Showing posts with label Marine Suicide Drone. Show all posts
Showing posts with label Marine Suicide Drone. Show all posts

Saturday, 3 May 2025

'নেভাল ড্রোন' হতে পারে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর 'ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার'

৩রা মে ২০২৫

২৬শে মে ২০২৫। ফরাসি নেভাল সুইসাইড এটাক ড্রোন ছুটে চলেছে তার টার্গেটের দিকে। সর্বশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে ফরাসি নৌবাহিনী মনুষ্যবিহীন নেভাল ড্রোনের ব্যবহার, বিশেষ করে সুইসাইড ড্রোনের ব্যবহার, গাইড্যান্স এবং ধ্বংসাত্মক সক্ষমতার ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে চাইছে। ফরাসি নৌবাহিনীর বিবৃতি থেকে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় তা হলো, ফরাসি নৌবাহিনী ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। 



ফরাসি নৌবাহিনীর চার প্রকারের নেভাল ড্রোন

গত ২৬শে এপ্রিল ফরাসি নৌবাহিনী ফ্রান্সের উপকূলে 'আনম্যান্ড সারফেস ভেসেল' (ইউএসভি) বা মনুষ্যবিহীন ম্যারিটাইম বা নেভাল ড্রোন নিয়ে একটা পরীক্ষা চালায়। পরীক্ষায় নৌবাহিনীর একটা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল বা ওপিভি থেকে একটা সুইসাইড বা কামিকাজি ড্রোন ছাড়া হয়; যা কিনা পুরোনো একটা ল্যান্ডিং ক্রাফটকে আঘাত করে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। ২০২১ সাল থেকে শুরু করা 'পোলারিস' কৌশলের অন্তর্ভুক্ত এই পরীক্ষায় সত্যিকারের যুদ্ধাবস্থার সবচাইতে কাছাকাছি অবস্থা তৈরি করে পরীক্ষাটার আয়োজন করা হয়। ফরাসি নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, এর আগে গত ডিসেম্বরে ফরাসি সাবমেরিন থেকে টর্পেডো ছোঁড়ার মাধ্যমে একটা জাহাজ ধ্বংস করা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে ফরাসি নৌবাহিনীর একটা 'লাফায়েত-ক্লাস' ফ্রিগেটের খুব কাছে একটা বিস্ফোরণ ঘটানোর মাধ্যমে জাহাজের চাপ নেবার সক্ষমতা যাচাই করা হয়। আর গত মার্চ মাসে 'ড্রাগুন ফিউরি' উভচর মহড়ার মাধ্যমে আক্রমণ এবং প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার যাচাই করা হয়। সর্বশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে ফরাসি নৌবাহিনী মনুষ্যবিহীন নেভাল ড্রোনের ব্যবহার, বিশেষ করে সুইসাইড ড্রোনের ব্যবহার, গাইড্যান্স এবং ধ্বংসাত্মক সক্ষমতার ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে চাইছে। ফরাসি নৌবাহিনীর বিবৃতি থেকে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় তা হলো, ফরাসি নৌবাহিনী ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। গত জানুয়ারিতে ফরাসি নৌবাহিনীর রিয়ার এডমিরাল ডেভিড ডেসফুজেরেস 'নেভাল নিউজ'কে বলেন যে, ফরাসি নৌবাহিনী চার ধরণের নেভাল ড্রোন পেতে চাইছে। এর প্রথমটা হলো সামুদ্রিক মাইন ধ্বংস করার জন্যে; দ্বিতীয়টা হলো হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে কাজের জন্যে; তৃতীয়টা হলো উভচর অপারেশনে ব্যবহার করার জন্যে; আর চতুর্থটা হলো শত্রুর সাথে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্যে কমব্যাট বা এটাক ড্রোন।

গত মার্চের উভচর মহড়ায় ফরাসি নৌবাহিনী 'এক্সেইল' কোম্পানির তৈরি 'ড্রিএক্স এইচ-৮' নেভাল ড্রোন ব্যবহার করে। এর আগে এই একই ড্রোন ২০২০ সাল থেকে পরীক্ষা করা হচ্ছিলো হাইড্রোগ্রাফির কাজের জন্যে। অর্থাৎ সমুদ্রাঞ্চলকে জাহাজ চলাচলে নিরাপদ রাখতে এর ব্যবহার খোঁজা হচ্ছিলো। এর মাধ্যমে পানির নিচের ভূমির গঠনপ্রকৃতির একটা ছবি পাওয়া যাচ্ছিলো। আর এই ড্রোন অটোনমাস, বা কোন মনুষ্য নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই একটা প্রোগ্রামের মাধ্যমে চালানো সম্ভব। এর ফলে একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের পানির নিচের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির জন্যে এই ড্রোনগুলিকে একটা নির্দেশনা দিয়ে দিলেই হলো; সর্বদা কোন ব্যক্তিকে এগুলির কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে না। 'ড্রাগুন ফিউরি' মহড়ার মাধ্যমে ফরাসি নৌবাহিনী এই কাজটাকেই উভচর অপারেশনে ব্যবহার করতে চাইছে। এরূপ অপারেশনে 'ড্রিএক্স এইচ-৮' ড্রোন শত্রুর নিয়ন্ত্রণে থাকা উপকূলের কাছাকাছি অঞ্চলে পানির নিচের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবে। ড্রোন ব্যবহারের কারণে ফরাসি সামরিক কোন সদস্যের জীবন হুমকির মাঝে পড়বে না। মহড়ার মাঝে ফরাসিরা আরও দেখতে চাইছিলো যে, কিভাবে এই ড্রোন নিরাপদে ফরাসি 'মিসট্রাল-ক্লাস'এর হেলিকপ্টার ডক ল্যান্ডিং শিপের ডক থেকে পানিতে ওঠা-নামা করানো যায়।
 
ফরাসি নৌবাহিনীর 'ফ্রেম' ফ্রিগেট থেকে নেভাল ড্রোন পানিতে নামানো হচ্ছে। ফরাসি সরকারের মালিকানায় থাকার কারণে নৌবাহিনীর চাহিদার গুরুত্ব অনুধাবন করে 'নেভাল গ্রুপ' মাত্র এক বছরের মাঝে এই ড্রোন ডেভেলপ করে অপারেশনাল অবস্থায় নিয়ে আসতে পেরেছে। এই কোম্পানির কর্মকান্ড অনেক ক্ষেত্রেই ফরাসি সরকারের কৌশলগত চিন্তাভাবনার ফলাফল। আর এর মাঝে এ-ও বোঝা যায় যে, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি কতটা বেসামাল হবার কারণে ফরাসিরা এতটা দ্রুত এগুচ্ছে।


