১৬ই অক্টোবর ২০২১
বাংলাদেশে বাঙালি হিন্দুদের অনুষ্ঠান দূর্গাপুজার পুজামন্ডপে পবিত্র কূরআন পাওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তীতে সেটাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পুজামন্ডপে হামলা দেশটার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ করে। পরদিন ১৪ই অক্টোবর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি সাংবাদিকদের বলেন যে, তারা বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হামলার খবর পেয়েছেন, যা তাদেরকে দুশ্চিন্তা দিয়েছে। তবে বাগচি বলেন যে, বাংলাদেশ সরকার দ্রুতই ঘটনার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যে ব্যবস্থা নেয়। একইসাথে তিনি এও বলেন যে, তাদের জানা রয়েছে যে, বাংলাদেশে দূর্গাপুজার অনুষ্ঠান সরকারের সহায়তাতেই হয়ে থাকে। ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে কথা বললেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিজেপি নেতা সামিক ভট্টাচার্য্য বাংলাদেশ সরকারকে দোষারোপ করেন। তিনি বলেন যে, বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর এরকম নির্যাতন গত কয়েক মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে; আর সেখানে সরকার চুপ করে দেখছে। একই দিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিন্দুদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও প্রতিনিধিদের সাথে পুজার শুভেচ্ছা জানানোর অনুষ্ঠানে কঠোর ভাষায় এই কর্মকান্ডের পিছনে যারা জড়িত, তাদের শাস্তি দেবার কথা বলেন। একইসাথে তিনি ভারতকে উদ্দেশ্য করেও কিছু বলেন, যা অনেক মিডিয়াই এড়িয়ে যায় অথবা হাইলাইট না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন যে, ভারত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা পেতে সহায়তা দিয়েছে; যার জন্যে তাদের কথা বাংলাদেশ সবসময় কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে। কিন্তু ভারতকে সাবধান থাকতে হবে যে, সেখানেও যাতে এমন কোনকিছু যেন না করা হয়, যা বাংলাদেশের উপরেও প্রভাব ফেলে এবং বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আঘাত আসে। তিনি আরও বলেন যে, ধর্মান্ধরা সবসময়ই ধর্মীয় সংঘাত দেখতে চায়। এরা শুধু মুসলিমদের মাঝ থেকেই আসে না; অন্যান্য ধর্ম থেকেও আসে। শেখ হাসিনা ভারতের কোন ঘটনাকে নির্দিষ্ট করে না বললেও ভারতীয় মিডিয়া এই যোগসূত্র ধরতে ভুলেনি।
ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ বলছে যে, শেখ হাসিনা এমন সময়ে কথাগুলি বললেন, যখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ্য বাংলাদেশে এমন একটা ধারণা জন্মেছে যে, ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতা নেবার পর থেকে ভারতের মুসলিমদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের নতুন নাগরিকত্ব আইন, যার মাধ্যমে আসামে অগুণিত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমকে বেআইনী বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে এবং ‘আর্টিকেল ৩৭০’ পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিশেষ স্ট্যাটাস বাতিল করে সেখানে অন্য অঞ্চলের হিন্দুদের বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা বাংলাদেশে মুসলিম বিরোধী কর্মকান্ড বলে পরিচিতি পেয়েছে।
