Showing posts with label Unmanned Surface Vessel. Show all posts
Showing posts with label Unmanned Surface Vessel. Show all posts

Thursday, 3 November 2022

সেভাস্তোপোলের রুশ নৌঘাঁটিতে ইউক্রেনিয় হামলার কৌশলগত গুরুত্ব

০৩রা নভেম্বর ২০২২
 
ইউক্রেনের সুইসাইড ড্রোন বোটগুলি শেষ পর্যন্ত ভিডিও ফুটেজ পাঠিয়েছে। এরকমই একটা ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে, রুশ 'এমআই-৮' হেলিকপ্টার থেকে বোটের দিকে গুলি ছোঁড়া হচ্ছে। একটা যুদ্ধজাহাজ কতগুলি সুইসাইড বোট ঠেকাতে পারবে, সেই সংখ্যাটা নির্দিষ্ট। আর সবগুলি বোটের মোট খরচও সর্বদাই যুদ্ধজাহাজের খরচের চাইতে অনেক কম হবে। সকলেই এখন ইউক্রেনের যুদ্ধের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিচ্ছে।

গত ২৯শে অক্টোবর ইউক্রেনিয়রা রুশ কৃষ্ণ সাগরীয় নৌবহরের হেডকোয়ার্টার্স সেভাস্তোপোলে বড়সড় হামলা করে।হামলার মূল টার্গেট ছিল রুশ নৌবহরের যুদ্ধজাহাজগুলি। আর হামলা করা হয় ইউক্রেনের নৌবাহিনীর নিজস্ব ‘ম্যারিন ড্রোন’ বা মনুষ্যবিহীন সুইসাইড বোটের মাধ্যমে। একইসাথে আকাশ থেকেও মনুষ্যবিহীন বিমান ড্রোনের মাধ্যমে হামলা করা হয়। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন যে, রুশ কৃষ্ণ সাগরীয় নৌবহরের ফ্ল্যাগশিপ ফ্রিগেট ‘এডমিরাল মাকারভ’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপরদিকে রুশরা বলছে যে, শুধু একটা মাইনসুইপার কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনিয়দের প্রকাশ করা একটা ভিডিওতে দেখা যায় যে, রুশ ‘এমআই-৮’ হেলিকপ্টার থেকে ড্রোন বোটকে লক্ষ্য করে মেশিন গানের গুলি ছোঁড়া হচ্ছে; যা বোটের আশেপাশে পানিতে আছড়ে পড়ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এই ড্রোনটা হয়তো তার টার্গেটে পৌঁছাবার আগেই ধ্বংস হয়েছিল। হামলার কিছু সময় পরেই রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলে যে, যে জাহাজগুলির উপর ইউক্রেনিয়রা হামলা করেছে, সেগুলি ইউক্রেনের শষ্য রপ্তানির জাহাজগুলিকে রক্ষা করছিল। সেই হিসেবে রাশিয়া ইউক্রেনের শষ্য রপ্তানির চুক্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়।

হামলার বর্ণনা

আপাততঃ পাওয়া প্রমাণ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, রুশরা ইউক্রেনের ড্রোনগুলির মাঝে বেশ কতগুলির বিরুদ্ধে সফলতা পেয়েছিল। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হচ্ছে যে, এই হামলা চালায় ইউক্রেনের ‘৭৩তম ম্যারিন স্পেশাল ফোর্সেস সেন্টার’; যাদেরকে সহায়তা দিয়েছে ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞরা। ইউক্রেনিয়রা কমপক্ষে ৭টা ম্যারিন ড্রোন এবং ৯টা বিমান ড্রোন ব্যবহার করেছিল। একটা ড্রোন সম্ভবতঃ ইউক্রেনের শষ্য রপ্তানির করিডোর ব্যবহার করেছে। সেখানে ইউক্রেনিয় বা পশ্চিমা একটা বাণিজ্য জাহাজ থেকে এই ড্রোন পানিতে ভাসানো হয়েছে। তারা আরও বলছে যে, সবগুলি বিমান ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে; আর ম্যারিন ড্রোনগুলির মাঝে ৪টা সমুদ্রে, আর ৩টা ভূমিতে ধ্বংস করা হয়েছে। বিবৃতিতে মাইনসুইপার জাহাজ ‘আইভান গোলুবেতস’এর স্বল্প ক্ষতি হবার কথা স্বীকার করা হয়। ‘নেভাল নিউজ’এর এক লেখায় তুর্কি নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তেইফুন ওজবেরক বলছেন যে, প্রমাণাদি দেখে ব্যাপারটা ভিন্ন মনে হয়। কারণ রুশ ‘এডমিরাল গ্রিগোরোভিচ-ক্লাস’এর একটা ফ্রিগেটের খুবই কাছ থেকে ড্রোন ফুটেজ দেখা যায়; যেখানে ফ্রিগেটটা নিজেকে রক্ষা করতে কিছুই করছে না বলে আপাতদৃষ্টে মনে হয়।

ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য এবং ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক এইচ আই সাটন মনে করছেন যে, এর আগে রুশ নৌবাহিনীর ক্রুজার ‘মস্কভা’ ডুবে যাবার মতো সেভাস্তোপোলে ইউক্রেনের হামলাও নৌ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলে বিবেচিত হবে। অনেক নৌবাহিনীই হয়তো এধরণের ড্রোন বোটের কথা ভেবেছে। কিন্তু ইউক্রেনই প্রথম এটা করে দেখিয়েছে। এতকাল যাবত ড্রোনের ক্যামেরা থেকে পাওয়া ফুটেজে টার্গেটকে আকাশ থেকে নিচে দেখা গিয়েছে। এবারই প্রথমবারের মতো টার্গেটের পাশ থেকে ড্রোন ফুটেজ দেখা গেলো।

ড্রোন বোট হামলার ইতিহাস

তবে রিমোট কন্ট্রোল ড্রোন বোটের ব্যবহার এর আগে হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ১৯১৭ সালে জার্মানরা ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজের উপরে রিমোট কন্ট্রোল বোট দিয়ে হামলা করেছিল; যদিও তা সফলতা পায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ইতালি, জাপান, ব্রিটেন এবং জার্মানি মূলতঃ মনুষ্যচালিত বোটের মাধ্যমে শত্রু জাহাজের উপরে হামলা করে। জার্মানরা টার্গেটে আঘাত করার আগে শেষ দুই মাইল মনুষ্যচালিত কমান্ড বোট থেকে ড্রোন বোট নিয়ন্ত্রণ করতো। ড্রোন বোটগুলিতেও পাইলট থাকতো; যারা শেষ মুহুর্তে বোট থেকে পানিতে লাফিয়ে পড়তো। সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৭ এবং ২০২২ সালে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা বিস্ফোরক বহণ করা বোট দিয়ে সৌদি এবং আমিরাতি যুদ্ধজাহাজের উপরে হামলা করে।

