেক রিপাবলিকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বলে দিচ্ছে যে, রাজনীতিবিদেরা মূলতঃ জনগণের মতামতের ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী নন। তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে নেয়া সিদ্ধান্তগুলির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়ে দেয় যে, জনগণ পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে।
নতুন বছরের শুরুতেই পুরো ইউরোপ উত্তপ্ত হয়েছে ভ্যাকসিন বিরোধী আন্দোলনে। ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইতালি, বেলজিয়াম, চেক রিপাবলিকসহ ইউরোপের দেশগুলিতে করোনার ভ্যাকসিনের বিষয়ে সরকারি বাধ্যবাধতার বিরুদ্ধে চলছে এই বিক্ষোভ। বেশিরভাগ স্থানেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও কিছু শহরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। বিক্ষোভকারীরা ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাপারটাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, এর আগে গত ১৮ই ডিসেম্বর ফ্রান্সে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, এবারের বিক্ষোভ তার চাইতে চার গুণ বড় ছিল।
‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ৮ই জানুয়ারি ভ্যাকসিনের বাধ্যবাধকতার বিরোধিতা করে ফ্রান্সে ১ লক্ষ ৫ হাজার মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করে। পুলিশ বলছে যে, রাজধানী প্যারিসে প্রচন্ড ঠান্ডা এবং বৃষ্টি উপেক্ষা করে ১৮ হাজার মানুষ ‘সত্য’, ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘ভ্যাকসিন পাস মানি না’ লেখা প্লাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করে। অনেকেই তাদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রেখেছিল ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁকে। এক সপ্তাহ আগেই ম্যাক্রঁ ‘লে প্যারিসিয়ান’ পত্রিকার সাথে সাক্ষাতে ভ্যাকসিন বিরোধীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত খারাপ শব্দ ব্যবহার করে হুমকি দেন যে, যারা ভ্যাকসিন নেবে না তিনি তাদের জীবন এতটাই দুর্বিসহ করে ফেলবেন যে, তারা বাধ্য হবে ভ্যাকসিন নিতে। আন্দোলনকারীরা ম্যাক্রঁর বিরুদ্ধেও একই ধরনের খারাপ শব্দ ব্যবহার করে প্রতিবাদ করে। একজন বিক্ষোভকারী ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, এটা ছিল ম্যাক্রঁর ‘শেষ চেষ্টা’। বিক্ষোভকারীরা বলছে যে, সরকার তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা ছাড়াও নাগরিকদের মাঝে পার্থক্য করছে।
এই বিক্ষোভ এমন সময়ে এলো, যখন এক সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো ফ্রান্সে ‘ওমিক্রন’ ভ্যারিয়্যান্টের কারণে একদিনে ৩ লাখের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। অথচ ইউরোপের দেশগুলির মাঝে ফ্রান্স সবচাইতে বেশি ভ্যাকসিন দেয়া দেশগুলির একটা। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ১২ বছরের বেশি বয়সের জনগণের ৯০ শতাংশকেই পুরোপুরি ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। আইসিইউগুলি ভর্তি হয়ে যাচ্ছে; হাসপাতালগুলি চাপের মাঝে রয়েছে। আর এর আগের দিন ৬ই জানুয়ারি ফ্রান্সের পার্লামেন্টে আইন পাস করে বলা হয় যে, জনগণকে রেস্টুরেন্টে খেতে, আন্তশহর বাসে চড়তে বা কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হলে পুরোপুরিভাবে ভ্যাকসিন নিতে হবে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ফরাসি সিনেটে বিরোধী দলের শক্তি বেশি থাকায় সেখানে বিল পাস হতে কিছু সময় লাগতে পারে। এই আইন ১৫ই জানুয়ারি থেকেই বাস্তবায়িত হবার কথা রয়েছে। প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে পুলিশ ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। ১০ জন পুলিশ অফিসারও কিছুটা আহত হয়। মঁপেলিয়ে শহরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে।
অস্ট্রিয়ার পুলিশ বলছে যে, রাজধানী ভিয়েনাতে ৪০ হাজার মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করে। সেখানে আগামী মাস থেকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জার্মানিতেও অনেকগুলি শহরে বিক্ষোভ চলে। এর মাঝে সবচাইতে বড় বিক্ষোভ হয় হামবুর্গ শহরে; যেখানে ১৩ হাজার মানুষ রাস্তায় ছিল। সেখানে প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘যথেষ্ট হয়েছে; আমাদের সন্তানদেরকে রেহাই দাও’। একজন বিক্ষোভকারী তার গায়ে ইহুদিদের ‘স্টার অব ডেভিড’ বহন করছিলেন; যেখানে লেখা ছিল ‘ভ্যাকসিন নেয়া হয়নি’। এর মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে ইহুদিদের গায়ে বাধ্যতামূলকভাবে ‘স্টার অব ডেভিড’ এঁকে রাখার নির্দেশনার সাথে তুলনা দেয়া হয়। জার্মানিতে ভ্যাকসিন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা চলছে। সেখানে এক মাস আগে থেকে ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদেরকে ভ্যাকসিন দেয়া শুরু হয়েছে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, ৯ই জানুয়ারি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ৫ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। পুলিশ ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করে। বিক্ষোভকারীদের প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘ভ্যাকসিন একনায়কতন্ত্র’। বেলজিয়ামে রেস্টুরেন্ট, বার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কোভিড পাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেখানে এক সপ্তাহে নতুন সংক্রমণ বেড়েছে ৯৬ শতাংশ। চেক রিপাবলিকে ৬০ বছরের উপরে জনগণ, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ভ্যাকসিন নিতে বাধ্য করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দেশটার নতুন কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতা নেবার আগে এই পরিকল্পনাগুলির বিরোধিতা করেছিল। এখন ক্ষমতায় গিয়ে নীতি পরিবর্তন করে তারা বিভিন্ন প্রফেশনালদের বাধ্যতামূলক ভ্যাকসিনের পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে চাইছে।
ইতালির তুরিন শহরেও শতশত মানুষ বিক্ষোভ করে। সেখানে ৫০ বছরের বেশি বয়সী সকল ব্যক্তির ভ্যাকসিন নেয়া বাধ্যমূলক করা হয়েছে। আর ১১ই জানুয়ারি থেকে ইতালিতে ভ্যাকসিন না নিলে কেউ রেস্টুরেন্টে ঢুকতে পারবে না, অথবা গণপরিবহণে চড়তে পারবে না। জার্মানির স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্ল লাউটারবাক ‘ডাই আম সনটাগ’ পত্রিকাকে বলেন যে, স্বল্প সংখ্যক মানুষ সকল বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে উপেক্ষা করে সেচ্ছায় মিথ্যা তথ্যের মাঝে ডুবে থাকতে চাইছে। তিনি বলেন যে, ভ্যাকসিন বিরোধীরা এবং করোনাভাইরাসকে ষড়যন্ত্র আখ্যা দেয়া মানুষেরা সকল মাপকাঠি এবং লক্ষ্য হারিয়ে ফেলেছে।
‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, জার্মানির মিনডেন শহরে আড়াই হাজার এবং ড্রেসডেন শহরে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে মানব বন্ধন করে। তাদের বক্তব্য ছিল, তারা ভ্যাকসিন বিরোধীদের আক্রমণের শিকার। এর মাঝে ৭ই জানুয়ারি অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর কার্ল নেহামার পুরোপুরি ভ্যাকসিন নেবার পর বুস্টার ডোজ নিয়েও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা নেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। অপরদিকে ফ্রান্সের বিক্ষোভগুলি এমন সময়ে এসেছে, যখন কিছুদিন পরেই সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ ভ্যাকসিন বিরোধীদের বিরুদ্ধে খারাপ শব্দ ব্যবহার করে বেশ বড় একটা ঝুঁকি নিয়েছেন।
ইউরোপের সরকারগুলি করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগের নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের দুই শতকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ভিত্তিক চিন্তাকে জ্বলাঞ্জলি দিচ্ছে। রাস্তায় বিক্ষোভকারীরা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে তুলে ধরতে চাইলেও সরকার তাদের সংখ্যাকে ছোট বলে এড়িয়ে যেতে চাইছে। ডোজের পর ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া সত্ত্বেও যখন ‘ওমিক্রণ’এর সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠতাই রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি; লিবারাল আদর্শ নয়। ফ্রান্স এবং চেক রিপাবলিকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বলে দিচ্ছে যে, রাজনীতিবিদেরা মূলতঃ জনগণের মতামতের ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী নন। তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে নেয়া সিদ্ধান্তগুলির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়ে দেয় যে, জনগণ পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে।
Labels:
Anti-Vaccination Protests,
coronavirus,
COVID-19,
Democracy,
Europe,
France,
Germany,
Ideological Crisis,
Liberalism
Monday, 10 January 2022
ফ্রান্স কেন ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করছে?
