০৫ই অগাস্ট ২০২২
অগাস্টের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসের স্পীকার এবং ডেমোক্র্যাট দলের প্রবীণ নেতা ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফর করার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের উত্তেজনা চরমে উঠেছে। চীনা সামরিক বাহিনী তাইওয়ানকে ঘিরে বিশাল আকারের সামরিক মহড়া শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই চীন কয়েক দশকে প্রথমবারের মতো তাইওয়ানের উপর দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে। বেশিরভাগ রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাই যেকোন যুদ্ধ না হবার ব্যাপারে মত দিলেও উত্তেজনা সংক্রমিত হবার ব্যাপারটাকে সকলেই ভীতির চোখে দেখছেন।
জাপান সফরের সময় তিনি তার তাইওয়ান সফরের পক্ষে এই বলে যুক্তি দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে একঘরে করে ফেলার চীনা পরিকল্পনার বিরোধী। তার তাইওয়ান সফরের মাধ্যমে তিনি প্রমান দিতে চাইছেন যে, চীন মার্কিনীদেরকে তাইওয়ান সফরে বাধা দিতে পারবে না। তবে তিনি অত্র অঞ্চলের স্থিতি পরিবর্তনের পক্ষে নন। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, চীন এখন যেধরনের সামরিক উত্তেজনা তৈরি করেছে, সেটা যদি তারা পরবর্তী সময়েও করতে থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, অত্র অঞ্চলের স্থিতাবস্থায় পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে তাইওয়ানের আকাশসীমায় আন্তর্জাতিক জাহাজ এবং বিমানের চলাচল বন্ধ করে অবরোধের মহড়া সত্যিকার অর্থেই একটা বড় পরিবর্তন। আর এই মহড়া চলছে পৃথিবীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্য রুটের উপর; যেখান থেকে দুনিয়ার বেশিরভাগ সেমিকন্ডাকটরের সরবরাহ আসে। ব্যবসার সাথে জড়িত যেকেউই চাইবে যাতে এধরনের উত্তেজনা বেশিদিন স্থায়ী না হয়।
পেলোসির তাইওয়ান সফর ছিল ২৫ বছরের মাঝে সেখানে সর্বোচ্চ মার্কিন রাজনৈতিক সফর। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘এশিয়া সোসাইটি’র প্রধান কেভিন রাড ‘এবিসি নিউজ’কে বলছেন যে, পেলোসির সফরের ফলে তাইওয়ানের নিরপত্তা বৃদ্ধি পেলো কিনা, সেব্যাপারে তিনি একেবারেই নিশ্চিত নন। বিশেষ করে এই সফরের পর চীন সামরিক ও অর্থনৈতিক যেসব পদক্ষেপ নেবে, তা তাইওয়ানের জন্যে ভালো কিছু বয়ে আনবে না। এছাড়াও পেলোসির সফরের কারণে অত্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ব্যাহত হয়েছে। তিনি হয়তো তাইওয়ানের সাথে একাত্মতা এবং মানবাধিকার বিষয়ে তার বক্তব্যগুলিকে তুলে ধরতে সেখানে যেতে পারেন; যেগুলি তার ব্যক্তিগত আদর্শিক রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তার তাইওয়ান সফর ছিল অবিবেচকের কাজ। আজকের এই উত্তেজনাগুলি একসময় যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের সাথে সামরিক সংঘাতের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। আর ঠিক একারণেই চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে নিয়ন্ত্রণ করাটা জরুরি।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রধান ইয়ান ব্রেমার ‘জি-জিরো মিডিয়া’র এক বিশ্লেষণে বলছেন যে, এই মুহুর্তে কেউই হয়তো তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে কথা হোক সেটা চাননি। নিঃসন্দেহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও চাননি। অন্ততঃ এখন তো নয়ই; বিশেষ করে এই বছরেই যখন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে শি জিনপিং তৃতীয়বারের মতো দায়িত্ব পাবার চেষ্টা করছেন। ন্যান্সি পেলোসি প্রথমে তার এশিয়া সফরসূচিতে তাইওয়ানের নামটা লিখিত আকারে দেয়া থেকেও বিরত ছিলেন। সফরের দুই সপ্তাহ আগে হোয়াইট হাউজ জানতে পারে যে, পেলোসি তাইওয়ান সফর করতে চাইছেন। এই খবরটা তখনও মিডিয়াতে আসেনি। তবে হোয়াইট হাউজ থেকে পেলোসির কাছে চিঠি দিয়ে তাইওয়ান সফরের ব্যাপারে মানা করার ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে যায়। বাইডেন হয়তো সমস্যায় পড়েছেন যে, পেলোসিকে যেতে দেয়ার অর্থ হলো দলের উপর বাইডেনের প্রভাব নেই; অপরদিকে পেলোসিকে যেতে মানা করার অর্থ হলো বাইডেন তাইওয়ান নীতিতে দুর্বল। এছাড়াও চীনের দিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, পেলোসির সফরের ব্যাপারে চীনকে একটা শক্ত প্রত্যুত্তর দিতেই হবে; নাহলে চীনা নেতৃত্ব তাদের জনগণের সামনে হেয় হবে। একারণেই চীন বারংবার এই সফরের বিরোধিতা করেছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র বারংবার চীনকে হুমকি দিয়েছে যাতে চীন মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে না যায়। উদাহরণস্বরূপ, দু’মাস আগেই যুক্তরাষ্ট্র চীনকে হুমকি দিয়েছে যাতে চীন রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ না করে এবং রাশিয়ার উপর অবরোধ না ভাঙ্গে। চীন এই হুমকিতে অত্যন্ত অখুশি হলেও তারা মোটামুটিভাবে মার্কিনীদের কথা শুনেছে। তবে তাইওয়ানের ইস্যু চীনের কাছে পুরোপুরিভাবে আলাদা।
ন্যান্সি পেলোসির জন্ম ১৬ই মার্চ ১৯৪০। ৮২ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদের অভিজ্ঞতা নিতান্তই কম নয়। জন্মের পর থেকেই তিনি রাজনীতি দেখছেন। তার বাবা থমাস দালেস্রান্দো জুনিয়র ছিলেন ডেমোক্র্যাট দলের একজন কংগ্রেসম্যান। ১৯৭৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির সদস্য নির্বাচিত হবার মাধ্যমে পেলোসির নির্বাচিত হওয়া শুরু। ১৯৮৭ সালে ৪৭ বছর বয়সে তিনি নির্বাচিত হয়ে কংগ্রেসে পদার্পণ করেন। ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো এবং ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো তিনি কংগ্রেসের স্পীকার নির্বাচিত হন।
মার্কিন রাজনীতিতে এক ব্যক্তি কি ইচ্ছে করলেই অন্য দেশের সাথে উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে পারেন? এখানে প্রেসিডেন্টের কি কিছুই করার ছিল না; নাকি তিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝে আরেকটা অস্থিরতাকে মেনে নিয়েছেন? কেভিন রাড বলছেন যে, মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনুযায়ী কংগ্রেসের স্পীকার যেকোন স্থানে যেতে পারেন। এখানে হোয়াইট হাউজের বাধা দেয়ার তেমন কিছুই নেই। বরং এখানে প্রশ্ন হলো, স্পীকার নিজে কি তার সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে চিন্তাভাবনা করেননি? উচ্চ পদে আসীন হয়ে তার বোঝা উচিৎ ছিল যে, তাইওয়ান সফর করাটা তাইওয়ানের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্যে ভালো হবে কিনা; অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাইওয়ানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভালো হবে কিনা। পেলোসি এই ব্যাপারগুলি চিন্তা করেননি। ব্রেমার বলছেন যে, বাইডেনের পেলোসিকে তাইওয়ান যেতে মানা করার এখতিয়ার না থাকলেও সামরিক বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে তিনি পেলোসির তাইওয়ান সফরে বাধা সৃষ্টি করতে পারতেন; যা তিনি করেননি। তিনি পেলোসির সাথে দ্বন্দ্ব চাননি; বরং চীনের সাথে দ্বন্দ্বকেই তিনি বেছে নিয়েছেন। অপরদিকে চীন খুব সম্ভবতঃ তাদের পার্টি কংগ্রেসে তাইওয়ানে কে যেতে পারবে এবং কি করতে পারবে, সেব্যাপারে তাদের নীতির পরিবর্তন করবে; যা আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধিতে অনেক বেশি প্রভাব রাখবে। ফলাফলস্বরূপ, সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্রগুলিকে তা আরও অনেক বেশি বাড়িয়ে দেবে। অন্ততঃপক্ষে রাশিয়ার সাথে ঠান্ডা যুদ্ধের মাঝে কেউই এমনটা চায়নি।
Friday, 5 August 2022
Tuesday, 2 August 2022
কঙ্গো… পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার আরও একটা ব্যর্থতা
০২রা অগাস্ট ২০২২
জুলাইএর শেষে মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের উপর শতশত মানুষ হামলা করে। হামলাকারীরা নর্থ কিভু এবং সাউথ কিভু প্রদেশের কয়েকটা শহরে শান্তিরক্ষীদের ঘাঁটিতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। সহিংসতায় তিনজন শান্তিরক্ষী সেনাসহ কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। জুলাই মাসের শুরু থেকেই জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে সুসংগঠিতভাবে গণআন্দোলন শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ হলো, ২২ বছর ধরে শান্তিরক্ষী বাহিনী কঙ্গোর মাটিতে থাকার পরেও কেন কঙ্গোলিজরা শান্তিতে নেই; কেন তাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই? শান্তিরক্ষীদের মূল কাজটাই ছিল যেখানে সাধারণ মানুষকে ‘এম২৩’সহ বিভিন্ন অস্ত্রধারী গ্রুপগুলির হাত থেকে রক্ষা করা, সেখানে এই অভিযোগ জাতিসংঘের কার্যক্ষমতাকে যথেষ্টই প্রশ্নবিদ্ধ করে। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে এই মুহুর্তে ১’শরও বেশি অস্ত্রধারী গ্রুপ রয়েছে। জাতিসংঘের মিশন থাকা সত্ত্বেও এই গ্রুপগুলি নিজেদের অবস্থানকে দিনদিন শক্তিশালী করছে। বিক্ষোভকারীরা বলছে যে, জাতিসংঘ যখন বলছে যে, তাদের কাছে ‘এম২৩’ বিদ্রোহীদের দমন করার মতো শক্তি নেই, তখন শান্তিরক্ষী চলে যাক। আর তারা না যাবার আগ পর্যন্ত বিক্ষোভ চলবে বলে বলেন অনেকে।
জাতিসংঘের ব্যর্থতা কি সামরিক না রাজনৈতিক?
বর্তমান সমস্যার মূল হিসেবে অনেকেই কঙ্গোর ‘এম২৩’ বিদ্রোহী গ্রুপের পুনরুত্থানকে দায়ী করেছেন। ‘এম২৩’ গত নভেম্বর মাস থেকে নতুন করে আগ্রাসী অভিযানে বের হয়েছে। ২০১৩ সালের পর থেকে এই গ্রুপ বেশ চুপচাপই ছিল। ‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে মানবাধিকার সংস্থা ‘এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’এর গবেষক জঁ-মোবের সেঙ্গা বলছেন যে, জাতিসংঘ কঙ্গোর ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষা করার জন্যে কাজ করেছে এবং সেখানে গণতান্ত্রিক নির্বাচন করার পিছনেও প্রচেষ্টা ছিল তাদের। এছাড়াও ২০১৩ সালে নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেট নিয়ে জাতিসংঘ ‘ফোর্স ইন্টারভেনশন ব্রিগেড’ তৈরি করে; যাদের কাজ ছিল আক্রমণে গিয়ে কঙ্গোর বিদ্রোহী গ্রুপগুলিকে অস্ত্র ছাড়তে বাধ্য করা। এই ব্রিগেড ২০১৩ সালে ‘এম২৩’ বিদ্রোহী গ্রুপকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে তাদের সাফল্যের সাথে ব্যার্থতার সংখ্যা মোটেই কম নয়। যেকারণে এর আগেও জাতিসংঘের বিরুদ্ধে মানুষ বিক্ষোভ করেছে। জাতিসংঘ সমস্যার মূল নিয়ে তারা কাজ করেনি। যেমন সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে তারা কাজ করেনি; শুধুমাত্র সামরিক দিকটাই তারা দেখেছে। ১৯৯৪ সালের গণহত্যায় জড়িতরা প্রায় তিন দশক ধরে নিঃসঙ্কোচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর মাঝে রুয়ান্ডা, উগান্ডা এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকেরাও রয়েছে। এই ভয়াবহ অপরাধগুলির প্রায় কোন ধরণের জবাবদিহিতাই ছিল না; আর সেকারণেই তারা এই একই কাজ বারংবার করেছে। ২০১৩ সালে ‘এম২৩’ জাতিসংঘের ব্রিগেডের কাছে সামরিকভাবে পরাজিত হলেও তাদের কর্মকান্ডের জন্যে তাদের কোন জবাবদিহিতা করতে হয়নি। যেকারণে তারা আবারও ফিরে এসেছে।