তেইফুন ওজবেরক বলছেন যে, ২০০০ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘কোল’এর উপর ইয়েমেনের আদেন বন্দরে হামলা হবার পর পশ্চিমা নৌবাহিনীগুলি নিজেদের বন্দর ও জাহাজগুলির নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে। কারণ এহেন হামলা এমন সময়ে করা হয়, যখন একটা যুদ্ধজাহাজ সবচাইতে দুর্বল অবস্থানে থাকে। বন্দরে থাকা অবস্থায় জাহাজগুলি নিজেদের অস্ত্রকে ব্যবহার করতে পারে না। ২০০০ সালের এই ঘটনাকে পুঁজি করে নিজেদের নৌবাহিনী তৈরি করেছে ইরান। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলি বড় জাহাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে তৈরি হলেও বহু সংখ্যক ছোট বোটের সমন্বিত হামলা মোকাবিলা করার জন্যে তৈরি করা হয়নি।

 
সেভাস্তোপোল বন্দরের স্যাটেলাইট ছবি। সেভাস্তোপোল সামরিক ঘাঁটির মুখটা বেশ সরু এবং সেখানে যেকোন জাহাজ ঢোকার মুখে চেকপোস্ট রয়েছে। এছাড়াও বন্দরের বাইরে রয়েছে নৌবাহিনীর প্যাট্রোল। আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, বন্দরের বাইরে এবং ভিতরে রুশ প্যাট্রোল ম্যারিন ড্রোনগুলিকে বাধা দিয়েছিল। তথাপি দু’টা ম্যারিন ড্রোন বন্দরের ভেতরে কোনভাবে ঢুকে পড়ে। রাশিয়া যেখানে ৯ মাস ধরে যুদ্ধরত, তখন সেভাস্তোপোল বন্দরে ঢোকার মুখে একটা ড্রোন বোটকে খুঁজে পাওয়া যাবে না বা বোটগুলিকে রুশরা ধ্বংস করতে ব্যর্থ হবে; এটা মেনে নেয়া যায় না।

কিভাবে এবং কি দিয়ে এই হামলা সম্ভব হলো?

সেভাস্তোপোল সামরিক ঘাঁটির মুখটা বেশ সরু এবং সেখানে যেকোন জাহাজ ঢোকার মুখে চেকপোস্ট রয়েছে। এছাড়াও বন্দরের বাইরে রয়েছে নৌবাহিনীর প্যাট্রোল। আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, বন্দরের বাইরে এবং ভিতরে রুশ প্যাট্রোল ম্যারিন ড্রোনগুলিকে বাধা দিয়েছিল। তথাপি দু’টা ম্যারিন ড্রোন বন্দরের ভেতরে কোনভাবে ঢুকে পড়ে। তেইফুন ওজবেরক বলছেন যে, রাশিয়া যেখানে ৯ মাস ধরে যুদ্ধরত, তখন সেভাস্তোপোল বন্দরে ঢোকার মুখে একটা ড্রোন বোটকে খুঁজে পাওয়া যাবে না বা বোটগুলিকে রুশরা ধ্বংস করতে ব্যর্থ হবে; এটা মেনে নেয়া যায় না। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় যে, রুশ হেলিকপ্টারগুলি বোটগুলির উপরে মেশিনগান দিয়ে গুলি করছে। কিন্তু এধরণের ছোট এবং দ্রুতগামী টার্গেট ধ্বংস করতে হয়তো নিখুঁত নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই।

ইউক্রেনিয়দের এহেন ম্যারিন ড্রোনের কথা জানা যায় গত সেপ্টেম্বরে; যখন একটা ড্রোন বোট ক্রিমিয়া উপদ্বীপের ওমেগা উপসাগর উপকূলে ভেসে আসে। এইচ আই সাটন এই বোটের একটা বিশ্লেষণ করেছেন। এর ইঞ্জিন খুব সম্ভবতঃ পানিতে খেলাধূলার জন্যে ব্যবহৃত জেটস্কির ওয়াটারজেট ইঞ্জিন। খুব সম্ভতঃ কানাডিয় কোম্পানি ‘সীডু’এর তৈরি জেটস্কির ইঞ্জিন এতে লাগানো হয়েছে। বোটের সামনে দু’টা সোভিয়েত ডিজাইনের ফিউজ (ইউপি-৫৮১) ব্যবহার করা হয়েছে। এই ফিউজগুলি দেখে ধারণা করা যেতে পারে যে, এর ওয়ারহেড ছিল হয়তো ‘এফএবি-৫০০’ বোমা। একটা ঘুর্নায়মান ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ক্যামেরার মাধ্যমে টার্গেটের ছবি তুলতে পারে বোটটা। এই ক্যামেরা দিয়ে তোলা ভিডিওই ইউক্রেনিয়রা প্রকাশ করেছে। বোটের ন্যাভিগেশন আসছে এর উপরে বসানো স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট এন্টেনা থেকে।

‘দ্যা ড্রাইভ’ ম্যাগাজিনের প্রতিরক্ষা সেকশন ‘ওয়ারজোন’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এই বোটগুলি ইউক্রেনের উপকূল থেকে ছাড়ার অর্থ হলো যথেষ্ট পরিমাণে জ্বালানি বহণ করতে হবে; যা কিনা বহণকৃত বিস্ফোরকের পরিমাণ কমিয়ে দেবে। এগুলিকে ডিজাইন করা হয়েছে দূরপাল্লার টার্গেটে আঘাত হানার জন্যে; যা থাকবে সরাসরি দৃষ্টির পাল্লার বাইরে। তবে সেই দূরত্বেও সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এর অর্থ হলো, বিশ্বের যেকোন বন্দর এখন এধরণের হামলার আওতায় পড়তে পারে। এরকম দূরত্ব থেকে বোট নিয়ন্ত্রণ করতে পারার অর্থ হলো, অস্থায়ী টার্গেটেও হামলা করা সম্ভব হবে; প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও এড়াতে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে; ঐ মুহুর্তে কোন সুযোগ হাজির হলে সেটাও কাজে লাগানো যাবে। কারণ বোটটাকে শেষ পর্যন্ত কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে এবং দরকার হলে এর দিক পরিবর্তন করতে পারছে। এই ব্যাপারটা নৌযুদ্ধের ক্ষেত্রে অনেক বড় নতুনত্ব। এতকাল সুইসাইড ড্রোন বোট অপারেট করেছে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে যে, এই চিন্তাটা যখন আরও উন্নততর কোন শক্তি লুফে নেবে, তখন এগুলির সক্ষমতা কেমন হতে পারে।