১০ই জানুয়ারি ২০২২
গত ৫ই জানুয়ারি ফ্রান্স একটা মহড়ার অংশ হিসেবে বিমান বাহিনীর দু’টা অত্যাধুনিক ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানকে তার দক্ষিণ ভারত মহাসাগরীয় উপনিবেশ লা রিউনিয়ন দ্বীপে পাঠিয়েছে। ফরাসি সূত্রের বরাত দিয়ে ‘ডাচ এভিয়েশন সোসাইটি’র ম্যাগাজিন ‘স্ক্র্যাম্বল’ এক প্রতিবেদনে বলছে যে, ‘অপারেশন ম্যারাথন’এর মাধ্যমে ‘রাফাল’ বিমানগুলির সাথে ছিল আকাশ থেকে আকাশে জ্বালানি দেবার সক্ষমতার একটা ‘এয়ারবাস এ৩৩০ এমআরটিটি’ ট্যাংকার বিমান। বিমানগুলি ফ্রান্স থেকে শুরু করে কোথাও না থেমে একবারে ৮ হাজার ৮’শ কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিয়ে লা রিউনিয়ন দ্বীপে নামে। আকাশপথে ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানগুলি দু’টা ট্যাংকার বিমান থেকে আকাশেই ৬ থেকে ৭ বার জ্বালানি নিয়েছে। ‘মিশন শিকরা’র অধিনে এই অপারেশন ৩রা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে; যার অধীনে পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে অন্ততঃ ৫টা ভিন্ন অপারেশন পরিচালিত হবে। এছাড়াও বিমানগুলি পরবর্তীতে পূর্ব আফ্রিকার জিবুতিতে ‘খামসিন’ নামের এক মহড়ায় অংশ নেবে; মিশরেও তারা যাত্রাবিরতি করবে। ফরাসি বিমান বাহিনী প্রধান জেনারেল লাভিয়েনে বলছেন যে, ফ্রান্স ২০২৩ সালে আরেকটা বড় মিশনের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে; যার উদ্দেশ্য হবে ৪৮ ঘন্টার মাঝে ২০টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান এবং তার সাথে কিছু ট্যাংকার বিমানকে ইন্দোপ্যাসিফিকে মোতায়েন করা। ‘অপারেশন ম্যারাথন’ সেই মিশনেরই একটা প্রস্তুতি। ফরাসি এভিয়েশন ম্যাগাজিন ‘০৬৩০ ডেল্টা’ বলছে যে, এই অপারেশন পরিচালিত হচ্ছে ফ্রান্সের ‘স্ট্র্যাটেজিক এয়ার ফোর্সেস’এর অধীনে; যার মূল উদ্দেশ্য হলো ফরাসি পারমাণবিক সক্ষমতাকে জিইয়ে রাখা। একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই ফ্রান্স তার মূল ভূখন্ড থেকে এতদূরে এরকম মিশন পরিচালনা করছে।
বিশাল দূরত্বে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার ফরাসি মিশন এটাই প্রথম নয়। ‘স্ক্র্যাম্বল’ বলছে যে, ২০২১এর জুন মাসে ফরাসিরা ‘অপারেশন হেইফারা ওয়াকেয়া’র অধীনে ৩টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানকে ফ্রান্স থেকে ১৭ হাজার কিঃমিঃ দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে ফরাসি উপনিবেশ ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়াতে উড়িয়ে নিয়ে যায়। সাথে ছিল ৩টা ট্যাংকার বিমান এবং একটা পরিবহণ বিমান। পথিমধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নামে একবার। মিশনের মাধ্যমে তারা ৪৮ ঘন্টার মাঝে পলিনেশিয়ায় বোমাবর্ষণ করার সক্ষমতার কথা জানান দেয়। এর আগে ২০২০এর অগাস্টে ফরাসিরা গ্রিসে ২টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছিল। ‘বিবিসি’ বলছে যে, এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তেল গ্যাস আহরণকে কেন্দ্র করে গ্রিসের সাথে তুরস্কের উত্তেজনার মাঝে গ্রিসকে আস্বস্ত করা।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার ক্যারিবিয় উপকূলে ফরাসি উপনিবেশ ফ্রেঞ্চ গায়ানাতে ফ্রান্স যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। সর্বশেষ সেটা ছিল ২০২১এর নভেম্বরে। এভিয়েশন ম্যাগাজিন ‘এরোটাইম হাব’ বলছে যে, ফরাসি উপনিবেশ থেকে মহাকাশে ইউরোপিয়ান রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। যখন সেখান থেকে ফরাসি সামরিক স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হয়, তখন এর জন্যে আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। গত নভেম্বরে ‘ভেগা’ স্পেসক্রাফটের মাধ্যমে ৩টা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণ করার সময় ৩টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান, একটা ‘সি ১৩৫’ রিফুয়েলিং বিমান এবং একটা ‘বোইং ই৩এফ’ এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং এন্ড কন্ট্রোল বিমান সেখানে প্রেরণ করা হয়েছিল। এছাড়াও ২০১৮ সালে একটা মহড়ার অংশ হিসেবে তিনটা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানকে অস্ট্রেলিয়াতেও পাঠানো হয়; সাথে ছিল একটা ট্যাংকার এবং একটা পরিবহণ বিমান।
ফ্রান্স তার নৌবাহিনীর ইউনিটগুলিকেও বিশ্বব্যাপী মোতায়েন রাখছে। ২০২১ সালের প্রথমভাগে ৪ মাসের জন্যে ফরাসি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘শার্ল দ্য গল’কে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়। ‘ক্লিমেনসিউ ২১’ নামের সেই মিশনের প্রধান রিয়ার এডমিরাল অসেডাট বলেন যে, ২০১৫ সালের পর থেকে প্রথমবারের মতো ফরাসি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়। এছাড়াও একইবছর ফরাসি হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘টোনেরে’র নেতৃত্বে ফরাসি যুদ্ধজাহাজের গ্রুপ ইন্দোপ্যাসিফিক ঘুরে আসে। ‘মিশন জঁ ডে আর্ক’ নামের ৫ মাসের সেই মিশনে ‘টোনেরে’ জাহাজের সাথে ছিল ফ্রিগেট ‘সুরকুফ’। তবে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে যেখানে বেশ কিছু দিন বা সপ্তাহ বা মাস সময় লাগে, বিমান বাহিনীর বিমানগুলি কয়েক ঘন্টার মাঝেই মোতায়েন করা যায়। কোন দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিমান শক্তি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্স তার বৈশ্বিক অবস্থানকে নিরাপত্তা দিতেই বিমান শক্তিকে বিশ্বব্যাপী মোতায়েন করার সক্ষমতার উপর জোর দিচ্ছে; এবং একইসাথে বাকি বিশ্বকে তা জানান দিচ্ছে।
ফ্রান্সের এই বিমান মোতায়েনের দূরপাল্লার মিশনগুলি এমন সময়ে আসছে, যখন আফ্রিকায় ফ্রান্সের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি প্রায় ৯ বছর পর ফরাসি সেনারা পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির উত্তরের তিমবুকতু শহর ছেড়ে যায়। ফ্রান্সের ‘অপারেশন বারখেইন’এর কমান্ডার জেনারেল এতিয়েন দু পেইরু বলেন যে, ফ্রান্স ‘অন্যভাবে’ মালিতে তার অবস্থান ধরে রাখবে। মালির অভ্যুত্থানকারী সামরিক অফিসার আসিমি গোইতার নেতৃত্বে থাকা মালি রাশিয়ার ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর ভাড়াটে সেনাদেরকে মালির সৈন্যদের ট্রেনিং দেয়ার জন্যে মোতায়েন করছে; যা কিনা ফ্রান্সের সাথে তার প্রাক্তন উপনিবেশ মালির দূরত্ব বাড়িয়েছে। এছাড়াও মালিতে ফ্রান্স বিরোধী চিন্তা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণ অনেকেই মনে করছে যে, ফরাসিরা মালির সহিংসতাকে কমাতে পারেনি; বরং তারা নিজেদের গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। মালির সহিংসতা সাম্প্রতিক সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশ বুরকিনা ফাসো এবং নিজেরএও ছড়িয়ে পড়েছে।
