Showing posts with label constitution. Show all posts
Showing posts with label constitution. Show all posts

Saturday, 25 March 2023

ময়লার শহর প্যারিস… রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপরেই আস্থার অভাব

২৫শে মার্চ ২০২৩

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় ময়লার স্তূপ। প্যারিসের আবর্জনার স্তূপের মাঝেই ফ্রান্সের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থা এবং ফ্রেঞ্চ রিপাবলিকের ভিত্তিতে পচনের প্রমাণ পাওয়া গেলেও এর সমাধান কারুর কাছেই নেই।


গত জানুয়ারি মাসে ফরাসি সরকার পেনশন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেবার পর থেকে প্রতিবাদে দেশজুড়ে চলছে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ। শিক্ষক, ট্রেনচালক, তেলের রিফাইনারির কর্মীসহ বিভিন্ন সেক্টরের লক্ষ লক্ষ কর্মীরা কর্মবিরতি পালন করছে এবং নিয়মিতভাবে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। ২৪শে মার্চ নাগাদ ফ্রান্সের পরিচ্ছন্নকর্মীরা ১৯ দিন ধরে ধর্মঘটে রয়েছে। শহরের রাস্তাগুলিতে ময়লা আবর্জনার স্তূপের মাঝে ইঁদুরের প্রকোপ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা; যার ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন রোগজীবাণু ছড়াবার আশংকাও তৈরি হয়েছে। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’ বলছে যে, ৯ হাজার ৬’শ টনের বেশি আবর্জনা এখন প্যারিসের রাস্তাগুলিতে স্তূপীকৃত অবস্থায় রয়েছে। আর পরিচ্ছন্ন কর্মীদের শ্রমিক ইউনিয়ন বলছে যে, তারা ২৭শে মার্চের আগে ধর্মঘট প্রত্যাহার করবে না।

ফ্রান্সের জ্বালানি ডিপো এবং তেলের রিফাইনারিগুলিতে দুই সপ্তাহ ধরে চলছে ধর্মঘট। কর্মীরা উৎপাদন কমানো ছাড়াও সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাতে চেষ্টা করছে। ২১শে মার্চ ফ্রান্সের দক্ষিণের জ্বালানি ডিপোতে ধর্মঘটকারী কর্মীদেরকে জোরপূর্বক কাজে ফেরত আনার চেষ্টা করলে কর্মীরা ডিপো অবরোধ করে। এতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের উপরে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। ধর্মঘটে ফ্রান্সের দক্ষিণের প্রায় ৪০ শতাংশ পেট্রোল স্টেশনেই জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে বলে বলছে ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’। পুরো ফ্রান্সে ৮ শতাংশ পেট্রোল স্টেশনে জ্বালানি ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সংকট মোকাবিলায় অনেক পেট্রোল স্টেশনেই গাড়িপ্রতি সর্বোচ্চ ৩০ লিটার পেট্রোল বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’ বলছে যে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর কথায়, এই পরিবর্তন ফ্রান্সের পেনশন ব্যবস্থাকে ধ্বসে পড়া থেকে বাঁচাবে এবং সরকারের খরচ কমাবে। অবসরের সময় দুই বছর বৃদ্ধি করে ৬৪ বছরে উন্নীত করার মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষ অতিরিক্ত দুই বছর কাজ করার পরেই পেনশন পাবার জন্যে যোগ্যতা অর্জন করবে। ম্যাক্রঁ সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করতে চাইছেন এবং সরকারের বাজেট ঘাটতিকে কমিয়ে ইইউএর টার্গেটের সাথে সমন্বয় করতে চাইছেন। পুরো ইউরোপের মাঝে ফ্রান্সে অবসরপ্রাপ্তরা অর্থনৈতিকভাবে সবচাইতে বেশি সচ্ছল। তবে এর জন্যে ‘ওইসিডি’র হিসেবে ফ্রান্সের জিডিপির সাড়ে ১৪ শতাংশ পেনশনের পিছনে খরচ করতে হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে তা মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ। পেনশনের খরচ মেটাতে গিয়ে ২০২৩ সালে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরো ঘাটতির মাঝে পড়তে যাচ্ছে সরকার। ২০২৫ সালের মাঝে এটা আরও বেড়ে প্রায় ১১ বিলিয়ন ইউরো এবং ২০৩৫ সাল নাগাদ ২১ বিলিয়ন ইউরোতে ঠেকবে। ফ্রান্সের মানুষের গড় বয়স বাড়ার সাথেসাথে পেনশনের জন্যে অর্থায়ন করা কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে আসছে। খরচ মেটাতে সরকার নতুন করে কর আরোপ বা সরকারি ঋণ বৃদ্ধি করতে চাইছে না। এর আগে ২০১৯ সালে ম্যাক্রঁর সরকার পরিবহণ খাতের পেনশন ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের চেষ্টা করলে পুরো ফ্রান্সজুড়ে পরিবহণ শ্রমিকরা রাস্তায় নেমেছিল। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণেই সেবার সরকার বেশিদূর এগুতে পারেনি।

