Thursday, 14 August 2014

পিনাক-৬ এবং আমাদের "বাঙ্গালী সিনড্রোম"

১৪ অগাস্ট ২০১৪



নিজের কাছে যদি নিজের জীবনের কোন মূল্য না থাকে, তাহলে অন্য কারুর সাধ্য নেই আমার জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি এই কথাটা যদি আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস না করতে চাই, তাহলে কি এটাই প্রমাণ হয় না যে আমার নিজের কাছেই নিজের জীবনের মূল্য নেই; অন্যেরটা না হয় বাদ-ই দিলাম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা যখন বাস-ট্রেন-লঞ্চের ছাদে ভ্রমণে উদ্যত হই, তখন এটা কখনোই ভাবি না যে আমরা অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা পাবার জন্য সৃষ্টিকর্তার দেওয়া সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি নিয়ে জুয়া খেলছি! এই ব্যাপারটা অর্ধশিক্ষিত অথবা অশিক্ষিত দিনমজুর থেকে শুরু করে শিক্ষিত চাকুরিজীবী মানুষের মাঝে বিদ্যমান। এটা যেন আমাদের বাঙ্গালীদের জাতিগত কোন একটা বৈশিষ্ট কাছের কিছু একটা পাবার জন্য দূরে দেখার দৃষ্টি হারিয়ে ফেলি। কাজেই যারা দূরে দেখতে পান, তাদের উপড়ে অনেক বড় দায়িত্ব বর্তায় -এই জাতিকে সঠিক পথে চালিত করা। আমাদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লীডারশিপ ছাড়া আর কোনকিছুতেই এই ‘দূরারোগ্য ব্যাধি’ যাবার নয়। যে দেশে মানুষের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই, সেখানে দেশের নিরাপত্তা বোঝার ক্ষমতা কয়জনের থাকতে পারে? 

 ঠিক এরকমভাবেই তিলধারণের জায়গা ছিল না পিনাক-৬ লঞ্চটিতে। জীবনের চাইতে আমাদের সময়ের মূল্য অনেক বেশি।
 

"আরে কি আর হইবো 
পিনাক-৬ লঞ্চটা যখন শত মানুষে ভরে উঠছে, তখন কতজন অনিরাপদ মনে করে লঞ্চ থেকে নেমে যেতে চেয়েছেন? কতজন সত্যিকার অর্থেই বলে উঠেছিলেন যে আর যাত্রী উঠিও না? অবশ্য সাধারণ একজন মানুষের পক্ষে একটা জাহাজ কতজন মানুষ নিতে পারে সেটা বোঝা কঠিন হতেই পারে। কিন্তু এটাও ঠিক যে অতীতের অনেক দূর্ঘটনার কথা জানার পরে এটা কিছুটা হলেও বুঝতে পারা উচিত। একটা লঞ্চে তিলধারণের জায়গা না থাকাটা এই নয় যে লঞ্চটা এতগুলা মানুষ নেবার জন্যেই তৈরি হয়েছে। একটা অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই লঞ্চ যখন ঘাট ছেড়ে যায়, তখন বিআইডব্লিউটিএ-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কখনোই বলতে পারেন না যে তারা সেটা জানতেন না। ৮৫ জনের লিমিটের জাহাজে ২৫০ জন মানুষ কিভাবে ওঠে? তাদের পকেটেও যে দুএকটা পয়সা পড়ে না, সেটা কি করে বলি? এখানেও সেই একই বাঙ্গালী ধ্যানধারণা তাকে পেয়ে বসে- ছোট্ট কিছু পাবার আশায় কয়েকশ মানুষের জীবন সে ছেড়ে দেয় সৃষ্টিকর্তার হাতে; মনে মনে বলে, আরে কি আর হইবো! সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তর আর বিআইডব্লিউটিএ-এর লোকেরা জানেন এই জাহাজে কতটা লাইফবয় আছে; আছে কতটা লাইফ জ্যাকেট। তারা জানেন এই জাহাজের ডিজাইনে সমস্যা আছে কিনা। তারা জানেন এই জাহাজ কোন নদীতে চলার ক্ষমতা রাখে বা রাখে না। কিন্তু এদের কারুরই পকেটে যে দুএকটা পয়সা পড়ে না, সেটা কি করে বলি? তারাও মনে মনে বলেন সেই একই কথা - আরে কি আর হইবো! আমাদের কাছে পরিবারের সাথে আগামীকাল সকালে নাস্তা করাটা সারাজীবনের জন্য নিজের সন্তানকে না দেখতে পারার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ! এ জাতির কাছে জীবনের অর্থই অন্য রকমের!  

জীবনের মূল্য আমারদের কাছে না থাকলেও মৃতদেহের মূল্য আমাদের কাছে অনেক। অর্ধগলিত লাশ হলেও সেটা আমার কাছে জীবন বাঁচানোর চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পিনাক-৬ ডুবে যাবার পর যে পরিমাণ শক্তি নিয়ে আমরা সকলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, তার সিকিভাগও যদি আমরা ডুবার আগে দিতে পারতাম, তাহলে মনে হয় এতগুলা মানুষের সলিল সমাধি হতো না। বিআইডব্লিউটিএ-এর কোন অফিসার এত্তগুলা মানুষকে লঞ্চে উঠতে দিলেন, সেটা জানার চেষ্টা না করে সবাই উঠে পড়ে লাগলাম ফ্লোটিং ক্রেন রুস্তমনির্ভীক কেন নিজে চলতে পারে না; অথবা তাদেরকে টাগবোট দিয়ে ঠেলতে এত সময় কেন লাগে। (স্পীডবোট দিয়ে ঠেললে কি সমস্যা??) একবারও চিন্তা করি না যে, এই ক্রেন একটা মৃত জাহাজকে উঠানোর জন্যে ব্যবহৃত হবে; এদিয়ে কোন জীবন বাঁচবে না; ১০ ঘন্টা পরে আসলেই কি, আগে আসলেই কি। সাংবাদিক ভাইদেরও দোষ দেই কিভাবে? তারাও তো আমাদের মতোই সেই একই বাঙ্গালী সিনড্রোম-এ আক্রান্ত! কয়েকটা লাশের ছবি একটা খুঁজে না পাওয়া জাহাজের চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ! 

http://www.newsi24.com/index.php?page=news&cid=38
 ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার বোট 'অগ্নি শাসক' ও 'অগ্নি বিনাশ' কাউকে বাঁচাতে পারেনি, কারণ তারা মাওয়া নয়, অনেক দূর থেকে এসেছিল।