গত সেপ্টেম্বরে ক্রিমিয়া উপদ্বীপে ভেসে আসা ড্রোন বোটটা ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা উপকূল থেকে প্রায় ২’শ ৮০ কিঃমিঃ দূরে ছিল। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয় যে, ড্রোনগুলি এসেছে ইউক্রেনের ওচাকভ এলাকা থেকে; যা কিনা সেভাস্তোপোল থেকে প্রায় ২’শ ৪০ কিঃমিঃ দূরে। ‘ডিফেন্স আপডেট’এর এক লেখায় ইস্রাইলি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক তামির এশেল বলছেন যে, এর অর্থ হলো, এই লম্বা দূরত্ব এই বোটগুলি অতিক্রম করেছে রুশদের দৃষ্টি এড়িয়ে। আর সেপ্টেম্বর মাসে ইউক্রেনিয় ড্রোন ক্রিমিয়ার উপকূলে আবিষ্কার হবার পরে রুশরা তাদের জাহাজগুলিকে খোলা সমুদ্রে প্যাট্রোল থেকে সরিয়ে সেভাস্তোপোল বন্দরের ভিতরে জমা করে; যে সুযোগ ইউক্রেনিয়রা কাজে লাগায় বন্দরের ভিতরে হামলা করে। একসাথে ম্যারিন এবং বিমান ড্রোন ব্যবহার করার ফলে ঐ মুহুর্তে ইউক্রেনিয়রা সর্বশেষ ইন্টেলিজেন্স পায় এবং সেগুলিকে সঠিকভাবে সমন্বয় করতে সক্ষম হয়। একইসাথে ইউক্রেনিয়রা ঘাঁটির মাঝে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে রুশদের হতভম্ব করে ফেলে।

সেপ্টেম্বর মাসে ক্রিমিয়ার উপকূলে ভেসে আসা ইউক্রেনিয় ড্রোন বোট। একটা ড্রোন বোট তৈরিতে হয়তো বেশ কয়েক হাজার ডলার খরচ হবে। তবে তা লক্ষ ডলারের কাতারে যাবে না। এর তুলনায় অনেক আধুনিক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য মিলিয়ন ডলারও হয়ে থাকে। একটা জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র খুব অল্প সংখ্যক রাষ্ট্রই তৈরি করতে পারে; কিন্তু এরকম একটা সুইসাইড বোট অনেকেই তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।

তেইফুন ওজবেরক রুশ কৃষ্ণ সাগরীয় নৌবহরের সমালোচনা করে বলছেন যে, তারা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখছে না। এর আগে তারা ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্রের হাতে ক্রুজার ‘মস্কভা’ এবং একটা গুরুত্বপূর্ণ টাগবোট হারিয়েছে। এছাড়াও তুর্কিদের নির্মিত ড্রোনের হামলায় তাদের বিভিন্ন প্যাট্রোল বোট ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধজাহাজ ‘মস্কভা’ আক্রান্ত হবার আগে রুশ ইন্টেলিজেন্স যদি সঠিক তথ্য দিতে পারতো যে, ইউক্রেনের জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলি উপকূলে অপারেশনাল রয়েছে, তাহলে জাহাজটাকে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার বাইরে রাখা যেতো। আর ইউক্রেনের হাতে মার্কিন ‘হারপুন’ জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে জেনেও রুশরা তাদের টাগবোট স্নেইক আইল্যান্ডের কাছে পাঠিয়েছিল। ‘মস্কভা’ হারাবার পর রুশরা উপকূলীয় অঞ্চলে আকাশের নিয়ন্ত্রণ হারায়। এরপরেও তারা হাল্কা বিমান প্রতিরক্ষা সজ্জিত প্যাট্রোল বোটগুলিকে উপকূলের কাছে পাঠায়; যেখানে সেগুলিকে ইউক্রেনের ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোনগুলি ধ্বংস করে। ‘মস্কভা’ হারাবার সময় বহু দেশের মতো রুশদেরও একই বাস্তবতা ছিল – তাদের নৌবাহিনী কয়েক দশক ধরে কোন যুদ্ধ করেনি। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রথম ঘটনার পরে তো তাদের শিক্ষা নেবার কথা; যা তারা নেয়নি। সেপ্টেম্বর মাসে সেভাস্তোপোলের কাছে যখন একটা ইউক্রেনিয় ড্রোন পাওয়া যায়, তখন রুশদের বোঝা উচিৎ ছিল যে, ইউক্রেনিয়রা সেভাস্তোপোলে রুশ নৌবহরের উপরে হামলার পরিকল্পনা করছে। পাঁচ সপ্তাহের আগাম সতর্কতা পাবার পরেও তারা সেভাস্তোপোলের নিরাপত্তা যথেষ্ট বৃদ্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের উপর সেভাস্তোপোল হামলার সম্ভাব্য ফলফল


এইচ আই সাটন মনে করছেন যে, আক্রমণে রুশ নৌবাহিনীর কোন জাহাজ সম্ভবতঃ ডুবে যায়নি। তথাপি এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এতে রুশদের দৃষ্টি অন্য দিকে সড়ে যাবে এবং ঘাঁটি হিসেবে সেভাস্তোপোলকে হুমকির মাঝে রাখবে। রুশ নৌবাহিনীর ইউনিটগুলি ভবিষ্যতে কোথায় কিভাবে মোতায়েন করা হবে, তা এই ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হবে।

তেইফুন ওজবেরকএর মতে, ইউক্রেনিয়রা এর আগে যেসব হামলা করেছে, সেগুলির কৌশলগত প্রভাব ছিল যথেষ্ট। সেই হামলাগুলি রুশ সামরিক বাহিনীকে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। বিশেষ করে রুশ নৌবাহিনীর ক্রুজার ‘মস্কভা’ ডুবে যাওয়া এবং ক্রিমিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কার্চ সেতুর উপরে হামলা রুশ সামরিক বাহিনীর সন্মানহানি করেছে। এখন ফ্রিগেট ‘এডমিরাল মাকারভ’এর উপরে হামলা সেই আঙ্গিকে ইউক্রেনের সাফল্য এবং রুশদের সন্মনহানি; যেখানে খুব ভালো ইন্টেলিজেন্স এবং নেটওয়ার্ক ভিত্তিক যুদ্ধক্ষমতার ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। অপরদিকে রুশদের এই ব্যর্থতাগুলি দেখিয়ে দেয় যে, একেবারে সাধারণ সামরিক বিষয়গুলি, যেমন বন্দরের নিরাপত্তা দেয়া, নজর রাখতে পারা, এবং শত্রুর শক্তি বিচার করতে পারার মতো সক্ষমতার ক্ষেত্রে রুশরা যথেষ্ট পারঙ্গম নয়।
 
'এডমিরাল গ্রিগোরোভিচ-ক্লাস'এর ফ্রিগেট 'এডমিরাল মাকারভ', যা খুব সম্ভবতঃ ইউক্রেনের ড্রোন বোটগুলি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এহেন হামলা এমন সময়ে করা হয়, যখন একটা যুদ্ধজাহাজ সবচাইতে দুর্বল অবস্থানে থাকে। বন্দরে থাকা অবস্থায় জাহাজগুলি নিজেদের অস্ত্রকে ব্যবহার করতে পারে না।

নৌ-যুদ্ধকৌশলের উপরে দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল কেমন হতে পারে?