২০১৯ সালেও ফ্রান্সে পেনশন নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের অনেকেই মনে করছেন যে, সরকারের পেনশন ব্যবস্থা পরিবর্তনেও সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ফ্রান্সের সামাজিক সুরক্ষা মডেলের দিনই এখন প্রায় শেষের পথে। এর মাধ্যমে ফ্রান্সে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার দ্রুত নিম্নগামী হচ্ছে। একইসাথে আইনপ্রনয়ণের প্রক্রিয়াও অল্প কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে। ৭০ শতাংশ জনগণ বিপক্ষে থাকলেও এখন সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৪৯’ বলে সরকার পেনশন ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে আইন তৈরি করতে পারবে।

২২শে মার্চ ম্যাক্রঁ ফরাসি টেলিভিশনে এক সাক্ষাতে বলেন যে, তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সড়ে আসবেন না; কারণ ফ্রান্সের জাতীয় স্বার্থের জন্যে সেটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। একইসাথে তিনি ফ্রান্সের বিক্ষোভকে ২০২১ সালের ৬ই জানুয়ারির যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের ‘ক্যাপিটল হিল’এর অরাজকতার সাথে তুলনা করেন। ‘হ্যারিস ইন্টারএকটিভ’এর ২২শে মার্চের জরিপে বলা হচ্ছে যে, ফ্রান্সের ৭০ শতাংশ জনগণ ম্যাক্রঁর এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এর আগে ৬ই মার্চ ‘এলাবি’র জরিপে বলা হয় যে, ৬৭ শতাংশ জনগণ সরকারের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে। ম্যাক্রঁর বক্তব্যের পর ২৩শে মার্চ পুরো ফ্রান্স জুড়ে বিক্ষোভ হয়। ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, ফরাসি পুলিশের হিসেবে ১১ লক্ষ মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে; আর ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়নগুলির হিসেবে প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। প্যারিসে ময়লার স্তূপে অগ্নিসংযোগ ছাড়াও সংঘর্ষে কমপক্ষে ৪’শ ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ৪’শ ৪১ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়। এর আগের ১১ই ও ১৫ই মার্চের বিক্ষোভ অপেক্ষাকৃত ছোট ছিল বলে অনেকেই সেটাকে ফরাসি সরকারের বিজয় বলে ধরে নিচ্ছিলো। কিন্তু নতুন করে সহিংস বিক্ষোভের পরে তার পুনরায় সরকারকে অস্থিরতার মাঝে ফেলেছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেবে গত ১৯শে জানুয়ারি থেকে ২৩শে মার্চ পর্যন্ত মোট ৯টা বড় আকারের বিক্ষোভ হয়েছে, যেগুলিতে সাড়ে ৩ লক্ষ থেকে শুরু করে ১৩ লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছে।

ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন ফরাসি টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে বলছেন যে, সহিংসতার মাত্রা যথেষ্ট বেড়ে যাওয়ায় পুলিশকে একটা সীমা পর্যন্ত বলপ্রয়োগ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। অপরদিকে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল ফেবিয়েন রুসেল সাংবাদিকদের বলেন যে, ফরাসি সরকার সহিংসতা নিয়ে জুয়া খেলছে। মাত্র কয়েকদিনের মাঝেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ পরিণত হয়েছে পুলিশের লাঠিচার্জে। বিক্ষোভকারীরা বলছে যে, তারা শুধুমাত্র পেনশন ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়েই বিক্ষোভ করছে না; ফরাসি সরকার পার্লামেন্টকে বাইপাস করে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়াতে জনগণের আক্রোশ আরও বেড়ে গেছে। ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, পার্লামেন্টে পাস করাতে না পেরে গত ১৬ই মার্চ ম্যাক্রঁর সরকার ফরাসি সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৪৯’এর উপর ভিত্তি করে পার্লামেন্টকে বাইপাস করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে পেনশন ব্যবস্থার পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ফ্রান্সে বিক্ষোভকারীদের অনেকেই মনে করছেন যে, সরকারের পেনশন ব্যবস্থা পরিবর্তনেও সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ফ্রান্সের সামাজিক সুরক্ষা মডেলের দিনই এখন প্রায় শেষের পথে। এর মাধ্যমে ফ্রান্সে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার দ্রুত নিম্নগামী হচ্ছে। একইসাথে আইনপ্রনয়ণের প্রক্রিয়াও অল্প কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, ২১শে মার্চ ফ্রান্সের পার্লামেন্টে ম্যাক্রঁর বিরুদ্ধে পরপর দু’টা অনাস্থা প্রস্তাব ভেস্তে গেলে বিরোধী রাজনীতিবিদদের কাছে প্লাকার্ড তুলে প্রতিবাদ করা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। কারণ ৭০ শতাংশ জনগণ বিপক্ষে থাকলেও এখন সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৪৯’ বলে সরকার পেনশন ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে আইন তৈরি করতে পারবে। প্যারিসের আবর্জনার স্তূপের মাঝেই ফ্রান্সের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থা এবং ফ্রেঞ্চ রিপাবলিকের ভিত্তিতে পচনের প্রমাণ পাওয়া গেলেও এর সমাধান কারুর কাছেই নেই।

Wednesday, 13 July 2022

শিনজো আবে জীবন দিয়ে জাপানের সংবিধান পরিবর্তনের পথকে উন্মুক্ত করে দিয়ে গেলেন

১৩ই জুলাই ২০২২
 
যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তার ব্যাপারে, বিশেষ করে চীনকে নিয়ন্ত্রণে, জাপানকে আরও কর্মক্ষম দেখতে ইচ্ছুক। ১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রচিত জাপানের সংবিধান দেশটাকে শান্তিকামী করে রেখেছে। এখন সেই একই সংবিধানকে পরিবর্তনে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। শিনজো আবের মৃত্যু জাপানের সংবিধান পরিবর্তনের প্রচেষ্ঠাটাকে এগিয়ে নিলেও এর মাধ্যমে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে বলেই অনেকের ধারণা।


