Thursday, 30 December 2021

সৌদিরা নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করছে কেন?

৩১শে ডিসেম্বর ২০২১

রাজধানী রিয়াদের ২’শ ৩০ কিঃমিঃ পশ্চিমে দাওয়াদমি এলাকার ফ্যাসিলিটি। এখানেই সৌদি আরব চীনের সহায়তায় নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। মার্কিনীদের উপর নির্ভরশীল সৌদিরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভীত। সৌদিদের এই প্রকল্প হয়তো সেই ভীতি থেকেই এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করতে পারছে না। এমতাবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা যেমন বাড়বে, তেমনি সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়বে।

 
মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘সিএনএন’ জানাচ্ছে যে, সৌদি আরব চীনের সহায়তায় নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। প্রতিবেদনে ধারণা করা হয় যে, সৌদি আরবের এহেন কর্মকান্ডের ফলে পারমাণবিক অস্ত্র ডেভেলপ করার পরিকল্পনা থেকে ইরানকে দূরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। স্যাটেলাইট ছবিতেও দেখা যাচ্ছে যে, সৌদি আরবের কমপক্ষে একটা স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করা হচ্ছে। চীনারাই একসময় রাজধানী রিয়াদের ২’শ ৩০ কিঃমিঃ পশ্চিমে দাওয়াদমি এলাকায় সেই ফ্যাসিলিটি তৈরি করে দিয়েছিল। গত অক্টোবর এবং নভেম্বরের মাঝে নেয়া ছবিতে সেখানে ‘বার্ন অপারেশন’এর প্রমাণ পাওয়া যায়; যা কিনা বুঝিয়ে দেয় যে, সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করা হচ্ছে। মার্কিন সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’এর ব্রিফিংএ চীন থেকে সৌদি আরবের কাছে সংবেদনশীল প্রযুক্তির বেশ কয়েকটা বড় আকারের শিপমেন্টের ব্যাপারে ইন্টেলিজেন্স উপস্থাপন করা হয়েছে।

চীনা পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র ‘সিএনএন’কে জানান যে, সৌদি আরবের সাথে চীনের সম্পর্ক কৌশলগত। সামরিক বাণিজ্যসহ অনেক বিষয়েই দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। এই সহযোগিতাগুলি আন্তর্জাতিক আইন মেনেই হচ্ছ; এবং এর মাঝে ব্যাপক ধ্বংস সাধন করার মতো কোন প্রযুক্তির আদানপ্রদান নেই। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বিস্তার নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘মিসাইল টেকনলজি কনট্রোল রেজিম’ বা ‘এমটিসিআর’এ চীন এবং সৌদি আরব কেউই স্বাক্ষরকারী নয়। সৌদি আরব, ইস্রাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখেছে। অপরদিকে ইরান তার দুর্বল বিমান বাহিনীর স্থলে ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে ডিটারেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

তবে এই ব্যাপারটায় শুধু চীনকেই জড়ানো ঠিক নয় বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সৌদি আরব বেশ কয়েকটা দেশের কাছ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পাবার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিডলবুরি কলেজ’এর প্রফেসর জেফরি লুইস বলছেন যে, রকেট পরীক্ষা করার সময় কিছু জ্বালানি বেঁচে যায়। এই বেঁচে যাওয়া জ্বালানি খুবই দাহ্য এবং বিপজ্জনক। কঠিন জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করার সময় অনেক ক্ষেত্রেই বেঁচে যাওয়া জ্বালানিগুলিকে একটা ‘বার্ন পিট’এর মাঝে ফেলে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এই পুড়িয়ে ফেলার অপারেশন থাকার অর্থই হলো সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করার কাজ চলছে। সৌদি আরবের দাওয়াদমি এলাকার ফ্যাসিলিটির স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করলে এব্যাপারটাই নিশ্চিত হওয়া যায়। ‘আইআইএসএস’ ওয়াশিংটনের সিনিয়র ফেলো মাইকেল এলম্যান এবং মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর জোসেফ এস বারমুডেজ জুনিয়র ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর সাথে সাক্ষাতে এই ফ্যাসিলিটিকে কঠিন জ্বালানির রকেট ইঞ্জিন ডেভেলপ করার কারখানা বলে মত দেন। ব্রিটেনের ‘ডেইলি মেইল’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সৌদিদের এই ফ্যাসিলিটির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখানে ‘সলিড ফুয়েল’ বা কঠিন জ্বালানির রকেট তৈরি করা হচ্ছে। তরল জ্বালানির রকেটের চাইতে কঠিন জ্বালানির রকেট সহজে লুকিয়ে রাখা যায় এবং অনেক দ্রুততার সাথে উড্ডয়ন করা যায়।

 
ভিয়েনায় ইরানের সাথে পশ্চিমা দেশগুলির পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে আলোচনা। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট প্রশ্নের মাঝে পড়লেও সৌদি প্রকল্পের ব্যাপারে ততটা চিন্তিত দেখা যায়নি কাউকেই। ইরান নিশ্চয়ই এমন কোন নিয়ন্ত্রণমূলক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চাইবে না, যা কিনা অন্যদের উপর প্রয়োগ করা হবে না।

বাইডেন প্রশাসন এখন মনে করছে যে, এর ফলে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প সীমিতকরণের চেষ্টার ব্যাপ্তি আরও বাড়িয়ে সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পকেও সীমিত করার চেষ্টাকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ইস্রাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপারে যথেষ্টই চিন্তিত। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বলা হয় যে, সৌদি আরব তাদের প্রথম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা তৈরি করেছে। একই বছরের জুনে ‘সিএনএন’ আরেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল যে, মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা এব্যাপারে অবহিত রয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সামনে গোপন ইন্টেলিজেন্স প্রকাশ করতে চাননি। ডেমোক্র্যাটরা সরকারি চ্যানেলের বাইরে থেকে এব্যাপারে জানতে পেরে ক্ষেপে যায়। ডেমোক্র্যাটরা বলতে থাকে যে, ট্রাম্প প্রশাসন সৌদিদের ব্যাপারে খুবই নরম আচরণ করছিলেন। অনেকেই বলেন যে, ট্রাম্পের নিস্তব্দতাই সৌদিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পকে এগিয়ে নেবার পিছনে সাহস যুগিয়েছে। মার্কিন সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন যে, বাইডেন প্রশাসন এই আদানপ্রদানে জড়িত থাকা কিছু কোম্পানির উপর অবরোধ দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে; যদিও ক্যাপিটল হিলে অনেকেই মনে করেন না যে, বাইডেন প্রশাসন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কঠোর কোন সিদ্ধান্ত নেবে।

প্রফেসর জেফরি লুইস বলছেন যে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট প্রশ্নের মাঝে পড়লেও সৌদি প্রকল্পের ব্যাপারে ততটা চিন্তিত দেখা যায়নি কাউকেই। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির বিস্তার ঠেকাতে সৌদি আরব এবং ইস্রাইলের মতো আঞ্চলিক পক্ষগুলিকেও আলোচনায় আনতে হবে; কারণ এরাও নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র নিজেরাই তৈরি করতে পারছে। ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এসোসিয়েট ফেলো মার্ক ফিতজপ্যাট্রিক এক লেখায় বলছেন যে, ইরান নিশ্চয়ই এমন কোন নিয়ন্ত্রণমূলক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চাইবে না, যা কিনা অন্যদের উপর প্রয়োগ করা হবে না। তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করার ব্যাপারে ইরানের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বাইরে সৌদি আরবের আর কোন উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা, সেব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। সৌদিদের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে ব্যবহারের জন্যে কোন পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির প্রকল্প শুরুর কথাও শোনা যায় না। তবে ২০১৮ সালে মার্কিন মিডিয়া ‘সিবিএস’কে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছিলেন যে, সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্র যোগাড় করতে চায় না। তবে ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র ডেভেলপ করে, তবে সৌদি আরব নিশ্চিতভাবেই একই কাজ করবে।

