Thursday, 16 December 2021

ভারত কি ৫০ বছর আগে এই বাংলাদেশই চেয়েছিল?

১৬ই ডিসেম্বর ২০২১

১৬ই ডিসেম্বর ২০২১। বাংলাদেশের বিজয় দিবস প্যারেডে অংশ নিচ্ছে ভারতীয় সামরিক কনটিনজেন্ট। বাংলাদেশকে স্বাধীনতা পেতে সহায়তা দেবার ৫০ বছর পর ভারত দেখতে পাচ্ছে যে, আঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে; যা নিঃসন্দেহে ভারতের প্রভাবকে প্রতিস্থাপন করছে। নিজের প্রভাব ধরে রাখতে দিল্লীকে হিসেব করতে হচ্ছে যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার ব্যাপারে বাস্তবতা মেনে নিয়ে তারা বাংলাদেশকে আলিঙ্গন করবে, নাকি শত্রুতা সৃষ্টি করে নিজেদের দুর্বল ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করবে? এই উভয় সংকটই বলে দিচ্ছে যে, ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতিতে সামনের দিনগুলিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

 
১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবসের ৫০তম বার্ষিকীতে অতিথি হয়ে আসেন ভারতের প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ। এর আগে একই বছরের মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীতে এসেছিলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশের সামরিক কনটিনজেন্ট ভারতের সামরিক প্যারেডে অংশ নিয়েছে। আর ভারতের সামরিক কনটিনজেন্ট বাংলাদেশের বিজয় দিবস প্যারেডে অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের কর্মকর্তারা বারংবার বলছেন যে, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তথাপি দুই দেশের মাঝে ইস্যুগুলিকে নিয়ে আলোচনা করলে সম্পর্কের গভীরতার ক্ষেত্রে ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। অর্থশতক আগে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের সময় ভারত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। ভারত চেয়েছিল পাকিস্তানকে দুই ভাগ করে দুর্বল করতে এবং এর একাংশকে নিজের প্রভাবে নিয়ে আসতে। ৫০ বছর আগে ভারত যে লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়েছিল, সেই লক্ষ্য কি বাস্তবায়ন হয়েছে? ভারত কি আজ বাংলাদেশে তার স্বার্থগুলিকে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হচ্ছে? বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে ভারতের বিবৃতির জবাবে বাংলাদেশ থেকে যখন বলা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ তার নাগরিকদের মাঝে কাউকে সংখ্যালঘু হিসেবে দেখে না, তখন দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, এই পার্থক্য দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে কতটা প্রভাব রাখবে?

সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতি যখন দুই দেশের মাঝে দেয়াল গড়ছে

বাংলাদেশে বাঙালি হিন্দুদের অনুষ্ঠান দূর্গাপুজার পুজামন্ডপে হামলার পরদিন ১৪ই অক্টোবর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি সাংবাদিকদের বলেন যে, তারা বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হামলার খবর পেয়েছেন, যা তাদেরকে দুশ্চিন্তা দিয়েছে। একই দিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিন্দুদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও প্রতিনিধিদের সাথে পুজার শুভেচ্ছা জানানোর অনুষ্ঠানে বলেন যে, ভারতকে সাবধান থাকতে হবে যে, সেখানেও যাতে এমন কোনকিছু যেন না করা হয়, যা বাংলাদেশের উপরেও প্রভাব ফেলে এবং বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আঘাত আসে। ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ বলছে যে, শেখ হাসিনা এমন সময়ে কথাগুলি বলেছেন, যখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ্য বাংলাদেশে এমন একটা ধারণা জন্মেছে যে, ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতা নেবার পর থেকে ভারতের মুসলিমদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের নতুন নাগরিকত্ব আইন, যার মাধ্যমে আসামে অগুণিত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমকে বেআইনী বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে এবং ‘আর্টিকেল ৩৭০’ পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিশেষ স্ট্যাটাস বাতিল করে সেখানে অন্য অঞ্চলের হিন্দুদের বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা বাংলাদেশে মুসলিম বিরোধী কর্মকান্ড বলে পরিচিতি পেয়েছে।

২০২০এর অগাস্টে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবু ধাবিতে মধ্যপ্রাচ্যের ‘গালফ নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন যে, তিনি বুঝতে পারছেন না যে, ভারত কেন তাদের দেশে নাগরিকত্ব আইনের সূচনা করেছে। কারণ এটার কোন প্রয়োজন ছিল না। তিনি আরও বলেন যে, এই আইনের কারণে ভারতের জনগণ অনেক সমস্যায় পতিত হয়েছে। ভারতের ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ পত্রিকা বলছে যে, ভারতের নাগরিকত্ব আইন বাংলাদেশে যথেষ্ট অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। ভারতের পার্লামেন্টে এই আইন পাসের পর থেকে তিনজন বাংলাদেশী মন্ত্রী তাদের ভারত সফর বাতিল করেছেন বলে পত্রিকাটা। প্রতিবেদনে পরিষ্কার করে বলা হয় যে, এই নাগরিকত্ব আইনের লক্ষ্য হলো ডিসেম্বর ২০১৪এর আগে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে অত্যাচারিত হয়ে বিতাড়িত হওয়া হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদেরকে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়া। এই আইনে বাংলাদেশের নাম রাখার কারণে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বিরক্তি প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতৃবৃন্দের বারংবার আসাম রাজ্যে নাগরিকত্ব আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সকল ‘বেআইনী অভিবাসী’কে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার কথা বলায় ২০১৯ সাল থেকে দুই দেশের মাঝে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। পত্রিকাটা আরও বলে যে, নাগরিকত্ব আইনের ব্যাপারটা শেখ হাসিনা প্রথমবার সেবছরের সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে এবং দ্বিতীয়বার অক্টোবরে নতুন দিল্লীতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামনে নিয়ে আসেন।

 
ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আসছে ভারতীয় পিঁয়াজ। ২০২০এর সেপ্টেম্বরে ভারত বাংলাদেশে পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পুনরায় শুরু করতে অনুরোধ জানানো হয়। ভারতের এহেন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে পিঁয়াজের মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে যায় এবং সরকারকে বহু দেশ থেকে পিঁয়াজ আমদানি করে ভর্তুকি দিয়ে বাজারে বিক্রি করতে হয়। ভারতে বিজেপির মতো একটা উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের অবির্ভাব এমন সময়ে ঘটেছে, যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সামনে অনেকগুলি অপশন হাজির হয়েছে; যা কিনা গত পাঁচ দশকে কখনোই আসেনি। সম্পর্কোন্নয়নের পাতলা চাদরের নিচে ঢাকা পড়ে রয়েছে গভীর সন্দেহ।

ভ্যাকসিন, পিঁয়াজ, পানি, সীমান্ত হত্যা… সমস্যা বিস্তর; কিন্তু সমাধান নেই

২০২১এর ফেব্রুয়ারিতে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে আরেক টানাপোড়েন শুরু হয় দুই দেশের মাঝে। ভারতের ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘সেরাম ইন্সটিটিউট’এর প্রধান নির্বাহী আদার পুনাওয়ালা বলেন যে, ভারতের সকলে ভ্যাকসিন পাবার পরেই অন্যদের কাছে ভ্যাকসিন বিক্রি করা হবে। ‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই বক্তব্য বাংলাদেশে অস্থিরতার জন্ম দেয়; কারণ এর আগের বছরেই বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে অক্সফোর্ড এবং ‘এসট্রাজেনেকা’র ডেভেলপ করা ৩ কোটি ভ্যাকসিন কেনার জন্যে চুক্তি করে। অনেকেই সেসময় ভারতকে অনির্ভরযোগ্য প্রতিবেশী বলে আখ্যা দিতে থাকে। পরবর্তীতে পুনাওয়ালা বাংলাদেশে ভ্যাকসিন রপ্তানি ব্যাহত হবে বলে ঘোষণা দিলেও ব্যাপারটা দুই দেশের সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জের মাঝে ফেলে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এটাই ভারতের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রথম উদাহরণ নয়। ২০২০এর সেপ্টেম্বরে ভারত বাংলাদেশে পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পুনরায় শুরু করতে অনুরোধ জানানো হয়। ভারতের এহেন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে পিঁয়াজের মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে যায় এবং সরকারকে বহু দেশ থেকে পিঁয়াজ আমদানি করে ভর্তুকি দিয়ে বাজারে বিক্রি করতে হয়। ২০২০এর ডিসেম্বরে দুই দেশের মাঝে ভার্চুয়াল বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং পরিবহণ করিডোর নিয়ে কথা হয়; কিন্তু তিস্তা নদীর পানি বন্টনের ব্যাপারটাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’এর সিনিয়র ফেলো জয়ীতা ভট্টাচার্য বলছেন যে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পানি বন্টনের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। তিস্তার পানির ব্যাপারে এই রাজ্য তাদের অবস্থান না পাল্টালে বাংলাদেশের সাথে পানি বন্টন করা কঠিন।