এর আগে ২০২৪এর ডিসেম্বরে ফরাসি নৌবাহিনী 'থালেস' কোম্পানির কাছ থেকে ১২মিটার লম্বা নেভাল ড্রোনের ডেলিভারি পায়। এটাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম সার্ভিসে আসা অটোনমাস নেভাল ড্রোন। এই ড্রোনগুলি ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের নৌবাহিনীর মাইন ধ্বংস করা জাহাজে বহণ করা যাবে। এগুলি একটা সোনার টেনে নেবে এবং পানির নিচে মাইন খুঁজবে। অটোনমাস হবার কারণে এই ড্রোনগুলি মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই একনাগারে ৪০ ঘন্টা মাইন খুঁজতে পারবে। এই ড্রোন ডেলিভারি পাবার আগেই ফরাসিরা ন্যাটোর অধীনে 'রেপমাস' মহড়ায় অংশ নেয়; যেখানে তারা তাদের নিজস্ব নৌবাহিনী থেকে ৩৮ বছরের পুরোনো ৪২মিটার লম্বা ৪০০টন ওজনের ডাইভিং টেন্ডার জাহাজ 'এশিরন'কে পাঠায়। এই জাহাজ মূলতঃ ব্যবহৃত হয় পানির নিচের বস্তু খোঁজায় ডাইভারদের বহণ করার জন্যে। এই জাহাজ থেকে সুইডেনে নির্মিত 'পিরায়া' নেভাল ড্রোন অপারেট করা হয়েছিলো। একটা ডাইভিং টেন্ডার জাহাজ থেকে মনুষ্যবিহীন নেভাল ড্রোন অপারেট করার অর্থ হলো এসকল ড্রোন অনেক প্রকারের জাহাজ থেকেই অপারেট করা সম্ভব।

২০২৪এর নভেম্বরে ফরাসি সরকারি মালিকানার শিপবিল্ডিং কোম্পানি 'নেভাল গ্রুপ' এবং 'কুয়াচ শিপইয়ার্ড' তাদের প্রথম নেভাল ড্রোন সামনে আনে। 'সীকুয়েস্ট এস' নামের প্রায় ৯মিটার লম্বা এই ড্রোনগুলিকে যেকোন জাহাজে বহণ করা যাবে; যার মাঝে থাকবে ফ্রিগেট, হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ডক ল্যান্ডিং শিপ, সাপ্লাই জাহাজ, ইত্যাদি। এই ড্রোনগুলিকে জাহাজের নিজস্ব বোট পানিতে নামানোর জন্য ব্যবহার করা ক্রেন বা ড্যাভিটের মাধ্যমে অপারেট করা যাবে। ফরাসি নৌবাহিনীর 'ফ্রেম' ফ্রিগেট থেকে এই ড্রোন ইতোমধ্যেই অপারেট করা হয়েছে। এই ড্রোনগুলি সোনারের মাধ্যমে পানির নিচের সাবমেরিন, টর্পেডো এবং ড্রোন খুঁজে পেতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে অগভীর পানিতে, যেখানে মাদারশিপের জন্যে অপারেট করা কঠিন, সেখানে এই ড্রোনগুলি চলতে পারবে। ফরাসি সরকারের মালিকানায় থাকার কারণে নৌবাহিনীর চাহিদার গুরুত্ব অনুধাবন করে 'নেভাল গ্রুপ' মাত্র এক বছরের মাঝে এই ড্রোন ডেভেলপ করে অপারেশনাল অবস্থায় নিয়ে আসতে পেরেছে। এই কোম্পানির কর্মকান্ড অনেক ক্ষেত্রেই ফরাসি সরকারের কৌশলগত চিন্তাভাবনার ফলাফল। আর এর মাঝে এ-ও বোঝা যায় যে, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি কতটা বেসামাল হবার কারণে ফরাসিরা এতটা দ্রুত এগুচ্ছে।
 
অগাস্ট ২০২১। তুর্কি 'এলবাট্রস এস' নেভাল এটাক ড্রোনের ঝাঁক সমন্বিত আক্রমণে। ইউক্রেন যুদ্ধে এবং লোহিত সাগরে পশ্চিমা বাণিজ্যিক জাহাজের উপর ইয়েমেনের হুথি মিলিশিয়াদের আক্রমণে সুইসাইড নেভাল ড্রোনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গিয়েছে। হুথি মিলিশয়ারা নেভাল ড্রোনের সাথে সমন্বয় করে ড্রোন বিমান, জাহাজ-ধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, এমনকি জাহাজ-ধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করেছে। এর ফলে প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত পশ্চিমা যুদ্ধজাহাজগুলি মারাত্মক সমস্যায় পড়েছিল।  


ইউক্রেন যুদ্ধ এবং লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথিদের থেকে শিক্ষা

তবে যেকোন জাহাজ থেকে নেভাল ড্রোন অপারেট করার সবচাইতে শক্তিশালী পরীক্ষাটা ছিল সুইসাইড এটাক ড্রোনের ক্ষেত্রে। ইউক্রেন যুদ্ধে এবং লোহিত সাগরে পশ্চিমা বাণিজ্যিক জাহাজের উপর ইয়েমেনের হুথি মিলিশিয়াদের আক্রমণে সুইসাইড নেভাল ড্রোনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গিয়েছে। ইউক্রেনিয়রা কিছু সুইসাইড এটাক ড্রোনের সাথে নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করা কমব্যাট ড্রোনও ব্যবহার করেছে। এই কমব্যাট ড্রোনগুলি রুশ প্রতিরক্ষা লাইনে টহল হেলিকপ্টারের উপর গুলি করে। কিছু কমব্যাট ড্রোনকে আবার মাদারশিপ হিসেবে ব্যবহার করে তারা; যার মাধ্যমে একটা কমব্যাট ড্রোনের ভেতর কয়েকটা সুইসাইড ড্রোন বিমান বহণ করা হয়। হুথি মিলিশয়ারা নেভাল ড্রোনের সাথে সমন্বয় করে ড্রোন বিমান, জাহাজ-ধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, এমনকি জাহাজ-ধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করেছে। এর ফলে প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত পশ্চিমা যুদ্ধজাহাজগুলি মারাত্মক সমস্যায় পড়েছিল। ফরাসিরা এই ঘটনাগুলি থেকে শিক্ষা নিয়েই নিজেদের ড্রোন ডেভেলপ করছে।

ফরাসিরা ছাড়াও অন্যান্য নৌবাহিনীও মনুষ্যবিহীন নেভাল ড্রোন নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে অথবা নিজেদের নৌবাহিনীতে সেগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনী 'ঘোস্ট ফ্লীট' নামের প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন ধরণের নেভাল ড্রোন তৈরি করছে; যেগুলি ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ, এটাক, লজিস্টিক্যাল মিশন ছাড়াও অন্যান্য মিশন সম্পাদনে সক্ষম হবে। এছাড়াও চীন, তুরস্ক, ইস্রাইল, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানও নেভাল ড্রোন ডেভেলপ করছে। ২০২১এর মে মাসে তুরস্ক প্রথমবারের মতো তাদের 'উলাক' নেভাল ড্রোন থেকে 'সিরিট' রকেট ছোঁড়ার মাধ্যমে একটা টার্গেট ধ্বংস করেছে। এই ড্রোন দু'টা 'এল-উমটাস' দূরপাল্লার ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও বহণ করতে সক্ষম। উপকূলীয় অঞ্চলে জাহাজের নিরাপত্তা ও নৌস্থাপনার নিরাপত্তা দিতে এই ড্রোনগুলিতে রাডার, নাইট ভিশন ক্যামেরা এবং ১২ দশমিক ৭মিঃমিঃ মেশিন গান বসানো হয়। ২০২২এর জুনে তুর্কিরা দু'টা 'আলবাট্রস এস' এটাক ড্রোনের সাথে একটা 'মির' কমান্ড ড্রোনের সমন্বয়ে আক্রমণকারী ড্রোনের ঝাঁক নিয়ে পরীক্ষা করে। ২০২৩এর এপ্রিলে তুর্কিরা একটা পরীক্ষা চালায়, যেখানে 'মারলিন' নেভাল ড্রোন সাবমেরিন খুঁজে বের করে এবং তার সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করা 'মির' নেভাল ড্রোন থেকে টর্পেডো ছুঁড়ে টার্গেট ধ্বংস করা হয়। ২০২৩এর অক্টোবরে তুরস্ক তাদের 'আলবাট্রস এস' সুইসাইড নেভাল ড্রোন পরীক্ষা করে। প্রায় ৭মিটার লম্বা এবং ২টন ওজনের এই ড্রোনগুলি ৪০নটিক্যাল মাইল গতিতে এবং প্রায় ১০ ঘন্টা ধরে চলতে সক্ষম। ইনবোর্ড ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করে এই ড্রোন ২৫০কেজি ওয়ারহেড বহণে সক্ষম। অটোনমাস এরকম ৮টা ড্রোন একত্রে টার্গেটে সমন্বিতভাবে হামলা করে এবং শেষ পর্যন্ত ওয়ারহেড বহণ করা একটা ড্রোনের আঘাতে ২২মিটার লম্বা টার্গেট জাহাজটা পুরোপুরিভাবে ধ্বংস হয়। নেভাল ড্রোনগুলিকে আকাশ থেকে সহায়তা দিচ্ছিল 'বায়রাক্তার টিবি-২' ড্রোন বিমান। ২০২৪এর অক্টোবরে কাতার তুরস্ক থেকে 'উলাক ১১' নেভাল ড্রোন ক্রয় করার ঘোষণা দেয়।
 
