Showing posts with label Brexit. Show all posts
Showing posts with label Brexit. Show all posts

Saturday, 22 October 2022

ব্রিটিশ রাজনীতি সংকটের মাঝে কেন?

২২শে অক্টোবর ২০২২
 
ব্রিটেনের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমা আদর্শকে ফেরি করা ব্রিটেনের রাজনৈতিক সংকটের কারণগুলির মাঝে রয়েছে রাজনৈতিক মেরুকরণ, জনপ্রিয়তা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, সমস্যাবহুল রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং যোগ্য নেতৃত্বের অভাব। এই সমস্যাগুলির কারণে অনেকেই দলীয় এবং ব্যক্তিস্বার্থকে রাষ্ট্রের আগে স্থান দিচ্ছে।

রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর খবরটাও এখন অনেক পুরোনো বলে মনে হচ্ছে। ক্ষমতা নেয়ার মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের পদত্যাগের পর অনেকেই ব্রিটিশ রাজনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন করছেন। মাত্র ছয় বছরের মাঝে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী; এবং ২০১৬ সালে ব্রেক্সিটের পর থেকে লিজ ট্রাস হলেন পদত্যাগ করা চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতায় যাবার সময় ট্রাস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি বাজেট না কমিয়েই কর্পোরেট এবং ধনীদের উপর থেকে কর কমাবেন। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি সংকটের মাঝে ট্রাসের নীতিগুলি ব্রিটেনের আর্থিক বাজারে ধ্বসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের মূল্য ইতিহাসের সর্বনিম্ন হয়ে যায় এবং ব্রিটিশ সরকারের ঋণ নেবার সক্ষমতাও কমে যায়। ফলশ্রুতিতে ট্রাস তার দলের সদস্যদের আস্থা হারিয়ে ফেলেন। ‘ব্লুমবার্গ’এর প্রধান বার্তা সম্পাদক জন মিকলেথওয়েইট এক আলোচনায় বলছেন যে, ট্রাস নিজেই খেলা শুরু করে কিছুক্ষণ পরেই নিজ গোলপোস্টে বল ঢুকিয়ে আত্মঘাতী গোল করেন; যেটার কোন প্রয়োজনই ছিল না। তবে ব্রিটেনে যা ঘটে, তা বাকি দুনিয়াতে প্রতিফলিত হবার একটা ইতিহাস রয়েছে।

‘এনবিসি’ ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে যে, ট্রাস কর্পোরেট কর কমাবার মাধ্যমে ব্রিটেনে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং কর্মসংস্থান তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আর্থিক বাজারের প্রশ্ন - ব্রিটিশ সরকার তার ঋণগুলিকে কিভাবে পরিশোধ করবে? ট্রাস তার অর্থমন্ত্রী কোয়ার্টেংকে পদচ্যুত করে জেরেমি হান্টকে তার স্থলাভিষিক্ত করলে হান্ট নীতিকে উল্টে দেন। এরপর এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ট্রাস ক্ষমাও প্রার্থনা করেন। এছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুয়েলা ব্রেভারম্যান পদত্যাগ করার পরে ট্রাস তার সমালোচক গ্র্যান্ট শ্যাপসকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করেন; যা প্রমাণ করে যে, ট্রাসের কর্তৃত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।

লন্ডনের ‘কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর টিম বেইল ‘এনপিআর’কে বলছেন যে, ট্রাস এবং তার আগের বরিস জনসনের ব্যর্থতার মূলে রয়েছে তাদের অবাস্তব প্রতিশ্রুতি। জনসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলন যে, তিনি অর্থনৈতিক দুর্দশা ছাড়াই ব্রেক্সিটের বাস্তবায়ন করবেন। অপরদিকে ট্রাস বাজেটের অর্থায়ন নিশ্চিত না করেই কর কর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। লন্ডনের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চেঞ্জিং ইউরোপ’এর ডিরেক্টর আনান্দ মেনন ‘এনবিসি’কে বলছেন যে, কনজারভেটিভ পার্টি এবং বাস্তবতা পরস্পরের বন্ধু নয়।

‘লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস’এর প্রফেসর প্যাট্রিক ডানলীভি ‘এনপিআর’কে বলছেন যে, ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থারও সমস্যা রয়েছে। যেমন প্রধানমন্ত্রী কোন জবাবদিহিতা ছাড়াই যে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করতে পারেন। যেমন প্রায় অপরিচিত কোয়াসি কোয়ার্টেংকে ট্রাস অর্থমন্ত্রী নিয়োগ দেন। এছাড়াও কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচিত করেন পার্টির নেতারা, পার্লামেন্ট সদস্যরা নয়। একারণে তাদের নির্বাচিত নেতারা সাধারণতঃ শ্বেতাঙ্গ, বয়সে প্রবীণ এবং সাধারণের চাইতে বেশি রক্ষণশীল হয়।