‘দ্যা ওয়ারজোন’এর এক লেখায় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক টাইলার রোগোওয়ে বলছেন যে, এধরণের একটা ড্রোন বোট তৈরিতে হয়তো বেশ কয়েক হাজার ডলার খরচ হবে। তবে তা লক্ষ ডলারের কাতারে যাবে না। এর তুলনায় অনেক আধুনিক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য মিলিয়ন ডলারও হয়ে থাকে। খরচ কম রাখার একটা পদ্ধতি হলো বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায় এমন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা। একইসাথে স্যাটেলাইট যোগাযোগের মতো বিভিন্ন প্রযুক্তি এখন কম খরচে যে কেউই পেতে পারে; যা এরকম দূরপাল্লার হামলাকে সম্ভব করছে। একটা জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র খুব অল্প সংখ্যক রাষ্ট্রই তৈরি করতে পারে; কিন্তু এরকম একটা সুইসাইড বোট অনেকেই তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। আর কোন বন্দরের প্রতিরক্ষাই নিশ্ছিদ্র নয়। সকল নিরাপত্তাই নেয়া হয় অতীতে যা ঘটেছে সেটার উপর নির্ভর করে; ভবিষ্যতে কি ঘটতে পারে সেটা চিন্তা করে নয়।

রোগোওয়ে বলছেন যে, এরকম সুইসাইড ড্রোন যদি কোন বাণিজ্যিক জাহাজে করে দূরবর্তী এলাকায় নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে এরকম হামলা পৃথিবীর যেকোন অঞ্চলেই করা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে প্রচুর বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল রয়েছে, সেখানে বহু জাহাজের প্রপেলারের শব্দের মাঝে এরকম একটা ছোট ড্রোন বোটের শব্দ খুঁজেই পাওয়া যাবে না। গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্য রুটগুলির মাঝ দিয়ে যাবার সময় মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলিকে বেশ ধীরগতিতে যেতে হয়। এরকম সময়ে বহু দিক থেকে বিপুল সংখ্যক ম্যারিন ড্রোনের হামলা ঠেকানো বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে যেতে পারে। আর এর সাথে যদি বিমান ড্রোন যুক্ত হয় তাহলে তো কথাই নেই। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সামরিক ঘাঁটিগুলি এরকম হামলার হুমকিতে থাকবে বেশি। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করার মাধ্যমেও সামরিক সাপ্লাই চেইনে বিশৃংখলা তৈরি করা সম্ভব।

এইচ আই সাটন বলছেন যে, যদিও অনেকেই এধরনের ড্রোনের ব্যাপারে চিন্তা করেছে, তথাপি অনেকগুলি ম্যারিন ড্রোন একত্রে একটা টার্গেটের উপরে হামলা করার ঘটনা এবারই প্রথম। আর ড্রোন বোটগুলি অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী হওয়ায় অনেকেই এগুলি তৈরির চেষ্টা চালাবে। এরকম একটা ড্রোন খুব বড় হুমকি না হলেও অনেকগুলি একত্রে প্রভাব তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এই ড্রোনগুলিকে কিভাবে প্রতিহত করা হবে, সেটা চিন্তা করে অনেক সিদ্ধান্তই পরিবর্তিত হবে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বা সামুদ্রিক মাইন অপসারণে বর্তমানে ব্যবহৃত ম্যারিন ড্রোনগুলি তাদের অবস্থান ধরে রাখবে অবশ্যই। তবে এর সাথে নতুন অস্ত্র হিসেবে এই সুইসাইড ম্যারিন ড্রোনও যুক্ত হবে। প্রকৃতপক্ষে, অনেক ধরণের ম্যারিন ড্রোনের মাঝে এরকম আক্রমণকারী ড্রোনকেই সকলে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।

অপরদিকে তেইফুন ওজবেরক বলছেন যে, একসাথে আকাশ এবং সমুদ্র থেকে অনেকগুলি ড্রোনের হামলা দেখিয়ে দেয় যে, স্বল্প খরচের এই অস্ত্রগুলি শতশত মিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজাহাজগুলির জন্যে কতবড় হুমকি হতে পারে। ভবিষ্যতে বড় যুদ্ধজাহাজগুলিতে যদি এরকম হামলা ঠেকাবার জন্যে যথেষ্ট ব্যবস্থা রাখা না হয়, তাহলে সেগুলির নিরাপত্তা দেয়া কঠিন হবে। টাইলার রোগোওয়ে বলছেন যে, একটা যুদ্ধজাহাজ কতগুলি সুইসাইড বোট ঠেকাতে পারবে, সেই সংখ্যাটা নির্দিষ্ট। আর সবগুলি বোটের মোট খরচও সর্বদাই যুদ্ধজাহাজের খরচের চাইতে অনেক কম হবে। সকলেই এখন ইউক্রেনের যুদ্ধের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, ইরান এবং উত্তর কোরিয়াও এখান থেকে শিখছে; যারা ভবিষ্যতে কোন সুযোগে এরকম সুইসাইড ড্রোন বোট দিয়ে সমুদ্র ছেয়ে ফেলতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু পশ্চিমা দেশগুলিরও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে অত্যন্ত দ্রুত এরকম ড্রোন তৈরি করার। কাজেই অতি শিগগিরই এরকম সুইসাইড ড্রোন বোট ডেভেলপ করার প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে; যেখানে বড় বা ছোট সকল দেশই অংশ নেবে।