কঙ্গোতে বর্তমানে জাতিসংঘের প্রায় ১৬ হাজার সেনা রয়েছে। এদের বেশিরভাগই এসেছে পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ থেকে। ‘মনুস্কো’ নামে পরিচিত এই মিশনের বাৎসরিক বাজেট ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। গত বছর এই মিশনের স্থায়িত্ব আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। কঙ্গোর এই পরিস্থিতি বুঝতে হলে কয়েকটা বিষয় নিয়ে আলোচনা আবশ্যিক। জাতিসংঘের ব্যর্থতার সাথে যুক্ত রয়েছে এই অঞ্চলের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া। আর রাজনৈতিক সমাধানের সাথে যুক্ত রয়েছে আশেপাশের দেশগুলি, বিশেষ করে রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি এবং উগান্ডার রাজনীতি। এই রাজনীতির এক অংশে রয়েছে জাতিগত বিদ্বেষ; আর অপর অংশে রয়েছে বৃহৎ শক্তিদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের স্বার্থের দ্বন্দ্ব।
একসময় এই অঞ্চল বেলজিয়ামের উপনিবেশ হলেও ফ্রান্সের সাথে বেলজিয়ামের সম্পর্কের কারণে এখানে ফ্রান্সের প্রভাব রয়েছে বরাবরই। ঔপনিবেশিক শক্তিরা এখানে জাতিগত বিভেদকে কাজে লাগিয়েছে প্রায় শতবর্ষ ধরে। রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি এবং কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে রয়েছে হুটু এবং টুটসি জাতির বসবাস। এর মাঝে টুটসির সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষের মতো; হুটুর সংখ্যা এর প্রায় ছয় গুণ। তবে সংখ্যালঘু হলেও টুটসিরা রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী; যার একটা প্রধান কারণ হলো ঔপনিবেশিক শক্তিরা টুটসিদেরকে শিক্ষিত করেছে এবং তাদেরকে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ দিয়েছে। ১৯৬০এর দশকে এই দেশগুলির স্বাধীনতা ঘোষণার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ হুটুরা ক্ষমতা নিয়ে নেয় এবং টুটসিদের উপর অত্যাচার শুরু করে। রুয়ান্ডা থেকে অনেক টুটসি পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে পালিয়ে যায়। এসময়েই শুরু হয় এই অঞ্চলের পরবর্তী ইতিহাস; যা গণহত্যার সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলেছে।
কঙ্গোর ইতিহাসকে একদিকে যেমন হুটু ও টুটসিদের বিদ্বেষের কাহিনী থেকে আলাদা করা যাবে না; তেমনি একজন বিশেষ ব্যাক্তির সামরিক ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার থেকে আলাদা করা যাবে না। এই ব্যক্তি হলেন রুয়ান্ডার বর্তমান প্রেসিডেন্ট পল কাগামি।
রুয়ান্ডার গণহত্যা - পল কাগামির ক্ষমতায় আরোহণের পথ
রুয়ান্ডার টুটসি রাজ পরিবারে জন্ম নেয়া পল কাগামি ১৯৭০এর দশকে এক মিলিশিয়া গ্রুপের অংশ হিসেবে তাঞ্জানিয়ার সহায়তায় পার্শ্ববর্তী দেশ উগান্ডার সরকারকে উৎখাতে অংশ নেন। কাগামি ছিলেন রুয়ান্ডা থেকে উৎখাত হওয়া সংখ্যালঘু টুটসি জনগোষ্ঠীর একজন। তিনি উগান্ডাতেই তার পড়াশোনা শেষ করেছেন; যা একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। টুটসি যোদ্ধাদের সহায়তায় ইয়োওয়েরি মুসেভেনি উগান্ডার ক্ষমতায় আসেন। সেসময় থেকেই মুসেভেনির সাথে কাগামির সখ্যতা। ১৯৯০ সালের অক্টোবরে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট মুসেভেনির প্রত্যক্ষ সহায়তায় টুটসি যোদ্ধারা রুয়ান্ডার অভ্যন্তরে হামলা করে। প্রথমে কাগামি এই বাহিনীর সদস্য ছিলেন না; কারণ সেসময় কাগামি যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের ফোর্ট লিভেনওয়ার্থএ কমান্ড এন্ড জেনারেল স্টাফ কলেজে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। রুয়ান্ডার এই গৃহযুদ্ধে টুটসি ‘রুয়ান্ডান প্যাট্রিওটিক ফ্রন্ট’ বা ‘আরপিএফ’এর বিরুদ্ধে রুয়ান্ডার হুটু সরকারকে সামরিক সহায়তা দিয়েছিল পার্শ্ববর্তী দেশ কঙ্গো এবং সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স। কাগামি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরেই ‘আরপিএফ’এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় ‘আরুশা একর্ডস’এর মাধ্যমে রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। চুক্তি অনুযায়ী ‘আরপিএফ’কে রুয়ান্ডার রাজনীতিতে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থান দেয়া হয়। সামরিক বাহিনীর অফিসারদের কমপক্ষে অর্ধেক আসতে হবে ‘আরপিএফ’ থেকে। আর পুরো সামরিক বাহিনীর ৪০ শতাংশ সদস্য আসতে হবে ‘আরপিএফ’ থেকে। ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে ‘আরুশা একর্ডস’কে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় আড়াই হাজার সেনার মাঝে সবচাইতে বড় গ্রুপ ছিল দেশটার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি বেলজিয়ামের।
পরের বছর ১৯৯৪এর ৬ই এপ্রিল রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালি বিমানবন্দরে অবতরণের ঠিক আগে একটা ভিআইপি বিমানকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত করা হয়। বিমানের আরোহীদের মাঝে ছিলেন বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট সিপ্রিয়েন নিতায়ামিরা এবং রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানা; উভয়েই ছিলেন হুটু। মার্কিন এবং ব্রিটিশ তদন্ত রিপোর্ট বলে যে, হুটুদের মাঝে উগ্রপন্থীরাই তাদের নিজেদের হুটু প্রেসিডেন্টদ্বয়কে হত্যা করে; যাতে করে টুটসিদের উপর গণহত্যা চালানো যায়। অপরদিকে ফরাসি এবং বেলজিয়ান রিপোর্ট বলে যে, টুটসি ‘আরপিএফ’ যোদ্ধারাই ঐ বিমান ভূপাতিত করেছিল। তবে এই ঘটনার পরপরই রুয়ান্ডার হুটু সামরিক অফিসার থিওনেস্তে বোগোসোরার অধীনে সেনারা তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের হত্যা করে এবং টুটসিদের উপর হামলা শুরু করে। শুরু হয় ভয়াবহ গণহত্যা।
১৯৯৪ সালের এপ্রিল থেকে জুলাইএর মাঝে মাত্র ১’শ দিনে মধ্য আফ্রিকার ছোট্ট দেশ রুয়ান্ডাতে ৮ লক্ষের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়; যা কিনা স্বল্প সময়ে হত্যাযজ্ঞের সকল রেকর্ডকে ভেঙ্গে ফেলে। নিহতদের বেশিরভাগই ছিল টুটসি। ছুরি-চাপাতি বা লাঠি-বাঁশ ব্যাবহার করে বা ঘরের ভেতরে পাকরাও করে ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হুটু জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘু টুটসিদের হত্যা করে।
চার মাস পর ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে গণহত্যা মোটামুটি বন্ধ হলে ‘আরুশা একর্ডস’ অনুযায়ী রুয়ান্ডার নতুন সরকার গঠিত হয়। নিহত প্রেসিডেন্ট হাবিয়ারিমানার রাজনৈতিক দল ‘এমআরএনডি’কে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। আর এই শূণ্যস্থান পুরণ করে কাগামির দল ‘আরপিএফ’। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, টুটসিরা মারাত্মক গণহত্যার শিকার হলেও টুটসিদের দল ‘আরপিএফ’এর ক্ষমতা কিন্তু বৃদ্ধি পায়। কাগামি হন ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী। আর প্রেসিডেন্ট হন প্যাস্তুর বিজিমুনগু, যিনি একজন হুটু হয়েও ‘আরপিএফ’এর সদস্য ছিলেন। সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব, পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকায় কাগামি প্রকৃতপক্ষে রুয়ান্ডার ক্ষমতায় চলে আসেন। ১৯৯৪ সালের বাকি বছরগুলিতে পশ্চিমা দেশগুলি থেকে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সহায়তা প্রদান করা হয়।
রুয়ান্ডার সরকারে ‘আরপিএফ’এর সদস্যদের সাথে হুটুদের দ্বন্দ্বের জের ধরে দেশব্যাপী ক্ষমতা দখলের হিরিক পড়ে যায়। এমনকি দেশের বাইরেও তা সংক্রমিত হয়। কাগামির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সেথ সেন্দাসোঙ্গা ১৯৯৮ সালের মে মাসে কেনিয়াতে এক হামলায় নিহত হন। ২০০০ সালে হুটু প্রেসিডেন্টের সাথে দ্বন্দ্বের পর কাগামি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন। রুয়ান্ডার সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট হতে হলে শুধুমাত্র মন্ত্রীসভা এবং পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেলেই যথেষ্ট; গণভোটের প্রয়োজন নেই। কাগামি খুব সহজেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে কাগামি রুয়ান্ডার নতুন সংবিধান রচনা করেন; যা অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন প্রতি ৭ বছরের জন্যে; দেশের রাজনীতিতে হুটু বা টুটসি কেউই নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে থাকতে পারবে না; জাতিগত পরিচয়ের কোন রাজনৈতিক দল রাজনীতি করতে পারবে না। ২০০৯ সালে মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই সংবিধানে গণহত্যা বন্ধ করার কথা বলে প্রকৃতপক্ষে একটা একদলীয় শাসনের প্রবর্তন করা হয়। প্রতিবেদনের কথাগুলি প্রকৃতই সত্য; কারণ ২০২২ সালেও কাগামি ক্ষমতা ধরে রেখেছেন।
কঙ্গো এবং পল কাগামি
পল কাগামি ক্ষমতা নিয়েই পার্শ্ববর্তী দেশ জায়ারএর (বর্তমান নাম ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো বা ডিআর কঙ্গো) পূর্বে বাস করা টুটসি গ্রুপগুলিকে সামরিক সহায়তা দিতে থাকেন এবং কঙ্গোর অভ্যন্তরে হুটু শরণার্থী শিবিরগুলির উপর হামলা করেন। কারণ এই হুটুরা কাগামির ক্ষমতা ধরে রাখার পিছনে হুমকি হিসেবে কাজ করছিল। বিশেষ করে রুয়ান্ডার প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের সমর্থকরা কঙ্গো থেকে রুয়ান্ডার অভ্যন্তরে হামলা করছিলো। এরপর কাগামি কঙ্গোর ফরাসি সমর্থিত একনায়ক মোবুটু সেসে সেকোকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। লরেন্ট কাবিলার নেতৃত্বে কঙ্গোর বিদ্রোহী গ্রুপকে কাগামি এবং উগান্ডার মুসেভেনি সমর্থন দেন। তবে কাবিলা কঙ্গোর ক্ষমতা নেবার পরপরই কাগামির সাথে শত্রুতা শুরু হয়। কাগামি অভিযোগ করেন যে, কঙ্গো থেকে বিদ্রোহীরা রুয়ান্ডার ভেতর হামলা করছে। জবাবে কাগামি কঙ্গোর অভ্যন্তরে ‘র্যালি ফর কঙ্গোলিজ ডেমোক্র্যাসি’ বা ‘আরসিডি’ গ্রুপকে সমর্থন দিতে শুরু করেন। শুধুমাত্র এঙ্গোলা, নামিবিয়া এবং জিম্বাবুয়ের সরাসরি সমর্থনের কারণে লরেন্ট কাবিলা ক্ষমতাচ্যুত হওয়া থেকে বেঁচে যান। তবে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় এবং ২০০৩ সাল পর্যন্ত রেডক্রসের হিসেবে ৩০ থেকে ৭৬ লক্ষ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুদ্ধের কারণে মৃত্যুবরণ করে। ২০০১ সালের জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী কাগামি এবং উগান্ডার মুসেভেনি কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলের নর্থ কিভু ও সাউথ কিভু অঞ্চলের খনিজ সম্পদের মালিক হবার চেষ্টা করেছেন। কঙ্গোর প্রচুর মূল্যবান খনিজ রুয়ান্ডা হয়ে বাইরের দুনিয়াতে বিক্রি হয়েছে।
২০০১ সালে রুয়ান্ডা ঘোষণা দেয় যে, কঙ্গো থেকে রুয়ান্ডার সকল সেনা সরে এসেছে। এর বিনিময়ে কাগামির সমর্থিত ‘আরসিডি’ লরেন্ট কাবিলার ছেলে জোসেফ কাবিলার সাথে কঙ্গোর ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেয়। তদুপরি কাগামি অভিযোগ করতে থাকেন যে, হুটু বিদ্রোহীরা এখনও কঙ্গোর ভূমি ব্যবহার করে রুয়ান্ডায় হামলা করছে। অপরদিকে কঙ্গোর সরকার বলে যে, হুটুদের কথা বলে কাগামি পুরো অঞ্চলে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর এক বিশ্লেষণে বলা হয় যে, ২০০৫ থেকে ২০০৯ সালের মাঝে লরেন্ট নেকুন্দার নেতৃত্বে কঙ্গোর টুটসিদের গ্রুপকে কাগামি সমর্থন দিয়েছেন; আর ২০১২ সাল থেকে বসকো নেতাগান্দার অধীনে ‘মার্চ ২৩ মুভমেন্ট’ বা ‘এম২৩’কে সমর্থন দিয়েছেন তিনি। ২০১০ সালে জাতিসংঘের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, কঙ্গোর অভ্যন্তরে রুয়ান্ডার সেনাবাহিনী মারাত্মক মানবাধিকার লংঘনের কাজে জড়িত ছিল। আর ২০১২ সালে জাতিগংঘের ফাঁস হওয়া এক গোপন রিপোর্টে বলা হয় যে, রুয়ান্ডার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস কাবারেবে প্রকৃতপক্ষে ‘এম২৩’এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন!