২০১৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জেমস ক্যামেরন কনজারভেটিভ পার্টির মাঝে দ্বন্দ্ব নিরসনে ইইউ থেকে বের হয়ে যাবার জন্যে গণভোটের আয়োজন করেন। এর ফলে পুরো রাষ্ট্রে মেরুকরণ শুরু হয়ে যায়। তখন অনেকেই বলেছিলেন যে, ব্রেক্সিটের কারণে ব্রিটেন অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমস্যায় পড়বে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ব্রেক্সিটের ব্যাপারে যথেষ্ট সোচ্চার থাকলেও এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কনজারভেটিভ পার্টির প্রকৃতপক্ষে ব্রেক্সিটের ব্যাপারে কোন পরিকল্পনাই ছিল না। কয়েক দশক ধরে বাণিজ্যের জন্যে ইউরোপের উপর ব্রিটেনের নির্ভরশীলতা একদিনে মুছে ফেলা সম্ভব ছিল না।

ক্যামেরনের পদত্যাগের পর থেরেসা মে আগাম নির্বাচন ডাকেন, যার মাধ্যমে তার দল পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ হারায়। পার্লামেন্টে কনজারভেটিভ পার্টির কট্টরপন্থী সদস্যদের প্রতিরোধে ব্রেক্সিটের সুরাহা করতে না পেরে থেরেসা মে পদত্যাগ করেন। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ২০১৯ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টিকে বড় বিজয় এনে দেন এবং প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ব্রেক্সিট সম্পন্ন করেন। কিন্তু করোনাভাইরাস বাধা হয়ে দাঁড়ায় জনসনের সামনে। তার সরকারের বিরুদ্ধে মহামারি নিয়ন্ত্রণে ভুল নীতি প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। ‘এনপিআর’ বলছে যে, জনসনকে ডুবিয়ে দেয় তার মিথ্যা কথার ঝুড়ি। গোটা ব্রিটেনের মানুষকে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে গণজমায়েত এড়িয়ে চলতে বলা হলেও জনসন তার লোকজন নিয়ে একাধিক পার্টির আয়োজন করেছিলেন।

ব্রিটেনের রাজনৈতিক কলহ তাদের প্রধান আন্তর্জাতিক মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের উপরেও প্রভাব ফেলতে পারে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এই ঘটনাগুলি ব্রিটেনের জন্যে যেমন লজ্জাজনক, গণতন্ত্রের জন্যেও তেমনি। ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেশটাকে তার আন্তর্জাতিক বন্ধুদের কাছে অগুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে। তারা কেউ কেউ বলছেন যে, সামনের দিনগুলিতে ব্রিটেনে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থান হতে পারে; যা ব্রিটেনের মাঝে বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি তুলতে পারে।

২৮শে অক্টোবর কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত লিজ ট্রাস প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। পার্টির নেতারাই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করবে; জনগণের ভোট নয়। এর আগে থেরেসা মেএর মতো লিজ ট্রাসকেও নির্বাচন জিতে প্রধানমন্ত্রী হতে হয়নি। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২৫ সালের জানুয়ারির আগে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন ডাকতে বাধ্য নন। তবে বিরোধী দলগুলি এর আগেই নির্বাচন চাইছে। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক এগিয়ে রয়েছেন। তার পিছনে রয়েছেন আরেক মন্ত্রী পেনি মরডন্ট। তবে আটজন কনজারভেটিভ এমপি বিবৃতি দিয়ে বলেছেন যে, তারা বরিস জনসনকেই আবার প্রধানমন্ত্রী দেখতে চান; যদিও দলের অনেকেই এর বিপক্ষে।

ব্রিটেনের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমা আদর্শকে ফেরি করা ব্রিটেনের রাজনৈতিক কলহ নিয়ে যখন বিশ্বব্যাপী সমালোচনা হচ্ছে, তখন কনসালট্যান্সি কোম্পানি ‘এরগো’র বিশ্লেষক এড প্রাইস ‘ব্লুমবার্গ’কে বলছেন যে, ব্রিটেনের গণতন্ত্র কাজ করছে বলেই অযোগ্য লোকটা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, লিজ ট্রাসের ক্ষমতাচ্যুত হবার পিছনে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বাজার অর্থনীতি। অপরদিকে ‘ব্লুমবার্গ’এর কলামিস্ট জন অথার্স মনে করছেন যে, ব্রিটেনের রাজনৈতিক সংকটের কারণে অর্থনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হবে। আর সরকারকেও নতুন করে তৈরি করা সমস্যা নিরসণে আরও ঋণ করতে হবে। ‘এনপিআর’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটেনের রাজনৈতিক সংকট যথেষ্ট গভীর; যার কারণগুলির মাঝে রয়েছে রাজনৈতিক মেরুকরণ, জনপ্রিয়তা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, সমস্যাবহুল রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং যোগ্য নেতৃত্বের অভাব। এই সমস্যাগুলির কারণে অনেকেই দলীয় এবং ব্যক্তিস্বার্থকে রাষ্ট্রের আগে স্থান দিচ্ছে।

Saturday, 27 August 2022

ব্রিটেনের অর্থনীতিতে ধ্বস আসন্ন?