‘ডয়েচে ভেলে’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ভারত যখন বাংলাদেশের সাথে তিস্তা সমস্যা সমাধান করতে পারছে না, তখন একই নদীতে ১ বিলিয়ন ডলারের সেচের প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে চীন। পানি সমস্যা ছাড়াও দুই দেশের সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের গুলি করে মানুষ হত্যা করার ব্যাপারটাও বাংলাদেশের জনগণের কাছে অসহনীয় একটা ব্যাপার হিসেবে ঠেকছে। একই সময়ে চীন বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য বা ৮ হাজার ২’শ পণ্যের জন্যে চীনের বাজারে শুল্কমুক্তভাবে ঢোকার অনুমতি দিয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের অনেকগুলি অবকাঠামো প্রকল্পে চীনারা বিনিয়োগ করেছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা উইলসন সেন্টার’এর বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলছেন যে, নাগরিকত্ব আইনের কারণে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে চীনারা বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের জন্যে সুবিধা করে দিয়ে ঢাকার আরও কাছাকাছি যেতে চাইছে। পাকিস্তানও চাইছে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে। ২০২০এর জুলাই মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান শেখ হাসিনাকে ফোন করেন। ঘটনাটা ভারতকে বড় কোন দুশ্চিন্তায় না ফেললেও ভারতীয় মিডিয়াতে এর ফলাও করে প্রচার বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্ভাব্য সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে ভারতীয়তের অস্বস্তিকেই দেখিয়ে দেয়।

 
বাংলাদেশের সামরিক শক্তির উন্নয়নের ব্যাপারে ভারতীয়রা সর্বদাই সন্দেহ প্রকাশ করেছে; যদিও বাংলাদেশের সামরিক শক্তি ভারতের সামরিক শক্তির সাথে তুলনা করার পর্যায়ে নেই। ভারতে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন যে, কেন বাংলাদেশের সাবমেরিন দরকার। ভারতে অনেকেই মনে করেছেন যে, বাংলাদেশের কাছে সাবমেরিন বিক্রির মাধ্যমে চীন ভারতকে কৌশলগতভাবে ঘিরে ফেলছে।

বাংলাদেশের অস্ত্র ক্রয়ে ভারত খুশি হতে পারে না কেন?

বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক যতই মধুর বলা হোক না কেন, বাংলাদেশের সামরিক শক্তির উন্নয়নের ব্যাপারে ভারতীয়রা সর্বদাই সন্দেহ প্রকাশ করেছে; যদিও বাংলাদেশের সামরিক শক্তি ভারতের সামরিক শক্তির সাথে তুলনা করার পর্যায়ে নেই। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চীন থেকে ২টা সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনার ঘোষণা দেয়ার পর ভারতীয় চিন্তাবিদদের প্রতিক্রিয়া ছিল উল্লেখ করার মতো। ভারতের ‘ডব্লিউআইওএন’ টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বাংলাদেশের কাছে সাবমেরিন বিক্রির মাধ্যমে চীন ভারতকে কৌশলগতভাবে ঘিরে ফেলছে; কারণ একইসাথে ভারতের পূর্বে পাকিস্তানে চীনের শক্ত অবস্থান রয়েছে। সেখানে বলা হয় যে, চীনারা এমন এক অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে, যেটা ভারত নিজের প্রভাবের অন্তর্গত বলে মনে করে। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষক জয়দেব রানাদে বলছেন যে, সাবমেরিন হলো এমন একটা যুদ্ধাস্ত্র, যার মূল ব্যবহার হলো চুপিসারে হত্যা করা। এটা সাধারণতঃ জলদস্যু পাকরাও করতে বা উপকূল টহলে ব্যবহৃত হয় না। তিনি বলেন যে, ভারত সরকার এটাকে বিপদ হিসেবে না দেখলেও এটা একটা চিন্তার কারণ হবে অবশ্যই। কারণ বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনার সাথেসাথে বঙ্গোপসাগরের নৌশক্তির ব্যালান্স পাল্টে গেছে; যদিও সাবমেরিনগুলি পুরোনো। তবে রানাদে মনে করেন না যে, যতক্ষণ ঢাকার সরকার ভারতের বন্ধু, ততক্ষণ ভারতের কোন দুশ্চিন্তার কারণ রয়েছে।

ভারতে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন যে, কেন বাংলাদেশের সাবমেরিন দরকার; যখন দেশটার সাথে ভারত এবং মিয়ানমার কোন দেশেরই সমুদ্রসীমার বিরোধ নেই। ভারতীয় মিডিয়া ‘ক্যাচ নিউজ’এর সাথে সাক্ষাতে বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন যে, বাংলাদেশ বিভিন্ন ছুতোতে সাবমেরিন কিনতে চাইতে পারে; আর চীনও কম দামে বিক্রয় করার সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। তার ধারণা ২০১৩ সাল থেকে যখন বাংলাদেশ সরকার সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা শুরু করে, তখন থেকেই ভারতীয় কর্মকর্তারা হয়তো বাংলাদেশের কাছে জানতে চেয়েছেন যে, তারা কেন সাবমেরিন কিনতে চাইছেন। তার ধারণা যদিও বাংলাদেশের হাতে সাবমেরিন ভারতের ইন্টেলিজেন্সের জন্যে একটা আলাদা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে, তথাপি তিনি মনে করেন না যে, এটা ভারতের জন্যে হুমকি। তবে তিনি বলছেন যে, বাংলাদেশে চীনের প্রভাব কমাতে অর্থনৈতিকভাবে চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় ভারত পারবে না। আর যেহেতু বহুকাল যাবত বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে ভারতকে শত্রু হিসেবে দেখা হয়েছে, তাই সামরিক দিক থেকেও ভারতের পক্ষে বাংলাদেশে চীনকে প্রতিস্থাপন করা কঠিন।

ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল ভারতের ‘সংসদ টিভি’র সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনাটা ভারতের জন্যে নতুন এক চ্যালেঞ্জের শুরু। বাংলাদেশ যদি রাশিয়া থেকে সাবমেরিন ক্রয় করতো, তাহলে তা ভারতের জন্যে চিন্তার কারণ হতো না। তবে তিনি মনে করেন না যে, সাবমেরিনগুলি বাংলাদেশের কোন কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবে। তিনি মনে করেন না যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভারতের সাথে মিল থাকবেই; তবে চিন্তার ব্যাপার হলো, যেখানে ভারতের সাথে চীনের সম্পর্ক ভালো নয়, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার একটা দেশ চীনের স্বার্থের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছে। এতে বাংলাদেশ এবং ভারতের মাঝে আন্তর্জাতিক ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য লক্ষ্যণীয়। বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত বিনা সিক্রি বলেন যে, বাংলাদেশ এবং ভারতের জনগণের মাঝে সম্পর্ক এতটাই গভীর যে, তা চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তিনি মনে করছেন যে, ভারতের উচিৎ বাংলাদেশকে সরাসরিই বলা যে, বাংলাদেশের স্বার্থ হওয়া উচিৎ ভারতের পাশে থাকা; অন্য কোন দেশকে এখানে যুক্ত করে নতুন করে সমীকরণ তৈরি না করা। ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজ’এর ডিরেক্টর প্রাক্তন নৌবাহিনী কমোডোর উদয় ভাস্কর বলেন যে, যে মুহুর্তে কাছাকাছি কোন সাবমেরিন থাকবে, সেই মুহুর্ত থেকে একটা নৌবাহিনীর কাজ হয় সেই সাবমেরিনের উপর তথ্য যোগাড় করা। সেই সাবমেরিন একটা বন্ধু বা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের হোক না কেন, সেটার উপর নজরদারি করাটা একটা দায়িত্ব।

 
মার্চ ২০২১। করোনা মহামারিতে মালদ্বীপকে সহায়তা দেয়ার জন্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল দল মালদ্বীপে। ভারতের কাছে না পেয়ে শ্রীলংকা বাংলাদেশের কাছ থেকে দুই’শ মিলিয়ন ডলারের মুদ্রা ঋণ পেয়েছে। এই কর্মকান্ডগুলি বাংলাদেশের জনগণের ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষারই প্রতিফলন।

ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের আভাস


ভারতে বিজেপির মতো একটা উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের অবির্ভাব এমন সময়ে ঘটেছে, যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সামনে অনেকগুলি অপশন হাজির হয়েছে; যা কিনা গত পাঁচ দশকে কখনোই আসেনি। সম্পর্কোন্নয়নের পাতলা চাদরের নিচে ঢাকা পড়ে রয়েছে গভীর সন্দেহ। ভারতের কাছে না পেয়ে শ্রীলংকা বাংলাদেশের কাছ থেকে দুই’শ মিলিয়ন ডলারের মুদ্রা ঋণ পেয়েছে। আবার মালদ্বীপকে করোনা সহায়তা প্রদান করেছে বাংলাদেশ। এই কর্মকান্ডগুলি বাংলাদেশের জনগণের ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষারই প্রতিফলন। হিমালয়ের পাদদেশে লাদাখে চীনের সাথে সামরিক উত্তেজনার মাঝে বাংলাদেশের অবস্থান দেখে অবাক হয়েছে ভারত। বাংলাদেশ সেসময় শুধু ভারতের পাশে দাঁড়ানো থেকে বিরতই থাকেনি; চীনের সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে সম্পর্কোন্নয়নও করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশের অবস্থান নেপালকেও সুযোগ দিয়েছে ভারতের সাথে কালাপানি সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্বে শক্ত অবস্থান নিতে। শুধু তাই নয়, পুরো ব্যাপারটাই ঘটেছে এমনভাবে, যাতে বাংলাদেশকে দোষারোপ করার কোন পদ্ধতিই ভারতের কাছে ছিল না। কারণ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশের পক্ষে থাকার কথা বলে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করেছে। এমনকি বাংলাদেশের সাবমেরিনকে ব্যালান্স করতে মিয়ানমারকে রুশ নির্মিত একটা পুরোনো সাবমেরিনও দিয়েছে। আবার মিয়ানমার নৌবাহিনীর জাহাজগুলির জন্যে সমুদ্রের গভীরে বাংলাদেশের সাবমেরিন খুঁজে পাবার সুবিধার্থে ভারতে নির্মিত সোনার যন্ত্রও বিক্রি করেছে। ভারত চেয়েছিল মিয়ানমারে তার প্রভাব বৃদ্ধির মাধ্যমে শুধু চীনকেই নয়, বাংলাদেশকেও ব্যালান্স করতে। তবে যে ব্যাপারটা এখন পরিষ্কার তা হলো, ভারতের পক্ষে এখন বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশকে স্বাধীনতা পেতে সহায়তা দেবার ৫০ বছর পর ভারত দেখতে পাচ্ছে যে, আঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে; যা নিঃসন্দেহে ভারতের প্রভাবকে প্রতিস্থাপন করছে। এখানে পাকিস্তানের ভূমিকা হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তানের প্রভাব কমাতে গিয়েই ভারত বাংলাদেশের প্রভাবকে মেনে নিতে বাধ্য হবে। এমতাবস্থায় নিজের প্রভাব ধরে রাখতে দিল্লীকে হিসেব করতে হচ্ছে যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার ব্যাপারে বাস্তবতা মেনে নিয়ে তারা বাংলাদেশকে আলিঙ্গন করবে, নাকি শত্রুতা সৃষ্টি করে নিজেদের দুর্বল ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করবে? এই উভয় সংকটই বলে দিচ্ছে যে, ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতিতে সামনের দিনগুলিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

Wednesday, 15 December 2021

আমিরাত ‘এফ ৩৫’ যুদ্ধবিমান ত্যাগ করতে রাজি; তবে চীনকে নয়

১৫ই ডিসেম্বর ২০২১

আমরাত মার্কিন ‘এফ ৩৫’ বিমান তারা ত্যাগ করতে রাজি থাকলেও চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে তারা ত্যাগ করতে রাজি নয়। মার্কিন কর্মকর্তারা যখন তাদের বন্ধু দেশগুলির উপর চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিতে চাপ দিচ্ছেন, তখন আমিরাতের অবস্থান দেখিয়ে দেয় যে, কেউই তাদের ডিমগুলি আজ এক ঝুড়িতে রাখতে রাজি নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ঝুড়িটা এখন আগের মতো নিরাপদ নয়।

 
১৪ই ডিসেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দেয় যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ২৩ বিলিয়ন ডলারের একটা সামরিক ক্রয় যুক্তি বাতিল করতে যাচ্ছে; যার মাঝে ছিল ‘এফ ৩৫’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান। একজন আমিরাতি কর্মকর্তা ‘সিএনএন’কে জানান যে, ‘প্রাযুক্তিক প্রয়োজন’, ‘সার্বভৌম অপারেশনাল সীমাবদ্ধতা’ এবং ‘লাভ খরচার বিশ্লেষণ’এর পর এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন যে, ক্রয় চুক্তি বাস্তবায়নে একে অপরের প্রতিরক্ষার নিরাপত্তাজনিত অবস্থানগুলির ব্যাপারে একটা সমঝোতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল আমিরাত এবং যুক্তরাষ্ট্র। তবে উন্নততর প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনও আমিরাতের পছন্দের সরবরাহকারী এবং ভবিষ্যতে হয়তো ‘এফ ৩৫’এর ব্যাপারে আলোচনা পুনরায় শুরু করা যেতে পারে। একইদিনে পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কার্বি সাংবাদিকদের বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং আমিরাতের সম্পর্ক কৌশলগত এবং একটা সামরিক চুক্তির চাইতে অনেক বেশি জটিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অনেক ধরনের শর্ত বাস্তবায়নে চাপ দেবেই। এটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। এই শর্তগুলি শুধু আমিরাতের জন্যে নয়, বরং সকল দেশের জন্যেই প্রযোজ্য; কারণ এগুলি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তিকে রক্ষা করার জন্যেই প্রয়োগ করা হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এগুলি আলোচনার উর্ধ্বে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের নতুন ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’র মাঝে পড়তে চায়না আমিরাত

‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২০ সালের অগাস্টে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সমঝোতার মূল স্তম্ভই ছিল আমিরাতের কাছে ‘এফ ৩৫’ যুদ্ধবিমান বিক্রয়। এটা ছিল আরব দেশগুলির কাছে বিক্রয়কৃত অস্ত্রের মাঝে সবচাইতে উন্নত প্রযুক্তি। তখন থেকেই মার্কিন রাজনীতিবিদদের অনেকেই এই চুক্তির ব্যাপারে নিজেদের সংশয় প্রকাশ করতে শুরু করেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও আমিরাতের কাছে ‘এফ ৩৫’ যুদ্ধবিমান, ‘এমকিউ ৯বি’ ড্রোন এবং গোলাবারুদ বিক্রয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন যাবতই চীনা টেলিকম কোম্পানি ‘হুয়াই’কে আমিরাতের টেলিকম নেটওয়ার্ক থেকে বাদ দেয়ার ব্যাপারে আমিরাতের উপর চাপ দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, চীনা প্রযুক্তি মার্কিন অস্ত্র ব্যবস্থাগুলির জন্যে হুমকি। আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন উপসহকারি পররাষ্ট্র সচিব মিরা রেজনিক ‘সিএনএন’কে বলছেন যে, ‘এফ ৩৫’ যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধুদের সামরিক প্রযুক্তির মাঝে মুকুটের মণির মতো; এটাকে তারা রক্ষা করবেনই। তবে আমিরাতের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সংশয়ের ব্যাপারে সন্দিহান। আমিরাতের নেতৃত্বের উপদেষ্টা আনওয়ার গারগাশ বলছেন যে, তাদের কাছে সংশয় হলো আরেকটা ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’এর মাঝে আটকে যাওয়া; যেখানে চীন হলো আমিরাতের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সহযোগী, আর যুক্তরাষ্ট্র হলো কৌশলগত সহযোগী। তিনি বলছেন যে, একটা ছোট দেশ হিসেবে তারা বড় দুই দেশের প্রতিযোগিতার কারণে সমস্যায় পড়বেন; কিন্তু তারা এই প্রতিযোগিতাকে কমাতে তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারবেন না।

 
ইস্রাইলি প্রধানমন্ত্রী সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের সময় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাথে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাবার ব্যাপারে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি যেমন চিন্তার মাঝে পড়েছিল, সেটা আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চলে যাবার সাথেসাথে। একারণেই আমিরাত চাইছে ইরান এবং তুরস্কের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা কমাতে এবং ইস্রাইলের কাছাকাছি যেতে।

নভেম্বর মাসে ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, আবু ধাবির ৮০ কিঃমিঃ দূরে ‘খলিফা পোর্ট’এ চীনারা একটা বহুতল ভবন নির্মাণের জন্যে বড় একটা গর্ত করেছে। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা বলছেন যে, এই কর্মকান্ডের কোন সামরিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। মার্কিনীরা হুমকি দেয় যে, সেখানে কোন চীনা সামরিক উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ককে সমস্যায় ফেলবে। একারণেই মার্কিন কর্মকর্তারা চীনাদের এই কর্মকান্ড বন্ধ করতে আমিরাতের উপর চাপ প্রয়োগ করা শুরু করে। ৯ই ডিসেম্বর আনওয়ার গারগাশ ওয়াশিংটনের ‘এরাব গালফ স্টেটস ইন্সটিটিউট’কে বলেন যে, আমিরাত চীনাদের এই কর্মকান্ড বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। তবে এব্যাপারে আমিরাতের অবস্থান হলো, এটা কোন সামরিক স্থাপনা নয়। তিনি আরও বলেন যে, বাইডেন প্রশাসনের জন্যে তার বন্ধুদের সংশয়ের কথা শোনার পরেও একেবারেই আমলে না নেয়াটা বোকামি। মার্কিন প্রেসিডেণ্ট জো বাইডেন আমিরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাথে সাক্ষাতে আমিরাতে চীনা অবস্থানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সংশয় প্রকাশ করলে বিন জায়েদ বলেন যে, তিনি বাইডেনের কথাগুলি পুরোপুরিভাবেই শুনতে পেয়েছেন। ‘মিডলইস্ট আই’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৬ থেকে ২০২০এর মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের সরবরাহ ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একইসাথে ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’ চিন্তার অংশ হিসেবে চীনারা মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে এবং অনেক অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে অংশ নিচ্ছে।

মার্কিনীদের প্রস্থান এবং আমিরাতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা চিন্তায় পরিবর্তন