গত ৮ই জুলাই জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এক আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। আবের হত্যাকান্ডের মাত্র দু’দিনের মাথায় জাপানের ক্ষমতাসীন ‘লিবারাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি’ বা ‘এলডিপি’ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের নির্বাচনে বড় বিজয় পেয়েছে। অনেকেই বলছেন যে, এর ফলে জাপানের রাজনীতিতে বহুদিনের আলোচিত বিষয় সাংবিধানিক পরিবর্তন একটা ফলাফল দেখবে। কেউ কেউ বলছিলেন যে, আবের হত্যাকান্ড ক্ষমতাসীনদের বিজয়ের ব্যবধানকে বাড়িয়ে দিতে পারে; নির্বাচনের ফলাফল এখন সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনে ৪৯ শতাংশ মানুষ ভোট দিলেও এবারে দিয়েছে ৫২ শতাংশ মানুষ। জাপানের ‘কিয়োদো’ বার্তা সংস্থা বলছে যে, এটা ২০১৩ সালের পর থেকে ‘এলডিপি’র সবচাইতে বড় বিজয় ছিল। বিরোধী দল ‘কন্সটিটিউশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব জাপান’, যারা সংবিধান পরিবর্তনের বিরোধী, তারা ৬টা আসন হারিয়েছে। দলের নেতা ইউকো মোরি বলছেন যে, শান্তিবাদী সংবিধানের মাধ্যমে আশেপাশের দেশগুলির সাথে জাপানের সম্পর্ক গভীর হয়েছে। এই সংবিধান পরিবর্তন করলে বিশেষ করে চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। আঞ্চলিকভাবে অস্ত্র প্রতিযোগিতা এখানকার শান্তি বিনষ্ট করবে।

জাপানের সাংবিধানিক পরিবর্তন আঞ্চলিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে মার্কিন সামরিক নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় জাপানের সংবিধান লেখা হয়েছিল; যেখানে বলা হয়েছে যে, জাপান অস্বীকার করছে যে, যুদ্ধ করতে পারাটা একটা সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিকার। ‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শিনজো আবে পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে আঞ্চলিকভাবে চীনের বহির্মুখী পররাষ্ট্রনীতি এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষণের প্রেক্ষিতে জাপানে সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলেছিলেন। এর সপক্ষে জনমতও গড়ে উঠছিল বেশ কয়েক বছর ধরেই।

জাপানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের নির্বাচনের আগে সকলেই মোটামুটিভাবে জানতেন যে, ক্ষমতাসীন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন ছিল বিজয়ের ব্যবধান নিয়ে। অর্থাৎ কত বেশি আসন নিয়ে তারা পাস করবে। কারণ এর উপরেই নির্ভর করবে জাপানের শান্তিবাদী সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে কিনা। সংবিধান পরিবর্তনে উচ্চকক্ষের ২’শ ৪৮ আসনের মাঝে দুই তৃতীয়াংশ বা প্রায় ১’শ ৬৬টা আসনের সমর্থন প্রয়োজন হবে। জাপানের ‘কিয়োদো’ সংবাদ সংস্থা বলছে যে, এবারের নির্বাচন সংবিধান পরিবর্তনের জন্যে সবচাইতে বড় বিজয় এনে দিয়েছে। কারণ ক্ষমতাসীন ‘এলডিপি’ দল এবং তাদের কোয়ালিশন দল ‘কোমেইতো’ নতুন করে মোট ৭৬টা আসন পেয়েছে। এর ফলে ক্ষমতাসীন দলের জোট ছাড়াও সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে বিরোধী দল ‘জাপান ইনোভেশন পার্টি’ এবং ‘ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ফর দ্যা পিপল’ মিলে মোট আসন হবে ১’শ ৭৯টা; যা কিনা দুই তৃতীয়াংশের চাইতে অনেক বেশি। এই দলগুলির ইতোমধ্যেই পার্লামেন্টের নিম্নপক্ষে দুই তৃতীয়াংশ সংগরিষ্ঠতা রয়েছে। ‘কোমেইতো’ একটা শান্তিবাদী দল হলেও মাত্র কিছুদিন আগেই তারা জাপানের সামরিক বাহিনীর সাংবিধানিক ভিত্তি পরিবর্তনের ব্যাপারে সমর্থন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জাপানের সংবিধান পরিবর্তনের সাথে শুধু পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনই নয়, সামরিক বাজেটের পরিবর্তনের কথাও উঠেছে। সামরিক বাজেট বৃদ্ধির পক্ষে জাপানে একটা শক্ত জনমত গড়ে উঠেছে বেশ কিছুদিন ধরেই। ‘এলডিপি’র নিগাতা প্রদেশের রাজনীতিবিদ কাজুহিরো কোবাইয়াশি ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’কে বলছেন যে, একসময় সংবিধান পরিবর্তনের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলাই যেতো না; এখন মানুষ মনোযোগ দিয়েই শোনে। আপাততঃ জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ১ শতাংশের মতো থাকলেও সরকার চাইছে তা দ্বিগুণ করে ২ শতাংশে উন্নীত করতে। ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর রবার্ট ওয়ার্ড ‘রয়টার্স’কে বলছেন যে, এখন প্রধানমন্ত্রী কিশিদা সামরিক বাজেট বৃদ্ধির জন্যে একটা সবুজ সংকেত পেলেন।