মার্কিন ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘স্ট্রাটফর’ ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলে যে, যদি সৌদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের অবস্থানে পৌঁছে, তবে মার্কিন প্রশাসন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হতে পারে। মাইকেল এলম্যান ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে এক সাক্ষাতে বলেন যে, সৌদি আরবের বিমান বাহিনীতে অত্যাধুনিক ‘এফ ১৫’, ‘টর্নেডো’ এবং ‘টাইফুন’ যুদ্ধবিমান রয়েছে এবং তাদের পাইলটেরাও যথেষ্ট ভালো। তবে তাদের লজিস্টিক্যাল সাপোর্টের ক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। কিন্তু সৌদিরা যদি ইরানের উপর কোন হামলা করতে যায়, সেখানে কোন নিশ্চয়তা নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র সৌদিদেরকে সহায়তা দেবে। এই অনিশ্চয়তাই হয়তো সৌদিদেরকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পেতে আগ্রহী করে তুলেছে। গত সেপ্টেম্বরে ‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব থেকে তাদের ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের সাথে অনেকেই আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসার ব্যাপারটা যুক্ত করেছে; এবং একইসাথে তা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনীদের উপর নির্ভরশীল দেশগুলিকে দুশ্চিন্তার মাঝে ফেলে দিয়েছে। ‘রাইস ইউনিভার্সিটি’র ‘জেমস এ বেকার থ্রি ইন্সটিটিউট ফর পাবলিক পলিসি’র রিসার্চ ফেলো ক্রিশ্চিয়ান আলরিকসেন বলছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে সিদ্ধান্ত নেয়ার মানুষগুলি মোটামুটিভাবে একমত যে, যুক্তরাষ্ট্র একসময় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে রক্ষায় যতটা মনযোগী ছিল, এখন ততটা নেই। সৌদিরা মনে করছে যে, ওবামা, ট্রাম্প এবং বাইডেনের পরপর তিনটা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের মাঝেই তারা মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাবার প্রবণতা দেখেছে। অন্ততঃ ট্রাম্প প্রশাসনের পর বাইডেন যখন আফগানিস্তান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত দেয়ার সময়ে নিশ্চিত করেছেন যে, তার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই সর্বাগ্রে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বন্ধুরাই হতাশ হয়েছে।

 
২০১৮ সালে মার্কিন মিডিয়া ‘সিবিএস’কে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছিলেন যে, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র ডেভেলপ করে, তবে সৌদি আরব নিশ্চিতভাবেই একই কাজ করবে। সৌদিরা মনে করছে যে, ওবামা, ট্রাম্প এবং বাইডেনের পরপর তিনটা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের মাঝেই তারা মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাবার প্রবণতা দেখেছে। অন্ততঃ ট্রাম্প প্রশাসনের পর বাইডেন যখন আফগানিস্তান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত দেয়ার সময়ে নিশ্চিত করেছেন যে, তার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই সর্বাগ্রে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বন্ধুরাই হতাশ হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানে সৌদিরা নিজেদের প্রতিরক্ষা নিজেরাই নিশ্চিত করতে পারবে, সেব্যাপারে কেউই নিশ্চিত নয়। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গত পাঁচ বছরে সৌদি আরবের অস্ত্র আমদানি ৬১ শতাংশ বেড়েছে। আর ‘মিডিলইস্ট আই’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২১ সালেই সৌদি আরব ঘোষণা দেয় যে, তারা নিজস্ব সামরিক শিল্পে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে। এছাড়াও ২০৩০ সালের মাঝে তারা তাদের সামরিক বাজেটের ৫০ শতাংশ নিজস্ব উৎস থেকে ক্রয় করার টার্গেট ঠিক করেছে। অর্থাৎ বাইরের উৎসের উপর নির্ভরতা কমাতে পরিকল্পনা নিয়েছে সৌদি আরব। তবে কিছুদিন আগেই বাইডেন প্রশাসন সৌদিদের কাছে ট্রাম্প প্রশাসনের এক অস্ত্র বিক্রির চুক্তিতে আংশিক সম্মতি দিয়েছে। সাড়ে ৬’শ মিলিয়ন ডলারের সেই অস্ত্র চুক্তির মাঝে রয়েছে ২’শ ৮০টা ‘এআইএম ১২০সি’ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র; এবং এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ফাইটার বিমান থেকে ছোঁড়ার জন্যে ৫’শ ৯৬টা ‘এলএইউ ১২৮ মিসাইল রেইল লঞ্চার’। এই চুক্তিতে সম্মতির পর মার্কিন সিনেটে প্রবল বাকবিতন্ডা চলে। সিনেটররা ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি আরবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, দুই বছর আগে সৌদি ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের ফ্যাসিলিটি তৈরির কাজ শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র সেব্যাপারে চুপ ছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছিল যে, সৌদি প্রকল্পে ট্রাম্প প্রেরণা যুগিয়েছিলেন। এখন বাইডেন প্রশাসনের এক বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র এব্যাপারে অফিশিয়ালি কোন বিবৃতি দেয়নি। এমনকি অতি সংবেদনশীল প্রযুক্তির বড় কিছু শিপমেন্টের ব্যাপারে ইন্টেলিজেন্স থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র চুপ থেকেছে; যদিও সকলেই মনে করছেন যে, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনার ক্ষেত্রে সৌদিদের এই প্রকল্প একটা বড় বাধা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধে সৌদিদেরকে সরাসরি সহায়তা দেবে কিনা, সেব্যাপারে অনিশ্চয়তাই হয়তো সৌদিদেরকে নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তবে এই প্রকল্পের ব্যাপারে কয়েক বছর ধরে ট্রাম্প এবং বাইডেন প্রশাসনের নীরবতাই যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ স্বীকৃতির প্রমাণ। দু’বছর আগে ‘স্ট্রাটফর’ বলেছিল যে, সৌদিরা ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করলে যুক্তরাষ্ট্র সৌদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। তবে কি বাইডেন প্রশাসন পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের জন্যেই অপেক্ষা করছে? নাকি ইরানের সাথে আলোচনার সফলতার ব্যাপারে সন্দেহের কারণেই বাইডেন প্রশাসন সৌদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া থেকে দূরে থাকছে? অর্থাৎ ইরানের সাথে আলোচনায় সৌদিদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে দরকষাকষির একটা সুযোগ দিচ্ছে। তথাপি অনেকেই বলছেন যে, মার্কিনীদের উপর নির্ভরশীল সৌদিরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভীত। সৌদিদের এই প্রকল্প হয়তো সেই ভীতি থেকেই এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করতে পারছে না। এমতাবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা যেমন বাড়বে, তেমনি সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়বে।

Wednesday, 29 December 2021

মালদ্বীপে পৌঁছেছে বাংলাদেশ?

