Wednesday, 1 September 2021

যুক্তরাষ্ট্র … আফগানিস্তানের পর

১লা সেপ্টেম্বর ২০২১

যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেকে দুনিয়ার আদর্শিক নেতৃত্বের অবস্থানে দেখতে চাইছে না। আফগানিস্তান ছেড়ে আসার ঘটনা এই ব্যাপারটাকে আরও পরিষ্কার করলো। মার্কিনীরা এখন অনেক ‘জাতীয়তাবাদী; তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত থেকে বাকি দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’ হতে চাইছে না। তবে যেহেতু কোন একক শক্তি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত হবার মতো অবস্থানে নেই, তাই বিশ্বকে হয়তো নতুন নেতৃত্বের জন্যে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

 
আফগানিস্তান ছেড়ে আসার পর বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আসলে কি হবে? এ নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন।

মার্কিন চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রীডম্যান থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’এর এক লেখায় বলছেন যে, ২০ বছর যুদ্ধ করে হেরে যাবার পরেও যুক্তরাষ্ট্রে কেউ কেউ চাইছেন যুদ্ধ চালিয়ে নিতে। কিন্তু তিনি মনে করছেন না যে, আরও ২০ বছর যুদ্ধ করলেও জয়ের দেখা মিলবে; কেননা, সফলতার সংজ্ঞাই এখানে অস্পস্ট এবং অতিরিক্ত রকমের উচ্চাভিলাসী। এর লক্ষ্য ছিল একটা সমাজকে তাদের জীবনযাত্রা থেকে পরিবর্তিত করে মার্কিনীরা যেমন চায় সেরকম করে গড়ে তোলা। কিন্তু এই অঞ্চলের বহু যুদ্ধরত গ্রুপগুলিকে যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং নতুন একটা সংস্কৃতির জন্ম দেয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাধ্যের বাইরে। ফ্রীডম্যান বলছেন যে, সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র যেমন চেয়েছিল পশ্চিমা লিবারাল আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে, ঠিক একইভাবে আফগানিস্তানের যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে আফগানদের সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করতে। শক্তি প্রয়োগে দেশটার মাত্র কিছু অংশকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আবার আফগানদের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল পশ্চিমা লিবারাল আদর্শ থেকে অনেক আলাদা। আফগানরা তাদের নৈতিকতাকেই সঠিক মনে করেছে; তাই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আফগানদের নৈতিকতা পরিবর্তন করে তাদেরকে পশ্চিমা ধাঁচের নৈতিকতাতে নিয়ে আসা ছিল দুষ্কর।

মার্কিন সামরিক কন্ট্রাক্টর ‘ব্ল্যাকওয়াটার’এর প্রতিষ্ঠাতা এরিক প্রিন্স মার্কিন টিভি চ্যানেল ‘ফক্স নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, ডেমোক্র্যাটরা বলছিলেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর ক্ষতি করেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একা একা আফগানিস্তান ছেড়ে আসার ঘোষণা ন্যাটোর যতটুকু বাকি রয়েছে, তাও ধ্বংস করবে। যুক্তরাষ্ট্রের উপর তার ইউরোপিয় মিত্রদের আস্থা চলে গেছে। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স যদি কোন দেশে তাদের লোক নিয়োগ করতে চায়, অথবা কোন দেশকে চীনের বিপক্ষে দাঁড়াতে বলে, তাহলে তারা চিন্তা করবে যে, যুক্তরাষ্ট্র তার বন্ধুদেরকে কিভাবে ফেলে চলে যায়। মার্কিন ডলার দুনিয়ার রিজার্ভ মুদ্রা, কারণ এর পিছনে রয়েছে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে ডলার ছাপিয়ে। এখন সারা দুনিয়াতে যদি মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব নিঃশেষ হয়ে আসে, তাহলে তা মার্কিন ডলারের উপর দুনিয়ার জনগণের আস্থাকেও প্রভাবিত করবে। এর ফলশ্রুতিতে মার্কিন অর্থনীতি এবং জীবনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এমন একটা জাতির কাছে পরাজিত হয়, যারা কিনা ৭০ বছরের পুরোনো অস্ত্র ব্যবহার করছে এবং চিন্তাধারার দিক থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীতে রয়েছে, তাহলে বুঝতে হবে যে, মার্কিন সামরিক সক্ষমতা যতটা মনে করা হয়, ততটা নয়। সেখানে যতটা সার্ভেইল্যান্সই থাকুক না কেন, তা সেখানকার সমাজের বাস্তবতাতে কতটা পরিবর্তন করতে পারলো, সেটাই আসল কথা। করোনাভাইরাসকে যখন অনেক বড় হুমকি বলে বলা হচ্ছে, তখন এটা মনে রাখা উচিৎ যে, তালিবানরা কোন মাস্ক না পড়েই পুরো দেশ জয় করে নিয়েছে। এই মহামারি তাদেরকে জয়কে খুব একটা আটকাতে পারেনি।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, আফগানিস্তান থেকে সড়ে আসার সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কি হওয়া উচিৎ, তা নিয়ে কথা হচ্ছে। বহুকাল যাবত মার্কিনীরা মেনেই নিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’। কিন্তু এখন সেই চিন্তায় পরিবর্তন হয়েছে। সারা দুনিয়াব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র উন্মুক্ত সমাজ, আইনের শাসন, মানবাধিকারের মতো পশ্চিমা আদর্শগুলিকে প্রতিষ্ঠা করেছে। মার্কিন জনগণ প্রশ্ন করা শুরু করেছে যে, তারা মার্কিন সরকারকে যেসকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার জন্যে নির্বাচিত করছে, তা তারা বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। উল্টো বহু অভিবাসী সেদেশে ঢুকে পড়ছে এবং সমাজকে পরিবর্তন করে ফেলছে। স্ট্যাচু অব লিবার্টির চিন্তাগুলি হঠাত করেই বহু আমেরিকানের কাছে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে না। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তাতেই সহিংসতা থামছে না, সেখানে অন্য দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে যাওয়া কেন? বাকি দুনিয়ার কাছে উদাহরণ হতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের জনগণের দেখাশুনা করতে হবে। ব্রেমার বলছেন যে, যদিও বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান বলবত থাকবে, তথাপি যুক্তরাষ্ট্র যে দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’, সেই চিন্তাটা একটা বড় ধাক্কা খেলো। এখন জাতীয়তাবাদী চিন্তাটাই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার নিরাপত্তার জন্যে কাজ করবে মার্কিন জনগণের স্বার্থে। অর্থাৎ যেখানে মার্কিন জনগণ নিজেদের সুবিধা দেখবে না, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নাক গলাবে না। ২০২১ সাল পর্যন্ত মার্কিনীরা মনে করেছে যে, তাদের আদর্শ দুনিয়ার বাকি আদর্শের চাইতে উন্নততর। কিন্তু বর্তমানে মার্কিন আদর্শ আসলে কোনটা, সেটাই কেউ নিশ্চিতভাবে বলছে পারছে না। তবে মার্কিন মিত্ররাও সমস্যায় রয়েছে; যেকারণে তারাও যুক্তরাষ্ট্রের ছেড়ে আসা জায়গাগুলি অত সহজে পূরণ করতে পারবে না। অপরদিকে চীনারা তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করলেও চীনারা যুক্তরাষ্ট্রের ছেড়ে আসা স্থান নিয়ে নেবে, এটা ভাবার পক্ষে কোন যুক্তিই নেই। রুশরাও সেটা করবে না। নেতৃত্ব হয়ে উঠছে আঞ্চলিক; বৈশ্বিক নয়। এতে আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়বে। ওবামা, ট্রাম্প বা বাইডেন সকলেই চাপের মাঝে পড়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এতকাল যে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সমর্থন করছে না। অনেকেই মনে করেছিলেন যে, ট্রাম্পের উত্থান একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা; কাঠামোগত পরিবর্তন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা বলে দিচ্ছে যে, আসল ব্যাপার তার ঠিক উল্টোটা।

এক টুইটার বার্তায় জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হলো একটা আদর্শিক প্রকল্প। যেকোন আদর্শিক প্রকল্পের মতোই সে নিজের আদর্শকে অন্যের আদর্শ থেকে উন্নততর মনে করে। তবে আদর্শিক কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সামরিক হস্তক্ষেপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়; এবং এর শেষ প্রায় কখনোই ভালো হয় না। ফ্রীডম্যান, প্রিন্স এবং ব্রেমারের কথা থেকে পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেকে দুনিয়ার আদর্শিক নেতৃত্বের অবস্থানে দেখতে চাইছে না। আফগানিস্তান ছেড়ে আসার ঘটনা এই ব্যাপারটাকে আরও পরিষ্কার করলো। মার্কিনীরা এখন অনেক ‘জাতীয়তাবাদী; তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত থেকে বাকি দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’ হতে চাইছে না। তবে যেহেতু কোন একক শক্তি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত হবার মতো অবস্থানে নেই, তাই বিশ্বকে হয়তো নতুন নেতৃত্বের জন্যে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