সূত্রঃ
‘Ukraine's New Drone Boats That Will Change Naval Warfare, Explained’ by H.I. Sutton, 31 October 2022 (https://www.youtube.com/watch?v=C_tvZufo4hE)
‘Analysis: Ukraine strikes with Kamikaze USVs – Russian bases are not safe anymore’ by Tayfun Ozberk in Naval News, 30 October 2022
‘Ukraine’s New Weapon To Strike Russian Navy In Sevastopol’ by H.I. Sutton in Naval News, 21 September 2022
‘Coordinated Drone Attack Targets the Russian Black Sea Fleet at Sevastopol’ by Tamir Eshel, in Defense Update, 30 October 2022 (https://defense-update.com/20221030_coordinated-drone-attack-targets-the-russian-black-sea-fleet-at-sevastopol.html)
‘Ukraine’s Unprecedented Mass Drone Boat Attack Was A Wakeup Call’ by Tyler Rogoway, in The Warzone, 01 November 2022 (https://www.thedrive.com/the-war-zone/ukraines-unprecedented-mass-drone-boat-attack-was-a-wakeup-call)
‘Ukraine Unleashes Mass Kamikaze Drone Boat Attack On Russia’s Black Sea Fleet Headquarters’ in The Warzone, 29 October 2022 (https://www.thedrive.com/the-war-zone/ukraine-unleashes-mass-kamikaze-drone-boat-attack-on-russias-black-sea-fleet-headquarters)
‘Russia says it has recovered, analyzed drones used to attack its fleet in Crimea’ by Reuters in Al-Arabiya News, 30 October 2022

Saturday, 10 September 2022

মার্কিন নৌবাহিনী ভূতুড়ে নৌবহর তৈরি করছে কেন?

১০ই সেপ্টেম্বর ২০২২
 
মার্কিন নৌবাহিনীর ড্রোন জাহাজ 'নোম্যাড' এবং 'রেঞ্জার'। মার্কিন নৌবাহিনী ‘ঘোস্ট ফ্লীট ওভারলর্ড’ প্রকল্পের মাধ্যমে নৌবাহিনীর আকার বৃদ্ধি করতে চাইছে; তবে একইসাথে তুলনামূলকভাবে বাজেট নিয়ন্ত্রণের মাঝে রাখতে চাইছে। তাই এই ড্রোন জাহাজগুলির মাঝে বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায় এমন অনেক যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। একটা ডেস্ট্রয়ার তৈরি করতে প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একই খরচে ডজনখানেক ‘ভূতুড়ে’ ড্রোন জাহাজ তৈরি করা সম্ভব। এই ডজনখানেক জাহাজ দিয়ে অনেক বেশি সমুদ্র অনেক বেশি সময় ধরে টহল দেয়া সম্ভব।

গত ২৩শে অগাস্ট মার্কিন নৌবাহিনী ‘ম্যারিনার’ নামে একটা জাহাজের উদ্ভোধন করে; যা প্রধানতঃ মনুষ্যবিহীন। ‘ঘোস্ট ফ্লীট ওভারলর্ড’ নামের প্রকল্পের অংশ এই জাহাজখানা কোন মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ভূতের মতোই সমুদ্রে চলবে বলে বলা হচ্ছে। জাহাজটা অনেক ক্ষেত্রেই নিজে নিজেই সমুদ্রে চলতে পারবে। ‘ইউএস নেভাল ইন্সটিটউট’এর খবরে বলা হচ্ছে যে, এতে এখন বিভিন্ন সেন্সর যন্ত্রপাতি, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাডার এবং অন্যান্য বিভিন্ন উপকরণ সংযোগ করা হচ্ছে; যার বেশিরভাগই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাজারে বিক্রি হয়। জাহাজটার মূল ডিজাইন ছিল সমুদ্রে তেলের রিগে মালামাল সরবরাহের কাজ করা জাহাজগুলির মতোই। নৌবাহিনীর সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক ব্রায়ান ফিতজপ্যাট্রিক বলছেন যে, জাহাজটা তৈরির মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন নৌবাহিনী এটাকে কিনে ফেলে। খবরে বলা হচ্ছে যে, ৫৯ মিটার লম্বা এই জাহাজটাতে ডাটালিঙ্ক এবং অন্যান্য সিস্টেম থাকবে; যার মাধ্যমে জাহাজটা অন্যান্য মনুষ্যবিহীন জাহাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ নৌবাহিনী এখন একত্রে কয়েকটা মনুষ্যবিহীন জাহাজ নিয়ে পরীক্ষা চালাতে সক্ষম হবে। ‘ম্যারিনার’ জাহাজখানা প্রায় একই ধরণের চারটা জাহাজের একটা। এর আগে আরও দু’টা জাহাজ ‘রেঞ্জার’ এবং ‘নোম্যাড’ ইতোমধ্যেই নৌবাহিনীর সাথে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। চতুর্থ জাহাজ ‘ভ্যানগার্ড’ এখনও তৈরি হচ্ছে। এই জাহাজগুলি মোটামুটিভাবে ৫২ থেকে ৬২ মিটার লম্বা এবং ৩’শ থেকে ৪’শ টনের মতো মালামাল বহণে সক্ষম।

মনুষ্যবিহীন জাহাজের চিন্তা এবং বাস্তবায়ন

‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার মাঝে চীনকে নিয়ন্ত্রণে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের বহরের আকার বৃদ্ধি করতে চাইছে। কিন্তু বাজেটের সংকুলান সর্বদাই কঠিন ব্যাপার হিসেবে সামনে আসছে; যা কিনা বারংবার নৌবহরের আকারকে আলোচনায় নিয়ে আসছে। কর্মকর্তাদের মাঝে অনেকেই মনে করছেন যে, নৌবহরের আকার বৃদ্ধি করার একটা পদ্ধতি হতে পারে মনুষ্যবিহীন বা ড্রোন জাহাজ। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিনীরা এহেন জাহাজ তৈরির পিছনে যথেষ্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর একটা কনসেপ্ট পেপারের অংশ হিসেবে ‘ইউএসভি’ বা ‘আনম্যানড সারফেস ভেসেল’ বা মনুষ্যবিহীন জাহাজের উপর একটা গ্রাফিক প্রেজেনটেশন উপস্থাপন করা হয়। ‘ইউএসভি সিস্টেমস ভিশন’ নামের এই প্রেজেনটেশনে দেখানো হয় যে, মার্কিন নৌবাহিনী মোটামুটিভাবে চার প্রকারের মনুষ্যবিহীর ড্রোন জাহাজ ডেভেলপ করছে। সবচাইতে ছোট প্রথম ক্লাসের নৌযানগুলি হবে ৭ মিটারের নিচে লম্বা। এর উপরে দ্বিতীয় ক্লাসের নৌযানগুলি হবে ৭ মিটার থেকে ১২ মিটার পর্যন্ত লম্বা। তৃতীয় ক্লাসের জাহাজগুলি হবে ১২ মিটার থেকে ৫০ মিটারের মাঝে। আর চতুর্থ ক্লাসের জাহাজগুলি হবে ৫০ মিটারের উপর লম্বা। শেষ এই দুই ক্লাসের জাহাজগুলিকে মধ্যম এবং বড় আকৃতির বলা হচ্ছে। বিভিন্ন ক্লাসের মাঝে পার্থক্য হবে এগুলির বহণক্ষমতা, সমুদ্রে লম্বা সময় ধরে থাকার সক্ষমতা এবং খারাপ আবহাওয়ায় টিকে থাকার সক্ষমতা।

