Friday, 10 May 2019

“ব্লু হোমল্যান্ড” নৌ-মহড়া তুরস্কের ভূ-রাজনৈতিক আকাংক্ষাকেই তুলে ধরে

১০ই মে, ২০১৯

গত ফেব্রুয়ারি-মার্চে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নৌ-মহড়া ‘ব্লু হোমল্যান্ড’। তুর্কী নৌবাহিনী বলছে যে, এটা ছিল ১৯২৩ সালে তুরস্কের জন্মের পর থেকে সবচাইতে বড় নৌ-মহড়া; যাতে কিনা ১’শ ৩ খানা যুদ্ধজাহাজ অংশ নিয়েছে। ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ নৌ-মহড়া দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তুরস্ক একটা নৌ-শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।


গত ফেব্রুয়ারি-মার্চে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নৌ-মহড়া ‘ব্লু হোমল্যান্ড’। তুর্কী নৌবাহিনী বলছে যে, এটা ছিল ১৯২৩ সালে তুরস্কের জন্মের পর থেকে সবচাইতে বড় নৌ-মহড়া; যাতে কিনা ১’শ ৩ খানা যুদ্ধজাহাজ অংশ নিয়েছে। একইসাথে তুর্কী বিমান বাহিনী এবং সেনাবাহিনীও এই মহড়ায় অংশ নেয়। মহড়ায় ১৩টা ফ্রিগেট, ৬টা কর্ভেট, ১৬টা এসল্ট বোট, ৭টা সাবমেরিন, ৭টা মাইন-হান্টার, ১৪টা প্যাট্রোল বোট-সহ আরও অন্যান্য জাহাজ অংশ নেয়। তুর্কী প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকার বলেন যে, তুরস্ক তার শক্তিকে অন্যান্য দেশের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে পুরোপুরি সফল হয়েছে। ২৭শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ই মার্চের মাঝে পরিচালিত এই মহড়া ছয় মাস আগ থেকে পরিকল্পনা করা হয়েছিল; এবং মহড়ার ব্যাপারে গ্রীসকে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল, যাতে করে গ্রীকদের সাথে কোনরূপ বিরোধের সূত্রপাত না হয়। তুরস্কের নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার এডমিরাল চেম গুরদেনিজ-এর মতে, ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ নৌ-মহড়া দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তুরস্ক একটা নৌ-শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। তুরস্কের নৌশক্তির মুলে রয়েছে তুরস্কের সামরিক শিল্প; বাহিনীর সংখ্যা বা আকার নয়। মহড়াতে অংশ নেয়া বেশিরভাগ সমরশক্তিই তুরস্কের নিজস্ব কারখানা থেকে তৈরি।

