Saturday, 11 April 2020

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে চীনের “জয়লাভ”?

১১ই এপ্রিল ২০২০




নতুন করে সংক্রমণের সম্ভাবনাগুলি উহানের ঝলমলে আলোকসজ্জার ঝলকানিতে হারিয়ে যাক, এমনটাই যেন চাইছে চীন


৭ই এপ্রিল চীন ঘোষণা দেয় যে, জানুয়ারি থেকে প্রথমবারের মতো এই দিনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কারুর মৃত্যু হয়নি। মোট ৬৩ জনের মাঝে নতুন করে সংক্রমণের কথা বলা হয়; যার মাঝে ৬১ জনই দেশের বাইরে থেকে আসা। আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা কমে আসায় চিনে স্বাভাবিক জীবন ফিরতে শুরু করেছে। ৮ই এপ্রিল উহান শহরের মানুষকে ১১ সপ্তাহের মাঝে প্রথমবারের মতো শহর ছাড়তে অনুমতি দেয়া হয়। চীনা সরকার বলছে যে, ২’শ ২১টা ফ্লাইটে করে ৭ হাজার মানুষ শহর ছেড়ে যায়; আর সাড়ে ৪ হাজার মানুষ শহরে ঢোকে। এছাড়াও পাঁচ লক্ষের বেশি মানুষ সড়কপথ ব্যবহার করে। তবে উহানের মানুষ অন্য শহরে যেতে পারলেও সেখানে তাদের নতুন করে ভাইরাসের টেস্ট করা হবে এবং বাধ্যতামূলক কোয়ার‍্যানটিনে রাখা হবে। তথাপি, চীন সরকার তার সফলতাগুলিকে ফলাও করে প্রচার করতে ভুলেনি। পুরো উহান শহর জুড়ে আয়োজন করা হয় চোখ ধাঁধাঁনো আলোকসজ্জার। সারা বিশ্বকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, চীন ‘করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ ‘জয়লাভ’ করেছে! কিন্তু আসলেই কি তাই?

চীনের উহান শহরকে যখন করোনাভাইরাস মুক্ত ঘোষণা করে উৎসব করা হলো, তখনই খবর এলো যে, সীমান্ত শহর সুইফেনহেতে নতুন করে সংক্রমণ শুরু হয়েছে। সুইফেনহে হলো চীনের সর্বপূর্বের রাজ্য হাইলংজিয়াংএর সীমান্ত শহর। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের প্রধান শহর ভ্লাডিভস্টকের সাথে চীনের স্থলযোগাযোগ এই পথেই। শহরটা ভ্লাডিভস্টক থেকে মাত্র দেড়’শ কিঃমিঃ দূরে। রাজ্যের স্বাস্থ্য কমিশনের বরাত দিয়ে ‘চায়না ডেইলি’ জানাচ্ছে যে, ৮ই এপ্রিল সেখানে নতুন করে ২৫ জনের মাঝে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া যায়। এদের মাঝে দুইজনের অবস্থা গুরুতর। এতে করে এই রাজ্যের মোট করোনা সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়ালো ৮৭তে। পুরো চীনে এইদিনে মোট ৫৯ জনের মাঝে সংক্রমণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ পুরো দেশের প্রায় অর্ধেক সংক্রমণই পাওয়া গিয়েছে সুইফেনহেতে। আক্রান্ত সকলেই চীনা নাগরিক। এরা রাশিয়ার মস্কো থেকে বিমানে এসেছিলেন ভ্লাডিভস্টক; সেখান থেকে সড়কপথে সুইফেনহে। নতুন আক্রান্ত সকলকেই হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং মস্কো থেকে আসা বিমানের বাকি যাত্রীদেরকে কোয়ার‍্যানটাইনে রাখা হয়েছে। তবে এই হিসেবের বাইরেও আরেকটা হিসেব আছে। ঐ ২৫ জন ছাড়াও একইদিনে এই রাজ্যে আরও ৮৬ জনের মাঝে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া যায়, যাদের শরীরে কোন লক্ষণ প্রকাশিত হয়নি। অর্থাৎ একদিনে মোট ১’শ ১১ জনের মাঝে ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গেছে। সকলেই এসেছে রাশিয়া থেকে। এর একদিন আগেই রাশিয়ার সাথে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া অবশ্য চীনের সাথে সীমান্ত বন্ধ করেছে ফেব্রুয়ারি মাসে। এখন থেকে রাশিয়াফেরত চীনা নাগরিকদেরকে সুইফেনহে এড়িয়ে যেতে বলা হয়েছে। হাইলংজিয়াং রাজ্যে এখন পর্যন্ত লক্ষণসহ আক্রান্ত পাওয়া গিয়েছে ৮৬ জন, আর লক্ষণছাড়া আক্রান্ত মিলেছে ১’শ ৪৬ জন। অর্থাৎ রাজ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২’শ ৩২ জন। সুইফেনহে শহরের বাসিন্দাদেরকে নিজ বাসগৃহে থাকতে বলা হয়েছে; যদিও এটা উহানের মতো কঠোর লকডাউন নয়। ‘বিবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে সেখানকার এক বেকারি শপের মালিক বলেন যে, অনেকেই ইতোমধ্যেই এই শহর ছেড়ে চলে গিয়েছে। সুইফেনহের জনসংখ্যা মাত্র ১ লাখের মতো হলেও হাইলংজিয়াং রাজ্যের জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। সুইফেনহে সড়কপথে রাজ্যের রাজধানী হারবিনের সঙ্গে সংযুক্ত, যার জনসংখ্যা ১ কোটির উপরে। অর্থাৎ জনসংখ্যার আকারে এই শহর উহানের মতোই। সুইফেনহে একইসাথে পার্শ্ববর্তী রাজ্য জিলিনের সাথেও যুক্ত।
   



৮ই এপ্রিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কমিউনিস্ট পার্টির এক সভায় দেশের বাইরে থেকে নতুন করে করোনাভাইরাসের আগমণ এবং দেশের ভেতর নতুন করে ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবার কথা বলেন। মার্কিন মিডিয়া ‘সিএনএন’ চীনের আরোগ্যপ্রাপ্তি এবং নতুন সংক্রমণের মাঝামাঝি বিপজ্জনক অবস্থানের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। মেডিক্যাল জার্নাল ‘ল্যানসেট’এর এক লেখায় গবেষকেরা বলেন যে, যেহেতু এই রোগের ভ্যাকসিন এখনও আবিষ্কৃত হয়নি, আর যেহেতু সামষ্টিকভাবে জনগণের দেহে এই রোগের সংক্রমণের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ এখনও তৈরি করা সম্ভব হয়নি, তাই এই ভাইরাস খুব সহজেই নতুন করে মাথা চাড়া দিতে পারে; বিশেষ করে যখন ব্যবসা বাণিজ্য, কারখানা এবং স্কুল খুলে দেয়ায় সামাজিকভাবে মানুষ কাছাকাছি আসতে থাকবে, তেমনি দেশের বাইরে থেকে রোগের সংক্রমণ হবার আশংকাও বাড়বে।

নতুন করে সংক্রমণের সাথে সাথে চীনা সরকারের সংক্রমণের সংখ্যাগুলি নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা। ৭ই এপ্রিল পর্যন্ত চীনের সরকারি হিসেবে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮১ হাজার ৭’শ ৪০ জন। আর মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ৩’শ ৩১ জন। এর দু’দিন আগেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল তেদ্রোস আধানম ঘেব্রেইসাস করোনাভাইরাসের মহামারি দ্রুততার সাথে খুঁজে পাওয়া এবং স্বচ্ছতার সাথে সংক্রমণের উপরে রিপোর্ট করার জন্যে চীনের প্রশংসা করেন। তবে অনেকেই এখনই ঘেব্রেইসাসের মতো প্রশংসার বাণী দিতে নারাজ। ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মন্ত্রী মাইকেল গোভ ‘বিবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, চীনের রিপোর্টগুলির মাঝে রোগের ব্যাপ্তি, ধরণ এবং সংক্রমণের ভয়াবহতার পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যায়নি। এর এক সপ্তাহ আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেন যে, চীনের সংক্রমণ এবং মৃতের সংখ্যাগুলি কিছুটা কমের দিকেই মনে হয়। তবে অনেক মার্কিন রাজনীতিবিদই চীনের রিপোর্ট করা সংখ্যাগুলিকে বিশ্বাস করতে রাজি নন। পশ্চিমা বিশ্বে এই ভাইরাসের সংক্রমণে ব্যাপক প্রাণহানি হবার পর কেউ কেউ চীনের কাছে উপদেশ চেয়েছে। তবে পশ্চিমারা অনেকেই চীনের সংখ্যাগুলিকে বিশ্বাস করছেন না। কারণ হিসেবে তারা চীনের লুকাছাপার ইতিহাসের কথাই তুলে ধরছেন। চীনের অর্থনীতি, বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সংখ্যাগুলি অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনীতিবিদদের বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি। তাই কেউ কেউ মনে করছেন যে, যারা জিডিপি নিয়ে বানোয়াট সংখ্যা দিতে পারে, তাদের পক্ষে করোনাভাইরাসের সংখ্যা পরিবর্তন করে বলাটা আলাদা কিছু নয়।