৩০শে ডিসেম্বর ২০২১

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৩শে ডিসেম্বর মালদ্বীপের পার্লামেন্টে শেখ হাসিনা এক বক্তব্য রাখেন। শেখ হাসিনার এই সফরটা বাংলাদেশ এবং মালদ্বীপের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্যেই শুধু নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্যেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এতকাল দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলি একমাত্র ভারতের প্রভাবের মাঝে থেকেই নিজেদের নীতি নির্ধারণ করেছে। এই প্রথমবারের মতো এই সমীকরণে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

 
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দ্বিতীয়ার্ধে ছয় দিনের জন্যে মালদ্বীপ সফর করে এসেছেন। দ্বৈত কর বাতিল করে বাণিজ্য সহজীকরণ, কারাবন্দী বিনিময়, বাংলাদেশ থেকে মেডিক্যাল প্রফেশনাল নেয়া এবং যুব উন্নয়ন বিষয়ে কয়েকটা সমঝোতা স্বারক এই সফরে স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়াও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মালদ্বীপকে ১৩টা সামরিক গাড়ি উপহার দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফরের মাঝে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট ফয়সাল নাসিম, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহামেদ নাশীদ এবং প্রধান বিচারপতি আহমেদ মুতাসিম আদনানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ২৩শে ডিসেম্বর মালদ্বীপের পার্লামেন্টে শেখ হাসিনা এক বক্তব্য রাখেন। এই সফরটা বাংলাদেশ এবং মালদ্বীপের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্যেই শুধু নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্যেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এতকাল দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলি একমাত্র ভারতের প্রভাবের মাঝে থেকেই নিজেদের নীতি নির্ধারণ করেছে। এই প্রথমবারের মতো এই সমীকরণে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

গত ১৩ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘আবু উবাইদাহ’ চট্টগ্রাম ছেড়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ সফর করা। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর ওয়েবসাইট বলছে যে, জাহাজটা ১৮ই ডিসেম্বর শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে পৌঁছায় এবং ২০শে ডিসেম্বর কলম্বো ছেড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মালদ্বীপ সফরের সময় জাহাজটা সেখানেই ছিল; যদিও জাহাজটা মিডিয়াতে তেমন একটা আসেনি। তবে মালদ্বীপে বাংলাদেশের সামরিক সফর এটাই প্রথম নয়। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক মালদ্বীপ সফরের সময় ৭টা সামরিক পিকআপ ট্রাক উপহার হিসেবে প্রদান করেছিলেন।

তবে এখনও পর্যন্ত মালদ্বীপ অনেক দিক থেকেই ভারতের প্রভাবের মাঝেই রয়েছে। পুরো মালদ্বীপ জুড়ে ভারত ১০টা স্বল্প পাল্লার উপকূলীয় রাডার বসিয়েছে মালদ্বীপের সমুদ্রসীমার উপর নজরদারি করার জন্যে। ২০০৬ সালে ভারত মালদ্বীপকে ৪৬ মিটার লম্বা একটা প্যাট্রোল বোট দেয়। ২০১৩ সালে ভারত মালদ্বীপকে দু’টা ‘ধ্রুভ’ হেলিকপ্টার উপহার দেয়। ২০১৯ সালের আরও একটা প্যাট্রোল বোট দেয় ভারত। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সাথে মালদ্বীপের নৌঘাঁটি ডেভেলপ করার ব্যাপারে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি মোতাবেক মালদ্বীপের ‘উথুরু থিলা ফালহু’ নৌঘাঁটি ডেভেলপ করার জন্যে ভারত মালদ্বীপকে ৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা দেবে। ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ বলছে যে, ভারত মালদ্বীপে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্যে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে। এছাড়াও করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্তি পেতেও ভারত মালদ্বীপকে আড়াই’শ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়েছে। ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ভারত মালদ্বীপকে ২ লক্ষ ডোজ করোনা ভ্যাকসিন প্রদান করেছে।

ভারতের সাথে মালদ্বীপের সম্পর্ক প্রভাব বিস্তারের হলেও মালদ্বীপের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের। মালদ্বীপের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কতটা গভীর, তা কয়েকটা ঘটনার মাঝেই প্রমাণ পাওয়া যাবে। সমুদ্রের পানির মাঝে বসবাস করলেও মালদ্বীপে খাবারের পানির অভাব রয়েছে। প্রতিটা দ্বীপের রয়েছে আলাদা বিদ্যুৎ এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে সমুদ্রের পানি থেকে সুপেয় পানি তৈরির যন্ত্র আগুন লেগে নষ্ট হয়ে গেলে পুরো পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ধ্বস নামে। প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষের খাবারের পানিটুকুও না থাকায় দেশটাতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। এরকমই এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ মালদ্বীপের সহায়তায় এগিয়ে আসে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘সমুদ্র জয়’ ১ লক্ষ লিটার খাবার পানি এবং ৫টা মোবাইল পানিশোধন প্ল্যান্ট নিয়ে রওয়ানা দেয় মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে। সর্বোচ্চ গতিতে ছুটে ৩ হাজার কিঃমিঃএর বেশি সমুদ্রপথ মাত্র ৪ দিনে পাড়ি দিয়ে মালেতে পৌঁছে জাহাজখানা।

 
মার্চ ২০২১। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মেডিক্যাল দল মালদ্বীপে। ভারতের সাথে মালদ্বীপের সম্পর্ক প্রভাব বিস্তারের হলেও মালদ্বীপের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের।


মালদ্বীপ অতি ছোট একটা দ্বীপ দেশ। দেশটার অতি জরুরি সেবার অনেককিছুই নিজেদের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। এর মাঝে রয়েছে প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল সেবা। বাংলাদেশের মেডিক্যাল প্রফেশনালরা মালদ্বীপে সার্ভিস দিচ্ছেন। ২০২০ সালে করোনা মহামারিতে মালদ্বীপের অর্থনীতিতে ধ্বস নামার সাথেসাথে এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ‘সমুদ্র অভিযান’ ১’শ টনের সাহায্য নিয়ে মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। এই সাহায্যের মাঝে ছিল ২০ হাজার সেট পিপিই, ৫ হাজার হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ৯’শ ৬০টা সেফটি গ্লাস এবং ৪০ কার্টন জরুরি ঔষধ। এছাড়াও ৮৫ টন খাবার ছিল জাহাজে। এর পরের মাসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটা পরিবহণ বিমানে করে ১১ জন ডাক্তারকে মালদ্বীপে পাঠানো হয়। ২০২১ সালের মার্চে মালদ্বীপের জনগণের মাঝে ভ্যাকসিনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘সি ১৩০’ পরিবহণ বিমানে করে সামরিক বাহিনীর ২৩ জন মেডিক্যাল প্রফেশনালকে মালদ্বীপে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশের প্রায় এক লক্ষ কর্মী মালদ্বীপের হুলহুমালে দ্বীপ তৈরিতে অংশ নিচ্ছে; যেখানে প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষের থাকার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্প হলো মালদ্বীপের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্প। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই দ্বীপ উন্নয়নের কাজ চলছে। তবে এই দ্বীপ উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ কম নয়। মালদ্বীপে কোন নদী নেই; যেকারণে পলিমাটি জমে মালদ্বীপের ভূমির পরিধি বাড়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। তাই মালদ্বীপ অন্য দেশ থেকে মাটি আমদানি করে হুলহুমালে দ্বীপ তৈরি করছে। এই জায়গাটাতেই মালদ্বীপের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার সুযোগ ছিল এক দশকের বেশি সময় ধরে। ২০১০ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত আহমেদ সারীর বাংলাদেশের নৌপরিবহণ মন্ত্রী শাহজাহান খানের কাছে বাংলাদেশ থেকে মাটি আমদানি করার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছিলেন। একই বছরের অগাস্টে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনকে মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত বলেন যে, তার দেশ প্রতি বছর ৪ লক্ষ টন মাটি আমদানি করছে; যার তিন চতুর্থাংশ আসছে ভারত থেকে। তিনি আরও বলেন যে, বাংলাদেশের নদীর পলিমাটি ভারতের মাটি থেকে উত্তম হওয়ায় তার দেশ বাংলাদেশ থেকে মাটি আমদানিতে বেশি আগ্রহী। ২০১৬ সালের এপ্রিলে মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত মোহামেদ আসিম বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমকে আবারও মাটি আমদানির কথা বলেন। সর্বশেষ ২০২০এর নভেম্বর মাসে মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল্লাহ শহীদ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের সাথে এক ফোনালাপে আবারও মাটি আমদানি করার ইচ্ছার কথা মনে করিয়ে দেন। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পরেও বাংলাদেশ থেকে মালদ্বীপে মাটি রপ্তানি হয়নি। যেহেতু বাংলাদেশের পলিমাটি দিয়ে ভারতের মাটিকে প্রতিস্থাপিত করার কথা ছিল, তাই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন খুব একটা সহজ ছিল না মোটেই। বলাই বাহুল্য যে, মালদ্বীপকে ভারত তার নিজস্ব প্রভাবের অধীন দেশ বলে মনে করে। এখানে বাংলাদেশ বা অন্য কোন দেশের প্রভাব বিস্তারকে ভারত ভালো চোখে দেখবে না। কিন্তু হয়তো এখন সেই ব্যাপারটাই ঘটতে যাচ্ছে, যা কিনা ভারত এত বছর আটকে রেখেছিল।