বিশ্বব্যাপী সামরিক অবস্থান কমিয়ে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করার অংশ হিসেবে গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয় যে, তারা ইরাক, কুয়েত, জর্দান এবং সৌদি আরব থেকে ৮টা ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা এবং সৌদি আরব থেকে আরেকটা অত্যাধুনিক ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নিচ্ছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব থেকে আরও ৩টা ‘প্যাট্রিয়ট’ ব্যাটারি সরিয়ে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তগুলি মধ্যপ্রাচ্যে তার উপর নির্ভরশীল দেশগুলিকে চিন্তায় ফেলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব কমার সাথেসাথে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশগুলি নতুন বন্ধু খুঁজছে।

‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আমিরাত বর্তমানে পুরোনো বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র, নতুন বন্ধু ইস্রাইল এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের মাঝে ব্যালান্স করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আনওয়ার গারগাশ বলছেন যে, ইস্রাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়াও আমিরাত আঞ্চলিকভাবে বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্যে ইরান, তুরস্ক এবং সিরিয়াকে সাথে চাইছে। যুবরাজ বিন জায়েদের ভাই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ডিসেম্বরের শুরুতেই ইরান সফর করেছেন। নভেম্বরের শেষে যুবরাজ বিন জায়েদ তুরস্ক সফর করে এসেছেন। আর ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও আমিরাত সফর করছেন। ইরান তার বাণিজ্যের একটা বড় অংশ আমিরাতের মাধ্যমে করে থাকে। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ২০১৯ সালে আমিরাত থেকে ইরানে রপ্তানি অনেক কমে গেলেও ৭ বিলিয়ন ডলার ছিল। ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে দুবাইএর অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর গাওদাত বাহগাত ‘ব্রেকিং ডিফেন্স’কে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাবার ব্যাপারে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি যেমন চিন্তার মাঝে পড়েছিল, সেটা আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চলে যাবার সাথেসাথে। একারণেই আমিরাত চাইছে ইরান এবং তুরস্কের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা কমাতে এবং ইস্রাইলের কাছাকাছি যেতে।

 
ফ্রান্স থেকে কেনা কাতারি বিমান বাহিনীর 'রাফাল' যুদ্ধবিমান। আমিরাত তার নির্ভরশীলতাগুলিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে; এক ঝুড়িতে সবগুলি ডিম না রাখার নীতি নিয়ে এগুচ্ছে তারা। ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান কেনার ব্যাপারটা এই কৌশলেরই অংশ। নিশ্চিতভাবেই ফ্রান্সের চাইতে চীনের ব্যাপারে বেশি আপত্তি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

ফ্রান্স থেকে ‘রাফাল’ বিমান ক্রয়… ‘এফ ৩৫’এর প্রতিস্থাপন?

২রা ডিসেম্বর আমিরাৎ ফ্রান্সের কাছ থেকে ৮০টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান ক্রয়ের জন্যে ১৯ বিলিয়ন ডলারের এক চুক্তি করে। আমিরাতি সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ‘ব্রেকিং ডিফেন্স’ বলছে যে, এই চুক্তি পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমিরাত চীনের সাথে ‘ফাইভ জি’ প্রযুক্তির টেলিকম চুক্তি বাতিল করবে না, যখন যুক্তরাষ্ট্র আমিরাতের কাছে ‘এফ ৩৫’ যুদ্ধবিমান বিক্রয় করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ‘রাফাল’ বিমানে মার্কিন অস্ত্র বহণের ব্যবস্থা রাখা এবং বিমানের উন্নয়ন চালিয়ে নিতে পারার ব্যাপারে আমিরাতের শর্ত না মানার কারণে ২০১১ সালে ফ্রান্সের সাথে আমিরাত আলোচনা বাতিল করেছিল। কুয়েতি সামরিক বিশ্লেষক আলি আল হাশিম বলছেন যে, আমিরাত এখন প্রথমে ফ্রান্সের কাছ থেকে যা চেয়েছিল, তা পেয়েছে। তবে এতকাল ফ্রান্সের সাথে আলোচনার পর এতগুলি বিমানের ব্যাপারে চুক্তি হঠাৎ করেই আসেনি বলে বলছেন সামরিক বিশ্লেষক ব্রেনডন প্যাট্রিক। এই ‘রাফাল’গুলি সম্ভবতঃ আমিরাতের ৮০টা মার্কিন নির্মিত ‘এফ ১৬’ বিমান এবং ৫৩টা ফরাসি নির্মিত ‘মিরাজ ২০০০’ বিমানকে প্রতিস্থাপিত করবে। এর ফলে আমিরাতের বিমান বাহিনী মার্কিন নির্মিত বিমানের চাইতে ফরাসি বিমানের উপর বেশি নির্ভরশীল হবে। তবে গাওদাত বাহগাত মনে করছেন না যে, আমিরাত ‘এফ ৩৫’এর চিন্তা একেবারেই বাদ দিয়ে দিয়েছে। তার কথায়, আমিরাত তার নির্ভরশীলতাগুলিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে; এক ঝুড়িতে সবগুলি ডিম না রাখার নীতি নিয়ে এগুচ্ছে তারা। ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান কেনার ব্যাপারটা এই কৌশলেরই অংশ। তিনি বলেন যে, নিশ্চিতভাবেই ফ্রান্সের চাইতে চীনের ব্যাপারে বেশি আপত্তি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। আমিরাতের বার্তা সংস্থা ‘ওয়াম’কে আমিরাতের বিমান বাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল ইব্রাহিম নাসের আল আলাউই বলছেন যে, ফ্রান্সের সাথে চুক্তি ‘এফ ৩৫’এর প্রতিস্থাপন হিসেবে নয়। বরং এটা হলো বিমান বাহিনীতে নতুন সক্ষমতা যুক্ত করা। এই কথাগুলির সাথে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলিরও মিল পাওয়া যায়। মিশর তাদের বিমান বাহিনীর মূল শক্তি মার্কিন বিমানের উপরে নির্ভরশীল হলেও তারা আগে কেনা ২৪টা ‘রাফাল’এর সাথে আরও ৩০টা যোগ করছে। কাতারও ৩৬টা মার্কিন ‘এফ ১৫কিউএ’ বিমানের সাথেসাথে ২৪টা ব্রিটিশ নির্মিত ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ এবং ৩৬টা ফরাসি ‘রাফাল’ও কিনছে।

ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর এসোসিয়েট ফেলো নেইল কুইলিয়াম ‘রয়টার্স’কে বলছেন যে, ইরানের বৈরিতাকে ব্যালান্স করতে আমিরাত সকল চেষ্টাই করবে; তবে এখানে সন্দেহ করার কোন অবকাশ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্রই আমিরাতের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। যে ব্যাপারটাতে সকলেই একমত তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনতে চাওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল দেশগুলির মাঝে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে; যা তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা চিন্তায় পরিবর্তন এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেশগুলির সম্পর্ক এখনও সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের উপর কেউই এখন আগের মতো নির্ভর করতে পারছে না; বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার পর। এই নতুন আঞ্চলিক নীতির অংশ হিসেবেই তারা যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে। এর ফলাফলস্বরূপ, আমিরাতের মতো দেশগুলির উপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব দিনে দিনে কমছে। একারণেই মার্কিন ‘এফ ৩৫’ বিমান তারা ত্যাগ করতে রাজি থাকলেও চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে তারা ত্যাগ করতে রাজি নয়। মার্কিন কর্মকর্তারা যখন তাদের বন্ধু দেশগুলির উপর চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিতে চাপ দিচ্ছেন, তখন আমিরাতের অবস্থান দেখিয়ে দেয় যে, কেউই তাদের ডিমগুলি আজ এক ঝুড়িতে রাখতে রাজি নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ঝুড়িটা এখন আগের মতো নিরাপদ নয়।

Monday, 13 December 2021

বাইডেনের গণতন্ত্র শীর্ষ বৈঠক দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র এখন লাইফ সাপোর্টে রয়েছে

১৩ই ডিসেম্বর ২০২১

প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, নিজ দেশে গণতান্ত্রিক সমস্যার মাঝে বৈশ্বিকভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে ওকালতি করার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে কিনা। পশ্চিমা দেশগুলিতেই যখন গণতন্ত্র মুমুর্ষু, তখন বাকি দুনিয়াতে গণতন্ত্রের তল্পিবাহক হবার মতো সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোন পশ্চিমা রাষ্ট্রের রয়েছে কি? গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার মতো শক্তি বাইডেনের কতটুকু রয়েছে? উত্তরটা যথেষ্টই কঠিন। কারণ গণতন্ত্রকে ‘লাইফ সাপোর্ট’এ রাখা হয়েছে; অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।