 
লাইফগার্ড কোথায়?  
কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি দিয়ে চললো ডুবে যাওয়া লঞ্চ খোঁজার পালা। টেকনোলজিরও যে লিমিট আছে, সেটা বুঝতে বাকি রইলো না। নদীর ভেতরে একটা লঞ্চ খুঁজে পাওয়া যদি এত্ত কষ্ট হয়, তাহলে মালেশিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৩৭০ মহাসমুদ্রে খুঁজতে কতটা কষ্ট করতে হয়েছিল সেটা বলাই বাহুল্য। তবে যা-ই হোক, কোটি টাকার অত্যাধুনিক সাইড-স্ক্যান সোনার আর সাব-বটম প্রোফাইলার কিন্তু সেই মৃত লঞ্চটি খোঁজার কাজেই ব্যবহার হলো। লঞ্চটাকে জীবিত রাখার পেছনে কত কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল? ঘাটে আবহাওয়ার পূর্ভাবাস দেওয়ার জন্য যে স্টেশন স্থাপনের কথা ছিল, সেটা হয়েছিল কি? উন্নত বিশ্বও লাশ খোঁজে; কিন্তু তারা লাশ খোঁজার চাইতে একশ গুণ বেশি খরচ করে মানুষ যাতে লাশ না হয়, সেই খাতে। মাওয়া ঘাটে এসে ফায়ার সার্ভিসের বোটগুলি লাশ খুঁজলো। অথচ এই বোটগুলি বানানোই হয়েছে মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য; লাশ খোঁজার জন্য নয়। এমেচার ভিডিওতে দেখা গেলো ১০-১৫টা স্পীডবোট কি করে মাওয়া ঘাট থেকে দ্রুতগতিতে এসে ভেসে থাকা মানুষগুলিকে বাঁচিয়ে তুললো। এরাই তো সেখানে লাইফগার্ডের দায়িত্ব পালন করলো। এই দ্রুতগামী বোটগুলি (যেকোন লঞ্চের চাইতে দুই থেকে তিন গুণ বেশি দ্রুতগামী) না থাকলে আরও অনেক বেশি মানুষ মারা যেত। সকল স্থানে না হলেও কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফায়ার সার্ভিসের লাইফগার্ড স্টেশন থাকা দরকার। ফায়ার বোট না হলেও দু’য়েকটা স্পীডবোট থাকা খুব জরুরি; যারা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করবে। ঢাকা বিভাগে ফায়ার সার্ভিসের ৫টি নৌ স্টেশন থাকলেও মাওয়াতে ছিল না। পিনাক-৬ মিশনে এই স্টেশনগুলি থেকে অগ্নি বিনাশঅগ্নি শাসক নামে দুটা ফায়ার ফ্লোট (বোট) পাঠানো হয়েছিল। বোটগুলি মাওয়া ঘাটে থাকলেও হয়তো কিছুটা কাজে আসতো। তবে এই ধরনের বোট বেশ দামী; সব জায়গায় রাখা সম্ভব হবে না। তবে কিছু স্পীডবোট রাখাটা অতটা কষ্টসাধ্য হবে বলে মনে হয় না। 

http://www.jamunanews24.com/2014/08/07/26197.php
মাওয়ায় বিআইডব্লিউটিএ-এর ফ্লোটিং ক্রেন 'নির্ভীক'-এর বাঁ পাশে বেকার দাঁড়িয়ে আছে টাগবোট। জানান দিচ্ছে যে এই জাহাজগুলির পানির নিচে জাহাজ খোঁজার কোন সামর্থ নেই

http://www.dailymail.co.uk/news/article-2710037/The-end-voyage-Costa-Concordia-reaches-ship-breaking-yard-Italy-five-day-towing-operation.html
দৈত্যাকৃতির জাহাজ 'কস্টা কনকরডিয়া' ভাসিয়ে তোলা হয়েছিল স্টীলের তৈরি ফাঁপা সিলিন্ডার ব্যবহার করে। তাহলে আমরা শুধু ক্রেন নিয়ে লাফালাফি করছি কেন?


রেসকিউ & স্যালভেজ = উদ্ধার
'রেসকিউ আর স্যালভেজ-এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; আমরা বাংলায় যদিও ‘উদ্ধার বলেই খালাস। আমরা পিনাক-৬-এর খোঁজে যা যা ব্যবহার করেছি, তার সবই স্যালভেজের কাজ করেছে। মানে ডুবে যাওয়া জাহাজ খোঁজা ও পানির উপরে ওঠানোর চেষ্টা করেছি কাউকে বাঁচাবার চেষ্টা করিনি; যেটা হতো রেসকিউ স্যালভেজ অনেক ক্ষেত্রেই একটা কমার্শিয়াল কাজ। জাহাজ উপরে তুলে সেই জাহাজকে মেরামত করে আবার চালু করা, অথবা সেটা স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া। তুলতে কত খরচ হবে, বনাম বিক্রি করলে কত পাওয়া যাবে পুরোটাই টাকা-পয়সার খেলা। তাই বেশিরভাগ স্যালভেজ অপারেশনে সময় নির্ধারণ করা হয় টাকার দিকটা বিবেচনা করে; কারুর জীবন বাঁচাবার কথা চিন্তা করে নয়। আমাদের বিআইডব্লিউটিএ-এর ফ্লোটিং ক্রেন হামজা, রুস্তম, প্রত্যয়নির্ভীক এই স্যালভেজ কাজের অংশ। এদের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে কোন গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটে একটা জাহাজ ডুবে গিয়ে সেই নৌরুট যেন বন্ধ করে না দেয়। ডুবে যাওয়া লঞ্চের থেকে গলিত লাশ উদ্ধার এদের প্রধান দায়িত্ব নয়। তবুও একেকটা ক্রেন একেক জায়গায় রাখা হয়, যাতে অপেক্ষাকৃত দ্রুতগতিতে অকুস্থলে গিয়ে পৌঁছাতে পারে; যে কাছে থাকবে সে যাবে সেখানে। কিন্তু কথা তো সেখানে গিয়েই ঠেকলো আগে গেলেই কি? কাউকে তো বাঁচাতে পারবেন না। তাহলে নারায়নগঞ্জ, চাঁদপুর, বরিশাল- এসব যায়গায় ক্রেনগুলিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে লাভটা কি হচ্ছে? লাভটা হচ্ছে এই যে আমরা যত দ্রুত সম্ভব আপনাদের প্রিয়জনের লাশ আপনাদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্যে নিয়োজিত! ভয়ঙ্কর শোনালেও ব্যাপারটা তা-ই। যারা একই ক্যাপাসিটির দুটি করে ক্রেন কেনার পরামর্শ দিয়েছেন, তারাও তো আমাদের মতোই বাঙ্গালী রোগে আক্রান্ত! ৬০টন ক্যাপাসিটির ২টা (হামজারুস্তম) এবং ২৫০টন ক্যাপাসিটির ২টা (প্রত্যয়নির্ভীক) ক্রেনের বদলে ৬০টনের একটি, ১২০ টনের একটি, ২৫০ টনের ১টি আর ৫০০ টনের একটি ক্রেন হলে অন্তত স্যালভেজ অপারেশনটা বিআইডব্লিউটিএ আরও একটু ভালোভাবে চালাতে পারতো। অন্তত আন্তর্জাতিক মানের স্যালভেজ কোম্পানিগুলি সেটাই করে থাকে। আর সবসময় কি জাহাজের ওজন ক্রেনের ক্যাপাসিটি থেকে কম হবে? আন্তর্জাতিকভাবে সুক্ষ্যাতি পাওয়া কোম্পানি বসক্যালিসের ৯টা বিশাল ক্রেন রয়েছে, যার সবচেয়ে ছোটটি ৪০০টন ক্ষমতার হলেও সবচেয়ে বড়টি কিন্তু মাত্র ৩,২০০ টনের। তার মানে এর বেশি ওজনের জাহাজ হলে কি এরা উঠাতে পারবে না? এখানেই আমাদের দেশের মানুষের অজ্ঞতা। পানিতে জাহাজ ডুবলে শুধু ক্রেন দিয়েই সেটাকে টেনে তুলতে হবে এটা কে বলেছে? ২০০১ সালে দেশী কোম্পানি প্রান্তিক বেঙ্গল স্যালভেজ এন্ড ডাইভিং কোন প্রত্যয়ের মতো শক্তিশালী কোন ক্রেন ছাড়াই চট্টগ্রাম বন্দরের জেটির পাশেই ডুবে যাওয়া এমভি সাউদার্ন কুইন জাহাজ উদ্ধার করে। মালামাল ছাড়া এই জাহাজের ওজন ছিল ৩,৯৩২ টন। সিম্পল সাইন্স ব্যবহার করেছিল তারা ২,৩০০ টন ক্যাপাসিটির ৪টা পন্টুন বেধে দিয়েছিল তারা জাহাজের সাথে; ব্যাস, বুদবুদ যেমন সবসময় পানির নিচ থেকে উপরের দিকে যায়, ঠিক তেমনি জাহাজ পানিতে ভেসে উঠলো। ২০১২ সালে ডুবে যাওয়া ১,১৪,০০০ টনের ইটালিয়ান ক্রুজ লাইনার কস্টা কনকরডিয়া একইভাবে অল্প কিছুদিন আগেই তোলা হয়েছে। ২০১২ সালে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের কাছে তেলবাহী জাহাজ এমটি মেহেরজান ৬০০ টন তেল নিয়ে ডুবে যায়। আমাদের বিআইডব্লিউটিএ জাহাজটিকে উঠাতে ব্যর্থ হলেও জাহাজের মালিকপক্ষ কিন্তু ঠিকই নয় মাস পরে জাহাজটি উঠিয়ে ফেলে। ২০০৯ সালে ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমভি কোকো-৪-এর মালিকপক্ষও কিন্তু একই কাজ করে আড়াই বছর পরে। কেউই বিশাল কোন ক্রেন ব্যবহার করেনি। পন্টুন, বার্জ, এয়ার ব্যাগ, খালি কার্গো জাহাজ, ইত্যাদি বেঁধে একটা ডুবে যাওয়া জাহজকে উদ্ধার করা যায়। এটা সিম্পল ফিজিক্স। কাজেই বিআইডব্লিউটিএ-এর ক্রেনের উপরে সকল রাগ ঝাড়ার অভ্যাস আমাদের পরিহার করা উচিত। বরং সেই একই সংস্থার সেই লোকগুলিকে জিজ্ঞেস করা দরকার আপনারা কি ইচ্ছে করেই লঞ্চটা উদ্ধার করলেন না? স্যালভেজ করতে দেরী হয়ে গেলে বিকৃত লাশ চিনতে কষ্ট হবে এই জন্য, নাকি ক্ষতিপূরণের দায়ভার লাঘবের জন্য? তাহলে সেই প্রশ্নেই আবার আসি - নারায়নগঞ্জ, চাঁদপুর, বরিশাল- এসব যায়গায় কাছাকাছি ক্যাপাসিটির এই ক্রেনগুলিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছেন কেন দ্রুত উদ্ধারের জন্য?  