২০১৯ সালে ফেলিক্স শিসেকেদি কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও রুয়ান্ডার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। ২০২০ সালেও কাগামির বিরুদ্ধে কঙ্গোর অভ্যন্তরে রুয়ান্ডার সেনা মোতায়েন রাখার অভিযোগ রয়েছে। আর ২০২১ সালের নভেম্বরে ‘এম২৩’ নতুন করে আভিযান শুরু করলে সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়।
ফ্রান্সের চক্ষুশূল কাগামি
নিহত হবার আগ পর্যন্ত রুয়ান্ডার হুটু প্রেসিডেন্ট হাবিয়ারিমানাএর সাথে ফ্রান্সের যথেষ্ট সখ্যতা ছিল। ১৯৯০ সালে টুটসি বিদ্রোহী গ্রুপ ‘আরপিএফ’ রুয়ান্ডায় হামলা শুরু করলে তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়াঁ মিতেরাঁর সরকার রুয়ান্ডা সরকারকে সহায়তা করার জন্যে ৬’শ প্যারাট্রুপার সেনা পাঠায়। এই সেনারা টুটসি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ চালিয়ে নেয় এবং ১৯৯৪ সালে টুটসিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চলার সময় ফরাসি সেনারা হুটু শরণার্থীদেরকে সুরক্ষা দেয়; যাদের মাঝে মানবাধিকার লংঘনকারীরা ছিল বলেও অভিযোগ ওঠে। ‘আরপিএফ’ রুয়ান্ডার ক্ষমতা নেবার পর ফ্রান্সের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ৬ মাস লাগে। তারপরেও দু’দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল না; কাগামির সরকার অভিযোগ করতে থাকে যে, ফ্রান্স গণহত্যাকারীদের সহায়তা দিয়েছে। এরপর ২০০৬ সালে ফরাসি এক বিচারপতি একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেন, যেখানে বলা হয় যে, রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কাগামি ১৯৯৪ সালে দুই প্রেসিডেন্টের বিমান ভূপাতিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে কাগামি সরকারের ৯ জন সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। রুয়ান্ডা সাথেসাথেই ফ্রান্সের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। তবে ২০০৮-০৯ সালের দিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক আবারও পুনপ্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি গণহত্যার পর থেকে প্রথম ফরাসি প্রেসিডেন্ট হিসেবে রুয়ান্ডা সফর করেন। সফরকালে তিনি স্বীকার করেন যে, ১৯৯৪ সালে ফ্রান্স অনেক বড় ভুল করেছে। পরের বছর কাগামিও প্যারিস সফর করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের কাছের বন্ধু কাগামি
গত ২৫শে জুলাই ‘রয়টার্স’এর এক খবরে বলা হয় যে, মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান রবার্ট মেনেনডেজ মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেনের কাছে লেখা এক চিঠিতে রুয়ান্ডাকে মার্কিন আর্থিক সহায়তার ব্যাপারটা পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানান। চিঠিতে বলা হয় যে, রুয়ান্ডা সরকারের বিরুদ্ধে পার্শ্ববর্তী দেশ কঙ্গোর অভ্যন্তরে ‘এম২৩’ বিদ্রোহী যোদ্ধাদের সহায়তা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমতাবস্থায় মার্কিন সরকার যদি রুয়ান্ডাকে সহায়তা দেয়া চালিয়ে যায়, তাহলে অনেকেই ধরে নিতে পারে যে, রুয়ান্ডার এহেন কর্মকান্ডে মার্কিনীদের সমর্থন রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০২১ সালে ১’শ ৪৭ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র রুয়ান্ডার সবচাইতে বড় সহযোগী রাষ্ট্র। এই সহায়তার একটা অংশ যাচ্ছে জাতিসংঘ মিশনে রুয়ান্ডার সেনাদের অংশ নেয়ার প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক্যাল সহায়তা হিসেবে। রুয়ান্ডার একনায়ক পল কাগামি গত ২২ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট এবং প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি রুয়ান্ডার বাস্তবিক শাসনকর্তা। সিনেটর মেনেনডেজ কাগামি সরকারের সমালোচনা করলেও গত তিন দশকের বেশি সময় ধরেই রুয়ান্ডার সাথে মার্কিনীদের সখ্যতা কমেনি এক বিন্দুও।
পল কাগামির বিরুদ্ধে গণহত্যায় অংশ নেবার অভিযোগ রয়েছে; তিনি পার্শ্ববর্তী দেশ কঙ্গোর অভ্যন্তরে বহু বছর ধরে সেনা মোতায়েন রেখেছেন এবং সেখানে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে নিয়েছেন। তথাপি দেশের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কাগামি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা পশ্চিমাদের, বিশেষ করে মার্কিনীদের যথেষ্টই খুশি করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে পল কাগামি প্রেসিডেন্ট হবার সময় রুয়ান্ডার মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৬’শ ৩১ ডলার; যা ২০২০ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২’শ ১৪ ডলারে। কাগামি রুয়ান্ডাকে উন্মুক্ত বাজার করে দেন এবং দেশকে সিঙ্গাপুর হিসেবে তৈরি করার কথা বলেন। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনসহ অনেকেই পল কাগামির সরকারের এহেন মুক্ত বাজার অর্থনীতির ভুয়সী প্রশংসা করেন। তবে এই উন্নয়ন শুধুমাত্র রাজধানী শহরের কিছু মানুষই ভোগ করেছে। বেশিরভাগ সম্পদই স্বল্প সংখ্যক মানুষের হাতে চলে গেছে।
১৯৯৪ সালের গণহত্যার পর থেকে রুয়ান্ডা ইংরেজী ভাষাভাষী দুনিয়া, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের বেশ কাছাকাছি গিয়েছে। ব্রিটেন রুয়ান্ডাকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে; আর যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে সামরিক সহায়তা ও উন্নয়ন অর্থায়ন। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কাগামিকে বর্তমান সময়ের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন বলে আখ্যা দেন। প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও কাগামি সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কারের ভূয়সী প্রসংসা করে এই বলেন যে, রুয়ান্ডা হলো আন্তর্জাতিক সহায়তা কাজে লাগাবার ক্ষেত্রে সকলের জন্যে উদাহরণস্বরূপ। ব্লেয়ার রুয়ান্ডার সরকারের উপদেষ্টারূপেও কাজ করেছেন। এখানেই শেষ নয়। ২০০৯ সালে ইংরেজী ভাষাভাষী না হয়েও মোজাম্বিকের পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে রুয়ান্ডা ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১২ সালে রুয়ান্ডা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যও নির্বাচিত হয়।
তবে ২০১২ সালের নভেম্বরে কঙ্গোর ‘এম২৩’ বিদ্রোহীদের সহায়তা দানের জন্যে ব্রিটিশ সরকার রুয়ান্ডার জন্যে ২১ মিলিয়ন পাউন্ড সহায়তা স্থগিত করে। জার্মানিও তাই করে। যুক্তরাষ্ট্রও রুয়ান্ডার সামরিক সহায়তা স্থগিত করে। তবে ২০১৩ সালের পর থেকে এই সহায়তাগুলি আবারও দেয়া শুরু হয়। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র রুয়ান্ডার সবচাইতে বড় সহায়তাকারী দেশ।
পশ্চিমাদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব
মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গো খনিজ সম্পদের দিক থেকে অত্যন্ত ধনী একটা দেশ। কিন্তু দেশের মানুষ এই খনিজ সম্পদের সুবিধা কখনোই পায়নি। বরং পশ্চিমা শক্তিদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বলি হয়েছে এখানকার জনগণ। ঔপনিবেশিক শক্তিরা এই অঞ্চল ত্যাগ করলেও এখানকার জনগণ এখনও উপনিবেশ হিসেবেই জীবনযাপন করছে। রুয়ান্ডার গণহত্যায় ৮ লক্ষাধিক মানুষের লাশের উপর দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন পল কাগামি; যিনি তার দেশকে ফ্রান্সের কোল থেকে বের করে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের কোলে নিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ উগান্ডা কাগামিকে ক্ষমতায় যেতে বিশাল সহায়তা দিয়েছে। ১৯৯৪ সালের গণহত্যাটা কাগামিকে তার ক্ষমতার ভিত শক্ত করতে যথেষ্ট সহায়তা করেছে। তবে এর ফলশ্রুতিতে ফ্রান্সের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের যে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তার ফলাফল ভোগ করতে বাধ্য হয় পার্শ্ববর্তী দেশ কঙ্গো। কঙ্গোর গৃহযুদ্ধে রুয়ান্ডা এবং উগান্ডা ভয়াবহ ভূমিকা নেয়; যার ফলশ্রুতিতে কঙ্গোতে ৩০ থেকে ৭৬ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তথাপি এই দ্বন্দ্ব এখনও শেষ হয়নি; যার ফলাফল দেখা যাচ্ছে কঙ্গোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের মাঝে। আফ্রিকাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে রুয়ান্ডাকে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করছে প্রায় তিন দশক ধরে। এমতাবস্থায় জাতিসংঘে রুয়ান্ডা সমর্থিত ‘এম২৩’ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর ফ্রান্স তার শক্তি হারাচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরেই। আফ্রিকাতে ফ্রান্সের অবস্থানগুলি দখলে নিতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার অসারতার জানান দিচ্ছে ফ্রান্স-যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেনের দ্বন্দ্বের বলি কঙ্গো ও রুয়ান্ডার লাখো মানুষের লাশ।
……………………………………………………
সূত্র -
‘Why are there protests against UN peacekeepers in DR Congo?’ in Inside Story, Al-Jazeera, 29 July 2022 (https://youtu.be/hP-U3sKyfBs)
‘America’s secret role in the Rwandan genocide’ in The Guardian, 12 September 2017
‘U.S. senator questions aid to Rwanda over human rights, role in Congo’ in Reuters, 26 July 2022
‘Rethinking the Rwandan Narrative for the 25th Anniversary’, by Gerald Caplan in Genocide Studies International, 2018
‘The Rwanda Crisis: History of a Genocide’ by Gerald Prunier, 1999
‘The Responsibility to Protect and the Duty to Prevent Genocide: Lessons to be Learned from the Role of the International Community and the Media During the Rwandan Genocide and the Conflict in the Former Yugoslavia’ by Jeremy Sarkin and Carly Fowler, in Suffolk Transnational Law Review, 2010
‘Hutus 'killed Rwanda President Juvenal Habyarimana'’ in BBC News, 12 January 2010
‘A Thousand Hills: Rwanda's Rebirth and the Man Who Dreamed it’ by Stephen Kinzer, 2008
‘Silent Accomplice: The Untold Story of France's Role in the Rwandan Genocide’ by Andrew Wallis, 2007
‘Paul Kagame And Rwanda: Power, Genocide and the Rwandan Patriotic Front’ by Colin Waugh, 2004
‘Rwanda's Leaders Vow to Build a Multiparty State for Both Hutu and Tutsi’ in The New York Times, 07 September 1994
‘Ex-Rwandan Minister Killed in Kenya’ in Associated Press, 17 May 1998
‘Report of the Panel of Experts on the Illegal Exploitation of Natural Resources and Other Forms of Wealth of the Democratic Republic of the Congo’, United Nations, 12 April 2001
‘Kagame elected Rwandan president’ in BBC News, 17 April 2000
‘The power of horror in Rwanda’, Human Rights Watch, 11 April 2009
‘Rwandans Led Revolt in Congo’ in The Washington Post, 09 July 1997
‘Review of Congo war halves death toll’ in Associated Press, 20 January 2010
‘Delayed UN report links Rwanda to Congo genocide’ in The Guardian, 01 October 2010
‘GDP per capita, PPP (current international $) – Rwanda’, World Bank, 2020
‘Rwanda's Economic Miracle’ in National Review, 13 December 2010
‘Tracking Rwanda's ICT ambitions’ in The New Times, 27 May 2012
‘Paul Kagame: Rwanda's redeemer or ruthless dictator?’ in The Daily Telegraph, 22 July 2010
‘Whispering truth to power: The everyday resistance of Rwandan peasants to post-genocide reconciliation’ by S. Thomson in African Affairs, 2011
‘Kabila Accuses Rwanda of Trying to Profit from Congo Chaos’ in Voice of America, 30 October 2009
‘Averting Proxy Wars in the Eastern DR Congo and Great Lakes’, International Crisis Group, 23 January 2020
‘Rwanda defence chief leads DR Congo rebels, UN report says, in BBC News, 17 October 2012
‘Shake Hands with the Devil: The Failure of Humanity in Rwanda’ by Romeo Dallaire, 2005
‘Securing Human Rights?: Achievements and Challenges of the UN Security Council’ by Bardo Fassbender, 2011
‘France's shame?, in The Guardian, 11 January 2007
‘France issues Rwanda warrants’ in BBC News, 23 November 2006
‘Rwanda cuts relations with France’ in BBC News, 24 November 2006
‘Kabuye's release not condition for resuming ties with France-Museminali’ in The New Times, 25 November 2008
‘On Visit to Rwanda, Sarkozy Admits 'Grave Errors' in 1994 Genocide’ in The New York Times, 25 February 2010
‘Rwanda's Kagame pays 'reconciliation visit' to France’ in BBC News, 12 September 2011
‘The end of the west's humiliating affair with Paul Kagame’ in The Guardian, 25 July 2012
‘Blair takes on unpaid role as Rwanda advise’ in The Guardian, 18 January 2008
‘Rwanda joins the Commonwealth’ in The Daily Telegraph, 29 November 2009
‘UK stops £21m aid payment to Rwanda’ in BBC News, 30 November 2012
‘The Effects of the Exit From Budget Support In Rwanda’, German Institute for Development Evaluation, February 2008
‘Obama accused of failed policy over Rwanda's support of rebel group’ in The Guardian, 11 December 2012
জুলাইএর শেষে মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের উপর শতশত মানুষ হামলা করে। হামলাকারীরা নর্থ কিভু এবং সাউথ কিভু প্রদেশের কয়েকটা শহরে শান্তিরক্ষীদের ঘাঁটিতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। সহিংসতায় তিনজন শান্তিরক্ষী সেনাসহ কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। জুলাই মাসের শুরু থেকেই জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে সুসংগঠিতভাবে গণআন্দোলন শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ হলো, ২২ বছর ধরে শান্তিরক্ষী বাহিনী কঙ্গোর মাটিতে থাকার পরেও কেন কঙ্গোলিজরা শান্তিতে নেই; কেন তাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই? শান্তিরক্ষীদের মূল কাজটাই ছিল যেখানে সাধারণ মানুষকে ‘এম২৩’সহ বিভিন্ন অস্ত্রধারী গ্রুপগুলির হাত থেকে রক্ষা করা, সেখানে এই অভিযোগ জাতিসংঘের কার্যক্ষমতাকে যথেষ্টই প্রশ্নবিদ্ধ করে। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে এই মুহুর্তে ১’শরও বেশি অস্ত্রধারী গ্রুপ রয়েছে। জাতিসংঘের মিশন থাকা সত্ত্বেও এই গ্রুপগুলি নিজেদের অবস্থানকে দিনদিন শক্তিশালী করছে। বিক্ষোভকারীরা বলছে যে, জাতিসংঘ যখন বলছে যে, তাদের কাছে ‘এম২৩’ বিদ্রোহীদের দমন করার মতো শক্তি নেই, তখন শান্তিরক্ষী চলে যাক। আর তারা না যাবার আগ পর্যন্ত বিক্ষোভ চলবে বলে বলেন অনেকে।
জাতিসংঘের ব্যর্থতা কি সামরিক না রাজনৈতিক?