ওয়ার্ল্ড মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ফ্রাঙ্ক আলরিক মন্টগোমারি চীনের রিপোর্ট করা সংখ্যাগুলিকে ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দেন। তিনি এ-ও বলেন যে, বেইজিং ইচ্ছে করেই বানোয়াট সংখ্যা দিচ্ছিল। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, অন্যান্য দেশও আক্রান্তদের সংখ্যার ব্যাপারে সম্পূর্ণ জ্ঞান রাখে না; কারণ সম্পূর্ণ তথ্য অনেক সময়েই পাওয়া যায় না, অথবা টেস্টিংএর ফলাফল ঠিকমতো আসেনা। একইসাথে ট্রাম্প প্রশাসনের উপদেষ্টা ডেবোরা বার্ক্স বলছেন যে, ইতালি এবং স্পেনের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, চীনের অনেক তথ্যই সম্ভবতঃ সঠিকভাবে রিপোর্ট হয়নি।

উহানের মেয়র স্বীকার করেছেন যে, জানুয়ারির শুরু থেকে ২৩ তারিখে শহরজুড়ে লকডাউন শুরু করার আগ পর্যন্ত তেমন কিছুই করা হয়নি। ভাইরাসের ব্যাপারে প্রথম রিপোর্ট করা ডাক্তার লী ওয়েনলিয়াংকে চীনা সরকার জোরপূর্বক চুপ করায়। কিছুদিন আগেও জাপানের ‘কিয়োদো নিউজ’ বলে যে, চীনা ডাক্তারদেরকে নতুন করে সংক্রমণের সংখ্যাগুলিকে রিপোর্টে উল্লেখ না করতে বলা হয়। হংকং ইউনিভার্সিটির স্কুল অব পাবলিক হেলথএর প্রফেসর বেন কাউলিং বলছেন যে, চীনারা উহানে সংক্রমণের শুরুর দিকে শুধুমাত্র মারাত্মকভাবে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত মানুষগুলির সংখ্যা রিপোর্ট করেছিল। পরবর্তীতে যেভাবে স্বল্প বা কোন লক্ষণ ছাড়াই রুগীর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছিল, সেই মাপকাঠি ধরলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ লক্ষ ৩২ হাজারের মতো হবার কথা। অর্থাৎ এটা হতো চীনা সরকারের রিপোর্ট করা সংখ্যার তিনগুণ! শুধু তা-ই নয়, কিছুদিন আগ পর্যন্তও চীন লক্ষণবিহীন করোনা আক্রান্তদের সংখ্যা সংক্রমণের সংখ্যার মাঝে দেখাতো নয়। এটা হাইলংজিয়াং রাজ্যের সংক্রমণের সংখ্যাগুলি দেখলেই পরিষ্কার হবে।

এদিকে ‘ব্লুমবার্গ নিউজ’ বলছে যে, মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের একটা গোপন প্রতিবেদনের খবর তারা পেয়েছে, যা কিনা হোয়াইট হাউজের জন্যে তৈরি করা হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, চীনারা শুরু থেকেই রোগের সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যার ব্যাপারে ইচ্ছাকৃতভাবে অসম্পূর্ণ রিপোর্ট দিচ্ছিল। দু’জন কর্মকর্তা অবশ্য চীনাদের রিপোর্টকে পুরোপুরিই বানোয়াট আখ্যা দেন। এর জবাবে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনইং বলেন যে, চীন রিপোর্টিংএর ব্যাপারে পুরোপুরি স্বচ্ছ ছিল। তিনি আরও বলেন যে, ওয়াশিংটন চাইছে চীনের ঘাড়ে দোষ ফেলে দিতে। ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য এই রিপোর্টের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন। তবে বাকিরা চীনের ব্যাপারে অতটা নরম সুরে কথা বলেননি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বলছেন যে, দুনিয়া জানতে পারার একমাস আগ থেকেই চীন এই ভাইরাস নিয়ে কাজ করছিল। রিপাবলিকান সিনেটর বেন সাসে চীন সরকারের দেয়া সংখ্যাগুলিকে ‘নষ্ট অপপ্রচার’ বলে মন্তব্য করেন। মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য মাইকেল ম্যাককল চীনকে করোনাভাইরাসের সাথে লড়াইয়ে বিশ্বাসযোগ্য পার্টনার হিসেবে দেখছেন না। তিনি বলেন যে, তারা এই রোগের মানুষ থেকে মানুষে ছড়াবার ব্যাপারে প্রথমে মিথ্যা বলেছিল। এরপর ডাক্তার এবং সাংবাদিকদের কন্ঠরোধ করেছিল।
  
উহানের ‘ফিউনেরাল হোম’এর বাইরে মানুষের বিশাল লাইন দেখে অনেকেই মনে করছেন যে, মহামারির প্রকৃত চিত্র খুব সম্ভবতঃ মানুষের দৃষ্টির অগোচরেই রাখা হয়েছে



মার্চের শেষ সপ্তাহে খবর বের হয় যে, চীনের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হুবেই রাজ্যের ‘ফিউনেরাল হোম’ বা শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সংস্থাগুলি করোনাভাইরাসে মৃত বলে রিপোর্ট করা সংখ্যার বহুগুণে বেশি সংখ্যক ‘আর্ন’ বা মৃতের ভস্ম রাখার পাত্রের ডেলিভারি পেতে থাকে। চীনের মিডিয়া ‘কাইশিন’ বলে যে, শুধু উহানেই সাড়ে ৮ হাজার ‘আর্ন’ বা পাত্র এসে পৌঁছেছে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, একেকটা ‘ফিউনেরাল হোম’এর বাইরে মৃতদের বিশাল লাইন দেখে অনেকেই মনে করছেন যে, মহামারির প্রকৃত চিত্র খুব সম্ভবতঃ মানুষের দৃষ্টির অগোচরেই রাখা হয়েছে।

চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পরিস্থিতির উহানের সবচাইতে খারাপ সময়ের সাথে তুলনা করলে যথেষ্টই উন্নতি হয়েছে। তবে বাকি দুনিয়ার কাছে চীন এখন বলতে চাইছে যে, তারা এই রোগ থেকে মুক্ত হতে সকলকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। ইতোমধ্যেই তারা ইতালি, সার্বিয়া ছাড়াও আরও অনেক দেশকেই করোনা প্রতিরোধে সহায়তা দিয়েছে; যা কিনা বিশ্বব্যাপী চীনের প্রভাবকে বৃদ্ধি করছে। অন্যদিকে সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র নিজ দেশে সংক্রমণ ঠেকাতেই হিমসিম খাচ্ছে। এমন একটা সময়ে চীন চাইছে না এই ভাইরাসের উৎপত্তি যে চীনে, তা নিয়ে কথা হোক; অথবা ভাইরাসের সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে চীনা সরকারের তথ্যগোপণ এবং সিদ্ধান্তহীনতা এই রোগকে উহান তথা চীন থেকে বাকি দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে, এব্যাপারে আলোচনা শুরু হোক। চীন চাইছে দুনিয়ার সামনে তার সাহায্যকারীর ছবিটাই প্রচার পাক; সমস্যা সৃষ্টিকারীর ছবি নয়। আর নতুন করে সংক্রমণের সম্ভাবনাগুলি উহানের ঝলমলে আলোকসজ্জার ঝলকানিতে হারিয়ে যাক, এমনটাই যেন চাইছে চীন।


Thursday, 9 April 2020

করোনা দুর্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তুহারাদের কি হবে?