শুধু পশ্চিম আফ্রিকার মালিতেই নয়, পুরো আফ্রিকা জুড়েই ফ্রান্সের প্রভাব হুমকির মাঝে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্য আফ্রিকার দেশ শাদ এবং পশ্চিম আফ্রিকার গিনিতে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। মাদাগাস্কারেও সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চলেছে। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে গৃহযুদ্ধের মাঝে রুশ ভাড়াটে সেনারা সরকারের নিরাপত্তা দিচ্ছে। মোজাম্বিকেও ফরাসি বিনিয়োগ গৃহযুদ্ধের হুমকির মাঝে রয়েছে। মোটকথা ফ্রান্সের বিশ্বব্যাপী সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টাগুলি ফ্রান্সের শক্তি নয়, বরং দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। ফ্রান্স বিশ্বব্যাপী তার উপনিবেশগুলি এবং তার প্রভাবে থাকা দেশগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যাপারে আগের মতো নিশ্চিত নয়; বিশেষ করে দূরবর্তী ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলির নিরাপত্তা ফ্রান্সের কাছে পুরোপুরি নিশ্চিত নয় বলেই সেখানে হাজার হাজার কিঃমিঃ পাড়ি দিয়ে ৪৮ ঘন্টার মাঝেই ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার মিশন পরিচালনা করা হচ্ছে। ফ্রান্সের প্রভাবের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্যান্য শক্তির মাঝে চলছে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
গত ৫ই জানুয়ারি ফ্রান্স একটা মহড়ার অংশ হিসেবে বিমান বাহিনীর দু’টা অত্যাধুনিক ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানকে তার দক্ষিণ ভারত মহাসাগরীয় উপনিবেশ লা রিউনিয়ন দ্বীপে পাঠিয়েছে। ফরাসি সূত্রের বরাত দিয়ে ‘ডাচ এভিয়েশন সোসাইটি’র ম্যাগাজিন ‘স্ক্র্যাম্বল’ এক প্রতিবেদনে বলছে যে, ‘অপারেশন ম্যারাথন’এর মাধ্যমে ‘রাফাল’ বিমানগুলির সাথে ছিল আকাশ থেকে আকাশে জ্বালানি দেবার সক্ষমতার একটা ‘এয়ারবাস এ৩৩০ এমআরটিটি’ ট্যাংকার বিমান। বিমানগুলি ফ্রান্স থেকে শুরু করে কোথাও না থেমে একবারে ৮ হাজার ৮’শ কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিয়ে লা রিউনিয়ন দ্বীপে নামে। আকাশপথে ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানগুলি দু’টা ট্যাংকার বিমান থেকে আকাশেই ৬ থেকে ৭ বার জ্বালানি নিয়েছে। ‘মিশন শিকরা’র অধিনে এই অপারেশন ৩রা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে; যার অধীনে পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে অন্ততঃ ৫টা ভিন্ন অপারেশন পরিচালিত হবে। এছাড়াও বিমানগুলি পরবর্তীতে পূর্ব আফ্রিকার জিবুতিতে ‘খামসিন’ নামের এক মহড়ায় অংশ নেবে; মিশরেও তারা যাত্রাবিরতি করবে। ফরাসি বিমান বাহিনী প্রধান জেনারেল লাভিয়েনে বলছেন যে, ফ্রান্স ২০২৩ সালে আরেকটা বড় মিশনের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে; যার উদ্দেশ্য হবে ৪৮ ঘন্টার মাঝে ২০টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান এবং তার সাথে কিছু ট্যাংকার বিমানকে ইন্দোপ্যাসিফিকে মোতায়েন করা। ‘অপারেশন ম্যারাথন’ সেই মিশনেরই একটা প্রস্তুতি। ফরাসি এভিয়েশন ম্যাগাজিন ‘০৬৩০ ডেল্টা’ বলছে যে, এই অপারেশন পরিচালিত হচ্ছে ফ্রান্সের ‘স্ট্র্যাটেজিক এয়ার ফোর্সেস’এর অধীনে; যার মূল উদ্দেশ্য হলো ফরাসি পারমাণবিক সক্ষমতাকে জিইয়ে রাখা। একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই ফ্রান্স তার মূল ভূখন্ড থেকে এতদূরে এরকম মিশন পরিচালনা করছে।
বিশাল দূরত্বে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার ফরাসি মিশন এটাই প্রথম নয়। ‘স্ক্র্যাম্বল’ বলছে যে, ২০২১এর জুন মাসে ফরাসিরা ‘অপারেশন হেইফারা ওয়াকেয়া’র অধীনে ৩টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানকে ফ্রান্স থেকে ১৭ হাজার কিঃমিঃ দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে ফরাসি উপনিবেশ ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়াতে উড়িয়ে নিয়ে যায়। সাথে ছিল ৩টা ট্যাংকার বিমান এবং একটা পরিবহণ বিমান। পথিমধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নামে একবার। মিশনের মাধ্যমে তারা ৪৮ ঘন্টার মাঝে পলিনেশিয়ায় বোমাবর্ষণ করার সক্ষমতার কথা জানান দেয়। এর আগে ২০২০এর অগাস্টে ফরাসিরা গ্রিসে ২টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছিল। ‘বিবিসি’ বলছে যে, এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তেল গ্যাস আহরণকে কেন্দ্র করে গ্রিসের সাথে তুরস্কের উত্তেজনার মাঝে গ্রিসকে আস্বস্ত করা।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার ক্যারিবিয় উপকূলে ফরাসি উপনিবেশ ফ্রেঞ্চ গায়ানাতে ফ্রান্স যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। সর্বশেষ সেটা ছিল ২০২১এর নভেম্বরে। এভিয়েশন ম্যাগাজিন ‘এরোটাইম হাব’ বলছে যে, ফরাসি উপনিবেশ থেকে মহাকাশে ইউরোপিয়ান রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। যখন সেখান থেকে ফরাসি সামরিক স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হয়, তখন এর জন্যে আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। গত নভেম্বরে ‘ভেগা’ স্পেসক্রাফটের মাধ্যমে ৩টা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণ করার সময় ৩টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান, একটা ‘সি ১৩৫’ রিফুয়েলিং বিমান এবং একটা ‘বোইং ই৩এফ’ এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং এন্ড কন্ট্রোল বিমান সেখানে প্রেরণ করা হয়েছিল। এছাড়াও ২০১৮ সালে একটা মহড়ার অংশ হিসেবে তিনটা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানকে অস্ট্রেলিয়াতেও পাঠানো হয়; সাথে ছিল একটা ট্যাংকার এবং একটা পরিবহণ বিমান।
ফ্রান্স তার নৌবাহিনীর ইউনিটগুলিকেও বিশ্বব্যাপী মোতায়েন রাখছে। ২০২১ সালের প্রথমভাগে ৪ মাসের জন্যে ফরাসি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘শার্ল দ্য গল’কে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়। ‘ক্লিমেনসিউ ২১’ নামের সেই মিশনের প্রধান রিয়ার এডমিরাল অসেডাট বলেন যে, ২০১৫ সালের পর থেকে প্রথমবারের মতো ফরাসি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়। এছাড়াও একইবছর ফরাসি হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘টোনেরে’র নেতৃত্বে ফরাসি যুদ্ধজাহাজের গ্রুপ ইন্দোপ্যাসিফিক ঘুরে আসে। ‘মিশন জঁ ডে আর্ক’ নামের ৫ মাসের সেই মিশনে ‘টোনেরে’ জাহাজের সাথে ছিল ফ্রিগেট ‘সুরকুফ’। তবে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে যেখানে বেশ কিছু দিন বা সপ্তাহ বা মাস সময় লাগে, বিমান বাহিনীর বিমানগুলি কয়েক ঘন্টার মাঝেই মোতায়েন করা যায়। কোন দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিমান শক্তি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্স তার বৈশ্বিক অবস্থানকে নিরাপত্তা দিতেই বিমান শক্তিকে বিশ্বব্যাপী মোতায়েন করার সক্ষমতার উপর জোর দিচ্ছে; এবং একইসাথে বাকি বিশ্বকে তা জানান দিচ্ছে।
ফ্রান্সের এই বিমান মোতায়েনের দূরপাল্লার মিশনগুলি এমন সময়ে আসছে, যখন আফ্রিকায় ফ্রান্সের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি প্রায় ৯ বছর পর ফরাসি সেনারা পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির উত্তরের তিমবুকতু শহর ছেড়ে যায়। ফ্রান্সের ‘অপারেশন বারখেইন’এর কমান্ডার জেনারেল এতিয়েন দু পেইরু বলেন যে, ফ্রান্স ‘অন্যভাবে’ মালিতে তার অবস্থান ধরে রাখবে। মালির অভ্যুত্থানকারী সামরিক অফিসার আসিমি গোইতার নেতৃত্বে থাকা মালি রাশিয়ার ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর ভাড়াটে সেনাদেরকে মালির সৈন্যদের ট্রেনিং দেয়ার জন্যে মোতায়েন করছে; যা কিনা ফ্রান্সের সাথে তার প্রাক্তন উপনিবেশ মালির দূরত্ব বাড়িয়েছে। এছাড়াও মালিতে ফ্রান্স বিরোধী চিন্তা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণ অনেকেই মনে করছে যে, ফরাসিরা মালির সহিংসতাকে কমাতে পারেনি; বরং তারা নিজেদের গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। মালির সহিংসতা সাম্প্রতিক সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশ বুরকিনা ফাসো এবং নিজেরএও ছড়িয়ে পড়েছে।