ফরাসি নৌবাহিনীর ডাইভিং টেন্ডার ভেসেল 'এশিরন'। ৪২মিটার লম্বা এবং ৪০০টনের ৩৮ বছরের পুরোনো এই জাহাজ থেকে নেভাল ড্রোন অপারেট করা হয়েছিল। যুদ্ধজাহাজ হতে হলে এখন আর কোন জাহাজকে জটিল ডিজাইনের হতে হয় না। প্রতিটা জাহাজেই নিজস্ব বোট পানিতে নামাবার জন্যে ক্রেন বা ড্যাভিট থাকে। এই একই ব্যবস্থার মাধ্যমে একটা নেভাল ড্রোনকে জাহাজে বহণ করে পানিতে নামানো সম্ভব; যা কিনা ফরাসি নৌবাহিনী প্রমাণ করেছে। ইউক্রেনিয়রা যা উপকূলের কাছাকাছি করেছে, ফরাসিরা সেটাকে গভীর সাগরে নিয়ে গিয়েছে।   


‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার' হিসেবে নেভাল ড্রোন

ইউক্রেন যুদ্ধের বাইরে অন্যান্য দেশের সুইসাইড নেভাল ড্রোনগুলি এখন পরীক্ষামূলক থেকে অপারেশনাল সক্ষমতা পর্যায়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে একটা ঝাঁকে অনেকগুলি ড্রোন ব্যবহার করে শত্রুর প্রতিরক্ষাকে ব্যাতিব্যস্ত করে ফেলাটাকেই সবচাইতে কার্যকর মনে করছেন অনেকে। দূরবর্তী টার্গেটের ক্ষেত্রে ফ্রিগেট বা অন্য কোন স্পেশালাইজড জাহাজ থেকে পানিতে নামিয়ে এগুলিকে শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়। এরূপ নেভাল ড্রোনগুলিকে পানির নিচ দিয়ে চলা সাবমেরিন ড্রোন এবং ড্রোন বিমানের সাথে সমন্বয় করে ব্যবহার করলে শত্রুর সমস্যাকে আরও জটিল করে ফেলা সম্ভব। বিশেষ করে বিভিন্ন দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন ড্রোনের মাধ্যমে আক্রমণ করে শত্রু জাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকেজো করে ফেলা সম্ভব। তবে অনেক দূরবর্তী টার্গেটে ম্যারিটাইম সুইসাইড এটাক ড্রোন দিয়ে হামলা করার ব্যাপারটা এখনও পরীক্ষিত নয়। এধরণের হামলায় ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সমস্যার কারণে ড্রোনের সাথে নিজ বাহিনীর যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে। এই সমস্যা দূর করতে হলে এগুলিকে অটোনমাস করা প্রয়োজন। তবে অটোনমাস করতে হলে এগুলিতে যথেষ্ট ভালো সেন্সর যুক্ত করতে হবে; যাতে করে অন্য কোন বস্তুর সাথে সংঘর্ষ এড়াতে পারে এবং টার্গেটে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারে। এছাড়াও শত্রুর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় জ্যামিং এবং সাইবার হামলা এড়াতে গেলে এই ড্রোনগুলিতে অত্যন্ত শক্তিশালী গাইড্যান্স সিস্টেম থাকা প্রয়োজন। তবে এখনও পর্যন্ত বেশিরভাগ নৌবাহিনীতেই নেভাল ড্রোন খোঁজা এবং সেগুলিকে ঠেকাবার জন্যে তেমন কোন শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। পানির ঢেউএর মাঝ দিয়ে চলা নিচু এবং ছোট্ট এসকল নৌযানকে খুঁজে পাওয়া বেশ বড় চ্যালেঞ্জ। স্বল্প খরচের এসকল ড্রোনের মাধ্যমে অনেক বড় এবং দামী যুদ্ধজাহাজ ঘায়েল করে ফেলা সম্ভব।

ইউক্রেনিয়রা প্রমাণ করেছে যে, নেভাল ড্রোনের মাধ্যমে শত্রুর নৌবাহিনীকে বন্দরের কাছাকাছি স্থানে পঙ্গু করে ফেলা সম্ভব। ইয়েমেনের হুথিরা প্রমাণ করেছে যে, নেভাল ড্রোন, ড্রোন বিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত আক্রমণের মাধ্যমে শত্রুর জাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যাতিব্যস্ত করে ফেলা সম্ভব। যুদ্ধজাহাজ হতে হলে এখন আর কোন জাহাজকে জটিল ডিজাইনের হতে হয় না। প্রতিটা জাহাজেই নিজস্ব বোট পানিতে নামাবার জন্যে ক্রেন বা ড্যাভিট থাকে। এই একই ব্যবস্থার মাধ্যমে একটা নেভাল ড্রোনকে জাহাজে বহণ করে পানিতে নামানো সম্ভব; যা কিনা ফরাসি নৌবাহিনী প্রমাণ করেছে। ইউক্রেনিয়রা যা উপকূলের কাছাকাছি করেছে, ফরাসিরা সেটাকে গভীর সাগরে নিয়ে গিয়েছে। বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ফরাসিদেরকে চিন্তার মাঝে ফেলেছে এবং একইসাথে নিজেদের প্রতিরক্ষাকে দ্রুত উন্নত করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। নেভাল ড্রোনগুলি একপ্রকার 'ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার' হিসেবে কাজ করছে; যার মাধ্যমে একটা নৌবাহিনী তাদের স্বাভাবিক শক্তিমত্তার চাইতে বেশি শক্তি প্রদর্শন করতে সক্ষম হবে। ইউক্রেন এক্ষেত্রে প্রমাণ করেছে যে, বহুগুণে শক্তিশালী একটা নৌবাহিনীকেও নেভাল ড্রোনের বিচক্ষণ ব্যবহারের মাধ্যমে পঙ্গু করে ফেলা সম্ভব। তুরস্কও এক্ষেত্রে শিক্ষা নিয়ে অনেক ধরণের নেভাল ড্রোন ডেভেলপ করেছে; যার মাঝে কয়েক প্রকারের কমব্যাট বা এটাক ড্রোনও রয়েছে।
 