৯ই এপ্রিল ২০২০
 
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় লাস ভেগাস শহরের কর্মকর্তারা ক্যাশম্যান সেন্টার নামের কনভেনশন সেন্টারের পার্কিং লটে খোলা আকাশের নিচে বাস্তুহারা মানুষদের থাকার ব্যবস্থা করে, যখন শহরের হোটেলগুলি সম্পূর্ণ খালি। এ নিয়ে সোশাল মিডিয়াতে হচ্ছে তুমুল সমালোচনা।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্যাসিনো শহর’ বলে পরিচিত লাস ভেগাসে বাস্তুহারা মানুষদের একজনের মাঝে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পরার পর থেকে ৫’শ মানুষের থাকার জায়গা হচ্ছে না। শহরের ক্যাথলিক চ্যারিটি এই লোকগুলিকে একটা আশ্রয়স্থলে থাকার ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু মার্চের শেষের দিকে সেই আশ্রয়স্থলে থাকা এক বাস্তুহারার শরীরে করোনাভাইরাস ধরা পরার পর নতুন স্থান খোঁজা শুরু হয়। লাস ভেগাস শহর, ক্লার্ক কাউন্টি এবং নেভাডা রাজ্যের কর্মকর্তারা শহরের ক্যাশম্যান সেন্টার নামের কনভেনশন সেন্টার ও বেইসবল স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সের পার্কিং লটে খোলা আকাশের নিচে এই মানুষগুলির থাকার ব্যবস্থা করে। এই ব্যবস্থায় পার্কিং লটের পাকা স্থানে ছয় ফিট দূরত্ব রেখে সাদা রঙের দাগ দিয়ে বক্স এঁকে দেয়া হয়। সাদা দাগ দেয়া একেকটা বক্সের মাঝে একেকজন বাস্তুহারার শোবার ব্যবস্থা করা হয়। এই থাকার ব্যবস্থার ছবি প্রকাশ পাবার পর থেকে সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। একজন টুইটার ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন যে, এটা হলো একটা ব্যর্থ সমাজের চিত্র, যা কিনা এর নাগরিকদের একেবারে মৌলিক চাহিদাও পূরণ করতে অক্ষম। আরেকটা মন্তব্য আসে যে, নেভাডা হলো বিশ্বের সবচাইতে ধনী একটা দেশের একটা রাজ্য, যেখানে পার্কিং লটের কংক্রিটের উপর বক্স এঁকে বাস্তুহারাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরেকজন মন্তব্য করেন যে, লাস ভেগাস শহর তাদের বাস্তুহারাদের থাকার ব্যবস্থা করেছে পার্কিং লটে, যখন শহরের হোটেলগুলি একেবারেই খালি! এই ছবি দেখেই এই দেশের সব ভুলগুলি বোঝা যায় এবং করোনাভাইরাস দুর্যোগের ব্যাপারে দেশটার সিদ্ধান্তের সমস্যাগুলি ধারণা করা যায়। মন্তব্যগুলির পিছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেনসাস ব্যুরো’র হিসেবে লাস ভেগাস শহরের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ। মাথাপিছু আয় ২৯ হাজার ডলারের বেশি। তবে পুরো জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ বা এক লাখের মতো মানুষ দরিদ্র্য।

নিউ ইয়র্ক শহরের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, শহরের পাঁচটা হোটেলে রুম লিজ নিয়ে ৭’শ বাস্তুহারা মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শহরের ‘ডিপার্টমেন্ট অব সোশাল সার্ভিসেস’এর হিসেবে দু’শর বেশি বাস্তুহারা মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। অন্যদিকে ‘রয়টার্স’ বলছে যে, করোনাভাইরাসের ঝুঁকিতে থাকা ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো শহরের ১০ হাজার বাস্তুহারা মানুষকে সেখানকার কর্মকর্তারা কোয়ার‍্যান্টাইন বা আলাদা করে রাখার জন্যে সাড়ে ৪ হাজার হোটেল রুম বুক করছে। তবে শহরের কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন চাইছে ১৪ হাজার রুম বুকিংএর ব্যবস্থা করে শহরের সব বাস্তুহারাদের আলাদা করার ব্যবস্থা করা। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সালের মাঝে সান ফ্রান্সিসকো শহরের বাস্তুহারাদের সংখ্যা ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। শহরের কর্মকর্তারা সুনাম ক্ষুন্ন হবে মনে করে হোটেলগুলির নাম প্রকাশ করতে চাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরগুলিও হোটেল রুমগুলি ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং নিচ্ছে। তবে অনুসন্ধিৎসু সংবাদ সংস্থা ‘ইন্টারসেপ্ট’ এই চেষ্টাগুলিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তারা বলছেন যে, নিউ ইয়র্কের ৬৩ হাজার বাস্তুহারা হয় শহরের সাড়ে ৪’শ আশ্রয়স্থলে অথবা রাস্তায় থাকছে। ‘দ্যা আরবান জাস্টিস সেন্টার’এর সমাজসেবা কাজের সুপারভাইজর ক্রেইগ হিউজ বলছেন যে, নিউ ইয়র্ক শহরে ১ লক্ষ হোটেল রুম খালি পড়ে রয়েছে, যেখানে সব বাস্তুহারা মানুষেরই থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব। বাস্তুহারাদের একজন ভিক্টোরিয়া উলফ দুঃখ করে বলেন যে, দেশের দ্বিতীয় সারির নাগরিক হিসেবে তাদের দেখা হচ্ছে; কয়েদীদের মতোই।
   
  
২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের হিসেবে মোট ৫ লক্ষ ৬৭ হাজার ৭’শ ১৫ জন মার্কিনী ছিল বাস্তুহারা। বাস্তুহারাদের মাঝে ৬৩ শতাংশ বিভিন্ন সংস্থার আশ্রমে থাকলেও বাকিরা এখনও রাস্তায় ঘুমায়। পুরো যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় ঘুমানো মানুষের ৫৩ শতাংশ বা ১ লক্ষ ৮ হাজারের বেশি ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে।



বিশ্বব্যাংকের হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু আয় প্রায় ৬৩ হাজার ডলার। তথাপি দেশটাতে সকল মানুষের থাকার জায়গা নেই। মার্কিন ‘ডিপার্টমেন্ট অব হাউজিং এন্ড আরবান ডেভেলপমেন্ট’এর হিসেব বলছে যে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে মোট ৫ লক্ষ ৬৭ হাজার ৭’শ ১৫ জন মার্কিনী ছিল বাস্তুহারা। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ছিল ৩ শতাংশ বেশি। ক্যালিফোর্নিয়াতে এই বৃদ্ধি ছিল সবচাইতে বেশি। এক বছরের মাঝে সেখানে বাস্তুহারার সংখ্যা সাড়ে ১৬ শতাংশ বা ২১ হাজার বেড়ে যায়। এর মাঝে নিউ ইয়র্ক শহরে ছিল সবচাইতে বেশি ৭৮ হাজার ৬’শ। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল লস এঞ্জেলেস শহর এবং কাউন্টি; সেখানে বাস্তুহারা ৫৬ হাজারেরও বেশি। এছাড়া সিয়াটলে ১১ হাজার, সান জোসে প্রায় ১০ হাজার, সান ডিয়েগোতে ৮ হাজার, সান ফ্রানসিসকোতে ৮ হাজার, ওকল্যান্ডে ৮ হাজার, সান্টা আনাতে ৮ হাজার, ফিনিক্সএ ৬ হাজার ৬’শ, ওয়াশিংটন ডিসিতে সাড়ে ৬ হাজার বাস্তুহারা। এই বাস্তুহারাদের মাঝে ৬৩ শতাংশ বিভিন্ন সংস্থার আশ্রমে থাকলেও বাকিরা এখনও রাস্তায় ঘুমায়। পুরো যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় ঘুমানো মানুষের ৫৩ শতাংশ বা ১ লক্ষ ৮ হাজারের বেশি ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে, যেখানে মাথাপিছু আয় ৩৫ হাজার ডলারেরও বেশি। রাস্তায় ঘুমানো মানুষের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা সাড়ে ১২ হাজার, যা হলো ফ্লোরিডা রাজ্যে।

সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকার পত্রিকা ‘দ্যা মার্কারি নিউজ’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে সান্টা ফে কাউন্টির অফিস অব সাপোর্টিভ হাউজিংএর ডিরেক্টর কাই লী বলেন যে, বাস্তুহারা মানুষগুলির স্বাস্থ্যের অবস্থা অন্যদের চাইতে আরও বেশি খারাপ থাকে। কাউন্টির সরকার প্রতিটা হোটেলকে একেকটা রুমের দিনপ্রতি ভাড়া হিসেবে ১’শ ডলার করে দিচ্ছে। তবে হোটেল রুমে থাকার ব্যবস্থা হলেও মানুষগুলির জন্যে খাদ্য এবং অন্যান্য সার্ভিসের ব্যবস্থা করাটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোটেল রুমগুলির অর্থায়নের পরিকল্পনার কিছুটা জানা যায় যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও রাজ্যের ‘সিনসিনাট ডক কম’ অনলাইন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে। রাজ্যের হ্যামিল্টন কাউন্টির কমিশনাররা হিসেব করছেন যে, ৩’শ ৩০টা হোটেল রুম তারা কমপক্ষে ৪৫ দিনের জন্যে বুকিং দিচ্ছেন, যেখানে তাদের খরচ হবে ১ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার। এই অর্থ তারা মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে চাইবেন। হ্যামিল্টন কাউন্টি এপ্রিল মাসের মাঝেই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ১’শ মিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ পেতে যাচ্ছে। তবে তারা এখনও নিশ্চিত নন যে, মার্কিন সরকার বাস্তুহারাদের থাকার জন্যে খরচকে এই প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় গণ্য করবে কিনা। ‘স্ট্র্যাটেজিস টু এন্ড হোমলেসনেস’ নামের এক এনজিওএর প্রেসিডেন্ট কেভিন ফিন বলছেন যে, বেশিরভাগ বাস্তুহারা মানুষই আগের মতোই আশ্রয়স্থলে থাকবে। তবে কিছু লোককে আলাদা করে হোটেলে রাখা গেলে আশ্রমে থাকা মানুষগুলি কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে থাকতে পারবে। তিনি আরও বলেন যে, হোটেলে রাখা মানুষগুলি মূলতঃ বৃদ্ধ অথবা যাদের আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা রয়েছে। করোনাভাইরাসে এদেরই ক্ষতি হবার সম্ভাবনা বেশি।
 
সান ডিয়েগোর বাস্তুহারাদের একটা আশ্রয়স্থল। খুব অল্প স্থানে বসবাসের কারণে এখানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি। তাই কিছু বাস্তুহারাকে বিভিন্ন শহরের খালি পড়ে থাকা হোটেলগুলিকে স্থানান্তর করা হচ্ছে।

 

সান ফ্রানসিসকো শহরের বোর্ড অব সুপারভাইজরএর সদস্য ম্যাট হ্যানি ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, শেষ পর্যন্ত চিন্তা করতে হবে যে, প্রতিটা মানুষের জীবনকে প্রকৃতপক্ষে মূল্য দিয়ে দেখা হচ্ছে কিনা। যাদের বাড়ি রয়েছে, তারা বাড়ির গুরুত্ব বুঝতে পারছেন। কিন্তু শহরের বাস্তুহারা লোকগুলিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে বিপদের দিকে; যার কারণে বাকিরা সকলেই বিপদে পড়বে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম বলছেন যে, শহরের হোটেল রুমগুলি বাস্তুহারাদের জন্যে বরাদ্দ দিতে যা খরচ হবে, তার ৭৫ শতাংশ কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি’ বহন করবে। তবে শুধুমাত্র করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অথবা শারীরিকভাবে দুর্বলদেরকেই কেন হোটেল রুমে রাখা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন অনেকে। ‘কোয়ালিশন অন হোমলেসনেস’এর এক মানবাধিকার কর্মী কেলি কাটলার এই নীতির সমালোচনা করে বলেন যে, এটা একটা জীবন মরণ সমস্যা; অথচ হোটেল রুমগুলি এখন খালি পড়ে রয়েছে। তবে সান ফ্রানসিসকোর মেয়ন লন্ডন ব্রীড পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, শহরের সকল বাস্তুহারা মানুষকে হোটেলে রাখা সম্ভব নয়। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক চিঠির জবাবে শহরের হিউম্যান সার্ভিসেস এজেন্সির ডিরেক্টর ট্রেন্ট রোরার সরাসরিই বলেন যে, আগামী দুই বছরে শহরের বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ১ বিলিয়ন ডলার। এমতাবস্থায় শহরের সকল বাস্তুহারার জন্যে হাজার হাজার হোটেল রুম বুকিং করাটা যুক্তিযুক্ত হবে না। সান ফ্রানসিসকো শহরের একজন সুপারভাইজর ডীন প্রেসটন এই নীতির সমালোচনা করে বলছেন যে, করোনাভাইরাস ঠেকাতে শহরের জনগণকে বাড়িতে থাকতে এবং দূরত্ব বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়ে বাস্তুহারাদের দূরত্ব বজায় রেখে থাকার জন্যে কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকাটা একটা বিরাট সমন্বয়হীনতা; যা কিনা বাস্তুহারাদের প্রতি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচায়ক। ‘ওয়েস্টার্ন রিজিওনাল এডভোক্যাসি প্রজেক্ট’এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর পল বোডেন সারসংক্ষেপে বলেন যে, আসলে মানুষ মনে করছে না যে বাস্তুহারারা হোটেল রুমে থাকার যোগ্য! এদেরকে শুধুমাত্র দৃষ্টির অগোচরে রাখতে পারলেই হলো।

যুক্তরাষ্ট্রে বাস্তুহারা মানুষের দুর্দশা পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার একটা স্বাভাবিক চিত্রই বটে। পৃথিবীর সবচাইতে ধনী দেশগুলির একটা হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে সাড়ে ৫ লাখের বেশি মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। মাথাপিছু ৬৩ হাজার ডলারের আয় যে কতটা অন্তসারশূণ্য, তা বাস্তুহারাদের চিত্র দেখলেই বোঝা যায়। তদুপরি, করোনাভাইরাসের দুর্যোগের মাঝেও এই মানুষগুলির থাকার স্থান নিয়ে চলছে দরকষাকষি। মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজের মাঝ থেকে কিছু অর্থ আলাদা করে বিভিন্ন শহর, কাউন্টি এবং রাজ্যের সরকারগুলি বিভিন্ন হোটেলে বাস্তুহারাদের থাকার ব্যবস্থা করছে। এই ব্যবস্থায় হোটেল মালিকদের ক্ষতি পোষাবার ব্যবস্থা হচ্ছে শুধু; বাস্তুহারাদের মাথা গোঁজার সমস্যার স্থায়ী কোন সমাধান হচ্ছে না। অর্থাৎ মার্কিন ট্যাক্সপেয়ারদের অর্থ যাচ্ছে হোটেল মালিকদের পকেটে। শুধু তা-ই নয়, সমাজে বাস্তুহারাদের প্রতি যে বৈষম্যের দৃষ্টিভঙ্গি লালনপালন করা হয়েছে, তা বাস্তুহারাদের দুর্দশাকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। এহেন বৈষম্যপূর্ণ ব্যবস্থা মার্কিনীদের বিবেককেও নাড়া দিয়েছে, যা কিনা লাস ভেগাসের পার্কিং লটে বাস্তুহারাদের থাকার ব্যবস্থা করার পর সোশাল মিডিয়াতে জনগণের মন্তব্য থেকে বোঝা যায়। একইসাথে এই চিত্রগুলি জনগণের সামনে উন্নত দেশের মাথাপিছু গড় আয়ের দম্ভটাকেও এখন অন্তসারশূণ্য করে দিয়েছে।

Monday, 6 April 2020

পশ্চিমাদের সেলেব্রিটি সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে করোনাভাইরাস

০৭ই এপ্রিল ২০২০

  
প্রাক্তন ব্রিটিশ সুপারমডেল নাওমি ক্যাম্পবেল তার ইন্সটাগ্রামে নিজের একটা ছবি পোস্ট করেন; যেখানে তার সারা শরীর ঢাকা ছিল সাদা রঙের পার্সোনাল প্রোটেকটিভ স্যুটে; মুখে তার ছিল ‘এন৯৫’ রেস্পিরেটর মাস্ক। এই স্যুট এবং মাস্ক পশ্চিমা সবগুলি দেশের হাসপাতালে চরম সরবরাহ স্বল্পতার মাঝে রয়েছে।