তবে কেউ কেউ মনে করছেন যে, কাজটা সহজ হবে না। জাপানের ‘রিতসুমেইকান এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর ইয়োইচিরো সাতো ‘আল জাজিরা’র এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বলেন যে, জাপানের সামরিক বাজেট বৃদ্ধিটা সম্ভবতঃ ধীরে ধীরেই হবে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই হঠাৎ বাজেট বৃদ্ধি করাটা কঠিন। শুধু সামরিক বাজেট নয়, জাপানের বৃদ্ধ জনগণের পেনশন, করোনা মহামারির কারণে বিভিন্ন ভর্তুকি, অর্থনীতিতে গতি আনার লক্ষ্যে নতুন ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয়া, ইত্যাদি ক্ষেত্রের জন্যেও অনেক অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। এই অর্থায়ন দ্রুত আনার একটা পদ্ধতি হলো ‘কনজাম্পশন ট্যাক্স’ বা মানুষের খরচের উপর কর; যা মানুষের কাছে অত্যন্ত অপ্রিয় হবে। ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্ব যেহেতু ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে, কাজেই এই অর্থায়নগুলিকে তারা হয়তো ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের পক্ষেই থাকবে।

জাপানের অনেকগুলি অভ্যন্তরীণ সমস্যা রয়েছে; যার মাঝে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং মানুষের আয়ে স্থবিরতা অন্যতম। কিছুদিন আগেই জাপানের সরকারি টেলিভিশন ‘এনএইচকে’র এক জরিপে বলে হয় যে, দেশের ৪২ শতাংশ জনগণই দেশের অর্থনৈতিক নীতির ব্যাপারে বেশি খেয়াল রাখছে; মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ দেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তাকে চিন্তার কেন্দ্রে রেখেছে। তদুপরি জাপানে ধীরেধীরে জনমত পরিবর্তিত হচ্ছে। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জাপানের জনমত অনেকটাই প্রভাবিত হয়েছে। একসময় কেউই বিশ্বাস করতো না যে চীন তাইওয়ানকে আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু ইউক্রেনের উপর রুশ হামলার পর অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন যে, চীন এহেন কোন কর্মকান্ডে জড়ালে জাপান কিছু করার জন্যে প্রস্তুত কিনা। ‘এলডিপি’ জাপানের সামরিক বাজেট বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয়া ছাড়াও আক্রান্ত হবার আগেই শত্রুর উপর সামরিক হামলা করার অধিকার আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠা করা পক্ষপাতি। জাপানের রাজনৈতিক পত্রিকা ‘ইনসাইডলাইন’এর প্রধান সম্পাদক তাকাও তোশিকাওয়ার মতে, দুই দশকের মাঝে এবারের নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তা নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়েছে। তবে জাপানের নিরাপত্তা চিন্তার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় প্রভাবক হলো যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তার ব্যাপারে, বিশেষ করে চীনকে নিয়ন্ত্রণে, জাপানকে আরও কর্মক্ষম দেখতে ইচ্ছুক। ১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রচিত জাপানের সংবিধান দেশটাকে শান্তিকামী করে রেখেছে। এখন সেই একই সংবিধানকে পরিবর্তনে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। শিনজো আবের মৃত্যু জাপানের সংবিধান পরিবর্তনের প্রচেষ্ঠাটাকে এগিয়ে নিলেও এর মাধ্যমে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে বলেই অনেকের ধারণা।