http://www.onbangladesh.org/blog/blogdetail/detail/8674/Rodrow/45347
'এমভি মিরাজ-৪'-কে টেনে তুলছে ফ্লোটিং ক্রেন 'প্রত্যয়'। এতে প্রমাণ হয়েছিল যে আবহাওয়া ভালো থাকলে আর ক্রেনের ক্যাপাসিটির মধ্যে থাকলে সেটা ঠিকই কাজ করবে।



জাহাজ খুঁজে না পেলে কি টেনে তুলবেন? 
আমরা যেহেতু প্রথমেই আমাদের জীবন বিকিয়ে দিয়েছি, কাজেই লাশ ছাড়া আমাদের আর কিছু থাকছে না। শোকার্ত পরিবারগুলির কাছে তখন দাফন করার জন্য লাশটাই অনেক বেশি গুরুত্ববহ হয়ে দাঁড়ায়। লঞ্চ খুঁজতে সর্বশক্তি নিয়োগ করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেখানে বেশ খানিকটা কমেডি অব এরর ধরা পড়ে যায়। এই ধরনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য কোন ধরনের আলাদা এজেন্সি না থাকায় কে কোথায় থেকে কতটুকু করবে, সেটা বোঝা দুষ্কর হয়ে গেল। বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিমান বাহিনী, সেনাবাহিনী বাকি রয়নি কেউ। চট্টগ্রাম বন্দরও যোগ দিল সেখানে। কিন্তু কে কোথায় কিভাবে কাজ করছে সেটা এক জায়গা থেকে জানাটা যেন অসম্ভব হয়ে গেল। প্রথমে বিআইডব্লিউটিএ-এর সার্ভে জাহাজগুলি হিমসিম খেল। সন্ধানী, তিস্তা, 'তুরাগ', ব-দ্বীপ এই জাহাজগুলি এরকম পরিস্থিতিতে এর আগেও পড়েছে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও ব্যর্থ হয়েছে। মাওয়া ঘাটের বিআইডব্লিউটিসি-এর টাগবোটগুলিতে (আইটি-৩৯৪, ৮-৩৯৭) লাগানো যন্ত্রপাতিও লঞ্চ খুঁজে পেত বলে মনে হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের জাহাজগুলিতেও ডুবে যাওয়া জাহাজ খোঁজার যন্ত্র নেই। তাই তারা নদীতে জাল ফেলে, দড়ি টেনে, রশিতে ইট বেঁধে, এংকর টেনে ও ডুবুরি নামিয়ে লঞ্চ খোঁজার চেষ্টা করেন, যাতে সাকসেস পাবার সম্ভাবনা তেমন একটা ছিল না। কোস্ট গার্ড, র‌্যাব, পুলিশ এরা দিলো সিকিউরিটি এবং জনবল। র‌্যাব এবং বিমান বাহিনী হেলিকপ্টার থেকে (লাশ খোঁজার?) সাপোর্ট দিল। ২০১৩ সালে কোরিয়া থেকে কেনা ফ্লোটিং ক্রেন প্রত্যয়নির্ভীক-এর সাথে এসেছিল ৪০টন টানা ক্যাপাসিটির শক্তিশালী টাগবোট দুরন্তদুর্বার দুটি স্পীডবোট আর চারটি রেসকিউ বোটও থাকার কথা এই জাহজগুলির সাথে। ২০১৪-এর ঝড়ের সিজনেই প্রত্যয় প্রথম মিশন পেয়ে যায়- লঞ্চ ডুবির জন্যে এই দেশে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না। পানির ৮০ ফুট নিচ থেকে এমভি মিরাজ-৪-কে টেনে তোলে এই ক্রেন। প্রমাণ হলো যে আবহাওয়া ঠিক থাকলে আর জাহাজের ওজন সাধ্যের মাঝে থাকলে এই ক্রেন কাজ করবে। সেবারে লঞ্চ খুঁজে পেতে কষ্ট পেতে হয়নি তেমন, তাই কোন কথাও উঠেনি। সবাই ব্যস্ত ছিল ঝড়ের পূর্বাভাস সত্তেও লঞ্চটি কিভাবে ছাড়া হলো সেটা নিয়ে। ক্রেনগুলি উদ্ভোদনের সময় কিন্তু বলা হয়েছিল যে এগুলির সাথে পানির নিচে লঞ্চ খোঁজার যন্ত্র আছে। যেহেতু ক্রেনগুলি চলতে পারে না, তাই ধরেই নেয়া যায় যে সেই যন্ত্র হয়তো টাগবোটগুলিতেই রাখা হয়েছে। কিন্তু যখন মাওয়ায় পিনাক-৬ উদ্ধারের সময় ক্রেনের সাথে টাগবোটও বসে থাকতে দেখা গেল, তখন প্রশ্ন জাগে স্বাভাবিকভাবেই আদৌ কি সেই ক্রেনের সাথে পানির নিচে জাহাজ খোঁজার যন্ত্র এসেছিল? জাহাজ খুঁজে না পেলে কি টেনে তুলবেন?  