Monday, 30 August 2021

ইউরেশিয়া ... আফগানিস্তানের পর

৩০শে অগাস্ট ২০২১

ছবিঃ নভেম্বর ২০২০। কাতারের দোহায় তুর্কমেনিস্তানের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় বসেছেন তালিবান প্রতিনিধিরা। তুর্কমেনিস্তান চাইছে তার বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদকে দক্ষিণ এশিয়াতে বিক্রি করতে। আর আফগানিস্তান চাইছে এই লক্ষ্যে তুর্কমেনিস্তানকে একটা করিডোর দিতে।


আফগানিস্তানের উত্তরপূর্বের বাদাখশান প্রদেশ একসময় পৃথিবী বিখ্যাত ছিল কিছু দামী পাথরের জন্যে। নীল রঙের এই পাথরগুলির নাম লাপিস লাজুলি। মধ্যযুগে এই পাথর ইউরোপে রপ্তানি হতো; যেখানে এই পাথর গুঁড়ো করে ‘আলট্রাম্যারিন’ নামে একপ্রকারের নীল রঙ তৈরি করা হতো। এই রঙ দামি পেইন্টিংএ ব্যবহার করা হতো। আফগানিস্তান থেকে ইউরোপ পর্যন্ত যাবার প্রাচীন বাণিজ্যপথটাকে উপজীব্য করেই বর্তমানে আফগানিস্তান থেকে তুরস্ক পর্যন্ত ‘লাপিস লাজুলি করিডোর’ নামে একটা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। এই করিডোরের মাধ্যমে শুধু আফগানিস্তান নয়, আফগানিস্তানের পূর্বে দক্ষিণ এশিয়াকে স্থলপথে যুক্ত করা হবে ইউরোপের সাথে। একইসাথে এই করিডোর প্রাচীন ‘সিল্ক রোড’এর উপরে তৈরি চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’ প্রকল্পের সাথে যুক্ত হবে। এই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো আফগানিস্তান; যেখানে এখন তালিবানরা ক্ষমতা নিয়েছে। গত ১৫ই অগাস্ট কাবুলে মার্কিন দূতাবাস হেলিকপ্টারের মাধ্যমে খালি করার পর এই বিশাল কৌশলগত করিডোরের ভবিষ্যৎ কি হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একইসাথে আলোচনা হচ্ছে আফগানিস্তানের ঘটনাগুলি এই করিডোরের উপর অবস্থিত দেশগুলিকে কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

আফগানিস্তান থেকে তুর্কমেনিস্তান

মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় মধ্য এশিয়া বিশ্লেষক প্রাক্তন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা পল গোবল বলছেন যে, আফগানিস্তানের যুদ্ধে তালিবানের বিজয় এবং সেখান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে রাশিয়া এবং চীনসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলি বিচলিত হয়েছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সবগুলিই কঠোর একনায়কোচিত শাসনের অধীনে থাকায় এবং প্রতিটা দেশেই দীর্ঘমেয়াদী ইসলামী আন্দোলন থাকার কারণে রাশিয়া এবং চীন নিজেদের অবস্থানকে নতুন করে সাজাতে চাইছে। চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট গিয়েছে মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে। আর মধ্য এশিয়া থেকে চীনের জ্বালানির একটা বড় অংশ আসে। এছাড়াও চীনের আরেকটা বড় চিন্তা হলো শিনজিয়াং বা উইঘুর প্রদেশকে নিয়ে। মুসলিম অধ্যুষিত এই প্রদেশে চীনা সরকারের নিপীড়ন যখন চলমান, তখন চীনারা দুশ্চিন্তায় রয়েছে যে, আফগানিস্তানে তালিবানদের বিজয় চীনের মুসলিমদেরকে অনুপ্রাণিত করবে কিনা। রাশিয়া ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের উত্তরে তাজিকিস্তান এবং কিরগিজস্তানে নিজেদের সামরিক অবস্থানকে সুসংহত করতে শুরু করেছে এবং ‘কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা ‘সিএসটিও’র অধীনে থাকা মধ্য এশিয়ার চারটা দেশের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। এই দেশগুলির সীমান্ত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। রাশিয়ার মূল ফোকাসই হলো সামরিক নিরাপত্তা। তবে এখানে রাশিয়ার সবচাইতে বড় দুর্বলতা হলো মধ্য এশিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ দেশ তুর্কমেনিস্তান তার জন্মের পর থেকেই ‘নিরপেক্ষতা’র নীতিতে এগুবার কারণে দেশটা রাশিয়ার নেতৃত্বে তৈরি হওয়া ‘সিএসটিও’র সদস্য নয়। তাই রাশিয়া চাইছে যে, তুর্কমেনিস্তান ‘সিএসটিও’র সদস্য হিসেবে নাম লিখিয়ে নিক এবং রুশ সহায়তা নিয়ে আফগানিস্তানের সাথে দেশটার প্রায় ৭’শ কিঃমিঃ সীমানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক।

তবে তুর্কমেনিস্তান থেকে পুরোপুরি ভিন্নরকম খবর আসছে। ২০২০এর নভেম্বরেই কাতারের রাজধানী দোহাতে তুর্কমেন কর্মকর্তারা তালিবান প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেছেন। কাবুলের মার্কিন দূতাবাস খালি করার তিন দিন পর ১৮ই অগাস্ট আফগানিস্তানের উত্তরের শহর মাজার ই-শরীফে তুর্কমেনিস্তানের কনসাল বালখ প্রদেশের তালিবানদের নতুন প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাত করেন। তুর্কমেনিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এই আলোচনাকে অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ এবং গঠনমূলক বলে উল্লেখ করা হয়। এতে দুই দেশের সম্পর্ককে ভ্রাতৃসুলভ বলেও বলা হয়। একই দিনে আফগানিস্তানের পশ্চিমের শহর হেরাতেও তুর্কমেনিস্তানের প্রতিনিধির সাথে তালিবান প্রতিনিধির সাক্ষাত হয়। ১৮ই অগাস্ট তুর্কমেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, আফগানিস্তানের সাথে সীমান্তে রাস্তা এবং রেললাইন খোলা রয়েছে এবং সেখানে স্বাভাবিক কর্মকান্ড চলছে। ‘ইউরেশিয়ানেট’এর এক প্রতিবেদনে তুর্কমেনিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের এই ‘হৃদ্যতাপূর্ণ’ সম্পর্ককে উভয় পক্ষের বাস্তববাদী চিন্তার ফলাফল বলা হচ্ছে। এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশী মধ্য এশিয়ার চারটা দেশ ঘুরে এসেছেন। তিনি আফগানিস্তানের আশেপাশের সকল দেশকে তালিবানদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে অনুরোধ করেছেন। ১৭ই অগাস্ট তালিবান প্রতিনিধি সুহাইল শাহীন ব্রিটেনের ‘স্কাই নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান এবং ভারত পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে কথা বলেন, যা ‘টিএপিআই’ বা ‘টাপি’ পাইপলাইন বলে পরিচিত। একইসাথে তুর্কমেনিস্তানের সাথে রেলযোগাযোগ প্রকল্পকেও তিনি প্রাধান্য দেবার কথা বলেন। এগুলির কর্মযজ্ঞ খুব শীঘ্রই শুরু হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সুহাইল শাহীন আফগানিস্তানকে মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে সেতু বলে আখ্যা দেন। এছাড়াও এবছরেই তালিবান প্রতিনিধি তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশগাবাদ ঘুরে আসেন এবং তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত বিদ্যুৎ রপ্তানির জন্যে গ্রিডলাইন প্রকল্পের কথাও আলোচনা করেন বলে বলছে জ্বলানি বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘আপস্ট্রিম’।

তুর্কমেনিস্তান চাইছে তার বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে। এই লক্ষ্যে দেশটার নেতৃত্ব শুধু চীনের বাজারের উপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। ‘টাপি’ পাইপলাইনের মাধ্যমে তুর্কমেনিস্তানের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের ‘গালকাইনিশ’ খনি থেকে পাকিস্তান এবং ভারত পর্যন্ত বছরে ৩৩ বিলিয়ন কিউবিক মিটার বা বিসিএম গ্যাস রপ্তানির চিন্তা করা হচ্ছে। এই গ্যাসের ৫ বিসিএম পাবে আফগানিস্তান; বাকি ২৮ বিসিএম সমভাবে বন্টিত হবে পাকিস্তান এবং ভারতের মাঝে। এই প্রকল্পে ১৮’শ ৪০ কিঃমিঃ পাইপলাইনের মাঝে প্রায় ১৬’শ কিঃমিঃ থাকবে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে। এর শেষ প্রান্ত থাকবে পাকিস্তানের সাথে ভারতের সীমান্ত শহর ফাজিলকাতে। তুর্কমেনিস্তানের আরেকটা প্রকল্প হলো কাস্পিয়ান সাগর, ককেশাস এবং তুরস্ক হয়ে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়া এবং ইরানের যথেষ্ট আপত্তি রয়েছে। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে রাশিয়া এবং ইরানকে বাইপাস করে তুর্কমেন গ্যাস ইউরোপে রপ্তানি হবে।
 
ছবিঃ আজেরবাইজানের আলাত সমুদ্রবন্দর। আজেরবাইজান এই বন্দর তৈরি করেছে মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সাথে যুক্ত হবার জন্যে। তুর্কমেনিস্তানের রেললাইন এবং সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আফগানিস্তান এই বন্দরের সাথে যুক্ত হয়েছে।


কাসপিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে তুরস্ক এবং ইউরোপে

তুর্কমেনিস্তানের পশ্চিমে রয়েছে কাসপিয়ান সাগর। স্থলবেষ্টিত একটা হ্রদ হলেও এটাকে সাগর বলেই আখ্যা দেয়া হয়। তবে এটাকে আইনগতভাবে হ্রদ বলা হবে, নাকি সাগর বলা হবে, সেব্যাপারে এর উপকূলবর্তী পাঁচটা দেশের মাঝে বিরোধ ছিল। রাশিয়া এবং প্রাক্তন সোভিয়েত রিপাবলিক কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং আজেরবাইজান কাসপিয়ানকে সাগর বলতে চাইছিল; ইরান বলতে চাইছিল এটা একটা হ্রদ। ইরান চাইছিল এই ‘হ্রদ’এর পুরোটা আই পাঁচ দেশের মাঝে সমভাবে বন্টন করে দেয়া হোক। এতে এক দেশ আরেক দেশের অংশে প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু রাশিয়া এতে রাজি ছিল না। কারণ এতে রাশিয়ার কাসপিয়ান সাগরের নৌবহর পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যেতো। শেষ পর্যন্ত দুই দশক আলোচনার পর ইরান রাশিয়ার সিদ্ধান্তই মেনে নিতে বাধ্য হয়। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ‘হ্রদ’ ঘোষণা না দেয়ায় ইরানই হয়তো এই চুক্তিতে কিছু হারিয়েছে। তবে চুক্তিতে যেহেতু বলা হয়েছে যে, স্বাক্ষরকারী পাঁচ দেশ ব্যতীত কাসপিয়ানে আর কোন দেশের সামরিক অবস্থান থাকবে না, সেদিক থেকে ইরান হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। অপরদিকে তুর্কমেনিস্তান এবং আজেরবাইজান ‘সাগর’ ঘোষণায় খুশি হয়েছে। কারণ এতে তারা পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলিকে কাসপিয়ানের তলদেশ দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন তৈরি করতে ডাক দিতে পারবে। অর্থাৎ তুর্কমেনিস্তান তার বিশাল গ্যাস সম্পদ আজেরবাইজান, জর্জিয়া এবং তুরস্ক হয়ে ইউরোপে রপ্তানি করতে পারবে।

স্থলবেষ্টিত তুর্কমেনিস্তান সমুদ্র নিয়ে চিন্তা শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। তাদের উদ্দেশ্য হলো মধ্য এশিয়ার অন্যান্য স্থলবেষ্টিত দেশগুলিকে তুর্কমেনিস্তানের মাধ্যমে তুরস্ক, ইউরোপ এবং ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত করা। এই লক্ষ্যে ২০১৩ সালের অগাস্টে তুর্কি সহায়তায় তুর্কমেনিস্তান কাসপিয়ান সাগরের তীরে তুর্কমেনবাশি সমুদ্রবন্দর তৈরি শুরু করে। ২০১৮ সালের মে মাসে তুর্কমেন প্রেসিডেন্ট গুরবাঙ্গুলি বারদিমুহামেদভ প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার খরচে নির্মিত এই সমুদ্রবন্দর উদ্ভোধন করেন। প্রায় সমান্তরালে আরেকটা প্রকল্পে হাত দেয় তুর্কমেনিস্তান। দেশটার পূর্বে আফগানিস্তানের সীমান্ত পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে। তিন বছরের মাঝে তুর্কমেনিস্তান নিজেদের অংশের লাইনের নির্মাণ শেষ করে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরের ৩০ কিঃমিঃ লাইন নির্মাণ শুরু করে। এই লাইন উদ্ভোধন করা হয় ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে। এর মাধ্যমে আফগানিস্তান যুক্ত হয়ে যায় কাসপিয়ান সাগরে তুর্কমেনবাশি সমুদ্রবন্দরের সাথে। এছাড়াও কাজাখস্তানও কাসপিয়ানের উপকূলে আকটাউ বন্দরের ১’শ কিঃমিঃ দক্ষিণে কুরিক রেল ফেরি টার্মিনাল চালু করে ২০১৬ সালে। ‘কাসপিয়ান নিউজ’ বলছে যে, এই বন্দর তৈরি করার সময় নির্মাতারা খেয়াল রাখছিলেন কাসপিয়ানের ওপাড়ে আজেরবাইজানের আলাত বন্দরের দিকে; যাতে করে কুরিকের রেলগাড়িগুলি আলাতে ওঠানামা করা যায়।


ছবিঃ অগাস্ট ২০২১। তুরস্কের সহায়তায় নির্মিত তুর্কমেনিস্তানের অত্যাধুনিক কর্ভেট ‘দেনিজ খান’। কাসপিয়ান সাগরের মাঝ দিয়ে তৈরি করা অতি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহণ করিডোরগুলির নিরাপত্তা দিতেই এই যুদ্ধজাহাজ তৈরি করা হয়। তবে এর মাধ্যমে কাসপিয়ান সাগরে চলমান অস্ত্র প্রতিযোগিতাও সামনে চলে আসছে।
 

কাসপিয়ানের পূর্বে তুর্কমেনিস্তান এবং কাজাখস্তানের সাথে যুক্ত হবার জন্যে কাসপিয়ানের পশ্চিমে আজেরবাইজান নতুন সমুদ্রবন্দর তৈরিতে হাত দেয় ২০১০ সালে। রাজধানী বাকুর ৭০ কিঃমিঃ দক্ষিণে আলাতে এই বন্দরে রেল ফেরি টার্মিনাল তৈরি হয় ২০১৪ সালে; গাড়ির টার্মিনাল তৈরি হয় ২০১৬ সালে। ২০১৮ সালের মে মাসে আজেরি প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিইয়েভ এই সমুদ্রবন্দর উদ্ভোধন করেন। এই বন্দরের মাধ্যমে তুর্কমেনবাশি বন্দর থেকে আসা রেলের বগি, ট্রাক এবং কনটেইনার আজেরবাইজানে প্রবেশ করবে। তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস ব্যবহার করে তৈরি করা রাসায়নিক সারের অর্ধেক আজেরবাইজানের মাধ্যমে রপ্তানি হচ্ছে। তাই আজেরবাইজান আলাত সমুদ্রবন্দরে ২৫ লক্ষ টন প্রসেসিং সক্ষমতার একটা ফার্টিলাইজার টার্মিনাল তৈরি করছে।

মধ্য এশিয়ার সাথে তুরস্ক এবং ইউরোপের যোগাযোগের সর্ব পশ্চিমের প্রকল্প হলো আজেরবাইজানের বাকু থেকে জর্জিয়ার তিবলিসি হয়ে তুরস্কের কার্স পর্যন্ত রেললাইন। ‘বিটিকে’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তুরস্কের সমর্থনে নেয়া এই প্রকল্পে আর্মেনিয়াকে বাইপাস করা হয়। ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়া আক্রমণ করে বসলে প্রকল্প পিছিয়ে যায়। অবশেষে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে ৮’শ ২৬ কিঃমিঃ লম্বা এই রেললাইন চালু হয়। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো একটা মালবাহী রেলগাড়ি চীন থেকে ইউরোপের চেক রিপাবলিকের প্রাগ স্টেশনে পৌঁছায়। এই রেলগাড়ি চীনের শিয়ান প্রদেশ থেকে কাজাখস্তান হয়ে কাসপিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে আজেরবাইজান পৌঁছে। এরপর ‘বিটিকে’ রেললাইন ব্যবহার করে তুরস্কের রেললাইনে পৌঁছায়; সেখান থেকে সহজেই ইউরোপে পৌঁছে যায়। ‘ডেইলি সাবাহ’ বলছে যে, প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কিঃমিঃ এই পথ রেলগাড়িটা পাড়ি দেয় ১২ দিনে। পুরো রুটে রেলগাড়িটা রাশিয়াকে বাইপাস করে।
 
কাসপিয়ান সাগরের এই সমুদ্রপথকে নিরাপত্তা দিতে আজেরবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তান উভয়েই নৌবাহিনী তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে। রাতারাতি তৈরি হওয়া তুর্কমেন নৌবাহিনীতে ক’দিন আগেই যুক্ত হয়েছে ৯১ মিটার লম্বা একটা কর্ভেট বা ছোট আকারের ফ্রিগেট ‘দেনিজ খান’; যা কিনা কাসপিয়ান সাগরের সর্বাধুনিক যুদ্ধজাহাজ। এর আগে তুর্কমেনিস্তানের জন্যে শিপইয়ার্ড তৈরি করে দেয় তুরস্কের ‘দিয়ারসান’ কোম্পানি। তাদের সহায়তায় তুর্কমেন নৌবাহিনী ২০১২ সাল থেকে মিসাইল সজ্জিত ১০টা ৫৬ মিটার লম্বা প্যাট্রোল বোট এবং ৬টা মিসাইল বোট তৈরি করে। কাসপিয়ানের অপর পাড়ে আজেরবাইজান ইস্রাইলের সহায়তায় তৈরি করেছে মিসাইল সজ্জিত ৬টা ৬২ মিটার লম্বা ‘তুফান ক্লাস’ প্যাট্রোল ভেসেল এবং ৬টা ‘শালদাগ’ ছোট প্যাট্রোল বোট। মাত্র এক দশকের মাঝেই এই দুই দেশ শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তুলে; যার ফলশ্রুতিতে কাসপিয়ানে চলছে একটা অস্ত্র প্রতিযোগিতা; যেখানে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হলো তুরস্ক এবং ইস্রাইল।
 