২৭শে অগাস্ট ২০২২
 
ফেব্রুয়ারি ২০২২। লন্ডনে জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাবার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্রিটিশ নাগরিকদের অর্থনৈতিক অবস্থা হয়েছে শোচনীয়। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ নামের ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাংক্ষা বাস্তবায়নে ব্রিটেন যেভাবে ব্রেক্সিটের দিকে এগিয়েছে, করোনার দুর্যোগের পর বৈশ্বিক জ্বালানি সমস্যার কারণে সেই চিন্তাগুলি খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে যাচ্ছে।


ব্রিটেনের ‘অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস’এর এক হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মাঝে দেশটার অর্থনীতি শূণ্য দশমিক ১ সঙ্কুচিত হয়েছে। অথচ এবছরের প্রথম তিন মাসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল শূণ্য দশমিক ৮ শতাংশ। বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে ‘বিবিসি’ বলছে যে, সামনের দিনগুলিতে অর্থনীতিতে ধ্বস নামার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে করোনার প্রণোদনা শেষ হয়ে যাবার সাথে সাথে খুচরা বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়া দায়ী। ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড’এর পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে যে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে ২০২২ সাল শেষ হবার আগেই ব্রিটেনের অর্থনীতি মন্দার মাঝে পড়তে যাচ্ছে। টানা ছয় মাস অর্থনীতির নিম্নগতিকেই অর্থনৈতিক মন্দা হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটেনের বার ও রেস্তোঁরার মালিকরা বলছেন যে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে তাদের এখনই মন্দার অনুভূতি হচ্ছে। মানুষ বাড়ি থেকে কম বের হচ্ছে; জীবনযাত্রার খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এছাড়াও পোলট্রি থেকে শুরু করে ভোজ্যতেল, সকল কিছুরই মূল্য বেড়ে গেছে; উল্টোদিকে তাদের ক্রেতারা খরচ কমাতে চাইছে। এমতাবস্থায় ব্যবসাগুলি এখন কোনমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটেনে জ্বালানির মূল্য এতটাই বেড়েছে যে, নাগরিকেরা তাদের খরচের হিসেব রাখতে হিমসিম খাচ্ছেন। তাদের জ্বালানির মিটারের ব্যালান্স দেখতে দেখতেই শূণ্যের কোঠায় চলে যাচ্ছে। রান্না করার মাঝেই কারো কারো জ্বালানি চলে যাচ্ছে। আর যারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিয়ে বেঁচে আছে, তাদের হাতে এখন বিদ্যুতের বিল পরিশোধের পর বাড়িভাড়া দেয়ার অর্থও থাকছে না। ২৬শে অগাস্ট ব্রিটেনের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বলে যে, নাগরিকদের বাৎসরিক জ্বালানি খরচ ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। অথচ গত এপ্রিল মাসেই জ্বালানি খরচ বেড়েছে ৫৪ শতাংশ! এর ফলশ্রুতিতে গড়পড়তা একেকটা বাড়ির জ্বালানি খরচ ২ হাজার ৩’শ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ২’শ ডলার হতে চলেছে। সর্বশেষ এই মূল্যবৃদ্ধি অক্টোবরের প্রথম দিন থেকে কার্যকর হতে চলেছে। আর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে এই খরচ আরও বেড়ে ৪ হাজার ৭’শ ডলার অতিক্রম করবে! ‘জি-৭’ বা বিশ্বের সবচাইতে ধনী ৭টা দেশের গ্রুপের মাঝে ব্রিটেনের মূল্যস্ফীতি সবচাইতে বেশি। আর ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সমন্বয় করে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কয়েক মাস ধরেই দেশজুড়ে রেল শ্রমিক, ডাকবিভাগের শ্রমিক, বন্দরের শ্রমিক, আইনজীবী, এমনকি পরিচ্ছন্ন কর্মীরাও ধর্মঘটে নেমেছে। জুলাই মাসে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্রিটেনের মূল্যস্ফীতি গিয়ে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ১ শতাংশে; যা কিনা ৪০ বছরের মাঝে সর্বোচ্চ!

‘এসএন্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স’ এবং ‘সিবিআই’এর যৌথ এক গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, জুলাই থেকে অগাস্ট মাসের মাঝে ব্রিটেনের ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর যতটা দ্রুত উৎপাদন হারিয়েছে, তা ২০০৯ সালের পর থেকে দেখা যায়নি। ‘এসএন্ডপি’এর এসোসিয়েট ডিরেক্টর ‘দ্যা গার্ডিয়ান’কে বলছেন যে, ২০২০ সালের মে মাসে করোনার লকডাউনের পর থেকে উৎপাদন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অগাস্ট মাসে ব্রিটেনের বেসরকারি খাত অর্থনৈতিক স্থবিরতার আরও কাছাকাছি গিয়েছে। দেশটার সেবা খাত সামান্য ভালো করায় পুরো অর্থনীতি এখনও ধ্বসে যায়নি। ‘সিবিআই’এর অর্থনীতিবিদ আলপেশ পালেহা বলছেন যে, কারখানাগুলি যখন কাঁচামালের উচ্চমূল্য, সরবরাহ পেতে দেরি হওয়া ইত্যাদি সমস্যার মাঝে রয়েছে, তখন অর্থনৈতিক মন্দা হাজির হয়েছে; কাজেই বছরের বাকি মাসগুলিতে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক হবে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি এখন ব্যাংকের উচ্চ সুদের মাঝেও পড়তে হচ্ছে কারখানাগুলিকে। সুদের হার বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালের বসন্তে ৪ শতাংশ হবার পূর্বাভাস দিচ্ছে কেউ কেউ।