এডমিরাল গুরদেনিজ এ-ও বলছেন যে, এই মহড়া দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্ককে নিয়ন্ত্রণের জন্যে অন্য দেশগুলি একত্রিত হচ্ছে। প্রভাবশালী এই এডমিরালই ২০০৬ সালে ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ নামের জন্ম দেন, এবং একই নামে ২০১৩ সালে তিনি ‘আইদিনলিক’ পত্রিকায় কলাম লেখা শুরু করেন। তুরস্কের ‘হুরিয়েত’ পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাতে তিনি বলেন যে, তিনি তখনই চিন্তা করেছিলেন যে, ২১-শতকে তুরস্কের জন্যে ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ মহড়া হতে যাচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই মহড়ার মাঝে কৃষ্ণ সাগর, ইজিয়ান সাগর এবং ভূমধ্যসাগর অন্তর্ভূক্ত; আর সামনের দিনগুলিতে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের সাথে অন্যান্য দেশের বিভেদ বাড়তেই থাকবে। আর তুরস্কের সামনে ভূরাজনৈতিক যে চ্যালেঞ্জগুলি রয়েছে, তার মাঝে রয়েছে সমুদ্র-তলদেশের সম্পদ আহরণ, সমুদ্র-বন্দরসহ একটা কূর্দী রাষ্ট্রের জন্ম এবং উত্তর সাইপ্রাসের ভবিষ্যৎ। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ বা ‘ইইজেড’এর আকার-আকৃতি নির্ধারিত হয়নি, যা কিনা তুরস্ককে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে। ইউরোপিয়রা তুরস্কের এই ব্যাপারটাকে সমাধান করার ক্ষেত্রে খুব একটা আগ্রহী নয়। মার্কিন এবং ইউরোপিয় কোম্পানিগুলি গ্রীক-নিয়ন্ত্রিত সাইপ্রাসে খণিজ সম্পদ আহরণে চেষ্টা করছে। গ্রীকরা বহুকাল ধরেই চিন্তা করছিল যে, তুর্কীরা স্থলভাগের শক্তি; ম্যারিটাইম শক্তি নয়। কিন্তু কয়েক’শ বছরের মাঝে প্রথমবারের মতো তুর্কীরা ঘোষণা দিচ্ছে যে, তুরস্ক একটা ম্যারিটাইম শক্তি। গুরদেনিজ বলছেন যে, পশ্চিমা দেশগুলি নিজেদের গ্রুপের বাইরের কোন দেশকে ম্যারিটাইম শক্তি হিসেবে দেখতে চায় না। তারা চায় যে, এই গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান-সহ কয়েকটা দেশই থাকুক। সেই দেশগুলি তাই তুরস্কের নৌ-শক্তিকে আটকাতে বিভিন্ন সময়ে ষড়যন্ত্র করেছে। এসব ষড়যন্ত্র বানচাল করার পরই ২০০৮ সাল থেকে তুরস্ক ভূমধ্যসাগর এবং কৃষ্ণসাগরের বাইরে ভারত মহাসাগরেও স্থায়ীভাবে পদার্পণ করেছে। সোমালিয়ার উপকূলে তুর্কী বাণিজ্য জাহাজ হাইজ্যাক হচ্ছিল; যা কিনা সেখানে তুরস্কের নৌ-শক্তি মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে প্রেরণা যুগিয়েছে।
 

অবসরপ্রাপ্ত এডমিরাল গুরদেনিজ বলছেন যে, তুরস্ক এখন পৃথিবীর ১৭তম বৃহৎ অর্থনীতি; এবং পৃথিবীর সকল আনাচে-কানাচে তুর্কীরা বসবাস করে এবং সেখানে তুরস্কের ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। দেশটার ৯০ শতাংশ বাণিজ্য হয় সমুদ্রপথে। এই সমুদ্র-বাণিজ্যের পথগুলিকে রক্ষা করার জন্যেই শক্তিশালী নৌবাহিনীর প্রয়োজন। যেখানেই তুর্কী বাণিজ্য জাহাজ যাচ্ছে, সেখানেই তুর্কী নৌবাহিনীর জাহাজকে নিরাপত্তা দেবার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। গুরদেনিজের বক্তব্যগুলি তুরস্কের সামরিক নীতিরই প্রতিফলন।


তবে এডমিরাল গুরদেনিজের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য সম্ভবতঃ তুরস্কের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সাথে সম্পর্কিত। তিনি বলছেন যে, তুরস্ক এখন পৃথিবীর ১৭তম বৃহৎ অর্থনীতি; এবং পৃথিবীর সকল আনাচে-কানাচে তুর্কীরা বসবাস করে এবং সেখানে তুরস্কের ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। দেশটার ৯০ শতাংশ বাণিজ্য হয় সমুদ্রপথে। এই সমুদ্র-বাণিজ্যের পথগুলিকে রক্ষা করার জন্যেই শক্তিশালী নৌবাহিনীর প্রয়োজন। যেখানেই তুর্কী বাণিজ্য জাহাজ যাচ্ছে, সেখানেই তুর্কী নৌবাহিনীর জাহাজকে নিরাপত্তা দেবার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। গুরদেনিজের বক্তব্যগুলি তুরস্কের সামরিক নীতিরই প্রতিফলন। ইস্তাম্বুলে এখন তৈরি হচ্ছে তুরস্কের প্রথম হাল্কা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘আনাদোলু’। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ২০২০-এ এই জাহাজ কমিশনিং-এর পর থেকে তা তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।     



‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর ‘সেন্টার অন দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস এন্ড ইউরোপ’এর এক লেখায় সিনিয়র ফেলো ওমার তাসপিনার তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনশীলতার ব্যাপারগুলিকে তুলে ধরেন। ঠান্ডা যুদ্ধের শেষে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত তুরস্ক চলেছে মুস্তফা কেমাল-এর অনুসারীদের কথায়, যাদেরকে চিন্তাগত দিক থেকে ‘কেমালিস্ট’ বলা হয়। ‘কেমালিস্ট’রা ছিলেন ইউরোপ-ঘেঁষা এবং কট্টর সেকুলার। উথমানি সময়ের কোন কিছুই তারা ফিরিয়ে আনতে রাজি ছিলেন না, মূলতঃ ইসলামের ফিরে আসার ভয়ে। সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ অফিসারই একসময় কেমালিস্ট ছিলেন। উথমানি সময়ের বৈশ্বিক চিন্তাধারাকে তারা পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে ইউরোপের সাথে মিলিত হবার চেষ্টা করছিলেন। তবে ২০০২ সালে রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের ‘একে’ পার্টি ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র যখন তুরস্কের নতুন ‘মডারেট ইসলামিক’ ধারাকে সমর্থন দিতে শুরু করলো, তখন ‘কেমালিস্ট’রা ‘একে’ পার্টির সকল নীতিরই বিরোধিতা শুরু করলো। ‘একে’ পার্টি ‘ইইউ’এর সাথে একত্রিত হবার জন্যে যখন যারপরনাই চেষ্টা শুরু করলো, তখন ‘কেমালিস্ট’রা ‘ইইউ’এ অন্তর্ভূক্তির বিরোধিতা শুরু করলো। তারা বরং তখন ইউরোপ থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাশিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য,এবং অন্যান্য দেশের সাথে কৌশলগত বন্ধুত্ব খোঁজার পরামর্শ দিতে লাগলো। ইতোমধ্যে ‘একে’ পার্টি উথমানি সময়ের গৌরবকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে উথমানি প্রভাবে থাকা এলাকাগুলিকে তুরস্কের প্রভাবে আনার চেষ্টা করা শুরু করে। এই চিন্তাধারাকে তুরস্কে ‘নিও-অটোমান’ বলা হতে থাকে। তবে ‘একে’ পার্টিই এই চিন্তার আবিষ্কারক নয়। তুর্কী প্রেসিডেন্ট তুরগুত ওজাল-ই তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিকে পরিবর্তনের চেষ্টা শুরু করেন। ১৯৯৩ সালে এই চিন্তাকে ‘নিও-অটোমানিজম’ বলে আখ্যা দেন তুর্কী লেখক চেঙ্গিজ চান্দার। চান্দার বলা শুরু করেন যে, তুরস্কের ‘কেমালিস্ট’ চিন্তা বর্জন করা উচিৎ। তুরগুত ওজালের ‘মাদারল্যান্ড’ পার্টির চিন্তাই ‘একে’ পার্টি’র জন্ম দিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০২ সালে ‘একে’ পার্টি ক্ষমতায় আসার পর এরদোগান তার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আহমেত দাভুতোগলুর নেতৃত্বে তুরস্কের বঞ্চিত পররাষ্ট্র দপ্তরকে বড় করেন এবং এই দপ্তরের কর্মকান্ডকে নতুন রূপ দেন। দাভুতোগলু একজন চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ এবং কূটনীতিবিদ, যিনি তার “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” বই-এর মাধ্যমে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘নিও-অটোমান’এর দিকে ধাবিত করেন। “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” বলতে তিনি ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক – উভয় দিক থেকেই তুরস্কের কৌশলগত প্রভাবের কথা বলেন, যেক্ষেত্রে উথমানি সময়ের গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলিকে পুঁজি করেই সামনে এগুতে হবে বলেন তিনি। দাভুতোগলুর নীতি অনুসরণ করেই তুরস্ক আশেপাশের দেশগুলির সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে। কুর্দী বিদ্রোহীদের ব্যাপারটাকে কেন্দ্র করে তুরস্ক একাধারে ইরান, ইরাক এবং সিরিয়ার সাথে আলোচনা শুরু করে। এরপর ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন তুরস্কের ভূখন্ড ব্যবহার করে ইরাক আক্রমণের চিন্তা করে, তখন দাভুতোগলুর নীতি অনুসরণ করেই তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রকে ‘না’ বলে। এরপর সিরিয়া যুদ্ধের সময় তুর্কীরা সিরিয়া এবং ইরাকে পুরোপুরি জড়িয়ে যায়। সোমালিয়ায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে সেখানে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে তুরস্ক। সৌদি গ্রুপের সাথে উত্তেজনার জের ধরে কাতারেও সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে তুরস্ক। ২০১৮-এর সেপ্টেম্বরে এরদোগান ঘোষণা দেন যে, আফ্রিকাতে তুরস্কের দূতাবাসের সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে বর্তমানে ৪১ করা হলেও, সেই সংখ্যাকে বর্তমানে ৫৪-তে উন্নীত করার চেষ্টা চলছে। সুদানেও নৌঘাঁটি তৈরির চেষ্টায় রয়েছে তুর্কীরা। ইউরোপে বসবাসরত তুর্কীদেরকেও তুরস্ক ব্যবহার করছে সেসব দেশে তুর্কী প্রভাব বাড়াতে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতেও তুরস্ক তার প্রভাব বাড়াচ্ছে কাজাখস্তান, জর্জিয়া এবং আজেরবাইজানের মাধ্যমে।