 
ডিসেম্বর ২০২১। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ 'আবু উবাইদাহ' শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মালদ্বীপ সফরের সময় জাহাজটা সেখানেই ছিল; যদিও জাহাজটা মিডিয়াতে তেমন একটা আসেনি। ভারত, শ্রীলংকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং আরও কিছু দেশ এতকাল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সফর তালিকায় ছিল; মালদ্বীপ ছিল না। জাহাজটার মালদ্বীপ সফর হয়তো 'কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ'এর ম্যারিটাইম অপারেশনেরই একটা রিহার্সাল। এটা পরিষ্কার যে, ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতি শুধুমাত্র ভারতকেন্দ্রিক আর থাকছে না।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘আবু উবাইদাহ’ মালদ্বীপ সফরে গিয়েছে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করার জন্যে নয়। ভারত, শ্রীলংকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং আরও কিছু দেশ এতকাল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সফর তালিকায় ছিল; মালদ্বীপ ছিল না। ২০২১ সালের অগাস্টে শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বোতে ‘কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ’ বা ‘সিএসসি’ নামের একটা নিরাপত্তা সহযোগিতা জোটের মাঝে বাংলাদেশের নাম চলে এসেছে। ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ বলছে যে, ২০১১ সালে শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোটাবায়া রাজাপক্ষের প্রচেষ্টায় শুরু করা এই জোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপের সমুদ্র নিরাপত্তায় ভারতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। তবে ২০১৪ সালের পর থেকে কয়েক বছর মালদ্বীপের সাথে ভারতের সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন চলায় এই কনক্লেভের কর্মকান্ড স্থগিত হয়ে যায়। ২০২০ সালে এই কর্মকান্ড আবারও নতুন উদ্যমে শুরু হয়; এর নামকরণটাও এবারেই আসে। এবারে গোটাবায়া রাজাপক্ষে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট। সেবছরের নভেম্বরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকে শ্রীলংকার প্রস্তাবে ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশ সেইশেল এবং মরিশাসের সাথে সাথে বাংলাদেশকেও এই জোটে ‘পর্যবেক্ষক’ হিসেবে ঢোকানো হয়। এর আগে ২০১৪ সালে সেইশেল এবং মরিশাস ‘অতিথি’ দেশ হিসেবে উপস্থিত ছিল। তবে সবচাইতে বড় ঘটনাটা ঘটে যায় ২০২১ সালের উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকে। এখানেই সিদ্ধান্ত হয়ে যায় যে নতুন তিনটা রাষ্ট্রকে স্থায়ী সদস্য হিসেবে জোটে ঢোকানো হবে। এর সাথে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আরেকটা ঘটনা ঘটে যায়; যা কিনা এই জোটের গুরুত্বকে বাড়িয়ে তোলে। ‘সিএসসি’এর অধীনে ভারত, শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপের অংশগ্রহণে একটা ‘ফোকাসড অপারেশন’ চালনা করা হয়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, এই অপারেশনে তিন দেশের নৌশক্তি অংশ নেয়। ভারতের ‘মনোহর পারিকার ইন্সটিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ এন্ড এনালিসিস’এর গবেষক গুলবিন সুলতানা ‘ফিনানশিয়াল এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক লেখায় বলছেন যে, প্রথমবারের মতো এই কনক্লেভের অধীনে একটা সামরিক অপারেশন করা হলো। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অন্যান্য ম্যারিটাইম নিরাপত্তা জোট, যেমন ‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম এসোসিয়েশন’এর সাথে কলম্বো কনক্লেভের একটা পার্থক্য হয়ে গেলো। তিনি মনে করছেন যে, ভারত মহাসাগরে এই জোট একটা গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পদক্ষেপ হিসেবে সামনে আসতে যাচ্ছে; যার গুরুত্ব আরও বাড়তে যাচ্ছে সেইশেল, মরিশাস এবং বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে।

মালদ্বীপ শুধুমাত্র বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের একটা উৎস হিসেবেই ছিল এতকাল। তবে এই অবস্থানের পরিবর্তন হতে চলেছে। গত ১৯শে নভেম্বর থেকে দুই দেশের মাঝে সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। বাণিজ্য সহজীকরণের জন্যে দুই দেশের মাঝে সরাসরি জাহাজ চলাচলের ব্যাপারেও ঐকমত্য হয়েছে ইতোমধ্যেই। এই প্রচেষ্টা বাস্তবায়িত হলে হয়তো বাংলাদেশ থেকে মালদ্বীপে পলিমাটি রপ্তানিও সম্ভব হতে পারে। আর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ‘বিআইডিএস’এর এক গোলটেবিল বৈঠকে বলেন যে, মালদ্বীপ বাংলাদেশের কাছে দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ চেয়েছে; এবং বাংলাদেশ সেটা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। এর আগে বাংলাদেশ শ্রীলংকাকে আড়াই’শ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে; যখন দেশটা ভারতের কাছ থেকে ঋণ পায়নি। আর ‘কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ’ এমন সময়ে ম্যারিটাইম অপারেশনকে এই জোটের অন্তর্ভুক্ত করলো, যখন শ্রীলংকার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ এই জোটের স্থায়ী সদস্য হিসেবে ঢুকতে যাচ্ছে। হয়তো অতি শিগগিরই বাংলাদেশের যুদ্ধজাহাজগুলিকে মালদ্বীপ, সেইশেল এবং মরিশাস পর্যন্ত সমুদ্রে টহল দিতে দেখা যাবে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ’আবু উবাইদাহ’র মালদ্বীপ সফর হয়তো এরকম অপারেশনেরই একটা রিহার্সাল। এটা পরিষ্কার যে, ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতি শুধুমাত্র ভারতকেন্দ্রিক আর থাকছে না।