http://www.mnabd.com/press/?p=18976
'জরিপ-১০' - নৌবাহিনীর অফিসারদের কথায় এই ছোট্ট জাহাজটাই 'পিনাক-৬' খোঁজায় বাংলাদেশ সরকারের সবচাইতে বড় অস্ত্র ছিল।


ইমার্জেন্সি ডিসাসটার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি  
কাজেই আবারো সেই নৌবাহিনী। তাদের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের একটা দল মংলা থেকে সড়কপথে যন্ত্রসহ হাজির হয়ে গেলেন। পোর্টেবল এই সোনার-গুলি যেকোন জাহাজে লাগিয়ে সেটাকে সার্ভে জাহাজ বানিয়ে দেওয়া যায়। তাহলে প্রশ্ন চট্টগ্রাম থেকে জরিপ-১০ নামের ছোট্ট জাহাজটি কেন আনা হলো? কারণ এই জাহাজের ভেতরে মাল্টিবিম ইকোসাউন্ডার’ (বেশ বড় একটা যন্ত্র যেটি পোর্টেবল না)  রয়েছে। আবার জাহাজের পেছন থেকে ছোট্ট পোর্টেবল সাইড-স্ক্যান সোনার দিয়েও সার্ভে করা হলো, যেটি পানির নিচে খুব অল্প জায়গার আল্ট্রা হাই রেজোলিউশন ইমেজ তৈরি করতে পারেমাল্টিবিম ইকোসাউন্ডার-এ অনেক বড় জায়গায় সার্ভে করা যায়। যেহেতু সবার ধারণা ছিল যে স্রোতে জাহাজ অনেক দূর চলে গিয়ে থাকতে পারে, কাজেই বড় জায়গা সার্ভে করতে পারে এমন যন্ত্রই দরকার। ছোট্ট জরিপ-১০ জাহাজটা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিকূল আবহাওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে উপকূলীয় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এসেছে। এটার ডিজাইন দেখলে বোঝাই যায় যে সমুদ্রে যাবার জন্য এটি তৈরি করা হয়নি। নৌবাহিনীর মাল্টিবিম ইকোসাউন্ডার’-সহ জাহাজ বিএনএস অনুসন্ধান’ এবং বিএনএস শৈবাল (যেগুলি সমুদ্রগামী জাহাজ) যোগার করা যেত কিনা (বা হয়েছিল কিনা) সেটা জানা যায়নি যদিও। যাইহোক, সোনারের সার্ভে লোকেশনের সমস্যার সাথে যোগ হয় নদীর পানিতে ভেসে আসা পলি-কাদা-বালুর চ্যালেঞ্জএবারেও পোর্টেবল একটা যন্ত্র দরকার হলো সাব-বটম প্রোফাইলারচট্টগ্রাম বন্দরের টাগ কান্ডারী-২, যেটি জরিপ-১০-এর আগেই চলে এসেছিল, সেটি থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হল সাব-বটম প্রোফাইলার’এই যন্ত্র পানির নিচে পলি-কাদা-বালুর নিচেও একটা জাহাজ খুঁজে পাওয়ার সামর্থ রাখে। শেষ পর্যন্ত পানির নিচে কিছু একটা কিন্তু খুঁজে পাওয়া গেলেও নদীর স্রোতের কারণে ডুবুরীরা বেশিদূর যেতেই পারলেন না। পানির ৬৫ ফুট নিচে ১৭ থেকে ২০ মিটার সাইজের এই বস্তুটি পিনাক-৬-এর প্রোফাইলের সাথে মিলে গিয়েছিল মোটামুটি। একবাক্যে বলতে গেলে বিআইডব্লিউটিএ এবং ফায়ার সার্ভিস লঞ্চ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হবার পরে এলো নৌবাহিনী, এরপর এলো চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ। এখানে পুরো অপারেশনের দায়িত্ব কার হাতে থাকবে সেটা নিয়ে স্বভাবতই একটা প্রশ্ন থেকে যায়। সমন্বয়হীনতার অভাব ছিল সবক্ষেত্রে। একটা ইমার্জেন্সি ডিসাসটার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দিল। এমন একটা এজেন্সি থাকলে হয়তো সময় নষ্ট কম হতো; তারা জানতো কোন সময় কাকে ডাকতে হবে। রানা প্লাজা ধ্বসের পরেও এইরকম এজেন্সির দরকার অনুভূত হয়েছিল। এনটিভি বিল্ডিং এবং বসুন্ধরা সিটি বিল্ডিং-এ আগুন লাগার পরেও বোঝা গিয়েছিল ব্যাপারটা। ভবিষ্যতে যে আমাদের আরও জটিল কোন দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে না, সেটা কে বললো? পিনাক-৬-এর ক্ষেত্রে লাশ উদ্ধার মূল লক্ষ্য থাকলেও রানা প্লাজা, এনটিভি ও বসুন্ধরার ক্ষেত্রে কিন্তু মানুষের জীবন বাঁচানোই মূল লক্ষ্য ছিল। ভবিষ্যতেও এরকম ঘড়ির কাটার দিকে লক্ষ্য রেখে উদ্ধারকাজ চালাতে হতে পারে। 

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/287404/%E0%A6%AA%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%A6%E0%A7%88%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%98%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%85%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9E%E0%A6%BE%E0%A6%A4-%E0%A6%AC%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%81%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A8
উদ্ধারকাজ শেষ করা পর্যন্ত 'পিনাক-৬' ল্যাপটপ স্ক্রীনে একটা রঙ্গিন দাগ হয়েই থেকে গেল। কারো মনে সত্যিকারের দাগ কাটতে পারলে কেউ না কেউ দায়িত্ব স্বীকার করতেন।


দায়িত্ব? সেটা আবার কি?  


সমুদ্রে তেল-গ্যাস আহরণ করতে গিয়ে পানির অনেক নিচে (৯০০ ফুটেরও বেশি গভীর পর্যন্ত) ডুবুরী পাঠাতে হয় তারা বেশ খানিকটা প্রতিকূল আবহাওয়াতেও কাজ করতে পারে। কারণ তাদের ডাইভিং সাপোর্ট জাহাজগুলি সেইরকমভাবে তৈরি। আমাদের দেশে সেই প্রযুক্তি নেই; তাই ডুবুরীরা কেন সোনারে খুঁজে পাওয়া জাহাজ পর্যন্ত যেতে পারলেন না, সেটা নিয়ে তর্ক করা অবান্তর। আর ডুবুরীরা নিচে যেতে না পারলে কিন্তু জাহাজের সাথে ক্রেনও আটকানো সম্ভব নয়। যেহেতু জাহাজটা নদীপথে কোন সমস্যা করবে না, তাই পরবর্তীতে জাহাজ উঠাতে গেলে মালিকপক্ষকেই উঠাতে হবে। আর অন্যান্য সববারের মতো এবারও মালিকপক্ষের যে কিছু হবে না, সেটা তো জানা-ই। ২০১৪-এর এপ্রিলে দক্ষিণ কোরিয়ার ফেরী সিওল ডুবিতে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করেছেন। জাহাজ ইন্সপেক্ট করেছেন যে যে অফিসার, তাদের বিরূদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলা হয়েছে জাহাজের চালক এবং অন্যান্য ক্রুর বিরূদ্ধে। মালিকপক্ষের বিরূদ্ধে মামলা হয়েছে; লাইসেন্স বাতিল হয়েছে কোম্পানীর। আর আমাদের এখানে কেউ কখনো দায়িত্বই স্বীকার করেনা। যেখানে কোন জবাবদিহিতা নেই, সেখানে দায়িত্ব নেবার তো প্রশ্নই আসে না। 