প্রথম দুই ক্লাসের বেশকিছু ছোট নৌযান মার্কিনীরা ইতোমধ্যেই তৈরি করে মনুষ্যবিহীন নৌযানের কনসেপ্টগুলিকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছে। তৃতীয় এবং চতুর্থ ক্লাস থেকে জাহাজের জটিলতা বাড়তে থাকে। জাহাজগুলির নিয়ন্ত্রণ মূলতঃ ভূমিতে অবস্থিত কন্ট্রোল সেন্টার থেকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে করা হয়। তৃতীয় ক্লাসের অংশ হিসেবে ২০১৭ সাল থেকে নৌবাহিনী ভিন্ন দুই গবেষণা সংগঠন ‘সী হান্টার’ এবং ‘সীহক’ নামের দু’টা জাহাজ তৈরি করেছে। ছোট আকারের হলেও তিনটা খোলের উপর তৈরি হবার কারণে এই ছোট জাহাজগুলি বাজে আবহাওয়াতেও টিকে থাকতে পারে। এই জাহাজগুলির ডিজাইন করাই হয়েছে মনুষ্যবিহীন জাহাজ হিসেবে। চতুর্থ ক্লাসের অংশ হিসেবে নৌবাহিনী ‘ম্যারিনার’ তৈরি করেছে। ম্যারিনারের আগে ২০১৯ সালে তৈরি হয়েছে ‘নোম্যাড’ এবং ‘রেঞ্জার’। তবে এই জাহাজগুলি প্রথম থেকেই মনুষ্যবিহীন জাহাজ হিসেবে তৈরি করা হয়নি। তেলের রিগে কাজ করা জাহাজ থেকে পরিবর্তন করে এগুলিকে তৈরি করা হয়েছে। এগুলির মূল আকর্ষণ হলো, এগুলির ইঞ্জিন বেশ শক্তিশালী এবং জাহাজের পিছনের দিকে বড় একটা অংশ খোলা ডেক; যেখানে বিভিন্ন আকৃতির কনটেইনার রাখা সম্ভব।

চতুর্থ ক্লাসের বড় জাহাজগুলির মূল সক্ষমতা হলো এগুলি বেশকিছু কনটেইনার বহণ করতে পারে। এই কনটেইনারগুলির ভেতর বিভিন্ন সামরিক মিশনের যন্ত্রপাতি বহণ করা হবে। যখন যেধরনের মিশন থাকবে, তখন সেধরনের কনটেইনার বহণ করা হবে। এগুলির মাঝে রয়েছে সাবমেরিন খুঁজতে ব্যবহার করা বিভিন্ন সরঞ্জাম, জাহাজ ধ্বংস করার ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন প্রকার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্য জাহাজের জন্যে টার্গেট খোঁজার যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র বহণ এবং মালামাল পরিবহণ। তৃতীয় ক্লাসের জাহাজগুলি আবার সমুদ্রে মাইন অপসারণের কাজেও লাগানো হতে পারে।

 
সেপ্টেম্বর ২০২১। ড্রোন জাহাজ 'রেঞ্জার'এর পিছনে রাখা কনটেইনার থেকে ছোঁড়া হচ্ছে 'এসএম-৬' আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র। জাহাজগুলির মূল সক্ষমতা হলো এগুলি বেশকিছু কনটেইনার বহণ করতে পারে। এই কনটেইনারগুলির ভেতর বিভিন্ন সামরিক মিশনের যন্ত্রপাতি বহণ করা হবে। যখন যেধরনের মিশন থাকবে, তখন সেধরনের কনটেইনার বহণ করা হবে। এগুলির মাঝে রয়েছে সাবমেরিন খুঁজতে ব্যবহার করা বিভিন্ন সরঞ্জাম, জাহাজ ধ্বংস করার ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন প্রকার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্য জাহাজের জন্যে টার্গেট খোঁজার যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র বহণ এবং মালামাল পরিবহণ।

ড্রোন জাহাজের সক্ষমতা

মার্কিন নৌবাহিনীর মনুষ্যবিহীন ড্রোন জাহাজ প্রকল্পের প্রধান রিয়ার এডমিরাল কেসি মোটন বলছেন যে, জাহাজগুলির মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, এগুলির একেকটার ইঞ্জিনের আকার ভিন্ন। পরবর্তীতে যেসকল মিশনের জন্যে এই জাহাজগুলিকে তৈরি করা হচ্ছে, সেই মিশনগুলিকে মাথায় রেখেই প্রধান কাজগুলি এখন সম্পাদন করা হচ্ছে। এই জাহাজগুলির কাছ থেকে আশা করা হচ্ছে যে, একসময় এগুলি অন্যান্য মার্কিন যুদ্ধজাহাজের মতো ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করবে। এডমিরাল মোটন বলছেন যে, এই জাহাজগুলির কয়েকটা এখন একত্রে প্যাট্রোল দিতে পারবে; যেখানে সেই কাজটা বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারগুলি করে থাকে। কিন্তু এই ডেস্ট্রয়ারগুলি এখন অনেক ব্যস্ত; তাই এগুলিকে সকল সময়ে পাওয়া যায় না। তবে ‘ম্যারিনার’ জাহাজটা একটা ডেস্ট্রয়ারের সাথে যুক্ত হয়ে মিশনে অংশ নিতে পারবে। কিছু মিশন, যেমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার কাজে ডেস্ট্রয়ারের জায়গায় ‘ম্যারিনার’এর মতো জাহাজগুলি প্রতিস্থাপিত হতে পারে।