২১শে নভেম্বর ২০২৪। মংলায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর 'আইল্যান্ড-ক্লাস' ওপিভি 'কপোতাক্ষ' এবং একই ক্লাসের আরেকটা জাহাজ। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পুরোনো 'আইল্যান্ড-ক্লাস' ওপিভি, ‘ক্যাসল-ক্লাস' কর্ভেট, ‘রিভার-ক্লাস' মাইন সুইপার, কোস্ট গার্ডের 'লীডার-ক্লাস' কর্ভেটগুলি খুব সহজেই বেশকিছু প্রকারের নেভাল ড্রোন বহণ করতে পারে। এখানেই ১৫টা জাহাজ। এগুলির সাথে আরও কিছু সেকেন্ড-হ্যান্ড জাহাজ যুক্ত করলে খুব সহজেই এই সংখ্যাকে ৩০ থেকে ৫০-এ নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এরূপ একটা ফ্লীটের পক্ষে ১০০ থেকে ৪০০টা নেভাল ড্রোন, একই সংখ্যক ড্রোন বিমান ছাড়াও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করা তেমন কঠিন হবে না। 


বাংলাদেশের জন্যে 'ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার'

বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে সম্পদের মারাত্মক স্বল্পতা রয়েছে। এই স্বল্প সম্পদ দিয়ে সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী কোন রাষ্ট্রকে (যেমন ভারত) মোকাবিলা করা খুবই কঠিন কাজ। তবে বাংলাদেশের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে তাদের নিজেদের শক্তিকে এমন একটা অবস্থানে নিয়ে যাওয়া, যা দিয়ে শত্রুর নৌবাহিনীকে বঙ্গোপসাগর অবরোধ দেয়ার প্রচেষ্টা থেকে নিবৃত করতে পারবে। হঠাৎ করে নৌবাহিনীর জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে গেলে সেকেন্ড-হ্যান্ড জাহাজ যোগাড় করতে হবে। আর সেক্ষেত্রে শধু সামরিক নয়, বেসামরিক জাহাজও ক্রয় করা যেতে পারে; যেগুলি কিনা সামরিক কাজের জন্যে প্রস্তুত করে নেয়া যেতে পারে। এই জাহাজগুলিকে বিভিন্ন প্রকারের সামরিক সরঞ্জাম বহণের জন্যে উপযোগী করে নেয়া সম্ভব। এর মাঝে ছোট ড্রোন বিমান যুক্ত করতে তেমন কোন পরিবর্তনই প্রয়োজন নেই। জাহাজের আকার অনুযায়ী সেখান থেকে ৪০মিনিট থেকে ১৮ঘন্টা ওড়ার সক্ষমতার ড্রোন অপারেশন পরিচালনা করা যেতে পারে। একইসাথে কনটেইনারের ভেতর বিভিন্ন প্রকারের সক্ষমতার প্যাকেজ বহণ করা যেতে পারে; যেমন, জাহাজ-ধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র; ড্রোন অপারেশনস কমান্ড সেন্টার। এছাড়াও জাহাজের ডেকের উপরেই বিভিন্ন প্রকারের অস্ত্র জুড়ে দেয়া যেতে পারে; যেমন, কাঁধে বহণযোগ্য বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র (ম্যানপ্যাডস); ১২ দশমিক ৭মিঃমিঃ, ২০মিঃমিঃ বা ৩০মিঃমিঃ বিমান-বিধ্বংসী কামান।

নেভাল ড্রোন বা 'আনম্যান্ড সারফেস ভেসেল' (ইউএসভি) বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার' হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রায় সকল জাহাজেই নিজস্ব বোট থাকে এবং বোট পানিতে নামাবার জন্যে ক্রেন বা ড্যাভিটও থাকে। এই মাধ্যমটা ব্যবহার করেই জাহাজে নেভাল ড্রোন বহণ করা যেতে পারে। যত বড় জাহাজ, তত বড় বা তত বেশি সংখ্যক বা প্রকারের নেভাল ড্রোন বহণ করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পুরোনো 'আইল্যান্ড-ক্লাস' ওপিভি, ‘ক্যাসল-ক্লাস' কর্ভেট, ‘রিভার-ক্লাস' মাইন সুইপার, কোস্ট গার্ডের 'লীডার-ক্লাস' কর্ভেটগুলি খুব সহজেই বেশকিছু প্রকারের নেভাল ড্রোন বহণ করতে পারে। এখানেই ১৫টা জাহাজ। এগুলির সাথে আরও কিছু সেকেন্ড-হ্যান্ড জাহাজ যুক্ত করলে খুব সহজেই এই সংখ্যাকে ৩০ থেকে ৫০-এ নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এরূপ একটা ফ্লীটের পক্ষে ১০০ থেকে ৪০০টা নেভাল ড্রোন, একই সংখ্যক ড্রোন বিমান ছাড়াও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করা তেমন কঠিন হবে না। এই জাহাজগুলিকে উচ্চতর সক্ষমতার ফ্রিগেট-কর্ভেটের সাথে গ্রুপ হিসেবে অপারেশনে যুক্ত করতে পারলে একে অপরের সক্ষমতাগুলিকে ব্যবহার করতে পারবে। এগুলির একত্রিত সক্ষমতা তখন প্রতিটা জাহাজের আলাদা সক্ষমতার সাথে যুক্ত হবে এবং নিজেদের একক দুর্বলতা দৃশ্যমান হবে না।

নেভাল ড্রোন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে 'ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার' হিসেবে কাজ করে বঙ্গোপসাগরকে শত্রুর নৌ-অবরোধের চেষ্টা থেকে মুক্ত রাখতে পারবে। তবে সেটা তখনই সম্ভব, যখন বাংলাদেশ নিশ্চিত করে বুঝতে পারবে যে, তারা নিজেদেরকে কোথায় দেখতে চায়। সাত দশকের লিবারাল বিশ্বব্যবস্থা, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠা করেছিলো, তা আজ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ভেঙ্গে ফেলেছে। এরূপ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্যে সবথেকে বেশি প্রয়োজন নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তাকে পাঁচ দশকের নতজানু অবস্থান থেকে সরিয়ে আদর্শিক চিন্তার দিকে ধাবিত করা। এছাড়াও প্রয়োজন রয়েছে নিজেদের ভূকৌশলগত অবস্থানকে 'হোলিস্টিক'ভাবে মূল্যায়ন করা; যাতে করে সামগ্রিকভাবে একটা প্রতিরক্ষা কৌশলের দিকে অগ্রগামী হওয়া সম্ভব হয়। এরূপ একটা কৌশলে উপনীত হবার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সেক্টরকে শক্তিশালী করার জন্যে শক্তিশালী সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হবে। যুদ্ধ আসছে জেনে শুধু কথায় প্রস্তুতি নিলেই হবে না; গুরুত্বের ক্রম অনুধাবন করে কাজে দেখাতে হবে। সার্বভৌমত্ব এই ক্রমের মাঝে কোথায় স্থান পাবে, তা আজ কেউ প্রশ্ন না করলেও পরাধীনতার স্বাদ নেয়ার পর প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে। আজকে কাজ না করার স্বপক্ষে কোন যুক্তিই আগামীকালকের ব্যর্থতার পর কারুর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আজকের অদূরদর্শীতা আগামীকালকে জনগণের কাছে দেশদ্রোহীতার সমতুল্য হবে। কারণ ব্যর্থতার দায় কেউই নিতে চাইবে না।