ব্রিটিশ এনজিও ‘ক্রিশ্চিয়ান্স এগেইনস্ট পভার্টি’র জন টেইলর ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, যে মানুষগুলি কখনোই ঋণদায়গ্রস্ত ছিল না, এখন তারা ঋণের মাঝে পড়ে যাচ্ছে। অনেকেই তাদের কাছের মানুষকে হারিয়েছে; মানসিক বিপর্যয়ের মাঝে রয়েছে; তারা জানে না যে কিভাবে তারা তাদের পরবর্তী বিল পরিশোধ করবে, অথবা কিভাবে তারা বেঁচে থাকার জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য ক্রয় করতে পারবে। ‘জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশন’এর গত মে মাসের গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, ১০ লক্ষ ব্রিটিশ পরিবার জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে নতুন করে অতিরিক্ত ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। ফাউন্ডেশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ রেবেকা ম্যাকডোনাল্ড বলছেন যে, এরকম দারিদ্র্য পরিস্থিতি তারা গত কয়েক দশকে দেখেননি। ব্রিটিশ সরকার বলছে যে, তারা আসছে শীতে সকল পরিবারকে ৪’শ ৭০ ডলার করে দেবে; কিন্তু অনেকেই বলছেন যে, এটা অন্ততঃ এর দ্বিগুণ পরিমাণ হওয়া উচিৎ।

‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ বলছে যে, কয়েক শতকের জনসংখ্যা বৃদ্ধির পর এখন জন্মহার কমে যাওয়ায় ব্রিটেনের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলিতে করদাতার সংখ্যাও কমতে যাচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে নতুন সমস্যাগুলি। জ্বালানি কোম্পানি ‘ইডিএফ’এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফিলিপ কোমারেট ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, ব্রিটিশ সরকার যদি জনগণকে জ্বালানি খরচ পোষাতে আরও সহায়তা না দেয়, তাহলে ব্রিটেনের অর্ধেক মানুষ শীতকালে ‘জ্বালানি দারিদ্র্য’র মাঝে পড়বে। এর অর্থ হলো, জ্বালানির খরচ পরিবারের ব্যয়ের ১০ শতাংশের বেশি হয়ে যাবে। নতুন হিসেব বলছে যে, করোনার লকডাউনের কারণে ২০২০ সালে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে ৩’শ বছরের মাঝে সবচাইতে বড় ধ্বস নেমেছিল। এখন ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ৪০ বছরের মাঝে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পদত্যাগের পর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ নামের ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাংক্ষা বাস্তবায়নে ব্রিটেন যেভাবে ব্রেক্সিটের দিকে এগিয়েছে, করোনার দুর্যোগের পর বৈশ্বিক জ্বালানি সমস্যার কারণে সেই চিন্তাগুলি খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে নিতে বিপুল সামরিক সহায়তা দিচ্ছে ব্রিটেন। তবে আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ২০২৩ সালে আফ্রিকায় আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দোপ্যাসিফিকে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, উত্তর ও পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তায় নেতৃত্ব দেয়া, ইত্যাদির মতো ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর ভূরাজনৈতিক চিন্তাগুলি বাস্তবায়নের উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সেটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

Saturday, 28 May 2022

উত্তর আয়ারল্যান্ডের নির্বাচন – ব্রিটেনের ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি চ্যালেঞ্জ?

২৯শে মে ২০২২

 
উত্তর আয়ারল্যান্ডের দেয়ালে জাতীয়তাবাদী গ্রাফিতির পাশে নির্বাচনী পোস্টার। পশ্চিমা দেশগুলিতে জাতীয়তাবাদের জোয়ারে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভোট যদি স্কটল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে অনুপ্রাণিত করে, তবে সেটাই ব্রিটেনের জন্যে বেশি দুশ্চিন্তার হবে। বিশেষ করে করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মাঝে নিজেদের অর্থনৈতিক দৈন্যদশাই যখন বেশিরভাগ মানুষের সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন ব্রিটেনের অখন্ডতা প্রশ্নাতীত থাকছে না।