জাহাজটার পিছনের খোলা ডেকে বেশ কতগুলি ২০ ফুট এবং ৪০ ফুট লম্বা কনটেইনার বহন করা যাবে। এই কনটেইনারগুলির মাঝে থাকবে বিভিন্ন সামরিক মিশনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি। যদিও এখনও পর্যন্ত নৌবাহিনী চাইছে যে জাহাজটা মহাসাগর পাড়ি দেবে, তথাপি এখনও জাহাজগুলিকে সমুদ্রের মাঝখানে কিভাবে রিফুয়েল করা হবে, সেব্যাপারে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। বর্তমানে জাহাজগুলিতে কয়েকজন নাবিক রাখতে হচ্ছে সমুদ্রে রিফুয়েলিং করার জন্যে; কারণ রিফুয়েলিং অপারেশগুলি অনেক জটিল। তবে সামনের বছরেই নৌবাহিনী মানুষ ছাড়া একটা রিফুয়েলিং অপারেশন করতে চাইছে। এছাড়াও এক বছর আগে ২০২১এর সেপ্টেম্বরে ‘রেঞ্জার’ জাহাজের উপর একটা কনটেইনার থেকে ‘এসএম-৬’ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে নতুন ধরণের যুদ্ধের দ্বার উন্মোচন করা হয়।

‘ম্যারিনার’ জাহাজখানার আরও একখানা বর্ণনা দিয়েছে ‘ব্রেকিং ডিফেন্স’। যদিও জাহাজটা মনুষ্যবিহীন বলা হচ্ছে, তথাপি এটা পুরোপুরি মনুষ্যবিহীন নয়। বরং এটাকে বলা যায় এমন একটা জাহাজ, যা কিনা দরকার হলে মানুষও চালায়। জাহাজের ব্রিজে বড় একটা লাল সুইচ রয়েছে; যার মাধ্যমে জাহাজটাকে সফটওয়্যার চালিত থেকে মনুষ্যচালিত করে ফেলা যায়। বিশেষ কোন সমস্যা হলেই অবশ্য এই সুইচ টেপা হয়। সাধারণতঃ অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞতার ক্যাপ্টেনরাই এই সুইচ বেশি টিপে থাকে। তবে নৌবাহিনী ভবিষ্যতে পুরোপুরি মনুষ্যবিহীন জাহাজ তৈরি করতে চাইছে।

 
ফেব্রুয়ারি ২০১৭। ড্রোন জাহাজ 'সী হান্টার' নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। মার্কিন নৌবাহিনী চাইছে যে, তারা এমন কিছু জাহাজ তৈরি করবে, যেগুলি কোন ধরণের মেইনটেন্যান্স ছাড়াই এক বছর সমুদ্রে অপারেট করতে সক্ষম হবে। ছোট জাহাজ ‘সী হান্টার’ এবং ‘সীহক’এর ক্ষেত্রে তারা এই ব্যাপারটা অনেকটাই পেরেছে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত বড় ‘নোম্যাড’ এবং ‘রেঞ্জার’এর মতো জাহাজগুলির ব্যাপারে তারা এখনও সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। বিশেষ করে এই বড় জাহাজগুলিকে সমুদ্রের মাঝে রিফুয়েলিং করতে এখনও ক্রু বহণ করতে হচ্ছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে চলতে গিয়েও মার্কিন নৌবাহিনী সকল ক্রু জাহাজ থেকে নামিয়ে দিতে পারছে না; যদিও জাহাজগুলি ৯০ শতাংশের বেশি সময় ক্রুদের সহায়তা ছাড়াই চলছে।


‘রিমপ্যাক ২০২২’ মহড়ায় ড্রোন জাহাজ – নেটওয়ার্কই আসল ইস্যু

মাত্র কিছুদিন আগেই ‘নোম্যাড’ এবং ‘রেঞ্জার’ ড্রোন জাহাজ দু’টা মার্কিন নেতৃত্বের বড় আকারের সামরিক মহড়া ‘রিম অব দ্যা প্যাসিফিক ২০২২’ বা ‘রিমপ্যাক ২০২২’এ অংশ নেয়। এই জাহাজ দু’টার সাথে আরও দু’টা অপেক্ষাকৃত ছোট মনুষ্যবিহীন জাহাজ অংশ নেয়; যেগুলি হলো ‘সী হান্টার’ এবং ‘সীহক’। ফিতজপ্যাট্রিক ‘ইউএস নেভাল ইন্সটিটিউট’কে বলছেন যে, সেই মহড়া থেকে তারা ৪’শ টেরাবাইট তথ্য পেয়েছেন; যা কিনা এখন বিশ্লেষণ করে দেখা হবে।

ছয় সপ্তাহ ধরে চলা ‘রিমপ্যাক ২০২২’ মহড়া থেকে অনেকেই বিভিন্ন শিক্ষা নিতে চাইছে। ‘ব্রেকিং ডিফেন্স’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে নৌবাহিনীর সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক ব্রায়ান ফিতজপ্যাট্রিক বলছেন যে, এবারের মহড়ায় সবচাইতে বড় পাওয়া ছিল নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা এই ড্রোনগুলির ব্যাপারে কি কথা বলছেন। তারা জিজ্ঞেস করছেন না যে, এই ড্রোন জাহাজগুলি কিভাবে চালনা করা হচ্ছে; বরং তারা জিজ্ঞেস করছেন যে, এই জাহাজগুলি তাদেরকে কি ধরণের সহায়তা দিতে পারে। এই ড্রোন জাহাজগুলি হঠাত করেই কোন নিয়ন্ত্রণ সমস্যার মাঝে পড়ে যাবে কিনা, সেব্যাপারে তারা চিন্তা করছেন না। অর্থাৎ এই জাহাজগুলির ব্যাপারে কর্মকর্তাদের ধারণার বেশ খানিকটা পরিবর্তন হয়েছে। এছাড়াও নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা একসাথে দুই ধরণের দু’টা ড্রোন জাহাজের নিয়ন্ত্রণ পাবার জন্যে অনুরোধ করেছেন। অর্থাৎ একটা মার্কিন ডেস্ট্রয়ার থেকেই একটা ছোট ড্রোন জাহাজ, যেখন ‘সী হান্টার’ এবং ‘সীহক’এর মাঝে একটা; এবং একটা বড় ড্রোন জাহাজ, যেমন ‘নোম্যাড’ এবং ‘রেঞ্জার’এর মাঝে একটা একসাথে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কিনা। ফিতজপ্যাট্রিক বলছেন যে, এটা এখন করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ছোট জাহাজগুলি নৌবাহিনীর একটা প্রকল্প থেকে আসা; বাকিগুলি অন্য প্রকল্প থেকে আসা। এই প্রকল্পগুলি ভিন্ন নেটওয়ার্কএর মাধ্যমে জাহাজগুলি নিয়ন্ত্রণ করছে। কাজেই একটা ডেস্ট্রয়ার থেকে ভিন্ন রকমের ড্রোন জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