সূত্রঃ
‘French Navy tests one-way attack USV against target at sea’ in Naval News, 29 April 2025

‘French Navy conducts trials with Exail DriX USV’ in Naval News, 18 March 2025

‘French Navy experiments new unmanned systems to support amphibious operations’ in Naval News, 18 March 2025

‘French Navy Tests iXblue’s DriX Unmanned Surface Vessel’ in Naval News, 02 November 2020

‘‘World’s first’ autonomous surface drone system delivered’ in Naval Today, 10 February 2025

‘French Navy steps up USV development and delivery ’ in Naval News, 27 January 2025

‘French Navy Experiments Weaponized Drone Jet Ski for Remote Naval Attacks Without Risking Crews’ in Army Recognition, 29 April 2025

‘France’s Naval Group unveils Seaquest, its first unmanned surface vessel’ in Breaking Defense, 05 November 2024

‘Seaquest S System Successfully Deployed on French Navy FREMM Frigate’ in Army Recognition, 08 November 2024

‘Turkey’s ‘ULAQ’ USV Completes Firing Tests with New Weapon System’ in Naval News, 24 January 2022

‘Türkiye's Okhan USV successfully completes tests’ in Turkiye Today, 20 January 2025

‘Qatar orders Turkish Ulaq USV’ in Janes’, 01 November 2024

‘Turkish Navy successfully tests Albatros S kamikaze naval drone’ in Army Recognition, 09 October 2023

‘For the First Time in the World, a Swarm Attack Concept was Carried Out in a Joint USV-UAV Operation!’ in Defence Turkey, 09 October 2023

‘Turkish “MIR” USV test-fires torpedo for the first time’ in Newsatsea, 19 April 2023

‘Turkey’s Aselsan demonstrates new swarm USV capabilities’ in Naval News, 20 June 2022

Thursday, 3 November 2022

সেভাস্তোপোলের রুশ নৌঘাঁটিতে ইউক্রেনিয় হামলার কৌশলগত গুরুত্ব

০৩রা নভেম্বর ২০২২
 
ইউক্রেনের সুইসাইড ড্রোন বোটগুলি শেষ পর্যন্ত ভিডিও ফুটেজ পাঠিয়েছে। এরকমই একটা ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, রুশ 'এমআই-৮' হেলিকপ্টার থেকে বোটের দিকে গুলি ছোঁড়া হচ্ছে। একটা যুদ্ধজাহাজ কতগুলি সুইসাইড বোট ঠেকাতে পারবে, সেই সংখ্যাটা নির্দিষ্ট। আর সবগুলি বোটের মোট খরচও সর্বদাই যুদ্ধজাহাজের খরচের চাইতে অনেক কম হবে। সকলেই এখন ইউক্রেনের যুদ্ধের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিচ্ছে।

গত ২৯শে অক্টোবর ইউক্রেনিয়রা রুশ কৃষ্ণ সাগরীয় নৌবহরের হেডকোয়ার্টার্স সেভাস্তোপোলে বড়সড় হামলা করে।হামলার মূল টার্গেট ছিল রুশ নৌবহরের যুদ্ধজাহাজগুলি। আর হামলা করা হয় ইউক্রেনের নৌবাহিনীর নিজস্ব ‘ম্যারিন ড্রোন’ বা মনুষ্যবিহীন সুইসাইড বোটের মাধ্যমে। একইসাথে আকাশ থেকেও মনুষ্যবিহীন বিমান ড্রোনের মাধ্যমে হামলা করা হয়। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন যে, রুশ কৃষ্ণ সাগরীয় নৌবহরের ফ্ল্যাগশিপ ফ্রিগেট ‘এডমিরাল মাকারভ’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপরদিকে রুশরা বলছে যে, শুধু একটা মাইনসুইপার কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনিয়দের প্রকাশ করা একটা ভিডিওতে দেখা যায় যে, রুশ ‘এমআই-৮’ হেলিকপ্টার থেকে ড্রোন বোটকে লক্ষ্য করে মেশিন গানের গুলি ছোঁড়া হচ্ছে; যা বোটের আশেপাশে পানিতে আছড়ে পড়ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এই ড্রোনটা হয়তো তার টার্গেটে পৌঁছাবার আগেই ধ্বংস হয়েছিল। হামলার কিছু সময় পরেই রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলে যে, যে জাহাজগুলির উপর ইউক্রেনিয়রা হামলা করেছে, সেগুলি ইউক্রেনের শষ্য রপ্তানির জাহাজগুলিকে রক্ষা করছিল। সেই হিসেবে রাশিয়া ইউক্রেনের শষ্য রপ্তানির চুক্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়।

হামলার বর্ণনা

আপাততঃ পাওয়া প্রমাণ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, রুশরা ইউক্রেনের ড্রোনগুলির মাঝে বেশ কতগুলির বিরুদ্ধে সফলতা পেয়েছিল। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হচ্ছে যে, এই হামলা চালায় ইউক্রেনের ‘৭৩তম ম্যারিন স্পেশাল ফোর্সেস সেন্টার’; যাদেরকে সহায়তা দিয়েছে ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞরা। ইউক্রেনিয়রা কমপক্ষে ৭টা ম্যারিন ড্রোন এবং ৯টা বিমান ড্রোন ব্যবহার করেছিল। একটা ড্রোন সম্ভবতঃ ইউক্রেনের শষ্য রপ্তানির করিডোর ব্যবহার করেছে। সেখানে ইউক্রেনিয় বা পশ্চিমা একটা বাণিজ্য জাহাজ থেকে এই ড্রোন পানিতে ভাসানো হয়েছে। তারা আরও বলছে যে, সবগুলি বিমান ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে; আর ম্যারিন ড্রোনগুলির মাঝে ৪টা সমুদ্রে, আর ৩টা ভূমিতে ধ্বংস করা হয়েছে। বিবৃতিতে মাইনসুইপার জাহাজ ‘আইভান গোলুবেতস’এর স্বল্প ক্ষতি হবার কথা স্বীকার করা হয়। ‘নেভাল নিউজ’এর এক লেখায় তুর্কি নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তেইফুন ওজবেরক বলছেন যে, প্রমাণাদি দেখে ব্যাপারটা ভিন্ন মনে হয়। কারণ রুশ ‘এডমিরাল গ্রিগোরোভিচ-ক্লাস’এর একটা ফ্রিগেটের খুবই কাছ থেকে ড্রোন ফুটেজ দেখা যায়; যেখানে ফ্রিগেটটা নিজেকে রক্ষা করতে কিছুই করছে না বলে আপাতদৃষ্টে মনে হয়।

ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য এবং ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক এইচ আই সাটন মনে করছেন যে, এর আগে রুশ নৌবাহিনীর ক্রুজার ‘মস্কভা’ ডুবে যাবার মতো সেভাস্তোপোলে ইউক্রেনের হামলাও নৌ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলে বিবেচিত হবে। অনেক নৌবাহিনীই হয়তো এধরণের ড্রোন বোটের কথা ভেবেছে। কিন্তু ইউক্রেনই প্রথম এটা করে দেখিয়েছে। এতকাল যাবত ড্রোনের ক্যামেরা থেকে পাওয়া ফুটেজে টার্গেটকে আকাশ থেকে নিচে দেখা গিয়েছে। এবারই প্রথমবারের মতো টার্গেটের পাশ থেকে ড্রোন ফুটেজ দেখা গেলো।