বারে বারে ক্রেনের ক্যাপাসিটির বাইরে বলে উদ্ধার অভিযান বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু একটা বড় জাহাজ যদি বুড়িগঙ্গা বা কর্ণফুলী নদীর ঠিক মাঝাখানে ডুবে যায়, তাহলে কি উদ্ধারকাজ এত্ত সহজে গুটিয়ে নেওয়া যাবে? হাজার কোটি টাকার ক্ষতির প্রশ্ন সেখানে। নাকি সেই ক্ষেত্রে আবার আমাদের বিআইডব্লিউটিএ-এর অনেক বুদ্ধি হয়ে যাবে? তারা কি ঝট করে বুঝে ফেলবেন যে শুধু ক্রেন না, অন্যভাবেও জাহাজ তোলা সম্ভব? লাশের চেয়ে টাকার গন্ধ ভালো বলেই কি? প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর আমরা ভুলে যাই বারবার। আর যেখানে কিউরও দিতে পারবে না কারুর জীবন, সেখানে প্রিভেনশন ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা আছে কি? বাঙ্গালী সিনড্রোম-এ আক্রান্ত এই জাতিকে কে উদ্ধার করবে? আর উদ্ধার করলেও সেটা কি জীবিত (মানে রেসকিউ) নাকি মৃত (স্যালভেজ) উদ্ধার হবে?

Tuesday, 22 July 2014

ফরাসী সামরিক কূটনীতি কি নতুন কিছু?

২২ জুলাই ২০১৪



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা যে অপার শক্তিশালী হয়ে দেখা দেয়, সেটা মেনে নিতে কিছুটা হলেও কষ্ট হচ্ছিল এতোদিনের বিশ্বকর্তা বৃটেন আর ফ্রান্সের। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ যুদ্ধের পর থেকেই বৃটেন আর ফ্রান্স বুঝতে পারে যে চাবি হাতবদল হয়ে গেছে। ১৯৬০-এর দশকে এসে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মানুষের স্বাধীনচেতা অনুভূতি চাড়া দিয়ে উঠে; সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে একই সাথে। এই দুটি ঔপনিবেশিক শক্তি ছাড়াও বাকি দেশগুলিও তাদের উপনিবেশ গুটিয়ে ফেলতে শুরু করে; দিন বদলের হাওয়া লেগেছে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এই আন্দোলন দমন করতে যেয়ে তারা বুঝতে পারে যে তাদের সামরিক বাহিনীর গঠনে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে। সামনের দিনগুলিতে এইরকম গেরিলা যুদ্ধের সম্মুখীন তাদের হতেই হবে। তখন থেকেই পরিবর্তন শুরু হলেও ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরূদ্ধে স্নায়ূযুদ্ধই ছিল তাদের প্রাধান্য। সোভিয়েত পতনের সাথে সাথে বিরাট আকৃতির যুদ্ধের সম্ভাবনা কমতে থাকে। আর ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আল-কায়েদার হামলার পর থেকে গেরিলা-টাইপের যুদ্ধের সম্ভাবনাই বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বাকিরাও তাদের সামরিক বাহিনীতে আনে পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের একটা উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে ফ্রান্স।

মালির রাজধানী বামাকো-তে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর 'সি-১৭' পরিবহণ বিমান থেকে ফরাসী সেনাবাহিনীর 'ভিএবি' আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) নেমে আসছে। ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ ইউনিটই আকাশপথে পরিবহণ করা সম্ভব।


ফ্রেঞ্চ সেনাবাহিনী দ্রুতিই যেখানে এখন একমাত্র চাহিদা
ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীর গঠন জানান দিয়ে দেয় যে তারা কোন ধরনের মিশনকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের এই বাহিনী তৈরি করেছে। একসময় আমরা সেনাবাহিনীর ডিভিশনকেই প্রধান ইউনিট হিসেবে জানতাম; ডিভিশনের মধ্যে থাকবে কয়েকটি করে ব্রিগেড, রেজিমেন্ট; সেগুলির মাঝে থাকবে কয়েকটি করে ব্যাটালিয়ন (উদাহরণস্বরূপঃ বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে রয়েছে ৮টা ডিভিশন)। কিন্তু মজার ব্যাপার যে এখন ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় ইউনিট হলো ব্রিগেড। তাদের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যত চিন্তা তাদেরকে বলে দিচ্ছে যে সামনের দিনগুলিতে বড় আকারের যুদ্ধ (যেখানে ডিভিশনের পর ডিভিশন সৈন্য দরকার হবে) কমে যাচ্ছে। ১০ থেকে ২০ হাজার সৈন্যের ডিভিশনের যায়গায় প্রধান ফর্ম্যাশন হয়ে যাচ্ছে ৩ থেকে ৬ হাজার সৈন্যের ব্রিগেড বা রেজিমেন্ট। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের দরকার হবে ছোট আকারের বাহিনী, যা খুব দ্রুত পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মোতায়েন করা যাবে। আর সেই বাহিনী অনেক কম শক্তি নিয়েও তার কাজ হাসিল করে নিতে পারবে, কারণ এই বাহিনীর পেছনে বিমান, স্যাটেলাইট ছাড়াও যত ধরণের উন্নত প্রযুক্তি আছে সবকিছুই থাকবে। এই কম শক্তির সেনাবাহিনীর গঠন খুঁটিয়ে দেখলে অনেক কিছুই পরিষ্কার হবে। 

ফরসী সেনাবাহিনীর 'এমএক্স-১০আরসি' আর্মার্ড কার। যেখানেই দ্রুত সৈন্য পাঠানো দরকার, সেখানেই ট্যাঙ্কের জায়গায় স্থান করে নিচ্ছে এই দ্রুতগামী সাঁজোয়া গাড়িগুলি। ১৫ টনের এই গাড়িগুলি বিমানে পরিবহন করা সম্ভব।


ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর এখন মোটামুটিভাবে ৮টা ফাইটিং ব্রিগেড রয়েছে। এর মধ্যে দুটা হলো আর্মার্ড ব্রিগেড, ২টা মেকানাইজড ব্রিগেড, ২টা লাইট আর্মার্ড ব্রিগেড, ১টা প্যারাশুট ব্রিগেড ও ১টা মাউন্টেন ব্রিগেড। এর বাইরেও অবশ্য আরো ৪টা বিভিন্ন সাপোর্ট ব্রিগেড ও স্পেশাল ফোর্সের ১টা ব্রিগেড ও ৩টা রেজিমেন্ট রয়েছে। দ্রুত পৃথিবীর যেকোন জায়গায় পাঠাতে এই বাহিনীকে এভাবে গঠন করা হয়েছে। এখানে দুটা মাত্র আর্মার্ড ব্রিগেড রয়েছে; যার একেকটিতে ১০০ থেকে ১২০টার মতো এএমএক্স-৫৬ লেক্লার্ক ট্যাঙ্ক রয়েছে। এই ট্যাঙ্কগুলি ৫৪-৫৭টন ওজনের। এছাড়াও ট্যাঙ্কের সাথে সাপোর্ট দেবার জন্যে রয়েছে জিটিসি সেলফ-প্রপেল্ড আর্টিলারি; এগুলি ৪২ টন ওজনের। এই হেভি ইকুইপমেন্টের জন্যে এই ইউনিটগুলি (আর্মার্ড ব্রিগেড) বিমানে করে পৃথিবীর কোথাও পাঠানো যাচ্ছে না; জাহাজ ছাড়া গতি নেই। কাজেই যেখানে ট্যাংক ছাড়া যুদ্ধ করা সম্ভব হবে না, সেখানে জাহাজের সাহায্য নিতে হবে; সময় বেশি লাগবে। কিন্তু যেখানে সময় কম, আর ট্যাঙ্ক ছাড়াও কাজ হাসিল করা সম্ভব, সেখানে পুরো ইউনিটই আকাশপথে চালান করার পদ্ধতি রাখা হয়েছে। মেকানাইজড আর লাইট আর্মার্ড ব্রিগেডগুলি এমনই। এগুলিতে লেক্লার্ক ট্যাংকের জায়গায় রাখা হয়েছে এএমএক্স-১০আরসি আর্মার্ড কার (১৫টন) আর ইআরসি-৯০ আর্মার্ড কার (৮টন)। আর জিটিসি সেলফ-প্রপেল্ড আর্টিলারির স্থলাভিষিক্ত হয়েছে সীজার সেলফ-প্রপেল্ড আর্টিলারি, যার ওজন ১৮টন। আর্মার্ড আর মেকানাইজড সবগুলি ইউনিটেই রয়েছে ভিএবি আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি), আর ভিবিসিআই ইনফ্যান্ট্রি কমব্যাট ভেহিকল (আইএফভি)।ভিএবি-এর ওজন ১৪টন আর ভিবিসিআই-এর ওজন ২৬টন। এই সবগুলি গাড়িই বিমানে করে স্থানান্তর সম্ভব। প্যারাশুট আর মাউন্টেন ব্রিগেডগুলি আরও অনেক হাল্কা। ইউরোপের যেকোন যুদ্ধের ময়দানে এই হাল্কা ইউনিট খুব বেশি কিছু করতে পারবে না। তার মানে এটাই যে ফ্রান্স ইউরোপে বড় কোন যুদ্ধের সম্ভাবনা প্রায় উড়িয়েই দিয়েছে। এখন তাদের কূটনীতি পৃথিবীর এমন সকল জায়গাকে ঘিরে যেখানে কোন একটা দ্বন্দে জয় পেতে খুব বেশি ভারি যন্ত্রপাতির দরকার হবে না। ফ্রান্সের চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দু যে এখন আফ্রিকা, সেটা বুঝতে খুব বেশি হিসেব কষতে হয় না। প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে ফ্রান্স এই এলাকার অনেকগুলি দেশকে ভালোভাবেই চেনে। আর তারা এ-ও দাবি করে যে তারাই এই এলাকায় সবচেয়ে দক্ষতার সাথে অপারেট করতে পারবে। আফ্রিকাতে তারা একাধিক যায়গায় তাদের পা-রাখার পথ খোলা রেখেছে। যেকোন আন্তর্জাতিক দ্বন্দে তারা এই পথ ব্যবহার করবে। 

আফ্রিকার পুলিশম্যান এখন কি করছে?
ফরাসীদেরকে আফ্রিকার পুলিশম্যান বললে দোষ হবে নাতারা গত অর্ধ-শতাব্দীতে এতবার আফ্রিকাতে তাদের প্রাক্তন উপনিবেশগুলিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে যে, তাদের আফ্রিকাতে আসা-যাওয়াটা প্রায় গা-সওয়াই হয়ে গেছে। আর সুপার-পাওয়ার না হবার কারণে ফরাসীরা খুব বেশী ডেউ তৈরি না করেই বারংবার তাদের কাজ করে গেছে আফ্রিকাতে। মার্কিনীদের পক্ষে অবশ্যই এত্ত সহজে হস্তক্ষেপ করা সম্ভব ছিল না। আমেরিকার সামরিক কার্যকলাপ ফলাও করে হেডলাইন হলেও ফ্রান্সের অভিযানগুলি কেন যেন ছোট অভিযান হিসেবেই কভার করা হয়েছে। অথচ জাতসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হবার পুরো ফায়দাটা কিন্তু তারা নিয়েছে। আফ্রিকাতে এতবার আসা-যাওয়া করলেও বেশিরভাগক্ষেত্রেই জাতিসংঘের অনুমতি তাদের নিতে হয়নি। আফ্রিকানরাই প্রথমে সুযোগ করে দিয়েছে ফরাসীদের। আফ্রিকাতে গণতন্ত্রের চর্চা খড়ের গাদায় সুঁই খোঁজার মতোসেসব দেশে বারংবার সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল ফরাসীদেরকে হস্তক্ষেপের সুযোগ দিয়েছে। একই ব্যাপার ঘটিয়েছে ঘন ঘন গৃহযুদ্ধ। চাদ, গ্যাবন, সেনেগাল-এর মতো দেশে তারা স্থায়ীভাবে রয়ে যাবার সুযোগ পেয়েছে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রনীতিতে আফ্রিকা অনেক বড় স্থান করে রেখেছে। তাদের সামরিক বাহিনীর নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবার কথা নয়। 

২০১২ সালের অক্টোবরের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে চাদ-এর রাজধানী নিজালমিনাতে ফরাসী বিমান বাহিনীর দু'টা 'মিরাজ এফ-১সিআর' এবং দু'টা 'মিরাজ-২০০০' জঙ্গী বিমান। পরের বছরে মালি-এর যুদ্ধে এই ঘাঁটি বিরাট ভূমিকা রাখে।