ব্রিটিশ অভিনয় শিল্পী ইদ্রিস এলবা গত ১৭ই মার্চ ঘোষণা দেন যে, তার শরীরে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। তিনি সন্দেহ করেছিলেন যে, তিনি খুব সম্ভবতঃ একজন করোনাভাইরাস পজিটিভ ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন। তাই কোন উপসর্গ দেখা দেয়া ছাড়াই তিনি নিজের করোনাভাইরাস টেস্টের ব্যবস্থা করেন। সেলেব্রিটি ইদ্রিস এলবা কোন উপসর্গ ছাড়াই তার করোনাভাইরাস পরীক্ষা করতে পারলেও সাধারণ ব্যক্তিদের জন্যে ব্যাপারটা অত সহজ ছিল না; অন্ততঃ উপসর্গ ছাড়া তো নয়ই। টেস্ট কিটের অপ্রতুলতার কারণে মার্কিন ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’ বা ‘সিডিসি’ করোনাভাইরাস টেস্টের জন্যে কঠোর গাইডলাইন দিয়ে দেয়। ওয়াশিংটন ডিসির ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ রিসার্চ’এর প্রেসিডেন্ট ডায়ানা জুকারম্যান ‘ইনসাইডার’ ম্যাগাজিনের সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, যখন কোন কিছু স্বল্প পরিমাণে পাওয়া যায়, তখন বিখ্যাত এবং ধনী মানুষেরাই তা আগে পেয়ে থাকে। গত ১১ই মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা রাজ্যের ৬০ শতাংশ টেস্টিং কিট ব্যবহার করে বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের করোনাভাইরাস টেস্ট করা হয়। এই টেস্টের কারণ হিসেবে উটাহ রাজ্যের বাস্কেটবল দলের একজনের করোনাভাইরাস পজিটিভ হবার কথা বলা হয়। দলের মোট ৫৮ জন খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তাকে টেস্ট করার পর একজনকে পজিটিভ পাওয়া যায়। ইদ্রিস এলবা বা বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের মতো লোকদের টেস্ট করা হয়েছে কোন লক্ষণ ছাড়াই। খুব সম্ভবতঃ প্রাইভেট ল্যাবরেটরির মাধ্যমেই এই টেস্টগুলি করা হয় বলে বলছে ‘বিজনেস ইনসাইডার’। কিছু ধনী ব্যক্তি নিজের বাড়িতে প্রাইভেট ডাক্তার এনে শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করিয়েছেন। যদিও মার্কিন সরকার জনগণের জন্যে করোনাভাইরাস টেস্ট বিনামূল্যেই করে দিচ্ছে, ধনী ব্যক্তিদের প্রাইভেট টেস্টিং অবশ্য কম খরচে হচ্ছে না। ধনী ব্যক্তিদের জন্যে কাজ করা ডাক্তার ডেভিড নাজারিন বলছেন যে, ডাক্তারের ফি বাদেই এরকম টেস্ট করতে কয়েক’শ ডলার খরচ হবার কথা। লস এঞ্জেলেসের ডাক্তার সারি আইচেস বলছেন যে, যখন ল্যাবরেটরিগুলি টেস্টের ফলাফল সরবরাহ করতে হিমসিম খাচ্ছে, তখন তাদের হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে যে, কাদের টেস্টগুলি আগে করা হবে। যাদের আর্থসামাজিক অবস্থান উপরের দিকে, তাদের টেস্টগুলিই তখন প্রাধান্য দিয়ে করা হবে।

বিখ্যাত এবং ধনী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করোনাভাইরাস টেস্ট করা একটা বিষয়; আর করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে গিয়ে নিজের ধনসম্পদ ব্যবহার করা আরেকটা বিষয়। মার্কিন মিডিয়া ‘স্লেট’ এক প্রতিবেদনে বলছে যে, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে দুই সপ্তাহের মাঝে প্রাইভেট জেট বিমানের বুকিং দশ গুণ বেড়ে গিয়েছে। ধনী ব্যক্তিরা নিজস্ব জেটবিমান ব্যবহারের মাধ্যমে জনসমাগম এড়াতে চেয়েছে। ‘সাউদার্ন জেট’এর মালিক জেরড ডেভিস বলছেন যে, নিউ ইয়র্ক থেকে দক্ষিণ ফ্লোরিডা প্রাইভেট জেট বিমানে যেতে কমপক্ষে ২০ হাজার ডলার খরচ হবে। প্রতি ঘন্টার জন্যে ৪ হাজার ডলারের উপর চার্জ করা হয়। একসময় কাস্টমার পেতে তারা দ্বারে দ্বারে ঘুরতেন; এখন চাহিদার ভাড়ে নুয়ে পড়ছেন তারা। প্রতিদিন পাঁচ থেকে দশটা বুকিংএর অনুরোধ আসছে। প্রাইভেট বিমান চার্টারের ব্যবসায় স্বাভাবিক সময়ে কখনোই ৩০ দিন পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যায় না। আর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য যখন সর্বনিম্ন স্তরে, তখন এই প্রাইভেট চার্টার কোম্পানিগুলি ব্যাপক মুনাফা আশা করছে।
 
 
বিলিয়নায়ার ডেভিড গেফেন তার টুইটার একাউন্টে তার লাক্সারি ইয়টের ছবি পোস্ট করে বলেন যে, তিনি এই ইয়টে নিজেকে আলাদা করে রাখবেন। আর তিনি এ-ও আশা করেন যে, সকলে যেন নিরাপদ থাকে। গেফেনের এই পোস্টে জনগণ এতটাই আক্রমণাত্মক মতামত দিতে থাকে যে, তিনি তার টুইটার একাউন্টই ডিলিট করে দেন!



চার্টার বিমানের মাধ্যমে ধনী ব্যক্তিরা অপেক্ষাকৃত ‘নিরাপদ’ জায়গা খুঁজছে। যেমন, ফেইবুকে বিনিয়োগ করা বিলিয়নায়ার পিটার থিয়েল নিউজিল্যান্ডে ৪’শ ৭৭ একর জমির মালিক। অন্যরা কেউ কেউ শহর থেকে দূরে কোথাও নিজস্ব বাড়িতে চলে যাচ্ছেন। ব্রিটেনের ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ পত্রিকা বলছে যে, কোন কোন অতিধনী ব্যক্তি করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে সমুদ্রের মাঝে ঘুরে বেড়াবার পরিকল্পনা করেছেন। লন্ডনের ইয়ট চার্টার কোম্পানি ‘বুরগেস’এর প্রধান নির্বাহী জনাথন বেকেট বলছেন যে, বিলিয়নায়াররা একটা লাক্সারি ইয়ট ভাড়া করে আলাস্কা, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর বা চিলির দক্ষিণে চলে যাচ্ছেন। কোন কোন পরিবার দুই মাসের বেশি সময়ের জন্যে ইয়ট ভাড়া করেছে। তাদের নিজেদের শিশুদেরকে ইয়টের উপরেই পড়াশুনা করাবার পরিকল্পনা নিয়েছেন তারা! এই ইয়টগুলির এক সপ্তাহের ভাড়া ১ লক্ষ ডলার থেকে ৬ লক্ষ ডলার পর্যন্ত হতে পারে; এর উপর ক্রুর বেতন তো রয়েছেই।

১১ই মার্চ প্রাক্তন ব্রিটিশ সুপারমডেল নাওমি ক্যাম্পবেল তার ইন্সটাগ্রামে নিজের একটা ছবি পোস্ট করেন; যেখানে তার সারা শরীর ঢাকা ছিল সাদা রঙের পার্সোনাল প্রোটেকটিভ স্যুটে; মুখে তার ছিল ‘এন৯৫’ রেস্পিরেটর মাস্ক। এই স্যুট এবং মাস্ক পশ্চিমা সবগুলি দেশের হাসপাতালে চরম সরবরাহ স্বল্পতার মাঝে রয়েছে। এর আগে ২৬শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন অভিনেত্রী গিনেথ প্যাল্ট্রো তার ইন্সটাগ্রামে একটা সেলফি পোস্ট করেন, যেখানে তার মুখে ছিল সুইডিশ কোম্পানি ‘এয়ারিনাম’এর তৈরি ‘আরবান এয়ার মাস্ক’, যা কিনা এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না।

২২শে মার্চ মার্কিন সেলেব্রিটি ম্যাডোনা তার ইন্সটাগ্রামে নিজের একটা ছবি পোস্ট করেন, যেখানে তাকে গোলাপের পাপড়ি ভাসা বাথটাবে গোসল করতে দেখা যাচ্ছে! তিনি ছবির টাইটেলে লেখেন ‘কোন বৈষম্য নয়’। তিনি বলেন যে, যে যতটা ধনীই হোক না কেন, করোনাভাইরাস সকলকে এক সাড়িতে নামিয়ে আনে। তবে ম্যাডোনার এই ছবির সাথে কথাগুলি মানুষের কাছে ভালোভাবে যায়নি মোটেই। বিলিয়নায়ার ডেভিড গেফেন তার টুইটার একাউন্টে তার লাক্সারি ইয়টের ছবি পোস্ট করে বলেন যে, তিনি এই ইয়টে নিজেকে আলাদা করে রাখবেন। আর তিনি এ-ও আশা করেন যে, সকলে যেন নিরাপদ থাকে। গেফেনের এই পোস্টে জনগণ এতটাই আক্রমণাত্মক মতামত দিতে থাকে যে, তিনি তার টুইটার একাউন্টই ডিলিট করে দেন!