ড্রোন বোট হামলার ইতিহাস

তবে রিমোট কন্ট্রোল ড্রোন বোটের ব্যবহার এর আগে হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ১৯১৭ সালে জার্মানরা ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজের উপরে রিমোট কন্ট্রোল বোট দিয়ে হামলা করেছিল; যদিও তা সফলতা পায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ইতালি, জাপান, ব্রিটেন এবং জার্মানি মূলতঃ মনুষ্যচালিত বোটের মাধ্যমে শত্রু জাহাজের উপরে হামলা করে। জার্মানরা টার্গেটে আঘাত করার আগে শেষ দুই মাইল মনুষ্যচালিত কমান্ড বোট থেকে ড্রোন বোট নিয়ন্ত্রণ করতো। ড্রোন বোটগুলিতেও পাইলট থাকতো; যারা শেষ মুহুর্তে বোট থেকে পানিতে লাফিয়ে পড়তো। সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৭ এবং ২০২২ সালে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা বিস্ফোরক বহণ করা বোট দিয়ে সৌদি এবং আমিরাতি যুদ্ধজাহাজের উপরে হামলা করে।

তেইফুন ওজবেরক বলছেন যে, ২০০০ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘কোল’এর উপর ইয়েমেনের আদেন বন্দরে হামলা হবার পর পশ্চিমা নৌবাহিনীগুলি নিজেদের বন্দর ও জাহাজগুলির নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে। কারণ এহেন হামলা এমন সময়ে করা হয়, যখন একটা যুদ্ধজাহাজ সবচাইতে দুর্বল অবস্থানে থাকে। বন্দরে থাকা অবস্থায় জাহাজগুলি নিজেদের অস্ত্রকে ব্যবহার করতে পারে না। ২০০০ সালের এই ঘটনাকে পুঁজি করে নিজেদের নৌবাহিনী তৈরি করেছে ইরান। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলি বড় জাহাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে তৈরি হলেও বহু সংখ্যক ছোট বোটের সমন্বিত হামলা মোকাবিলা করার জন্যে তৈরি করা হয়নি।

 
সেভাস্তোপোল বন্দরের স্যাটেলাইট ছবি। সেভাস্তোপোল সামরিক ঘাঁটির মুখটা বেশ সরু এবং সেখানে যেকোন জাহাজ ঢোকার মুখে চেকপোস্ট রয়েছে। এছাড়াও বন্দরের বাইরে রয়েছে নৌবাহিনীর প্যাট্রোল। আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, বন্দরের বাইরে এবং ভিতরে রুশ প্যাট্রোল ম্যারিন ড্রোনগুলিকে বাধা দিয়েছিল। তথাপি দু’টা ম্যারিন ড্রোন বন্দরের ভেতরে কোনভাবে ঢুকে পড়ে। রাশিয়া যেখানে ৯ মাস ধরে যুদ্ধরত, তখন সেভাস্তোপোল বন্দরে ঢোকার মুখে একটা ড্রোন বোটকে খুঁজে পাওয়া যাবে না বা বোটগুলিকে রুশরা ধ্বংস করতে ব্যর্থ হবে; এটা মেনে নেয়া যায় না।

কিভাবে এবং কি দিয়ে এই হামলা সম্ভব হলো?

সেভাস্তোপোল সামরিক ঘাঁটির মুখটা বেশ সরু এবং সেখানে যেকোন জাহাজ ঢোকার মুখে চেকপোস্ট রয়েছে। এছাড়াও বন্দরের বাইরে রয়েছে নৌবাহিনীর প্যাট্রোল। আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, বন্দরের বাইরে এবং ভিতরে রুশ প্যাট্রোল ম্যারিন ড্রোনগুলিকে বাধা দিয়েছিল। তথাপি দু’টা ম্যারিন ড্রোন বন্দরের ভেতরে কোনভাবে ঢুকে পড়ে। তেইফুন ওজবেরক বলছেন যে, রাশিয়া যেখানে ৯ মাস ধরে যুদ্ধরত, তখন সেভাস্তোপোল বন্দরে ঢোকার মুখে একটা ড্রোন বোটকে খুঁজে পাওয়া যাবে না বা বোটগুলিকে রুশরা ধ্বংস করতে ব্যর্থ হবে; এটা মেনে নেয়া যায় না। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় যে, রুশ হেলিকপ্টারগুলি বোটগুলির উপরে মেশিনগান দিয়ে গুলি করছে। কিন্তু এধরণের ছোট এবং দ্রুতগামী টার্গেট ধ্বংস করতে হয়তো নিখুঁত নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই।

ইউক্রেনিয়দের এহেন ম্যারিন ড্রোনের কথা জানা যায় গত সেপ্টেম্বরে; যখন একটা ড্রোন বোট ক্রিমিয়া উপদ্বীপের ওমেগা উপসাগর উপকূলে ভেসে আসে। এইচ আই সাটন এই বোটের একটা বিশ্লেষণ করেছেন। এর ইঞ্জিন খুব সম্ভবতঃ পানিতে খেলাধূলার জন্যে ব্যবহৃত জেটস্কির ওয়াটারজেট ইঞ্জিন। খুব সম্ভতঃ কানাডিয় কোম্পানি ‘সীডু’এর তৈরি জেটস্কির ইঞ্জিন এতে লাগানো হয়েছে। বোটের সামনে দু’টা সোভিয়েত ডিজাইনের ফিউজ (ইউপি-৫৮১) ব্যবহার করা হয়েছে। এই ফিউজগুলি দেখে ধারণা করা যেতে পারে যে, এর ওয়ারহেড ছিল হয়তো ‘এফএবি-৫০০’ বোমা। একটা ঘুর্নায়মান ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ক্যামেরার মাধ্যমে টার্গেটের ছবি তুলতে পারে বোটটা। এই ক্যামেরা দিয়ে তোলা ভিডিওই ইউক্রেনিয়রা প্রকাশ করেছে। বোটের ন্যাভিগেশন আসছে এর উপরে বসানো স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট এন্টেনা থেকে।

‘দ্যা ড্রাইভ’ ম্যাগাজিনের প্রতিরক্ষা সেকশন ‘ওয়ারজোন’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এই বোটগুলি ইউক্রেনের উপকূল থেকে ছাড়ার অর্থ হলো যথেষ্ট পরিমাণে জ্বালানি বহণ করতে হবে; যা কিনা বহণকৃত বিস্ফোরকের পরিমাণ কমিয়ে দেবে। এগুলিকে ডিজাইন করা হয়েছে দূরপাল্লার টার্গেটে আঘাত হানার জন্যে; যা থাকবে সরাসরি দৃষ্টির পাল্লার বাইরে। তবে সেই দূরত্বেও সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এর অর্থ হলো, বিশ্বের যেকোন বন্দর এখন এধরণের হামলার আওতায় পড়তে পারে। এরকম দূরত্ব থেকে বোট নিয়ন্ত্রণ করতে পারার অর্থ হলো, অস্থায়ী টার্গেটেও হামলা করা সম্ভব হবে; প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও এড়াতে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে; ঐ মুহুর্তে কোন সুযোগ হাজির হলে সেটাও কাজে লাগানো যাবে। কারণ বোটটাকে শেষ পর্যন্ত কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে এবং দরকার হলে এর দিক পরিবর্তন করতে পারছে। এই ব্যাপারটা নৌযুদ্ধের ক্ষেত্রে অনেক বড় নতুনত্ব। এতকাল সুইসাইড ড্রোন বোট অপারেট করেছে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে যে, এই চিন্তাটা যখন আরও উন্নততর কোন শক্তি লুফে নেবে, তখন এগুলির সক্ষমতা কেমন হতে পারে।