ছবিঃ ‘লাপিস লাজুলি করিডোর’, যা তুরস্ক থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তুরস্ক, আজেরবাইজান, তুর্কমেনিস্তান এবং পাকিস্তানের লক্ষ্য এতে যুক্ত হওয়া; তালিবানরাও একই লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে চলে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের রেখে যাওয়া পরিকল্পনাগুলিই মধ্য এশিয়া তথা ইউরেশিয়াতে বাস্তবায়িত হতে চলেছে। এই প্রকল্পগুলির ভূরাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে ইউরেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। আফগানিস্তানের ঘটনাগুলি একারণেই চীন থেকে রাশিয়া এমনকি তুরস্ক এবং ইউরোপ পর্যন্ত পুরো ইউরেশিয়াতে প্রতিফলিত হচ্ছে।


তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূকৌশলগত পরিকল্পনা

ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথ এবং উত্তরের বিশাল দেশ রাশিয়াকে পুরোপুরি বাইপাস করে চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত রেল করিডোর তৈরি করা ছিল একটা বিরাট পরিকল্পনা। এর পিছনে তুরস্ক এবং চীনের বড় সহায়তা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাটাই ছিল মূখ্য। যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে যে, চীনের সাথে ইউরোপের যোগাযোগ যেন রাশিয়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়। এর সমান্তরালে তুর্কমেনিস্তানের মাঝ দিয়ে একটা রেল করিডোর তৈরি করা হয়েছে আফগানিস্তানের সীমানা পর্যন্ত। এর মাধ্যমে তুরস্কের সাথে আফগানিস্তান রেলপথে যুক্ত হয়েছে। পাকিস্তান চাইছে এই রেল করিডোরের সাথে যুক্ত হতে।

রেল করিডোর ছাড়াও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তুর্কমেনিস্তানের বিশাল গ্যাসের ভান্ডার। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এই গ্যাস ‘টাপি’ পাইপলাইনের মাধ্যমে পাকিস্তান এবং ভারতে রপ্তানি হোক, যাতে মধ্য এশিয়ায় চীনের প্রভাব কমে আসে। আবার যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তুর্কমেনিস্তানের গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছাক। এতে রাশিয়ার গ্যাসের উপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা কমে আসবে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে যে, গ্যাস বিক্রি করার মাধ্যমে একদিকে রাশিয়া ইউরোপের উপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার উপর যেসকল অর্থনৈতিক অবরোধ দিচ্ছে, তা এই গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

পল গোবল বলছেন যে, মধ্য এশিয়াতে রাশিয়া এবং চীন উভয়েই স্থিতিশীলতা চাইলেও তাদের লক্ষ্য আলাদা। চীন মধ্য এশিয়া থেকে তার গ্যাস সরবরাহের যেমন নিরাপত্তা চায়, তেমনি মধ্য এশিয়া হয়ে ইউরোপ যাবার রেলপথেরও নিরাপত্তা চায়। মধ্য এশিয়াতে স্থিতিশীলতা চাওয়াটা চীনের একটা অর্থনৈতিক লক্ষ্য। অপরদিকে রাশিয়া তার দক্ষিণের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি নিয়ে চিন্তায় রয়েছে সর্বদা। তাই মধ্য এশিয়ার দেশগুলির নিরাপত্তাজনিত দিকটাই রাশিয়ার জন্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তালিবানরা আফগানিস্তানে ক্ষমতা নেবার সাথেসাথেই মস্কো এবং বেইজিংএ তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে আস্তত্ব করেছে। তথাপি রাশিয়া এবং চীনের দুশ্চিন্তা পুরোপুরি চলে যায়নি। অপরিকে তুর্কমেনিস্তানকে নিয়ে রাশিয়া চিন্তিত হলেও তুর্কমেনিস্তান কিন্তু আফগানিস্তানের মাঝে তার সুযোগই দেখতে পারছে। কারণ তালিবানরা প্রথম থেকেই বলছে যে, তারা আফগানিস্তানের মাঝ দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন, রেললাইন এবং বিদ্যুৎ গ্রিডলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে ইচ্ছুক। মধ্য এশিয়াকে দক্ষিণ এশিয়ার সাথে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত করাটাই এখন তালিবানরা লক্ষ্য হিসেবে বলছে; যা কিনা তাদের বাস্তবতা মেনে নেবার চিন্তাতাকেই তুলে ধরে। একই লক্ষ্য তুরস্ক, আজেরবাইজান, তুর্কমেনিস্তান এবং পাকিস্তানের; আর তা হলো 'লাপিস লাজুলি করিডোর'এর সাথে যুক্ত হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে চলে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের রেখে যাওয়া পরিকল্পনাগুলিই মধ্য এশিয়া তথা ইউরেশিয়াতে বাস্তবায়িত হতে চলেছে। এই প্রকল্পগুলির ভূরাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে ইউরেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। আফগানিস্তানের ঘটনাগুলি একারণেই চীন থেকে রাশিয়া এমনকি তুরস্ক এবং ইউরোপ পর্যন্ত পুরো ইউরেশিয়াতে প্রতিফলিত হচ্ছে।

Saturday, 28 August 2021

কাবুল এয়ারলিফট মার্কিনীদের সামরিক কাজে বেসামরিক বিমান ব্যবহারের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এলো

২৮শে অগাস্ট ২০২১

ছবিঃ ২০০৩ সাল। কুয়েতে মার্কিন সেনাবাহিনীর ৪র্থ পদাতিক ডিভিশনের সেনারা বেসামরিক বিমান থেকে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই সেনারা কুয়েত থেকে ইরাকের অভ্যন্তরে সামরিক মিশনে অংশ নেয়। ২০০১ সালের পর থেকেই মার্কিন বিমান পরিবহণ সংস্থাগুলি অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকে ধুঁকে চলছে বলে তারাও বিশ্বব্যাপী মার্কিন সরকারের কাজ পাবার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিন সামরিক অপারেশন কমতে থাকলে মার্কিন এয়ারলাইন্সগুলিও আয় থেকে বঞ্চিত হবে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা উভয়কেই টিকিয়ে রেখেছে গত তিন দশক ধরে। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে উভয়েই এখন সমস্যার মাঝে পড়েছে।



গত ২২শে অগাস্ট মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন আফগানিস্তান থেকে মার্কিন নাগরিক এবং মার্কিনীদের সহায়তা করা আফগানদের সরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সিভিল রিজার্ভ এয়ার ফ্লিট’ বা ‘সিআরএএফ’কে কার্যকর করার আদেশ দেন। ‘সিআরএএফ’এর অধীনে ১৮টা বেসামরিক বিমানকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অধীনে আনা হয়। সামরিক পত্রিকা ‘ডিফেন্স ওয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইতিহাসে মাত্র তৃতীয়বারের মতো মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জরুরি সামরিক মিশনে ‘সিআরএএফ’কে ব্যবহার করছে। মার্কিন পরিবহণ দপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘সিআরএএফ’ হলো এমন একটা প্রকল্প, যার মাধ্যমে মার্কিন বেসামরিক বিমান সংস্থাগুলি স্বেচ্ছায় নিজেদের বহরের প্রতিশ্রুত বিমানের মাঝে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ বিমান যেকোন সময় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করতে দেবে। প্রতিটা বিমানই যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত হতে হবে এবং প্রতিটা বিমানের জন্যে কমপক্ষে ৪ জন ক্রু থাকতে হবে। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে খেয়াল রাখে যেন এয়ারলাইন্সগুলি তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করার সক্ষমতা ধরে রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ‘ট্রান্সপোর্টেশন কমান্ড’এর সাথে চুক্তি অনুযায়ী বিমান সংস্থাগুলি স্বেচ্ছায় বিমান দেয়ার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের পণ্য এবং মানুষ পরিবহণের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাবে।

‘সিআরএএফ’ আসলে কি জিনিস?

মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘এয়ার মোবিলিটি কমান্ড’এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হিসেবে দেখা যায় যে, ২০২১ সালের অগাস্টে ‘সিআরএএফ’এর অধীনে ২৪টা এয়ারলাইন্সের ৪’শ ৫০টা বিমান তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মাঝে ৪’শ ১৩টা বিমান রয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অপারেশনে। যার মাঝে ২’শ ৬৮টা বিমান রয়েছে দূরবর্তী রুটের জন্য; আর ১’শ ৪৫টা রয়েছে কাছাকাছি রুটের জন্যে। এছাড়াও ৩৭টা বিমান রয়েছে মার্কিন মূল ভূখন্ডে পরিচালনার জন্যে। তবে এই সংখ্যাগুলি প্রায় প্রতিমাসেই পরিবর্তিত হচ্ছে।

১৯৫১ সালের ডিসেম্বরে ‘সিআরএএফ’এর জন্ম। এর মাত্র কয়েক বছর আগেই বার্লিন এয়ারলিফটের সময় কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই বেসামরিক বিমান ব্যবহার করে বার্লিনে জরুরি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পরিবহণ করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ২৪শে জুন থেকে ১৯৪৯ সালের ১২ই মে পর্যন্ত ১৫ মাসে সোভিয়েত ইউনিয়নের বার্লিন অবরোধের সময় ২ লক্ষ ৭৮ হাজার ফ্লাইটে ২৩ লক্ষ ২৬ হাজার টনেরও বেশি মালামাল পরিবহণ করা হয়; যার ৭৬ শতাংশ পরিবহণ করেছিল মার্কিনীরা; ২৩ শতাংশ করেছিল ব্রিটিশরা। এই ঘটনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ‘দ্যা ড্রাইভ’ ম্যাগাজিনের এই প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বর্তমানে আফগানিস্তান মিশনের জন্যে প্রথম পর্যায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে; যার মাধ্যমে কোন একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে জরুরি দরকারে বিমান ব্যবহার করা হচ্ছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা হলো কোন অঞ্চলে বড় কোন যুদ্ধাবস্থা মোকাবিলা করা; যা বিমানের সংখ্যাকে অনেক বাড়িয়ে নেবে। আর তৃতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা হলো যদি বৈশ্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র কোন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে যা করা হবে। দরকার বিশেষে কিছু বিমান ২৪ ঘন্টা; কিছু ৪৮ ঘন্টা; আর কিছু ৭২ ঘন্টার মাঝে ব্যবহারের উপযোগী করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এর আগে দু’বার ‘সিআরএএফ’কে কার্যকর করা হয়েছিল। তবে ‘সিআরএএফ’এর বিমানগুলি বিভিন্ন সময়ে সামরিক মহড়ায় এবং বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন মিশনে নিয়মিতই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ১৯৯০ সালে প্রথম ইরাক যুদ্ধের সময় এবং ২০০৩ সালে দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি মোতায়েন করার জন্যে প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘সিআরএএফ’কে কার্যকর করেছিল। মার্কিন সরকারের ‘ডিফেন্স টেকনিক্যাল ইনফর্মেশন সেন্টার’এর ওয়েবসাইটে ‘র‍্যান্ড কর্পোরেশন’এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৯০ সালে ‘অপারেশন ডেজার্ট শিল্ড’ এবং ‘ডেজার্ট স্টর্ম’এর জন্যে ‘সিআরএএফ’এর ৭৭টা যাত্রীবাহী বিমান এবং ৩৯টা কার্গো বিমান কার্যকর করা হয়। এই বিমানগুলি মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো এবং সেখান থেকে ফেরত নিয়ে আসা সেনাদের ৬০ শতাংশ এবং মোট পণ্য পরিবহণের ২৫ শতাংশ পরিবহণ করে। এটা ছিল দ্বিতীয় পর্যায়ের মিশন। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ ছিল প্রথম পর্যায়ের অপেক্ষাকৃত ছোট মিশন। মার্কিন বিমান বাহিনীর ‘এয়ারফোর্স ম্যাগাজিন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিভিন্ন সময়ে ‘সিআরএএফ'’র বেসরকারি বিমানগুলি মার্কিন সামরিক মিশনের ৫০ শতাংশ জনবল এবং কার্গো পরিবহণ করে আসছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর চাইছে যে, বিশ্বব্যাপী মার্কিন সামরিক ঘাঁটি কমিয়ে আনার সাথেসাথে ‘সিআরএএফ’এর পিছনে খরচও যেন কমে আসে। কারণ এই খরচ এখন বাৎসরিক প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুরু করলে ‘সিআরএএফ’এর বিমানের ব্যবহার ভীষণভাবে বেড়ে যায়। মার্কিন এয়ারলাইন্সগুলি মার্কিন সরকারের কাজ পাবার উপরে অনেকাংশেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। মার্কিন সরকার নিয়ম পরিবর্তন করে বলে দেয় যে, এয়ারলাইন্সগুলির কমপক্ষে ৬০ শতাংশ আয় আসতে হবে বাণিজ্যিক পরিবহণের মাধ্যমে; বাকি ৪০ শতাংশ সরকারি কাজের মাধ্যমে আসতে পারে। মোট ২৪টা এয়ারলাইন্স ‘সিআরএএফ’এর আওতায় থাকলেও প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ পরিবহণ নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র পাঁচটা কোম্পানি; যেগুলি হলো, যাত্রী পরিবহণের জন্যে ‘আমেরিকান এয়ারলাইন্স’, ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স’, ‘ডেল্টা এয়ারলাইন্স’; আর কার্গো পরিবহণের জন্যে ‘ফেডএক্স’ ও ‘ইউনাইটেড পার্সেল সার্ভিস’। মার্কিন সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ের জন্যেই বেশি বিমান চাওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হবে দু’টা সেনা ব্রিগেডকে যেন তার সকল রসদসহ এক সপ্তাহের মাঝে দুনিয়ার যেকোন স্থানে মোতায়েন করা যায়; অথবা কোন জনহিতকর কাজে যেন ব্যবহার করা যায়। আফগানিস্তানের কাবুল বিমানবন্দর থেকে মানুষ সরিয়ে নেয়াটা এমনই একটা প্রথম পর্যায়ের মিশন। 


ছবিঃ ২০০৪ সাল। বেসামরিক বিমানে ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছে মার্কিন সেনারা।

 
আফগানিস্তানের মিশনে বেসামরিক বিমানের ব্যাপক ব্যবহার

প্রতিরক্ষামন্ত্রী অস্টিনের আদেশ অনুযায়ী ‘আমেরিকান এয়ারলাইন্স’, ‘এটলাস এয়ার’ এবং ‘ডেল্টা এয়ারলাইন্স’ তিনটা করে বিমান দেবে; ‘অমনি এয়ার’ এবং ‘হাওয়াইয়ান এয়ারলাইন্স’ দেবে দু’টা করে বিমান; আর ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স’ দেবে চারটা বিমান। এই বিমানগুলি আফগানিস্তানে যাবে না; বরং সেগুলি কাবুল থেকে মার্কিন সামরিক পরিবহণ বিমানে করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে নিয়ে আসা মানুষদেরকে আমেরিকা বা ইউরোপ বা অন্যান্য দেশে নিয়ে যাবে। ২২শে অগাস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সাংবাদিকদের বলেন যে, গত ১৫ই অগাস্টে কাবুলে মার্কিন দূতাবাস খালি করার পর থেকে তখন পর্যন্ত প্রায় ২৮ হাজার মানুষকে আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে। ‘দ্যা ড্রাইভ’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই কাজে ‘সিআরএএফ’ কার্যকর করার আগেই অনেক বেসরকারি পরিবহণ বিমান চার্টারের মাধ্যমে ব্যবহার করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। ‘মিলিটারি টাইমস’এর সম্পাদক হাওয়ার্ড আল্টম্যান ২১শে অগাস্টের এক টুইটার বার্তায় জানাচ্ছেন যে, ২৪ ঘন্টায় কাবুল থেকে ৩৮টা বিমান উড্ডয়ন করে, যার মাঝে ৬টা ছিল ‘সি ১৭’ সামরিক পরিবহণ বিমান; আর ৩২টা ছিল বেসামরিক চার্টার বিমান।

‘সিএনবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আদেশ দেয়ার দিনই ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স’এর প্রথম বিমানটা জার্মানির ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট হান’ বিমানবন্দর থেকে কাতারে ‘আল উদাইদ’ মার্কিন সামরিক ঘাঁটির দিকে রওয়ানা হয়। এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারা বলছেন যে, বিমানগুলিতে সম্ভবতঃ ডায়াপার, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পণ্য এবং কিছু কাপড় ভরে নিচ্ছেন তারা যাত্রীদের দরকারের জন্য। ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স’ তাদের ‘বোয়িং ৭৭৭ ৩০০’ বিমান ব্যবহার করছে; এগুলির একেকটা ৩’শ ৫০ জন যাত্রী বহণ করতে পারে। এই মিশনগুলির জন্যে বিমানের ক্রুদেরকে বেশি পারিশ্রমিক দেয়া হচ্ছে। ‘ডেল্টা এয়ারলাইন্স’এর কর্মকর্তারা বলছেন যে, তারা বিভিন্ন রুটে বর্তমানে ওড়া বিমানগুলিকে ব্যবহার করছে না; বরং যে বিমানগুলি বসে ছিল, সেগুলিই ব্যবহার করছে। একারণে তাদের স্বাভাবিক ফ্লাইট শিডিউলে কোন পরিবর্তন হবে না। তবে ‘আমেরিকান এয়ারলাইন্স’ তাদের শিডিউল ফ্লাইট থেকেই বিমান সরিয়ে নিচ্ছে এই মিশনের জন্যে। অপরপক্ষে ‘এটলাস এয়ার’ মূলতঃ একটা কার্গো ক্যারিয়ার; যারা এমনিতেই নিয়মিতভাবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্যে মালামাল পরিবহণ করে থাকে। কোম্পানির যাত্রীবাহী বিমানগুলির মাঝে রয়েছে ‘বোয়িং ৭৪৭ ৪০০’ বিমান, যেগুলি ৩’শ ৭৪ জন যাত্রী বহণে সক্ষম; আর ‘বোয়িং ৭৬৭ ৩০০’ বিমানগুলি বহণ করতে পারে ২’শ ১৫ জন। ‘সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স’ এই প্রকল্পের অংশ না হলেও তারা এই প্রকল্পে অংশ নেবার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রে মূল ভুখন্ডে বিভিন্ন বিমানবন্দরের মাঝে পরিচালনার জন্যে স্বাভাবিক ফ্লাইট ব্যাহত না করে বসে থাকা বিমানগুলিকে ব্যবহার করবে।