Wednesday, 15 April 2020

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জাপানের সিদ্ধান্তহীনতা দেশটার চিন্তাগত পরাধীনতাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে

১৬ই এপ্রিল ২০২০


জাপানে জরুরি অবস্থা জারি করা হলেও কর্তৃপক্ষ নাগরিকদেরকে বাড়িতে থাকতে এবং সামাজিক দূরত্ব রাখতে ‘অনুরোধ’ করতে পারবে মাত্র। কিন্তু কেউ যদি এই ‘অনুরোধ’ না মানে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনীদের লিখে দেয়া এই সংবিধান করোনাভাইরাসের দুর্যোগের মাঝেও জাপানকে ভোগাচ্ছে। প্রতিনিয়তই জাপান সরকারকে চিন্তা করতে হচ্ছে যে, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গেলে জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর আঘাত আসবে কিনা। জাপানের সংবিধান এই ব্যাপারটাকেই পবিত্র করে রেখেছে।

নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৪ই এপ্রিল জাপানে একদিনে সর্বোচ্চ ১৯ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর একদিনে ৪’শ ৭৭ জনের মাঝে সংক্রমণ পাবার পরে সর্বমোট সংক্রমণের সংখ্যা ৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। টোকিওতে একদিনে ১’শ ৬১ জন, ওসাকায় ৫৯ জন, ফুকুওকাতে ৩৩ জনের মাঝে ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত জাপানে মোট ৮ হাজার ১’শ ৬১ জন আক্রান্তের মাঝে টোকিওতেই পাওয়া গেছে ২ হাজার ৩’শ ১৯ জন। এ পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১’শ ৭৩ জনে। এই তিনটা ‘প্রিফেকচার’ বা অঞ্চলেই গত সপ্তাহে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন প্রিফেকচারে স্কুল, রেস্তোঁরা, সমাজসেবা সংস্থা, চাইল্ড কেয়ার হোম, ইত্যাদি সংস্থায় একজন বা একাধিক আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে আরও অনেকজনের আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে বলে জানাচ্ছে ‘জাপান টাইমস’। সাপ্পোরোতে একটা হাসপাতাল থেকে ২৫ জন মানুষ সংক্রমিত হয়েছে। তবে অনেকেই বলছেন যে, জাপানে জরুরি অবস্থা এসেছে অনেক দেরিতে। এবং কেউ কেউ বলছেন যে, একারণে জাপানকে কড়া মূল্য দিতে হবে।

জাপানের ‘কিয়োদো নিউজ’এর এক জরিপ বলছে যে, ৮০ শতাংশ জনগণ মনে করছেন যে, সরকারের জরুরি অবস্থা ঘোষণা অনেক দেরিতে এসেছে। সরকারের সমর্থনও ৫ শতাংশ কমে ৪০ শতাংশে এসেছে। কিয়োটোর দোশিশা ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির প্রফেসর নোরিকো হামা সরকারের সমালোচনা করে বলেন যে, প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে টুইটারে তার কুকুরের সাথে অন্তরঙ্গ ছবি এবং তার চা খাওয়ার ছবি প্রকাশ করছেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না যে তিনি ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। সাধারণ মানুষের গভীর অর্থনৈতিক সমস্যাকে তিনি বুঝতেই পারছেন না। ১ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পরেও অনেকেই বলছেন যে, তা এই দুর্যোগ মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়। আক্রান্ত জনগণ খুঁজে তাদেরকে নগদে ২ হাজার ৮’শ ডলার করে দেবার সিদ্ধান্ত হলেও অনেকেই বলছেন যে, অন্য দেশের মতো সকল নাগরিককেই এই অর্থ দেবার ব্যবস্থা করা উচিৎ।