Saturday, 25 December 2021

পশ্চিমা অর্থনীতিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্ট

২৫শে ডিসেম্বর ২০২১

করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রমণের কারণে পশ্চিমা দুনিয়ায় ক্রিসমাসের আগে আগে ৪ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। মানুষের মৃত্যুর মহামারি যতটা, তার চাইতে বেশি সম্পদের মহামারি। অপ্রতুল এবং যথেচ্ছ সমাধানের কারণে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মারাত্মক চাপের মাঝে পড়েছে। এই যথেচ্ছ সমাধানগুলিকে জোরপূর্বক বাস্তবায়নের চেষ্টা মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করছে এবং জনমনে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই পড়েছে প্রশ্নের মুখে। করোনা মহামারি বিশ্বের জনগণকে ধ্বসে পড়া পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে।


করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রমণের কারণে পশ্চিমা দুনিয়ায় ক্রিসমাসের আগে আগে ৪ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটএওয়্যার’এর বরাত দিয়ে ‘বিবিসি’ বলছে যে, ফ্লাইট বাতিলের এক চতুর্থাংশই ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। ক্রিসমাসের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে বাতিল হয়েছে ৬’শ ৮৯টা ফ্লাইট; ক্রিসমাসের দিন আরও ৭’শ বাতিলের অপেক্ষায়। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, অনেক ফ্লাইট ক্রু এবং অপারেশনসএর সাথে জড়িত লোকজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে; অথবা তাদের নিজেদেরকে কোয়ার‍্যান্টাইন করতে হয়েছে। যদিও গবেষকেরা বলেছেন যে, ওমিক্রন আগের ভ্যারিয়্যান্টগুলির চাইতে বেশি প্রাণনাশী নয়, তথাপি এর সংক্রমণ করতে পারার সক্ষমতা অনেক বেশি থাকায় অনেকেই চিন্তা পড়েছেন। ‘ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান’এর এসোসিয়েট প্রফেসর হ্যালি প্রেসকট ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’কে বলছেন যে, যখন একইসাথে লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়ে যায়, তখন এদের মাঝে স্বল্প শতাংশ মানুষও যদি হাসপাতালে যায়, সেটাও মেডিক্যাল ব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলার জন্যে যথেষ্ট।

ক্রিসমাসের ঠিক আগে আগে ব্রিটেনের রেস্টুর‍্যান্টগুলি ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের কারণে মারাত্মক সমস্যায় পতিত হয়েছে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, গত বসন্তের পর থেকে সবচাইতে খারাপ অবস্থায় পড়েছে তারা। ‘অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্স’ বা ‘ওএনএস’ বলছে যে, ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে রেস্টুর‍্যান্টগুলিতে বসা খদ্দেরের সংখ্যা ১৪ শতাংশ কমেছে। ওমিক্রনের কারণে ব্রিটিশরা এখন বাইরে গিয়ে খাচ্ছে কম; এবং বাসায় বসে কাজ করছে বেশি। লন্ডনে এই অবস্থা সবচাইতে খারাপ; সেখানে খদ্দেরের সংখ্যা কমেছে ১৮ শতাংশ। ‘ওএনএস’ আরও বলছে যে, বাসা থেকে কাজ করতে বলা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দুই সপ্তাহে ২ শতাংশ বেড়ে ১৪ শতাংশে ঠেকেছে। ব্রিটেনের আঞ্চলিক শহরগুলিতে বেচাকেনা ভালো চললেও লন্ডনে বেচাকেনা ২৯ শতাংশ কমে গেছে। কনসালট্যান্সি কোম্পানি ‘অক্সফোর্ড ইকনমিক্স’এর অর্থনীতিবিদ এন্ড্রু গুডউইন বলছেন যে, যদিও সরকার বেশিরভাগ বিধিনিষেধ ক্রিসমাসের আগে চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তথাপি জনগণের মাঝেই সাবধানতা অবলম্বণ করার প্রবণতা বেড়েছে; এর উপর রয়েছে অবাধে চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা। তিনি মনে করছেন যে, এগুলির কারণে ব্রিটেনের জিডিপি ডিসেম্বর মাসে কমবে।

অপরদিকে আটলান্টিকে ওপাড়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বলছে যে, মার্কিন অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় চার দশকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। বলা হচ্ছে যে, গত নভেম্বরে ব্যক্তিগত খরচার হিসেবে ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ; যা ১৯৮২ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। গত অক্টোবরে এটা ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ। নভেম্বরে জনগণের খরচ বাড়লেও আয় সেই তুলনায় বাড়েনি। খরচ বেড়েছে দশমিক ৬ শতাংশ; আয় বেড়েছে দশমিক ৪ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ ধরে বেকার ভাতা দাবি করা মানুষের সংখ্যা ডিসেম্বরে দাঁড়িয়েছে ১৮ লক্ষ ৫৯ হাজারে। মহামারির মাঝে এটা সর্বনিম্ন সংখ্যা হলেও সংখ্যাটা যথেষ্টই বড়। কারণ এর বাইরেও অনেকেই রয়েছে যারা বেকারত্বের এই সংজ্ঞার মাঝে না পড়লেও কোনমতে সংসার চালাচ্ছে।

‘বিবিসি’ বলছে যে, ওমিক্রন ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতালি, স্পেন এবং গ্রিসে মাস্ক পড়ে বাইরে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উত্তর স্পেনের কাতালোনিয়াতে রাত্রিকালীন কারফিউ বলবত করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে চলছে কঠোর লকডাউন। জার্মানিতে ২৮ ডিসেম্বর থেকে প্রাইভেট গণজমায়েত ১০ জনের বেশি করা যাবে না; নাইট ক্লাবগুলিও বন্ধ থাকবে। ফুটবল খেলা হবে দর্শকবিহীন মাঠে। পর্তুগালে ২৬শে ডিসেম্বর থেকে বার এবং নাইট ক্লাবগুলি বন্ধ হচ্ছে; আর ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত বাসা থেকে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রধান এন্থনি ফাউচি বলছেন যে, ক্রিসমাসের সময় মানুষ বেশি ঘোরাঘুরি করলে পুরোপুরি ভ্যাকসিন নেয়া থাকলেও সংক্রমণ বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র হিসেবে বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে ৫৩ লক্ষ মানুষ করোনাভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেছে; আক্রান্ত হয়েছে কমপক্ষে ২৭ কোটি ৯০ লক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ই ডিসেম্বর অফিশিয়ালি করোনায় মৃতের সংখ্যা ৮ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। গত ২রা অক্টোবরে তা ৭ লক্ষ ছাড়িয়েছিল। অর্থাৎ ৭৫ দিনে বা প্রায় আড়াই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মারা গেছে ১ লক্ষ মানুষ। প্রতিদিন গড়ে এই সংখ্যা ১ হাজার ৩’শ ৩৩ জন। ২০২০ সালের মার্চের শুরু থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৯ মাসে মৃত্যু হয়েছিল ৭ লক্ষ মানুষের। অর্থাৎ এই সময়ের মাঝে গড়ে প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২’শ ২৮ জন; যা কিনা গত আড়াই মাসের চাইতে কম! অথচ প্রথম ১৯ মাসের তুলনায় শেষ আড়াই মাসে বেশিরভাগ মানুষই ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছে। ‘ব্লুমবার্গ’এর প্রতিবেদনে দেখানো হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষ কমপক্ষে একবার ভ্যাকসিন নিয়েছে; ৬২ শতাংশ মানুষকে পুরোপুরিভাবে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। এর মাঝে ২০ শতাংশ আবার বুস্টার ডোজও পেয়েছে। ইইউতে ৭০ শতাংশ মানুষকে দেয়া হয়ে পুরোপুরি ভ্যাকসিন; ২৬ শতাংশ বুস্টারও পেয়েছে। মাল্টিবিলিয়ন ডলারের এই ভ্যাকসিন ব্যবস্থাও মৃত্যুর মিছিল কমাতে পারছে না। থামাতে পারছে না অর্থনৈতিক নিম্নগতি।

