সেনেপা যুদ্ধ – পেরু বনাম ইকুয়েডর
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরু এবং ইকুয়েডর। পেরুর জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লক্ষ এবং ইকুয়েডরের জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ। আয়তনের দিক থেকেও পেরু অনেক বড় দেশ; ১৩ লক্ষ বর্গকিঃমিঃ বনাম ৩ লক্ষ বর্গকিঃমিঃ। বর্তমানে পেরুর জিডিপি (২৭০ বিলিয়ন ডলার) ইকুয়েডরের চাইতে (১২০ বিলিয়ন ডলার) অনেক বড় হলেও ১৯৮০এর দশকে একেবারে সমান ছিল। এই দুই দেশের মাঝে বহু আগে থেকেই সীমানা নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব ছিল। সেনেপা নামে গভীর অরণ্যের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৭০কিঃমিঃএর মতো অঞ্চলে সীমানা নির্ধারণে কিছুটা ধোঁয়াশা ছিল। ১৯৪০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্ততায় এই দ্বন্দ্ব কিছুটা কাটলেও ১৯৫০এর দশকে ইকুয়েডরের পার্লামেন্টে সেই সীমানাকে স্বীকৃতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই সমস্যা আবারও জেঁকে বসে ১৯৮১ সালে; যখন ইকুয়েডর সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে গোপনে এই দুর্গম অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তবে সামরিক দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী পেরু খুব সহজেই ইকুয়েডরের সেনাদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে সেনেপা অঞ্চলের উপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। মূলতঃ এই অঞ্চলের ইকুয়েডর প্রান্তে স্বর্ণ এবং তামার খনির সন্ধান পাবার কারণে ইকুয়েডর এই অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছিল। ১৯৮১ সালের অপমান ইকুয়েডর ভোলেনি। ১৯৮৮ সাল থেকে দক্ষিণ আমেরিকার অনেকগুলি দেশেই অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। ইকুয়েডর সুযোগ খোঁজে। অর্থনৈতিক চাপে পেরু তার সামরিক বাজেট কমিয়ে ফেলে। তাদের বিমান বাহিনীতে ১২টা ফরাসি নির্মিত অত্যাধুনিক 'মিরাজ-২০০০পি' বিমান ছাড়াও ছিল ১৫টা সুপারসনিক 'মিরাজ-৫পি' ফাইটার (১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনাকে ১০টা দিয়ে দেয়ার পর), ৩৪টা সোভিয়েত 'সুখোই-২২' সুপারসনিক বোমারু বিমান, ১৫টা ব্রিটিশ 'ক্যানবেরা' মধ্যম পাল্লার বোমারু বিমান, ২৪টা মার্কিন নির্মিত 'এ-৩৭বি' হাল্কা এটাক বিমান এবং ১৫টা সোভিয়েত নির্মিত 'এমআই-২৪' এটাক হেলিকপ্টার। কাগজে কলমে এটা ছিল দক্ষিণ আমেরিকার সবচাইতে শক্তিশালী বিমান বাহিনী। কিন্তু সমস্যা হলো, বাজেট না থাকায় স্পেয়ার পার্টসের অভাবে পেরুর বিমান বাহিনীর মাত্র ৩টা 'মিরাজ-২০০০পি', ৭টা 'সুখোই-২২', ৪টা 'ক্যানবেরা', ৮টা 'এ-৩৭বি' বিমান এবং মাত্র ৫টা সোভিয়েত নির্মিত 'এমআই-২৪' এটাক হেলিকপ্টার অপারেশনাল ছিল। তাদের ২০টা বিমান প্রতিরক্ষা রাডারের মাঝে মাত্র ৮টা অপারেশনাল ছিল। এছাড়াও মধ্যম পাল্লার সোভিয়েত নির্মিত ৬টা 'এসএ-৩' আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (১১৬টা ক্ষেপণাস্ত্র), ১২৫টা 'এসএ-৭' ও ১১০টা 'এসএ-১৬' স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মাঝে মাত্র ২০ শতাংশ অপারেশনাল ছিল। এছাড়াও তাদের বহরে ১২৪টা সোভিয়েত নির্মিত ২৩মিঃমিঃ বিমান প্রতিরক্ষা কামানও ছিল; তবে সেগুলিকে হেলিকপ্টারে করে বহণ করে দুর্গম এলাকায় নিয়ে যাবার মতো সক্ষমতা পেরুর ছিল না। এই অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হলেও তা যুদ্ধের এক মাসের মাঝে পুরোপুরিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়নি। একারণে ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে সেনেপা যুদ্ধে পেরুর বিমান বাহিনীর অত্যাধুনিক 'মিরাজ-২০০০' এবং 'মিরাজ-৫' বিমানগুলি একবারের জন্যেও ইকুয়েডরের বিমানগুলিকে বাধা দিতে পারেনি। অপরদিকে ইকুয়েডরের 'মিরাজ-এফ১' এবং ইস্রাইলের তৈরি 'কেফির সি২' সুপারসনিক বিমানগুলি পেরুর কয়েকটা বিমান ভূপাতিত করে ফেলে। বাজে অর্থনৈতিক অবস্থা স্বল্প সময়ের জন্যে পেরুর সাথে ইকুয়েডরের সামরিক সক্ষমতার সমতা তৈরি করেছিল। পেরুর প্রায় ১০টার মতো 'মিরাজ-এফ১' এবং ১০টার মতো 'কেফির সি২' বিমান অপারেশনাল ছিল; যা যুদ্ধের ফলাফল তাদের পক্ষে নিয়ে আসতে সহায়তা করেছিল। তাদের বিমান বাহিনীর সবচাইতে আধুনিক ব্রিটিশ 'জাগুয়ার' বোমারু বিমানকে ব্যবহার করারই দরকার হয়নি। এবারে আবারও যখন যুদ্ধবিরতি হয় এবং সকলে আলোচনার টেবিলে বসে, তখন ইকুয়েডর সেনেপা অঞ্চল থেকে তার সেনা সরিয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য হয় ঠিকই, কিন্তু খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ অঞ্চলটা তাদের নামে নিশ্চিতভাবে লিখিয়ে নেয়। এই অঞ্চলে কানাডার একটা কোম্পানি স্বর্ণের খনি ডেভেলপ করেছে এবং একটা চীনা কোম্পানি তামার খনি ডেভেলপ করেছে। অর্থাৎ ইকুয়েডর যা চেয়েছিল, সেটাই পেয়েছে।
স্বল্প সময়ের সেনেপা যুদ্ধ যে ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দেয় তা হলো, একটা রাষ্ট্র কোন অবস্থাতেই তার প্রতিরক্ষাকে হাল্কাভাবে নিতে পারে না। এটা স্বার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। যুদ্ধ শেষ হবার সাথেসাথেই পেরু রাশিয়া থেকে 'মিগ-২৯' এবং 'সুখোই-২৫' যুদ্ধবিমান কেনে। ২০০১ সালেই পেরু 'মিগ-২৯' যুদ্ধবিমানগুলিকে আপগ্রেড করে মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য 'আর-৭৭' রাডার গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বহণের উপযোগী করে নেয়। তাদের অতি দামী 'মিরাজ-২০০০পি' ফাইটারগুলি এয়ারবোর্ন রাডার ছাড়া খুব বেশি একটা কাজে আসেনি। এই বিমানগুলি একবারের জন্যেও ইকুয়েডরের বিমানগুলিকে বাধা দিতে পারেনি। সেগুলিতে বহণ করার জন্যে মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রও ফরাসিরা পেরুকে দিতে রাজি হয়নি।
সেনেপা যুদ্ধ থেকে শিক্ষা
প্রথমতঃ বিশাল শক্তিশালী সামরিক সরঞ্জামের বহর কোন কাজেই আসবে না যদি সেগুলি সর্বদা ব্যবহারের উপযোগী না থাকে। যুদ্ধের দিনে যুদ্ধক্ষেত্রে কে কতটা সামরিক শক্তি মোতায়েন করতে পারে, সেটার উপরেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। কোন একটা সময় সেই সরঞ্জামগুলি ব্যবহারের উপরে কোন নিয়ন্ত্রণ চলে আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স সেটার উপর নজরদারি করবে এবং প্রয়োজন হলে সেই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গোছাতে পারে। সামরিক সরঞ্জামের রেডিনেস বা ব্যবহারের উপযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এই রেডিনেস একদিকে যেমন নির্ভর করবে সরঞ্জামের কর্মক্ষমতার উপর, তেমনি নির্ভর করবে মানবসম্পদের ট্রেনিংএর উপর। এটা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
দ্বিতীয়তঃ সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি; বিশেষ করে যেদিন প্রয়োজন হবে। যদি সরঞ্জাম অন্য কারুর তৈরি হয়, তাহলে সেখানে নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে। বাইরে থেকে সরঞ্জাম কিনে আনার সাথে আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রশ্ন ছাড়াও ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত। অস্ত্র নির্মাতা রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় না হলে যুদ্ধের দিন সরঞ্জামের রেডিনেসের সমস্যা হতে পারে। স্পেয়ার পার্টস ছাড়া এখানে সফটওয়্যার আপগ্রেডের ব্যাপার রয়েছে। আবার যুদ্ধ শুরু হলে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও চলে আসতে পারে। অস্ত্র নির্মাতা দেশগুলি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র বহণের সক্ষমতা রেখে তাদের বিমানগুলি রপ্তানি করে না। বরং শর্ত সাপেক্ষে কিছু কিছু করে প্রযুক্তির ছাড় দেয়া হয়। পেরু 'মিরাজ-২০০০' বিমান ঠিকই পেয়েছিল; কিন্তু সেগুলি মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে বহণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং 'এক্সোসেট' জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে পারতো না। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার 'সুপার এটেনডার্ড' যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। ব্রিটেনের চাপে ফরাসিরা আর্জেন্টিনার বেশিরভাগ 'সুপার এটেনডার্ড' যুদ্ধবিমানকে 'এক্সোসেট' ক্ষেপণাস্ত্র বহণের উপযোগী করেনি; কালক্ষেপণ করেও আর্জেন্টিনার ক্ষতি করে তারা। পেরুকে ফ্রান্স 'এক্সোসেট' ক্ষেপণাস্ত্র দেয়নি এই সন্দেহে যে, পেরু সেগুলি আর্জেন্টিনাকে দিয়ে দিতে পারে। মিশরেরও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে মার্কিন 'এফ-১৬' (১৯২টা) এবং ফরাসি 'রাফাল' (৫৪টার মাঝে ২৪টা ডেলিভারি পেয়েছে) যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন তাদের মধ্যম পাল্লার 'এআইএম-১২০ এমর্যাম' আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র মিশরকে দেয়নি; তেমনি ফরাসিরাও তাদের 'রাফাল' বিমানের সাথে 'মাইকা' এবং 'মিটিয়র' ক্ষেপণাস্ত্র দিতে রাজি হয়নি। কারণ উভয় দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হলো ইস্রাইলকে রক্ষা করা; তাই তারা মিশরের হাতে এই অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলি দেয়নি। সুতরাং অতি দামী মার্কিন ও ফরাসি যুদ্ধবিমান কেনার পরেও মিশর সেগুলি নিয়ে কিছুই করতে পারেনি। একারণে তারা শেষ পর্যন্ত চীনের দ্বারস্থ হয়েছে 'জে-১০সি' যুদ্ধবিমানের জন্যে। তারা আশা করছে যে, অবশেষে তারা এই বিমানের সাথে মধ্যম পাল্লার 'পিএল-১৫' আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পাবে। মার্কিন 'এফ-১৬'এর সাথে তুরস্কের অভিজ্ঞতাও ভালো নয়। তুরস্কের 'এফ-১৬' বিমানগুলির সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার আপগ্রেড করার জন্যে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে পেছনে ঘুরছে। আর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে নাকে দড়ি দিয়ে তার কাজগুলি করিয়ে নিচ্ছে। মার্কিন 'এফ-৩৫' স্টেলথ বিমানের প্রকল্পে যুক্ত হয়েও তুরস্ক ফেঁসে গেছে। রাশিয়া থেকে 'এস-৪০০' বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার 'অপরাধে' যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং তুরস্কের পাইলটরা 'এফ-৩৫' বিমানে ট্রেনিং সম্পন্ন করার পর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে বিমানগুলি ডেলিভারি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি আগাম দেয়া অর্থও যুক্তরাষ্ট্র ফেরত দেয়নি তুরস্ককে! দেরিতে হলেও তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাকমেইল বুঝতে পেরেছে (যদিও কিছু লোক এখনও যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়তে পারছে না); এবং একারণে তারা নিজেদের যুদ্ধ সরঞ্জাম ডেভেলপ করছে।
তৃতীয়তঃ যেকোন ইন্ডাস্ট্রিয়াল সরঞ্জাম ডেলিভারির ক্ষেত্রে একটা লীডটাইম থাকে। অর্থাৎ প্রস্তুতকারীকে কিছুটা সময় দিতে হয় সরঞ্জাম তৈরি করে ডেলিভারি দেয়ার; বিশেষ করে সরঞ্জাম যদি এমন হয়, যা কিনা আগে থেকে তৈরি করে রেখে দেয়া হয় না। সমরাস্ত্রের ক্ষেত্রে লীডটাইম খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা বেশ দীর্ঘ। হাতে গোণা কয়েকজন এসকল সরঞ্জাম প্রস্তুত করে। একারণে অনেক সময়েই দেখা যায় যে, সমরাস্ত্রের স্পেয়ার পার্টস পেতে সময়ক্ষেপণ হয়। পেরুর ক্ষেত্রেও সম্ভবতঃ সেটা হয়েছিল। কোন কোন সময় অতি প্রয়োজন হলে প্রস্তুতকারী দেশ নিজেদের বাহিনী থেকে সমরাস্ত্র সেকেন্ড-হ্যান্ড ডেলিভারি দিয়ে থাকে। তবে সেটা শুধুমাত্র প্রস্তুতকারী রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বিত হলেই হয়ে থাকে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ভিয়েতনাম ছেড়ে গিয়েছিল, তখন তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিমান বাহিনীকে প্রায় ১১'শ যুদ্ধবিমান দিয়েছিল। অপরদিকে ১৯৬৫ সালে ভারতের সাথে যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে পাকিস্তান কানাডা থেকে 'এফ-৮৬এফ স্যাবর' ফাইটার বিমান যোগাড় করে।
চতুর্থতঃ যে ব্যাপারটা পেরু হয়তো মোকাবিলা করেনি, তবে অন্য অনেক দেশকেই মোকাবিলা করতে হতে পারে। যেমন অস্ত্র ডেলিভারি করা বিমানকে আকাশসীমানা ব্যবহার করতে না দেয়া। অস্ত্র যদি আমদানি করতে হয়, তখন শক্তিশালী কোন দেশ ইচ্ছা করলে বহণকারী বিমানের চলাচলকে বিঘ্নিত করতে পারে। এখানে যুদ্ধে জড়ানো রাষ্ট্রের আকাশসীমানা কোন কোন দেশের সাথে বা তাদের সমুদ্রসীমানা রয়েছে কিনা, সেগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। ১৯৮০এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশ চীন থেকে ২০টা 'এফ-৭এমবি' এবং ১২টা 'এ-৫' বিমান ক্রয় করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ চীন থেকে আরও যুদ্ধবিমান ক্রয় করে। এই বিমানগুলি অনেক ক্ষেত্রেই আকাশপথে উড়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। অন্ততঃ 'কে-৮ডব্লিউ' বিমানগুলি যে আকাশপথে মিয়ানমার হয়ে এসেছিল, তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে এই আকাশপথের বর্ণনা এখানে না দেয়া গেলেও যে ব্যাপারটা বোঝানো সম্ভব তা হলো, যুদ্ধের সময় সমরাস্ত্র আমদানি করতে গেলে কোন একটা পথে আকাশসীমানা খোলা রাখতেই হবে। এটা সার্বভৌমত্ব রক্ষার সাথে সম্পর্কিত।
পঞ্চমতঃ সকল সমরাস্ত্র নিজেরা ডেভেলপ ও তৈরি করতে পারলে উপরের বেশিরভাগ সমস্যাই এড়ানো সম্ভব। সকল সরঞ্জাম না হলেও অন্ততঃ ক্রিটিক্যাল কম্পোনেন্টগুলি যদি নিজেরা তৈরি করা যায়, তাহলে পেরুর মতো পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। তবে এর সাথে একটা এয়ার করিডোর খোলা রাখতেই হবে; যাতে করে বাইরে থেকে এমন কিছু সরঞ্জাম নিয়ে আসা যায়, যা কিনা নিজেদের কাছে নেই।
সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে যদি একটা রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে। সেই রাষ্ট্র নিঃসন্দেহে অন্য রাষ্ট্রের পক্ষে প্রক্সি যুদ্ধে নামতে বাধ্য হবে; ঠিক যেমনটা ইউক্রেনের ক্ষেত্রে হয়েছে। নিজের অর্থ খরচ করে অন্যের কাছ থেকে কেনা অস্ত্রের উপর নির্ভর করে কেউ কখনও বড় হতে পারেনি। সে সর্বদাই আরেকজনের কথায় উঠেছে বসেছে। অন্য কথায় অন্যের দাস হিসেবে কাজ করেছে। অনেকে এই দাস মনোভাবের মাঝেই গর্ব দেখে - সবচাইতে শক্তিশালী রাষ্ট্রের দাসত্ব করাও গর্বের ব্যাপার! তবে বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস শিক্ষা দেয় যে, যুদ্ধের সময়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি নিয়মিতই নিজেদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে জ্বলাঞ্জলি দেয়। তাই সেসকল রাষ্ট্রের উপর সামরিক সরঞ্জামের ব্যাপারে নির্ভরশীলতা তৈরি করাটা বিপদ ডেকে নিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা বলাই যেতে পারে যে, বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা যদি ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্যে প্রস্তুত রাখা না হয়, তাহলে এই রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী রাখার কোন প্রয়োজনই নেই। আর এই সামরিক বাহিনীর জন্যে বাইরে থেকে কেনা কোন অস্ত্রের উপর যদি শর্ত থাকে যে, তা ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না, অথবা যুদ্ধের সময়ে অস্ত্র অবরোধের মাঝে পড়তে হবে, বা স্পেয়ার পার্টস বা সফটওয়্যার আপডেট পাওয়া যাবে না, তাহলে সেই অস্ত্রের ব্যাপারে বাংলাদেশের অনীহা থাকাটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিৎ। অন্ততঃ এটা নিশ্চিত যে, বিশাল অংক খরচ করে পশ্চিমা দেশ থেকে কেনা অত্যাধুনিক সামরিক বিমান যদি মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, বা এন্টি রাডার ক্ষেপণাস্ত্র, বা জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহণে সক্ষম না হয়, তাহলে সেগুলি শো-কেসে সাজিয়ে রাখা চকচকে খেলনা থেকে আলাদা কিছু হবে না।
সূত্রঃ
‘The Time Ecuador and Peru Fought a 34-Day War Over a Patch of Amazonian Jungle’ in Historynet, 16 June 2023 (https://www.historynet.com/cenepa-war-peru-ecuador/)
‘The Cenepa Conflict at 25: Lessons Learned' by Lt Col Oswal Sigüeñas Alvarado in Journal of the Americas, Third Edition 2021
‘Mirage vs. Sukhoi; February 10, 1995 – The Cenepa War’ in Ed Nash’s Military Matters, 20 March 2020 (https://www.youtube.com/watch?v=fKJcm7E59oU)
‘Exocet missile: how the sinking of HMS Sheffield made it famous’ in The Guardian, 15 October 2017
‘Turkey scales down $23 bln F-16 jet deal with US, minister says’ in Reuters, 27 November 2024
‘Egypt to Replace US F-16s With China’s J-10C Fighter Jets: Report’ in The Defense Post, 10 September 2024
‘Egypt has spent big on diversifying its air force, but to what end?’ in Middle East Eye, 09 September 2022
‘Egypt barred from receiving BVR missiles for F-16 and Rafale’ in Bulgarian Military, 12 September 2024 (https://bulgarianmilitary.com/2024/09/12/egypt-barred-from-receiving-bvr-missiles-for-f-16-and-rafale/)
‘Turkey’s readmission to the F-35 program must come with a cost’ by Jonathan Schanzer and Sinan Ciddi in The Hill, 26 March 2025
‘US formally removes Turkey from F-35 programme’ in TRT World (https://www.trtworld.com/turkey/us-formally-removes-turkey-from-f-35-programme-46112)
‘Canadair Sabre’ in Joe Baugher (http://joebaugher.com/usaf_fighters/p86_22.html)