Friday, 10 December 2021

বাইডেন এবং পুতিনের বৈঠক … ছাড় দেয়ার প্রবণতা নেই কেন?

১১ই ডিসেম্বর ২০২১

পুতিন বাইডেনকে আলোচনায় বসিয়ে রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ শক্তি হিসেবে দেখাতে চাইছেন। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় চীন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, তখন রাশিয়াকে আরেকটা সমমানের শক্তি হিসেবে দেখতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র। অন্ততঃ একসাথে দু’টা শক্তির বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে যে চ্যালেঞ্জিং হবে, সেব্যাপারে কারুরই সন্দেহ নেই।

গত ৭ই ডিসেম্বর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন যে, রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করলে রাশিয়ার উপর এমন সকল অর্থনৈতিক অবরোধ আসবে, যা কিনা ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের পরও রাশিয়ার উপর আরোপ করা হয়নি। দুই ঘন্টার রূদ্ধদ্বার এই বৈঠকের পর হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে বৈঠকের আলোচ্য বিষয়াবলির উল্লেখ করা হয়। বাইডেন একইসাথে বলেন যে, রাশিয়া ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির জন্যে যে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ পাইপলাইন তৈরি করেছে, সেটা চালু করার আশাও পুতিন ছেড়ে দিতে পারেন, যদি তিনি ইউক্রেন আক্রমণে এগিয়ে যান। অপরদিকে ক্রেমলিন থেকে বলা হচ্ছে যে, পুতিন বাইডেনকে বলেন যে, পূর্ব ইউরোপ এবং বিশেষ করে ইউক্রেনে পশ্চিমাদের সামরিক অবস্থান রাশিয়ার নিরাপত্তাকে হুমকির মাঝে ফেলেছে; যেটাকে তারা ‘লাল দাগ’ হিসেবে বলছেন। তবে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এটা এখনই বলা যাচ্ছে না যে, এই বৈঠক ইউক্রেনের উত্তেজনা প্রশমণে কতটা ভূমিকা রাখবে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে, পুতিন তার উদ্দেশ্যকে পরিষ্কার করেননি। যেকারণে কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না যে, রাশিয়া কি আসলেই আগামী বছরের শুরুতে ইউক্রেন আক্রমণ করে বসবে, নাকি পশ্চিমাদের কাছ থেকে নিজেদের দাবিগুলি আদায়ের লক্ষ্যেই রাশিয়া একটা সমস্যা তৈরি করেছে। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা বলছেন যে, বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের সীমানায় প্রায় ৭০ হাজার সেনা মোতায়েন রেখেছে; যা সামনের দিনগুলিতে ১ লক্ষ ৭৫ হাজারে উঠতে পারে।

‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের পর পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার উপর যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তার চাপে রাশিয়া ক্রিমিয়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে, এবারে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে যেসব অবরোধের কথা চিন্তা করছে, তার মাঝে রয়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার থেকে রুশ কোম্পানিগুলির জন্যে পুঁজি যোগাড় করা কঠিন করে ফেলা; এবং রুশ রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া। আরও কঠিন শাস্তি হিসেবে রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা ‘সুইফট’ থেকে বের করে দেয়ার কথাও বলা হচ্ছে। তবে ইউরোপিয়রা এই শাস্তির ব্যাপারে একমত নন; তারা বলছেন যে, এটা করা হলে রাশিয়ার প্রত্যুত্তরও যথেষ্ট কঠিন হতে পারে।

মার্কিনীরা বলছে যে, রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল করে নেয়ার সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে আড়াই বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে। এর মাঝে রয়েছে আকাশ নিরাপত্তার রাডার, কাউন্টার আর্টিলারি রাডার, ড্রোন, যোগাযোগ ব্যবস্থার যন্ত্রপাতি, নৌবাহিনীর জন্যে প্যাট্রোল বোট, এবং ‘জ্যাভেলিন’ ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। তবে ইউক্রেনে মার্কিন সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে কোন আলোচনা নেই। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ইউক্রেনকে রক্ষা করতে না পারলে তা রাশিয়ার সামনে পশ্চিমা দুর্বলতাকেই তুলে ধরবে বলে অনেকেই মনে করবে; বিশেষ করে চীন এই ধারণা পোষণ করবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড সিনেটের সামনে বলেন যে, রাশিয়া ক্ষেপে যেতে পারে মনে করে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া অনেক অস্ত্রই স্টোর করে রেখেছে। তবে চাপের মুখে পড়লে ইউক্রেন হয়তো তাদের ‘জ্যাভেলিন’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি কাজে লাগাতে পারে।

৭ই ডিসেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’এর এক ফোরামে বলেন যে, রাশিয়ার সাথে সমস্যাটা আসলে ইউক্রেনের চাইতেও বড়। আন্তর্জাতিক সীমানাকে যে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যাবে না, এব্যাপারে দুনিয়ার নিয়মকানুনকে রক্ষা করার ব্যাপারটা এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘সিআইএ’এর ডিরেক্টর উইলিয়াম বার্নস একই ফোরামে বলেন যে, আগামী কয়েক মাসের মাঝে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সীমানায় জলা জায়গাগুলি জমে বরফ হলে গেলেই পুতিন হয়তো তার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পুতিন মনে করছেন যে, জার্মানি চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের রিটায়ারমেন্টের পর কিছুটা বিক্ষিপ্ত রয়েছে। আর ফ্রান্সও আগামী বছরের শুরুতে নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। আর গত দুই বছরের তুলনায় রাশিয়ার বর্তমান অর্থনীতি বেশ ভালো; বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি রাশিয়াকে একটা সুযোগ দিচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ বাইডেনের অবরোধের হুমকিকে উড়িয়ে দিয়েই বলেন যে, রাশিয়ার জন্যে অবরোধ নতুন কিছু নয়। তিনি আরও বলেন যে, রুশ সেনারা রুশ ভূমিতেই রয়েছে; তারা কারুর জন্যেই হুমকি নয়।

‘এএফপি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যদিও অনেকেইর ধারণা পুতিন রাশিয়ার কূটনৈতিক ক্ষতি করে ইউক্রেন আক্রমণ করবেন না; তথাপি ওয়াশিংটনে অনেকেই মনে করতে শুরু করেছেন যে, এবার পুতিন হয়তো ধোঁকা দিচ্ছেন না। ‘কার্নেগি মস্কো সেন্টার’এর তাতিয়ানা স্তানোভায়া মনে করছেন যে, পুতিন পুরো হিসেবই পাল্টে দিয়েছেন। কাজেই এবার হয়তো রাশিয়া এখন মরিয়া কোন পদক্ষেপই নেবে। অপরদিকে বাইডেন যখন বলেছেন যে, তিনি কারুর ‘লাল দাগ’ মানবেন না, তখন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব ব্লিনকেনকে বলছেন যে, রাশিয়া ন্যাটোর কাছ থেকে নিশ্চয়তা চাইছে যে, ন্যাটো রাশিয়ার সীমানার আরও বেশি কাছে আসার চেষ্টা করবে না। স্তানোভায়া মনে করছেন যে, পুতিন হয়তো বলতে চাইছেন যে, ন্যাটো তাকে এই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না দিলে তিনি ইউক্রেনে হামলা করবেন। তবে ইউক্রেনকে যে ন্যাটোর ভেতর ঢোকানো হচ্ছে না, সেব্যাপারে পশ্চিমারা একমত। আর ইউক্রেনকে রক্ষায় মার্কিন সেনা মোতায়েনের ব্যাপারটাও মার্কিন কর্মকর্তারা নাকচ করে দিয়েছেন। তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অবরোধের হুমকি দিয়ে রাশিয়াকে দমিয়ে রাখতে চেষ্টা করবে? নাকি ইউক্রেনে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে দেশটার উপর রাশিয়ার আক্রমণকে বৈধতা দেবে? মার্কিন ইন্টেলিজেন্স এখনও নিশ্চিত নয় যে, পুতিন ইউক্রেন আক্রমণ করবেন কিনা। কিন্তু যেব্যাপারে সকলেই একমত তা হলো, পুতিন বাইডেনকে আলোচনায় বসিয়ে রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ শক্তি হিসেবে দেখাতে চাইছেন। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় চীন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, তখন রাশিয়াকে আরেকটা সমমানের শক্তি হিসেবে দেখতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র। অন্ততঃ একসাথে দু’টা শক্তির বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে যে চ্যালেঞ্জিং হবে, সেব্যাপারে কারুরই সন্দেহ নেই।

Thursday, 9 December 2021

চীনা অর্থনীতির গতি কি মন্থর হয়ে আসছে?