পশ্চিমা দেশগুলিতে ভ্যাকসিন নেয়ার বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে যেমন প্রতিবাদ হয়েছে, তেমনি করোনার কারণে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের বিরুদ্ধেও হয়েছে বিক্ষোভ। রাষ্ট্রগুলি কোন সমাধান দিতে পারেনি তাদের জনগণকে, যার মাধ্যমে সংক্রমণ বা মৃত্যু কমানো যেতে পারতো। অথচ পরীক্ষামূলক বিধিনিষেধের যাঁতাকলে পরে জনগণের আর্থিক অবস্থা হয়েছে করুণ। ভ্যাকসিনের ডোজ বৃদ্ধি করার পরেও মেলেনি কাংক্ষিত ফলাফল। অথচ এর ফলে কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি প্রচুর লাভ করেছে; তাদের গুটিকয়েক শেয়ারহোল্ডার লাশের মিছিলের উপর হয়েছে বিলিয়নায়ার। ওমিক্রন মানুষের জীবন নিচ্ছে কম; কিন্তু দুই বছর ধরে থেকে থেকে বিধিনিষেধের পর পশ্চিমা অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টাটুকুকে ধ্বসিয়ে ফেলছে। মানুষের মৃত্যুর মহামারি যতটা, তার চাইতে বেশি সম্পদের মহামারি। অপ্রতুল এবং যথেচ্ছ সমাধানের কারণে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মারাত্মক চাপের মাঝে পড়েছে। এই যথেচ্ছ সমাধানগুলিকে জোরপূর্বক বাস্তবায়নের চেষ্টা মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করছে এবং জনমনে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই পড়েছে প্রশ্নের মুখে। করোনা মহামারি বিশ্বের জনগণকে ধ্বসে পড়া পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে।

Friday, 24 December 2021

কনকনে ঠান্ডার মাঝে আকাশচুম্বী জ্বালানির মূল্য ইইউএর লক্ষ্যহীনতাকেই তুলে ধরে

২৫শে ডিসেম্বর ২০২১

ইইউ এখন না পারছে জাতীয়তাবাদকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের স্বার্থের দ্বন্দ্বগুলিকে ঘুচতে; না পারছে পূর্ব ইউরোপের সীমান্তের সমস্যাগুলিকে সমাধান করে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে। ব্রেক্সিট, করোনাভাইরাসের অব্যবস্থাপনা, ডানপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের পর নিজেদের অনৈক্য প্রসূত এই জ্বালানি সমস্যা ইইউএর লক্ষ্যগুলিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ইইউ কি সমস্যার সমাধান করার জন্যে তৈরি হয়েছিল; নাকি নতুন সমস্যার জন্ম দেয়ার জন্যে?

 
ইউরোপের অনেক অঞ্চলেই ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তাপমাত্রা শূণ্যের নিচে নেমে গেছে। এর মাঝেই চলছে মারাত্মক জ্বালানি সমস্যা। বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জমে যাওয়া ঠান্ডার মাঝে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কোন শেষ দেখা যাচ্ছে না। জ্বালানির অকশনে গ্যাসের মূল্য এবছরের মাঝেই বেড়েছে ৬ গুণ! আর বিদ্যুতের অকশনের অবস্থাও খারাপ। জার্মানিতে বিদ্যুতের মূল্য উঠেছে প্রতি মেগাওয়াট আওয়ারে রেকর্ড ২’শ ৮৯ ডলার। ফ্রান্সেও ইতিহাসের সর্বোচ্চ মূল্য উঠেছে। ‘এসএন্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটস’এর হিসেবে ২২শে ডিসেম্বর ব্রিটেনে বিদ্যুতের বেইজলোড মূল্য ছিল প্রতি মেগাওয়াট আওয়ারএ প্রায় ৪’শ ৩৮ ডলার; যা ডিসেম্বর মাসের শুরুর তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। নেদারল্যান্ডসে বিদ্যুতের মূল্য ২১শে ডিসেম্বরে রেকর্ড ৪’শ ৮৭ ডলার ছোঁয়।

‘ব্লুমবার্গ’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বাৎসরিক ছুটির মাসগুলির ঠিক আগেই করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রমণ বেড়েছে ইউরোপে; যা কিনা মূদ্রাস্ফীতিকে আরও বাড়িয়েছে। ট্রেডিং কোম্পানি ‘ট্রাফিগুরা গ্রুপ’এর প্রধান নির্বাহী জেরেমি উইয়ার নভেম্বরে সকলকে সাবধান করে বলেন যে, শীত বেশি পড়লে ইউরোপে লোড শেডিংএর কারণে ব্ল্যাকআউট হতে পারে। ফ্রান্সের বিদ্যুৎ কোম্পানি ‘ইলেকট্রিসিটে ডে ফ্রান্স এসএ’ ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা তাদের আণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি বন্ধ করছে; যেগুলি কিনা ফ্রান্সের মোট আণবিক বিদ্যুতের ১০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে। এর ফলে গ্যাসের উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কোন পদ্ধতি খোলা থাকছে না। অথচ শীতকালের শুরুতে ইউরোপের গ্যাস স্টোরেজগুলিতে মাত্র ৬০ শতাংশ গ্যাসের মজুত রয়েছে। এর মাঝে রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানিতে ইউরোপের সাথে চলছে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। জ্বালানি ব্যবসায়ীরা মনে করছেন যে, এশিয়াতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির চাহিদা কম থাকায় ইউরোপ হয়তো এলএনজি দিয়ে নিজেদের জ্বালানির চাহিদা কিছুটা মেটাতে পারবে। তবে এশিয়া থেকে এলএনজির জাহাজগুলি ঘুরিয়ে ইউরোপে নিয়ে আসতে জানিয়ারি মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এছাড়াও ইউরোপের বাতাসের গতি কম থাকার কারণে জার্মানি, ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে থাকবে।

ইউরোপের জ্বালানি সমস্যা এখন একটা ব্যবস্থাগত সমস্যা বলে বলছেন ব্রিটেনের বাণিজ্য এসোসিয়েশনের প্রধান এমা পিঞ্চবেক। 'বিবিসি’র সাথে এক সাক্ষাতে তিনি বলেন যে, যেসব কোম্পানি জ্বালানি সরবরাহ করে অথবা বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে, তাদেরকে সরকারগুলি বলছে যে, তাদের কারখানাগুলি বন্ধ করে দিতে অথবা উৎপাদিত পণ্য যেন পরিবর্তন করে ফেলা হয়। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে জ্বালানির অতিরিক্ত মূল্য এবং এর ফলশ্রুতিতে চাহিদার উপর ভয়ঙ্কর প্রভাব। পিঞ্চবেকের ধারণা যে, সামনের বসন্তে ব্রিটেনে জ্বালানির খরচ ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। মহামারির মাঝে জীবনযাত্রার অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির সাথে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি মারাত্ম পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। পুরো সমস্যাটাকে একটা ব্যবস্থাগত সমস্যা বলে ব্রিটিশ সরকারকে জ্বালানির উপর কর এবং ভ্যাট কর্তনের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করতে বলছেন তিনি।