একইসাথে দাভুতোগলু পুরো মুসলিম দুনিয়াকে 'এক উম্মা' হিসেবে চিন্তা করতে চাইছেন। এবং জাতিরাষ্ট্রের ভিতকেও তিনি প্রশ্ন করছেন তার লেখায়। তিনি আরও বলছেন যে, দুনিয়ার ১৬টা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের আটটাই মুসলিম দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণে, যা কিনা মুসলিম দুনিয়াকে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে। তবে তিনি তুর্কী জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করেই মুসলিম উম্মাকে এক বলে চিন্তা করেছেন। বর্তমান তুরস্ক জাতিরাষ্ট্র কনসেম্পট-এরই অংশ, যা নিয়ে প্রশ্ন করে তিনি তুর্কী জাতীয়তাবাদীদের ক্ষেপিয়ে তুলতে চাননি।  
  
আহমেত দাভুতোগলু একজন চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ এবং কূটনীতিবিদ, যিনি তার “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” বই-এর মাধ্যমে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘নিও-অটোমান’এর দিকে ধাবিত করেন। “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” বলতে তিনি ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক – উভয় দিক থেকেই তুরস্কের কৌশলগত প্রভাবের কথা বলেন, যেক্ষেত্রে উথমানি সময়ের গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলিকে পুঁজি করেই সামনে এগুতে হবে বলেন তিনি।



তবে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, এই ‘নিও-অটোমান’ এবং ‘কেমালিস্ট’ উভয় দলই বর্তমানে তুরস্কের বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে পুনরুদ্ধ্বার করার চেষ্টায় মনোযোগী হয়েছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে উভয় পক্ষই তুরস্ককে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখার চেষ্টা করছে; উভয় পক্ষই তুরস্কের সামরিক শক্তিকে উন্নত করে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক ক্ষেত্রে এর উপযোগী ব্যবহার খুঁজতে চাইছে। এই দুই গ্রুপের এক গ্রুপ উথমানি খিলাফতের সময়কার ইসলামিক ভাবধারাকে যেমন বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করতে চাইছে, তেমনি আরেক গ্রুপ কট্টর সেকুলার চিন্তাকে লালন করেই তুরস্ককে পশ্চিমা চাপের মাঝ থেকে বের করে আনতে চাইছে। উভয় পক্ষই মূলতঃ জাতীয়তাবাদী চিন্তা দ্বারা ধাবিত। তবে এই চিন্তা ক্রমশঃ তুরস্ককে পশ্চিমাদের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।