গত সেপ্টেম্বরে ক্রিমিয়া উপদ্বীপে ভেসে আসা ড্রোন বোটটা ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা উপকূল থেকে প্রায় ২’শ ৮০ কিঃমিঃ দূরে ছিল। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয় যে, ড্রোনগুলি এসেছে ইউক্রেনের ওচাকভ এলাকা থেকে; যা কিনা সেভাস্তোপোল থেকে প্রায় ২’শ ৪০ কিঃমিঃ দূরে। ‘ডিফেন্স আপডেট’এর এক লেখায় ইস্রাইলি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক তামির এশেল বলছেন যে, এর অর্থ হলো, এই লম্বা দূরত্ব এই বোটগুলি অতিক্রম করেছে রুশদের দৃষ্টি এড়িয়ে। আর সেপ্টেম্বর মাসে ইউক্রেনিয় ড্রোন ক্রিমিয়ার উপকূলে আবিষ্কার হবার পরে রুশরা তাদের জাহাজগুলিকে খোলা সমুদ্রে প্যাট্রোল থেকে সরিয়ে সেভাস্তোপোল বন্দরের ভিতরে জমা করে; যে সুযোগ ইউক্রেনিয়রা কাজে লাগায় বন্দরের ভিতরে হামলা করে। একসাথে ম্যারিন এবং বিমান ড্রোন ব্যবহার করার ফলে ঐ মুহুর্তে ইউক্রেনিয়রা সর্বশেষ ইন্টেলিজেন্স পায় এবং সেগুলিকে সঠিকভাবে সমন্বয় করতে সক্ষম হয়। একইসাথে ইউক্রেনিয়রা ঘাঁটির মাঝে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে রুশদের হতভম্ব করে ফেলে।

সেপ্টেম্বর মাসে ক্রিমিয়ার উপকূলে ভেসে আসা ইউক্রেনিয় ড্রোন বোট। একটা ড্রোন বোট তৈরিতে হয়তো বেশ কয়েক হাজার ডলার খরচ হবে। তবে তা লক্ষ ডলারের কাতারে যাবে না। এর তুলনায় অনেক আধুনিক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য মিলিয়ন ডলারও হয়ে থাকে। একটা জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র খুব অল্প সংখ্যক রাষ্ট্রই তৈরি করতে পারে; কিন্তু এরকম একটা সুইসাইড বোট অনেকেই তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।

তেইফুন ওজবেরক রুশ কৃষ্ণ সাগরীয় নৌবহরের সমালোচনা করে বলছেন যে, তারা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখছে না। এর আগে তারা ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্রের হাতে ক্রুজার ‘মস্কভা’ এবং একটা গুরুত্বপূর্ণ টাগবোট হারিয়েছে। এছাড়াও তুর্কিদের নির্মিত ড্রোনের হামলায় তাদের বিভিন্ন প্যাট্রোল বোট ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধজাহাজ ‘মস্কভা’ আক্রান্ত হবার আগে রুশ ইন্টেলিজেন্স যদি সঠিক তথ্য দিতে পারতো যে, ইউক্রেনের জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলি উপকূলে অপারেশনাল রয়েছে, তাহলে জাহাজটাকে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার বাইরে রাখা যেতো। আর ইউক্রেনের হাতে মার্কিন ‘হারপুন’ জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে জেনেও রুশরা তাদের টাগবোট স্নেইক আইল্যান্ডের কাছে পাঠিয়েছিল। ‘মস্কভা’ হারাবার পর রুশরা উপকূলীয় অঞ্চলে আকাশের নিয়ন্ত্রণ হারায়। এরপরেও তারা হাল্কা বিমান প্রতিরক্ষা সজ্জিত প্যাট্রোল বোটগুলিকে উপকূলের কাছে পাঠায়; যেখানে সেগুলিকে ইউক্রেনের ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনগুলি ধ্বংস করে। ‘মস্কভা’ হারাবার সময় বহু দেশের মতো রুশদেরও একই বাস্তবতা ছিল – তাদের নৌবাহিনী কয়েক দশক ধরে কোন যুদ্ধ করেনি। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রথম ঘটনার পরে তো তাদের শিক্ষা নেবার কথা; যা তারা নেয়নি। সেপ্টেম্বর মাসে সেভাস্তোপোলের কাছে যখন একটা ইউক্রেনিয় ড্রোন পাওয়া যায়, তখন রুশদের বোঝা উচিৎ ছিল যে, ইউক্রেনিয়রা সেভাস্তোপোলে রুশ নৌবহরের উপরে হামলার পরিকল্পনা করছে। পাঁচ সপ্তাহের আগাম সতর্কতা পাবার পরেও তারা সেভাস্তোপোলের নিরাপত্তা যথেষ্ট বৃদ্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের উপর সেভাস্তোপোল হামলার সম্ভাব্য ফলফল


এইচ আই সাটন মনে করছেন যে, আক্রমণে রুশ নৌবাহিনীর কোন জাহাজ সম্ভবতঃ ডুবে যায়নি। তথাপি এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এতে রুশদের দৃষ্টি অন্য দিকে সড়ে যাবে এবং ঘাঁটি হিসেবে সেভাস্তোপোলকে হুমকির মাঝে রাখবে। রুশ নৌবাহিনীর ইউনিটগুলি ভবিষ্যতে কোথায় কিভাবে মোতায়েন করা হবে, তা এই ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হবে।

তেইফুন ওজবেরকএর মতে, ইউক্রেনিয়রা এর আগে যেসব হামলা করেছে, সেগুলির কৌশলগত প্রভাব ছিল যথেষ্ট। সেই হামলাগুলি রুশ সামরিক বাহিনীকে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। বিশেষ করে রুশ নৌবাহিনীর ক্রুজার ‘মস্কভা’ ডুবে যাওয়া এবং ক্রিমিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কার্চ সেতুর উপরে হামলা রুশ সামরিক বাহিনীর সন্মানহানি করেছে। এখন ফ্রিগেট ‘এডমিরাল মাকারভ’এর উপরে হামলা সেই আঙ্গিকে ইউক্রেনের সাফল্য এবং রুশদের সন্মনহানি; যেখানে খুব ভালো ইন্টেলিজেন্স এবং নেটওয়ার্ক ভিত্তিক যুদ্ধক্ষমতার ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। অপরদিকে রুশদের এই ব্যর্থতাগুলি দেখিয়ে দেয় যে, একেবারে সাধারণ সামরিক বিষয়গুলি, যেমন বন্দরের নিরাপত্তা দেয়া, নজর রাখতে পারা, এবং শত্রুর শক্তি বিচার করতে পারার মতো সক্ষমতার ক্ষেত্রে রুশরা যথেষ্ট পারঙ্গম নয়।
 
'এডমিরাল গ্রিগোরোভিচ-ক্লাস'এর ফ্রিগেট 'এডমিরাল মাকারভ', যা খুব সম্ভবতঃ ইউক্রেনের ড্রোন বোটগুলি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এহেন হামলা এমন সময়ে করা হয়, যখন একটা যুদ্ধজাহাজ সবচাইতে দুর্বল অবস্থানে থাকে। বন্দরে থাকা অবস্থায় জাহাজগুলি নিজেদের অস্ত্রকে ব্যবহার করতে পারে না।

নৌ-যুদ্ধকৌশলের উপরে দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল কেমন হতে পারে?