অপরদিকে মার্কিন চিন্তাবিদেরা অনেকেই ইউরোপের সমস্যাকে রাশিয়া নির্ভরতার ফলাফল হিসেবে চিহ্নিত করছেন। ‘ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজ’এর এসিসট্যান্ট প্রফেসর এমিলি হল্যান্ড ‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন’এর প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক লেখায় বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই চাইছিল যে, ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাস থেকে সরে আসুক। কিন্তু এর পিছনে বড় সমস্যা হলো জ্বালানির ব্যাপারে ইউরোপিয়দের মাঝে মতানৈক্য। ইইউ যেখানে চাইছে যে, কয়লার ব্যবহার শূণ্য করে ফেলতে, সেখানে পোল্যান্ড চাইছে রাশিয়ার উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে কয়লার ব্যবহার বন্ধ করার সময়সীমা বৃদ্ধি করতে। অপরদিকে জার্মানিতে এঙ্গেলা মার্কেলের প্রাক্তন সরকার এবং বর্তমান সোশাল ডেমোক্র্যাট সরকার আণবিক শক্তিকে জলবায়ু বান্ধব শক্তি হিসেবে মনে করছে না। অথচ ফ্রান্স এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি মনে করছে যে, আণবিক শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রীনহাউজ গ্যাসের নির্গমণ কমানো সম্ভব। এক্ষেত্রে মার্কিন আণবিক শক্তি কোম্পানিগুলি ইউরোপে রাশিয়ার কাছে হারানো ব্যবসা পুনরুদ্ধার করার সুযোগ পেতে পারে। এমিলি হল্যান্ড মনে করছেন যে, ইউরোপের মতানৈক্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ হবে ইউক্রেন, মলদোভা এবং দক্ষিণপূর্ব ইউরোপের দেশগুলির সাথে দ্বিপাক্ষিকভাবে কাজ করা; কারণ এই দেশগুলি রুশ হুমকির মাঝে রয়েছে।

প্রায় একই সুরে কথা বলেছেন মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর ফেলো এলেন ওয়াল্ড। তিনি এক লেখায় ইউরোপের জ্বালানির উৎসকে বৈচিত্রপূর্ণ করার উপদেশ দিচ্ছেন। তার কথায় ইউরোপ একইসাথে যেমন চাইছে জলবায়ুকে রক্ষা করতে, ঠিক তেমনি চাইছে অর্থনীতিকে গতিশীল রেখে নিজেদের জীবনমান ঠিক রাখতে। এটা করতে গেলে ইউরোপকে কিছু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হবে; যেমন বায়োফুয়েল হিসেবে পাম অয়েলের ব্যবহার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে। এলেন ওয়াল্ড বলছেন যে, রেইপসীড এবং সয়াবিনের চাইতে পাম থেকে প্রতি হেক্টরে ৭ থেকে ১১ গুণ তেল উৎপাদন হয়। কিন্তু ইউরোপের জলবায়ু পাম অয়েলের জন্যে উপযুক্ত নয়। ইইউ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, পাম অয়েলের আমদানি বন্ধ করে নিজস্ব বায়োফুয়েলের উৎপাদন বৃদ্ধি করবে। অর্থাৎ নিজেদের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে গিয়ে জলবায়ুর জন্যে অপেক্ষাকৃত খারাপ জিনিসটাই ইইউকে বেছে নিতে হচ্ছে।

নিজের সাথেই যুদ্ধরত ইউরোপ। বিশ্লেষকেরা যে সমস্যাগুলি বলছেন, সেগুলি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগত সমস্যা। জনগণের জন্যে অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানিকে অকশনে কেনাবেচার ব্যবস্থাটা যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা ইউরোপের ইতিহাসের সবচাইতে মারাত্মক জ্বালানি সমস্যাই দেখিয়ে দিচ্ছে। এর মাঝে ইউরোপ এখনও কয়লা, গ্যাস এবং আণবিক শক্তির ব্যবহারের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে একমত নয়। কনকনে ঠান্ডার মাঝে ইউরোপের মতানৈন্যকে ভূরাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে চাইছে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র। ইইউ এখন না পারছে জাতীয়তাবাদকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের স্বার্থের দ্বন্দ্বগুলিকে ঘুচতে; না পারছে পূর্ব ইউরোপের সীমান্তের সমস্যাগুলিকে সমাধান করে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে। ব্রেক্সিট, করোনাভাইরাসের অব্যবস্থাপনা, ডানপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের পর নিজেদের অনৈক্য প্রসূত এই জ্বালানি সমস্যা ইইউএর লক্ষ্যগুলিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ইইউ কি সমস্যার সমাধান করার জন্যে তৈরি হয়েছিল; নাকি নতুন সমস্যার জন্ম দেয়ার জন্যে?

Friday, 17 December 2021

নতুন জার্মান পররাষ্ট্রনীতি… কতটা বাস্তবসম্মত?

১৭ই ডিসেম্বর ২০২১

পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে যৌথ সংবাদ সন্মেলন করছেন নতুন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক এবং পোলিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিবিগনিউ রাউ। ইইউএর মাঝে পোল্যান্ডের অবস্থান শক্তিশালী ইইউএর বিরুদ্ধে। কারণ শক্তিশালী ইইউএর মাঝে পোল্যান্ড শক্তিশালী জার্মানিকে দেখতে পাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ইউরোপের লিবারাল আদর্শের দেশগুলির মাঝে এখনও অবিশ্বাস বিদ্যমান। ইইউএর ভঙ্গুর এই পরিস্থিতিতে নতুন জার্মান কোয়ালিশন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সফলতা কতটুকু হতে পারে, তা নিয়ে কেউই নিশ্চিত নয়।

 
জার্মানির নতুন কোয়ালিশন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক বিভিন্ন ইউরোপিয় দেশ ভ্রমণ করা শুরু করেছেন। ‘গ্রীন পার্টি’র নেতা হিসেবে ভ্রমণের শুরুতেই তিনি বলেন যে, জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলাকে তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে প্রাধান্য দেবেন। কারণ ভবিষ্যতের কোন সমস্যাই মানবজাতির জন্যে জলবায়ু সমস্যার চাইতে বড় নয়। এর আগের সকল জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো তিনিও প্যারিস দিয়ে তার যাত্রা শুরু করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, ফ্রান্সের চাইতে কাছের বন্ধু নেই জার্মানির। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছেন যে, প্যারিস এবং ব্রাসেলসে ইইউ এবং ন্যাটোর হেডকোয়ার্টার্স সফরে তিনি বেলারুশ এবং ইউক্রেনের ব্যাপারে ইউরোপের নীতির একাত্মতা নিয়ে কথা বলেন। প্যারিস সফরে তিনি চীনা মহিলা টেনিস খেলোয়াড় পেং শুইএর ইস্যুতে একাত্মতা ছাড়াও বেইজিংএ শীতকালীন অলিম্পিক কূটনৈতিকভাবে বর্জনের বিষয়ে আলোচনা করেন। বেয়ারবক পরিষ্কারভাবেই উল্লেখ করেন যে, ইউরোপ যেসকল আদর্শিক স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলিকে ভেঙ্গে যেতে দিতে পারে না; বিশেষ করে আইনের শাসন এবং মানবাধিকার।