শুধু পশ্চিম আফ্রিকার মালিতেই নয়, পুরো আফ্রিকা জুড়েই ফ্রান্সের প্রভাব হুমকির মাঝে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্য আফ্রিকার দেশ শাদ এবং পশ্চিম আফ্রিকার গিনিতে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। মাদাগাস্কারেও সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চলেছে। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে গৃহযুদ্ধের মাঝে রুশ ভাড়াটে সেনারা সরকারের নিরাপত্তা দিচ্ছে। মোজাম্বিকেও ফরাসি বিনিয়োগ গৃহযুদ্ধের হুমকির মাঝে রয়েছে। মোটকথা ফ্রান্সের বিশ্বব্যাপী সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টাগুলি ফ্রান্সের শক্তি নয়, বরং দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। ফ্রান্স বিশ্বব্যাপী তার উপনিবেশগুলি এবং তার প্রভাবে থাকা দেশগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যাপারে আগের মতো নিশ্চিত নয়; বিশেষ করে দূরবর্তী ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলির নিরাপত্তা ফ্রান্সের কাছে পুরোপুরি নিশ্চিত নয় বলেই সেখানে হাজার হাজার কিঃমিঃ পাড়ি দিয়ে ৪৮ ঘন্টার মাঝেই ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার মিশন পরিচালনা করা হচ্ছে। ফ্রান্সের প্রভাবের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্যান্য শক্তির মাঝে চলছে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
Labels:
France,
French Guiana,
Geopolitics,
Indian Ocean,
Mali,
New World Order,
Pacific Ocean,
Rafale,
Reunion
Saturday, 8 January 2022
কাজাখস্তানের রাস্তায় সহিংসতার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
০৮ই জানুয়ারি ২০২২
গত ৬ই জানুয়ারি থেকে মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখস্তানে সহিংসতায় পুলিশ এবং সাধারণ জনগণ সহ কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, তিন দশক আগে দেশটার জন্মের পর থেকে এখন পর্যন্ত এটা সবচাইতে মারাত্মক সহিংসতা। ১ কোটি ৯০ লক্ষ জনসংখ্যার দেশটায় এলপিজির মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। আলমাতির সরকারি অফিসগুলিতে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভকারীদের মতে, হাইড্রোকার্বন রপ্তানিকারী দেশ কাজাখস্তানের জন্যে এই মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক। কাজাখস্তানে পেট্রোলের চাইতে কমদামি এলপিজি গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাজাখস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয় যে, প্রধান শহর আলমাতি এবং পশ্চিমের মানগিসতাউ প্রদেশে দুই হাজার দুই শ’র অধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কমপক্ষে ১৮ জন সদস্য নিহত হওয়া ছাড়াও ৭’শ ৪৮ জন আহত হয়েছে বলে বলছে রুশ বার্তা সংস্থা ‘ইন্টারফ্যাক্স’। পুলিশের গুলিতে ২৬ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও শতশত সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে; কমপক্ষে ৬০ জন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট কাসিম জোমার্ত তোকাইয়েভ বিক্ষোভ ঠেকাতে সরকার ভেঙ্গে দিয়েছেন। তিনি বিক্ষোভকারীদেরকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে তাদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশও দিয়েছেন। একইসাথে তিনি দুই সপ্তাহের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা ছাড়াও রাশিয়াকে সেদেশে সেনা মোতায়েন করতে অনুরোধ করেন। তোকাইয়েভ বলেন যে, ২০ হাজার বিক্ষোভকারী পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক আলমাতির উপর হামলা করেছে। তাদের মাঝে যথেষ্ট সমন্বয় এবং সামরিক প্রস্তুতি রয়েছে।
রুশ বার্তা সংস্থা ‘আরআইএ’ বলছে যে, রুশ নেতৃত্বে ‘কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অরগানাইজেশন’ বা ‘সিএসটিও’ প্রায় আড়াই হাজারের মতো সেনা মোতায়েন করবে। তারা হয়তো সেখানে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের জন্যে মোতায়েন থাকবে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইগর কনাশেনকভ বলেন যে, রুশ প্যারাট্রুপাররা বিক্ষোভকারীদের হাত থেকে আলমাতির বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সেনাদের উপর সশস্ত্র হামলা হলে তারা গুলি চালাতে পারবে বলেও বলা হয়। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, দেশটার প্রথম প্রেসিডেন্ট নূরসুলতান নাজারবায়েভ প্রায় ২৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৯ সালে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। তবে অনেকের ধারণা তিনি এখনও তার নিজের নির্বাচিত বর্তমান প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে দেশ চালাচ্ছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কাজাখস্তানে কোন মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে কিনা, অথবা রুশ সেনারা সেখানে কোন ধরনের রাষ্ট্রীয় সংস্থার দখল নেয় কিনা, সেব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র খেয়াল রাখবে। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন সাংবাদিকদের বলেন যে, ইতিহাস বলে দেয় যে, রুশরা একবার কোন দেশে ঢুকলে তাদেরকে সেখান থেকে বের করা কঠিন হয়ে যায়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বলা হয় যে, ব্রিটেন কোন সহিংসতা এবং জনগণের সম্পদের ধ্বংসের বিরোধী। ব্রিটেন চায় কাজাখ সরকার ইন্টারনেট সার্ভিস খুলে দিক এবং জনগণের বাকস্বাধীনতার অধিকারকে মান্য করুক। অপরদিকে তুরস্কের কমিউনিকেন্স ডিরেকটিভ থেকে বলা হয় যে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান কাজাখ প্রেসিডেন্টকে ফোন করে তুরস্কের পুরোপুরি সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
রাশিয়ার দক্ষিণ সীমানায় কাজাখস্তানের এই সমস্যা এমন সময়ে এলো, যখন রাশিয়ার পূর্বদিকে ইউক্রেনের সীমানায় রুশ সেনা মোতায়েন নিয়ে ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার উত্তেজনা চলছে। হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব জেন পিসাকি সাংবাদিকদের বলেন যে, কাজাখস্তানের পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, পরবর্তী সপ্তাহে জেনেভায় ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার সাথে ন্যাটোর আলোচনা যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে।
কাজাখস্তান বিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উৎপাদনকারী দেশগুলির একটি। পৃথিবীর সবচাইতে বেশি ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী কোম্পানি ‘কাজাটমপ্রম’ বলছে যে, বিক্ষোভে তাদের উৎপাদন ব্যাহত হয়নি। তবে ‘প্ল্যাটস’এর হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরেনিয়ামের মূল্য কিছুটা বেড়েছে। অপরদিকে দৈনিক ১৬ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদনকারি কাজাখস্তানের সবচাইতে বড় বিদেশী তেল কোম্পানি ‘শেভরন’ বলছে যে, কিছু কনট্রাকটর বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে রেললাইন উপড়ে ফেলায় ‘তেনগিজ’ তেলখনিতে উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।
‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কাজাখস্তানের সহিংসতার কারণে দেশটায় চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ হুমকির মাঝে পড়েছে। চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’ চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ হাব হলো চীন এবং ইউরোপের মাঝে অবস্থিত কাজাখস্তান। সেখানে চীনারা ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। চীনা রাষ্ট্রীয় মিডিয়া বলছে যে, চীনা ব্যবসাগুলি এখনও কোন সমস্যায় পড়েনি; আর কাজাখস্তান থেকে চীন পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইনগুলি বিক্ষোভের শহরগুলি থেকে দূরে থাকায় খুব সম্ভবতঃ নিরাপদেই থাকবে। ২০১৯ সালের ১১ মাসে দুই দেশের মাঝে বাণিজ্য ছিল প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। একই বছরে চীনারা কাজাখস্তান হয়ে সাড়ে ১৪ লক্ষ টিইউএস কনটেইনার রেলপথে ইউরোপে পাঠিয়েছে।
মার্কিন ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক পিটার জেইহান কাজাখস্তানের সমস্যার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলছেন যে, আলমাতি শহরটা কাজাখস্তানের একেবারে পূর্বে; যেখানে দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষ থাকে। শহরটা কিরগিজস্তান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফারগানা ভ্যালির দেশ উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং চীনের উইঘুরের খুব কাছে। মুসলিম অধ্যুষিত এই অঞ্চল আফগানিস্তানের সীমানায়। রাশিয়া একারণেই তার দক্ষিণ সীমানায়, বিশেষ করে আলমাতি বা মধ্য এশিয়ায় কোন অস্থিরতা চায় না। ওয়াশিংটনে রুশ রাষ্ট্রদূত আনাতোলি আন্তোনভ ‘নিউজউইক’কে বলেন যে, কাজাখস্তানের সমস্যা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ফলাফল। দুই দশক ধরে পশ্চিম এবং মধ্য এশিয়ায় গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের নামে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ অস্থিরতাকে উস্কে দিয়েছে। তাঁর ধারণা, মধ্য এশিয়াতে উগ্রবাদী ধর্মীয় আদর্শ ছড়িয়ে পড়ার হুমকি রয়েছে।
কাজাখস্তানের সহিংসতা এমন সময়ে এলো, যখন ইউক্রেনের সীমানায় সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে রুশ সরকার ন্যাটোকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে। ইউক্রেন এবং মধ্য এশিয়ার দুই সীমানাকে একত্রে নিয়ন্ত্রণে আনা রাশিয়ার জন্যে একটা চ্যালেঞ্জ। আলমাতির বিক্ষোভ হয়তো রাশিয়াকে ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঝামেলা চুকিয়ে ফেলতে প্রভাবিত করতে পারে। আফগানিস্তান থেকে পলায়নের পরেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি মধ্য এশিয়ায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেই রয়ে গেছে। তবে আলমাতির সহিংসতার ব্যাপারে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানে মধ্য এশিয়ায় সৃষ্ট শূণ্যস্থান পূরণের প্রতিযোগিতার একটা লক্ষণও বটে, যা আঞ্চলিক অস্থিরতাকে বৃদ্ধি করবে।
গত ৬ই জানুয়ারি থেকে মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখস্তানে সহিংসতায় পুলিশ এবং সাধারণ জনগণ সহ কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, তিন দশক আগে দেশটার জন্মের পর থেকে এখন পর্যন্ত এটা সবচাইতে মারাত্মক সহিংসতা। ১ কোটি ৯০ লক্ষ জনসংখ্যার দেশটায় এলপিজির মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। আলমাতির সরকারি অফিসগুলিতে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভকারীদের মতে, হাইড্রোকার্বন রপ্তানিকারী দেশ কাজাখস্তানের জন্যে এই মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক। কাজাখস্তানে পেট্রোলের চাইতে কমদামি এলপিজি গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাজাখস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয় যে, প্রধান শহর আলমাতি এবং পশ্চিমের মানগিসতাউ প্রদেশে দুই হাজার দুই শ’র অধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কমপক্ষে ১৮ জন সদস্য নিহত হওয়া ছাড়াও ৭’শ ৪৮ জন আহত হয়েছে বলে বলছে রুশ বার্তা সংস্থা ‘ইন্টারফ্যাক্স’। পুলিশের গুলিতে ২৬ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও শতশত সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে; কমপক্ষে ৬০ জন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট কাসিম জোমার্ত তোকাইয়েভ বিক্ষোভ ঠেকাতে সরকার ভেঙ্গে দিয়েছেন। তিনি বিক্ষোভকারীদেরকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে তাদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশও দিয়েছেন। একইসাথে তিনি দুই সপ্তাহের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা ছাড়াও রাশিয়াকে সেদেশে সেনা মোতায়েন করতে অনুরোধ করেন। তোকাইয়েভ বলেন যে, ২০ হাজার বিক্ষোভকারী পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক আলমাতির উপর হামলা করেছে। তাদের মাঝে যথেষ্ট সমন্বয় এবং সামরিক প্রস্তুতি রয়েছে।
রুশ বার্তা সংস্থা ‘আরআইএ’ বলছে যে, রুশ নেতৃত্বে ‘কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অরগানাইজেশন’ বা ‘সিএসটিও’ প্রায় আড়াই হাজারের মতো সেনা মোতায়েন করবে। তারা হয়তো সেখানে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের জন্যে মোতায়েন থাকবে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইগর কনাশেনকভ বলেন যে, রুশ প্যারাট্রুপাররা বিক্ষোভকারীদের হাত থেকে আলমাতির বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সেনাদের উপর সশস্ত্র হামলা হলে তারা গুলি চালাতে পারবে বলেও বলা হয়। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, দেশটার প্রথম প্রেসিডেন্ট নূরসুলতান নাজারবায়েভ প্রায় ২৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৯ সালে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। তবে অনেকের ধারণা তিনি এখনও তার নিজের নির্বাচিত বর্তমান প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে দেশ চালাচ্ছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কাজাখস্তানে কোন মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে কিনা, অথবা রুশ সেনারা সেখানে কোন ধরনের রাষ্ট্রীয় সংস্থার দখল নেয় কিনা, সেব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র খেয়াল রাখবে। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন সাংবাদিকদের বলেন যে, ইতিহাস বলে দেয় যে, রুশরা একবার কোন দেশে ঢুকলে তাদেরকে সেখান থেকে বের করা কঠিন হয়ে যায়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বলা হয় যে, ব্রিটেন কোন সহিংসতা এবং জনগণের সম্পদের ধ্বংসের বিরোধী। ব্রিটেন চায় কাজাখ সরকার ইন্টারনেট সার্ভিস খুলে দিক এবং জনগণের বাকস্বাধীনতার অধিকারকে মান্য করুক। অপরদিকে তুরস্কের কমিউনিকেন্স ডিরেকটিভ থেকে বলা হয় যে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান কাজাখ প্রেসিডেন্টকে ফোন করে তুরস্কের পুরোপুরি সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