০৯ই ডিসেম্বর ২০২১

চীনের 'এভারগ্র্যান্ড' কোম্পানির দৈত্যাকৃতির রিয়েল এস্টেট প্রকল্প। চীনা অর্থনীতি পুঁজিবাদের সমস্যাগুলি থেকে মুক্ত নয়। লাগামহীন ঋণের উপর নির্ভরশীল হবার কারণেই চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টর সমস্যায় পতিত; যা পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে অনুসরণ করারই ফলাফলস্বরূপ।

 
গত ৬ই ডিসেম্বর চীনা সরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চাইনিজ একাডেমি অব সোশাল সায়েন্সেস’ বা ‘সিএএসএস’এর এক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২২ সালে চীনের আর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২০ সালে কোভিড দুর্যোগের পর ২০২১ সালে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল দেশটার। এর ফলে ২০২০ থেকে ২০২২এর মাঝে গড় প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ। তবে ‘সিএএসএস’ বলছে যে, আগামী বছর চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টরের সমস্যাগুলি চলমান থাকবে এবং তা প্রাদেশিক সরকারগুলির বাজেটকে প্রভাবিত করবে। রিয়েল এস্টেট সমস্যা, স্থবির রপ্তানি এবং করোনাভাইরাসের কারণে কড়াকড়ি আরোপে জনগণের খরচ করার প্রবৃত্তি কমে যাওয়ায় ‘সিএএসএস’ চীনা সরকারকে ২০২২ সালের প্রবৃদ্ধির টার্গেট ২০২১ সালের চাইতে কম রাখতে পরামর্শ দিয়েছে। একইসাথে তারা সরকারকে রিয়েল এস্টেট বাজারকে বাঁচাতে হস্তক্ষেপ করতে উপদেশ দেয়। তাদের কথায়, বড় শহরগুলিতে ভূমির নিলাম বাজারে বিপর্জয় এবং ছোট শহরগুলিতে রিয়েল এস্টেটের মূল্য দ্রুত কমে যাওয়া থামাতে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীনের বিশাল রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ‘এভারগ্র্যান্ড’ ব্যাংকের ঋণ ফেরত দিতে না পারার কারণে চীন সরকার রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলির জন্যে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন করে ফেলেছে। এর ফলে রিয়েল এস্টেট সেক্টর অর্থায়ন পেতে হিমসিম খাচ্ছে। এতে ব্যাংকিং সেক্টরও সমস্যায় পতিত হয়েছে। এছাড়াও মারাত্মক জ্বালানি সমস্যায় পতিত হয়েছে চীন।

নানামুখী চ্যালেঞ্জে চীনা অর্থনীতি

‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে চীনের জ্বালানি সমস্যাকে ব্যাখ্যা করা হয়। ২০৬০ সালের মাঝে চীন সরকার গ্রীন হাউজ গ্যাসের নির্গমণ শূণ্যের কোঠায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চীনা সরকার তাদের প্রাদেশিক সরকারগুলির উপর পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে চাপ প্রদান করা শুরু করে। একারণে অনেক অঞ্চলেই বিদ্যুতের ব্যবহারকে র‍্যাশনিং ব্যবস্থার অধীনে আনা হয়। এতে বহু বাড়িঘর অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়া ছাড়াও সিমেন্ট, স্টিল এবং এলুমিনিয়াম শিল্পের মতো বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করা অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এর মাঝে ৩০ শতাংশ কয়লা উৎপাদনকারী শানজি প্রদেশে বন্যা হওয়ায় কয়লার মূল্য আরেক দফা বৃদ্ধি পায়। এরই মাঝে যুক্ত হয় ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা। রিয়েল এস্টেট এই কোম্পানি ৩’শ বিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দেউলিয়া হবার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। ‘ফ্যান্টাসিয়া’ নামের আরেকটা ডেভেলপার কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে; আর ‘সাইনিক হোল্ডিংস’ও একই পথে যাবার কথা বলছে।

 
চীনের সাংহাই শহরের মারাত্মক দূষণ।  পুঁজিবাদী আদর্শকে অনুসরণ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ায় চীনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে। আর এই বিপর্যয় এড়াতে গিয়েই মারাত্মক জ্বালানি সংকটে পড়ে চীনা জনগণ অন্ধকারে রাত কাটাচ্ছে।

‘দ্যা ইকনমিস্ট’ পত্রিকার ‘ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’এর ইউ সু বলছেন যে, রিয়েল এস্টেট সেক্টর স্থবির হয়ে আসলে এর সাথে যুক্ত কন্সট্রাকশন কনট্রাক্টর, বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াস প্রস্তুতকারক এবং বাড়িঘরের অভ্যন্তরের ফার্নিশিংএর ব্যবসাগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে চীনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিরেক্টর জৌ ল্যান বলছেন যে, ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হবার কিছু নেই। কারণ এই কোম্পানির ঋণ অনেক ব্যাংকের মাঝে ছড়িয়ে আছে। কোন একটা ব্যাংক এখানে বড় সমস্যায় পড়বে না। অর্থাৎ আর্থিক সেক্টরে ‘এভারগ্র্যান্ড’এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ‘বিবিসি’ বলছে যে, চীনের বড় প্রযুক্তি কোম্পানি, গেমিং কোম্পানি এবং শিক্ষা সেক্টর সরকারের নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়েছে। সরকার সামাজিক দিকনির্দেশনাকে পরিবর্তন করতে পাঁচ বছর মেয়াদী এই নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকান্ডগুলি বাস্তবায়ন করছে। অর্থাৎ এই নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকান্ড আরও কয়েক বছর ধরে চলবে। তবে একইসাথে অনেকগুলি নীতির পরিবর্তনের স্বল্পমেয়াদী প্রভাব অবশ্যই দেখা যাবে।

চীনা সরকার চিন্তিত; সেকারণেই তারা তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনছে

চীনা সরকার ইতোমধ্যেই অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। ৬ই ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’ তার নীতিতে পরিবর্তন এনেছে। ১৫ই ডিসেম্বর থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি তাদের রিজার্ভ থেকে শূণ্য দশমিক ৫ শতাংশ করে কমিয়ে ফেলতে পারবে। রিজার্ভ হলো ব্যাংকগুলির পুঁজির একটা অংশ যা ব্যাংক সবসময় ধরে রাখতে বাধ্য। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলি নতুন করে অর্থ যোগার করা ছাড়াই আরও অতিরিক্ত ১’শ ৮৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে সক্ষম হবে। ‘সিএনএন’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এবছরে দ্বিতীয়বার চীনা বাণিজ্যিক ব্যাংকের রিজার্ভের বাধ্যবাধকতা কমানো হলো। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ‘পলিটব্যুরো’র এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, ২০২২ সালে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সরকার আরও সাহসী সিদ্ধান্ত নেবে। অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাককুয়ারি গ্রুপ’এর অর্থনীতিবিদ ল্যারি হু মত দিচ্ছেন যে, এর আগে কখনোই চীনা নেতৃত্ব ‘স্থিতিশীলতা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’এর মতো কথা বলেনি। এর অর্থ হতে পারে যে, চীনা শীর্ষ নেতৃত্ব সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতার ব্যাপারে যথেষ্টই চিন্তিত।

‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের দুর্যোগের মাঝেও চীন সরকার অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থেকেছে। ২০২০এর প্রথম ভাগের পর থেকে চীনা সরকার সুদের হার কমায়নি। এমনকি অর্থনীতিতে বড় রকমের কোন প্রণোদনার বন্যাও বইয়ে দেয়নি। তারা শুধুমাত্র করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ব্যবসাগুলিকে কিছু সমর্থন দিয়েছে। ২০২০ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চীন প্রায় সকল বড় অর্থনীতিকে ছাপিয়ে যায়। তবে তার অর্থনীতি ২০২১ সালে কিছু সমস্যায় পতিত হয়; যার মাঝে রয়েছে নিজেদের জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক শিপিং সাপ্লাইএর বিলম্ব এবং অভ্যন্তরীণ রিয়েল এস্টেট সমস্যা। এছাড়াও দেশটার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি এবং আরও কিছু বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উপর সরকারের চাপপ্রয়োগের ব্যাপারটাও অনেক বিশ্লেষকদের চিন্তিত করেছে। রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ‘এভারগ্র্যান্ড’ গত ৩রা ডিসেম্বর ঘোষণা দেয় যে, তারা হয়তো তাদের সকল ঋণ ফেরত দিতে পারবে না। এই ঘোষণায় ৬ই ডিসেম্বর হংকংএর পুঁজি বাজারে কোম্পানির শেয়ারের মূল্য একদিনে ২০ শতাংশ পড়ে যায়।

বিশ্লেষকেরা ভয় পাচ্ছেন যে, ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা হয়তো চীনের পুরো রিয়েল এস্টেট ব্যবসাকে আক্রান্ত করে ফেলতে পারে। আর চীনের জিডিপির ৩০ শতাংশই রিয়েল এস্টেট সেক্টরের উপর নির্ভরশীল। এতকাল ‘পলিটব্যুরো’র সদস্যরা বলেছেন যে, রিয়েল এস্টেট সেক্টরকে নিয়ম মেনে চলতে হবে এবং সেব্যাপারে শি জিনপিং নিজেও যথেষ্ট কঠোর ছিলেন। কিন্তু এবছরই প্রথমবারের মতো তারা রিয়েল এস্টেট সেক্টরের ব্যাপারে কঠোর কোন কথা বলেননি। ‘সিটি গ্রুপ’এর বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ব্যাংকের রিজার্ভের বাধ্যবাধকতা কমানো এবং ‘পলিটব্যুরো’র বিবৃতিতে বাসস্থানের চাহিদাকে সমর্থন দিয়ে যাবার কথায় বোঝা যাচ্ছে যে, সামনের দিনগুলিতে রিয়েল এস্টেট সেক্টরের ব্যাপারে চীনা সরকার আরও নরম সুরেই কথা বলবে।

 
চীনারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকেই এগুচ্ছে এবং স্বল্পমেয়াদী সমস্যাগুলির সমাধান করতে যেয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে না। আর নিজেদের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের মাঝে রেখে তারা সমস্যাগুলিকে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখতে পারবে।

চীনা অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন; তবে ধ্বস নয়

চীন ভিত্তিক বাজার গবেষণা সংস্থা ‘চায়না বেইজ বুক ইন্টারন্যাশনাল’এর প্রধান নির্বাহী লেল্যান্ড মিলার ‘ব্লুমবার্গ’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, তিনি মনে করেননা যে বর্তমানে চীনে যে অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলি হচ্ছে, তা পূর্বে ঘটে যাওয়া ছোটখাটো কোনো ঘটনার মতো। তার মতে, আজকে চীনে যা ঘটছে, তার প্রভাব আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হবে। এর মূল কারণ হলো সারা বিশ্বের হিসেবটাই এখন পাল্টে গেছে; যা কিনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করবে। ওয়াল স্ট্রীটের পুঁজিপতিরা মনে করছিলেন যে, কোভিডের লকডাউনের পর চীনারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনার ঘোষণা দেবে; কিন্তু সেটার ঘোষণা এখনও আসেনি। কারণ চীনারা মনে করছে যে, ধীরস্থির কম প্রবৃদ্ধিই চীনের অর্থনীতির জন্যে ভালো হবে। মিলার আরও বলছেন যে, চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টর যখন মুষরে পড়ছে, সেখানে অভ্যন্তরীণ বেসরকারি কনজাম্পশন বা খরচ বেড়ে গিয়ে সেটাকে প্রতিস্থাপন করার কোন সম্ভাবনা আসলে নেই। সরকার মানুষের খরচ বৃদ্ধি করতে পারার জন্যে বড় কোন সহায়তা দেয়নি। রাষ্ট্রের সম্পদকে জনগণের হাতে তুলে দেয়া হয়নি। আর বাইরের বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের জন্যে বর্তমানে চীনের আর্থিক সেক্টর ছাড়া অন্য সেক্টরগুলিতে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। তবে মিলার মনে করেন না যে, ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা চীনের অর্থনীতির জন্যে বিশাল কোন সমস্যা বয়ে নিয়ে আসবে। এর কারণ হলো, চীনা অর্থনীতি পশ্চিমা অর্থনীতির মতো মুক্তভাবে চলে না। এখানে সরকার ইচ্ছে করলেই অর্থনৈতিক সমস্যাগুলিকে স্বল্প পরিসরে আটকে দিয়ে বাকি অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারে। চীনা সরকার ‘এভারগ্র্যান্ড’এর ব্যাপারে প্রথমেই সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে চীনা জনগণকে শিক্ষা দিচ্ছে যাতে তারা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগের আগে হিসেব করে সিদ্ধান্ত নেয়।

‘কর্নেল ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর এবং মার্কিন থিংকট্যাংক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন’এর সিনিয়র ফেলো এসওয়ার প্রসাদ ‘ব্রুকিংস’এর এক আলোচনায় বলেন যে, যেটা বোঝা যাচ্ছে তা হলো, চীনারা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা দেখতে চায়। একইসাথে তারা মধ্যমেয়াদে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে চিন্তাভাবনা না করে কেনাবেচাকে নিরুৎসাহিত করা ছাড়াও পরিবেশের উপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রভাবকে কমাতে চাইছে। এই মধ্যমেয়াদী লক্ষ্যগুলিকে বাস্তবায়ন করতে চীন স্বল্প মেয়াদে কিছু প্রবৃদ্ধিকে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। চীনা সরকার জনগণকে বোঝাতে চাইছে যে, যেসব কোম্পানির বিনিয়োগের উৎস ঝুঁকিপূর্ণ, সেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা উচিৎ নয়। আর একইসাথে কেউ যদি মনে করে যে, কোন কোম্পানি নিজেদের খারাপ ব্যবস্থাপনার জন্যে দেউলিয়া হয়ে গেলে সরকার তাদেরকে উদ্ধার করবে, সেটা একেবারেই সঠিক নয়। তবে বহু মানুষের পুঁজি রিয়েল এস্টেট সেক্টরে আটকে থাকার ব্যাপারটা চীনা সরকারের চিন্তার কারণ হিসেবে রয়েছে। প্রফেসর প্রসাদ মনে করছেন না যে, রিয়েল এস্টেটের সমস্যাগুলি পুরো আর্থিক সেক্টরকে প্রভাবিত করবে।

 
চীনে 'মার্সিডিস' কোম্পানির কারখানা। চীনের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোকে হিসেবে ধরেই অনেক পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা ভবিষ্যৎবাণী করছেন যে, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে যাচ্ছে। মূলতঃ এই দৃষ্টিভঙ্গিটা পশ্চিমা পুঁজিপতিদের; যারা চীনে শতশত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে মুনাফার আশায়। তারা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় শংকিত; যদিও সেই প্রবৃদ্ধি সকল বৃহৎ অর্থনীতি থেকে বেশি। ওয়াল স্ট্রীটের পুঁজিপতিরা শংকায় রয়েছে যে, তাদের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বুঝি ডিম দেয়া বন্ধ করে দিচ্ছে!

‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’!

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’ এবং ‘রোডিয়াম গ্রুপ’এর এক যৌথ প্রতিবেদনে চীনের দুই নৌকায় পা রাখার ব্যাপারটা নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীন এতকাল মনে করছিল যে, তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সংকীর্ণ নীতিকে তারা সমান্তরালে রেখেই এগিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে শুরু করে চীনাদের ভবিষ্যৎ জিডিপি পূর্বাভাসই বলে দিচ্ছে যে, চীনারা তাদের এতকালের পথ থেকে সরে আসছে। এই প্রতিবেদনের সাথে পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা মোটামুটিভাবে একমত যে, চীনারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকেই এগুচ্ছে এবং স্বল্পমেয়াদী সমস্যাগুলির সমাধান করতে যেয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে না। আর নিজেদের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের মাঝে রেখে তারা সমস্যাগুলিকে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখতে পারবে।

চীনের অর্থনীতি এখনও পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানির উপর নির্ভরশীল। পশ্চিমা বিশ্বে করোনাভাইরাসের প্রভাবে অর্থনৈতিক মন্দা চীনা পণ্যের বাজারকে চ্যালেঞ্জের মাঝে ফেলছে। চীনা অর্থনীতি পুঁজিবাদের সমস্যাগুলি থেকে মুক্ত নয়। লাগামহীন ঋণের উপর নির্ভরশীল হবার কারণেই চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টর সমস্যায় পতিত; যা পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে অনুসরণ করারই ফলাফলস্বরূপ। পুঁজিবাদী আদর্শকে অনুসরণ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ায় চীনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে। আর এই বিপর্যয় এড়াতে গিয়েই মারাত্মক জ্বালানি সংকটে পড়ে চীনা জনগণ অন্ধকারে রাত কাটাচ্ছে। চীনের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোকে হিসেবে ধরেই অনেক পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা ভবিষ্যৎবাণী করছেন যে, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে যাচ্ছে। মূলতঃ এই দৃষ্টিভঙ্গিটা পশ্চিমা পুঁজিপতিদের; যারা চীনে শতশত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে মুনাফার আশায়। তারা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় শংকিত; যদিও সেই প্রবৃদ্ধি সকল বৃহৎ অর্থনীতি থেকে বেশি। ওয়াল স্ট্রীটের পুঁজিপতিরা শংকায় রয়েছে যে, তাদের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বুঝি ডিম দেয়া বন্ধ করে দিচ্ছে!

Monday, 6 December 2021

সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে কেন অস্ট্রেলিয়ার সৈন্য মোতায়েন?

০৬ই ডিসেম্বর ২০২১

২০০৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে অস্ট্রেলিয়ার সেনা মোতায়েন ছিল দেশটার আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্বকে পুঁজি করেই। এখন নতুন করে শুরু হওয়া দ্বন্দ্ব আবারও সেখানে অস্ট্রেলিয়ার সেনা মোতায়েনের সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তথাপি ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার অংশ অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এই অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকতে চায়। সহিংসতায় সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরগুলি সেক্ষেত্রে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর জন্যে প্রভাব ধরে রাখার ছুতো মাত্র।

 
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের প্রধানমন্ত্রী মানাসেহ সোগাভারেএর পদত্যাগ দাবি করে গত ২৪শে নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদী সমাবেশ খুব শীঘ্রই সহিংসতায় রূপ নেয়। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, মালাইতা দ্বীপ থেকে আসা বেশকিছু লোক গুয়াদালকানাল দ্বীপে অবস্থিত রাজধানী হোনিয়ারাতে সহিংসতায় যোগ দেয়। প্রায় হাজার খানেক লোক পার্লামেন্ট ভবন কমপ্লেক্সের একাংশে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ যখন জনগণকে পার্লামেন্ট ভবন থেকে সরাবার চেষ্টা করছে, তখন হোনিয়ারা শহরে শুরু হয় লুটতরাজ। পরদিন হোনিয়ারার চায়না টাউনে চীনা মালিকানার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। শহর আইন শৃংখলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবার পর সলোমোনের প্রধানমন্ত্রী সোগাভারে অস্ট্রেলিয়ার কাছে সহযোগিতা চান। ২৪ ঘন্টার মাঝেই অস্ট্রেলিয় সরকার হোনিয়ারাতে সেনা মোতায়েন করে। নিউজিল্যান্ডও পরবর্তীতে সেখানে সেনা পাঠায়।

বর্তমান সমস্যার শুরুটা ছিল ২০১৯ সালে; যখন ৮ লক্ষ জনসংখ্যার দ্বীপ দেশ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকার ৫’শ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে তাইওয়ানের সাথে ৩৬ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। বিরোধী দলগুলি এবং গুয়াদালকানাল দ্বীপের প্রতিবেশী মালাইতাএর প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী ড্যানিয়েল সুইদানি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। ২০২০ সালে মালাইতাএর প্রাদেশিক সরকার সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকারের আদেশ অমান্য করে তাইওয়ানের কাছ থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা নেয়। ২০১৯ সালে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ এবং কিরিবাতি দ্বীপ তাইওয়ানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক কর্তনের পর বর্তমানে মাত্র ১৫টা দেশের সাথে তাইওয়ানের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় থাকলো। এর মাঝে ৪টা দেশ হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় ছোট্ট দ্বীপ দেশ।

চীন এবং তাইওয়ানের মাঝে দ্বন্দ্ব

‘দ্যা অস্ট্রেলিয়ান ফিনানশিয়াল রিভিউ’এর এক লেখায় অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার ডাউনার বলছেন যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে হস্তক্ষেপ করার ব্যাপারটা সবসময়েই চীনের কারণে ছিল। বেইজিং এবং তাইপে এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারে যে প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে, তাতে এখানে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান গ্রহণ করা ছাড়া উপায় নেই। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলিতে স্থিতিশীলতা দেখতে অস্ট্রেলিয়াকে অনেক সময় এবং সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন ডাউনার। তবে তিনি বলেন যে, অনেকেই ভুল করে মনে করছেন যে, চীন এই অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া এবং তার বন্ধুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। প্রকৃতপক্ষে চীনের লক্ষ্য হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশগুলিকে তাইওয়ান থেকে দূরে রাখা। এই লক্ষ্যে তারা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ সাফল্যও পেয়েছে। শুধুমাত্র নাউরু, পালাউ, তুভালু এবং মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ এখনও তাইওয়ানের কূটনৈতিক বন্ধু হিসেবে রয়েছে। উভয় পক্ষই দ্বীপগুলিকে নিজেদের পক্ষে রাখতে ঘুস দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলে তাদের সাহায্য দেয়ার কর্মসূচি অব্যাহত রাখলেও এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা অস্ট্রেলিয়ার চেষ্টাকে সমস্যায় ফেলেছে। অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা মূলতঃ গণতান্ত্রিক শাসনযন্ত্রকে আরও কর্মক্ষম করার উদ্দেশ্যে।

 
অক্টোবর ২০১৯। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর সাথে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের প্রধানমন্ত্রী মানাসেহ সোগাভারে। কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে এগিয়ে থাকার জন্যে চীনারা যখন তাইওয়ানের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন অপেক্ষাকৃত বড় পুঁজির এই এশিয় প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দেশগুলির উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। চীন এবং তাইওয়ানের কাছ থেকে মিলিয়ন ডলারের সহায়তা পেতে রাজনীতিবিদদের মাঝে জন্ম নিয়েছে লালসা; যা একইসাথে উস্কে দিয়েছে গুয়াদালকানাল এবং মালাইতাএর মাঝে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব। দামি এই অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সামনে অস্ট্রেলিয়ার গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্ত করার সহায়তাগুলি ম্লান হয়ে গিয়েছে।