হোয়াইট হাউজের বরাত দিয়ে ‘সিএনএন’ বলছে যে, ১৫ই অগাস্ট থেকে ২৭শে অগাস্ট পর্যন্ত মোট ১ লক্ষ ৯ হাজার ২’শ মানুষকে কাবুল থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ ‘সিআরএএফ’ কার্যকর করার দিন থেকে পাঁচ দিনে প্রায় ৭১ হাজার মানুষকে সরিয়ে আনা হয়েছে। পেন্টাগন বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে ভার্জিনিয়ার ফোর্ট পিকেট এবং নিউ মেক্সিকোর হলোম্যান এয়ার ফোর্স বেইসকে তৈরি করা হচ্ছে আফগানিস্তানের শরণার্থীদের রাখার জন্যে। ২৩শে অগাস্ট মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভান সাংবাদিকদের বলেন যে, মার্কিন সরকার কাবুল বিমানবন্দরের অপারেশনের জন্যে তালিবানদের সাথে সর্বদাই সমন্বয় করে চলছে। কাবুল বিমানবন্দর পর্যন্ত মানুষদের সহজে পৌঁছার জন্যে তারা রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা চ্যানেলগুলি ব্যবহার করে তালিবানদের সাথে আলোচনা করে চলেছেন। তিনি বলেন যে, ৩১শে অগাস্টের মাঝে যেসকল মার্কিন নাগরিক আফগানিস্তান ছাড়তে ইচ্ছুক, তাদের সকলকেই সরিয়ে নেয়া সম্ভব। তবে এর এক সপ্তাহ আগেই পেন্টাগন বলে যে, কাবুলে থাকা মার্কিন নাগরিকদের বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছাবার নিশ্চয়তাই মার্কিনীরা দিতে পারছে না; যদিও কাবুলে এই মুহুর্তে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে।

কাবুল এয়ারলিফট দেখিয়ে দিচ্ছে যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বব্যাপী তাদের অবস্থানকে ধরে রাখতে বেসরকারি বিমান বহরের উপর কতটা নির্ভরশীল। বিশেষ করে গত দুই দশকে বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ মার্কিনীদেরকে বেসামরিক বিমান বহরের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল করে ফেলেছে। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিবহণ কর্মকান্ডের প্রায় অর্ধেক এই বেসামরিক বিমান বহরগুলিই করছে; যেকারণে বিশ্বব্যাপী মার্কিন সামরিক মিশনের পরিবহণ খরচ হিসেবে ‘সিআরএএফ’এর জন্যে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের খরচ যোগাতে হিমসিম খাচ্ছে পেন্টাগন। একইসাথে ২০০১ সালের পর থেকেই মার্কিন বিমান পরিবহণ সংস্থাগুলি অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকে ধুঁকে চলছে বলে তারাও বিশ্বব্যাপী মার্কিন সরকারের কাজ পাবার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে। এই কোম্পানিগুলির মার্কিন সরকারি কাজের উপর নির্ভরশীলতা কমাতেই নিয়ম করে বলে দেয়া হয়েছে যে, এয়ারলাইন্সগুলির আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি সরকারি কাজের উপর নির্ভরশীল থাকতে পারবে না। কিন্তু করোনাভাইরাসের মহামারি শুরু হবার পর এয়ারলাইন্সগুলির অবস্থা আরও শোচনীয় হয়েছে। ইতোমধ্যেই ‘সিআরএএফ’এর বিমানের সংখ্যা ২০১৪ সালে ৫’শ ৫২ থেকে ২০২১ সালে ৪’শ ৫০এ নেমে এসেছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিন সামরিক অপারেশন কমতে থাকলে মার্কিন এয়ারলাইন্সগুলিও আয় থেকে বঞ্চিত হবে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা উভয়কেই টিকিয়ে রেখেছে গত তিন দশক ধরে। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে উভয়েই এখন সমস্যার মাঝে পড়েছে।

Thursday, 26 August 2021

আলজেরিয়া এবং মরক্কোর দ্বন্দ্ব ... এখন কেন?

২৬শে অগাস্ট ২০২১
পশ্চিম সাহারার অবস্থান উল্টোদিকে মরক্কোর দক্ষিণে; যেখানে ব্যস্ত থেকে জিবরালটার থেকে দূরে রয়েছে মরক্কোর সেনাবাহিনী। জিবরালটারের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্যপথ মরক্কোর পররাষ্ট্রনীতি থেকে দূরে থাকবে ততদিন, যতদিন পশ্চিম সাহারার দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখবে ইউরোপ এবং আলজেরিয়া। এই দ্বন্দ্ব তুরস্ক এবং ইস্রাইলের মত দেশগুলিকেও যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় পশ্চিম আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় টেনে আনছে। একইসাথে এই দ্বন্দ্বের কারণে মরক্কো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখার জন্যে একটা ‘দরজা’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।



গত ২৪শে অগাস্ট আলজেরিয়ার সরকার মরক্কোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা প্রদান করতে গিয়ে আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রামদানি লামামরা সাংবাদিকদের বলেন যে, মরক্কো আলজেরিয়ার কর্মকর্তাদের উপর ‘পেগাসাস’ সফটওয়্যার ব্যবহার করে গোয়েন্দাগিরি করছে। একইসাথে মরক্কো আলজেরিয়ার অভ্যন্তরে একটা বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপকে সমর্থন দিচ্ছে এবং পশ্চিম সাহারার ব্যাপারে মরক্কো যে প্রতিশ্রুতিগুলি দিয়েছে, সেগুলি তারা রাখছে না। লামামরা বলেন যে, মরক্কো কখনোই আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে শত্রুতাপূর্ণ আচরণ বন্ধ করেনি। আলজেরিয়ার এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মরক্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক টুইটার বার্তায় বলে যে, আলজেরিয়ার এই সিদ্ধান্ত দুঃখজনক এবং অহেতুক। ‘রয়টার্স’ জানাচ্ছে যে, দুই দেশের মাঝে সীমানা ১৯৯৪ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। এর আগে দুই দেশের দ্বন্দ্বে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হলেও ১৯৮৮ সালে তা আবারও পূর্বাবস্থায় আনা হয়েছিল। তবে সেই সময় থেকে এবারই প্রথম কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হলো। মরক্কো দুই দেশের মাঝে সীমানা খুলতে চাইলেও নিরাপত্তার কথা বলে আলজেরিয়া সীমানা বন্ধ রেখেছে।

এর এক সপ্তাহ আগেই আলজেরিয়ার সরকার বলে যে, সেদেশে ভয়াবহ দাবানলে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর পিছনে দু’টা গ্রুপ জড়িত; যাদেরকে আলজেরিয়া কিছুদিন আগেই সন্ত্রাসী বলে ঘোষণা দিয়েছে। আলজেরিয়ার পূর্বাঞ্চলে কাবাইলি অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘এমএকে’ এই দুই গ্রুপের একটা। এই গ্রুপকে মরক্কো এবং ইস্রাইল সহায়তা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে আলজেরিয়ার সরকার। দাবানলে ঐ অঞ্চলই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আলজেরিয়া সরকার আগুন লাগাবার এবং একজন নিরপরাধ মানুষকে দোষী অপবাদ দিয়ে গণপিটুনি দিয়ে খুন করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে; যাদের কয়েকজন নিজেদেরকে ‘এমএকে’এর সদস্য বলে স্বীকার করে। আলজেরিয়ার টেলিভিশনে তাদের স্বীকারোক্তি প্রচার করা হয়। একইসাথে নিরপরাধ গায়ক জামাল বেন ইসমাইলের মৃত্যুকে সরকারের সিদ্ধান্তের পিছনে জনসমর্থন আদায়ে ব্যবহার করা হয়।

এর আগে গত ১৮ই জুলাই আলজেরিয়ার সরকার মরক্কো থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়। অভিযোগ ছিল যে, নিউ ইয়র্কে মরক্কোর রাষ্ট্রদূত ওমর হিলালি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের এক বৈঠকে আলজেরিয়ার বিচ্ছন্নতাবাদীদের পক্ষে কথা বলেছেন। হিলালি বলেন যে, যদি পশ্চিম সাহারার জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারের ব্যাপারে আলজেরিয়া এতটা সোচ্চার থাকে, তাহলে তাদের নিজেদের দেশে কাবাইলি অঞ্চলের জনগণকেও নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার দেয়া উচিৎ। হিলালির কথাগুলি দুই দেশের বহু বছরের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে। ১৯৭০এর দশক থেকেই মরক্কোর দক্ষিণে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলে ‘পলিসারিও ফ্রন্ট’ স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করছে। পলিসারিওকে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে আলজেরিয়া। অপরদিকে মরক্কো এই অঞ্চলকে নিজের অঞ্চল বলে মনে করে। ১৯৯১ সালে যুদ্ধ শেষ হলেও অনেক বছর ঠান্ডা থাকার পর ২০২০ সালের শেষ দিকে পশ্চিম সাহারার ইস্যু আবারও গরম হয়ে উঠতে শুরু করে, যখন গত নভেম্বরে পলিসারিও ঘোষণা দেয় যে, তারা আবারও সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে যাচ্ছে। এরপর অবশেষে গত ডিসেম্বরে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম সাহার উপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়।
 