রাশিয়ার দক্ষিণ সীমানায় কাজাখস্তানের এই সমস্যা এমন সময়ে এলো, যখন রাশিয়ার পূর্বদিকে ইউক্রেনের সীমানায় রুশ সেনা মোতায়েন নিয়ে ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার উত্তেজনা চলছে। হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব জেন পিসাকি সাংবাদিকদের বলেন যে, কাজাখস্তানের পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, পরবর্তী সপ্তাহে জেনেভায় ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার সাথে ন্যাটোর আলোচনা যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে।
কাজাখস্তান বিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উৎপাদনকারী দেশগুলির একটি। পৃথিবীর সবচাইতে বেশি ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী কোম্পানি ‘কাজাটমপ্রম’ বলছে যে, বিক্ষোভে তাদের উৎপাদন ব্যাহত হয়নি। তবে ‘প্ল্যাটস’এর হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরেনিয়ামের মূল্য কিছুটা বেড়েছে। অপরদিকে দৈনিক ১৬ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদনকারি কাজাখস্তানের সবচাইতে বড় বিদেশী তেল কোম্পানি ‘শেভরন’ বলছে যে, কিছু কনট্রাকটর বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে রেললাইন উপড়ে ফেলায় ‘তেনগিজ’ তেলখনিতে উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।
‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কাজাখস্তানের সহিংসতার কারণে দেশটায় চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ হুমকির মাঝে পড়েছে। চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’ চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ হাব হলো চীন এবং ইউরোপের মাঝে অবস্থিত কাজাখস্তান। সেখানে চীনারা ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। চীনা রাষ্ট্রীয় মিডিয়া বলছে যে, চীনা ব্যবসাগুলি এখনও কোন সমস্যায় পড়েনি; আর কাজাখস্তান থেকে চীন পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইনগুলি বিক্ষোভের শহরগুলি থেকে দূরে থাকায় খুব সম্ভবতঃ নিরাপদেই থাকবে। ২০১৯ সালের ১১ মাসে দুই দেশের মাঝে বাণিজ্য ছিল প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। একই বছরে চীনারা কাজাখস্তান হয়ে সাড়ে ১৪ লক্ষ টিইউএস কনটেইনার রেলপথে ইউরোপে পাঠিয়েছে।
মার্কিন ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক পিটার জেইহান কাজাখস্তানের সমস্যার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলছেন যে, আলমাতি শহরটা কাজাখস্তানের একেবারে পূর্বে; যেখানে দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষ থাকে। শহরটা কিরগিজস্তান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফারগানা ভ্যালির দেশ উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং চীনের উইঘুরের খুব কাছে। মুসলিম অধ্যুষিত এই অঞ্চল আফগানিস্তানের সীমানায়। রাশিয়া একারণেই তার দক্ষিণ সীমানায়, বিশেষ করে আলমাতি বা মধ্য এশিয়ায় কোন অস্থিরতা চায় না। ওয়াশিংটনে রুশ রাষ্ট্রদূত আনাতোলি আন্তোনভ ‘নিউজউইক’কে বলেন যে, কাজাখস্তানের সমস্যা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ফলাফল। দুই দশক ধরে পশ্চিম এবং মধ্য এশিয়ায় গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের নামে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ অস্থিরতাকে উস্কে দিয়েছে। তাঁর ধারণা, মধ্য এশিয়াতে উগ্রবাদী ধর্মীয় আদর্শ ছড়িয়ে পড়ার হুমকি রয়েছে।
কাজাখস্তানের সহিংসতা এমন সময়ে এলো, যখন ইউক্রেনের সীমানায় সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে রুশ সরকার ন্যাটোকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে। ইউক্রেন এবং মধ্য এশিয়ার দুই সীমানাকে একত্রে নিয়ন্ত্রণে আনা রাশিয়ার জন্যে একটা চ্যালেঞ্জ। আলমাতির বিক্ষোভ হয়তো রাশিয়াকে ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঝামেলা চুকিয়ে ফেলতে প্রভাবিত করতে পারে। আফগানিস্তান থেকে পলায়নের পরেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি মধ্য এশিয়ায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেই রয়ে গেছে। তবে আলমাতির সহিংসতার ব্যাপারে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানে মধ্য এশিয়ায় সৃষ্ট শূণ্যস্থান পূরণের প্রতিযোগিতার একটা লক্ষণও বটে, যা আঞ্চলিক অস্থিরতাকে বৃদ্ধি করবে।
Labels:
Afghanistan,
Almaty,
Central Asia,
China,
Geopolitics,
Kazakhstan,
New World Order,
Russia,
Turkey,
USA
Sunday, 2 January 2022
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দোপ্যাসিফিক ফোকাসের মাঝেই বলকানে জাতিগত সমস্যার পুনরুদ্ধান
০২রা জানুয়ারি ২০২২
গত ১০ই ডিসেম্বর বসনিয়ার জাতিগত সার্ব অংশের পার্লামেন্টের এক ভোটাভুটিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, সার্বরা বসনিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি থেকে বের হয়ে যাবে। উত্তপ্ত বাকবিতন্ডার মাঝে ডানপন্থী সার্ব জাতীয়তাবাদী নেতা মিলোরাদ দোদিক যথেষ্ট ভোট পেয়ে সার্বদেরকে বসনিয়ার সেনাবাহিনী, আদালত এবং কর ব্যবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসার জন্যে আইন তৈরি করার জন্যে সমর্থন পেয়ে যান। ছয় মাসের মধ্যে এই প্রস্তাবগুলি আইন আকারে স্বীকৃতি পেতে পারে। বিরোধী দলীয় সাংসদ ব্রানিস্লাভ বোরেনোভিচ সমালোচনা করে বলেন যে, এই প্রস্তাবের অর্থ হলো সংঘাত; যুদ্ধ এবং মৃত্যু। তিনি দোদিককে জিজ্ঞেস করেন যে, রিপাবলিকা সার্পস্কার সেনাবাহিনী কিসের প্রতিনিধিত্ব করবে? ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমানের জন্যে অর্থ কোত্থেকে আসবে? সীমানায় চেকপোস্ট বসানোর শর্তগুলি কি হবে? এই উত্তরগুলি দোদিককে দিতে হবে বলে তিনি দাবি করেন। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে সার্বদের এই সিদ্ধান্তের খবরটা বসনিয়ার তথা পুরো বলকানের কঠিন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বলেই উল্লেখিত হয়।
পৃথিবীর অন্যতম জটিল রাজনৈতিক ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে ‘ইউরোনিউজ’ বসনিয়ার রাষ্ট্র ব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছে। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার গৃহযুদ্ধের শেষে মার্কিন মধ্যস্ততায় ডেইটন শান্তি চুক্তির মাধ্যমে বর্তমান বসনিয়া রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়। এই রাষ্ট্রের মাঝে রয়েছে দু’টা আলাদা প্রশাসনিক সত্ত্বা। একটা হলো জাতিগত সার্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে রিপাবলিকা সার্পস্কা; আর অন্যটা হলো বসনিয়াক এবং ক্রোয়াটদের নিয়ে গঠিত ফেডারেশন অব বসনিয়া এন্ড হার্জেগোভিনা। জাতিগত সার্বরা হলো মূলতঃ অর্থোডক্স খ্রিস্টান; বসনিয়াকরা মূলতঃ মুসলিম; ক্রোয়াটরা মূলতঃ ক্যাথোলিক খ্রিস্টান। উভয় অঞ্চলকেই বেশকিছু ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে বসনিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার কিছু ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ করে; যার মাঝে রয়েছে সেনাবাহিনী, সর্বোচ্চ আদালত এবং কর আদায়ের কাঠামো। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হলো তিন সদস্য বিশিষ্ট প্রেসিডেন্সি; যার সদস্যরা হলেন বসনিয়াক, সার্ব এবং ক্রোয়াট। তিন জাতির মানুষের ভোটের দ্বারা তারা আলাদাভাবে নির্বাচিত হন। বর্তমানে এর বসনিয়াক সদস্য হলেন শেফিক জাফেরোভিচ; আর ক্রোয়াট সদস্য জেলিকো কমসিচ। উগ্র জাতীয়তাবাদী অচরণের জন্যে তারা পশ্চিমা দেশগুলির কাছে দোদিক এবং তার সমর্থকদের উপর চাপ সৃষ্টির আনুরোধ জানিয়ে আসছেন। ২০১৩ সালের শুমারি অনুযায়ি বসনিয়ার প্রায় ৩৩ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝে ৫০ শতাংশ হলো বসনিয়াক; সার্বরা হলো প্রায় ৩১ শতাংশ; ক্রোয়াটরা ১৫ শতাংশের মতো। ১৯৯০এর দশকে সাবেক ইউগোস্লাভিয়া ভেঙ্গে যাবার পর ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে ১ লক্ষের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। যুদ্ধের মাঝে ভয়ংকর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে বসনিয়ার স্রেব্রেনিসা শহরে সার্বদের হাতে ৮ হাজার নিরপরাধ বসনিয়াক মুসলিমের মৃত্যুর ঘটনা এখনও ভয়াবহ এক উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে।
মিলোরাদ দোদিক ২০১০ সালে গণতান্ত্রিক ভোটে রিপাবলিকা সার্পস্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে বসনিয়ার প্রেসিডেন্সির সদস্য নির্বাচিত হবার আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। এই পদে থাকার সময়েই তিনি বারংবার রিপাবলিকা সার্পস্কাকে বসনিয়ার রাষ্ট্রকাঠামো থেকে আলাদা করে ফেলার কথা বলেন। ডেইটন শান্তি চুক্তিকে হুমকিতে ফেলার কারণে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন সরকার দোদিকের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দেয় এবং তার সাথে কোন মার্কিন ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু দোদিক বলেন যে তিনি তার উপর অবরোধের কোন তোয়াক্কা করেন না। তিনি বসনিয়ার প্রেসিডেন্সির সদস্য হবার পর থেকে তার জাতীয়তাবাদী কথার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। ‘ইউরোনিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, গত সেপ্টেম্বর মাসে তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কার আলাদা সেনাবাহিনী, আদালত এবং কর কাঠামো তৈরি করার পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। তবে তিনি বলেন যে, এসব পরিকল্পনা বসনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবার প্রচেষ্টা নয়, অথবা নতুন করে যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনাকেও উস্কে দেবে না।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অব ফরে রিলেশন্স’ বা ‘সিএফআর’এর এক লেখায় চার্লস কুপচান বলছেন যে, ডেইটন চুক্তি অনুসারে বসনিয়ার রাজনীতিটাই হলো জাতিগত। আর সার্বদের নতুন সিদ্ধান্তের অর্থ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আর কিছু নয়। তিনি বলেন যে, পুরো বলকান অঞ্চলেই এখন জাতীয়তাবাদের উত্থান হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ সার্বিয়াও দ্রুত নিজেদের সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করছে এবং দেশটার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুনিয়ার সকল সার্বদের একত্রিত হবার আহ্বান জানিয়েছেন। সার্বিয়া এখনও ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর সহায়তায় সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আলবেনিয় মুসলিম অধ্যুষিত কসভোকে স্বীকৃতি দেয়নি; এবং এখনও সার্বিয়ার সাথে কসভোর সম্পর্ক বেশ খারাপ। একইসাথে অত্র অঞ্চলে রাশিয়াও অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের মাঝে তার প্রভাব বিস্তার করছে; যার মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিকে ইইউ এবং ন্যাটো থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে রাশিয়া। এর মাঝে ইইউ বলকানের ব্যাপারে খুব বেশি দৃষ্টি দিচ্ছে না; আর যুক্তরাষ্ট্রও ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়ে ব্যস্ত। রাশিয়ার সাথেও চলছে উত্তেজনা। এমতাবস্থায় দোদিকের জাতীয়তাবাদী কর্মকান্ডের ফলে রিপাবলিকা সার্পস্কা যদি বসনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়, তাহলে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে; যা বসনিয়ার সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
কুপচান বলকানের বেশ কয়েকটা দেশের ইইউ এবং ন্যাটোর সদস্য হওয়াকে সেখানকার উন্নয়ন আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ইইউ এবং ন্যাটো সদস্য দেশ হাঙ্গেরির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর অরবানই যখন উগ্রপন্থী কথা বলছেন, তখন ইউরোপের গণতান্ত্রিকতার মাঝেই জাতীয়তাবাদী সমস্যার গভীরতা নতুধাবন করা যায়। বুদাপেস্টে এক ভাষণে তিনি বলেন যে, বসনিয়াকে যদি ইইউএর ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে ২০ লক্ষ মুসলিমের কারণে নিরাপত্তার সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। গত ডিসেম্বরে এক সংবাদ সন্মেলনে অরবান বলেন যে, তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কাকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছেন এবং তিনি মিলোরাদ দোদিকের উপর অবরোধের বিরোধী। অরবান জার্মানির প্রতি দোদিকের বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকান্ডের কারণে শাস্তি না দিয়ে বরং আলিঙ্গন করার আহ্বান জানান। পূর্ব ইউরোপে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতারা যখন নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, তখন ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়েই ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র; ১৯৯০এর দশকে ওয়াশিংটনের ছায়াতলে স্বাক্ষরিত ডেইটন শান্তি চুক্তিকে ধরে রাখার মতো সময় তাদের নেই। বলকানে তিন দশকের ভিতরেই গণতান্ত্রিকভাবেই ভেঙ্গে পড়ছে মার্কিন রাজনৈতিক সমাধান।
গত ১০ই ডিসেম্বর বসনিয়ার জাতিগত সার্ব অংশের পার্লামেন্টের এক ভোটাভুটিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, সার্বরা বসনিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি থেকে বের হয়ে যাবে। উত্তপ্ত বাকবিতন্ডার মাঝে ডানপন্থী সার্ব জাতীয়তাবাদী নেতা মিলোরাদ দোদিক যথেষ্ট ভোট পেয়ে সার্বদেরকে বসনিয়ার সেনাবাহিনী, আদালত এবং কর ব্যবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসার জন্যে আইন তৈরি করার জন্যে সমর্থন পেয়ে যান। ছয় মাসের মধ্যে এই প্রস্তাবগুলি আইন আকারে স্বীকৃতি পেতে পারে। বিরোধী দলীয় সাংসদ ব্রানিস্লাভ বোরেনোভিচ সমালোচনা করে বলেন যে, এই প্রস্তাবের অর্থ হলো সংঘাত; যুদ্ধ এবং মৃত্যু। তিনি দোদিককে জিজ্ঞেস করেন যে, রিপাবলিকা সার্পস্কার সেনাবাহিনী কিসের প্রতিনিধিত্ব করবে? ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমানের জন্যে অর্থ কোত্থেকে আসবে? সীমানায় চেকপোস্ট বসানোর শর্তগুলি কি হবে? এই উত্তরগুলি দোদিককে দিতে হবে বলে তিনি দাবি করেন। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে সার্বদের এই সিদ্ধান্তের খবরটা বসনিয়ার তথা পুরো বলকানের কঠিন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বলেই উল্লেখিত হয়।