অনলাইন নিরাপত্তা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রকস’এর এক লেখায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার নেভাল পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট স্কুলের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের প্রফেসর রায়ান জিনগেরাস বলছেন যে, যদিও বর্তমানে তুরস্ক ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এক জটিল সম্পর্কের মাঝে আটকে আছে, তদুপরি তুর্কী জনগণের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন এখন প্রবল। আর এই স্বপ্নের প্রমাণ তুরস্কের রাজনৈতিক ক্যানভাসের সর্বকোণেই দৃশ্যমান হচ্ছে। রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, মিডিয়ার লোকজন, সামরিক অফিসার, ব্যবসায়ী, ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ এখন তুরস্কের বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে কথা বলছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের উথমানি খিলাফতের সময়ের স্মৃতিকেই তুরস্কের জনগণ এখন আঁকড়ে ধরে সামনে এগুতে চাইছে। তুরস্কের বিভিন্ন মহলে এখন মুস্তফা কেমাল আতাতুর্কের সময়কার ক্ষুদ্র পরিসরের পররাষ্ট্রনীতিকে সমালোচনা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে, উথমানি সময়ে তুরস্কের যেমনি একটা বৈশ্বিক চিন্তা ছিল, সেটা আতাতুর্কের সময় অব্যহত না রাখার কারণে জন্মের পর থেকেই তুরস্ক উথমানি সময়ের গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানের কিছুই ধরে রাখতে পারেনি। বিশেষ করে উথমানি সময়ে ইস্তাম্বুলের সরাসরি শাসনের অধীনে থাকা পুর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চল, সিরিয়া, মিশর, উত্তর আফ্রিকা, পূর্ব আফ্রিকা, এবং পারস্যে (ইরাক) ১৯২৩-পরবর্তী তুরস্কের কোন প্রভাব ছিল না বললেই চলে। প্রফেসর জিনগেরাসের মতে, তুরস্কের জনগণের আকাংক্ষা তুরস্ককে এমন এক দিকে ধাবিত করছে, যা কিনা দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের ভবিষ্যৎ বিভেদের গল্পটা লিখে দিচ্ছে।

Saturday, 4 May 2019

ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনাম নৌ-বিরোধ পূর্ব এশিয়ায় নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে

৫ই মে ২০১৯

২৭শে এপ্রিল ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘কেএন-২১৩’ ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজ ‘তিপতাদি’কে সজোরে ধাক্কা দেয়।


গত ২৭শে এপ্রিল দক্ষিণ চীন সাগরে ইন্দোনেশিয়ার নতুনা দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি দেশটার নৌবাহিনীর জাহাজ ‘তিপতাদি’কে ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের একটা জাহাজ ধাক্কা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার জাহাজখানা ভিয়েতনামের একটা ফিশিং ট্রলারকে আটক করে এবং এর ১২ জন নাবিককে গ্রেপ্তার করে। জাহাজের দু’জন ক্রুকে অবশ্য ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ তুলে নেয়। ভিয়েতনাম সরকার দাবি করে যে, ইন্দোনেশিয়া সমুদ্রের যে স্থানে ভিয়েতনামের ফিশিং ট্রলারটা আটক করে, তা ভিয়েতনামের ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ বা ‘ইইজেড’এর অংশ। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া দাবি করে যে, ফিশিং ট্রলারটা বেআইনীভাবে ইন্দোনেশিয়ার ‘ইইজেড’এ মাছ ধরছিলো। ইন্দোনেশিয়া সরকার তাদের নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে ধারণ করা একটা ভিডিও প্রকাশ করে, যা-তে দেখা যায় যে, ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘কেএন-২১৩’ ইন্দোনেশিয়ার জাহাজটাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ঘটনার পর ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তর জাকার্তাতে ভিয়েতনামের রাষ্টদূতকে ডেকে প্রতিবাদ করে। ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই ঘটনা ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনামের সম্পর্ককে আরও জটিল করছে। তবে এই ঘটনার সূত্র ধরে অত্র অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণও নতুন করে দেখার সময় এসেছে।