 
গত ৯ এবং ১০ই ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমন্ত্রণে ‘সামিট ফর ডেমোক্র্যাসি’ বা ‘গণতন্ত্র শীর্ষ বৈঠক’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। এই অনুষ্ঠানের সাফল্য এবং ব্যর্থতা নিয়ে যেমন ব্যাপক আলোচনা চলছে, তেমনি এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য নিয়েও উত্তপ্ত বাক্য আদান প্রদান হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কথায়, গণতন্ত্র শীর্ষ বৈঠকের লক্ষ্য ছিল এমন একটা প্ল্যাটফর্ম দেয়া, যেখানে নেতৃবৃন্দ নিজেদের একার এবং যৌথ অঙ্গীকার, সংস্কার, এবং নতুন কোনকিছু আরম্ভ করার ঘোষণা দেবে, যেগুলির মূল লক্ষ্য হবে নিজেদের দেশে এবং বিদেশে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারকে রক্ষা করা। এছাড়াও আরও লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে যে, এই ফোরামের মাধ্যমে সাহসী এবং নতুন চিন্তা, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং মানবাধিকারকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। তবে সমস্যা হলো, বাইডেন প্রশাসন এই বৈঠকে ডেকেছেন এমন সকল ব্যক্তিদের, যাদের নিজেদের শাসন নিয়েই ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে।

‘টাইম’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় সাংবাদিক এবং লেখক দেবাশিষ রায় চৌধুরী বলেন যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতার্তে এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেয়ার বাউসুনারুকে এই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোটা ছিল কৌতুককর। তিনি বলেন যে, আফগানিস্তানকে তালিবানদের হাতে তুলে দিয়ে এবং সৌদি আরবের কাছে ৬’শ ৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে প্রেসিডেন্ট বাইডেন হয়তো মনে করছিলেন যে, স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের বিরুদ্ধে মারাত্মক পদক্ষেপ নেয়া এই ব্যক্তিগুলিকে ডেকে এনে গণতন্ত্র রক্ষায় তাদেরই মতো লোকগুলিকে কিভাবে প্রতিহত করা যায়, সেব্যাপারে দুই দিনের একটা ভার্চুয়াল বৈঠক করাটা ভালো একটা চিন্তা হতে পারে। তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, আমন্ত্রিত ১’শ ১০টা দেশের মাঝে ৩০ শতাংশের বেশি দেশ মার্কিন সংস্থা ‘ফ্রিডম হাউস’এর হিসেবে জনগণকে আংশিক স্বাধীনতা দেয়; আর তিনটা দেশ জনগণকে কোনরূপ স্বাধীনতাই দেয় না; যেগুলি হলো, এঙ্গোলা, ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো এবং ইরাক। তালিকার এক ডজনেরও বেশি দেশকে সুইডেনের ‘ভি ডেম ইন্সটিটিউট’ নামক সংস্থা ‘নির্বাচনী একনায়কতন্ত্র’ বলে আখ্যা দেয়; যার মাঝে রয়েছে ভারত, ফিলিপাইন এবং কেনিয়া। চৌধুরীর কথায়, তালিকায় থাকা দেশগুলিই শুধু নয়, তালিকায় না থাকা দেশগুলিও তাকে অবাক করেছে। যেমন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; যদিও একই রকমের কর্মকান্ড করার পরেও মোদি, দুতার্তে এবং বাউসুনারুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আবার পাকিস্তানকে কি কারণে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সেটাও অজানা; তবে পাকিস্তান এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বাইডেনের লজ্জাকে লাঘব করে। মার্কিন বন্ধু দেশ একদলীয় শাসনের অধীনে থাকা সিঙ্গাপুরকেও ডাকা হয়নি।

৯ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ‘ইসলামাবাদ কনক্লেভ ২০২১’ অনুষ্ঠানে এক বক্তব্যে বলেন যে, পাকিস্তান কোন রাজনৈতিক জোটে যোগ দিতে চায় না; বরং যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে দূরত্ব কমাতে চেষ্টা করতে চায়। ইমরান খান আরও বলেন যে, পাকিস্তানের উচিৎ হবে এধরনের জোট তৈরি বন্ধ করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো; কারণ কারুরই উচিৎ নয় কোন জোটে যোগ দেয়া। যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মাঝে ঠান্ডা যুদ্ধ সারা বিশ্বের জন্যে দুর্যোগ নিয়ে এসেছিল। এবং একারণেই পাকিস্তান চাইছে না আরেকটা নতুন ঠান্ডা যুদ্ধের মাঝে আটকা পড়তে। পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা বলছে যে, ইমরান খানের এই কথাগুলি যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র শীর্ষ বৈঠকে পাকিস্তানের যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পরের দিনই এসেছে। এই বৈঠকে চীনের প্রতিনিধিত্ব করতে বেইজিং থেকে কাউকে না ডেকে তাইওয়ানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়; যা পাকিস্তানকে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল। এই মুহুর্তে চীন হলো পাকিস্তানের সবচাইতে কাছের বন্ধু; আর রাশিয়ার সাথেও পাকিস্তানের সম্পর্কোন্নয়ন হচ্ছে।

 
বাইডেন যে ব্যাপারটা চেপে যাচ্ছেন তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বন্ধুগুলির মাঝেই রয়েছে মোদির ভারত; যেখানে মানুষের উপাসনা করার অধিকার নেই বললেই চলে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের এই কর্মকান্ডগুলিকে মেনে নিচ্ছে, কারণ চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারত হলো মার্কিনীদের অতি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু। এখানে ভূরাজনীতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দেবাশিষ রায় চৌধুরী বলছেন যে, বাইডেনের গণতন্ত্র শীর্ষ বৈঠক প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের ব্যাপারেই ছিল না। এটা ছিল চীন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন একটা জোট তৈরির চেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া মিলে যেমন ‘কোয়াড’ জোট গঠন করা হয়েছে চীনকে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে, ঠিক তেমনি গণতন্ত্র শীর্ষ বৈঠক ছিল ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেল’ বা বিশাল পরিসরে আরেকটা ‘কোয়াড’ গঠন করা। বাইডেন বলছেন যে, গণতন্ত্র হেরে যাচ্ছে চীন এবং রাশিয়ার জন্যে। কিন্তু তিনি যে ব্যাপারটা চেপে যাচ্ছেন তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বন্ধুগুলির মাঝেই রয়েছে মোদির ভারত; যেখানে মানুষের উপাসনা করার অধিকার নেই বললেই চলে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের এই কর্মকান্ডগুলিকে মেনে নিচ্ছে, কারণ চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারত হলো মার্কিনীদের অতি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু। এখানে ভূরাজনীতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৪ঠা ডিসেম্বর চীনের ‘স্টেট কাউন্সিল’এর তথ্য দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক শ্বেতপত্রে বলা হয় যে, চীন একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তবে তাদের গণতন্ত্র কাজ করছে; অর্থাৎ তা পশ্চিমা গণতন্ত্রের মতো অকার্যকর অবস্থায় নেই। মার্টিন গিলেনস এবং বেঞ্জামিন পেইজের দুই দশকের ১৮’শ মার্কিন আইনের উপর করা এক গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয় যে, সাধারণ জনগণের আইনের ব্যাপারে কোন ধারণাই নেই। শুধুমাত্র স্বল্প সংখ্যক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং সম্পদশালী ব্যক্তির দ্বারাই এই আইনগুলি তৈরি হয়েছে। অপরদিকে গত অক্টোবরে ‘পিউ রিসার্চ’এর প্রকাশ করা এক গবেষণায় বলা হয় যে, অর্ধেকের বেশি মার্কিনী গণতন্ত্রের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট। আর ৮৫ শতাংশ জনগণ তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুরোপুরি বা বড় রকমের পরিবর্তন চাইছে। ৬৬ শতাংশ জনগণ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চাইছে; আর ৭৬ শতাংশ মানুষ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। শুধু মার্কিনীরাই নয়; একই গবেষণার অন্যান্য পশ্চিমা দেশের ফলাফলও প্রায় একই। ইতালি, স্পেন, গ্রিস, ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামের ফলাফলগুলিও গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাহীনতাকে দেখিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ইতালি এবং স্পেনে যথাক্রমে ৮৯ শতাংশ এবং ৮৬ শতাংশ মানুষ রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুরোপুরি বা বড় রকমের পরিবর্তন চাইছে।

‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, নিজ দেশে গণতান্ত্রিক সমস্যার মাঝে বৈশ্বিকভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে ওকালতি করার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে কিনা। সন্মেলনে কারা যোগদান করবে, সেই হিসেব করতে গিয়ে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। তুরস্ক এবং হাঙ্গেরিকে বাদ দিয়ে নাইজেরিয়া এবং ফিলিপাইনকে আমন্ত্রণ জানানোর সমালোচনা করা হয় প্রতিবেদনে। প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র শীর্ষ বৈঠক পশ্চিমা চিন্তাবিদদের যেমন অস্বস্তির মাঝে ফেলেছে, তেমনি পশ্চিমা মিডিয়াগুলিকেও ফেলেছে ধোঁয়াশার মাঝে। অপরদিকে চীনা শ্বেতপত্র মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জনগণের তৈরি আইনের সংজ্ঞা হিসেবে চীনারাও গণতান্ত্রিক দেশ। আর সেক্ষেত্রে জনগণের মাঝে কতজন মানুষ সেই আইন তৈরি করতে পারবে, সেব্যাপারে পশ্চিমারা চীনাদের থেকে খুব একটা এগিয়ে নেই মোটেই। প্রশ্নটা শুধু পশ্চিমা গণতন্ত্র বা চীনা গণতন্ত্রকে নিয়ে নয়; বরং খোদ গণতন্ত্রকে নিয়েই। দেবাশিষ রায় চৌধুরী বলছেন যে, গণতন্ত্রের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেই বিশ্বব্যাপী জনগণ এমন কিছু রাজনীতিবিদের কথায় সায় দিচ্ছে, যারা গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও বেশি দুর্বল করে ফেলছে। ‘ফ্রিডম হাউস’এর হিসেবে গত ১৫ বছরের মাঝে বর্তমানে সর্বোচ্চ সংখ্যক দেশে জনগণের স্বাধীনতা পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রিত। আর ‘পিউ রিসার্চ’এর গবেষণা দেখিয়ে দিচ্ছে গণতান্ত্রিকতার উপর পশ্চিমা দেশগুলির জনগণের আস্থাহীনতাকে। পশ্চিমা দেশগুলিতেই যখন গণতন্ত্র মুমুর্ষু, তখন বাকি দুনিয়াতে গণতন্ত্রের তল্পিবাহক হবার মতো সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোন পশ্চিমা রাষ্ট্রের রয়েছে কি? গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার মতো শক্তি বাইডেনের কতটুকু রয়েছে? উত্তরটা যথেষ্টই কঠিন। কারণ গণতন্ত্রকে ‘লাইফ সাপোর্ট’এ রাখা হয়েছে; অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।

Friday, 10 December 2021

বাইডেন এবং পুতিনের বৈঠক … ছাড় দেয়ার প্রবণতা নেই কেন?

১১ই ডিসেম্বর ২০২১

পুতিন বাইডেনকে আলোচনায় বসিয়ে রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ শক্তি হিসেবে দেখাতে চাইছেন। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় চীন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, তখন রাশিয়াকে আরেকটা সমমানের শক্তি হিসেবে দেখতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র। অন্ততঃ একসাথে দু’টা শক্তির বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে যে চ্যালেঞ্জিং হবে, সেব্যাপারে কারুরই সন্দেহ নেই।

গত ৭ই ডিসেম্বর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন যে, রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করলে রাশিয়ার উপর এমন সকল অর্থনৈতিক অবরোধ আসবে, যা কিনা ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের পরও রাশিয়ার উপর আরোপ করা হয়নি। দুই ঘন্টার রূদ্ধদ্বার এই বৈঠকের পর হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে বৈঠকের আলোচ্য বিষয়াবলির উল্লেখ করা হয়। বাইডেন একইসাথে বলেন যে, রাশিয়া ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির জন্যে যে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ পাইপলাইন তৈরি করেছে, সেটা চালু করার আশাও পুতিন ছেড়ে দিতে পারেন, যদি তিনি ইউক্রেন আক্রমণে এগিয়ে যান। অপরদিকে ক্রেমলিন থেকে বলা হচ্ছে যে, পুতিন বাইডেনকে বলেন যে, পূর্ব ইউরোপ এবং বিশেষ করে ইউক্রেনে পশ্চিমাদের সামরিক অবস্থান রাশিয়ার নিরাপত্তাকে হুমকির মাঝে ফেলেছে; যেটাকে তারা ‘লাল দাগ’ হিসেবে বলছেন। তবে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এটা এখনই বলা যাচ্ছে না যে, এই বৈঠক ইউক্রেনের উত্তেজনা প্রশমণে কতটা ভূমিকা রাখবে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে, পুতিন তার উদ্দেশ্যকে পরিষ্কার করেননি। যেকারণে কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না যে, রাশিয়া কি আসলেই আগামী বছরের শুরুতে ইউক্রেন আক্রমণ করে বসবে, নাকি পশ্চিমাদের কাছ থেকে নিজেদের দাবিগুলি আদায়ের লক্ষ্যেই রাশিয়া একটা সমস্যা তৈরি করেছে। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা বলছেন যে, বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের সীমানায় প্রায় ৭০ হাজার সেনা মোতায়েন রেখেছে; যা সামনের দিনগুলিতে ১ লক্ষ ৭৫ হাজারে উঠতে পারে।

‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের পর পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার উপর যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তার চাপে রাশিয়া ক্রিমিয়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে, এবারে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে যেসব অবরোধের কথা চিন্তা করছে, তার মাঝে রয়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার থেকে রুশ কোম্পানিগুলির জন্যে পুঁজি যোগাড় করা কঠিন করে ফেলা; এবং রুশ রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া। আরও কঠিন শাস্তি হিসেবে রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা ‘সুইফট’ থেকে বের করে দেয়ার কথাও বলা হচ্ছে। তবে ইউরোপিয়রা এই শাস্তির ব্যাপারে একমত নন; তারা বলছেন যে, এটা করা হলে রাশিয়ার প্রত্যুত্তরও যথেষ্ট কঠিন হতে পারে।

মার্কিনীরা বলছে যে, রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল করে নেয়ার সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে আড়াই বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে। এর মাঝে রয়েছে আকাশ নিরাপত্তার রাডার, কাউন্টার আর্টিলারি রাডার, ড্রোন, যোগাযোগ ব্যবস্থার যন্ত্রপাতি, নৌবাহিনীর জন্যে প্যাট্রোল বোট, এবং ‘জ্যাভেলিন’ ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। তবে ইউক্রেনে মার্কিন সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে কোন আলোচনা নেই। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ইউক্রেনকে রক্ষা করতে না পারলে তা রাশিয়ার সামনে পশ্চিমা দুর্বলতাকেই তুলে ধরবে বলে অনেকেই মনে করবে; বিশেষ করে চীন এই ধারণা পোষণ করবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড সিনেটের সামনে বলেন যে, রাশিয়া ক্ষেপে যেতে পারে মনে করে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া অনেক অস্ত্রই স্টোর করে রেখেছে। তবে চাপের মুখে পড়লে ইউক্রেন হয়তো তাদের ‘জ্যাভেলিন’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি কাজে লাগাতে পারে।

৭ই ডিসেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’এর এক ফোরামে বলেন যে, রাশিয়ার সাথে সমস্যাটা আসলে ইউক্রেনের চাইতেও বড়। আন্তর্জাতিক সীমানাকে যে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যাবে না, এব্যাপারে দুনিয়ার নিয়মকানুনকে রক্ষা করার ব্যাপারটা এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘সিআইএ’এর ডিরেক্টর উইলিয়াম বার্নস একই ফোরামে বলেন যে, আগামী কয়েক মাসের মাঝে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সীমানায় জলা জায়গাগুলি জমে বরফ হলে গেলেই পুতিন হয়তো তার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পুতিন মনে করছেন যে, জার্মানি চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের রিটায়ারমেন্টের পর কিছুটা বিক্ষিপ্ত রয়েছে। আর ফ্রান্সও আগামী বছরের শুরুতে নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। আর গত দুই বছরের তুলনায় রাশিয়ার বর্তমান অর্থনীতি বেশ ভালো; বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি রাশিয়াকে একটা সুযোগ দিচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ বাইডেনের অবরোধের হুমকিকে উড়িয়ে দিয়েই বলেন যে, রাশিয়ার জন্যে অবরোধ নতুন কিছু নয়। তিনি আরও বলেন যে, রুশ সেনারা রুশ ভূমিতেই রয়েছে; তারা কারুর জন্যেই হুমকি নয়।

‘এএফপি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যদিও অনেকেইর ধারণা পুতিন রাশিয়ার কূটনৈতিক ক্ষতি করে ইউক্রেন আক্রমণ করবেন না; তথাপি ওয়াশিংটনে অনেকেই মনে করতে শুরু করেছেন যে, এবার পুতিন হয়তো ধোঁকা দিচ্ছেন না। ‘কার্নেগি মস্কো সেন্টার’এর তাতিয়ানা স্তানোভায়া মনে করছেন যে, পুতিন পুরো হিসেবই পাল্টে দিয়েছেন। কাজেই এবার হয়তো রাশিয়া এখন মরিয়া কোন পদক্ষেপই নেবে। অপরদিকে বাইডেন যখন বলেছেন যে, তিনি কারুর ‘লাল দাগ’ মানবেন না, তখন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব ব্লিনকেনকে বলছেন যে, রাশিয়া ন্যাটোর কাছ থেকে নিশ্চয়তা চাইছে যে, ন্যাটো রাশিয়ার সীমানার আরও বেশি কাছে আসার চেষ্টা করবে না। স্তানোভায়া মনে করছেন যে, পুতিন হয়তো বলতে চাইছেন যে, ন্যাটো তাকে এই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না দিলে তিনি ইউক্রেনে হামলা করবেন। তবে ইউক্রেনকে যে ন্যাটোর ভেতর ঢোকানো হচ্ছে না, সেব্যাপারে পশ্চিমারা একমত। আর ইউক্রেনকে রক্ষায় মার্কিন সেনা মোতায়েনের ব্যাপারটাও মার্কিন কর্মকর্তারা নাকচ করে দিয়েছেন। তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অবরোধের হুমকি দিয়ে রাশিয়াকে দমিয়ে রাখতে চেষ্টা করবে? নাকি ইউক্রেনে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে দেশটার উপর রাশিয়ার আক্রমণকে বৈধতা দেবে? মার্কিন ইন্টেলিজেন্স এখনও নিশ্চিত নয় যে, পুতিন ইউক্রেন আক্রমণ করবেন কিনা। কিন্তু যেব্যাপারে সকলেই একমত তা হলো, পুতিন বাইডেনকে আলোচনায় বসিয়ে রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ শক্তি হিসেবে দেখাতে চাইছেন। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় চীন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, তখন রাশিয়াকে আরেকটা সমমানের শক্তি হিসেবে দেখতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র। অন্ততঃ একসাথে দু’টা শক্তির বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে যে চ্যালেঞ্জিং হবে, সেব্যাপারে কারুরই সন্দেহ নেই।

Thursday, 9 December 2021

চীনা অর্থনীতির গতি কি মন্থর হয়ে আসছে?