ডাউনার বলছেন যে, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় ২০০৩ সালে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে আইনশৃংখলা বজায় রাখতে তার সরকার সামরিক বাহিনী প্রেরণ করে। সেবার গুয়াদালকানাল দ্বীপের সাথে মালাইতা দ্বীপের দ্বন্দ্ব থেকে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। ২০১৭ সালে এই বাহিনীকে তুলে নেয়া হয়। ডাউনারের কথায় সেটা ছিল একটা বড় ভুল। কারণ যদি সেখানে খুব ছোট একটা অস্ট্রেলিয় বাহিনী থাকতো, তাহলে হয়তো সেখানকার অবস্থা আজকের মতো হতো না। ডাউনার বলছেন যে, বর্তমানে সমস্যার পিছনে গুয়ালাদালকানাল এবং মালাইতার মাঝে দ্বন্দ্বই দায়ী; আর পিছনে ইন্ধন যোগাচ্ছে দুই পক্ষের চীনের ব্যাপারে নীতি। ডাউনার মনে করছেন যে, ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়া সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ থেকে সেনা সরিয়ে ফেলার কারণে বেইজিং এবং তাইপে উভয়েই হয়তো ধারণা করেছিল যে, অস্ট্রেলিয়া অত্র অঞ্চলকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার থিংকট্যাংক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর রিসার্চ ফেলো মিহাই সোরা ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক লেখায় মত দিচ্ছেন যে, সলোমোনে অস্ট্রেলিয়ার দ্রুত সামরিক হস্তক্ষেপ দেশটার দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। তিনি বলছেন যে, সমস্যার শুরুটা ছিল আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী কোন্দলের মাঝে। তবে খুব দ্রতই তা প্রাত্যহিক জীবনের সমস্যাগুলিকে পুঁজি করে জ্বলে ওঠে। করোনাভাইরাসের কারণে দেশের স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং এর ফলফলস্বরূপ অর্থনৈতিক ধ্বস মানুষকে সহিংসতা এবং লুটতরাজের দিকে আগ্রহী করেছে। শিক্ষার অভাব এবং বেকারত্বে জর্জরিত যুবসমাজ যখন হতাশায় ডুবে আছে, তখন চরম দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্তের প্রতি মানুষের আনুগত্যের ঘাটতি তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সমস্যার কেন্দ্রে ছিল দেশটার অসমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন। দেশটার রাজধানী হোনিয়ারার অবস্থান হলো গুয়াদালকানাল দ্বীপে; যেকারণে বেশিরভাগ উন্নয়ন কর্মকান্ড হয়েছে এই দ্বীপে। পাশের দ্বীপ মালাইতাএর জনগণ এই উন্নয়নের হিস্যা না পাওয়ায় ছিল ক্ষুব্ধ। মালাইতা দ্বীপ থেকেই প্রতিবাদ শুরু হলেও পরবর্তীতে তা অন্যান্য অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ইস্যুর মাঝে হারিয়ে যায়।

 


সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের ভূকৌশলগত অবস্থান

ভূকৌশলগতভাবে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের প্রধান বন্দরগুলির সাথে সবচাইতে বেশি বাণিজ্য হয় এশিয়ার দেশগুলির। আর এই বাণিজ্য সাধনের জন্যে বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে পপুয়া নিউগিনির পূর্ব উপকূল থেকে শুরু করে পূর্বদিকে প্রায় দুই হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত সমুদ্রে অবস্থিত দ্বীপগুলির ফাঁক দিয়ে প্রবাহিত প্রণালিগুলির মাঝ দিয়ে যেতে হয়। সবচাইতে বেশি জাহাজ চলাচল করে নিউগিনি এবং নিউ ব্রিটেন দ্বীপের মাঝ দিয়ে; এবং নিউ আয়ারল্যান্ড এবং বোগেনভিল দ্বীপের মাঝ দিয়ে। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের দ্বীপগুলি এই দুই বাণিজ্য রুট ঘেঁষে অবস্থিত। এই দ্বীপগুলিকে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার চেষ্টা করে। এই চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। এই দ্বন্দ্বে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের গুয়াদালকানাল দ্বীপ বিখ্যাত হয়ে যায়। উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে রাজি হয়নি। এর কারণ হলো এই দ্বীপগুলির নিয়ন্ত্রণের উপর অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা নির্ভর করছিল। প্রায় ৮০ বছর পর এখনও সেই বাস্তবতা পাল্টায়নি। একারণে অস্ট্রেলিয়া এই দ্বীপ দেশগুলির নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদাই চিন্তিত।

অস্ট্রেলিয়ার জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অস্টাল’ গত অক্টোবরে বলে যে, তাদের তৈরি করা ১৩তম ‘গার্ডিয়ান ক্লাস’ প্যাট্রোল বোট অস্ট্রেলিয়ার সরকার পপুয়া নিউগিনিকে দান করেছে। ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সরকার ২’শ ৩৬ মিলিয়ন ডলার খরচে ২১টা প্যাট্রোল বোট অর্ডার করে। এই বোটগুলি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ১২টা দেশের জন্যে তৈরি করা হচ্ছে; যা কিনা এর আগে অস্ট্রেলিয়া সরকারের দান করা প্যাট্রোল বোটগুলিকে প্রতিস্থাপন করবে। পপুয়া নিউগিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ ছাড়াও এই ১২টা দেশের মাঝে রয়েছে ফিজি, ফেডারেটেড স্টেটস অব মাইক্রোনেশিয়া, টোঙ্গা, কুক দ্বীপপুঞ্জ, কিরিবাতি, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, পালাউ, সামোয়া, তুভালু, ভানুয়াতু; এবং ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জের মাঝে অবস্থিত তিমর লেস্তে। অতি ছোট এই দেশগুলি প্রত্যেকেই জাতিসংঘে একটা ভোটের মালিক। অথচ এদের নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের হাতে নেই। এই দেশগুলির কূটনৈতিক কর্মকান্ড অস্ট্রেলিয়ার দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত ছিল সর্বদা। এই দেশগুলির তাইওয়ানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এর বড় উদাহরণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অর্থনৈতিক আগ্রাসী ভূমিকা এই দ্বীপ দেশগুলির উপর অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রণকে নড়বড়ে করে ফেলেছে।

অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক অবস্থানে থাকা পপুয়া নিউগিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে চীনা অর্থনৈতিক প্রভাব অস্ট্রেলিয়াকে বিচলিত করেছে। একইসাথে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে এগিয়ে থাকার জন্যে চীনারা যখন তাইওয়ানের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন অপেক্ষাকৃত বড় পুঁজির এই এশিয় প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দেশগুলির উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। চীন এবং তাইওয়ানের কাছ থেকে মিলিয়ন ডলারের সহায়তা পেতে রাজনীতিবিদদের মাঝে জন্ম নিয়েছে লালসা; যা একইসাথে উস্কে দিয়েছে গুয়াদালকানাল এবং মালাইতাএর মাঝে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব। দামি এই অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সামনে অস্ট্রেলিয়ার গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্ত করার সহায়তাগুলি ম্লান হয়ে গিয়েছে। ২০০৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে অস্ট্রেলিয়ার সেনা মোতায়েন ছিল দেশটার আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্বকে পুঁজি করেই। এখন নতুন করে শুরু হওয়া দ্বন্দ্ব আবারও সেখানে অস্ট্রেলিয়ার সেনা মোতায়েনের সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তথাপি ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার অংশ অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এই অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকতে চায়। সহিংসতায় সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরগুলি সেক্ষেত্রে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর জন্যে প্রভাব ধরে রাখার ছুতো মাত্র।

Saturday, 4 December 2021

পুঁজিবাদ কি পৃথিবীর জলবায়ুকে বাঁচাতে পারলো?