‘দ্যা ওয়ারজোন’এর এক লেখায় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক টাইলার রোগোওয়ে বলছেন যে, এধরণের একটা ড্রোন বোট তৈরিতে হয়তো বেশ কয়েক হাজার ডলার খরচ হবে। তবে তা লক্ষ ডলারের কাতারে যাবে না। এর তুলনায় অনেক আধুনিক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য মিলিয়ন ডলারও হয়ে থাকে। খরচ কম রাখার একটা পদ্ধতি হলো বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায় এমন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা। একইসাথে স্যাটেলাইট যোগাযোগের মতো বিভিন্ন প্রযুক্তি এখন কম খরচে যে কেউই পেতে পারে; যা এরকম দূরপাল্লার হামলাকে সম্ভব করছে। একটা জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র খুব অল্প সংখ্যক রাষ্ট্রই তৈরি করতে পারে; কিন্তু এরকম একটা সুইসাইড বোট অনেকেই তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। আর কোন বন্দরের প্রতিরক্ষাই নিশ্ছিদ্র নয়। সকল নিরাপত্তাই নেয়া হয় অতীতে যা ঘটেছে সেটার উপর নির্ভর করে; ভবিষ্যতে কি ঘটতে পারে সেটা চিন্তা করে নয়।

রোগোওয়ে বলছেন যে, এরকম সুইসাইড ড্রোন যদি কোন বাণিজ্যিক জাহাজে করে দূরবর্তী এলাকায় নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে এরকম হামলা পৃথিবীর যেকোন অঞ্চলেই করা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে প্রচুর বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল রয়েছে, সেখানে বহু জাহাজের প্রপেলারের শব্দের মাঝে এরকম একটা ছোট ড্রোন বোটের শব্দ খুঁজেই পাওয়া যাবে না। গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্য রুটগুলির মাঝ দিয়ে যাবার সময় মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলিকে বেশ ধীরগতিতে যেতে হয়। এরকম সময়ে বহু দিক থেকে বিপুল সংখ্যক ম্যারিন ড্রোনের হামলা ঠেকানো বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে যেতে পারে। আর এর সাথে যদি বিমান ড্রোন যুক্ত হয় তাহলে তো কথাই নেই। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সামরিক ঘাঁটিগুলি এরকম হামলার হুমকিতে থাকবে বেশি। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করার মাধ্যমেও সামরিক সাপ্লাই চেইনে বিশৃংখলা তৈরি করা সম্ভব।

এইচ আই সাটন বলছেন যে, যদিও অনেকেই এধরনের ড্রোনের ব্যাপারে চিন্তা করেছে, তথাপি অনেকগুলি ম্যারিন ড্রোন একত্রে একটা টার্গেটের উপরে হামলা করার ঘটনা এবারই প্রথম। আর ড্রোন বোটগুলি অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী হওয়ায় অনেকেই এগুলি তৈরির চেষ্টা চালাবে। এরকম একটা ড্রোন খুব বড় হুমকি না হলেও অনেকগুলি একত্রে প্রভাব তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এই ড্রোনগুলিকে কিভাবে প্রতিহত করা হবে, সেটা চিন্তা করে অনেক সিদ্ধান্তই পরিবর্তিত হবে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বা সামুদ্রিক মাইন অপসারণে বর্তমানে ব্যবহৃত ম্যারিন ড্রোনগুলি তাদের অবস্থান ধরে রাখবে অবশ্যই। তবে এর সাথে নতুন অস্ত্র হিসেবে এই সুইসাইড ম্যারিন ড্রোনও যুক্ত হবে। প্রকৃতপক্ষে, অনেক ধরণের ম্যারিন ড্রোনের মাঝে এরকম আক্রমণকারী ড্রোনকেই সকলে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।

অপরদিকে তেইফুন ওজবেরক বলছেন যে, একসাথে আকাশ এবং সমুদ্র থেকে অনেকগুলি ড্রোনের হামলা দেখিয়ে দেয় যে, স্বল্প খরচের এই অস্ত্রগুলি শতশত মিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজাহাজগুলির জন্যে কতবড় হুমকি হতে পারে। ভবিষ্যতে বড় যুদ্ধজাহাজগুলিতে যদি এরকম হামলা ঠেকাবার জন্যে যথেষ্ট ব্যবস্থা রাখা না হয়, তাহলে সেগুলির নিরাপত্তা দেয়া কঠিন হবে। টাইলার রোগোওয়ে বলছেন যে, একটা যুদ্ধজাহাজ কতগুলি সুইসাইড বোট ঠেকাতে পারবে, সেই সংখ্যাটা নির্দিষ্ট। আর সবগুলি বোটের মোট খরচও সর্বদাই যুদ্ধজাহাজের খরচের চাইতে অনেক কম হবে। সকলেই এখন ইউক্রেনের যুদ্ধের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, ইরান এবং উত্তর কোরিয়াও এখান থেকে শিখছে; যারা ভবিষ্যতে কোন সুযোগে এরকম সুইসাইড ড্রোন বোট দিয়ে সমুদ্র ছেয়ে ফেলতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু পশ্চিমা দেশগুলিরও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে অত্যন্ত দ্রুত এরকম ড্রোন তৈরি করার। কাজেই অতি শিগগিরই এরকম সুইসাইড ড্রোন বোট ডেভেলপ করার প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে; যেখানে বড় বা ছোট সকল দেশই অংশ নেবে।



সূত্রঃ
‘Ukraine's New Drone Boats That Will Change Naval Warfare, Explained’ by H.I. Sutton, 31 October 2022 (https://www.youtube.com/watch?v=C_tvZufo4hE)
‘Analysis: Ukraine strikes with Kamikaze USVs – Russian bases are not safe anymore’ by Tayfun Ozberk in Naval News, 30 October 2022
‘Ukraine’s New Weapon To Strike Russian Navy In Sevastopol’ by H.I. Sutton in Naval News, 21 September 2022
‘Coordinated Drone Attack Targets the Russian Black Sea Fleet at Sevastopol’ by Tamir Eshel, in Defense Update, 30 October 2022 (https://defense-update.com/20221030_coordinated-drone-attack-targets-the-russian-black-sea-fleet-at-sevastopol.html)
‘Ukraine’s Unprecedented Mass Drone Boat Attack Was A Wakeup Call’ by Tyler Rogoway, in The Warzone, 01 November 2022 (https://www.thedrive.com/the-war-zone/ukraines-unprecedented-mass-drone-boat-attack-was-a-wakeup-call)
‘Ukraine Unleashes Mass Kamikaze Drone Boat Attack On Russia’s Black Sea Fleet Headquarters’ in The Warzone, 29 October 2022 (https://www.thedrive.com/the-war-zone/ukraine-unleashes-mass-kamikaze-drone-boat-attack-on-russias-black-sea-fleet-headquarters)
‘Russia says it has recovered, analyzed drones used to attack its fleet in Crimea’ by Reuters in Al-Arabiya News, 30 October 2022