  

১৫ই এপ্রিল জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক টাস্ক ফোর্সের রিপোর্টের বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’ জানাচ্ছে যে, কোন সাবধানতা অবলম্বণ করা না হলে করোনাভাইরাসের কারণে জাপানে ৪ লক্ষ ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। টাস্ক ফোর্সের সদস্য হোক্কাইডো ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হিরোশি নিশিউরা বলছেন যে, বিপদ এড়াতে হলে বর্তমানে চলমান জরুরি অবস্থার মাঝে মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগ ৮০ শতাংশ কমাতে হবে। সরকারি গবেষকেরা বলছেন যে, প্রায় সাড়ে ৮ লক্ষ মানুষের ভেন্টিলেটর দরকার পড়ার মতো খারাপ অবস্থা হতে পারে। জাপানের বার্তা সংস্থা ‘এনএইচকে’ বলছে যে, ৯টা প্রিফেকচারে ইতোমধ্যেই ইমার্জেন্সি বেডের সংখ্যা অপ্রতুলতার দিকে ধাবমান। মেডিক্যাল কর্মীদের ‘পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট’ বা ‘পিপিই’ স্বল্পতার কারণে ওসাকা শহরের সরকার নাগরিকদের কাছে নিজেদের ওয়াটারপ্রুফ কোট দান করতে আহ্বান জানিয়েছে। ডাক্তাররা সেখানে ডাস্টবিনের উপরে ব্যবহার করা প্লাস্টিক গায়ে পরিধান করছেন। শহরের কাপড় তৈরি করার কারখানাগুলিকে পিপিই তৈরি করার আহ্বান জানিয়েছে ওসাকা সরকার। টোকিওর ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মিয়েকো নাকাবায়াশি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সরকারের সমালোচনা করে বলেন যে, সরকারের পদক্ষেপ নিতে দেরি হবার কারণে ডাক্তাররা ভীতি নিয়ে কাজ করছেন। আর সরকার যথেষ্ট সংখ্যায় টেস্ট করতে দিচ্ছে না এখনও।

জাপান সরকারের বরাত দিয়ে ‘নিকেই এশিয়ান রিভিউ’ বলছে যে, জাপানের ৪৭টা প্রিফেকচারের মাঝে ৪৩টা প্রিফেকচারেই করোনাভাইরাসে বেশি অসুস্থ্য মানুষকে সেবা দেয়ার জন্যে আইসিইউ বেডের স্বল্পতা দেখা দিতে পারে। মাত্র চারটা প্রিফেকচার - টোকিও, ওকাইয়ামা, ফুকুওকা এবং ওকিনাওয়াতে দরকারের চাইতে বেশি আইসিইউ আছে বলে বলে বলা হচ্ছে। জাপানে মাথাপিছু আইসিইউ বেডের সংখ্যা অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় কম। ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনলজি ইনফর্মেশন’র হিসেবে প্রতি লাখ জনগণের জন্যে জাপানে রয়েছে ৫টা করে আইসিইউ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে লাখে ৩৫টা; জার্মানিতে ৩০টা; ফ্রান্স ও ইতালিতে ১২টা; স্পেনে ১০টা। বেশি বয়সের মানুষের জন্যে আইসিইউতে থাকাটা খুব বেশি কষ্টকর। জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি বলেই সেখানে আইসিইউএর সংখ্যা কম রাখা হয়েছে।