৪ঠা ডিসেম্বর ২০২১

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ‘কপ২৬’এর সাফল্য দাবি করেন; অথচ জলবায়ু সমস্যার মূলে থাকা কনজিউমারিজম নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকেন। জলবায়ু বাঁচাতে তিনি কিভাবে ব্রিটিশ নাগরিকদেরকে লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে খরচ কমাতে বলবেন? আর কিভাবেই বা তিনি স্বীকার করে নেবেন যে, ‘ক্যাপিটালিজম ইজ কিলিং দ্যা প্ল্যানেট’?


স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে হয়ে গেলো জলবায়ু সন্মেলন ‘কপ২৬’। ২৬তম এই আসরের সাফল্য কতটুকু, তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন ছিল, তেমনি উত্তর মেলেনি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় জলবায়ু সমস্যার সমাধান কিভাবে হবে। গ্লাসগোতে হাজারো পরিবেশবাদীরা বিক্ষোভ করেছে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, একদল বামপন্থীদের প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘ক্যাপিটালিজম ইজ কিলিং দ্যা প্ল্যানেট’; অর্থাৎ ‘পুঁজিবাদ বিশ্বটাকে মেরে ফেলছে’। আসলেই কি তাই? পুঁজিবাদ কি গ্লাসগোর বৈঠকে এই অভিযোগের জবাব দিতে পেরেছে? ‘কপ২৬’ বৈঠকের শুরুতে ছিল বিজ্ঞানীদের আশংকা এবং বৈঠকের শেষে ছিল প্রতিনিধিদের একগুচ্ছ ঐচ্ছিক প্রতিশ্রুতি, যার আন্তরিকতা নিয়ে রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘কপ২৬’ বৈঠকের শুরু হয়েছিল প্রতিশ্রুতির মাঝ দিয়ে; কিন্তু শেষ হয়েছে ক্ষমা চাইবার মাধ্যমে। বৈঠকের শেষে প্রতিনিধিরা একটা সমঝোতায় পৌঁছান ঠিকই। বেশিরভাগ দেশই নতুন করে গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমাবার উচ্চাভিলাসী টার্গেট বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন যে, ইউরোপে শিল্প বিপ্লব শুরুর সময়ের তুলনায় বর্তমানের বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির মাঝে রাখতে না পারলে জলবায়ুগত বিপর্জয় দেখা দেবে। অনেকেই মনে করছেন যে, তাপমাত্রা এই সীমার মাঝে রাখার জন্যে গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন যতটা কমানো দরকার ছিলো, তা ‘কপ২৬’ বৈঠক থেকে প্রতিশ্রুত হয়নি। বৈঠকের শেষ মুহুর্তে ভারত একটা শব্দ পরিবর্তন করে ‘কয়লার ব্যবহার বন্ধ করা’র স্থানে ‘কয়লার ব্যবহার কমানো’কে অন্তর্ভুক্ত করায়। একইসাথে বৈঠকে খনিজ জ্বালানির উপর থেকে ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করার ব্যাপারে সমঝোতা হয়। অনেক দেশ তাদের গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন পুরোপুরি বন্ধ করার টার্গেট ঘোষণা করে। অপরদিকে ধনী দেশগুলি জলবায়ু পরিবর্তনে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলিকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যাপারে পিছু হটে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, আগামী বছর ‘কপ২৭’ বৈঠক বসবে মিশরে; যেখানে গ্রীনহাউজ গ্যাসের প্রধান নির্গমনকারী দেশগুলিকে নতুন টার্গেট দিতে বলা হবে। কিন্তু ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার টার্গেটই যখন ‘লাইফ সাপোর্ট’এ রয়েছে, তখন জলবায়ু নিয়ে আন্দোলন করা গ্রুপগুলি বলছে যে, ‘কপ২৭’ এখনই মৃত।
 
‘কপ২৬’এর প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা বলেন যে, তিনি বৈঠকের ফলাফল নিয়ে গভীর হতাশার ব্যাপারে তিনি অবগত আছেন। তথাপি তিনি বৈঠক থেকে যা পাওয়া গিয়েছে সেটাকে রক্ষা করার জন্যে সকলকে অনুরোধ করেন। কিন্তু সরকারগুলি কিভাবে এগুলি বাস্তবায়ন করবে, সেব্যাপারে অনেকেই দুশ্চিন্তায় আছেন। কারণ এখানে জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে; কোন দেশেরই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নেই।


‘কপ২৬’ ... সাফল্য, নাকি হতাশা?

বৈঠকের শেষ দিন ১৩ই নভেম্বর ‘কপ২৬’এর প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা তার বক্তব্যে বলেন যে, যেভাবে এই বৈঠক চলেছে, তার জন্যে তিনি ‘গভীরভাবে দুঃখিত’। তিনি আরও বলেন যে, তিনি বৈঠকের ফলাফল নিয়ে গভীর হতাশার ব্যাপারে তিনি অবগত আছেন। তথাপি তিনি বৈঠক থেকে যা পাওয়া গিয়েছে সেটাকে রক্ষা করার জন্যে সকলকে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন যে, কয়লার ব্যাপারে এই প্রথমবারের মতো সমঝোতা হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেন যে, তারা শেষ পর্যন্ত এমন একটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছেন, যা ‘গেম চেঞ্জিং’ বা খেলা পরিবর্তন করে ফেলার মতো। তিনি মনে করেন যে, এটা ছিল জলবায়ুর ব্যাপারে বৈশ্বিক চিন্তার একটা বিশাল পরিবর্তন। একইসাথে গ্লাসগোতে কয়লার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, বৈঠকের সাফল্যের মাঝে ছিল কিছু হতাশা। স্বাধীন দেশগুলি যা করতে চায়, তার উপর তারা কোনকিছু চাপিয়ে দিতে পারেন না বলে বলেন তিনি। জনসন একইসাথে বৈঠককে রক্ষা করে বলেন যে, ‘কপ২৬’এর কখনোই জলবায়ু পরিবর্তন বন্ধ করতে পারার কথা নয়। মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, সর্বোচ্চ যেটা করা সম্ভব তা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের দ্রুততাকে কমানো এবং ভবিষ্যতে এটা পরিবর্তন করে ফেলার জন্যে নিজেদের প্রস্তুত করা। ‘ইউরোনিউজ’এর সাথে সাক্ষাতে পরিবেশবাদী সংস্থা ‘গ্রীনপিস’এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর জেনিফার মরগ্যান বলেন যে, দেড় ডিগ্রির টার্গেট কোনমতে বেঁচে আছে; তথাপি কয়লার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়ায় তারা খুশি। তবে তিনি বলেন যে, জলবায়ুর ব্যাপারে সিদ্ধান্তগুলি প্রকৃতপক্ষে পরের বছরের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

‘কপ২৬’ বৈঠকে যেসব সমঝোতা হয়েছে, তা সরকারগুলি কিভাবে বাস্তবায়ন করবে, সেব্যাপারে অনেকেই দুশ্চিন্তায় আছেন। কারণ এখানে জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে; কোন দেশেরই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নেই। ‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জলবায়ু টার্গেটকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে ২০১০ সালের গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ থেকে ৪৫ শতাংশ নির্গমন কমাতে হবে ২০৩০ সালের মাঝেই। সবচাইতে বড় গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনকারী দেশ চীন তাদের নির্গমন শূণ্যে নিয়ে আসার টার্গেট দিয়েছে ২০৬০ সালের মাঝে; তবে তারা কয়লার ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি হয়নি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নির্গমনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রও ২০৫০ সালের মাঝে নির্গমন শূণ্যে নামানোর টার্গেট দিলেও কলয়ার ব্যবহার শূণ্য করতে নারাজ। তৃতীয় সর্বোচ্চ নির্গমনকারী ভারত ২০৭০ সালের মাঝে নির্গমন শূণ্য করতে চায়। ‘কপ২৬’এ কয়লার ব্যাপারে কেবলমাত্র তাদের শক্ত অবস্থানই মিডিয়াতে এসেছে। চতুর্থ সর্বোচ্চ নির্গমনকারী দেশ রাশিয়া ২০৬০ সালের টার্গেট দিয়েছে; কয়লার ব্যাপারে তারাও একই অবস্থানে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনকারী চারটা দেশ কয়লা ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি হয়নি। আর ‘কপ২৬’ সন্মেলনে চীনা নেতা শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যোগদানই করেননি। কাজেই বৈঠকের বাধ্যবাধকতাহীন সমঝোতাগুলির ব্যাপারে দেশগুলির দৃষ্টিভঙ্গি যে খুব বেশি একটা কঠোর নয়, তা বোধগম্য।
 