মার্কিন সঙ্গীতশিল্পী ফ্যারেল উইলিয়ামস এক টুইটার পোস্টে তার অনুসারীদেরকে হাসপাতালে দান করতে বলেন। এর জবাবে তার এক ভক্ত বলেন যে, উইলিয়ামস কমপক্ষে দেড়’শ মিলিয়ন ডলারের মালিক; তার উচিৎ তার নিজের অর্থ দান করা। উইলিয়ামস পরবর্তীতে জবাবে বলেন যে, তিনি নিজেও দান করেছেন। তবে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন সেলেব্রিটিদের করোনাভাইরাস প্রতিরোধে অনুদানের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন করছে। মার্কিন সেলেব্রিটি শেফ ববি ফ্লে তার রেস্তোঁরার কর্মীদের বেতন দেয়ার জন্যে জনগণের কাছে অর্থ চাইছেন। অথচ তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার। পত্রিকাটা বলছে যে, করোনাভাইরাস মানুষকে এক কাতারে নামায়নি; বরং মানুষের মাঝে বৈষম্যকে আরও বেশি ফুটিয়ে তুলেছে। সম্পদের ক্ষেত্রে বৈষম্য ছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা পাবার ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে বৈষম্য। সেলেব্রিটিরা করোনাভাইরাসের লক্ষণ না দেখিয়েও তাদের টেস্ট করিয়ে ফেলতে পাচ্ছেন। অথচ সাধারণ মানুষ কাশতে থাকলেও টেস্ট করাতে পারেনি। রিপোর্টের উপসংহারে বলা হচ্ছে যে, পশ্চিমের সেলেব্রিটি সংকৃতি এবং পুঁজিবাদ একই সূত্রে গাঁথা। উভয়েই ব্যক্তিকে সমাজের উপরে স্থান দেয়। এটা অস্বস্তিকরভাবে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, মেডিক্যাল কর্মী, সুপারমার্কেট স্টাফ, বাস ড্রাইভার, পণ্য ডেলিভারি কর্মীদের মতো কঠোর পরিশ্রমীরা যখন বিশ্বকে টিকিয়ে রাখছে, তখন ধনী ব্যক্তিরা শহর ছেড়ে দূরবর্তী অঞ্চলে পালাচ্ছে। আর এর আগে কখনো এতটা পরিষ্কারভাবে দেখা যায়নি যে, সমাজের অতিকায় ধনী ব্যক্তিরা সমাজকে কতটা কম দিচ্ছে।


Sunday, 5 April 2020

পশ্চিমা দেশগুলিতে বর্ণবাদী চিন্তাকে উস্কে দিয়েছে করোনাভাইরাস!

৫ই এপ্রিল ২০২০

     
ফ্রান্সের নঁতে শহরে গ্রাফিতি বলছে, ‘করোনাভাইরাস যত মানুষকে অসুস্থ্য করেছে, তার চাইতে বেশি মানুষকে বর্ণবাদী করেছে’



গত পহেলা এপ্রিল দু’জন ডাক্তার ফরাসী টিভিতে এসে মতামত দেন যে, নভেল করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আফ্রিকার জনগণের উপর টেস্ট করে দেখা যেতে পারে। এই মন্তব্যের পর থেকে এই ডাক্তারদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ উঠেছে। টিভি চ্যানেল ‘এলসিআই’এর সাথে সাক্ষাতে প্যারিসের কোচিন হসপিটালের আইসিইউএর প্রধান জঁ-পল মিরা বলেন যে, এইডসএর ভ্যাকসিন টেস্ট করার জন্যে যেমন পতিতাদের বেছে নেয়া হয়েছিল, তেমনি করোনাভাইরাসের প্রতিরোধক হিসেবে যক্ষ্মার প্রতিরোধক ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন টেস্ট করার জন্যে আফ্রিকার মানুষগুলিকে বেছে নেয়া যেতে পারে; কারণ পতিতাদের যেমন এইডসএর বিরুদ্ধে আলাদা কোন প্রতিরোধ নেই, তেমনি আফ্রিকার মানুষগুলিরও করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ নেই। তিনি যুক্তি দেন যে, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার মেডিক্যাল কর্মীরা যথেষ্ট সুরক্ষা নিয়ে কাজ করেন, যার ফলে এমনিতেই তাদের করোনভাইরাসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম থাকবে; তাদেরকে ভ্যাকসিন দেয়া হোক আর না হোক। ফ্রান্সের ন্যাশনাল হেলথ ইন্সটিটিউটের রিসার্চ ডিরেক্টর ক্যামিল লক্ট তার সাথে সহমত পোষণ করে বলেন যে, তারা ইতোমধ্যেই ইউরোপের সমান্তরালে আফ্রিকাতেও এই টেস্ট চালাবার চিন্তা করছেন। এই টেলিভিশন অনুষ্ঠানের পর থেকে প্রায় সাথেসাথেই শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। আইভোরি কোস্টের বিখ্যাত ফুটবলার দিদিয়ের দ্রগবা এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, এটা আশ্চর্য্য একটা ব্যাপার যে এধরণের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে বারংবার সাবধান করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, আফ্রিকা কোন টেস্টিং ল্যাবরেটরি নয়। তিনি তাদের কথাগুলিকে বর্ণবাদী কথা বলে আখ্যা দেন। দ্রগবার মতো ফ্রান্সের সোশালিস্ট পার্টি এবং বর্ণবাদ বিরোধী গ্রুপগুলিও বিবৃতি দিয়েছে।

‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আফ্রিকা এই মুহুর্তে সবচাইতে কম আক্রান্ত মহাদেশ, যেখানে সাড়ে ৭ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গিয়েছে মোট ৩’শ ২০ জন। জঁ-পল মিরা পরবর্তীতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ‘হাফিংটন পোস্ট’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা হিসেবে বলেন যে, ফ্রান্স এবং আস্ট্রেলিয়ার সাথে আফ্রিকার একটা দেশ এই গবেষণার অংশ হতে পারে, এধরনের কথা আগে কখনোই শোনা যায়নি। ‘বিবিসি’ এক সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল টেনে নিয়ে এসে বলে যে, যক্ষ্মার প্রতিরোধে ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন বা টিকা যেসব দেশে জনগণের মাঝে দেয়া হয়েছে, সেসব দেশে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা কম হয়ে থাকতে পারে। তারা বলছেন যে, যেসব দেশে যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি, সেসব দেশেই শিশুদের মাঝে ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন দেবার প্রচলন রয়েছে। এই চিন্তার উপর নির্ভর করেই কিছু গবেষক ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিনকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যবহার করা যায় কিনা, তা নিয়ে চিন্তা করছেন। তবে এই টিভি সাক্ষাতের পর থেকে ভ্যাকসিনের চাইতে পশ্চিমা সমাজের বর্ণবাদ নিয়েই কথা হচ্ছে বেশি।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হবার পর থেকে পশ্চিমা বিশ্বে বর্ণবাদী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী আচরণের খবর আবারও সংবাদপত্রে আসা শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রীটে এক সিঙ্গাপুর বংশোদ্ভূত ব্যক্তির উপর চার ব্যক্তি হামলা করে ব্যাপক মারধর করে। হামলাকারীরা বলে যে, ‘আমরা তোমার করোনাভাইরাস আমাদের দেশে চাই না’। ফেব্রুয়ারির শুরুতে নিউ ইয়র্কের সাবওয়ে স্টেশনে মাস্ক পড়া এক চীনা বংশোদ্ভূত মহিলার উপর হামলা করা হয় এবং তাকে ‘রোগের বাহক’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়ায় এক এশিয় পরিবারের গাড়ির উপর করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে গালাগালি লেখা হয়। ক্যালিফোর্নিয়াতে এক স্কুলে চীনা বংশোদ্ভূত এক ছাত্রকে কাশি দেবার কারণে শিক্ষক নার্সের কাছে যেতে বলেন, যদিও অন্যদের জন্যে তিনি তা বলেননি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৬ই মার্চ এক টুইটার বার্তায় করোনাভাইরাসকে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে আখ্যা দেবার সাথেসাথেই চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের মাঝে নতুন করে শংকা দেখা দিয়েছে। নিউ ইয়র্কের জনপ্রতিনিধি গ্রেইস মেং একজন চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিনী। তিনি ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, বিভিন্ন দেশে চীনাদের বিরুদ্ধে হয়রানি এবং আক্রমণের ঘটনার খবর শুনে মনে হয় যে, চীনা বংশোদ্ভূত জনগণকে এখনও বিদেশী বলেই আখ্যা দেয়া হয়। পত্রিকাটা বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে যুগের পর যুগ বর্ণবাদ এবং বৈষম্য পেরিয়ে এশিয় বংশোদ্ভূতরা অনেক আশা নিয়ে একুশ শতক শুরু করেছিল। তিনজন এশিয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দাঁড়িয়েছেন, যা কিনা এশিয়দের মাঝে আশার সঞ্চার করেছিল। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু পর থেকে মার্কিন শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীরা এশিয় বংশোদ্ভূতদেরকে ভাইরাসের সংক্রমণের জন্যে দায়ি করতে থাকে এবং একইসাথে এশিয়দের উপর বিপুল সংখ্যায় আক্রমণ আসতে থাকে। শতশত মানুষ হামলার কথা রিপোর্ট করলেও বহু মানুষ এব্যাপারে কোন রিপোর্টই করেনি।
   