গত ফেব্রুয়ারিতেও ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী ভিয়েতনামের ৪টা ফিশিং ট্রলার আটক করে। ইন্দোনেশিয়ার মৎস্য মন্ত্রী সুসি পুজিয়াস্তুতি তখন বলেন যে, ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের দু’টা জাহাজ এই আটক কর্মকান্ডে বাধা দিতে এসেছিল। আর এই ঘটনার পুরোটাই সংঘটিত হয় ইন্দোনেশিয়ার ‘ইইজেড’এর ভেতরে। শুধু তা-ই নয়, ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রী বলেন যে, এরকম ঘটনা অহরহই ঘটছে। ঐ ঘটনার কিছুদিন আগেই ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ একই রকম এক আটক কাজে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীকে বাধা দিতে এসেছিল। এপ্রিলের ঘটনার পর ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রী ঘোষণা দেন যে, ইন্দোনেশিয়া আটক করা বিদেশী ট্রলার একত্রে জনসম্মুখে ডুবানোর রীতি পুনরায় চালু করছে। এর আগে চীন, ভিয়েতনাম এবং অন্যান্য দেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়াতে বিদেশী ট্রলার ডুবানোর এই অনুষ্ঠান ইন্দোনেশিয়া স্থগিত করেছিল। এখন এই অনুষ্ঠান আবারও শুরু করার ঘোষণায় ইন্দোনেশিয়ার সাথে চীন এবং ভিয়েতনামের সম্পর্ক নতুন করে চাপের মাঝে পড়বে। ঘোষণা অনুযায়ী ৪ঠা মে ইন্দোনেশিয়া ৫১টা ফিশিং ট্রলার ডুবানোর কাজ শুরু করে, যা কিনা দুই সপ্তাহ ধরে চলার কথা রয়েছে।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ চীন সাগরের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের সমুদ্রের নতুন করে নামকরণ করে। দক্ষিণ চীন সাগরে ইন্দোনেশিয়ার অধীনে থাকা নতুনা দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশের এলাকাকে ইন্দোনেশিয়ার সরকার ‘নর্থ নতুনা সী’ বা উত্তর নতুনা সাগর নামকরণ করে। ইন্দোনেশিয় সরকার বলে যে, তারা শুধুমাত্র ঐ এলাকায় নিজেদের ‘ইইজেড’এর অংশটা নতুন করে নামকরণ করেছে। তবে সমস্যা দাঁড়ায় ইন্দনেশিয়ার অধীন ‘ইইজেড’এর সীমানা নিয়ে। চীনারা দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় পুরোটাই নিজেদের বলে দাবি করে, এবং নিজেদের সজ্ঞায়িত ‘নাইন-ড্যাস লাইন’এর অধীনে সকল দ্বীপ এবং সমুদ্রাঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার জন্যে আশেপাশের দেশগুলির সাথে বিবাদেও জড়িয়েছে। চীনারা নতুনা সাগরে ইন্দোনেশিয়ার দাবি করা ‘ইইজেড’কে স্বীকৃতি দেয় না। তবে ইন্দোনেশিয়া তার দাবি করা ‘ইইজেড’এর মাঝে বিদেশী ফিশিং ট্রলার গ্রেপ্তার করতে থাকে। চীনা ফিশিং ট্রলারগুলিকে গ্রেপ্তার করার সময় চীনা নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলি বাধা দিতে আসে। এভাবে দুই দেশের নৌবাহিনীর মাঝে সংঘাতের সম্ভাবনা বেড়েই চলেছে প্রতিদিন। তবে মিডিয়া চীনকে এতটাই বেশি গুরুত্ব দেয় যে, ভিয়েতনামের সাথে ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্র নিয়ে বিরোধের ব্যাপারটা একেবারেই চাপা পড়ে যায়।

ইন্দোনেশিয়ার সাথে ভিয়েতনামের সমুদ্র-বিরোধ নতুন নয়। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫-এর মাঝে ইন্দোনেশিয়া সর্বমোট ৬’শ ৯২টা বিদেশী ফিশিং ট্রলার গ্রেপ্তার করে। এর মাঝে ৬৫ শতাংশ ফিশিং ট্রলার ভিয়েতনামের হবার পরেও মিডিয়াতে চীনের ব্যাপারটাই হাইলাইট হয়েছে। চীন-ইন্দোনেশিয়া বিরোধই ছিল মিডিয়ার উপজীব্য। তবে এবারে ভিয়েতনামের সাথে ইন্দোনেশিয়ার নৌ-বিরোধ দুই দেশের সরকারি বাহিনীর মাঝে হবার কারণে তা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার সাথে ভিয়েতনামের সমুদ্র-বিরোধ নতুন নয়। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫-এর মাঝে ইন্দোনেশিয়া সর্বমোট ৬’শ ৯২টা বিদেশী ফিশিং ট্রলার গ্রেপ্তার করে। এর মাঝে ৪’শ ৫৪টাই ছিল ভিয়েতনামের। ১’শ ১৬টা থাইল্যান্ডের, ৯১টা মালয়েশিয়ার এবং ৩১টা মাত্র চীনের। অর্থাৎ ৬৫ শতাংশ ফিশিং ট্রলার ভিয়েতনামের হবার পরেও মিডিয়াতে চীনের ব্যাপারটাই হাইলাইট হয়েছে। চীন-ইন্দোনেশিয়া বিরোধই ছিল মিডিয়ার উপজীব্য। তবে এবারে ভিয়েতনামের সাথে ইন্দোনেশিয়ার নৌ-বিরোধ দুই দেশের সরকারি বাহিনীর মাঝে হবার কারণে তা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