০৯ই ডিসেম্বর ২০২১

চীনের 'এভারগ্র্যান্ড' কোম্পানির দৈত্যাকৃতির রিয়েল এস্টেট প্রকল্প। চীনা অর্থনীতি পুঁজিবাদের সমস্যাগুলি থেকে মুক্ত নয়। লাগামহীন ঋণের উপর নির্ভরশীল হবার কারণেই চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টর সমস্যায় পতিত; যা পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে অনুসরণ করারই ফলাফলস্বরূপ।

 
গত ৬ই ডিসেম্বর চীনা সরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চাইনিজ একাডেমি অব সোশাল সায়েন্সেস’ বা ‘সিএএসএস’এর এক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২২ সালে চীনের আর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২০ সালে কোভিড দুর্যোগের পর ২০২১ সালে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল দেশটার। এর ফলে ২০২০ থেকে ২০২২এর মাঝে গড় প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ। তবে ‘সিএএসএস’ বলছে যে, আগামী বছর চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টরের সমস্যাগুলি চলমান থাকবে এবং তা প্রাদেশিক সরকারগুলির বাজেটকে প্রভাবিত করবে। রিয়েল এস্টেট সমস্যা, স্থবির রপ্তানি এবং করোনাভাইরাসের কারণে কড়াকড়ি আরোপে জনগণের খরচ করার প্রবৃত্তি কমে যাওয়ায় ‘সিএএসএস’ চীনা সরকারকে ২০২২ সালের প্রবৃদ্ধির টার্গেট ২০২১ সালের চাইতে কম রাখতে পরামর্শ দিয়েছে। একইসাথে তারা সরকারকে রিয়েল এস্টেট বাজারকে বাঁচাতে হস্তক্ষেপ করতে উপদেশ দেয়। তাদের কথায়, বড় শহরগুলিতে ভূমির নিলাম বাজারে বিপর্জয় এবং ছোট শহরগুলিতে রিয়েল এস্টেটের মূল্য দ্রুত কমে যাওয়া থামাতে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীনের বিশাল রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ‘এভারগ্র্যান্ড’ ব্যাংকের ঋণ ফেরত দিতে না পারার কারণে চীন সরকার রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলির জন্যে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন করে ফেলেছে। এর ফলে রিয়েল এস্টেট সেক্টর অর্থায়ন পেতে হিমসিম খাচ্ছে। এতে ব্যাংকিং সেক্টরও সমস্যায় পতিত হয়েছে। এছাড়াও মারাত্মক জ্বালানি সমস্যায় পতিত হয়েছে চীন।

নানামুখী চ্যালেঞ্জে চীনা অর্থনীতি

‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে চীনের জ্বালানি সমস্যাকে ব্যাখ্যা করা হয়। ২০৬০ সালের মাঝে চীন সরকার গ্রীন হাউজ গ্যাসের নির্গমণ শূণ্যের কোঠায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চীনা সরকার তাদের প্রাদেশিক সরকারগুলির উপর পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে চাপ প্রদান করা শুরু করে। একারণে অনেক অঞ্চলেই বিদ্যুতের ব্যবহারকে র‍্যাশনিং ব্যবস্থার অধীনে আনা হয়। এতে বহু বাড়িঘর অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়া ছাড়াও সিমেন্ট, স্টিল এবং এলুমিনিয়াম শিল্পের মতো বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করা অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এর মাঝে ৩০ শতাংশ কয়লা উৎপাদনকারী শানজি প্রদেশে বন্যা হওয়ায় কয়লার মূল্য আরেক দফা বৃদ্ধি পায়। এরই মাঝে যুক্ত হয় ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা। রিয়েল এস্টেট এই কোম্পানি ৩’শ বিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দেউলিয়া হবার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। ‘ফ্যান্টাসিয়া’ নামের আরেকটা ডেভেলপার কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে; আর ‘সাইনিক হোল্ডিংস’ও একই পথে যাবার কথা বলছে।

 
চীনের সাংহাই শহরের মারাত্মক দূষণ।  পুঁজিবাদী আদর্শকে অনুসরণ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ায় চীনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে। আর এই বিপর্যয় এড়াতে গিয়েই মারাত্মক জ্বালানি সংকটে পড়ে চীনা জনগণ অন্ধকারে রাত কাটাচ্ছে।

‘দ্যা ইকনমিস্ট’ পত্রিকার ‘ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’এর ইউ সু বলছেন যে, রিয়েল এস্টেট সেক্টর স্থবির হয়ে আসলে এর সাথে যুক্ত কন্সট্রাকশন কনট্রাক্টর, বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াস প্রস্তুতকারক এবং বাড়িঘরের অভ্যন্তরের ফার্নিশিংএর ব্যবসাগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে চীনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিরেক্টর জৌ ল্যান বলছেন যে, ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হবার কিছু নেই। কারণ এই কোম্পানির ঋণ অনেক ব্যাংকের মাঝে ছড়িয়ে আছে। কোন একটা ব্যাংক এখানে বড় সমস্যায় পড়বে না। অর্থাৎ আর্থিক সেক্টরে ‘এভারগ্র্যান্ড’এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ‘বিবিসি’ বলছে যে, চীনের বড় প্রযুক্তি কোম্পানি, গেমিং কোম্পানি এবং শিক্ষা সেক্টর সরকারের নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়েছে। সরকার সামাজিক দিকনির্দেশনাকে পরিবর্তন করতে পাঁচ বছর মেয়াদী এই নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকান্ডগুলি বাস্তবায়ন করছে। অর্থাৎ এই নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকান্ড আরও কয়েক বছর ধরে চলবে। তবে একইসাথে অনেকগুলি নীতির পরিবর্তনের স্বল্পমেয়াদী প্রভাব অবশ্যই দেখা যাবে।

চীনা সরকার চিন্তিত; সেকারণেই তারা তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনছে

চীনা সরকার ইতোমধ্যেই অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। ৬ই ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’ তার নীতিতে পরিবর্তন এনেছে। ১৫ই ডিসেম্বর থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি তাদের রিজার্ভ থেকে শূণ্য দশমিক ৫ শতাংশ করে কমিয়ে ফেলতে পারবে। রিজার্ভ হলো ব্যাংকগুলির পুঁজির একটা অংশ যা ব্যাংক সবসময় ধরে রাখতে বাধ্য। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলি নতুন করে অর্থ যোগার করা ছাড়াই আরও অতিরিক্ত ১’শ ৮৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে সক্ষম হবে। ‘সিএনএন’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এবছরে দ্বিতীয়বার চীনা বাণিজ্যিক ব্যাংকের রিজার্ভের বাধ্যবাধকতা কমানো হলো। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ‘পলিটব্যুরো’র এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, ২০২২ সালে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সরকার আরও সাহসী সিদ্ধান্ত নেবে। অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাককুয়ারি গ্রুপ’এর অর্থনীতিবিদ ল্যারি হু মত দিচ্ছেন যে, এর আগে কখনোই চীনা নেতৃত্ব ‘স্থিতিশীলতা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’এর মতো কথা বলেনি। এর অর্থ হতে পারে যে, চীনা শীর্ষ নেতৃত্ব সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতার ব্যাপারে যথেষ্টই চিন্তিত।

‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের দুর্যোগের মাঝেও চীন সরকার অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থেকেছে। ২০২০এর প্রথম ভাগের পর থেকে চীনা সরকার সুদের হার কমায়নি। এমনকি অর্থনীতিতে বড় রকমের কোন প্রণোদনার বন্যাও বইয়ে দেয়নি। তারা শুধুমাত্র করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ব্যবসাগুলিকে কিছু সমর্থন দিয়েছে। ২০২০ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চীন প্রায় সকল বড় অর্থনীতিকে ছাপিয়ে যায়। তবে তার অর্থনীতি ২০২১ সালে কিছু সমস্যায় পতিত হয়; যার মাঝে রয়েছে নিজেদের জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক শিপিং সাপ্লাইএর বিলম্ব এবং অভ্যন্তরীণ রিয়েল এস্টেট সমস্যা। এছাড়াও দেশটার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি এবং আরও কিছু বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উপর সরকারের চাপপ্রয়োগের ব্যাপারটাও অনেক বিশ্লেষকদের চিন্তিত করেছে। রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ‘এভারগ্র্যান্ড’ গত ৩রা ডিসেম্বর ঘোষণা দেয় যে, তারা হয়তো তাদের সকল ঋণ ফেরত দিতে পারবে না। এই ঘোষণায় ৬ই ডিসেম্বর হংকংএর পুঁজি বাজারে কোম্পানির শেয়ারের মূল্য একদিনে ২০ শতাংশ পড়ে যায়।