জাপানের মেইজি ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের প্রাক্তন প্রফেসর লরেন্স রেপেটা ‘জাপান টাইমস’এর এক লেখায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন জরুরি অবস্থা জারি করতে জাপানের এতো সময় কেন লেগে গেল। এপ্রিলের ৭ তারিখে টোকিওসহ ৬টা প্রিফেকচারে জরুরি অবস্থা জারি করার জন্যে মার্চ মাসে পরিবর্তন করা ‘নিউ ইনফ্লুয়েঞ্জা স্পেশাল মেজার্স এক্ট’ নামের আইন ব্যবহার করা হয়। জাপানের সর্বমোট ৪৭টা ‘প্রিফেকচার’এর মাঝে ৭টাতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। তবে এই আইনের অধীনে প্রিকেফচারের গভর্নররা নাগরিকদেরকে বাড়িতে থাকতে এবং সামাজিক দূরত্ব রাখতে ‘অনুরোধ’ করতে পারবে মাত্র। কিন্তু কেউ যদি এই ‘অনুরোধ’ না মানে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। তাহলে কেন জাপানের কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের বাধ্য করতে পারলো না? প্রফেসর রেপেটা বলছেন যে, এক্ষেত্রে তিনটা কারণ থাকতে পারে। প্রথমতঃ জাপানের জনগণ অফিশিয়াল ‘অনুরোধ’কে বাধ্যবাধকতা হিসেবেই দেখে। দ্বিতীয়তঃ জাপানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মানদন্ড বেশ শক্ত। আর তৃতীয়তঃ জাপানের বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলিই ক্ষমতাসীন লিবারাল ডেমোক্র্যাট পার্টির অর্থায়ন করে। লকডাউন করলে এই ব্যবসাগুলিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচাইতে বেশি। তবে এর বাইরেও বড় একটা কারণ হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের লিখে দেয়া জাপানের শান্তিবাদী সংবিধানকে কেউ অবমূল্যায়ন করতে সাহস দেখায়নি, এবং পরিবর্তন করতেও এগিয়ে আসেনি। করোনাভাইরাসের সুযোগে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের কিছু রাজনৈতিক মিত্র চাইছিলো সংবিধানকে পরিবর্তন করে নিতে; কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি।

১২ই এপ্রিল জাপানের সবচাইতে উত্তরের হোক্কাইডো প্রিফেকচারে পুনরায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয় বলে জানাচ্ছে ‘কিওদো নিউজ’। এক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকায় কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে তিন সপ্তাহের জরুরি অবস্থা জারি করে ১৯শে মার্চ তা তুলে ফেলা হয়; স্কুলগুলিকে খুলে দেয়া হয় এবং জনসমাগমের অনুমতিও দেয়া হয়। কিন্তু এবারে আবারও ৬ই মে পর্যন্ত স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং জরুরি দরকার ছাড়া ঘরের বাইরে যেতে মানা করা হয়েছে। হোক্কাইডোর এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন যেন জাপান সরকারের সিদ্ধান্তহীনতারই সারসংক্ষেপ। জাপান এখনও নিশ্চিত নয় যে, তার কি করা উচিৎ। নিজেদের সংবিধান নিয়েও একটা অনিশ্চয়তা জাপানকে প্রায় দুই দশক ধরে ঘিরে রেখেছে; যা কিনা জাপানের সকল চিন্তাকে প্রভাবিত করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনীদের লিখে দেয়া এই সংবিধান করোনাভাইরাসের দুর্যোগের মাঝেও জাপানকে ভোগাচ্ছে। প্রতিনিয়তই জাপান সরকারকে চিন্তা করতে হচ্ছে যে, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গেলে জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর আঘাত আসবে কিনা। জাপানের সংবিধান এই ব্যাপারটাকেই পবিত্র করে রেখেছে। জনগণকে বাধ্য করার মতো কোন সিদ্ধান্তই সরকার সহজে নিতে পারছে না। অন্যদিকে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে জনগণের আস্থাও হারাতে হচ্ছে সরকারের। বিশ্বযুদ্ধের সাড়ে সাত দশক পেরুলেও রাষ্ট্রচিন্তার দিক থেকে জাপান এখনও অনেকটাই পরাধীন থেকে গিয়েছে।