গত ২৩শে সেপ্টেম্বর আসামের দারাং জেলায় তথাকথিত ‘বেআইনী বসতি স্থাপনকারী’দের বাস্তুচ্যুত করার পুলিশী মিশনে সাধারণ জনগণ বাধা দেয়। ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ বলছে যে, এই সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে দু’জন ব্যক্তির মৃত্যু হয়। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সিপাঝার অঞ্চলের ধলপুর গ্রামে পুলিশের এই অভিযানের সময় করা এক ভিডিওতে দেখা যায় যে, এক ব্যক্তি পুলিশ এবং একজন ফটোগ্রাফারকে তাড়া করছে। এরপর একসময় পুলিশ সদস্যরা সেই ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলে। সে মাটিতে পড়ে যায়, কারণ তার বুকে গুলি লেগেছিল। পুলিশ তখন তার উপর লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। এরপর সেখানকার এক ফটোগ্রাফার বিজয় শংকর বানিয়া পড়ে যাওয়া মানুষটাকে লাথি মারতে থাকে এবং তার শরীরের উপর উঠে লাফাতে থাকে। একসময় সকলে যখন বুঝতে পারে যে, সে মৃত্যুবরণ করেছে, তখন পুলিশ তার মৃতদেহ সরিয়ে নিয়ে আসে। পুলিশ বলে যে, মৃত দুই ব্যক্তির নাম মইনুল হক এবং শেখ ফরিদ। পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ধলপুর গ্রামের অধিকাংশ মানুষ বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম। শেখ ফরিদ ছিল ১২ বছর বয়সী এক শিশু, যে পোস্ট অফিস থেকে সেখান দিয়ে বাড়ি যাচ্ছিল। ৩৫ বছর বয়সী মইনুল হক ছিলেন একজন সাধারণ গ্রামবাসী।
আসামের মূখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব সর্মা বলেন যে, পুলিশ তাদের নিজেদের কাজ করছে। তিনি বলেন যে, তার পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ জনগণের কাছ থেকে রামদা, বল্লম এবং অন্যান্য অস্ত্র দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়। তিনি পরিষ্কার করেন যে, বাস্তুচ্যুত করার এই মিশন চলবে। হিমান্ত সর্মা একসময় কংগ্রেস দলের সদস্য থাকলেও ২০১৫ সালে তিনি দল বদল করে বিজেপিতে যোগ দেন। ‘দ্যা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ বলছে যে, আসামের ধলপুর গ্রামের উত্তেজনা সেদিনই বন্ধ হয়ে যায়নি। পুলিশ ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও তিন ব্যক্তিকে ২৩শে সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ইন্ধন যোগাবার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।
ভারতের পূর্ব সীমানার কাছে আসামে যখন মুসলিমদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে, তখন পশ্চিম সীমান্তে কাশ্মিরে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। ১১ই অক্টোবর ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের পুঞ্চ জেলায় নিরাপত্তা বাহিনী বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলাদের খোঁজা শুরু করলে গোলাগুলিতে পাঁচজন ভারতীয় সেনা নিহত হয়। এর কিছুদিন আগেই কাশ্মিরে সংখ্যালঘু হিন্দু বেসামরিক জনগণের উপর আক্রমণ শুরু হয়। হামলা এবং পাল্টা হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, অনেক সংখ্যালঘু পরিবারই এখন কাশ্মির ছাড়তে শুরু করেছে। তারা বলছে যে, এখন ১৯৯০এর দশকের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে সরকার কাশ্মিরে শান্তি ফেরার যে দাবিগুলি করছিল, তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ২০১৯ সালে বিজেপি সরকার কাশ্মিদের বিশেষ স্ট্যাটাস বাতিল করার পর থেকেই ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল কাশ্মিরে জনসংখ্যা বিষয়ক পরিবর্তন আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে।
ধর্মান্ধতাকে উপজীব্য করে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে জড়িয়ে ভারতের বিজেপি সরকার শুধু ভারত তৈরির স্তম্ভকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ক্ষান্ত হয়নি, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেও ধর্মীয় সহিংসতাকে উস্কে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস নতুন নয়; তবে মোদির বিজেপি সরকার প্রথমবারের মতো ভারতের সেকুলার পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এতটাই স্থায়ী রূপ নিচ্ছে যে, দেশটার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটা এখন আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরের উগ্র হিন্দুত্ববাদী কর্মকান্ডের প্রভাবের সীমানা অতিক্রম রোধ করার চিন্তাটাই দক্ষিণ এশিয়াকে সেই সহযোগিতার পথে হাঁটাবে।