বিশ্লেষকেরা ভয় পাচ্ছেন যে, ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা হয়তো চীনের পুরো রিয়েল এস্টেট ব্যবসাকে আক্রান্ত করে ফেলতে পারে। আর চীনের জিডিপির ৩০ শতাংশই রিয়েল এস্টেট সেক্টরের উপর নির্ভরশীল। এতকাল ‘পলিটব্যুরো’র সদস্যরা বলেছেন যে, রিয়েল এস্টেট সেক্টরকে নিয়ম মেনে চলতে হবে এবং সেব্যাপারে শি জিনপিং নিজেও যথেষ্ট কঠোর ছিলেন। কিন্তু এবছরই প্রথমবারের মতো তারা রিয়েল এস্টেট সেক্টরের ব্যাপারে কঠোর কোন কথা বলেননি। ‘সিটি গ্রুপ’এর বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ব্যাংকের রিজার্ভের বাধ্যবাধকতা কমানো এবং ‘পলিটব্যুরো’র বিবৃতিতে বাসস্থানের চাহিদাকে সমর্থন দিয়ে যাবার কথায় বোঝা যাচ্ছে যে, সামনের দিনগুলিতে রিয়েল এস্টেট সেক্টরের ব্যাপারে চীনা সরকার আরও নরম সুরেই কথা বলবে।

 
চীনারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকেই এগুচ্ছে এবং স্বল্পমেয়াদী সমস্যাগুলির সমাধান করতে যেয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে না। আর নিজেদের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের মাঝে রেখে তারা সমস্যাগুলিকে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখতে পারবে।

চীনা অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন; তবে ধ্বস নয়

চীন ভিত্তিক বাজার গবেষণা সংস্থা ‘চায়না বেইজ বুক ইন্টারন্যাশনাল’এর প্রধান নির্বাহী লেল্যান্ড মিলার ‘ব্লুমবার্গ’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, তিনি মনে করেননা যে বর্তমানে চীনে যে অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলি হচ্ছে, তা পূর্বে ঘটে যাওয়া ছোটখাটো কোনো ঘটনার মতো। তার মতে, আজকে চীনে যা ঘটছে, তার প্রভাব আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হবে। এর মূল কারণ হলো সারা বিশ্বের হিসেবটাই এখন পাল্টে গেছে; যা কিনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করবে। ওয়াল স্ট্রীটের পুঁজিপতিরা মনে করছিলেন যে, কোভিডের লকডাউনের পর চীনারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনার ঘোষণা দেবে; কিন্তু সেটার ঘোষণা এখনও আসেনি। কারণ চীনারা মনে করছে যে, ধীরস্থির কম প্রবৃদ্ধিই চীনের অর্থনীতির জন্যে ভালো হবে। মিলার আরও বলছেন যে, চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টর যখন মুষরে পড়ছে, সেখানে অভ্যন্তরীণ বেসরকারি কনজাম্পশন বা খরচ বেড়ে গিয়ে সেটাকে প্রতিস্থাপন করার কোন সম্ভাবনা আসলে নেই। সরকার মানুষের খরচ বৃদ্ধি করতে পারার জন্যে বড় কোন সহায়তা দেয়নি। রাষ্ট্রের সম্পদকে জনগণের হাতে তুলে দেয়া হয়নি। আর বাইরের বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের জন্যে বর্তমানে চীনের আর্থিক সেক্টর ছাড়া অন্য সেক্টরগুলিতে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। তবে মিলার মনে করেন না যে, ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা চীনের অর্থনীতির জন্যে বিশাল কোন সমস্যা বয়ে নিয়ে আসবে। এর কারণ হলো, চীনা অর্থনীতি পশ্চিমা অর্থনীতির মতো মুক্তভাবে চলে না। এখানে সরকার ইচ্ছে করলেই অর্থনৈতিক সমস্যাগুলিকে স্বল্প পরিসরে আটকে দিয়ে বাকি অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারে। চীনা সরকার ‘এভারগ্র্যান্ড’এর ব্যাপারে প্রথমেই সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে চীনা জনগণকে শিক্ষা দিচ্ছে যাতে তারা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগের আগে হিসেব করে সিদ্ধান্ত নেয়।

‘কর্নেল ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর এবং মার্কিন থিংকট্যাংক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন’এর সিনিয়র ফেলো এসওয়ার প্রসাদ ‘ব্রুকিংস’এর এক আলোচনায় বলেন যে, যেটা বোঝা যাচ্ছে তা হলো, চীনারা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা দেখতে চায়। একইসাথে তারা মধ্যমেয়াদে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে চিন্তাভাবনা না করে কেনাবেচাকে নিরুৎসাহিত করা ছাড়াও পরিবেশের উপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রভাবকে কমাতে চাইছে। এই মধ্যমেয়াদী লক্ষ্যগুলিকে বাস্তবায়ন করতে চীন স্বল্প মেয়াদে কিছু প্রবৃদ্ধিকে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। চীনা সরকার জনগণকে বোঝাতে চাইছে যে, যেসব কোম্পানির বিনিয়োগের উৎস ঝুঁকিপূর্ণ, সেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা উচিৎ নয়। আর একইসাথে কেউ যদি মনে করে যে, কোন কোম্পানি নিজেদের খারাপ ব্যবস্থাপনার জন্যে দেউলিয়া হয়ে গেলে সরকার তাদেরকে উদ্ধার করবে, সেটা একেবারেই সঠিক নয়। তবে বহু মানুষের পুঁজি রিয়েল এস্টেট সেক্টরে আটকে থাকার ব্যাপারটা চীনা সরকারের চিন্তার কারণ হিসেবে রয়েছে। প্রফেসর প্রসাদ মনে করছেন না যে, রিয়েল এস্টেটের সমস্যাগুলি পুরো আর্থিক সেক্টরকে প্রভাবিত করবে।

 
চীনে 'মার্সিডিস' কোম্পানির কারখানা। চীনের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোকে হিসেবে ধরেই অনেক পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা ভবিষ্যৎবাণী করছেন যে, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে যাচ্ছে। মূলতঃ এই দৃষ্টিভঙ্গিটা পশ্চিমা পুঁজিপতিদের; যারা চীনে শতশত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে মুনাফার আশায়। তারা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় শংকিত; যদিও সেই প্রবৃদ্ধি সকল বৃহৎ অর্থনীতি থেকে বেশি। ওয়াল স্ট্রীটের পুঁজিপতিরা শংকায় রয়েছে যে, তাদের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বুঝি ডিম দেয়া বন্ধ করে দিচ্ছে!

‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’!

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’ এবং ‘রোডিয়াম গ্রুপ’এর এক যৌথ প্রতিবেদনে চীনের দুই নৌকায় পা রাখার ব্যাপারটা নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীন এতকাল মনে করছিল যে, তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সংকীর্ণ নীতিকে তারা সমান্তরালে রেখেই এগিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে শুরু করে চীনাদের ভবিষ্যৎ জিডিপি পূর্বাভাসই বলে দিচ্ছে যে, চীনারা তাদের এতকালের পথ থেকে সরে আসছে। এই প্রতিবেদনের সাথে পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা মোটামুটিভাবে একমত যে, চীনারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকেই এগুচ্ছে এবং স্বল্পমেয়াদী সমস্যাগুলির সমাধান করতে যেয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে না। আর নিজেদের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের মাঝে রেখে তারা সমস্যাগুলিকে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখতে পারবে।

চীনের অর্থনীতি এখনও পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানির উপর নির্ভরশীল। পশ্চিমা বিশ্বে করোনাভাইরাসের প্রভাবে অর্থনৈতিক মন্দা চীনা পণ্যের বাজারকে চ্যালেঞ্জের মাঝে ফেলছে। চীনা অর্থনীতি পুঁজিবাদের সমস্যাগুলি থেকে মুক্ত নয়। লাগামহীন ঋণের উপর নির্ভরশীল হবার কারণেই চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টর সমস্যায় পতিত; যা পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে অনুসরণ করারই ফলাফলস্বরূপ। পুঁজিবাদী আদর্শকে অনুসরণ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ায় চীনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে। আর এই বিপর্যয় এড়াতে গিয়েই মারাত্মক জ্বালানি সংকটে পড়ে চীনা জনগণ অন্ধকারে রাত কাটাচ্ছে। চীনের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোকে হিসেবে ধরেই অনেক পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা ভবিষ্যৎবাণী করছেন যে, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে যাচ্ছে। মূলতঃ এই দৃষ্টিভঙ্গিটা পশ্চিমা পুঁজিপতিদের; যারা চীনে শতশত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে মুনাফার আশায়। তারা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় শংকিত; যদিও সেই প্রবৃদ্ধি সকল বৃহৎ অর্থনীতি থেকে বেশি। ওয়াল স্ট্রীটের পুঁজিপতিরা শংকায় রয়েছে যে, তাদের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বুঝি ডিম দেয়া বন্ধ করে দিচ্ছে!