মরুভূমিতে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ!
পূর্ব আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা’ এলাকাটা এখন বেশ গরম। সোমালিয়া এখানে একটা প্রায় সরকার-বিহীন এলাকা (দেশ বলা দুষ্কর)এখানে বহুদিন ধরে গেড়ে বসে আছে আস্ত্রধারী আল শাবাব গোষ্ঠি। আল-কায়েদার সাথেও এদের আঁতাত রয়েছে বলে জানা যায়। এই এলাকায় কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া, এবং অন্যান্য দেশে বিভিন্ন ধরণের সন্ত্রাসী হামলার জন্যে এরা দায় স্বীকার করেছে। এদের বিরূদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র; আর সেই যুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হচ্ছে জিবুতি, যা একটা ফ্রেঞ্চ উপনিবেশ। এর কিছুটা পশ্চিমে সাব-সাহারান আফ্রিকাতে প্রায় পুরোটাই মরু অঞ্চল। এই বিশাল এলাকায় কোন ধরনের সরকারই কাজ করে না। এই দেশগুলির হাজার হাজার মাইল সীমানা রক্ষা করা অসম্ভব। অত্যন্ত গরীব হওয়ায় এই দেশগুলির সমস্যা আরও বেশি প্রকট। এই এলাকায় আল-কায়েদা সমর্থিত অনেক অস্ত্রধারী গোষ্ঠী রয়েছে। এদেরকে মোকাবিলা করার জন্য আমেরিকা যেমন উঠে পড়ে লেগেছে, তেমনি ফ্রান্সও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। মার্কিনীরা এখানকার খুব বেশি দেশে তাদের সৈন্য মোতায়েনের সাহস পায়নি জনরোষ সৃষ্টি হতে পারে ভেবে। তবে ফ্রেঞ্চরা এখানে রয়েছে বেশ অনেকদিন ধরেই। ১৯৮৩ সাল থেকে থাকলেও ১৯৮৬ সালে চাদ-এর সাথে গাদ্দাফীর লিবিয়ার যুদ্ধের সময় ফরাসীরা এখানে একেবারে গেড়ে বসে প্রেসিডেন্ট হিসেন হাব্রের হাত ধরে। লিবিয়ার সাথে চাদের যুদ্ধের শেষে, এমনকি আন্তর্জাতিক আদালতে চাদ-লিবিয়ার সীমান্ত সমস্যা মিটমাট হয়ে যাবার পরেও ফ্রেঞ্চরা এখানে রয়ে যায়। অপারেশেন ইপারভিয়ে সেই ৮৬-তে শুরু হয়ে এখনো চলছে। ফরাসীদের কাছে চাদ মরুভূমির মাঝে একটা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মতো। ফরাসী বিমান বাহিনীর ৬ থেকে ৮টা ফাইটার বিমান চাদের রাজধানী নিজালমিনাতে সবসময়ই থাকে। এই ঘাঁটি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা ২০১৩ সালে মালি-এর যুদ্ধের সময় হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের পিছনে থাকার নীতি
চাদ থেকে দক্ষিণে গ্যাবনের রাজধানী লিব্রেভিলে ফ্রান্সের ছোট একটা সেনাদল স্থায়ীভাবে রয়েছে বহুকাল ধরে। আবার আফ্রিকার পশ্চিম উপকুলে সেনেগালের রাজধানী ডাকার-এও ফ্রান্সের একটা ঘাঁটি ছিল ৫০ বছর ধরে; ২০১০ সালে ঘাটিটি ছেড়ে দেয়ার কথা দেয় ফ্রান্স। কিন্তু সন্ত্রাস বিরোধী মিশনের গুরুত্ব তুলে ধরে ফ্রেঞ্চরা ডাকারে রয়েই যায়। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, সিয়েরা লিওন আর কুট-ডে-ভোয়া (আইভোরি কোস্ট) এই দেশগুলিতেও ফ্রান্সের সামরিক উপস্থিতি বহু বছর ধরে থেকে-থেকে রয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার মরুভূমি অঞ্চলে আল-কায়েদা সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে মোকাবিলা করতে ফ্রান্সের এই ঘাঁটিগুলির অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটা ঠিকমতোই জানে। আর আফ্রিকাতে তাদের অনভিজ্ঞতার কারণেও তারা এখানে ফ্রান্সের পিছনে থাকতেই বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। আমেরিকানরা বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া ছাড়াও বেশ কয়েকটি দেশে গোয়েন্দা বিমান ও ড্রোন পাঠিয়েছে। ফরাসী বাহিনীকেও তারা বিভিন্ন মিশনে লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট দিচ্ছে। তবে নিজেরা সরাসরি সংঘাতে জড়িত হওয়া থেকে বিরত থাকছে। সেই কাজটা আফ্রিকানদের আর ফরাসীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে তারা।

'অপারেশন সেরভাল'- ফরসীরা দূরত্বকে জয় করেছে।


‘অপারেশন সেরভাল’
২০১২ সালে মালি-এর গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নেয়। সরকার-বিরোধী এমএনএলএ বিদ্রোহীরা দেশের বেশিরভাগ এলাকা নিজেদের দখলে নিয়ে নেবার পর সরকারের অবস্থা বেসামাল হয়ে পড়ে। ঠিক এই সময়ে লিবিয়া যুদ্ধের পর সেখান থেকে প্রচুর অস্ত্রের যোগান পাওয়া ইসলামিক জঙ্গীরা এমএনএলএ-এর বিরূদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই নতুন ইসলামিক সসস্ত্র গোষ্ঠীরা মালি-এর বেশিরভাগ এলাকা সরকারী বাহিনী ও এমএনএলএ-এর কাছ থেকে খুব দ্রুত দখলে নিয়ে সেখানে কঠোর শারিয়া আইন জারি করে। ঠিক যখন মনে হচ্ছিল যে আল-কায়েদা সমর্থিত এই জঙ্গীরা মালি-এর রাজধানীও আয়ত্তে নিয়ে নেবে, ঠিক তখনই ২০১৩ সালের জানুয়ারী মাসে ফরাসীরা জাতিসংঘের ম্যান্ডেট পেয়ে মালি-তে রওয়ানা হয়। ফ্রান্সের প্রথম উদ্দেশ্যই ছিল জঙ্গীদের জানান দেওয়া যে তারা এখানে এসেছে। শুরু হলো অপারেশন সেরভাল ফ্রেঞ্চ স্পেশাল ফোর্সের গ্যাজেল হেলিকপ্টারগুলি হামলা চালায় জঙ্গীদের অগ্রবর্তী বাহিনীর উপরে। ঠিক তার পরপরই ফ্রান্স থেকে ৩,৫০০ কিঃমিঃ উড়ে এসে ৪টা রাফাল জঙ্গীবিমান মালির উত্তরে গাও শহরে বোমাবর্ষণ করে, যেখানে ছিল জঙ্গীদের হেডকোয়ার্টার্স । মালির উত্তরের আলজেরিয়া আর মরক্কো এই মিশনে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায়। বিমানগুলি বোমাবর্ষণ শেষ করে ১,৩০০ কিঃমিঃ দূরে চাদ-এর নিজালমিনাতে গিয়ে অবতরণ করে, আর বাকি অপারেশনে সেখান থেকেই কাজ চালায়। এই দূরত্বে হামলা করে ফ্রান্স তাদের হাত কতটুকু লম্বা, সেটার একটা প্রমাণ দিল। নিজালমিনাতে আগে থেকেই ফ্রান্সের ২টা মিরাজ এফ-১সিআর গোয়েন্দা বিমান আর ৪টা মিরাজ ২০০০ ফাইটার বিমান ছিল, যেগুলি এর পর থেকে যুদ্ধে অংশ নেয়। সেনেগালের ডাকারে অবস্থিত ফরাসী নৌবাহিনীর ৫টা আটলান্টিক গোয়েন্দা বিমানও উড়ে আসে ফরাসী বাহিনীকে ইন্টেলিজেন্স সরবরাহ করার জন্যে। কমপক্ষে ৫টি ফ্রেঞ্চ  এয়ার-রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার বিমান এই অপারেশনে অংশ নেয়, যার কারণেই ফরাসীরা মূলত দূরত্বকে জয় করতে পেরেছে। 

পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে ডাকারে অবস্থিত ঘাঁটি থেকে ফরাসী নৌবাহিনীর 'আটলান্টিক' গোয়েন্দা বিমান মালি-এর উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে।