ছোট্ট দেশ উত্তর আয়ারল্যান্ডের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়াতে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে। ১৯২১ সালের মে মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সরকারের আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ব্রিটেনের অংশ হিসেবে উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্ম দেয়া হয়েছিল। সেই সময় থেকে ১’শ ১ বছর পর প্রথমবারের মতো দেশটার পার্লামেন্টে আইরিশ জাতীয়তাবাদীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এতদিন পর্যন্ত সকল নির্বাচনেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ‘ইউনিয়নিস্ট’ দলগুলি; যাদের মূল চিন্তা হলো ব্রিটেনের সাথে যুক্ত থাকা। বহু বছর ধরে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রামে লিপ্ত থাকা ‘আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি’র রাজনৈতিক মুখপাত্র ‘সিন ফেইন’ ২৯ শতাংশ ভোট পেয়ে সর্বোচ্চ ২৭টা আসন পেয়েছে। মাত্র ১৯ লক্ষ জনসংখ্যার এই দেশের নির্বাচন ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ একদিকে উত্তর আয়ারল্যান্ড যেমন ব্রিটেনের একটা অংশ, অপরদিকে আইরিশ জাতীয়তাবাদীরা বহুদিন থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডকে ব্রিটেন থেকে আলাদা করে রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের সাথে একত্রীকরণের পক্ষপাতি। অর্থাৎ উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজনীতি ব্রিটেনের ভৌগোলিক অখন্ডতার সাথে সম্পর্কিত।

নির্বাচনে ২১ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ‘ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি’ বা ‘ডিইউপি’; যারা পেয়েছে ২৫টা আসন। ‘আলস্টার ইউনিয়নিস্ট পার্টি’ বা ‘ইউইউপি’ পেয়েছে ৯টা আসন। বাকিরা পেয়েছে ২৯টা আসন। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্ষমতা ভাগাভাগির ফর্মূলা অনুযায়ী দেশটার সরকারের শীর্ষ নেতা ‘ফার্স্ট মিনিস্টার’ এবং ‘ডেপুটি ফার্স্ট মিনিস্টার’ আসবে জাতীয়তাবাদী এবং সবচাইতে বড় ‘ইউনিয়নিস্ট’ দল থেকে। বাকি মন্ত্রীরা আসবে নির্বাচনে বেশি আসন পাওয়া দলগুলি থেকে। শীর্ষ দু’টা পদের নাম আলাদা হলেও এদের কাজ একই; এবং এদের একজন পদত্যাগ করলে আরেকজন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। কাজেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদী ‘সিন ফেইন’ দলের কাউকে যদি সরকার প্রধান হতে হয়, তাহলে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইউনিয়নিস্ট দলের কাউকে ‘ডেপুটি’র পদটা মেনে নিতে হবে। কিন্তু দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ‘ডিইউপি’ দলের প্রধান জেফরি ডোনাল্ডসন বলে দিয়েছেন যে, ব্রেক্সিটের পর থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্য যেভাবে চলছে, সেটা তার দলের মনপূতঃ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ‘ডেপুটি’র পদ সমর্থন করবেন না। ‘নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড প্রোটোকল’ নামের পরিচিত এই বাণিজ্য ব্যবস্থা ‘ডিইউপি’ সমর্থন করে না।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই প্রোটকলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেই ‘ডিইউপি’র সদস্য পল গিভান ‘ফার্স্ট মিনিস্টার’এর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। ইউনিয়নিস্টরা মনে করে যে, এই প্রটোকলের মাধ্যমে উত্তর আয়াল্যান্ডকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে এবং এতে ব্রিটেনের অংশ হিসেবে উত্তর আয়ারল্যান্ডের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে। ‘ডিইউপি’ যদি ‘ডেপুটি’ পদে লোক না দেয়, তাহলে এই সমস্যা ৬ মাস পর্যন্ত চলতে পারে। বিরোধ তখনও চলতে থাকলে নির্বাচন দিতে হতে পারে; অথবা ব্রিটিশ সরকারের উত্তর আয়ারল্যান্ড সচিবকে নতুন কোন পদ্ধতি বের করতে হবে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাথে ব্রিটেনের বাকি অংশের বাণিজ্য যে নীতিতে চলছে, তার মাঝে কিছু আইন ব্রিটেন একতরফাভাবে বাতিল করতে পারে বলে জানিয়েছে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এর মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার অনেক বড় ঝুঁকি নিতে চলেছে; কারণ এর মাধ্যমে ব্রিটেন আবারও ইইউএর সাথে দ্বন্দ্বে জড়াতে পারে।

১৯৯৮ সালের ‘গুড ফ্রাইডে এগ্রিমেন্ট’এর মাধ্যমে উত্তর আয়ারল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ শেষ হয় এবং ‘আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি’র সদস্যরা অস্ত্র ফেলে পার্লামেন্টে এসে বসে। তবে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় জাতীয়তাবাদীরা কখনোই দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক পদটা পায়নি। দেশটার রাজনৈতিক বিভেদের মাঝে জাতিগত এবং ধর্মীয় ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্যাথোলিক খ্রিস্টানদের বেশিরভাগই নিজেদেরকে আইরিশ বলে আখ্যা দেয়; অপরদিকে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানদের বেশিরভাগই নিজেদেরকে ব্রিটিশ বলে আখ্যা দেয়। এখানে উল্লেখ্য যে, স্বাধীন দেশ রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড ব্রিটেনের অংশ নয়; এবং সেখানে বেশিরভাগ জনগণই হলো ক্যাথোলিক খ্রিস্টান। ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটেনের প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানরা উত্তর আয়ারল্যান্ডে উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে সেখানে ব্রিটেনের শাসনকে মজবুত করেছে। বর্তমানে দেশটার প্রোটেস্ট্যান্ট জনগণ সেই বসতি স্থাপনকারীদেরই বংশধর।

 
ব্রেক্সিটের ভোটে ব্রিটেনের একেক অংশের ফলাফল ছিল একেক রকম। ইইউ থেকে বের হয়ে যাবার ব্যাপারে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসএর জনগণ যতটা উৎসুক ছিল, স্কটিশ এবং আইরিশরা ততটা ছিল না। এখন ব্রেক্সিটের পর তারা মনে করছে যে, ব্রিটেনের সাথে একত্রে থাকাটা তাদের জন্যে কোন অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনছে না।

‘সিন ফেইন’ বলছে যে, তারা আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণের ব্যাপারে বদ্ধ পরিকর। দলটার নেতা লু ম্যাকডোনাল্ড বলছেন যে, পাঁচ বছরের মাঝে তারা আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণের জন্যে গণভোটের ডাক দেবেন। অপরদিকে ইউনিয়নিস্টরা বলছে যে, সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলিতে জাতীয়তাবাদীরা কম ভোট পেয়েছে; তাই গণভোটের প্রশ্নই আসে না। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২৮শে মে প্রায় ১০ হাজার ইউনিয়নিস্ট উত্তর আয়ারল্যান্ডের শতবর্ষ উদযাপন করে। অনুষ্ঠানে ‘অরেঞ্জ অর্ডার’এর গ্র্যান্ড মাস্টার এডওয়ার্ড স্টিভেনসন ঘোষণা দেন যে, উত্তর আয়ারল্যান্ড সবসময় ব্রিটেনের অংশই থাকবে।

ব্রেক্সিটের মাধ্যমে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাকে এগিয়ে নেবার যে স্বপ্ন ব্রিটেন দেখেছে, সেখানে একটা শক্ত কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে জাতীয়তাবাদ। কারণ উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিচ্ছন্নতাবাদীরা এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও স্কটল্যান্ড কিন্তু ২০১৪ সালে ব্রিটেন থেকে আলাদা হবার জন্যে গণভোটের আয়োজন করেছে; যেখানে ৪৫ শতাংশ জনগণ স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ব্রেক্সিটের পক্ষে বিপক্ষে ভোটই বলে দিয়েছে যে, স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড বাকি ব্রিটেনের থেকে ভিন্নভাবে চিন্তা করছে। অর্থাৎ ইইউ থেকে বের হয়ে যাবার ব্যাপারে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসএর জনগণ যতটা উৎসুক ছিল, স্কটিশ এবং আইরিশরা ততটা ছিল না। এখন ব্রেক্সিটের পর তারা মনে করছে যে, ব্রিটেনের সাথে একত্রে থাকাটা তাদের জন্যে কোন অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনছে না।

ব্রিটেনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে ইউরোপের মূল ভূখন্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি গত কয়েক’শ বছরে বিভিন্ন সময়ে আইরিশ ক্যাথোলিকদেরকে ব্যবহার করতে চেয়েছে। সেই হিসেবে আয়ারল্যান্ড সর্বদাই ব্রিটেনের অস্তিত্বের প্রতি একটা হমকি হয়ে কাজ করেছে। আইরিশ দ্বীপে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্যেই ব্রিটেন উত্তর আয়ারল্যান্ডে প্রোটেস্ট্যান্ট উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। একুশ শতকেও সেই ইতিহাসই বয়ে বেড়াচ্ছে উত্তর আয়ারল্যান্ড। তবে পশ্চিমা দেশগুলিতে জাতীয়তাবাদের জোয়ারে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভোট যদি স্কটল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে অনুপ্রাণিত করে, তবে সেটাই ব্রিটেনের জন্যে বেশি দুশ্চিন্তার হবে। বিশেষ করে করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মাঝে নিজেদের অর্থনৈতিক দৈন্যদশাই যখন বেশিরভাগ মানুষের সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন ব্রিটেনের অখন্ডতা প্রশ্নাতীত থাকছে না।

Saturday, 1 February 2020

ব্রেক্সিট-পরবর্তী ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর ভবিষ্যৎ কি?

১লা ফেব্রুয়ারি ২০২০
ইইউএর মাঝে থেকেও ব্রিটেন সর্বদাই আলাদা থাকতে চেয়েছে। ইইউএর সাধারণ মুদ্রা ইউরোকেও ব্রিটেন নিজের মুদ্রা হিসেবে মেনে নেয়নি। ইইউ থেকে ব্রিটেন সুবিধা চেয়েছে; কিন্তু বিনিময়ে কিছু দিতে কার্পণ্য করেছে। ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ায় ইউরোপের সাথে ব্রিটেনের এই প্রতিযোগিতা শেষ হচ্ছে না; বরং নতুন রূপ নিচ্ছে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটেনের সম্পর্কও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে; বিশেষ করে ব্রিটেন যখন পশ্চিমা বিশ্বের আদর্শিক নেতৃত্ব নিতে চাইছে। এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলিও ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ সম্পর্কে আলোচনা করছে। কিন্তু এর বাস্তবতা নিয়ে কৌতুহলের চাইতে প্রশ্নই বেশি আসছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনের সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিশ্বের সকলকে বিশ্বাস করানো যে ব্রিটেন বিশ্বকে আবারও নেতৃত্ব দেবার সক্ষমতা রাখে।


ইইউ পার্লামেন্ট এবং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সম্মতির পর ৩১শে জানুয়ারি ব্রিটেন অফিশিয়ালি ইউরোপিয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে গেল। তবে এতে সামনের দিনগুলিতে নতুন কিছু বিষয় আলোচনায় আসছে। এর একটা হলো ইইউএর সাথে নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি করা। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ব্রেক্সিটের পর আরও কঠিন সময় শুরু হচ্ছে। ইইউএর সাথে বাণিজ্য আলোচনা খুব একটা সহজ হবে না। ইউরোপের দেশগুলি এখন ব্রিটেনের সাথে তেমন সহজ শর্তে ব্যবসা করবে না। ব্রিটেনের অর্থনীতি ইউরোপের সাথে ব্যবসার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তাহলে ব্রিটেন কেন এই ঝামেলার মাঝে জড়াতে গেলো? ব্রিটেন চাইছে তার ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাটাকে এগিয়ে নিতে; যার মাধ্যমে ব্রিটেন ইইউএর নিয়মকানুনের মাঝে আটকে না থেকে বিশ্বব্যাপী আদর্শিক নেতৃত্ব দিতে চাইছে।

প্রাক্তন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব উইলিয়াম হেগ ‘দ্যা ডিইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার এক লেখায় বলেন যে, ব্রিটেনের ইইউ থেকে বের হবার সাথেসাথে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর যুগ শুরু হলো। তিনি মনে করছেন যে, পশ্চিমা গণতন্ত্রই হচ্ছে বিশ্বের জন্য একমাত্র গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক আদর্শ এবং বিশ্বব্যাপী আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীন যেহেতু তেমন কিছুই করছে না, তাই ব্রিটেনের উচিৎ এক্ষেত্রে বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়া। তবে ইইউ ছেড়ে গেলেও ইউরোপকে সাথে নিয়েই কাজ করার কথা বলছেন উইলিয়াম হেগ।

ব্রিটিশ থিংকট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর ইউরোপ প্রোগ্রামের ডিরেক্টর থমাস রেইনস ‘কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স’এর এক লেখায় বলছেন যে, ব্রিটেনের সামনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে ব্যালান্স করে চলার এবং এর মাঝেই বিশ্বব্যাপী প্রভাব বৃদ্ধি করার এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটেনের নিরাপত্তা সম্পর্ক গভীরই থাকবে; আর ইউরোপ যথারীতি ব্রিটেনের সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী থাকবে। এর মাঝেই ব্রিটেন চাইবে কানাডা এবং জাপানের মতো কিছু মধ্যম সারির শক্তির সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করতে। জলবায়ু পরিবর্তন, মুক্ত বাণিজ্য, মধ্যপ্রাচ্য, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এবং অর্থনৈতিক অবরোধের মতো ইস্যুগুলিতেও ব্রিটেন ইউরোপকে পাশে চাইবে। অর্থনৈতিক এবং সামরিক সক্ষমতার দৈন্যের মাঝেই ব্রিটেন মানবাধিকারের মতো লিবারাল আদর্শগুলির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক নেতৃত্ব নিতে চাইবে।

অপরদিকে ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর এক বিশ্লেষণে হচ্ছে যে, ইইউ থেকে বের হয়ে গেলেই যে ব্রিটেন স্বাধীনভাবে চলতে পারবে, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। চীনা কোম্পানি হুয়াইকে ব্রিটেনের ‘ফাইভ-জি’ মোবাইল নেটওয়ার্ক তৈরির অনুমতি দেবার পর যুক্তরাষ্ট্রের নাখোশ হবার ব্যাপারটাকে তুলে ধরে তারা বলছে যে, ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ব্রিটেনকে কোন একটা পক্ষে থাকতেই হবে।উইন্সটন চার্চিলের সময় থেকে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা ‘বিশেষ সম্পর্ক’ রক্ষা করে চলছে; আর এই সম্পর্ককে ব্রিটেন ইউরোপের উপরেই স্থান দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে সর্বদাই এই ‘বিশেষ সম্পর্ক’কে বিশেষভাবে নয়, বরং নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার আলোকে দেখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রিটিশ স্বার্থকে পদদলিত করে যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থকেই সমুন্নত রেখেছে। তদুপরি, ইন্টেলিজেন্স, সামরিক এবং পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতে শত ঝড়ঝাপ্টার মাঝেও যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই ব্রিটেনকে পাশে পেয়েছে। দুই দেশের এই ‘বিশেষ সম্পর্ক’কে ব্রিটেনের জনগণ অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ব্রিটেনের আনুগত্যের সম্পর্ক হিসেবে দেখেছে। বিশেষ করে ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের পর এই কথাগুলিই প্রচলিত হয়েছে। তবে ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্রিটেনের গুরুত্ব কমে যেতে পারে বলে মনে করছে ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা যুতসই বাণিজ্য চুক্তি করতে না পারলে এই সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে।

চীনারাও ব্রেক্সিটের পর ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর দিকে খেয়াল রাখছে। লন্ডনে চীনা রাষ্ট্রদূত লিউ শিয়াওমিংএর একটা লেখা ছাপা হয় ব্রিটেনের ‘ডেইলি মেইল’ পত্রিকাতে। তিনি বলছেন যে, ব্রেক্সিটের পর ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’কে চীনের দিকেই তাকাতে হবে। গত পাঁচ বছরে চীনারা ব্রিটেনে যা বিনিয়োগ করেছে, তা এর আগের তিন দশকেও করেনি; এর মূল্যমান ১৯ বিলিয়ন ডলার। অপরদিকে ব্রিটিশরা চীনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদেশী বিনিয়োগের যোগানদাতা। চীনা কোম্পানি হুয়াই গত পাঁচ বছরে ব্রিটেনে ২ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করেছে, সাড়ে ৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে এবং প্রতি বছর ৬০ মিলিয়ন পাউন্ড কর দিয়েছে। এর পরের পাঁচ বছরে হুয়াই ‘ফাইভ-জি’ প্রকল্পে আরও ৩ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করবে। শিয়াওমিং ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর কাছ থেকে মুক্ত বাণিজ্যের নিশ্চয়তা চাইছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের চলছে ব্যাপক বাণিজ্য যুদ্ধ। ব্রিটেন মনে করছে যে, ‘অকারণে’ চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধে জড়ালে ব্রিটেনের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মুক্ত বাণিজ্যের প্রসার চাইলেও ব্রিটিশরা পূর্ব এশিয়ায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যেমে চীনের আগ্রাসী আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করার পক্ষপাতি; যা কিনা ব্রিটেনের আদর্শিক চিন্তারই ফসল।

সিঙ্গাপুরের ‘এস রাজারাতনাম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর ফেলো ফ্রেডারিক ক্লিয়েম ‘নিকেই এশিয়ান রিভিউ’এর এক লেখায় ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনের কাছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্ব বৃদ্ধির কথা বলছেন। ২০১৮ সালে ‘আসিয়ান’এর সাথে ব্রিটেনের বাণিজ্য ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলারের; অত্র এলাকায় ব্রিটেনের বিনিয়োগ রয়েছে ২২ বিলিয়ন ডলার। তিনি বলছেন যে, ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ বাস্তবায়ন করতে গেলে ব্রিটেনকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে হবে। ইতোমধ্যেই ১৯৭১ সালে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের সাথে স্বাক্ষরিত ‘ফাইভ পাওয়ার ডিফেন্স এরেঞ্জমেন্টস’এর অধীনে ব্রিটেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিরক্ষা খাতে স্থায়ী খেলোয়াড় হতে চাইছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনী দক্ষিণ চীন সাগরে নিয়মিত আসাযাওয়া করছে এবং এখানে একটা স্থায়ী নৌঘাঁটি করার পরিকল্পনার কথাও শোনা যাচ্ছে।

‘লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস’এর ‘আইডিয়াস ইন্সটিটিউট’এর এসোসিয়েট স্টিফেন পাদুয়ানো ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ তার অবাস্তব আকাংক্ষাকে আজ হোক কাল হোক মেনে নিতে বাধ্য। আফ্রিকাতে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং চীনকে টক্কর দিয়ে আফ্রিকায় সবচাইতে বড় বিনিয়োগকারী হবার আশা ব্রিটেন করতে পারে না। আফ্রিকাতে ব্রিটেন যদি তার পশ্চিমা সহযোগীদেরকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে থাকে, তাহলে ব্রিটেনের আকাংক্ষা বাস্তবায়ন কঠিন। একইসাথে ব্রিটেন আফ্রিকার দেশগুলিকে বলতে পারে না যে তারা যেন ব্রিটেনকেই তাদের প্রধান বাণিজ্য সহযোগী হিসেবে মেনে নেয়।

ইইউএর মাঝে থেকেও ব্রিটেন সর্বদাই আলাদা থাকতে চেয়েছে। ইইউএর সাধারণ মুদ্রা ইউরোকেও ব্রিটেন নিজের মুদ্রা হিসেবে মেনে নেয়নি। ইইউ থেকে ব্রিটেন সুবিধা চেয়েছে; কিন্তু বিনিময়ে কিছু দিতে কার্পণ্য করেছে। ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ায় ইউরোপের সাথে ব্রিটেনের এই প্রতিযোগিতা শেষ হচ্ছে না; বরং নতুন রূপ নিচ্ছে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটেনের সম্পর্কও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে; বিশেষ করে ব্রিটেন যখন পশ্চিমা বিশ্বের আদর্শিক নেতৃত্ব নিতে চাইছে। এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলিও ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ সম্পর্কে আলোচনা করছে। কিন্তু এর বাস্তবতা নিয়ে কৌতুহলের চাইতে প্রশ্নই বেশি আসছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনের সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিশ্বের সকলকে বিশ্বাস করানো যে ব্রিটেন বিশ্বকে আবারও নেতৃত্ব দেবার সক্ষমতা রাখে।