তবে বেয়ারবকের পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ সফর অতটা মধুর ছিলনা। বেয়ারবক পোল্যান্ডের বার্তা সংস্থা ‘টিভিপি’কে বলেন যে, দুই দেশের সম্পর্কের মাঝে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে পোল্যান্ডে জার্মানির কর্মকান্ডের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা, দায়িত্ব নেয়া এবং ক্ষতিপূরণের ব্যাপারগুলি রয়েছে। দুই দেশের মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে তোলাকে তিনি ঐতিহাসিক কাজ বলে আখ্যা দেন। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিবিগনিউ রাউ বলেন যে, পোল্যান্ডের জনগণের চিন্তায় সুবিচারের ব্যাপারটা প্রোথিত হতে হলে অনেকগুলি ইস্যুর সমাধান প্রয়োজন। তিনি বলেন যে, পোল্যান্ড নতুন সরকারের কাছ থেকে দায়িত্ব স্বীকার এবং ক্ষতিপূরণ চায়। পোলিশ মিডিয়া ‘এনএফপি’ বলছে যে, ওয়ারশ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে বার্লিনের কাছ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতিপূরণ চাইলেও এর আগের এঙ্গেলা মার্কেলের সরকার এর কোন আইনী ভিত্তি নেই বলে প্রত্যাখ্যান করে। এছাড়াও পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত পোল্যান্ডের আইনকে ইইউএর আইনের উপরে স্থান দেয়ার পর থেকে ইইউএর সাথে পোল্যান্ডের যে টানাপোড়েন চলছে, সেব্যাপারেও বেয়ারবক আলোচনা করেন। তবে তিনি ওয়ারশ সফরে সাংবাদিকদের এব্যাপারে কিছু বলতে রাজি হননি। অপরদিকে পোলিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাউ রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প বাতিল করে দেয়ার দাবি জানান। ‘এনএফপি’ বলছে যে, পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন দলের চেয়ারম্যান ইয়ারোস্লাভ কাচিনস্কি ইইউএর আরও শক্তিশালীকরণকে জার্মানির আরও শক্তিশালী হওয়া হিসেবে দেখছেন। তিনি ৫ই ডিসেম্বর ইউরোপের ডানপন্থী নেতা ফ্রান্সের মারিন লা পেন এবং হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানকে নিয়ে বৈঠক করেন।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর সাথে এক সাক্ষাতে জার্মান ‘সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি’ বা ‘এসপিডি’র পররাষ্ট্রনীতির মুখপাত্র নিলস শ্মিড বলেন যে, ‘এসডিপি’, ‘গ্রীন পার্টি’ এবং ‘ফ্রি ডেমোক্র্যাটস’ বা ‘এফডিপি’এর নতুন কোয়ালিশন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি আগের নীতিকেই এগিয়ে নেবে; বড় রকমের পরিবর্তনের আশংকা নেই। ইউরোপ এবং আন্তআটলান্টিক নীতির ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য রয়েছে। নতুন ক্ষেত্র হিসেবে তিনি ইন্টারনেট কোম্পানিগুলিকে শৃংখলার মাঝে আনা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ‘ফাইভ জি’ এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো নতুন প্রযুক্তিকে নিয়মের অধীনে আনতে, এমনকি মহামারি নিয়ন্ত্রণে এবং নতুন ঔষধ ডেভেলপ করতে তিনি ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার উপর গুরুত্ব দেন। তবে তিনি বলেন যে, সবচাইতে বড় পরিবর্তনটা আসতে পারে চীন নীতির ক্ষেত্রে। এর মূল কারণ হলো চীন ইউরোপের জন্যে যেমন হুমকি, তেমনি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা ছাড়াও পুরো বিশ্বব্যবস্থাকেই সমস্যায় ফেলে দিয়েছে।

জার্মান থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জার্মান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’ বা ‘ডিজিএপি’র প্রধান নির্বাহী ক্যাথরিন ক্লুভার এশব্রুক এক লেখায় বলছেন যে, নতুন জার্মান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এঙ্গেলা মার্কেলের সুযোগসন্ধানী এবং মার্কেন্টিলিস্ট পররাষ্ট্রনীতি থেকে অনেক আলাদা হতে চলেছে। তিনি বলছেন যে, জার্মান সরকার যুক্তরাষ্ট্র এবং সমমনা দেশগুলিকে একত্রিত করে চীনের উপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে, যাতে তারা অর্থনৈতিক ভ্যালু চেইনগুলিকে ঠিক রেখেই মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনগুলিকে রক্ষা করতে পারে। তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইউরোপের নিয়মকানুন এবং স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করার ক্ষমতার উপর জোর দেবে; যেমন প্রযুক্তি, সাইবারস্পেস এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে। তবে সেটা সম্ভব হবে যদি জার্মানি নিজেদের ডিজিটাল এবং ডাটা সক্ষমতাকে দ্রুত উন্নত করতে সক্ষম হয়। আর জলবায়ুভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব পেতে গেলে জার্মানিকে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু লক্ষ্য ঠিক এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে তিন দলের কোয়ালিশনের মাঝে পার্থক্যগুলি লক্ষ্যনীয় এবং কিছু ক্ষেত্রে নীতি পরিষ্কার নয়; যেমন রাশিয়া এবং তুরস্কের ক্ষেত্রে নীতির স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে; প্রতিরক্ষানীতিও একেবারেই উচ্চাভিলাসী নয়। জিডিপির ৩ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করার কথা বলা হয়েছে; তবে কোন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই বাজেট ব্যবহৃত হবে, তা নিশ্চিত করে বলা হয়নি। আগামী বছর জার্মানি প্রথমবারের মতো তার জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করতে যাচ্ছে; যেখানে সরকার হয়তো বাধ্য হবে জার্মানির নিজস্ব স্বার্থগুলিকে উল্লেখ করতে। এর মাধ্যমে জার্মানি হয়তো অবশেষে একটা ‘স্বাভাবিক’ পররাষ্ট্রনীতির খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে।

ব্রাসেলসের ‘সেন্টার ফর রাশিয়া ইউরোপ এশিয়া স্টাডিজ’এর প্রতিষ্ঠাতা থেরেসা ফ্যালন সন্দেহ প্রকাশ করছেন যে, জার্মানি তার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সহযোগী চীনের ব্যাপারে যে আদর্শিক নীতিতে যেতে চলেছে, সেটা খুব সহজে বাস্তবায়নযোগ্য। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, এঙ্গেলা মার্কেলের সরকারও ক্ষমতা নেয়ার শুরুতে আদর্শিক কথা বলে তিব্বতের দালাই লামার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল; পরে বাস্তবতা মেনে নিয়ে চীনের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে নেয়ার নীতিতে এগিয়েছে। বিশ্লেষকেরা জার্মানির নতুন কোয়ালিশন সরকারের চীন নীতি নিয়ে আলোচনা করলেও জার্মানির সীমানাতেই যে বড় সমস্যা রয়েছে, তা নিয়ে খুব একটা কথা বলছেন না। ইইউএর মাঝে পোল্যান্ডের অবস্থান শক্তিশালী ইইউএর বিরুদ্ধে। কারণ শক্তিশালী ইইউএর মাঝে পোল্যান্ড শক্তিশালী জার্মানিকে দেখতে পাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ইউরোপের লিবারাল আদর্শের দেশগুলির মাঝে এখনও অবিশ্বাস বিদ্যমান। ইইউএর ভঙ্গুর এই পরিস্থিতিতে নতুন জার্মান কোয়ালিশন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সফলতা কতটুকু হতে পারে, তা নিয়ে কেউই নিশ্চিত নয়।