পৃথিবীর অন্যতম জটিল রাজনৈতিক ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে ‘ইউরোনিউজ’ বসনিয়ার রাষ্ট্র ব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছে। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার গৃহযুদ্ধের শেষে মার্কিন মধ্যস্ততায় ডেইটন শান্তি চুক্তির মাধ্যমে বর্তমান বসনিয়া রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়। এই রাষ্ট্রের মাঝে রয়েছে দু’টা আলাদা প্রশাসনিক সত্ত্বা। একটা হলো জাতিগত সার্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে রিপাবলিকা সার্পস্কা; আর অন্যটা হলো বসনিয়াক এবং ক্রোয়াটদের নিয়ে গঠিত ফেডারেশন অব বসনিয়া এন্ড হার্জেগোভিনা। জাতিগত সার্বরা হলো মূলতঃ অর্থোডক্স খ্রিস্টান; বসনিয়াকরা মূলতঃ মুসলিম; ক্রোয়াটরা মূলতঃ ক্যাথোলিক খ্রিস্টান। উভয় অঞ্চলকেই বেশকিছু ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে বসনিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার কিছু ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ করে; যার মাঝে রয়েছে সেনাবাহিনী, সর্বোচ্চ আদালত এবং কর আদায়ের কাঠামো। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হলো তিন সদস্য বিশিষ্ট প্রেসিডেন্সি; যার সদস্যরা হলেন বসনিয়াক, সার্ব এবং ক্রোয়াট। তিন জাতির মানুষের ভোটের দ্বারা তারা আলাদাভাবে নির্বাচিত হন। বর্তমানে এর বসনিয়াক সদস্য হলেন শেফিক জাফেরোভিচ; আর ক্রোয়াট সদস্য জেলিকো কমসিচ। উগ্র জাতীয়তাবাদী অচরণের জন্যে তারা পশ্চিমা দেশগুলির কাছে দোদিক এবং তার সমর্থকদের উপর চাপ সৃষ্টির আনুরোধ জানিয়ে আসছেন। ২০১৩ সালের শুমারি অনুযায়ি বসনিয়ার প্রায় ৩৩ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝে ৫০ শতাংশ হলো বসনিয়াক; সার্বরা হলো প্রায় ৩১ শতাংশ; ক্রোয়াটরা ১৫ শতাংশের মতো। ১৯৯০এর দশকে সাবেক ইউগোস্লাভিয়া ভেঙ্গে যাবার পর ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে ১ লক্ষের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। যুদ্ধের মাঝে ভয়ংকর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে বসনিয়ার স্রেব্রেনিসা শহরে সার্বদের হাতে ৮ হাজার নিরপরাধ বসনিয়াক মুসলিমের মৃত্যুর ঘটনা এখনও ভয়াবহ এক উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে।
মিলোরাদ দোদিক ২০১০ সালে গণতান্ত্রিক ভোটে রিপাবলিকা সার্পস্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে বসনিয়ার প্রেসিডেন্সির সদস্য নির্বাচিত হবার আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। এই পদে থাকার সময়েই তিনি বারংবার রিপাবলিকা সার্পস্কাকে বসনিয়ার রাষ্ট্রকাঠামো থেকে আলাদা করে ফেলার কথা বলেন। ডেইটন শান্তি চুক্তিকে হুমকিতে ফেলার কারণে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন সরকার দোদিকের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দেয় এবং তার সাথে কোন মার্কিন ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু দোদিক বলেন যে তিনি তার উপর অবরোধের কোন তোয়াক্কা করেন না। তিনি বসনিয়ার প্রেসিডেন্সির সদস্য হবার পর থেকে তার জাতীয়তাবাদী কথার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। ‘ইউরোনিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, গত সেপ্টেম্বর মাসে তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কার আলাদা সেনাবাহিনী, আদালত এবং কর কাঠামো তৈরি করার পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। তবে তিনি বলেন যে, এসব পরিকল্পনা বসনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবার প্রচেষ্টা নয়, অথবা নতুন করে যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনাকেও উস্কে দেবে না।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অব ফরে রিলেশন্স’ বা ‘সিএফআর’এর এক লেখায় চার্লস কুপচান বলছেন যে, ডেইটন চুক্তি অনুসারে বসনিয়ার রাজনীতিটাই হলো জাতিগত। আর সার্বদের নতুন সিদ্ধান্তের অর্থ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আর কিছু নয়। তিনি বলেন যে, পুরো বলকান অঞ্চলেই এখন জাতীয়তাবাদের উত্থান হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ সার্বিয়াও দ্রুত নিজেদের সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করছে এবং দেশটার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুনিয়ার সকল সার্বদের একত্রিত হবার আহ্বান জানিয়েছেন। সার্বিয়া এখনও ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর সহায়তায় সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আলবেনিয় মুসলিম অধ্যুষিত কসভোকে স্বীকৃতি দেয়নি; এবং এখনও সার্বিয়ার সাথে কসভোর সম্পর্ক বেশ খারাপ। একইসাথে অত্র অঞ্চলে রাশিয়াও অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের মাঝে তার প্রভাব বিস্তার করছে; যার মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিকে ইইউ এবং ন্যাটো থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে রাশিয়া। এর মাঝে ইইউ বলকানের ব্যাপারে খুব বেশি দৃষ্টি দিচ্ছে না; আর যুক্তরাষ্ট্রও ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়ে ব্যস্ত। রাশিয়ার সাথেও চলছে উত্তেজনা। এমতাবস্থায় দোদিকের জাতীয়তাবাদী কর্মকান্ডের ফলে রিপাবলিকা সার্পস্কা যদি বসনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়, তাহলে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে; যা বসনিয়ার সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
কুপচান বলকানের বেশ কয়েকটা দেশের ইইউ এবং ন্যাটোর সদস্য হওয়াকে সেখানকার উন্নয়ন আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ইইউ এবং ন্যাটো সদস্য দেশ হাঙ্গেরির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর অরবানই যখন উগ্রপন্থী কথা বলছেন, তখন ইউরোপের গণতান্ত্রিকতার মাঝেই জাতীয়তাবাদী সমস্যার গভীরতা নতুধাবন করা যায়। বুদাপেস্টে এক ভাষণে তিনি বলেন যে, বসনিয়াকে যদি ইইউএর ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে ২০ লক্ষ মুসলিমের কারণে নিরাপত্তার সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। গত ডিসেম্বরে এক সংবাদ সন্মেলনে অরবান বলেন যে, তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কাকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছেন এবং তিনি মিলোরাদ দোদিকের উপর অবরোধের বিরোধী। অরবান জার্মানির প্রতি দোদিকের বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকান্ডের কারণে শাস্তি না দিয়ে বরং আলিঙ্গন করার আহ্বান জানান। পূর্ব ইউরোপে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতারা যখন নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, তখন ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়েই ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র; ১৯৯০এর দশকে ওয়াশিংটনের ছায়াতলে স্বাক্ষরিত ডেইটন শান্তি চুক্তিকে ধরে রাখার মতো সময় তাদের নেই। বলকানে তিন দশকের ভিতরেই গণতান্ত্রিকভাবেই ভেঙ্গে পড়ছে মার্কিন রাজনৈতিক সমাধান।
Labels:
Balkans,
Bosnia,
Croatia,
Dayton Agreement,
Geopolitics,
Nationalism,
New World Order,
Republika Srpska,
Right Wing,
Serbia,
USA
Subscribe to:
Posts (Atom)