স্থবির জনসংখ্যার পশ্চিমা দেশগুলি কনজিউমার সংস্কৃতির প্রসারের মাধ্যমেই নিজেদের অর্থনীতিকে চালিয়ে নিচ্ছে। আর সেসব অর্থনীতির উপরেই রচিত হয়েছে দরিদ্র দেশগুলির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। মাথাপিছু জিডিপি বৃদ্ধির লক্ষ্য দরিদ্র এই দেশগুলির মানুষের জন্যে জলবায়ু রক্ষার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলির জন্যে কনজিউমারিজমের মাধ্যমে নিজেদের লাইফস্টাইল জারি রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ তা হলো পশ্চিমা পুঁজিবাদী অর্থনীতির জ্বালানি। জলবায়ুকে বাঁচাবার চেষ্টা এক্ষেত্রে পুঁজিবাদী অর্থনীতির উপর লাগাম। 


জলবায়ু সমস্যার দায় কার?

‘ইয়াহু নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে ‘ওয়ার্ল্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে যে, বৈশ্বিক গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের ৭৩ শতাংশই আসে জ্বালানি থেকে। এই জ্বালানির বেশিরভাগ যায় শিল্প, বাড়িঘর উষ্ণকরণে এবং পরিবহণে। সেই তুলনায় কৃষিখাতে নির্গমন মাত্র ১৮ শতাংশ। কেবলমাত্র পরিবহণ খাতেই নির্গমন ১৬ শতাংশ। ১৮৫০ সাল থেকে বায়ুমন্ডলে যত গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন হয়েছে, তার ২০ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের নির্গমন সকল বাঁধ ভেঙ্গে ফেলেছে। চীনের অর্থনীতি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কয়লা পুড়িয়েই চীনারা পশ্চিমা বিশ্বের জন্যে স্বল্প খরচে পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করে চলেছে। এখন পশ্চিমারাই চীনাদেরকে বলছে গ্রীনহাউজ গ্যাসের নির্গমন কমাতে। তবে চীনা শহরগুলির ব্যাপক বায়ুদূষণ চীনাদেরকেও বিচলিত করেছে।

অর্থনীতি এবং জলবায়ুকে পুঁজিবাদের পাল্লায় মাপতে গিয়ে জলবায়ু সর্বদাই হেরেছে। ‘কপ২৬’এর আগে আরও ২৫টা সন্মেলন হয়েছে; কিন্তু জলবায়ু কখনোই প্রাধান্য পায়নি। গ্রীনহাউজ গ্যাসের বেশিরভাগটাই যখন পশ্চিমা দেশগুলির শিল্পবিপ্লবের কারণে নির্গমন হয়েছে, তখন সারা বিশ্বের সকল দরিদ্র দেশের মাথার উপর গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন শূণ্য করার টার্গেট বেঁধে দেয়াটা কপটতারই উদাহরণ। কারণ দরিদ্র এই দেশগুলির বেশিরভাগই পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানি করে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। আর এই রপ্তানি তাদের গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের পিছনে যথেষ্টই দায়ি। পশ্চিমা দেশগুলির কনজিউমার সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে বহু দেশ তাদের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলিকে গড়ে তুলেছে। স্থবির জনসংখ্যার পশ্চিমা দেশগুলি কনজিউমার সংস্কৃতির প্রসারের মাধ্যমেই নিজেদের অর্থনীতিকে চালিয়ে নিচ্ছে। আর সেসব অর্থনীতির উপরেই রচিত হয়েছে দরিদ্র দেশগুলির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। মাথাপিছু জিডিপি বৃদ্ধির লক্ষ্য দরিদ্র এই দেশগুলির মানুষের জন্যে জলবায়ু রক্ষার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলির জন্যে কনজিউমারিজমের মাধ্যমে নিজেদের লাইফস্টাইল জারি রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ তা হলো পশ্চিমা পুঁজিবাদী অর্থনীতির জ্বালানি। জলবায়ুকে বাঁচাবার চেষ্টা এক্ষেত্রে পুঁজিবাদী অর্থনীতির উপর লাগাম। খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ‘কপ২৬’এর সাফল্য দাবি করেন; অথচ জলবায়ু সমস্যার মূলে থাকা কনজিউমারিজম নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকেন। জলবায়ু বাঁচাতে তিনি কিভাবে ব্রিটিশ নাগরিকদেরকে লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে খরচ কমাতে বলবেন? আর কিভাবেই বা তিনি পুঁজিবাদকে সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে দেয়া ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়ে স্বীকার করে নেবেন যে, ‘ক্যাপিটালিজম ইজ কিলিং দ্যা প্ল্যানেট’?

Friday, 3 December 2021

রাশিয়া কি ইউক্রেন আক্রমণ করবে?

৪ঠা ডিসেম্বর ২০২১

 

ইউক্রেন বলছে রাশিয়া তার সীমানায় ৯০ হাজারেরও বেশি সেনা মোতায়েন করেছে। রাশিয়া যেমন গত এপ্রিলে সামরিক শক্তি মোতায়েন করে হুমকি তৈরি করার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে আলোচনায় আনতে পেরেছিল, ঠিক সেটাই তারা আবারও করতে চাইছে। রাশিয়া চাইছে ইউরোপ তাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিক। কিন্তু রাশিয়াকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়ার অর্থ হলো ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অবান্তর হয়ে যাওয়া।


২রা ডিসেম্বর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ‘অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি এন্ড কোঅপারেশন ইন ইউরোপ’ বা ‘ওএসসিই’র এক অনুষ্ঠানে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেনএর সাথে বৈঠকের আগে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেন যে, ইউরোপ হয়তো সামরিক সংঘাতের দুঃস্বপ্নের দিকে ফেরত যেতে চলেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ল্যাভরভ ইউরোপের সাথে নতুন নিরাপত্তা চুক্তি করার প্রস্তাব দেন; যার মূল স্তম্ভ হলো ন্যাটোর পূর্বদিকে সম্প্রসারণ রোধ করা। তিনি আরও বলেন যে, ন্যাটো দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে রাশিয়ার সীমানার কাছে পোল্যান্ড এবং রোমানিয়াতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো তৈরি করেছে। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই বৈঠক এমন সময়ে হলো, যখন ইউক্রেন বলছে যে, রাশিয়া ইউক্রেনের সীমানার কাছে ৯০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। মস্কো বলছে যে, ইউক্রেনের উপর হামলা করার কোন উদ্দেশ্য তাদের নেই; উল্টো ইউক্রেনেই তাদের পূর্ব সীমানায় সামরিক শক্তি মোতায়েন করছে, যেখানে রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে ২০১৪ সাল থেকে ডনবাস অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে। বৈঠকের পর মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব ব্লিনকেন বলছেন যে, ইউক্রেনের সাথে সংঘাতে জড়ালে রাশিয়াকে মারাত্মক পরিণতি গুণতে হবে।