 
বহু আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে চীনাদেরকে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের, নোংড়া এবং রুগ্ন মানুষ হিসেবে দেখা হতো। ১৮৭০ সাল থেকে চীন থেকে আসা শ্রমিকদেরকে শ্বেতাঙ্গরা তাদের চাকুরি হারাবার কারণ হিসেবে দেখতে থাকে। ১৮৮২ সালে এক আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা শ্রমিকের আসা বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর ১৯৪০এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা জাপানিদের ভাগ্যে জোটে ব্যাপক অত্যাচার। যুক্তরাষ্ট্রে বরাবরই এশিয় এবং অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ দেশ থেকে আগত জনগণকে অপেক্ষাকৃত নিম্ন স্তরের মানুষ এবং রোগের বাহক হিসেবে দেখা হয়েছে।




জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের প্রফেসর রসালিন্ড চৌ বলছেন যে, তিনি এখন জনসন্মুখে কাশি দিতেও ভয় পান। কারণ তিনি মনে করছেন যে, এশিয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় তাকে কাশি দিতে দেখে অন্যরা সেটাকে কিভাবে দেখবে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ক্লেয়ার জীন কিম বলেন যে, বহু আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে চীনাদেরকে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের, নোংড়া এবং রুগ্ন মানুষ হিসেবে দেখা হতো। ১৮৭০ সাল থেকে চীন থেকে আসা শ্রমিকদেরকে শ্বেতাঙ্গরা তাদের চাকুরি হারাবার কারণ হিসেবে দেখতে থাকে। ১৮৮২ সালে এক আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা শ্রমিকের আসা বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর ১৯৪০এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা জাপানিদের ভাগ্যে জোটে ব্যাপক অত্যাচার। যুক্তরাষ্ট্রে বরাবরই এশিয় এবং অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ দেশ থেকে আগত জনগণকে অপেক্ষাকৃত নিম্ন স্তরের মানুষ এবং রোগের বাহক হিসেবে দেখা হয়েছে। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট শহরে গাড়ির ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা কিছু লোক ভিনসেন্ট চিন নামে এক চীনা আমেরিকানকে পিটিয়ে হত্যা করে। সেসময় তারা তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্যে এশিয়দেরকে দায়ি করেছিল। এরপর ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে বাদামি বর্ণের যেকোন মানুষ দেখলেই তাকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দেয়া হতো। এখন করোনাভাইরাসের প্রভাব কবে কমবে, তা যেহেতু কেউই বলতে পারছে না, তাই এশিয়দের বিরুদ্ধে মার্কিন উগ্রবাদী শ্বেতাঙ্গদের আক্রমণাত্মক এই অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

‘দ্যা আটলান্টিক’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, পশ্চিমা সমাজে মহামারী সবসময়েই ভীতির সঞ্চার করেছে। আর এই ভীতি শেষ পর্যন্ত বৈষম্যের মাঝ দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের সংক্রমণের সময় পূর্ব এশিয়দের টার্গেট করা হয়েছিল। ২০১৪ সালে ইবোলা ভাইরাসের কারণে টার্গেট করা হয়েছিল আফ্রিকানদের। ইবোলা ভাইরাসের নাম দেয়া হয়েছে আফ্রিকার একটা নদীর নামে; যেকারণে এই ভাইরাসটা স্বাভাবিকভাবেই আফ্রিকান ভাইরাস হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০১২ সালে সংক্রমিত হওয়া ‘মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম’ বা ‘মার্স’ ভাইরাসের নামের সাথেই মধ্যপ্রাচ্যকে জুড়ে দেয়া হয়। এবারে করোনাভাইরাসকে একইভাবে অনেক মার্কিন নেতারা ‘উহান ভাইরাস’ বলে আখ্যা দিতে কার্পণ্য করেননি। ইউরোপের উগ্রবাদী ডানপন্থী নেতারা ভাইরাসের সংক্রমণকে যুক্ত করতে চাইছেন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সাথে। ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স এবং স্পেনে ডানপন্থী নেতারা ভাইরাস সংক্রমণের কারণ হিসেবে এশিয় এবং আফ্রিকান অভিবাসীদের দুষতে ভুল করেননি। ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মিরি সং ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছুতোয় বাহ্যিকভাবে আলাদা করা যায় এমন গ্রুপগুলিকে টার্গেট করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের মতো দেশে এটা বাকিদের চাইতে অনেক বেশি হয়েছে। ‘নাইন ইলেভেন’এর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা, বা আরব, মুসলিম এবং শিখদের উপর হামলা বেড়ে যায়। ব্রিটেনেও ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে জাতিগত এবং ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হামলার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।
  
  
চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্লেগের আবির্ভাব হয়, যা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বলে পরিচিত। সেসময় ইউরোপিয়রা মনে করেছিল যে, ইহুদী বণিকরা সিল্ক রুটের মাধ্যমে ইউরোপে প্লেগ এনেছিল। এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সারা ইউরোপে ইহুদীদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার চলেছিল। ১৩৪৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ গণহত্যা ছিল সবচাইতে ভয়াবহ; যখন ২ হাজার ইহুদীকে স্ট্রাসবুর্গ শহরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। মানুষকে রোগের বাহক বা তেলাপোকার সাথে তুলনা দিলে হত্যা করাটা সহজতর হয়েছে। এই কথাগুলি পশ্চিমা সমাজের গোঁড়ার সমস্যাকেই তুলে ধরে। করোনাভাইরাস এই সমস্যাকে শুধু আরেকবার সামনে নিয়ে এলো মাত্র।



ইউনিভার্সিটি অব বাথএর প্রফেসর ব্র্যাড ইভান্স ব্রিটেনের ‘দ্যা ইন্ডেপেন্ডেন্ট’এর এক লেখায় পশ্চিমা সমাজের বর্ণবাদের ইতিহাসকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্লেগের আবির্ভাব হয়, যা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বলে পরিচিত। সেসময় ইউরোপিয়রা মনে করেছিল যে, ইহুদী বণিকরা সিল্ক রুটের মাধ্যমে ইউরোপে প্লেগ এনেছিল। এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সারা ইউরোপে ইহুদীদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার চলেছিল। ১৩৪৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ গণহত্যা ছিল সবচাইতে ভয়াবহ; যখন ২ হাজার ইহুদীকে স্ট্রাসবুর্গ শহরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। ইভান্স বলছেন যে, বর্ণবাদ ও জাতিগত বিদ্বেষ পশ্চিমাদের জীবনব্যবস্থার মাঝে গেঁথেই ছিল। ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো পশ্চিমা চিন্তাগুলি এই বিদ্বেষকে নিয়ন্ত্রণ তো করেইনি, বরং লালনপালন করেছে। প্রতিটা গণহত্যার সময়ই সমাজের কিছু মানুষকে ইঁদুরের সাথে তুলনা দেয়া হয়েছে; বলা হয়েছে যে, এরা হলো রোগের বাহক। মানুষকে রোগের বাহক বা তেলাপোকার সাথে তুলনা দিলে হত্যা করাটা সহজতর হয়েছে। ইভান্সএর কথাগুলি পশ্চিমা সমাজের গোঁড়ার সমস্যাকেই তুলে ধরে। করোনাভাইরাস এই সমস্যাকে শুধু আরেকবার সামনে নিয়ে এলো মাত্র।


Friday, 3 April 2020

করোনাভাইরাস - সুইডেনে কোন লকডাউন নেই কেন?

৪ঠা এপ্রিল ২০২০
ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিতে লকডাউনের মাঝ দিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার পর লকডাউন ভাঙ্গার বহু উদাহরণ দেখা গেছে। সুইডেন সেই পথে হাঁটতেই নারাজ। সুইডেন ইউরোপের সবচাইতে বেশি লিবারাল চিন্তার রাষ্ট্র বলেই পরিচিত। ব্যক্তিস্বাধীনতার নিরাপত্তা দেয়াকে সুইডিশরা পবিত্র দায়িত্ব হিসেবেই দেখে। করোনাভাইরাস ইস্যু শুধুমাত্র দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সুইডিশরা ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সমাজের দুর্বলদের সুরক্ষা দেবার উপরে স্থান দিচ্ছে।


পশ্চিমা দেশগুলির মাঝে প্রায় সবগুলি দেশই নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ‘লকডাউন’এর পথে হাঁটলেও সুইডেন এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সুইডেনের স্কুল, রেস্তোঁরা, শপিং মল, বার, সিনেমা হল এবং স্কি রেজর্টের মতো জায়গাগুলি এখনও খোলা রয়েছে। ট্রেন-বাস চলছে সমানে। শুধুমাত্র ৫০ জনের বেশি মানুষের জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং রেস্তোঁরায় দূরত্ব বজায় রেখে বসতে বলা হয়েছে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সুইডেন এবং ডেনমার্কের মাঝে ‘ওরেসুন্ড’ সেতু পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, কেননা সেতুর দক্ষিণের ডেনমার্ক তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। তবে সুইডেন এই সেতুর উত্তর দিক খোলাই রেখেছে। সেখানে এখনও মানুষ হাত ধরাধরি করে রাস্তায় হাঁটছে। খোলা স্থানে পিকনিক এবং বারবিকিউ চলছে; স্কেটিং এবং খেলার মাঠে খেলাও চলছে বেশ। কেউই মাস্ক পড়ছে না। সুইডেনের এই নীতির পিছনে চিন্তাগুলি এখন আলোচনার বিষয় হয়ে গেছে।

৩রা এপ্রিল পর্যন্ত সুইডেনে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৬ হাজার ১’শ ৩১; এর মাঝে মৃত্যুবরণ করেছেন ৩’শ ৫৮ জন। এখন পর্যন্ত প্রতি লাখের মাঝে আক্রান্ত হয়েছে ৬১ জন। ব্রিটেনে এটা ৫৭ জন; জার্মানিতে ১০৮ জন; ফ্রান্সে ৮৮ জন; নরওয়েতে ৯৯ জন; ডেনমার্কে ৬৭ জন; ফিনল্যান্ডে ২৯ জন। অর্থাৎ সুইডেন যে করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ, তা বলা যাচ্ছে না।

‘ইউগভ’ নামের এক গবেষণা সংস্থার এক নিয়মিত গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, ২৬টা দেশের মাঝে সুইডেনের মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার ব্যাপারে সবচাইতে কম ভীতির মাঝে রয়েছে। ২৯শে মার্চের ফলাফল বলছে যে, মাত্র ৩১ শতাংশ সুইডিশ আক্রান্ত হবার ব্যাপারে খুব বেশি বা কিছুটা ভীত। এর বিপরীতে এই সংখ্যাটা ইতালিতে ৭২ শতাংশ, ফ্রান্সে ৭০ শতাংশ, ব্রিটেনে ৬১ শতাংশ, স্পেনে ৫০ শতাংশ, জার্মানিতে ৪৯ শতাংশ, নরওয়েতে ৪৮ শতাংশ, ডেনমার্কে ৪২ শতাংশ এবং ফিনল্যান্ডে ৩৯ শতাংশ। এশিয়ার দেশগুলিতে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। তবে সুইডেনের মানুষ নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করলেও পরিসংখ্যান বলছে অন্যরকম।

‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, মানুষ সম্ভবতঃ একেকটা দেশের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রকাশ করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা হচ্ছে যে, মালয়েশিয়ায় ৪৫ জন করোনাভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেছে; আর ভিয়েতনামে একজনও মারা যায়নি। অথচ দুই দেশই ভাইরাস প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলস্বরূপ, মালয়েশিয়াতে ৯০ শতাংশ জনগণ সংক্রমণের ভয়ে রয়েছে; ভিয়েতনামে এই সংখ্যা ৮৯ শতাংশ। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, সুইডেনের রাস্তার পরিস্থিতি দেখে দেশের মানুষের মাঝে কোন ভীতি না আসাটাই স্বাভাবিক। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্তেফান লোফুয়েন সুইডিশদেরকে ‘প্রাপ্তবয়স্ক’দের মতো আচরণ করতে বলেন এবং ‘উদ্বেগ বা গুজব’ ছড়াতে মানা করেন। সুইডেনের প্রধান রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ এন্ডার্স তেগনেল বলছেন যে, লকডাউন করলে পুরো ব্যবস্থাটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। মাসের পর মাস লকডাউন অসম্ভব। বরং কিছুদিন পরপর কঠোর সিদ্ধান্তে যেতে হবে; আর সেটা চালাতে হবে যতটা সম্ভব স্বল্প সময়ের জন্যে। তেগনেলের কথাগুলিই সুইডিশরা মেনে নিয়েছে। সুইডেনে গত ৩’শ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের উপর দেশের মানুষের অগাধ বিশ্বাস জন্মেছে; যেকারণে বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন, জনগণ তা-ই মেনে চলছে।

‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সুইডেনের এই নীতির ফলে দেশটার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকে নিম্নস্তরের মানুষগুলি মৃত্যুঝুঁকির মাঝে পড়ে যাচ্ছে। এদের মাঝে অনেকেই মনে করছেন যে, সুইডিশ সরকার এই মানুষগুলিকে করোনাভাইরাসের ফ্রন্টলাইনে ছেড়ে দিয়েছে। সুইডেনের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন না যে, শিশুরা এই রোগের শক্তিশালী বাহক। তাই সুইডেনের অনেক স্কুল এখনও খোলা রয়েছে। নোবেল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কার্ল হেনরিক হেলডিন-সহ সুইডেনের দুই হাজার মেডিক্যাল প্রফেশনালের স্বাক্ষরসহ এক চিঠিতে সুইডেনের এহেন নীতির সমালোচনা করে বলা হয় যে, এই নীতি সুইডেনকে মারাত্মক দুর্যোগের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তবে এই নীতির পক্ষেও রয়েছেন অনেকে। সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর পিটার নিলসন বলছেন যে, বাকি বিশ্বে রাজনীতিবিদেরা লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিলেও সুইডেনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীও সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞদের মতামতের উপর। তারা বলছেন যে, অনির্দিষ্টকালের জন্যে লকডাউন চালিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আর এই মহামারী আবারও ফিরে আসবে না, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনা। অতীতের বিভিন্ন রোগের সংক্রমণের ইতিহাস বলছে যে, সকলেরই উচিৎ মহামারীর দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বারের মতো সংক্রমণকে এড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।

সুইডেনের ‘কারোলিন্সকা ইন্সটিটিউট’এর গবেষক সেসিলিয়া সোডারবার্গ নাউক্লের বলছেন যে, সরকার মনে করছে যে, এই মহামারিকে তারা রুখতে পারবে না; সুতরাং তারা মানুষকে মরতে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর মানুষ অন্ধভাবে সরকারের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছে। তিনি মনে করছেন যে, কিছুদিনের মাঝেই স্টকহোমে ইতালির মতো আইসিইউএর ভয়ঙ্কর অপ্রতুলতা দেখা দেবে। আর তখন কিছুই করার থাকবে না। নাউক্লেরের সমালোচনাগুলি অমূলক নয়; কারণ অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকে সুইডেনের নিম্নস্তরের মানুষগুলিই থাকবে মৃত্যুঝুঁকিতে। সুইডেনের জনগণের রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করার আরেকটা কারণ রয়েছে; তারা সুইডেনের স্বাধীনচেতা আদর্শকে তুলে ধরে রাখতে অনড় রয়েছেন। নিজ উদ্যোগে সুইডেনের স্পোর্টস ক্লাবগুলি তাদের যুব কর্মকান্ডগুলি থামিয়ে দিলে দেশটার পাবলিক হেলথ এজেন্সির ডিরেক্টর জেনারেল ইহোহান কার্লসন ক্লাবগুলিকে এই কর্মকান্ড পুনরায় শুরু করার জন্যে আহ্বান জানান। ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিতে লকডাউনের মাঝ দিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার পর লকডাউন ভাঙ্গার বহু উদাহরণ দেখা গেছে। সুইডেন সেই পথে হাঁটতেই নারাজ। সুইডেন ইউরোপের সবচাইতে বেশি লিবারাল চিন্তার রাষ্ট্র বলেই পরিচিত। ব্যক্তিস্বাধীনতার নিরাপত্তা দেয়াকে সুইডিশরা পবিত্র দায়িত্ব হিসেবেই দেখে। করোনাভাইরাস ইস্যু শুধুমাত্র দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সুইডিশরা ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সমাজের দুর্বলদের সুরক্ষা দেবার উপরে স্থান দিচ্ছে।