আর বিমান হামলার পরপরই শুরু হয় ফরাসী সেনাবাহিনীর আগমণ। ফ্রান্স এবং মালির রাজধানী বামাকো-এর মাঝে ৩,৫০০ কিঃমিঃ লম্বা একটা এয়ার ব্রিজ তৈরি করে ফেলা হয়। ফ্রান্সের বিমান বাহিনীর পরিবহণ বিমানগুলি ব্যবহার হবে এটা তো জানা কথা। তবে যখন যখন ১০টা দেশ থেকে ২৫টারও বেশি পরিবহণ বিমান এই কাজে যোগ দেয়, তখন আলাদাভাবে তাকাতে হবে পুরো ব্যাপারটার দিকে। এটা হলো কালেকটিভ সিকিউরিটি-এর একটা অংশ। ফ্রান্স মাঠে যুদ্ধ করবে ঠিকই; কিন্তু বাকিরাও যে যেভাবে পারে, তাকে সাহায্য করবে। এতগুলি দেশের সাহায্য না পেলে সৈন্যসমাবেশ করতে ফরাসী বিমান বাহিনীর অনেক বেশি সময় লেগে যেত। এখানে উল্লেখযোগ্য যে এই ২৫টিরও বেশি বিমানের মাঝে যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছিল মাত্র ৫টি। এই পরিবহণ বিমান ছাড়াও এয়ার-রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার এবং গোয়েন্দা বিমান সরবরাহ করেও ফ্রান্সকে সাহায্য করেছে কয়েকটি দেশ। ফ্রান্সের নৌবাহিনীর একটি জাহাজ পশ্চিম আফ্রিকার ডাকার বন্দরে এসে কয়েকশ সৈন্য নামায়; যারা বিমানযোগে চলে আসে মালি-তে। তবে দ্রুত অভিযানের সাফল্যের বেশিরভাগটাই পাবে ফ্রেঞ্চ সেনাবাহিনী। তারা তাদের সেনাবাহিনীকে তৈরিই করেছিল এই আদতে। মাটিতে নামার সাথে সাথে তাদের গতি সেটা প্রমাণ করে। তাদের দ্রুতগামী লাইট আর্মার্ড ও পদাতিক ইউনিটিগুলির সামনে জঙ্গীরা পিছু হঠতে বাধ্য হয়। তার উপরে আকাশের পুরো আধিপত্ত ছিল ফ্রেঞ্চদের হাতে। নিজালমিনা থেকে উড়ে আসা রাফাল আর মিরাজ-২০০০ জঙ্গী বিমান ছাড়াও ফ্রেঞ্চ সেনাবাহিনীকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল সেনাবাহিনীর গ্যাজেলটাইগার এটাক হেলিকপ্টারগুলি। জানুয়ারীর ১১ তারিখে অভিযান শুরুর পর থেকে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে মালি-এর বেশিরভাগ এলাকা ফ্রান্সের সমর্থনপুষ্ট মালি-এর সরকারী বাহিনীর দখলে চলে আসে। এরপর দখলকৃত এলাকায় নিরাপত্তা দেওয়ার পরবর্তী কাজ শুরু হয়। ২০১৩-এর জুলাই পর্যন্ত এই মিশনে ফ্রান্সের ৭জন সৈন্য নিহত হয়। মালিয়ান বাহিনী আর আফ্রিকার অন্যান্য সাহায্যকারী দেশের ১৪৪জন সৈন্য নিহত  হয়। অপরদিকে জঙ্গীদের ৬০০ থেকে ১,০০০ নিহত হয়। 

মালি-এর রাস্তায় ফরাসী সাঁজোয়া যান। বেশিরভাগ মালিয়ানরাই ফ্রান্সের হস্তক্ষেপ সমর্থন করেছিল, যা ছিল ফ্রান্সের কূটনীতির বিরাট এক সাফল্য।


সাফল্য আগে থেকেই লেখা ছিল কি?
ফ্রেঞ্চরা অভিনযানে নামার দুসপ্তাহের মাঝেই মালি-তে অবতরণ করা শুরু করে আফ্রিকার ৯টা দেশের সমন্বয়ে গঠন করা প্রায় ৭,৫০০ সৈন্যের এক বাহিনী। যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে এদেরও বড় একটা অবদান ছিল। এরপরে জুলাই মাস থেকে ফ্রেঞ্চ আর আফ্রিকান বাহিনীর স্থলাভিষিক্ত হওয়া শুরু করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী, যার সদস্যসংখ্যা ১২,০০০ ছাড়িয়ে যাবার কথা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ এই মিশনে ১,৬০০ সৈন্য পাঠিয়েছে। ফ্রান্স মালি থেকে বেশিরভাগ সৈন্য সরিয়ে নিলেও ১,০০০ সৈন্য রেখে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও আশেপাশের দেশগুলিতে (নিযের-এর রাজধানী নিয়ামি-তে এবং বুরকিনা ফাসো-এর রাজধানী উগাডুগু-তে) গোয়েন্দা বিমান ও ড্রোন-এর জন্য ঘাঁটি গেড়েছে এই সংঘাতের জের ধরে। জাতিসংঘ মিশনের চোখ-কান এখন এই বিমান ও ড্রোন। আফ্রিকার সন্মিলিত বাহিনী আলাদা আলাদাভাবে মালি-তে অবতরণ করেছিল। তারা ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর মত দ্রুত সাফল্য পাবার জন্য প্রস্তুত ছিল না। আর জাতিসংঘের মিশন তো বরাবরের মতোই বেশ ঢিলেঢালাভাবে এগোয়। জাতিসংঘের উপরে ভরসা করলে মালিয়ানরা হয়তো অন্য একটা ইতিহাসের সাথে পরিচিত হতো। আফ্রিকানরা প্রায় ৭,৫০০ সৈন্য যোগার করেছে; জাতিসংঘ জোগাড় করছে ১২,০০০-এরও বেশি; যার তুলনায় ফ্রান্সের বাহিনী ছিল অনেক ছোট। এখানেই ফ্রান্সের সামরিক সাফল্য; তারা অতি দ্রুত এই কাজটা করতে পেরেছে। তারা মাত্র হাজার চারেক সৈন্যই ব্যবহার করেছে; তবে মালি-কে বাঁচিয়ে দেবার জন্যে সেটাই যথেষ্ট ছিল। এই মিশনের মাধ্যমে ফ্রান্সের বাহিনী তাদের কূটনীতিতে এক বিরাট ভূমিকা রাখলো। বেশিরভাগ মালিয়ানরাই মনে করছেন যে ফ্রান্সের হস্তক্ষেপ না হলে তাদের দেশ আল-কায়েদা জঙ্গীদের হাতে চলে যেত। মালিয়ানদের এই সম্মতি ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদের একটা অনেক বড় সাফল্য। প্রথমেই বলেছি যে ফ্রান্স তাদের সেনাবাহিনীকে গড়ে তুলেছে ঠিক এই ধরণের মিশনের জন্যেই। আর তাদের আফ্রিকার মরুতে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ (বিমান ঘাঁটি) খোঁজার কাজটা পুরো সাফল্য এনে দিয়েছে এবারে। চাদের রাজধানী নিজালমিনা-তে ফ্রান্সের ফাইটার বিমানগুলি না থাকলে ফ্রান্সের এই মিশন সফল  হতো না। ফ্রান্সের এই সাফল্য বহুদিন ধরে লালন করা সামরিক নীতি আর তাদের আফ্রিকা নীতির উপরে অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল; যদিও শেষ মুহূর্তে মালিয়ানদের সম্মতির ব্যাপারটা আগে থেকে বলা মুশকিল ছিল। তবে তাদের বাহিনীর পুরো গঠনটাই কিন্তু তাদের কূটনীতিকে সমর্থন করে। এক্ষেত্রে তাদের রাজনীতিবিদদের দূরদর্শীতাকে প্রশংসা করতেই হয়। শুধুমাত্র বর্তমান সরকার নয়, অতীতের সকল সরকারই ফ্রান্সের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টা একইভাবে লালন করে গেছে। এই কারণেই ফ্রান্স এই মিশনের জন্য ছিল প্রস্তুত। তারা অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকে কতটা উপরে তুলে ধরবে সেটা সবসময়ই বিতর্কের বিষয় হবে। ফ্রান্স তাদের উপনিবেশ ছেড়ে এলেও সেখানে তাদের পুলিশি প্রহড়া দেবার দায়িত্বখানা ভুলে যায়নি! কিন্তু নিজের দেশের স্বার্থকে এগিয়ে নিতে তাদের সামনে চিন্তা করার প্রবণতাটা আমাদের মতো দেশের ক্ষেত্রে একটা উদাহরণস্বরূপ।