বর্তমান সমস্যার মূল হিসেবে অনেকেই কঙ্গোর ‘এম২৩’ বিদ্রোহী গ্রুপের পুনরুত্থানকে দায়ী করেছেন। ‘এম২৩’ গত নভেম্বর মাস থেকে নতুন করে আগ্রাসী অভিযানে বের হয়েছে। ২০১৩ সালের পর থেকে এই গ্রুপ বেশ চুপচাপই ছিল। ‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে মানবাধিকার সংস্থা ‘এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’এর গবেষক জঁ-মোবের সেঙ্গা বলছেন যে, জাতিসংঘ কঙ্গোর ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষা করার জন্যে কাজ করেছে এবং সেখানে গণতান্ত্রিক নির্বাচন করার পিছনেও প্রচেষ্টা ছিল তাদের। এছাড়াও ২০১৩ সালে নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেট নিয়ে জাতিসংঘ ‘ফোর্স ইন্টারভেনশন ব্রিগেড’ তৈরি করে; যাদের কাজ ছিল আক্রমণে গিয়ে কঙ্গোর বিদ্রোহী গ্রুপগুলিকে অস্ত্র ছাড়তে বাধ্য করা। এই ব্রিগেড ২০১৩ সালে ‘এম২৩’ বিদ্রোহী গ্রুপকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে তাদের সাফল্যের সাথে ব্যার্থতার সংখ্যা মোটেই কম নয়। যেকারণে এর আগেও জাতিসংঘের বিরুদ্ধে মানুষ বিক্ষোভ করেছে। জাতিসংঘ সমস্যার মূল নিয়ে তারা কাজ করেনি। যেমন সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে তারা কাজ করেনি; শুধুমাত্র সামরিক দিকটাই তারা দেখেছে। ১৯৯৪ সালের গণহত্যায় জড়িতরা প্রায় তিন দশক ধরে নিঃসঙ্কোচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর মাঝে রুয়ান্ডা, উগান্ডা এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকেরাও রয়েছে। এই ভয়াবহ অপরাধগুলির প্রায় কোন ধরণের জবাবদিহিতাই ছিল না; আর সেকারণেই তারা এই একই কাজ বারংবার করেছে। ২০১৩ সালে ‘এম২৩’ জাতিসংঘের ব্রিগেডের কাছে সামরিকভাবে পরাজিত হলেও তাদের কর্মকান্ডের জন্যে তাদের কোন জবাবদিহিতা করতে হয়নি। যেকারণে তারা আবারও ফিরে এসেছে।
কঙ্গোতে বর্তমানে জাতিসংঘের প্রায় ১৬ হাজার সেনা রয়েছে। এদের বেশিরভাগই এসেছে পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ থেকে। ‘মনুস্কো’ নামে পরিচিত এই মিশনের বাৎসরিক বাজেট ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। গত বছর এই মিশনের স্থায়িত্ব আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। কঙ্গোর এই পরিস্থিতি বুঝতে হলে কয়েকটা বিষয় নিয়ে আলোচনা আবশ্যিক। জাতিসংঘের ব্যর্থতার সাথে যুক্ত রয়েছে এই অঞ্চলের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া। আর রাজনৈতিক সমাধানের সাথে যুক্ত রয়েছে আশেপাশের দেশগুলি, বিশেষ করে রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি এবং উগান্ডার রাজনীতি। এই রাজনীতির এক অংশে রয়েছে জাতিগত বিদ্বেষ; আর অপর অংশে রয়েছে বৃহৎ শক্তিদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের স্বার্থের দ্বন্দ্ব।
একসময় এই অঞ্চল বেলজিয়ামের উপনিবেশ হলেও ফ্রান্সের সাথে বেলজিয়ামের সম্পর্কের কারণে এখানে ফ্রান্সের প্রভাব রয়েছে বরাবরই। ঔপনিবেশিক শক্তিরা এখানে জাতিগত বিভেদকে কাজে লাগিয়েছে প্রায় শতবর্ষ ধরে। রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি এবং কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে রয়েছে হুটু এবং টুটসি জাতির বসবাস। এর মাঝে টুটসির সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষের মতো; হুটুর সংখ্যা এর প্রায় ছয় গুণ। তবে সংখ্যালঘু হলেও টুটসিরা রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী; যার একটা প্রধান কারণ হলো ঔপনিবেশিক শক্তিরা টুটসিদেরকে শিক্ষিত করেছে এবং তাদেরকে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ দিয়েছে। ১৯৬০এর দশকে এই দেশগুলির স্বাধীনতা ঘোষণার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ হুটুরা ক্ষমতা নিয়ে নেয় এবং টুটসিদের উপর অত্যাচার শুরু করে। রুয়ান্ডা থেকে অনেক টুটসি পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে পালিয়ে যায়। এসময়েই শুরু হয় এই অঞ্চলের পরবর্তী ইতিহাস; যা গণহত্যার সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলেছে।
কঙ্গোর ইতিহাসকে একদিকে যেমন হুটু ও টুটসিদের বিদ্বেষের কাহিনী থেকে আলাদা করা যাবে না; তেমনি একজন বিশেষ ব্যাক্তির সামরিক ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার থেকে আলাদা করা যাবে না। এই ব্যক্তি হলেন রুয়ান্ডার বর্তমান প্রেসিডেন্ট পল কাগামি।
রুয়ান্ডার গণহত্যা - পল কাগামির ক্ষমতায় আরোহণের পথ
রুয়ান্ডার টুটসি রাজ পরিবারে জন্ম নেয়া পল কাগামি ১৯৭০এর দশকে এক মিলিশিয়া গ্রুপের অংশ হিসেবে তাঞ্জানিয়ার সহায়তায় পার্শ্ববর্তী দেশ উগান্ডার সরকারকে উৎখাতে অংশ নেন। কাগামি ছিলেন রুয়ান্ডা থেকে উৎখাত হওয়া সংখ্যালঘু টুটসি জনগোষ্ঠীর একজন। তিনি উগান্ডাতেই তার পড়াশোনা শেষ করেছেন; যা একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। টুটসি যোদ্ধাদের সহায়তায় ইয়োওয়েরি মুসেভেনি উগান্ডার ক্ষমতায় আসেন। সেসময় থেকেই মুসেভেনির সাথে কাগামির সখ্যতা। ১৯৯০ সালের অক্টোবরে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট মুসেভেনির প্রত্যক্ষ সহায়তায় টুটসি যোদ্ধারা রুয়ান্ডার অভ্যন্তরে হামলা করে। প্রথমে কাগামি এই বাহিনীর সদস্য ছিলেন না; কারণ সেসময় কাগামি যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের ফোর্ট লিভেনওয়ার্থএ কমান্ড এন্ড জেনারেল স্টাফ কলেজে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। রুয়ান্ডার এই গৃহযুদ্ধে টুটসি ‘রুয়ান্ডান প্যাট্রিওটিক ফ্রন্ট’ বা ‘আরপিএফ’এর বিরুদ্ধে রুয়ান্ডার হুটু সরকারকে সামরিক সহায়তা দিয়েছিল পার্শ্ববর্তী দেশ কঙ্গো এবং সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স। কাগামি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরেই ‘আরপিএফ’এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় ‘আরুশা একর্ডস’এর মাধ্যমে রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। চুক্তি অনুযায়ী ‘আরপিএফ’কে রুয়ান্ডার রাজনীতিতে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থান দেয়া হয়। সামরিক বাহিনীর অফিসারদের কমপক্ষে অর্ধেক আসতে হবে ‘আরপিএফ’ থেকে। আর পুরো সামরিক বাহিনীর ৪০ শতাংশ সদস্য আসতে হবে ‘আরপিএফ’ থেকে। ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে ‘আরুশা একর্ডস’কে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় আড়াই হাজার সেনার মাঝে সবচাইতে বড় গ্রুপ ছিল দেশটার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি বেলজিয়ামের।
পরের বছর ১৯৯৪এর ৬ই এপ্রিল রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালি বিমানবন্দরে অবতরণের ঠিক আগে একটা ভিআইপি বিমানকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত করা হয়। বিমানের আরোহীদের মাঝে ছিলেন বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট সিপ্রিয়েন নিতায়ামিরা এবং রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানা; উভয়েই ছিলেন হুটু। মার্কিন এবং ব্রিটিশ তদন্ত রিপোর্ট বলে যে, হুটুদের মাঝে উগ্রপন্থীরাই তাদের নিজেদের হুটু প্রেসিডেন্টদ্বয়কে হত্যা করে; যাতে করে টুটসিদের উপর গণহত্যা চালানো যায়। অপরদিকে ফরাসি এবং বেলজিয়ান রিপোর্ট বলে যে, টুটসি ‘আরপিএফ’ যোদ্ধারাই ঐ বিমান ভূপাতিত করেছিল। তবে এই ঘটনার পরপরই রুয়ান্ডার হুটু সামরিক অফিসার থিওনেস্তে বোগোসোরার অধীনে সেনারা তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের হত্যা করে এবং টুটসিদের উপর হামলা শুরু করে। শুরু হয় ভয়াবহ গণহত্যা।
১৯৯৪ সালের এপ্রিল থেকে জুলাইএর মাঝে মাত্র ১’শ দিনে মধ্য আফ্রিকার ছোট্ট দেশ রুয়ান্ডাতে ৮ লক্ষের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়; যা কিনা স্বল্প সময়ে হত্যাযজ্ঞের সকল রেকর্ডকে ভেঙ্গে ফেলে। নিহতদের বেশিরভাগই ছিল টুটসি। ছুরি-চাপাতি বা লাঠি-বাঁশ ব্যাবহার করে বা ঘরের ভেতরে পাকরাও করে ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হুটু জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘু টুটসিদের হত্যা করে।
চার মাস পর ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে গণহত্যা মোটামুটি বন্ধ হলে ‘আরুশা একর্ডস’ অনুযায়ী রুয়ান্ডার নতুন সরকার গঠিত হয়। নিহত প্রেসিডেন্ট হাবিয়ারিমানার রাজনৈতিক দল ‘এমআরএনডি’কে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। আর এই শূণ্যস্থান পুরণ করে কাগামির দল ‘আরপিএফ’। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, টুটসিরা মারাত্মক গণহত্যার শিকার হলেও টুটসিদের দল ‘আরপিএফ’এর ক্ষমতা কিন্তু বৃদ্ধি পায়। কাগামি হন ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী। আর প্রেসিডেন্ট হন প্যাস্তুর বিজিমুনগু, যিনি একজন হুটু হয়েও ‘আরপিএফ’এর সদস্য ছিলেন। সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব, পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকায় কাগামি প্রকৃতপক্ষে রুয়ান্ডার ক্ষমতায় চলে আসেন। ১৯৯৪ সালের বাকি বছরগুলিতে পশ্চিমা দেশগুলি থেকে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সহায়তা প্রদান করা হয়।
রুয়ান্ডার সরকারে ‘আরপিএফ’এর সদস্যদের সাথে হুটুদের দ্বন্দ্বের জের ধরে দেশব্যাপী ক্ষমতা দখলের হিরিক পড়ে যায়। এমনকি দেশের বাইরেও তা সংক্রমিত হয়। কাগামির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সেথ সেন্দাসোঙ্গা ১৯৯৮ সালের মে মাসে কেনিয়াতে এক হামলায় নিহত হন। ২০০০ সালে হুটু প্রেসিডেন্টের সাথে দ্বন্দ্বের পর কাগামি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন। রুয়ান্ডার সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট হতে হলে শুধুমাত্র মন্ত্রীসভা এবং পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেলেই যথেষ্ট; গণভোটের প্রয়োজন নেই। কাগামি খুব সহজেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে কাগামি রুয়ান্ডার নতুন সংবিধান রচনা করেন; যা অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন প্রতি ৭ বছরের জন্যে; দেশের রাজনীতিতে হুটু বা টুটসি কেউই নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে থাকতে পারবে না; জাতিগত পরিচয়ের কোন রাজনৈতিক দল রাজনীতি করতে পারবে না। ২০০৯ সালে মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই সংবিধানে গণহত্যা বন্ধ করার কথা বলে প্রকৃতপক্ষে একটা একদলীয় শাসনের প্রবর্তন করা হয়। প্রতিবেদনের কথাগুলি প্রকৃতই সত্য; কারণ ২০২২ সালেও কাগামি ক্ষমতা ধরে রেখেছেন।
কঙ্গো এবং পল কাগামি
পল কাগামি ক্ষমতা নিয়েই পার্শ্ববর্তী দেশ জায়ারএর (বর্তমান নাম ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো বা ডিআর কঙ্গো) পূর্বে বাস করা টুটসি গ্রুপগুলিকে সামরিক সহায়তা দিতে থাকেন এবং কঙ্গোর অভ্যন্তরে হুটু শরণার্থী শিবিরগুলির উপর হামলা করেন। কারণ এই হুটুরা কাগামির ক্ষমতা ধরে রাখার পিছনে হুমকি হিসেবে কাজ করছিল। বিশেষ করে রুয়ান্ডার প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের সমর্থকরা কঙ্গো থেকে রুয়ান্ডার অভ্যন্তরে হামলা করছিলো। এরপর কাগামি কঙ্গোর ফরাসি সমর্থিত একনায়ক মোবুটু সেসে সেকোকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। লরেন্ট কাবিলার নেতৃত্বে কঙ্গোর বিদ্রোহী গ্রুপকে কাগামি এবং উগান্ডার মুসেভেনি সমর্থন দেন। তবে কাবিলা কঙ্গোর ক্ষমতা নেবার পরপরই কাগামির সাথে শত্রুতা শুরু হয়। কাগামি অভিযোগ করেন যে, কঙ্গো থেকে বিদ্রোহীরা রুয়ান্ডার ভেতর হামলা করছে। জবাবে কাগামি কঙ্গোর অভ্যন্তরে ‘র্যালি ফর কঙ্গোলিজ ডেমোক্র্যাসি’ বা ‘আরসিডি’ গ্রুপকে সমর্থন দিতে শুরু করেন। শুধুমাত্র এঙ্গোলা, নামিবিয়া এবং জিম্বাবুয়ের সরাসরি সমর্থনের কারণে লরেন্ট কাবিলা ক্ষমতাচ্যুত হওয়া থেকে বেঁচে যান। তবে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় এবং ২০০৩ সাল পর্যন্ত রেডক্রসের হিসেবে ৩০ থেকে ৭৬ লক্ষ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুদ্ধের কারণে মৃত্যুবরণ করে। ২০০১ সালের জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী কাগামি এবং উগান্ডার মুসেভেনি কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলের নর্থ কিভু ও সাউথ কিভু অঞ্চলের খনিজ সম্পদের মালিক হবার চেষ্টা করেছেন। কঙ্গোর প্রচুর মূল্যবান খনিজ রুয়ান্ডা হয়ে বাইরের দুনিয়াতে বিক্রি হয়েছে।
২০০১ সালে রুয়ান্ডা ঘোষণা দেয় যে, কঙ্গো থেকে রুয়ান্ডার সকল সেনা সরে এসেছে। এর বিনিময়ে কাগামির সমর্থিত ‘আরসিডি’ লরেন্ট কাবিলার ছেলে জোসেফ কাবিলার সাথে কঙ্গোর ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেয়। তদুপরি কাগামি অভিযোগ করতে থাকেন যে, হুটু বিদ্রোহীরা এখনও কঙ্গোর ভূমি ব্যবহার করে রুয়ান্ডায় হামলা করছে। অপরদিকে কঙ্গোর সরকার বলে যে, হুটুদের কথা বলে কাগামি পুরো অঞ্চলে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর এক বিশ্লেষণে বলা হয় যে, ২০০৫ থেকে ২০০৯ সালের মাঝে লরেন্ট নেকুন্দার নেতৃত্বে কঙ্গোর টুটসিদের গ্রুপকে কাগামি সমর্থন দিয়েছেন; আর ২০১২ সাল থেকে বসকো নেতাগান্দার অধীনে ‘মার্চ ২৩ মুভমেন্ট’ বা ‘এম২৩’কে সমর্থন দিয়েছেন তিনি। ২০১০ সালে জাতিসংঘের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, কঙ্গোর অভ্যন্তরে রুয়ান্ডার সেনাবাহিনী মারাত্মক মানবাধিকার লংঘনের কাজে জড়িত ছিল। আর ২০১২ সালে জাতিগংঘের ফাঁস হওয়া এক গোপন রিপোর্টে বলা হয় যে, রুয়ান্ডার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস কাবারেবে প্রকৃতপক্ষে ‘এম২৩’এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন!