উভয় পক্ষের উত্তেজক বক্তব্যের মাঝে উত্তেজনা প্রশমণের কথাও আসছে। রুশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ রুশ বার্তা সংস্থাকে বলছেন যে, দুই দেশের প্রেসিডেন্টের মাঝে আলোচনা চাইছেন তারা; যদিও এখনও আলোচনার সিডিউল ঠিক হয়নি। তিনি আরও বলেন যে, দুই নেতার এই বৈঠক খুবই জরুরি; কারণ সমস্যাগুলি ঘনীভূত হচ্ছে। ব্লিনকেনও দুই প্রেসিডেন্টের আলোচনার ব্যাপারে আশাবাদী।

এন্টনি ব্লিনকেন বলছেন যে, ইউক্রেন রাশিয়ার জন্যে কোন হুমকি নয়; বরং একমাত্র হুমকি হলো ইউক্রেনের প্রতি রাশিয়ার হুমকি। কিন্তু ৩০শে নভেম্বর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক বিনিয়োগ সন্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন যে, ইউক্রেনে দূরপাল্লার অস্ত্র মোতায়েন রাশিয়ার জন্যে ‘লাল দাগ’ অতিক্রম করার মতোই ঠেকবে। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, ইউক্রেনের মাটিতে কোন আক্রমণাত্মক অস্ত্র মোতায়েন করা হলে তা ৭ থেকে ১০ মিনিটের মাঝে মস্কোতে হামলা করতে পারবে। আর হাইপারসনিক অস্ত্র ব্যবহার করলে তা মাত্র ৫ মিনিটের মাঝেই মস্কো পৌঁছাবে। তিনি পোল্যান্ড এবং রোমানিয়াতে ‘ঈজিস এশোর’ ব্যলিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, এই ব্যবস্থার মাঝে ‘মার্ক ৪১’ ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার ব্যবস্থা রয়েছে; যার মাধ্যমে শুধুমাত্র বিমান বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রই নয়, একই ব্যবস্থা ব্যবহার করে ‘টোমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ছোঁড়া সম্ভব। ‘ঈজিস’ হলো মার্কিন নৌবাহিনীর ‘আরলেই বুর্ক-ক্লাস’ ডেস্ট্রয়ারগুলিতে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ‘মার্ক ৪১’ ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়ন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। মাল্টিপারপাস এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একইসাথে বিমান ধ্বংসী, সাবমেরিন ধ্বংসী এবং জাহাজ ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও ভূমির টার্গেট ধ্বংস করার জন্যে তৈরি করা ‘টোমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও বহণ করা যায়; যার পাল্লা ১৩’শ থেকে আড়াই হাজার কিঃমিঃ পর্যন্ত। পুতিন ন্যাটোকে পোল্যান্ড বা রোমানিয়ার মতো ইউক্রেনেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করার ব্যাপারে সাবধান করেন। তিনি বলেন যে, এমতাবস্থায় মস্কোর সামনে একটাই পথ খোলা থাকবে; আর তা হলো, শত্রুর বিরুদ্ধে একই ধরনের একটা হুমকি তৈরি করা। আর সেটা করার সক্ষমতা বর্তমানে রাশিয়ার রয়েছে।

 

রোমানিয়াতে ২০১৬ সালে 'ঈজিস এশোর' ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়। রাশিয়া বলছে যে, এই ব্যবস্থা থেকে একইসাথে 'টোমাহক' ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও মোতায়েন করা সম্ভব। চীনকে নিয়ন্ত্রণ করাই যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য, তখন ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার সাথে পিছিয়ে পরাটাও যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে পারছে না। পূর্ব ইউরোপে অত্যাধুনিক অস্ত্র মোতায়েন করাটা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি নয়, বরং সামরিক দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। কারণ এই অস্ত্রের সাথে রিজার্ভ এবং ন্যাশনাল গার্ডের সেনাদের মোতায়েন করে ইউরোপ থেকে শক্তিশালী ইউনিটগুলি সরিয়ে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা হচ্ছে।


মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে ব্যবহৃত অস্ত্রকে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে; যার মাধ্যমে সাধারণ একটা অস্ত্র কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। গত অক্টোবরে মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘লকহিড মার্টিন’ নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ বা ‘পিআরএসএম’এর পঞ্চম পরীক্ষা চালিয়েছে। সামরিক ম্যাগাজিন ‘আর্মি টেকনলজি’ বলছে যে, এবারে তারা সেনাবাহিনী এবং ম্যারিন কোরের ব্যবহৃত হাল্কা রকেট আর্টিলারির ব্যবস্থাটাকে ব্যবহার করেছে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার জন্যে। ‘হাই মোবিলিটি রকেট আর্টিলারি সিস্টেম’ বা ‘হিমারস’ নামে পরিচিত ১৬ টন ওজনের এই রকেট আর্টিলারি ব্যবস্থাকে ‘সি ১৩০’ সামরিক পরিবহণ বিমানে করে পরিবহণ করা সম্ভব। ‘পিআরএসএম’ হলো এমন একটা ক্ষেপণাস্ত্র, যা বর্তমানে মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত সর্বোচ্চ ৩’শ কিঃমিঃ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ‘এমজিএম ১৪০ এটাকমস’এর পাল্লাকে দ্বিগুণ করার জন্যে ডেভেলপ করা হচ্ছে। একটা ‘সি ১৩০’ বিমান ব্যবহার করে এরকম একটা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে যেকোন স্থানে খুব দ্রুত মোতায়েন করা সম্ভব; যেখান থেকে তা ৫’শ কিঃমিঃএর অধিক পাল্লার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারবে। গত ফেব্রুয়ারিতে রোমানিয়ার সেনাবাহিনী ‘হিমারস’ রকেট আর্টিলারির প্রথম চালানটি পায় বলে বলছে রোমানিয়ার মিডিয়া ‘এগারপ্রেস’। ২০১৮ সালে পোল্যান্ডও ৫৬টা ‘হিমারস’ অর্ডার করে। এই রকেট ব্যবস্থাগুলি একাধারে যেমন বিমানে করে যেকোন স্থানে মোতায়েন করা সম্ভব, তেমনি এগুলি থেকে ৩’শ কিঃমিঃ পাল্লার ‘এটাকমস’ ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও ভবিষ্যতে ৫’শ কিঃমিঃএর বেশি পাল্লার ‘পিআরএসএম’ও ছোঁড়া সম্ভব। মার্কিন সেনাবাহিনীর অফিসার মেজর ব্রেনান ডেভেরাউ ‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন’এর প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক লেখায় রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় পূর্ব ইউরোপে ‘হিমারস’ মোতায়েনের কথা বলেন। তার মতে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার সাথে সাথে খুব স্বল্প বিনিয়োগেই যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে ডিটারেন্ট তৈরি করতে পারবে।

রুশ এবং মার্কিন কর্মকর্তারা উত্তেজক মন্তব্য করলেও উভয় পক্ষই দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের আলোচনা দেখতে চাইছে। একে অপরকে সামরিক শক্তি মোতায়েনের জন্যে অভিযুক্ত করলেও কেউই যুদ্ধ চাইছে না। তথাপি রাশিয়া যেমন গত এপ্রিলে সামরিক শক্তি মোতায়েন করে হুমকি তৈরি করার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে আলোচনায় আনতে পেরেছিল, ঠিক সেটাই তারা আবারও করতে চাইছে। রাশিয়া চাইছে ইউরোপ তাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিক। কিন্তু রাশিয়াকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়ার অর্থ হলো ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অবান্তর হয়ে যাওয়া। চীনকে নিয়ন্ত্রণ করাই যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য, তখন ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার সাথে পিছিয়ে পরাটাও যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে পারছে না। পূর্ব ইউরোপে অত্যাধুনিক অস্ত্র মোতায়েন করাটা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি নয়, বরং সামরিক দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। কারণ এই অস্ত্রের সাথে রিজার্ভ এবং ন্যাশনাল গার্ডের সেনাদের মোতায়েন করে ইউরোপ থেকে শক্তিশালী ইউনিটগুলি সরিয়ে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা হচ্ছে।