উভয় দেশই নিজেদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিচ্ছে ২০০৩ সাল থেকে। ২০১৩ সালে দুই দেশের মাঝে কৌশলগত পার্টনারশিপের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উভয় দেশই অত্র অঞ্চলে বেআইনীভাবে মাছ ধরা এবং চোরাচালান প্রতিরোধে নিজেদের নৌবাহিনীর মাঝে সমন্বয় সাধনে অগ্রসর হবার চেষ্টা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, দুই দেশের সম্পর্ক এখনও কন্টকমুক্ত নয়। ইন্দোনেশিয়ার ভাইস-প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ জুসুফ কাল্লা বলেন যে, উভয় দেশ এই মুহুর্তে আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণে আলোচনা চালাচ্ছে। এর আগে ‘নর্থ নতুনা সী’ ঘোষণা যে চীনের সাথে ভিয়েতনামের স্বার্থেও আঘাত করেছে, তা এখন সকলের সামনে চলে আসলো। সমুদ্রসীমা নির্ধারণ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে আঞ্চলিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান এবং সেই অবস্থানকে ঘিরে ইন্দোনেশিয়ার নীতি এখন আলোচনায় চলে আসছে। আঞ্চলিক শক্তি, বিশেষ করে চীনের চাপে, ইন্দোনেশিয়া তার সামরিক শক্তিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। একসময় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী সামরিক বাজেটের বেশিরভাগটা পেলেও এখন নৌ-সীমানার নিরাপত্তা নিশ্চিতে নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনী বাজেটের একটা বড় অংশ পাচ্ছে। নিরাপত্তা-বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রকস’এ এক লেখায় মার্কিন বিমান বাহিনীর অফিসার মেজর ক্যালেব স্লেইটন ইন্দোনেশিয়ার বিমান বাহিনীর এয়ার কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যের ব্যাপারে আলোচনা করেন। ঐ কোর্সে অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন যে, সেখানে বছরব্যাপী একটা প্রশিক্ষণ মহড়া চালানো হয়, যেখানে শত্রু হিসেবে ধরা হয় আঞ্চলিক শক্তিধর একটা দেশকে, যার কিনা রয়েছে শক্তিশালী নৌবাহিনী। এই প্রশিক্ষণ মহড়া ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকিগুলিকে সামনে রেখেই আয়োজন করা হচ্ছে। এতে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, দ্বীপ দেশ ইন্দোনেশিয়ার সামরিক শক্তির বর্তমান ফোকাস সমুদ্রের দিকে। আর দেশটার উত্তরে অবস্থিত শক্তিশালী রাষ্ট্র চীনকেই এক্ষেত্রে সবচাইতে বড় হুমকি হিসেবে মনে করা হচ্ছে। তবে স্লেইটনের লেখায় ভিয়েতনামের উল্লেখ নেই। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে রেষারেষিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের পক্ষ নিয়েছে। তাই ইন্দোনেশিয়া কেন চীন এবং ভিয়েতনাম উভয়ের ব্যাপারেই কড়া নীতি নিয়ে এগুচ্ছে, তা বুঝতে হলে সাম্প্রতিককালে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক ঘাঁটি উন্নয়ের ধারার দিকে তাকাতে হবে।


ইন্দোনেশিয়ার স্বঘোষিত ‘নর্থ নতুনা সী’তে নতুনা দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের সকল স্থলভাগের ঠিক মাঝখানে এই দ্বীপ। কৌশলগত মালাক্কা প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা বেশিরভাগ জাহাজকেই এই দ্বীপের পাশ দিয়ে যেতে হয়। এই দ্বীপপুঞ্জের নতুনা বা রিয়াউ দ্বীপে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর সমন্বিত ঘাঁটি উন্নয়নের কাজ করছে ইন্দোনেশিয়া।