২০১৯ সালে ফেলিক্স শিসেকেদি কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও রুয়ান্ডার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। ২০২০ সালেও কাগামির বিরুদ্ধে কঙ্গোর অভ্যন্তরে রুয়ান্ডার সেনা মোতায়েন রাখার অভিযোগ রয়েছে। আর ২০২১ সালের নভেম্বরে ‘এম২৩’ নতুন করে আভিযান শুরু করলে সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়।
ফ্রান্সের চক্ষুশূল কাগামি
নিহত হবার আগ পর্যন্ত রুয়ান্ডার হুটু প্রেসিডেন্ট হাবিয়ারিমানাএর সাথে ফ্রান্সের যথেষ্ট সখ্যতা ছিল। ১৯৯০ সালে টুটসি বিদ্রোহী গ্রুপ ‘আরপিএফ’ রুয়ান্ডায় হামলা শুরু করলে তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়াঁ মিতেরাঁর সরকার রুয়ান্ডা সরকারকে সহায়তা করার জন্যে ৬’শ প্যারাট্রুপার সেনা পাঠায়। এই সেনারা টুটসি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ চালিয়ে নেয় এবং ১৯৯৪ সালে টুটসিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চলার সময় ফরাসি সেনারা হুটু শরণার্থীদেরকে সুরক্ষা দেয়; যাদের মাঝে মানবাধিকার লংঘনকারীরা ছিল বলেও অভিযোগ ওঠে। ‘আরপিএফ’ রুয়ান্ডার ক্ষমতা নেবার পর ফ্রান্সের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ৬ মাস লাগে। তারপরেও দু’দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল না; কাগামির সরকার অভিযোগ করতে থাকে যে, ফ্রান্স গণহত্যাকারীদের সহায়তা দিয়েছে। এরপর ২০০৬ সালে ফরাসি এক বিচারপতি একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেন, যেখানে বলা হয় যে, রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কাগামি ১৯৯৪ সালে দুই প্রেসিডেন্টের বিমান ভূপাতিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে কাগামি সরকারের ৯ জন সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। রুয়ান্ডা সাথেসাথেই ফ্রান্সের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। তবে ২০০৮-০৯ সালের দিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক আবারও পুনপ্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি গণহত্যার পর থেকে প্রথম ফরাসি প্রেসিডেন্ট হিসেবে রুয়ান্ডা সফর করেন। সফরকালে তিনি স্বীকার করেন যে, ১৯৯৪ সালে ফ্রান্স অনেক বড় ভুল করেছে। পরের বছর কাগামিও প্যারিস সফর করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের কাছের বন্ধু কাগামি
গত ২৫শে জুলাই ‘রয়টার্স’এর এক খবরে বলা হয় যে, মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান রবার্ট মেনেনডেজ মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেনের কাছে লেখা এক চিঠিতে রুয়ান্ডাকে মার্কিন আর্থিক সহায়তার ব্যাপারটা পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানান। চিঠিতে বলা হয় যে, রুয়ান্ডা সরকারের বিরুদ্ধে পার্শ্ববর্তী দেশ কঙ্গোর অভ্যন্তরে ‘এম২৩’ বিদ্রোহী যোদ্ধাদের সহায়তা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমতাবস্থায় মার্কিন সরকার যদি রুয়ান্ডাকে সহায়তা দেয়া চালিয়ে যায়, তাহলে অনেকেই ধরে নিতে পারে যে, রুয়ান্ডার এহেন কর্মকান্ডে মার্কিনীদের সমর্থন রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০২১ সালে ১’শ ৪৭ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র রুয়ান্ডার সবচাইতে বড় সহযোগী রাষ্ট্র। এই সহায়তার একটা অংশ যাচ্ছে জাতিসংঘ মিশনে রুয়ান্ডার সেনাদের অংশ নেয়ার প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক্যাল সহায়তা হিসেবে। রুয়ান্ডার একনায়ক পল কাগামি গত ২২ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট এবং প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি রুয়ান্ডার বাস্তবিক শাসনকর্তা। সিনেটর মেনেনডেজ কাগামি সরকারের সমালোচনা করলেও গত তিন দশকের বেশি সময় ধরেই রুয়ান্ডার সাথে মার্কিনীদের সখ্যতা কমেনি এক বিন্দুও।
পল কাগামির বিরুদ্ধে গণহত্যায় অংশ নেবার অভিযোগ রয়েছে; তিনি পার্শ্ববর্তী দেশ কঙ্গোর অভ্যন্তরে বহু বছর ধরে সেনা মোতায়েন রেখেছেন এবং সেখানে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে নিয়েছেন। তথাপি দেশের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কাগামি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা পশ্চিমাদের, বিশেষ করে মার্কিনীদের যথেষ্টই খুশি করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে পল কাগামি প্রেসিডেন্ট হবার সময় রুয়ান্ডার মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৬’শ ৩১ ডলার; যা ২০২০ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২’শ ১৪ ডলারে। কাগামি রুয়ান্ডাকে উন্মুক্ত বাজার করে দেন এবং দেশকে সিঙ্গাপুর হিসেবে তৈরি করার কথা বলেন। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনসহ অনেকেই পল কাগামির সরকারের এহেন মুক্ত বাজার অর্থনীতির ভুয়সী প্রশংসা করেন। তবে এই উন্নয়ন শুধুমাত্র রাজধানী শহরের কিছু মানুষই ভোগ করেছে। বেশিরভাগ সম্পদই স্বল্প সংখ্যক মানুষের হাতে চলে গেছে।
১৯৯৪ সালের গণহত্যার পর থেকে রুয়ান্ডা ইংরেজী ভাষাভাষী দুনিয়া, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের বেশ কাছাকাছি গিয়েছে। ব্রিটেন রুয়ান্ডাকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে; আর যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে সামরিক সহায়তা ও উন্নয়ন অর্থায়ন। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কাগামিকে বর্তমান সময়ের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন বলে আখ্যা দেন। প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও কাগামি সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কারের ভূয়সী প্রসংসা করে এই বলেন যে, রুয়ান্ডা হলো আন্তর্জাতিক সহায়তা কাজে লাগাবার ক্ষেত্রে সকলের জন্যে উদাহরণস্বরূপ। ব্লেয়ার রুয়ান্ডার সরকারের উপদেষ্টারূপেও কাজ করেছেন। এখানেই শেষ নয়। ২০০৯ সালে ইংরেজী ভাষাভাষী না হয়েও মোজাম্বিকের পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে রুয়ান্ডা ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১২ সালে রুয়ান্ডা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যও নির্বাচিত হয়।
তবে ২০১২ সালের নভেম্বরে কঙ্গোর ‘এম২৩’ বিদ্রোহীদের সহায়তা দানের জন্যে ব্রিটিশ সরকার রুয়ান্ডার জন্যে ২১ মিলিয়ন পাউন্ড সহায়তা স্থগিত করে। জার্মানিও তাই করে। যুক্তরাষ্ট্রও রুয়ান্ডার সামরিক সহায়তা স্থগিত করে। তবে ২০১৩ সালের পর থেকে এই সহায়তাগুলি আবারও দেয়া শুরু হয়। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র রুয়ান্ডার সবচাইতে বড় সহায়তাকারী দেশ।
পশ্চিমাদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব
মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গো খনিজ সম্পদের দিক থেকে অত্যন্ত ধনী একটা দেশ। কিন্তু দেশের মানুষ এই খনিজ সম্পদের সুবিধা কখনোই পায়নি। বরং পশ্চিমা শক্তিদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বলি হয়েছে এখানকার জনগণ। ঔপনিবেশিক শক্তিরা এই অঞ্চল ত্যাগ করলেও এখানকার জনগণ এখনও উপনিবেশ হিসেবেই জীবনযাপন করছে। রুয়ান্ডার গণহত্যায় ৮ লক্ষাধিক মানুষের লাশের উপর দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন পল কাগামি; যিনি তার দেশকে ফ্রান্সের কোল থেকে বের করে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের কোলে নিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ উগান্ডা কাগামিকে ক্ষমতায় যেতে বিশাল সহায়তা দিয়েছে। ১৯৯৪ সালের গণহত্যাটা কাগামিকে তার ক্ষমতার ভিত শক্ত করতে যথেষ্ট সহায়তা করেছে। তবে এর ফলশ্রুতিতে ফ্রান্সের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের যে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তার ফলাফল ভোগ করতে বাধ্য হয় পার্শ্ববর্তী দেশ কঙ্গো। কঙ্গোর গৃহযুদ্ধে রুয়ান্ডা এবং উগান্ডা ভয়াবহ ভূমিকা নেয়; যার ফলশ্রুতিতে কঙ্গোতে ৩০ থেকে ৭৬ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তথাপি এই দ্বন্দ্ব এখনও শেষ হয়নি; যার ফলাফল দেখা যাচ্ছে কঙ্গোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের মাঝে। আফ্রিকাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে রুয়ান্ডাকে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করছে প্রায় তিন দশক ধরে। এমতাবস্থায় জাতিসংঘে রুয়ান্ডা সমর্থিত ‘এম২৩’ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর ফ্রান্স তার শক্তি হারাচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরেই। আফ্রিকাতে ফ্রান্সের অবস্থানগুলি দখলে নিতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার অসারতার জানান দিচ্ছে ফ্রান্স-যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেনের দ্বন্দ্বের বলি কঙ্গো ও রুয়ান্ডার লাখো মানুষের লাশ।
……………………………………………………
সূত্র -
‘Why are there protests against UN peacekeepers in DR Congo?’ in Inside Story, Al-Jazeera, 29 July 2022 (https://youtu.be/hP-U3sKyfBs)
‘America’s secret role in the Rwandan genocide’ in The Guardian, 12 September 2017
‘U.S. senator questions aid to Rwanda over human rights, role in Congo’ in Reuters, 26 July 2022
‘Rethinking the Rwandan Narrative for the 25th Anniversary’, by Gerald Caplan in Genocide Studies International, 2018
‘The Rwanda Crisis: History of a Genocide’ by Gerald Prunier, 1999
‘The Responsibility to Protect and the Duty to Prevent Genocide: Lessons to be Learned from the Role of the International Community and the Media During the Rwandan Genocide and the Conflict in the Former Yugoslavia’ by Jeremy Sarkin and Carly Fowler, in Suffolk Transnational Law Review, 2010
‘Hutus 'killed Rwanda President Juvenal Habyarimana'’ in BBC News, 12 January 2010
‘A Thousand Hills: Rwanda's Rebirth and the Man Who Dreamed it’ by Stephen Kinzer, 2008
‘Silent Accomplice: The Untold Story of France's Role in the Rwandan Genocide’ by Andrew Wallis, 2007
‘Paul Kagame And Rwanda: Power, Genocide and the Rwandan Patriotic Front’ by Colin Waugh, 2004
‘Rwanda's Leaders Vow to Build a Multiparty State for Both Hutu and Tutsi’ in The New York Times, 07 September 1994
‘Ex-Rwandan Minister Killed in Kenya’ in Associated Press, 17 May 1998
‘Report of the Panel of Experts on the Illegal Exploitation of Natural Resources and Other Forms of Wealth of the Democratic Republic of the Congo’, United Nations, 12 April 2001
‘Kagame elected Rwandan president’ in BBC News, 17 April 2000
‘The power of horror in Rwanda’, Human Rights Watch, 11 April 2009
‘Rwandans Led Revolt in Congo’ in The Washington Post, 09 July 1997
‘Review of Congo war halves death toll’ in Associated Press, 20 January 2010
‘Delayed UN report links Rwanda to Congo genocide’ in The Guardian, 01 October 2010
‘GDP per capita, PPP (current international $) – Rwanda’, World Bank, 2020
‘Rwanda's Economic Miracle’ in National Review, 13 December 2010
‘Tracking Rwanda's ICT ambitions’ in The New Times, 27 May 2012
‘Paul Kagame: Rwanda's redeemer or ruthless dictator?’ in The Daily Telegraph, 22 July 2010
‘Whispering truth to power: The everyday resistance of Rwandan peasants to post-genocide reconciliation’ by S. Thomson in African Affairs, 2011
‘Kabila Accuses Rwanda of Trying to Profit from Congo Chaos’ in Voice of America, 30 October 2009
‘Averting Proxy Wars in the Eastern DR Congo and Great Lakes’, International Crisis Group, 23 January 2020
‘Rwanda defence chief leads DR Congo rebels, UN report says, in BBC News, 17 October 2012
‘Shake Hands with the Devil: The Failure of Humanity in Rwanda’ by Romeo Dallaire, 2005
‘Securing Human Rights?: Achievements and Challenges of the UN Security Council’ by Bardo Fassbender, 2011
‘France's shame?, in The Guardian, 11 January 2007
‘France issues Rwanda warrants’ in BBC News, 23 November 2006
‘Rwanda cuts relations with France’ in BBC News, 24 November 2006
‘Kabuye's release not condition for resuming ties with France-Museminali’ in The New Times, 25 November 2008
‘On Visit to Rwanda, Sarkozy Admits 'Grave Errors' in 1994 Genocide’ in The New York Times, 25 February 2010
‘Rwanda's Kagame pays 'reconciliation visit' to France’ in BBC News, 12 September 2011
‘The end of the west's humiliating affair with Paul Kagame’ in The Guardian, 25 July 2012
‘Blair takes on unpaid role as Rwanda advise’ in The Guardian, 18 January 2008
‘Rwanda joins the Commonwealth’ in The Daily Telegraph, 29 November 2009
‘UK stops £21m aid payment to Rwanda’ in BBC News, 30 November 2012
‘The Effects of the Exit From Budget Support In Rwanda’, German Institute for Development Evaluation, February 2008
‘Obama accused of failed policy over Rwanda's support of rebel group’ in The Guardian, 11 December 2012
Labels:
Africa,
Britain,
DR Congo,
France,
Geopolitics,
Ideological Crisis,
MONUSCO,
New World Order,
Rwanda,
Uganda,
UN Peacekeepers,
USA
Sunday, 31 July 2022
বিন সালমানের প্যারিস সফর পশ্চিমা আদর্শের দেউলিয়াত্বকেই তুলে ধরে
০১লা অগাস্ট ২০২২
শুধু বাইডেন এবং এরদোগানই নয়, এবারে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁও সৌদি যুবরাজ এবং সৌদি আরবের বাস্তবিক শাসনকর্তা মোহাম্মদ বিন সালমানকে কাছে টেনে নিলেন। বিন সালমানের প্যারিস সফরকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা লিবারাল মিডিয়াতে ব্যাপক সমালোচনা চলমান রয়েছে; যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য সফর এবং বিন সালমানের ইস্তাম্বুল সফরের পর থেকে অব্যাহত রয়েছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ২৮শে জুলাই প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ এবং বিন সালমানের নৈশভোজের ফাঁকে আলোচনার পটভূমি ছিল জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা এবং ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে মধ্যপ্রাচের দেশগুলির দুশ্চিন্তা। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটের ভেতরে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকান্ড নিয়ে পশ্চিমা মানবাধিকার সংস্থাগুলির হাহাকারের মাঝেই পশ্চিমা নেতৃত্ব বিন সালমানের সাথে বৈঠক করে যাচ্ছেন। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’এর বেনেডিক্টে জনেরদ বলছেন যে, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ মানবাধিকারের ব্যাপারে শক্ত অবস্থান না নিয়ে বিন সালমানের চরিত্রকে ‘হোয়াইটওয়াশ’ করে তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পুনর্বাসনের ঝুঁকি নিচ্ছেন! ফ্রান্সের অবস্থানকে যুক্তিযুক্ত করতে গিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র বলেন যে, সৌদি যুবরাজের সাথে আলোচনায় মানবাধিকার ইস্যুকে সাধারণভাবে আলোচনা করা হলেও পুরো ইউরোপের সমস্যা সমাধানে ফ্রান্সের সকল বন্ধুদের সাথেই আলোচনায় বসতে হচ্ছে। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এলিজাবেথ বোর্ন বলছেন যে, তিনি মনে করেন না যে, ফরাসি জনগণ সরকারের এই ব্যাপারটাকে অনুধাবন করতে পারবে; এমনকি রুশ গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ করে দেবার হুমকির মাঝে প্রেসিডেন্ট যদি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির সাথে বৈঠক নাও করেন।
‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিন সালমানের প্যারিস সফরের মূলে রয়েছে সৌদি আরবকে তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্যে প্রভাবিত করা; যে উদ্দেশ্যে ম্যাক্রঁ এবং জো বাইডেন উভয়েই চেষ্টা চালাচ্ছেন। ফ্রান্স এবং ইইউ চাইছে তাদের জ্বালানির উৎসকে আরও প্রসারিত করতে। পশ্চিমা দেশগুলি এখন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আদর্শের উপরে স্থান দিচ্ছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘মিডলইস্ট ইন্সটিটিউট’এর স্কলার ফাতিমা আবি আল-আসরার ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’কে বলছেন যে, পশ্চিমা নেতারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির কাছে ধর্না দিয়ে তেলের বাজারের অস্থিরতা কাটাতে চাইছেন মূলতঃ তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্বার্থকে মাথায় রেখেই। সর্বক্ষেত্রেই দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে চীন এবং রাশিয়ার ক্ষেত্রেই শুধু নয়; যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম অনুসরণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গুয়ান্তানামো বে কারাগারে মানবাধিকার লঙ্ঘন, অভিবাসী নিয়ে বৈরী নীতি, আর বর্ণবাদী সমস্যা তো রয়েছেই। এমতাবস্থায় সৌদিদের সাথে আলোচনা করাটা পশ্চিমাদের নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসা নয়; কারণ ঐতিহাসিকভাবেই সৌদি আরবের সাথে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক রয়েছে। কাজেই সৌদি আরবকে বিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কিছুই নেই।
সৌদি যুবরাজের অফিস থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেয়ার কারণে বিন সালমান তার গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। আলোচনার ফলে দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতা আরও নিশ্চয়তা পেলো। আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে উভয় দেশের সাধারণ স্বার্থকে এগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে এই আলোচনা ভূমিকা রাখবে। ‘আল আরাবিয়া’র এক প্রতিবেদনে ‘সৌদি প্রেস এজেন্সি’ এবং ফরাসি প্রেসিডেন্টের অফিসের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, দুই দেশের মাঝে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ এবং হাইড্রোজেন শক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয় যে, উভয় নেতা বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে স্থিতি ফিরিয়ে আনার গুরুত্ব এবং বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্য, বিশেষ করে গমের সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও বাকি বিশ্বের উপর ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে দুই দেশের মাঝে সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়ে কথা হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলির জ্বালানির উৎস বাড়ানোর বিষয়টার উপরেই ফরাসি প্রেসিডেন্ট বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে উভয় দেশের স্বার্থের প্রতি হুমকির বিষয়গুলিকে আলোচনায় এনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়; বিশেষ করে লেবাননের সমস্যা নিরসরণে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ব্যাপারে ঐকমত্য ছাড়াও সেখানে দুই দেশের যৌথ কর্মপদ্ধতির সফলতা যাচাই করা হয়। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে না দেয়ার বিষয়ে আলোচনার অগ্রগতি এবং সিরিয়ায় শান্তির ফিরিয়ে আনার ব্যাপারও দুই দেশের মাঝে আলোচিত হয়েছে। ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রগতি নিয়েও তারা আলোচনা করেছেন।
বিন সালমানের প্যারিস সফরের আরেকটা দিক ছিল ইরানের সাথে পশ্চিমাদের পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা। আল-আসরার বলছেন যে, গত চার বছর ধরে বিন সালমানকে পশ্চিমারা বয়কট করে এসেছে। কাজেই যুবরাজ নিশ্চয়ই তার এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্যে উৎসুক ছিলেন; বিশেষ করে তিনি আঞ্চলিক দিক দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সৌদিদের অবস্থানকে সুসংহত করতে চাইছেন এবং বাকি বিশ্বের কাছে তার এই অবস্থানকে জানান দিতে চাইছেন। আর ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে, বিশেষ করে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াগুলিকে সামরিক দিক থেকে হারাতে না পেরে বিন সালমান এখন পশ্চিমাদের কাছ থেকে কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে চাইছেন; যাতে ইরান ইচ্ছামতো তার নীতি বাস্তবায়ন করতে না পারে। ফ্রান্স সর্বদাই ইরানের সাথে পারমাণবিক ইস্যুতে চুক্তি করতে আগ্রহী ছিল; তবে সৌদিরা এতে আগ্রহী নয়। সৌদিরা দুশ্চিন্তায় রয়েছে যে, পশ্চিমারা যদি ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি করে, সেক্ষেত্রে পশ্চিমারা হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির মতামত না নিয়েই সেদিকে ধাবিত হতে পারে। সৌদিরা চাইছে না যে, পশ্চিমারা যে চুক্তি করবে, সেটা তাদেরকে চুপচাপ মেনে নিতে হবে।
বিন সালমানের প্যারিস সফর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইস্যুগুলিতে আরব দেশগুলির পশ্চিমমুখীতাকে আবারও তুলে ধরলো। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরান ইস্যুতে সৌদিরা প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সকে বাদ দিয়ে চিন্তা করতে পারছে না। নিঃসন্দেহে ম্যাক্রঁ মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপের অবস্থান ধরে রাখার নেতৃত্ব চাইছেন। অপরদিকে আবারও প্রমাণ হলো যে, মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মাঝে জ্বালানি বিপর্যয় মোকাবিলা করাটা ফ্রান্স, তথা ইউরোপের যেকোন দেশের ক্ষমতাসীনদের জন্যেই বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কঠিন বাস্তবতায় নিজেদের স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে আদর্শকে জ্বলাঞ্জলি দেয়ার ঘটনাটা পশ্চিমাদের আদর্শিক দেউলিয়াত্বকে আরও একবার আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
শুধু বাইডেন এবং এরদোগানই নয়, এবারে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁও সৌদি যুবরাজ এবং সৌদি আরবের বাস্তবিক শাসনকর্তা মোহাম্মদ বিন সালমানকে কাছে টেনে নিলেন। বিন সালমানের প্যারিস সফরকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা লিবারাল মিডিয়াতে ব্যাপক সমালোচনা চলমান রয়েছে; যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য সফর এবং বিন সালমানের ইস্তাম্বুল সফরের পর থেকে অব্যাহত রয়েছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ২৮শে জুলাই প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ এবং বিন সালমানের নৈশভোজের ফাঁকে আলোচনার পটভূমি ছিল জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা এবং ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে মধ্যপ্রাচের দেশগুলির দুশ্চিন্তা। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটের ভেতরে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকান্ড নিয়ে পশ্চিমা মানবাধিকার সংস্থাগুলির হাহাকারের মাঝেই পশ্চিমা নেতৃত্ব বিন সালমানের সাথে বৈঠক করে যাচ্ছেন। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’এর বেনেডিক্টে জনেরদ বলছেন যে, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ মানবাধিকারের ব্যাপারে শক্ত অবস্থান না নিয়ে বিন সালমানের চরিত্রকে ‘হোয়াইটওয়াশ’ করে তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পুনর্বাসনের ঝুঁকি নিচ্ছেন! ফ্রান্সের অবস্থানকে যুক্তিযুক্ত করতে গিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র বলেন যে, সৌদি যুবরাজের সাথে আলোচনায় মানবাধিকার ইস্যুকে সাধারণভাবে আলোচনা করা হলেও পুরো ইউরোপের সমস্যা সমাধানে ফ্রান্সের সকল বন্ধুদের সাথেই আলোচনায় বসতে হচ্ছে। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এলিজাবেথ বোর্ন বলছেন যে, তিনি মনে করেন না যে, ফরাসি জনগণ সরকারের এই ব্যাপারটাকে অনুধাবন করতে পারবে; এমনকি রুশ গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ করে দেবার হুমকির মাঝে প্রেসিডেন্ট যদি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির সাথে বৈঠক নাও করেন।
‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিন সালমানের প্যারিস সফরের মূলে রয়েছে সৌদি আরবকে তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্যে প্রভাবিত করা; যে উদ্দেশ্যে ম্যাক্রঁ এবং জো বাইডেন উভয়েই চেষ্টা চালাচ্ছেন। ফ্রান্স এবং ইইউ চাইছে তাদের জ্বালানির উৎসকে আরও প্রসারিত করতে। পশ্চিমা দেশগুলি এখন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আদর্শের উপরে স্থান দিচ্ছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘মিডলইস্ট ইন্সটিটিউট’এর স্কলার ফাতিমা আবি আল-আসরার ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’কে বলছেন যে, পশ্চিমা নেতারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির কাছে ধর্না দিয়ে তেলের বাজারের অস্থিরতা কাটাতে চাইছেন মূলতঃ তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্বার্থকে মাথায় রেখেই। সর্বক্ষেত্রেই দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে চীন এবং রাশিয়ার ক্ষেত্রেই শুধু নয়; যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম অনুসরণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গুয়ান্তানামো বে কারাগারে মানবাধিকার লঙ্ঘন, অভিবাসী নিয়ে বৈরী নীতি, আর বর্ণবাদী সমস্যা তো রয়েছেই। এমতাবস্থায় সৌদিদের সাথে আলোচনা করাটা পশ্চিমাদের নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসা নয়; কারণ ঐতিহাসিকভাবেই সৌদি আরবের সাথে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক রয়েছে। কাজেই সৌদি আরবকে বিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কিছুই নেই।
সৌদি যুবরাজের অফিস থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেয়ার কারণে বিন সালমান তার গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। আলোচনার ফলে দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতা আরও নিশ্চয়তা পেলো। আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে উভয় দেশের সাধারণ স্বার্থকে এগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে এই আলোচনা ভূমিকা রাখবে। ‘আল আরাবিয়া’র এক প্রতিবেদনে ‘সৌদি প্রেস এজেন্সি’ এবং ফরাসি প্রেসিডেন্টের অফিসের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, দুই দেশের মাঝে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ এবং হাইড্রোজেন শক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয় যে, উভয় নেতা বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে স্থিতি ফিরিয়ে আনার গুরুত্ব এবং বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্য, বিশেষ করে গমের সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও বাকি বিশ্বের উপর ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে দুই দেশের মাঝে সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়ে কথা হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলির জ্বালানির উৎস বাড়ানোর বিষয়টার উপরেই ফরাসি প্রেসিডেন্ট বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে উভয় দেশের স্বার্থের প্রতি হুমকির বিষয়গুলিকে আলোচনায় এনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়; বিশেষ করে লেবাননের সমস্যা নিরসরণে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ব্যাপারে ঐকমত্য ছাড়াও সেখানে দুই দেশের যৌথ কর্মপদ্ধতির সফলতা যাচাই করা হয়। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে না দেয়ার বিষয়ে আলোচনার অগ্রগতি এবং সিরিয়ায় শান্তির ফিরিয়ে আনার ব্যাপারও দুই দেশের মাঝে আলোচিত হয়েছে। ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রগতি নিয়েও তারা আলোচনা করেছেন।
বিন সালমানের প্যারিস সফরের আরেকটা দিক ছিল ইরানের সাথে পশ্চিমাদের পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা। আল-আসরার বলছেন যে, গত চার বছর ধরে বিন সালমানকে পশ্চিমারা বয়কট করে এসেছে। কাজেই যুবরাজ নিশ্চয়ই তার এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্যে উৎসুক ছিলেন; বিশেষ করে তিনি আঞ্চলিক দিক দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সৌদিদের অবস্থানকে সুসংহত করতে চাইছেন এবং বাকি বিশ্বের কাছে তার এই অবস্থানকে জানান দিতে চাইছেন। আর ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে, বিশেষ করে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াগুলিকে সামরিক দিক থেকে হারাতে না পেরে বিন সালমান এখন পশ্চিমাদের কাছ থেকে কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে চাইছেন; যাতে ইরান ইচ্ছামতো তার নীতি বাস্তবায়ন করতে না পারে। ফ্রান্স সর্বদাই ইরানের সাথে পারমাণবিক ইস্যুতে চুক্তি করতে আগ্রহী ছিল; তবে সৌদিরা এতে আগ্রহী নয়। সৌদিরা দুশ্চিন্তায় রয়েছে যে, পশ্চিমারা যদি ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি করে, সেক্ষেত্রে পশ্চিমারা হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির মতামত না নিয়েই সেদিকে ধাবিত হতে পারে। সৌদিরা চাইছে না যে, পশ্চিমারা যে চুক্তি করবে, সেটা তাদেরকে চুপচাপ মেনে নিতে হবে।
বিন সালমানের প্যারিস সফর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইস্যুগুলিতে আরব দেশগুলির পশ্চিমমুখীতাকে আবারও তুলে ধরলো। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরান ইস্যুতে সৌদিরা প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সকে বাদ দিয়ে চিন্তা করতে পারছে না। নিঃসন্দেহে ম্যাক্রঁ মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপের অবস্থান ধরে রাখার নেতৃত্ব চাইছেন। অপরদিকে আবারও প্রমাণ হলো যে, মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মাঝে জ্বালানি বিপর্যয় মোকাবিলা করাটা ফ্রান্স, তথা ইউরোপের যেকোন দেশের ক্ষমতাসীনদের জন্যেই বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কঠিন বাস্তবতায় নিজেদের স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে আদর্শকে জ্বলাঞ্জলি দেয়ার ঘটনাটা পশ্চিমাদের আদর্শিক দেউলিয়াত্বকে আরও একবার আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
Labels:
energy crisis,
France,
Geopolitics,
Human Rights,
Ideological Crisis,
Middle East,
Saudi Arabia,
Ukraine War
Friday, 29 July 2022
রুশ গ্যাস ছাড়া শীতকাল পার হতে পারবে জার্মানি?
৩০শে জুলাই ২০২২
রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত ‘নর্ড স্ট্রিম ১’ গ্যাস পাইপলাইনে রুশ কোম্পানি ‘গ্যাজপ্রম’ গ্যাস সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেবার পরপরই জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ইইউ সমঝোতায় পৌঁছে যে, তারা আগামী শীতের মাঝে অগাস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত স্বেচ্ছায় তাদের গ্যাসের ব্যবহার ১৫ শতাংশ কমাবে। আর রাশিয়া যদি ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দেয়, তাহলে জরুরি ভিত্তিতে বাধ্যতামূলকভাবে গ্যাস ব্যবহার কমাতে হবে। তবে এই জরুরি অবস্থা কখন কিভাবে ঘোষণা হতে পারে, সেব্যাপারে সমঝোতা হয়নি। তথাপি ইইউএর গ্যাস নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত নয় বা এই নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীলতা কম, এমন দেশগুলি এই সমঝোতার বাইরে থাকতে পারবে; যার মাঝে পড়বে দ্বীপ দেশ আয়ারল্যান্ড, সাইপ্রাস এবং মাল্টা; তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া; এবং দক্ষিণ ইউরোপের দেশ স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও গ্রিস। প্রস্তাবের পক্ষে জোরেসোরে কাজ করা চেক রিপাবলিকের মন্ত্রী জোসেফ সিকেলা সাংবাদিকদের বলেন যে, এই সমঝোতা বেশ কঠিন ছিল; তবে এর দরকার সকলেই বুঝতে পেরেছে। এখন সকলে মিলে কষ্ট ভাগাভাগি করে নেবে তারা। জার্মান মন্ত্রী রবার্ট হাবেক স্বীকার করেন যে, রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীল হয়ে জার্মানি কৌশলগত ভুল করেছে। তবে এখন এটা শুধু জার্মানির সমস্যা নয়। ফরাসি মন্ত্রী আগনেস পানিয়ে-রানুশে বলেন যে, এখানে পুরো ইউরোপের অর্থনীতির স্বাস্থ্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে; কারণ ইইউএর শিল্পগুলি একে অপরের উপর নির্ভরশীল। জার্মানির কেমিক্যাল শিল্পে সমস্যা হলে সারা ইউরোপের শিল্পই সমস্যায় পড়ে যাবে।
ইইউএর মাঝে হাঙ্গেরি এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। তারা এর আগেও রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধের ইইউ সিদ্ধান্তের সাথে একমত হয়নি। স্পেনের মন্ত্রী তেরেসা রিবেরা জার্মানিকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তারা তাদের জ্বালানির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার সময় তো অন্য কারুর উপদেশ নেয়নি; তাহলে স্পেন কেন তাদের জন্যে কষ্ট সহ্য করবে? তিনি এই ভাষা ব্যবহার করেছেন, কারণ স্পেন তার বেশিরভাগ গ্যাস আফ্রিকা থেকে আমদানি করে।
ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এক দশক আগে দক্ষিণ ইউরোপের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সময় জার্মানি সেই দেশগুলির ঋণে জর্জরিত হয়ে যাবার সমালোচনায় বলেছিল যে, তারা তাদের নিজেদের ঘরের কাজগুলি করেনি। এখন রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমাবার ক্ষেত্রে বাস্তবতা হলো, জার্মানি ক্লাসের সবচাইতে খারাপ ছাত্র। স্পেনের মন্ত্রী রিবেরা এবার জার্মানিকে ঐ একই কথাগুলি ফেরত দিয়ে বলেছেন যে, এলএনজি আমদানির অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে স্পেন নিজেদের ঘরের কাজগুলি করেছে। তিনি প্রকৃতপক্ষে জার্মানির সমালোচনাই করেছেন; কারণ জার্মানি রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীল থেকে এলএনজি আমদানির কোন অবকাঠামোই তৈরি করেনি। জার্মান পত্রিকা ‘সুডশে জাইটুং’ প্রায় একইভাবে বলছে যে, একসময় কিছু দেশ অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ে জার্মানির লেকচার শুনেছে। এখন এই দেশগুলিকেই অনুরোধ করা হচ্ছে, তারা যেন গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে জার্মানিকে ‘গ্যাসের দেউলিয়াত্ব’ থেকে উদ্ধার করে! আরেক জার্মান পত্রিকা ‘ফ্রাংকফুটার আলেমাইনে’ বলছে যে, ‘নর্ড স্ট্রিম ১’ পাইপলাইন তৈরি করার সময় জার্মানরা পোল্যান্ড ও পূর্ব ইউরোপের বাকি দেশগুলির জ্বালানি এবং নিরাপত্তার প্রশ্নকে উপেক্ষা করেছিল। আর জার্মানরা সর্বদাই দাবি করেছে যে, তারা বাকিদের চাইতে বেশি জানে!
‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, জার্মানি কি কি পদ্ধতিতে এই সংকট কাটাবার চেষ্টা করতে পারে। প্রথমতঃ এলএনজিএর মাধ্যমে অন্যান্য সূত্র থেকে সমুদ্রপথে গ্যাস আমদানি করতে পারে তারা। দ্বিতীয়তঃ নিজ দেশে গ্যাসের ব্যবহার কমাতে চেষ্টা করতে পারে। তৃতীয়তঃ কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে দিতে পারে। চতুর্থতঃ তারা ক্ষমতাসীন কোয়ালিশনে থাকা ছোট দল ‘ফ্রি ডেমোক্র্যাট’এর কথা শুনে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিকে আরও বেশি সময়ের জন্যে সার্ভিসে রাখার চেষ্টা করতে পারে। ২০২২ সালের মাঝেই জার্মানির সর্বশেষ তিনটা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার কথা রয়েছে। জার্মানি ইতোমধ্যেই পারমাণবিক বিদ্যুতের জন্যে জ্বালানি কেনা বন্ধ করে দিয়েছে; নতুন করে কিনতে গেলে সেটা ২০২৩ সালের শরতকালের আগে সম্ভব হবে না। শীতকালে চালু রাখলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি থেকে কম উৎপাদন আসবে। এছাড়াও সমস্যা হলো পারমাণবিক বিদ্যুতের জন্যে ইউরেনিয়ামের ২০ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে; আরও ২০ শতাংশ আসে রাশিয়ার বন্ধু দেশ কাজাখস্থান থেকে। তথাপি পারমাণবিক বিদ্যুৎ জার্মানির মোট বিদ্যুতের তুলনায় তেমন কিছুই নয়; বায়ুশক্তি থেকেই আসে এর চাইতে তিনগুণ বিদ্যুৎ। আর গ্রীষ্মে বেশি গরম পড়লে নদীর উষ্ণ পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি ঠান্ডা করার কাজে ব্যবহার করা যাবে না। বায়ুশক্তি বৃদ্ধি করার ১০ হাজার মেগাওয়াটের প্রকল্প রয়েছে জার্মানির; তবে প্রথম টার্বাইন থেকে বিদ্যুৎ আসতেও ৬ বছর লেগে যাবে। এছাড়াও পরিবেশ রক্ষার আইনের কারণে সোলার এবং বায়োগ্যাস থেকে দ্রুতই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আশা করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় পরিবেশ রক্ষার ব্রতকে আপাততঃ ভুলে গিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্যাসের ব্যবহার কমানোই জার্মানির সামনে খোলা পথ।
রুশ গ্যাসের সরবরাহ বন্ধের কাছাকাছি চলে যাওয়ার পর জার্মানির হ্যানোভার শহর সরকারি ভবনগুলিতে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গরম পানির সরবরাহ বন্ধ ঘোষণা করেছে। ঝরণাগুলি বন্ধ থাকবে; রাতের বেলায় সরকারি ভবনগুলিতে আলো জ্বলবে না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও তাপমাত্রা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই ব্যবস্থাগুলি আসছে শীতকালের আগে গ্যাসের মজুত বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে। জার্মানির জ্বালানি কোম্পানিগুলিকে দেউলিয়াত্ব থেকে বাঁচাতে জার্মান পরিবারগুলিকে বছরে অতিরিক্ত ৫’শ ইউরো গুণতে হতে পারে। ইইউএর মাঝে থেকেও জার্মানি নিজস্ব নীতিকে অনুসরণ করতে চেয়েছে; প্রয়োজনে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলিকে জার্মানির তৈরি করে দেয়া নীতি অনুসরণ করতে বাধ্যও করেছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপের বাকি দেশগুলির সাথে জার্মানির নীতিগত সংঘর্ষ আরও প্রবল হয়েছে। জাতীয়তাবাদের উত্থানের বাস্তবতার মাঝে ইইউএর চিন্তাটাই যখন প্রশ্নবিদ্ধ, তখন বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি হবার পরেও জার্মানির অসহায়ত্ব এখন সকলের সামনে পরিষ্কার। এহেন দুর্বলতা জার্মানির জাতীয় গর্বের উপর আঘাত; যা দেশটার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার বীজ হতে পারে।
রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত ‘নর্ড স্ট্রিম ১’ গ্যাস পাইপলাইনে রুশ কোম্পানি ‘গ্যাজপ্রম’ গ্যাস সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেবার পরপরই জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ইইউ সমঝোতায় পৌঁছে যে, তারা আগামী শীতের মাঝে অগাস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত স্বেচ্ছায় তাদের গ্যাসের ব্যবহার ১৫ শতাংশ কমাবে। আর রাশিয়া যদি ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দেয়, তাহলে জরুরি ভিত্তিতে বাধ্যতামূলকভাবে গ্যাস ব্যবহার কমাতে হবে। তবে এই জরুরি অবস্থা কখন কিভাবে ঘোষণা হতে পারে, সেব্যাপারে সমঝোতা হয়নি। তথাপি ইইউএর গ্যাস নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত নয় বা এই নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীলতা কম, এমন দেশগুলি এই সমঝোতার বাইরে থাকতে পারবে; যার মাঝে পড়বে দ্বীপ দেশ আয়ারল্যান্ড, সাইপ্রাস এবং মাল্টা; তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া; এবং দক্ষিণ ইউরোপের দেশ স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও গ্রিস। প্রস্তাবের পক্ষে জোরেসোরে কাজ করা চেক রিপাবলিকের মন্ত্রী জোসেফ সিকেলা সাংবাদিকদের বলেন যে, এই সমঝোতা বেশ কঠিন ছিল; তবে এর দরকার সকলেই বুঝতে পেরেছে। এখন সকলে মিলে কষ্ট ভাগাভাগি করে নেবে তারা। জার্মান মন্ত্রী রবার্ট হাবেক স্বীকার করেন যে, রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীল হয়ে জার্মানি কৌশলগত ভুল করেছে। তবে এখন এটা শুধু জার্মানির সমস্যা নয়। ফরাসি মন্ত্রী আগনেস পানিয়ে-রানুশে বলেন যে, এখানে পুরো ইউরোপের অর্থনীতির স্বাস্থ্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে; কারণ ইইউএর শিল্পগুলি একে অপরের উপর নির্ভরশীল। জার্মানির কেমিক্যাল শিল্পে সমস্যা হলে সারা ইউরোপের শিল্পই সমস্যায় পড়ে যাবে।
ইইউএর মাঝে হাঙ্গেরি এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। তারা এর আগেও রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধের ইইউ সিদ্ধান্তের সাথে একমত হয়নি। স্পেনের মন্ত্রী তেরেসা রিবেরা জার্মানিকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তারা তাদের জ্বালানির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার সময় তো অন্য কারুর উপদেশ নেয়নি; তাহলে স্পেন কেন তাদের জন্যে কষ্ট সহ্য করবে? তিনি এই ভাষা ব্যবহার করেছেন, কারণ স্পেন তার বেশিরভাগ গ্যাস আফ্রিকা থেকে আমদানি করে।
ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এক দশক আগে দক্ষিণ ইউরোপের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সময় জার্মানি সেই দেশগুলির ঋণে জর্জরিত হয়ে যাবার সমালোচনায় বলেছিল যে, তারা তাদের নিজেদের ঘরের কাজগুলি করেনি। এখন রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমাবার ক্ষেত্রে বাস্তবতা হলো, জার্মানি ক্লাসের সবচাইতে খারাপ ছাত্র। স্পেনের মন্ত্রী রিবেরা এবার জার্মানিকে ঐ একই কথাগুলি ফেরত দিয়ে বলেছেন যে, এলএনজি আমদানির অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে স্পেন নিজেদের ঘরের কাজগুলি করেছে। তিনি প্রকৃতপক্ষে জার্মানির সমালোচনাই করেছেন; কারণ জার্মানি রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীল থেকে এলএনজি আমদানির কোন অবকাঠামোই তৈরি করেনি। জার্মান পত্রিকা ‘সুডশে জাইটুং’ প্রায় একইভাবে বলছে যে, একসময় কিছু দেশ অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ে জার্মানির লেকচার শুনেছে। এখন এই দেশগুলিকেই অনুরোধ করা হচ্ছে, তারা যেন গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে জার্মানিকে ‘গ্যাসের দেউলিয়াত্ব’ থেকে উদ্ধার করে! আরেক জার্মান পত্রিকা ‘ফ্রাংকফুটার আলেমাইনে’ বলছে যে, ‘নর্ড স্ট্রিম ১’ পাইপলাইন তৈরি করার সময় জার্মানরা পোল্যান্ড ও পূর্ব ইউরোপের বাকি দেশগুলির জ্বালানি এবং নিরাপত্তার প্রশ্নকে উপেক্ষা করেছিল। আর জার্মানরা সর্বদাই দাবি করেছে যে, তারা বাকিদের চাইতে বেশি জানে!
‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, জার্মানি কি কি পদ্ধতিতে এই সংকট কাটাবার চেষ্টা করতে পারে। প্রথমতঃ এলএনজিএর মাধ্যমে অন্যান্য সূত্র থেকে সমুদ্রপথে গ্যাস আমদানি করতে পারে তারা। দ্বিতীয়তঃ নিজ দেশে গ্যাসের ব্যবহার কমাতে চেষ্টা করতে পারে। তৃতীয়তঃ কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে দিতে পারে। চতুর্থতঃ তারা ক্ষমতাসীন কোয়ালিশনে থাকা ছোট দল ‘ফ্রি ডেমোক্র্যাট’এর কথা শুনে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিকে আরও বেশি সময়ের জন্যে সার্ভিসে রাখার চেষ্টা করতে পারে। ২০২২ সালের মাঝেই জার্মানির সর্বশেষ তিনটা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার কথা রয়েছে। জার্মানি ইতোমধ্যেই পারমাণবিক বিদ্যুতের জন্যে জ্বালানি কেনা বন্ধ করে দিয়েছে; নতুন করে কিনতে গেলে সেটা ২০২৩ সালের শরতকালের আগে সম্ভব হবে না। শীতকালে চালু রাখলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি থেকে কম উৎপাদন আসবে। এছাড়াও সমস্যা হলো পারমাণবিক বিদ্যুতের জন্যে ইউরেনিয়ামের ২০ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে; আরও ২০ শতাংশ আসে রাশিয়ার বন্ধু দেশ কাজাখস্থান থেকে। তথাপি পারমাণবিক বিদ্যুৎ জার্মানির মোট বিদ্যুতের তুলনায় তেমন কিছুই নয়; বায়ুশক্তি থেকেই আসে এর চাইতে তিনগুণ বিদ্যুৎ। আর গ্রীষ্মে বেশি গরম পড়লে নদীর উষ্ণ পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি ঠান্ডা করার কাজে ব্যবহার করা যাবে না। বায়ুশক্তি বৃদ্ধি করার ১০ হাজার মেগাওয়াটের প্রকল্প রয়েছে জার্মানির; তবে প্রথম টার্বাইন থেকে বিদ্যুৎ আসতেও ৬ বছর লেগে যাবে। এছাড়াও পরিবেশ রক্ষার আইনের কারণে সোলার এবং বায়োগ্যাস থেকে দ্রুতই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আশা করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় পরিবেশ রক্ষার ব্রতকে আপাততঃ ভুলে গিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্যাসের ব্যবহার কমানোই জার্মানির সামনে খোলা পথ।
রুশ গ্যাসের সরবরাহ বন্ধের কাছাকাছি চলে যাওয়ার পর জার্মানির হ্যানোভার শহর সরকারি ভবনগুলিতে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গরম পানির সরবরাহ বন্ধ ঘোষণা করেছে। ঝরণাগুলি বন্ধ থাকবে; রাতের বেলায় সরকারি ভবনগুলিতে আলো জ্বলবে না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও তাপমাত্রা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই ব্যবস্থাগুলি আসছে শীতকালের আগে গ্যাসের মজুত বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে। জার্মানির জ্বালানি কোম্পানিগুলিকে দেউলিয়াত্ব থেকে বাঁচাতে জার্মান পরিবারগুলিকে বছরে অতিরিক্ত ৫’শ ইউরো গুণতে হতে পারে। ইইউএর মাঝে থেকেও জার্মানি নিজস্ব নীতিকে অনুসরণ করতে চেয়েছে; প্রয়োজনে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলিকে জার্মানির তৈরি করে দেয়া নীতি অনুসরণ করতে বাধ্যও করেছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপের বাকি দেশগুলির সাথে জার্মানির নীতিগত সংঘর্ষ আরও প্রবল হয়েছে। জাতীয়তাবাদের উত্থানের বাস্তবতার মাঝে ইইউএর চিন্তাটাই যখন প্রশ্নবিদ্ধ, তখন বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি হবার পরেও জার্মানির অসহায়ত্ব এখন সকলের সামনে পরিষ্কার। এহেন দুর্বলতা জার্মানির জাতীয় গর্বের উপর আঘাত; যা দেশটার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার বীজ হতে পারে।
Labels:
energy crisis,
EU,
Geopolitics,
Germany,
Nationalism,
New World Order,
Russia,
Ukraine War
Sunday, 24 July 2022
মধ্যপ্রাচ্য সফরে কি পেলেন জো বাইডেন?
২৫শে জুলাই ২০২২
জুলাইয়ের প্রথমভাগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য সফরের কেন্দ্রে ছিল সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে বৈঠক। মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ‘সিবিএস’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বাইডেন সৌদি যুবরাজের সাথে দেখা করার জন্যে রাজি ছিলেন না মোটেই। বিশেষ করে যেখানে মার্কিন ইন্টেলিজেন্স প্রতিবেদনই বলেছে যে, ২০১৮ সালে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার সিদ্ধান্ত খুব সম্ভবতঃ বিন সালমানই দিয়েছিলেন। এখন তুমুল সমালোচনার মুখে বাইডেনকে বিন সালমানের সাথে বৈঠকের যুক্তিযুক্ততা তুলে ধরতে হচ্ছে। বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য সফরে তেলের বাজারে অস্থিরতা কমাতে সৌদি আরবকে তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে রাজি করানো, ইস্রাইলের সাথে আরব দেশগুলির সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়াও ইস্রাইলের জন্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা বৃদ্ধি করা; এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ধরে রাখার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশগুলিকে আস্বস্ত করার ব্যাপারগুলি বিশ্লেষকেরা আলোচনা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ইস্যুগুলিকে সকলেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন।
জো বাইডেন জেদ্দায় ‘জিসিসি’র শীর্ষ বৈঠকে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাবে না; এবং রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো দেশের কাছে শূন্যস্থান পূরণের সুযোগও তারা দেবে না। ‘আল জাজিরা’র জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ত্যাগের পর এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের চীন ও রাশিয়া কেন্দ্রিক বক্তব্যের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্রগুলির মাঝে যথেষ্ট দুশ্চিন্তার সৃষ্টি হয়েছে। একারণেই বাইডেনকে নতুন করে আশ্বাস দিতে হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব কমে যায়নি; বরং আফগানিস্তান থেকে সরে আসার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বেশকিছু সম্পদ এখন মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা সম্ভব হবে। বিশারা বলছেন যে, বাইডেন বেশ পরিষ্কার করেই বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে থাকবে তাদের জাতীয় স্বার্থের জন্যে। এর জন্যে দরকার হলে মানবাধিকারের মতো আদর্শিক ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র ছাড় দেবে; সেটা সৌদি আরব, মিশর বা ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। তবে বিশারা আশংকা করছেন যে, মার্কিন জাতীয় স্বার্থের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে একটা নতুন ঠান্ডাযুদ্ধ শুরু হতে পারে; যার একপক্ষে থাকবে রাশিয়া, চীন ও ইরান; অপরপক্ষে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, ইস্রাইল এবং আরও কিছু দেশ।
সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবি ‘দ্যা গার্ডিয়ান’কে বলছেন যে, বাইডেন মধ্যপ্রাচ্যে অনেক ব্যাপার নিয়ে কথা বললেও তিনি মূলতঃ বিন সালমানের সাথে দেখা করতেই এসেছিলেন। তেল নিয়ে কথা বলা ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে চীন এবং রাশিয়ার প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন তিনি। বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোন কিছু করতে গেলে সৌদি আরবকে বাদ দিয়ে এগুনো যাবে না। বাইডেনের সফর বিন সালমানের জন্যে একটা বড় বিজয় ছিল।
বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য সফরের আগেই একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার উপর অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে যে শূণ্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সহায়তায় যতটা সম্ভব পূরণের চেষ্টা করা। তবে সৌদিরা ব্যাপারটাকে মার্কিনীদের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। ‘সিবিএস’এর সাথে এক সাক্ষাতে সৌদি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আদেল বিন আহমেদ আল জুবাইর বলছেন যে, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়ানোটাই সমাধান নয়; কারণ যুক্তরাষ্ট্রের এই মুহুর্তে অতিরিক্ত তেল পরিশোধন করার সক্ষমতা নেই। ‘সিবিএস’ বলছে যে, বাইডেন মধ্যপ্রাচ্য সফরে ইস্রাইলি বিমানের জন্যে সৌদি আকাশসীমা খুলে দেয়া, ফিলিস্তিনে ফোর-জি প্রযুক্তি চালু, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন, পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, লোহিত সাগরে একটা দ্বীপের উন্নয়ন, ইত্যাদি বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছেন। এই বিষয়গুলি মধ্যপ্রাচ্যের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা মার্কিন জনগণের জীবনে কোন প্রভাব ফেলবে না। মানবাধিকার এবং জ্বালানির মূল্যের ব্যাপারেই মার্কিনীর বেশি আগ্রহী।
‘আল জাজিরা’ বলছে যে, মধ্যপ্রাচ্য সফরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে সাক্ষাতের পর বাইডেনকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে বেশ খানিকটাই সমস্যা সামলাতে হচ্ছে। বিন সালমানের সাথে বাইডেনের সাক্ষাৎকে কেউই সহজভাবে নিতে পারেনি। এখন উল্টো সৌদি যুবরাজই বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রই তার আদর্শিক অবস্থানকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি ইরাকে মার্কিন সামরিক হামলা, আবু ঘরাইব জেলখানায় মার্কিনীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অতি সম্প্রতি ইস্রাইলে মার্কিন সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহর হত্যার পর মার্কিন প্রশাসনের চুপচাপ থাকার কথা মনে করিয়ে দেন। মধ্যপ্রাচ্য সফরের আগেই বাইডেন নিজ দেশে যথেষ্ট সমালোচনার মুখে ছিলেন এবং মধ্যপ্রাচ্য সফর করার পরেও তার অবস্থান খুব একটা সংহত হয়নি। কাজেই এই মুহুর্তে এটা চিন্তা করা কঠিন যে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই বাইডেনের জনসমর্থন হঠাত করেই বেড়ে যাবে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে থাকার সময় তার যথেষ্ট কম জনসমর্থন ছিল; আর এই মুহুর্তে বাইডেনের জনসমর্থনও প্রায় একই রকম; প্রায় ৩০ শতাংশের আশেপাশে; যা যথেষ্ট আশংকাজনক। মধ্যপ্রাচ্যে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কোন বিজয় না পেয়েই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়েছেন; যেখানে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও খাদ্যমূল্যের চরম বৃদ্ধির কারণে জনগণ প্রেসিডেন্টের উপর ক্ষেপে রয়েছে।
ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, বাইডেন ক্ষমতায় আসার সময় বলেছিলেন যে, তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পছন্দের একনায়কদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেবেন। তিনি নির্বাচনী প্রচারণার সময়েই সৌদি যুবরাজের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেবেন বলে বলেছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর তিনি বিন সালমানের সাথে কথা বলা থেকে বিরত থেকেছেন। এমনকি খাশোগি হত্যাকান্ডে বিন সালমানের জড়িত থাকার ব্যাপারে মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টও তিনি সনসমক্ষে আনার ব্যবস্থা করেছেন। এখন বিন সালমানই বাইডেনকে মার্কিন দ্বিমুখী নীতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তদুপরি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা বাইডেনকে বিন সালমানের কাছে টেনে এনেছে। মার্চ মাসে অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১’শ ৩৯ ডলারে পৌঁছে; আর যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ দশমিক ১ শতাংশ; যার ফলশ্রুতিতে ডেমোক্র্যাটরা নভেম্বরের নির্বাচনে আসন হারাবে। অথচ বাইডেন তেল উৎপাদন বৃদ্ধির কোন বড় ঘোষণা ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ করেছেন; যদিও আসন্ন ওপেক বৈঠকে বাইডেনের জন্যে ভালো খবর থাকতে পারে। বাইডেন যা কিছুই বলেন না কেন, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ করছে।
জুলাইয়ের প্রথমভাগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য সফরের কেন্দ্রে ছিল সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে বৈঠক। মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ‘সিবিএস’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বাইডেন সৌদি যুবরাজের সাথে দেখা করার জন্যে রাজি ছিলেন না মোটেই। বিশেষ করে যেখানে মার্কিন ইন্টেলিজেন্স প্রতিবেদনই বলেছে যে, ২০১৮ সালে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার সিদ্ধান্ত খুব সম্ভবতঃ বিন সালমানই দিয়েছিলেন। এখন তুমুল সমালোচনার মুখে বাইডেনকে বিন সালমানের সাথে বৈঠকের যুক্তিযুক্ততা তুলে ধরতে হচ্ছে। বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য সফরে তেলের বাজারে অস্থিরতা কমাতে সৌদি আরবকে তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে রাজি করানো, ইস্রাইলের সাথে আরব দেশগুলির সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়াও ইস্রাইলের জন্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা বৃদ্ধি করা; এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ধরে রাখার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশগুলিকে আস্বস্ত করার ব্যাপারগুলি বিশ্লেষকেরা আলোচনা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ইস্যুগুলিকে সকলেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন।
জো বাইডেন জেদ্দায় ‘জিসিসি’র শীর্ষ বৈঠকে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাবে না; এবং রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো দেশের কাছে শূন্যস্থান পূরণের সুযোগও তারা দেবে না। ‘আল জাজিরা’র জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ত্যাগের পর এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের চীন ও রাশিয়া কেন্দ্রিক বক্তব্যের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্রগুলির মাঝে যথেষ্ট দুশ্চিন্তার সৃষ্টি হয়েছে। একারণেই বাইডেনকে নতুন করে আশ্বাস দিতে হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব কমে যায়নি; বরং আফগানিস্তান থেকে সরে আসার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বেশকিছু সম্পদ এখন মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা সম্ভব হবে। বিশারা বলছেন যে, বাইডেন বেশ পরিষ্কার করেই বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে থাকবে তাদের জাতীয় স্বার্থের জন্যে। এর জন্যে দরকার হলে মানবাধিকারের মতো আদর্শিক ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র ছাড় দেবে; সেটা সৌদি আরব, মিশর বা ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। তবে বিশারা আশংকা করছেন যে, মার্কিন জাতীয় স্বার্থের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে একটা নতুন ঠান্ডাযুদ্ধ শুরু হতে পারে; যার একপক্ষে থাকবে রাশিয়া, চীন ও ইরান; অপরপক্ষে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, ইস্রাইল এবং আরও কিছু দেশ।
সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবি ‘দ্যা গার্ডিয়ান’কে বলছেন যে, বাইডেন মধ্যপ্রাচ্যে অনেক ব্যাপার নিয়ে কথা বললেও তিনি মূলতঃ বিন সালমানের সাথে দেখা করতেই এসেছিলেন। তেল নিয়ে কথা বলা ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে চীন এবং রাশিয়ার প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন তিনি। বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোন কিছু করতে গেলে সৌদি আরবকে বাদ দিয়ে এগুনো যাবে না। বাইডেনের সফর বিন সালমানের জন্যে একটা বড় বিজয় ছিল।
বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য সফরের আগেই একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার উপর অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে যে শূণ্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সহায়তায় যতটা সম্ভব পূরণের চেষ্টা করা। তবে সৌদিরা ব্যাপারটাকে মার্কিনীদের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। ‘সিবিএস’এর সাথে এক সাক্ষাতে সৌদি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আদেল বিন আহমেদ আল জুবাইর বলছেন যে, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়ানোটাই সমাধান নয়; কারণ যুক্তরাষ্ট্রের এই মুহুর্তে অতিরিক্ত তেল পরিশোধন করার সক্ষমতা নেই। ‘সিবিএস’ বলছে যে, বাইডেন মধ্যপ্রাচ্য সফরে ইস্রাইলি বিমানের জন্যে সৌদি আকাশসীমা খুলে দেয়া, ফিলিস্তিনে ফোর-জি প্রযুক্তি চালু, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন, পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, লোহিত সাগরে একটা দ্বীপের উন্নয়ন, ইত্যাদি বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছেন। এই বিষয়গুলি মধ্যপ্রাচ্যের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা মার্কিন জনগণের জীবনে কোন প্রভাব ফেলবে না। মানবাধিকার এবং জ্বালানির মূল্যের ব্যাপারেই মার্কিনীর বেশি আগ্রহী।
‘আল জাজিরা’ বলছে যে, মধ্যপ্রাচ্য সফরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে সাক্ষাতের পর বাইডেনকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে বেশ খানিকটাই সমস্যা সামলাতে হচ্ছে। বিন সালমানের সাথে বাইডেনের সাক্ষাৎকে কেউই সহজভাবে নিতে পারেনি। এখন উল্টো সৌদি যুবরাজই বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রই তার আদর্শিক অবস্থানকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি ইরাকে মার্কিন সামরিক হামলা, আবু ঘরাইব জেলখানায় মার্কিনীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অতি সম্প্রতি ইস্রাইলে মার্কিন সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহর হত্যার পর মার্কিন প্রশাসনের চুপচাপ থাকার কথা মনে করিয়ে দেন। মধ্যপ্রাচ্য সফরের আগেই বাইডেন নিজ দেশে যথেষ্ট সমালোচনার মুখে ছিলেন এবং মধ্যপ্রাচ্য সফর করার পরেও তার অবস্থান খুব একটা সংহত হয়নি। কাজেই এই মুহুর্তে এটা চিন্তা করা কঠিন যে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই বাইডেনের জনসমর্থন হঠাত করেই বেড়ে যাবে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে থাকার সময় তার যথেষ্ট কম জনসমর্থন ছিল; আর এই মুহুর্তে বাইডেনের জনসমর্থনও প্রায় একই রকম; প্রায় ৩০ শতাংশের আশেপাশে; যা যথেষ্ট আশংকাজনক। মধ্যপ্রাচ্যে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কোন বিজয় না পেয়েই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়েছেন; যেখানে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও খাদ্যমূল্যের চরম বৃদ্ধির কারণে জনগণ প্রেসিডেন্টের উপর ক্ষেপে রয়েছে।
ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, বাইডেন ক্ষমতায় আসার সময় বলেছিলেন যে, তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পছন্দের একনায়কদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেবেন। তিনি নির্বাচনী প্রচারণার সময়েই সৌদি যুবরাজের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেবেন বলে বলেছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর তিনি বিন সালমানের সাথে কথা বলা থেকে বিরত থেকেছেন। এমনকি খাশোগি হত্যাকান্ডে বিন সালমানের জড়িত থাকার ব্যাপারে মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টও তিনি সনসমক্ষে আনার ব্যবস্থা করেছেন। এখন বিন সালমানই বাইডেনকে মার্কিন দ্বিমুখী নীতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তদুপরি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা বাইডেনকে বিন সালমানের কাছে টেনে এনেছে। মার্চ মাসে অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১’শ ৩৯ ডলারে পৌঁছে; আর যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ দশমিক ১ শতাংশ; যার ফলশ্রুতিতে ডেমোক্র্যাটরা নভেম্বরের নির্বাচনে আসন হারাবে। অথচ বাইডেন তেল উৎপাদন বৃদ্ধির কোন বড় ঘোষণা ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ করেছেন; যদিও আসন্ন ওপেক বৈঠকে বাইডেনের জন্যে ভালো খবর থাকতে পারে। বাইডেন যা কিছুই বলেন না কেন, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ করছে।
Labels:
China,
Geopolitics,
Iran,
Israel,
Joe Biden,
MBS,
Middle East,
New World Order,
oil price,
Russia,
Saudi Arabia,
USA
Subscribe to:
Posts (Atom)