এছাড়াও নৌবাহিনী এবং পেন্টাগনের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরকেও এই ড্রোন জাহাজগুলির কর্মকান্ড দেখাবার ব্যাপারে উৎসুক রয়েছে নৌবাহিনী। নৌবাহিনীর অপারেশন্স প্রধান এডমিরাল মাইকেল গিলডে ছোট আকারের ড্রোন জাহাজগুলির দরকারের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নন। অপদিকে মহড়ার সময় একটা ড্রোন জাহাজ নিয়ে কিছু সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। এরকম একটা জাহাজের নিয়ন্ত্রণ ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোর কমান্ড সেন্টার থেকে একটা ডেস্ট্রয়ারে ট্রান্সফার করার সময় সেটা সফল হয়নি। তাই শেষ পর্যন্ত জাহাজটার নিয়ন্ত্রণ স্যান ডিয়েগোতেই থেকে যায়।

 
২২শে জুন ২০২২। ড্রোন জাহাজ 'রেঞ্জার' 'রিমপ্যাক ২০২২' মহড়ায় অংশ নেয়ার জন্যে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছে। পিছনে বহন করছে বিভিন্ন আকৃতির চারটা কনটেইনার। ‘রিমপ্যাক ২০২২’এর একটা ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নেটওয়ার্ক নিয়ে যেকোন সময় সমস্যা হতেই পারে। আর এই নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা হলো সবচাইতে সংবেদনশীল একটা আলোচনা। তথাপি মার্কিনীরা এই সমস্যাগুলিকে যতটা সম্ভব সমাধান করে ফেলতে চাইবে। কারণ ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার মাঝে বাজেট ঘাটতি এবং রিক্রুটিং সমস্যা নৌবাহিনীকে বেশ ভোগাচ্ছে। এমতাবস্থায় মনুষ্যবিহীন প্রকল্পগুলিই মার্কিনীদের সামনে একমাত্র ভরসা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বড় আকারের মহড়ায় ড্রোন জাহাজের ভূমিকা

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি এসোসিয়েশন’এর ম্যাগাজিন ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স’এ ছোট ড্রোন জাহাজ ‘সী হান্টার’ ও ‘সীহক’এর ‘রিমপ্যাক ২০২২’তে অংশ নেয়ার বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়। জাহাজ দু’টা প্রথমবারের মতো এত লম্বা মিশনে বের হয়েছে। এই জাহাজগুলির ইউনিটের (আনম্যানড সারফেস ভেসেল ডিভিশন ওয়ান) প্রধান কমান্ডার জেরেমায়া ডেলি বলছেন যে, এই মিশনে ‘সীহক’এর সাথে ছিল সাবমেরিন খুঁজে পাবার জন্যে জাহাজ পিছন থেকে টানা (টোউড এরে) সোনার। অপরদিকে ‘সী হান্টার’ বহণ করেছে ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ করার (আইএসআর) জন্যে যন্ত্রপাতি। কিছু সময়ের জন্যে মহড়া এলাকার কাছাকাছি একটা টাইফুন আঘাত হানার কারণে ড্রোন জাহাজগুলিকে খারাপ আবহাওয়াও সহ্য করতে হয়েছে। তবে সেই আবহাওয়া ছোট জাহাজগুলির সহ্যক্ষমতার মাঝেই ছিল।

‘রিমপ্যাক ২০২২’ মহড়ায় অনেকগুলি দেশ অংশ নিচ্ছিলো এবং একেকটা দেশের জাহাজগুলি আলাদা নেটওয়ার্কের অংশ ছিল। কাজেই এহেন মহড়ায় নেটওয়ার্ক এবং যোগাযোগে কিছু সমস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক বলে বলছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। মার্কিন ৩য় নৌবহরের সহকারি চিফ অব স্টাফ ক্যাপ্টেন ড্যান ব্রাউন বলছেন যে, ডাটা শেয়ারিং হোক অথবা ভয়েস কমিউনিকেশন্সই হোক, যোগাযোগ হলো এমন একটা জায়গা, যেখানে সক্ষমতার ঘাটতি সবচাইতে বড়।

মার্কিন নৌবাহিনী ‘ঘোস্ট ফ্লীট ওভারলর্ড’ প্রকল্পের মাধ্যমে নৌবাহিনীর আকার বৃদ্ধি করতে চাইছে; তবে একইসাথে তুলনামূলকভাবে বাজেট নিয়ন্ত্রণের মাঝে রাখতে চাইছে। তাই এই ড্রোন জাহাজগুলির মাঝে বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায় এমন অনেক যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। একটা ডেস্ট্রয়ার তৈরি করতে প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একই খরচে ডজনখানেক ‘ভূতুড়ে’ ড্রোন জাহাজ তৈরি করা সম্ভব। এই ডজনখানেক জাহাজ দিয়ে অনেক বেশি সমুদ্র অনেক বেশি সময় ধরে টহল দেয়া সম্ভব। মার্কিন নৌবাহিনী চাইছে যে, তারা এমন কিছু জাহাজ তৈরি করবে, যেগুলি কোন ধরণের মেইনটেন্যান্স ছাড়াই এক বছর সমুদ্রে অপারেট করতে সক্ষম হবে। ছোট জাহাজ ‘সী হান্টার’ এবং ‘সীহক’এর ক্ষেত্রে তারা এই ব্যাপারটা অনেকটাই পেরেছে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত বড় ‘নোম্যাড’ এবং ‘রেঞ্জার’এর মতো জাহাজগুলির ব্যাপারে তারা এখনও সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। বিশেষ করে এই বড় জাহাজগুলিকে সমুদ্রের মাঝে রিফুয়েলিং করতে এখনও ক্রু বহণ করতে হচ্ছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে চলতে গিয়েও মার্কিন নৌবাহিনী সকল ক্রু জাহাজ থেকে নামিয়ে দিতে পারছে না; যদিও জাহাজগুলি ৯০ শতাংশের বেশি সময় ক্রুদের সহায়তা ছাড়াই চলছে। তবে যে ইস্যুটা এখনও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো নেটওয়ার্ক। ‘রিমপ্যাক ২০২২’এর একটা ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নেটওয়ার্ক নিয়ে যেকোন সময় সমস্যা হতেই পারে। আর এই নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা হলো সবচাইতে সংবেদনশীল একটা আলোচনা। তথাপি মার্কিনীরা এই সমস্যাগুলিকে যতটা সম্ভব সমাধান করে ফেলতে চাইবে। কারণ ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার মাঝে বাজেট ঘাটতি এবং রিক্রুটিং সমস্যা নৌবাহিনীকে বেশ ভোগাচ্ছে। এমতাবস্থায় মনুষ্যবিহীন প্রকল্পগুলিই মার্কিনীদের সামনে একমাত্র ভরসা হিসেবে দেখা দিয়েছে।