ইন্দোনেশিয়ার স্বঘোষিত ‘নর্থ নতুনা সী’তে নতুনা দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বীপের ৬’শ ৫৫ কিঃমিঃ উত্তর-পূর্বে রয়েছে স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের চীনা সামরিক ঘাঁটি। সিঙ্গাপুর থেকে এর দূরত্ব ৫’শ ৬৫ কিঃমিঃ; ব্রুনাই থেকে ৭’শ ৭০ কিঃমিঃ; ভিয়েতনাম থেকে ৫’শ ৬০ কিঃমিঃ। অর্থাৎ এই অঞ্চলের সকল স্থলভাগের ঠিক মাঝখানে এই দ্বীপ। কৌশলগত মালাক্কা প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা বেশিরভাগ জাহাজকেই এই দ্বীপের পাশ দিয়ে যেতে হয়। এই দ্বীপপুঞ্জের নতুনা বা রিয়াউ দ্বীপে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর সমন্বিত ঘাঁটি উন্নয়নের কাজ করছে ইন্দোনেশিয়া। ২০১৮-এর ১৮ই ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল হাদি তিয়াহিয়ান্তো নতুনা দ্বীপে ঘাঁটির উদ্বোধন করেন। তিয়াহিয়ান্তো বলেন যে, এই ঘাঁটির কাজ হলো ইন্দোনেশিয়ার সীমানায় আগ্রাসী শক্রির বিরুদ্ধে একটা “ডিটারেন্ট” তৈরি করা।

তিয়াহিয়ান্তোর আগের প্রাক্তন প্রধান জেনারেল নুরমানতায়ো বলেছিলেন যে, ইন্দোনেশিয়ার চারিদিকে মোট পাঁচটা দূরবর্তী দ্বীপকে ‘বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ দ্বীপ’ হিসেবে উন্নয়ন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাঝে নতুনা দ্বীপ হলো এরূপ প্রথম ঘাঁটি। বাকি ঘাঁটিগুলির সবগুলিই পূর্ব দিকে আস্ট্রেলিয়া এবং ফিলিপাইনের কাছাকাছি; এগুলি হলো –মালুকু দ্বীপপুঞ্জের সাউমলাকি (পূর্ব তিমরের কাছে), উত্তর মালুকুর মরোতাই (ফিলিপাইনের দক্ষিণে), এবং পপুয়ার বিয়াক ও মেরাউকে (অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে)। জাকার্তার ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর ম্যাগাজিনের এক লেখায় এভান লাক্সমানা বলছেন যে, নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করাটা ইন্দোনেশিয়ার জন্যে চীনকে নিয়ন্ত্রণের অংশ নয়, বরং এটা পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের নীতির অংশ। ১৯৪৬ সাল থেকে এই অঞ্চলের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয় সিঙ্গাপুর থেকে। ইন্দোনেশিয়া চাইছে যে, নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হলে অত্র অঞ্চলের বিমান চলাচলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে নতুনা দ্বীপে।

ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাথে পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই যায় ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপগুলির মাঝ দিয়ে প্রবাহিত মালাক্কা, সুন্দা এবং লম্বক প্রণালী দিয়ে। তবে এই প্রণালীগুলি পার হতে হলে জাহাজগুলিকে হয় নতুনা সাগর, কিংবা পূর্বে ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপ এবং ইন্দোনেশিয়ার পপুয়া দ্বীপের মাঝ দিয়ে যেতে হবে। নতুনা সাগরের মাঝে ইন্দোনেশিয়া নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে। আর মিন্দানাও এবং পপুয়ার মাঝের সমুদ্রপথ পাহাড়া দিতে ইন্দোনেশিয়া মরোতাই এবং বিয়াক ছাড়াও আরও কয়েকটা সামরিক ঘাঁটির উন্নয়ন করছে। মোটকথা অত্র অঞ্চলের সবগুলি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে, যা কিনা পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে নৌ-ঘাঁটি করেছে; গুয়ামের ঘাঁটিতেও শক্তি বৃদ্ধি করছে। আর গত ডিসেম্বরে ব্রিটেন ঘোষণা দিয়েছে যে, তারাও হয় সিঙ্গাপুর, নতুবা ব্রুনাই-এ সামরিক ঘাঁটি করতে যাচ্ছে। ফ্রান্সেরও প্রশান্ত মহাসাগরে রয়েছে কয়েকটা দ্বীপ উপনিবেশ। ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনাম নৌ-বিরোধ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ইন্দোনেশিয়া একটা অংশ হতে চলেছে। বহুকাল ধরেই ইন্দোনেশিয়া শুধুমাত্র তার দ্বীপগুলির স্থলভাগের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও এখন কৌশলগত সমুদ্রপথগুলির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়ার এহেন চিন্তা শুধু চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলিকেও ভাবাবে।