ইইউ বলে যে, মরক্কোর সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর সহায়তাতেই শরণার্থীরা স্প্যানিশ ছিটমহলে ঢুকে পড়ে; উদ্দেশ্য ছিল স্পেনের উপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। অনেকেই মনে করেছেন যে, স্পেনের সেউতা ছিটমহলে শরণার্থীদের প্রেরণ করা ছিল মূলতঃ পশ্চিম সাহারার পলিসারিওর নেতাকে স্পেনে ঢুকতে দেয়ার প্রতিশোধমূলক কর্মকান্ড।


মরক্কোর সাথে আলজেরিয়া নতুন করে দ্বন্দ্ব এমন এক সময়ে এলো, যখন ইউরোপের সাথে মরক্কোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। গত ১০ই জুন ইইউ পার্লামেন্টে পাস করা এক রেজোলিউশনে বলা হয় যে, গত মে মাসে মরক্কোর মূল ভুখন্ডে স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতাতে ১০ হাজার শরণার্থী ঢুকে যাবার পিছনে মরক্কো সরকারের হাত ছিল। ইইউ বলে যে, মরক্কোর সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর সহায়তাতেই শরণার্থীরা স্প্যানিশ ছিটমহলে ঢুকে পড়ে; উদ্দেশ্য ছিল স্পেনের উপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। অনেকেই মনে করেছেন যে, স্পেনের সেউতা ছিটমহলে শরণার্থীদের প্রেরণ করা ছিল মূলতঃ পশ্চিম সাহারার পলিসারিওর নেতাকে স্পেনে ঢুকতে দেয়ার প্রতিশোধমূলক কর্মকান্ড।

পলিসারিওর সাথে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় মরক্কোর পক্ষে থেকেছে এবং প্রচুর অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের উত্তেজনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কিনছে মরক্কো। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর কাছে ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্রতিশ্রুতি দেয়। এই অস্ত্রের মাঝে ছিল ৪টা ‘এমকিউ ৯ রীপার’ অস্ত্রবাহী ড্রোন এবং লেজার গাইডেড বোমা। ‘ডিফেন্স ওয়ার্ল্ড’ বলছে যে, ২০১৯এর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর কাছে ২৪টা ‘এএইচ ৬৪ এপাচি’ এটাক হেলিকপ্টার এবং প্রায় আড়াই হাজার ‘টো ২এ’ এন্টিট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই চুক্তির মূল্যমান ছিল ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। এর মাঝে ‘ম্যান আনম্যানড টিমিং’ নামে একটা প্রযুক্তিও বিক্রি করা হচ্ছে; যার মাধ্যমে এপাচি হেলিকপ্টারের পাইলট একটা ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং ড্রোনের পাঠানো ভিডিও সরাসরি দেখতে পাবে। এর মাধ্যমে মরক্কোর সামরিক সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। এর আগে ২০১৯এর মার্চে যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোকে ২৫টা নতুন ‘এফ ১৬’ যুদ্ধবিমান বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়াও গত এপ্রিলে মরক্কো তুরস্কের ‘বায়কার মাকিনা’ কোম্পানির কাছ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলারে ১৩টা ‘বায়রাকতার টিবি ২’ ড্রোন কিনছে বলে বলা হয়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্যামুয়েল রামানি ‘ডিফেন্স নিউজ’কে বলছেন যে, গত এপ্রিল মাসে মরক্কো প্রথমবারের মতো ড্রোন ব্যবহার করে পলিসারিওর উপর হামলা করে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্ক একত্রে মরক্কোর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। একইসাথে ইস্রাইলের সাথে মরক্কোর সম্পর্ক স্বাভাবিক হবার কারণে ইস্রাইলও হয়তো মরক্কোকে সামরিক সহয়তা দেবে; বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি দিয়ে।

মরক্কোর কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। মরক্কোর উত্তরে রয়েছে কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ জিবরালটার প্রণালি। সেউতা ছিটমহলের অবস্থানও ঠিক তার দক্ষিণে। অপরদিকে পশ্চিম সাহারার অবস্থান উল্টোদিকে মরক্কোর দক্ষিণে; যেখানে ব্যস্ত থেকে জিবরালটার থেকে দূরে রয়েছে মরক্কোর সেনাবাহিনী। জিবরালটারের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্যপথ মরক্কোর পররাষ্ট্রনীতি থেকে দূরে থাকবে ততদিন, যতদিন পশ্চিম সাহারার দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখবে ইউরোপ এবং আলজেরিয়া। এই দ্বন্দ্ব তুরস্ক এবং ইস্রাইলের মত দেশগুলিকেও যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় পশ্চিম আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় টেনে আনছে। একইসাথে এই দ্বন্দ্বের কারণে মরক্কো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখার জন্যে একটা ‘দরজা’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

Tuesday, 17 August 2021

আফগান বিপর্যয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ফিরে পাবার শেষ আশাটুকু হারালো যুক্তরাষ্ট্র

১৮ই অগাস্ট ২০২১

কাবুলের মার্কিন দূতাবাসের উপর মার্কিন হেলিকপ্টারের ছবিগুলি যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে তেমন কিছু না হলেও তা যে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের গোড়ায় আঘাত করেছে, তা সেদেশের নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছে। বুঝতে পেরেছে বলেই তারা কেউই চার দশকের মাঝে সবচাইতে মারাত্মক এই বিপর্যয়ের দায় নিতে চাইছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরা আরও আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে। কাবুলের বিপর্যয় সেই সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ়তা দিলো কেবল। প্রকৃতপক্ষে আফগান বিপর্যয় যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বশীল অবস্থানে ফিরে আসার শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিল।


১৬ই অগাস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আফগানিস্তানের পরিস্থিতির ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। এক বক্তব্যে তিনি বলেন যে, তিনি ২০০৯ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে আফগানিস্তানে অতিরিক্ত সেনা প্রেরণের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি আরও বলেন যে, যদিও সেনা সরাতে গিয়ে অনেক সমস্যার পড়তে হয়েছে, তথাপি সেনা সরিয়ে নেবার জন্যে কোন ভালো সময় কখনোই ছিল না। তিনি বলেন যে, গত এক সপ্তাহের ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসাটা সঠিক সিদ্ধান্তই ছিল। যে যুদ্ধে আফগানরা নিজেরাই নিজেদের জন্যে যুদ্ধ করতে রাজি নয়, সেখানে মার্কিন সেনাদের যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করাটা উচিৎ নয়। তিনি আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির জন্যে দায় পুরোপুরিভাবে নিজের কাঁধে নিতে চাননি। তিনি বলেন যে, আফগানিস্তানে মার্কিন মিশন কখনোই দেশ গড়ার জন্যে ছিল না। তিনি ক্ষমতায় এসে তালিবানদের সাথে চুক্তির ফলাফলটুকু পেয়েছেন; কারণ সেই চুক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় করা হয়েছিল। তিনি হলেন চতুর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন; এবং তিনি পঞ্চম কোন প্রেসিডেন্টের কাছে এই দায়িত্ব হস্তান্তর করতে চান না। তবে সকলে বাইডেনের সাথে একমত হতে পারেননি। রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাকনেল এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, আফগানিস্তান হলো একটা চরম বিপর্যয়। বাইডেন প্রশাসনের আফগানিস্তান থেকে সরে আসার জন্যে তা যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদার উপরেই দাগ ফেলে দিয়েছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, অনেক মার্কিনীদের কাছেই কাবুলে মার্কিন দূতাবাসের উপর মার্কিন হেলিকপ্টার ওড়ার ঘটনাটা ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের লজ্জাজনক পলায়নের স্মৃতিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে; বাইডেন সেসময় একজন নব নির্বাচিত সিনেটর ছিলেন।

‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বাইডেনের বক্তব্যের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সংস্থার প্রতিক্রিয়া যোগাড় করেছে। কংগ্রেসের রিপাবলিকান দলের প্রধান কেভিন ম্যাকার্থি বলছেন যে, কয়েক দশকের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে মারাত্মক পররাষ্ট্রনীতি বিপর্যয়ে ছয় দিন চুপ থাকার পর বাইডেন মুখ খুলেছেন। তার বক্তব্য সৈন্য সরাবার বিপর্যয়ের কারণে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করতে না পারা, হাজারো সেনাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকি বেড়ে যাবার বিষয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়না। আরেক রিপাবলিকান লিন্ডসে গ্রাহাম বলছেন যে, বাইডেন আফগানিস্তানে বিপজ্জনক এবং অপমানজনক পথে হেঁটেছেন; এর জন্যে তিনি নিজেকে ছাড়া কাউকেই দোষ দিতে পারেন না। ডেমোক্র্যাট দলের প্রধান স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বাইডেনকে সমর্থন করে বলেন যে, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং মার্কিন সেনাদের আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে আনার জন্যে একাগ্র ভূমিকার জন্যে প্রেসিডেন্ট প্রশংসার দাবিদার। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট’এর ফেলো ক্যাথারিন জিমারম্যান বলছেন যে, তালিবান আফগানিস্তানে ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠার ফলে বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রয়েছে মানবাধিকার, এই কথাগুলি অন্তসারশূণ্য হয়ে গেলো। ‘ফ্রিডমওয়ার্কস’এর প্রেসিডেন্ট এডাম ব্র্যান্ডন বলছেন যে, আফগানিস্তানের এই পরিস্থিতির জন্যে শুধুমাত্র বাইডেনকে দায়ী করা যাবে না। কংগ্রেসের সামনে যেসকল সামরিক এবং ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছেন, তাদেরকেও দায়ী করতে হবে।

‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, একমাস আগেই বাইডেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, তালিবানরা পুরো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেবে, এটা প্রায় অসম্ভব। তবে এবারের ভাষণে তিনি স্বীকার করেন যে, আফগানিস্তানের ঘটনাগুলি তারা যতটা দ্রুত আশা করেছিলেন, তার চাইতে বেশি দ্রুত ঘটেছে। বাইডেনের সাথে সুর মিলিয়েই ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল জ্যান্স স্টলটেনবার্গ বলেন যে, আফগানিস্তানে ন্যাটোর সেনারা চিরকালের জন্যে যায়নি। তবে তালিবানরা যত দ্রুত আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তা তাদেরকে অবাক করেছে। তিনি তালিবানদের এই সাফল্যের পিছনে আফগান রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই দায়ি করেন। ‘বিবিসি’ আরও বলছে যে, মার্কিন জনমত বলছে যে, বেশিরভাগ জনগণই আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে। ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ বা ‘সিএসআইএস’এর এনথনি করডেসম্যান বাইডেনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে ‘ভয়েস অব আমেরিকা’কে বলেন যে, আফগানিস্তানে যত সময়ই যুক্তরাষ্ট্র থাকুক না কেন, সেখানে কার্যকর একটা গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল না; এই ব্যাপারটাকে তিনি বেশ শক্তিশালীভাবেই তুলে ধরেছেন। একই ধরনের কথা বলেছেন ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সিনিয়র ফেলো চার্লস কুপচান। তিনি বলেন যে, ছয় মাস, এক বছর বা দুই বছর সময় দিলেই ফলাফল পরিবর্তিত হয়ে যেতো, এমন কোন প্রমাণ নেই। ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’এর সিনিয়ন ফেলো আরন ডেভিড মিলার বলছেন যে, বাইডেন যে একটা বিষয় সম্পর্কে তার দায় স্বীকার করেছেন তা হলো, তারা বুঝতে পারেননি যে তালিবানরা এতটা সহজে পুরো আফগানিস্তান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে।

‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রধান মার্কিন চিন্তাবিদ ইয়ান ব্রেমার বাইডেনের সমালোচনা করে বলছেন যে, বাইডেন তার বক্তব্যে কেন আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়া উচিৎ সেটার শক্ত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আফগানিস্তানে মারাত্মক কতগুলি ব্যর্থতার ব্যাপারে তিনি কিছুই বলেননি। ব্রেমার বলছেন যে, ১৯৭৯ সালে ইরানে মার্কিন দূতাবাসের জিম্মি হবার পর থেকে চার দশকে এটা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সবচাইতে ভয়াবহতম পররাষ্ট্রনীতির বিপর্যয়। এখানে ব্যর্থতাগুলির প্রথমে থাকবে সামরিক এবং ইন্টেলিজেন্সের ব্যর্থতা। যখন বাইডেন আফগানিস্তান ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে, আফগান সেনাবাহিনী তালিবানদের বিরুদ্ধে দুই থেকে তিন বছর যুদ্ধ করতে পারবে। অথচ যখন তালিবানরা আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে, তখন ইন্টেলিজেন্সের কর্মকর্তারা বলেন যে, আফগান সেনাবাহিনী মাত্র দুই থেকে তিন দিন টিকবে! ব্রেমার বলছেন যে, তিনি তার ক্যারিয়ারে এতবড় ইন্টেলিজেন্স ব্যর্থতার কথা কখনোই শোনেননি। যুক্তরাষ্ট্র বিশ বছর ধরে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে যে আফগান সেনাবাহিনী তৈরি করেছে, তা যুদ্ধ করতে রাজি হয়নি! আর দুই দশক ধরে প্রশিক্ষণ দেবার পরেও এই সেনাদের সক্ষমতা এবং মনোবল সম্পর্কে তারা নিশ্চিত ছিলেন না! দ্বিতীয়তঃ সমন্বয়ের ব্যর্থতা। পশ্চিমা দেশগুলি যুক্তরাষ্ট্রের সাথেসাথে আফগানিস্তানে গিয়েছে এবং যুদ্ধ করে জীবনও দিয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তান ত্যাগের সময় যুক্তরাষ্ট্র একাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যখন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত কাবুলে রয়ে গিয়েছেন, তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত কাবুল ছেড়ে গিয়েছেন। তৃতীয়তঃ পরিকল্পনার ব্যর্থতা। ছয় হাজার সেনাকে একবার আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নিয়ে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ড থেকে কয়েক হাজার সেনাকে উড়িয়ে নিয়ে আসা এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের সহায়তা করা হাজারো আফগানের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে না পারা খুবই বাজে ধরনের পরিকল্পনার ব্যর্থতাকে তুলে ধরে। পুরো ব্যাপারটাই শেষ মার্কিন সেনা দেশ ছাড়ার আগেই করা যেতো। আর চতুর্থতঃ গণযোগাযোগের ব্যর্থতা। ৮ই জুলাই বাইডেন বলেছিলেন যে, তালিবানের পক্ষে পুরো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়া প্রায় অসম্ভব। বাইডেন আরও বলেছিলেন যে, ১৯৭৫ সালে সায়গনে মার্কিন দূতাবাসের ছাদের উপর থেকে মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নেবার মতো কোন পরিস্থিতিই কাবুলে নেই। ব্রেমার বলছেন যে, বাইডেনের এই কথাগুলি স্বল্প সময়ের মাঝেই ভুল প্রমাণিত হবার পরেও মার্কিম কর্মকর্তারা বলছিলেন যে, তারা সাফল্যের সাথে কর্মসম্পাদন করেছেন। শুধু তাই নয়, এরকম একটা দুর্যোগ পরিস্থিতিতে বাইডেন ক্যাম্প ডেভিডের অবকাশকেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন এবং সেসময় বাইডেনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা কেউই তার সাথে ছিলেন না। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাথে কথা বলছিলেন অনলাইনে। আর এতবড় একটা দুর্যোগের পর মুখ খুলতে বাইডেন নিঃসন্দেহে অনেক বেশি সময় নিয়েছেন।

ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, বাইডেনের সিদ্ধান্তের পিছনে যথেষ্ট জনসমর্থন রয়েছে। কারণ রাজনৈতিক মতামত দিতে অপারগ সাধারণ আমেরিকানরা আফগানিস্তানের ব্যাপারে মাথা ঘামাতে চান না। তবে কাবুল ছেড়ে আসার সময় যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তাহলে তা ১৯৭৯ সালের তেহরান দূতাবাসের বিপর্যয়কেও ছাড়িয়ে যাবে। এবং তা বাইডেনের প্রেসিডেন্সিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলতে পারে। এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কাবুলের ঘটনাগুলি হয়তো বড় কোন প্রভাব ফেলবে না; তবে আন্তর্জাতিকভাবে এর ফলাফল হবে মারাত্মক। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরা হয়তো মনে করতে শুরু করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তার আগের নেতৃত্বশীল অবস্থানে ফিরে এসেছে; তারা এখন ধরেই নেবে যে, যুক্তরাষ্ট্র আসলে একা একাই সিদ্ধান্ত নেবে এবং কাজ করবে; অন্য কারুর সিদ্ধান্ত তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্র একটা অনির্ভরযোগ্য বন্ধু। পশ্চিমা বিশ্বের আদর্শিক নেতৃত্ব দেবার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি হারালো। রাশিয়া এবং চীন এখন অন্যান্য দেশের কাছে আরও নির্ভরযোগ্যভাবে বলতে পারবে যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা রাখে না। এমতাবস্থায় বিশ্বের অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল থাকতে চাইবে না।

আফগানিস্তানের ব্যাপারে মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের ব্যর্থতা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হারাবার ক্ষেত্রে মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎবাণী পুরোপুরিই সত্যি হতে চলেছে। কাবুলের মার্কিন দূতাবাসের উপর মার্কিন হেলিকপ্টারের ছবিগুলি যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে তেমন কিছু না হলেও তা যে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের গোড়ায় আঘাত করেছে, তা সেদেশের নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছে। বুঝতে পেরেছে বলেই তারা কেউই চার দশকের মাঝে সবচাইতে মারাত্মক এই বিপর্যয়ের দায় নিতে চাইছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরা আরও আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে। কাবুলের বিপর্যয় সেই সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ়তা দিলো কেবল। প্রকৃতপক্ষে আফগান বিপর্যয় যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বশীল অবস্থানে ফিরে আসার শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিল।