Monday, 18 April 2022

‘জিরো কোভিড’ নীতি নিয়ে চীন কোনদিকে এগুচ্ছে?

১৮ই এপ্রিল ২০২২

‘জিরো কোভিড’ নীতি থেকে সড়ে আসলে শি জিনপিংএর সরকারকে ভুল স্বীকার করতে হবে; যা হবে রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল। তাই তারা এখন পর্যন্ত তাদের সাফল্যগুলিকেই হাইলাইট করে যাচ্ছে। ফলাফলস্বরূপ, সারা দুনিয়ার ‘ম্যানুফ্যাকচারিং ক্যাপিটাল’ চীনের ‘জিরো কোভিড’ নীতির দিকেই সকলে চেয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।


চীনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ শহর সাংহাই এবং এর আশেপাশের এলাকায় করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় লকডাউন চলছে। এপ্রিলের শুরুতে দৈনিক সংক্রমণ ২০ হাজারে পৌঁছে গেলে ৪ঠা এপ্রিল থেকে পুরো সাংহাই শহরের আড়াই কোটি মানুষকেই অনির্দিষ্ট কালের জন্যে লকডাউনের মাঝে ফেলে দেয়া হয়। ‘বিবিসি’ বলছে যে, সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, জনগণ বাসা থেকে অনলাইনে দরকারি জিনিসপত্র অর্ডার করতে পারবে; আর সরকারি স্বেচ্ছাসেবকরা সেগুলি মানুষের বাড়িতে পৌঁছে দেবে। কিন্তু সমস্যা হলো প্রথম সপ্তাহ থেকেই ডেলিভারি সার্ভিসগুলি চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছে না। ডেলিভারির লোকদের মাঝেই অনেকে লকডাউনের বিধিনিষেধে আটকা পড়ে গেছে। ‘উইবো’ সোশাল মিডিয়াতে সরকারি ভিডিও মেসেজের নিচেই অনেকে মন্তব্য করছেন যে, দ্রুত ডেলিভারি সমস্যার সমাধান করা উচিৎ। কেউবা সেখানে লিখেছেন যে, প্রথমবারের মতো তিনি অনাহারে থাকছেন। সাংহাই মিউনিসিপ্যাল কমিশনের ডিরেক্টর লিউ মিন স্বীকার করেছেন যে, খাদ্যের যথেষ্ট মজুত থাকা সত্ত্বেও তারা ডেলিভারি দিতে সক্ষম হচ্ছেন না। সাংহাইএর ভাইস মেয়র চেন টং ৭ই এপ্রিল বলেন যে, তারা জনগণের সমস্যাগুলি সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাংহাই এবং অন্যান্য শহরে ‘জিরো কোভিড’ নীতির প্রয়োগ

পশ্চিমাদের ভুল নীতি স্বীকার না করেই ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বাকি বিশ্বের দেশগুলি ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সাথে জীবনযাপন করার নীতিতে এগুলেও চীনারা এখনও ভাইরাসকে সমূলে উৎপাটন করার নীতিতে এগুচ্ছে। এর আগে উহান এবং শিয়ান শহরে তারা বেশ সফলতার সাথে কোভিড নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও সাংহাইতে তারা হিমসিম খাচ্ছে। প্রথমতঃ সাংহাই তাদের সবচাইতে বড় শহর। আর দ্বিতীয়তঃ এবারের সংক্রমণের ব্যাপ্তি আগের চাইতে অনেক বেশি। সাংহাই হলো চীনের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। কাজেই সাংহাইএর লকডাউনের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাপী সকলেই চিন্তিত। বিশ্বের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং ক্যাপিটাল’ বলে খ্যাত চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনি চীনা সরকারের ‘জিরো কোভিড’ নীতিও ব্যাপক সমালোচনার মাঝে পড়ছে। ইতোমধ্যেই সাংহাইয়ে জনগণের মাঝে অসন্তোষের বিভিন্ন রিপোর্ট চীনের নিয়ন্ত্রিত সোশাল মিডিয়াকে ছাপিয়ে বাইরে চলে আসছে।

‘সিএনএন’ বলছে যে, এর আগে মার্চ মাসে শেনজেন শহরে এক সপ্তাহের লকডাউন প্রয়োগের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ রোধ করেছিল চীনা সরকার। এরপর ১০ই এপ্রিল ১ কোটি ৮০ লক্ষ জনসংখ্যার গুয়াংঝু শহরে ৩৭ জনের মাঝে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর পুরো শহরের সকলকে বাধ্যতামূলক কোভিড পরীক্ষার মাঝে নিয়ে আসা হয়। উত্তর পূর্বাঞ্চলের জিলিন প্রদেশেও ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রমণ বেড়েছে। প্রথম সংক্রমিত হওয়া উহান শহরে ট্রেনে চড়তে গেলে কোভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেট দেখাতে হয়। বেইজিংএর কিছু ‘হাই রিস্ক’ অঞ্চলেও মানুষের চলাচল বেশ নিয়ন্ত্রিত করে ফেলা হয়েছে। হংকংএর ‘সিটি ইউনিভার্সিটি’র এসোসিয়েট প্রফেসর নিকোলাস থমাস বলছেন যে, এটা নিশ্চিত যে, সাংহাইতে লকডাউন প্রয়োগের আগেই সেখান থেকে করোনাভাইরাস অন্য স্থানে সংক্রমিত হয়েছে। ছোট এলাকাগুলি লকডাউনের মাঝে আনা সহজ হলেও সাংহাই শহরের অভিজ্ঞতা বলছে যে, বাকি বড় শহরগুলিতেও প্রয়োজনে একই নীতি প্রয়োগ হতে পারে। তবে সাংহাই লকডাউনের সবচাইতে বড় ফলাফল হবে চীনা কোভিড ব্যবস্থাপনার উপর জনগণের বিশ্বাসকে নতুন করে তৈরি করার চ্যালেঞ্জ। এটা না করা গেলে ভবিষ্যতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সরকারি চেষ্টাগুলির সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। 

সাইংহাইতে স্বেচ্ছাসেবকরা জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যোগাড় করছে। ইতোমধ্যেই সাংহাই শহরে লকডাউনের মাঝে থাকা জনগণের একাংশ পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। খাবারের সংকটে অনেক মানুষ ‘বারটারিং’ বা পণ্য অদলবদলের দিকে ধাবিত হয়েছে। জনরোষের মুখে চীনা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছে। কোভিড ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ছাড়াও সরকারের ভাষ্যকেই অনেকে অবিশ্বাস শুরু করেছে।


খাদ্য সংকট এবং জনরোষ

‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাংহাই এবং এর আশেপাশের অঞ্চলের বাৎসরিক জিডিপি পুরো চীনের প্রায় ৪০ শতাংশ; যা ১৭ই এপ্রিল নাগাদ কোন না কোন প্রকারের লকডাউনের মাঝে রয়েছে। ইতোমধ্যেই সাংহাই শহরে লকডাউনের মাঝে থাকা জনগণের একাংশ পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। খাবারের সংকটে অনেক মানুষ ‘বারটারিং’ বা পণ্য অদলবদলের দিকে ধাবিত হয়েছে। জনরোষের মুখে চীনা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছে। কোভিড ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ছাড়াও সরকারের ভাষ্যকেই অনেকে অবিশ্বাস শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই জনগণের প্রতিবাদের কিছু ভিডিও চীনা সোশাল মিডিয়াতে আপলোড করা হয়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি ভিডিওগুলি নামিয়ে ফেলতে সক্ষম হলেও সেগুলি আবারও পশ্চিমা সোশাল মিডিয়াতে আপলোড করা হয়েছে। তবে পশ্চিমা সোশাল মিডিয়া চীনে এখন নিষিদ্ধ।

‘উইচ্যাট’ সোশাল মিডিয়াতে দু’জন লোকের ফোনালাপের রেকর্ড বেশ ভাইরাল হয়েছে। সাংহাই শহরের ৮২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ ইউ ওয়েনমিং কিছুদিন আগেই করোনা পজিটিভ হয়েছেন। তিনি তার এলাকার চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকে ফোন করে বলেন যে, তার বাড়িতে কোন খাবার নেই এবং তার সকল ঔষধও শেষ হয়ে গিয়েছে; এখন তিনি কি করবেন? তিনি কি তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানে অপেক্ষা করবেন? পার্টি নেতা ঝাং ঝেন বৃদ্ধের বারংবার পীড়াপীড়িতে বিরক্ত হয়ে বলেন যে, তিনি তার উচ্চপদস্থদের এব্যাপারে অবহিত করেছেন; এর বাইরে তিনি আর কিছুই করতে পারবেন না। ঝাং বলছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে সহায়তার জন্যে অনুরোধের সংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে। কিন্তু তার উচ্চপদস্থরা তাকে কোন সহায়তাই দিচ্ছেন না। তিনি যতক্ষণ সম্ভব ততক্ষণ এই কাজ করবেন; সম্ভব না হলে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেবেন। বৃদ্ধ ওয়েনমিংএর মতো সাধারণ মানুষের বিভিন্ন বক্তব্য সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সামনে চলে আসছে। প্রচন্ড চাপের মুখে ৫৫ বছর বয়সী একজন পাবলিক হেলথ কর্মকর্তা চিয়ান ওয়েনশিয়ং নিজের অফিসে আত্মহত্যা করেন। চীনা কর্মকর্তারা ঘটনাটাকে স্বীকার করে নিয়ে বলছেন যে, ভদ্রলোক ১৪ই এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং উপ প্রধানমন্ত্রী সুন চুনলান মানুষের হতাশাজনক চিন্তাভাবনাকে অতিক্রম করার শক্তি অর্জন করার কথা বলেছেন, যাতে করে সরকারের ‘জিরো কোভিড’ নীতিকে সফল করা সম্ভব হয়। সরকার তাদের কোভিড নীতিকেই বিশ্বসেরা বলে আখ্যা দিচ্ছে। ‘শিনহুয়া’ সংবাদ সংস্থা জানাচ্ছে যে, শি জিনপিং তার এক ভাষণে বলেন যে, শীতকালীন অলিম্পিকে অংশ নেয়া কিছু বিদেশী এথলেট মন্তব্য করেছেন যে, যদি কোভিড নিয়ন্ত্রণে কাউকে গোল্ড মেডেল দেয়ার কথা বলা হয়, তাহলে সেটা চীনই পাবে। 

শি জিনপিংকে স্বীকার করতে হবে যে, এর আগে মাত্র দু’টা ভাইরাসকে দুনিয়া থেকে সরানো সম্ভব হয়েছিল। এর একটা হলো ‘স্মলপক্স’ এবং অপরটা হলো ‘রিন্ডারপেস্ট’; এটা নিশ্চিত যে, ‘সার্স কোভ-২’ এরকম তৃতীয় একটা ভাইরাস হবে না। শেষবার “মানুষের প্রকৃতিকে জয় করতে হবে” বলে যে চেষ্টা করা হয়েছিল, তা মারাত্মক ফলাফল বয়ে এনেছিল- এই চিন্তাটা কোনভাবেই মুছে ফেলা যাবে না।


বয়বৃদ্ধদের ভ্যাকসিন দেয়া নিয়ে বিতর্ক

‘ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো’র প্রফেসর জেইন ডুকেট বলছেন যে, সাংহাইএর নাগরিকরা চিন্তাও করতে পারেনি যে, সেখানে খাবার এবং অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ঘাটতি তৈরি হতে পারে। আর এগুলির লজিস্টিকসে সমস্যা হলে জনগণের মাঝ থেকে লকডাউনে ছাড় দেয়ার জন্যে চাপ আসতে থাকবে। আবার ছাড় দিলেও সংক্রমণ থামানোতে সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। কাজেই চীনা সরকার এক্ষেত্রে উভয় সংকটে রয়েছে; এর যেকোন একটাতে সমস্যা হলেই জনরোষ তৈরি হতে পারে। এর মাঝে আবার বেশি বয়স্কদের ভ্যাকসিন পাওয়া নিয়েও রয়েছে জটিলতা। চীনা সরকারের হিসেবে ৫ই এপ্রিল পর্যন্ত ৬৫ বছরের উর্ধ্বে জনগণের মাঝে ৯ কোটি ২০ লক্ষ এখনও ভ্যাকসিনের তিন ডোজ পাননি। আবার ৮০ বছরের উর্ধ্বে ২ কোটি মানুষও পুরোপুরিভাবে ভ্যাকসিন পাননি। জনসংখ্যার এই অংশটারই কোভিডে আক্রান্ত হয়ে বেশি অসুস্থ্য হওয়া বা মৃত্যুর সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত বেশি। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বিশেষ করে চীনা নেতা শি জিনপিং দেশটার কোভিড ব্যবস্থাপনা নিয়ে এবছরের শেষের দিকে ২০তম জাতীয় কংগ্রেসে চাপের মাঝে পড়তে পারেন বলে মনে করছেন ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, স্যান ডিয়েগো’র ভিক্টর শিহ।

পশ্চিমারাও যে তাদের লকডাউনের নীতিতে ভুল করেছে, সেটা নিয়ে কথা না বলেই মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সিনিয়র ফেলো ইয়ানঝং হুয়াং বলছেন যে, চীনের উচিৎ সকলকে একত্রে বাড়িতে আটকে না রেখে শুধুমাত্র যারা বৃদ্ধ, তাদেরকে তিন ডোজের ভ্যাকসিন দেয়া এবং তাদের জন্যে এন্টিভাইরাল ঔষধ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাবার ব্যবস্থা করা। একইসাথে তাদের উচিৎ পশ্চিমা ভ্যাকসিন নিজেদের দেশে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা। 


করোনা মহামারির লকডাউন তুলে নেবার পর থেকে চলেছে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই জট। এরপর ২০২১ সাল থেকেই চলছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্যস্ফীতি; যার সাথে ২০২২ সালে যোগ হয়েছে খাদ্যশস্যের বাজারে ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব। এই সকল কিছুর উপর যুক্ত হয়েছে চীনের লকডাউন; যা কিনা বর্তমান পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার অসারতার প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব এখন এমন এক দিকে ধাবিত হচ্ছে যে, মানুষ যেকোন বিকল্প বিশ্বব্যবস্থাকে ট্রায়াল দিতে রাজি থাকবে।


‘জিরো কোভিড’এর ভবিষ্যৎ এবং এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব

‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর’এর ‘সাউ সুয়ি হোক স্কুল অব পাবলিক হেলথ’এর এসোসিয়েট প্রফেসর এলেক্স কুক ‘সিএনএন’কে বলছেন যে, যেহেতু ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্ট খুব সহজে ছড়ায় এবং এটা খুব একটা প্রাণঘাতী নয়, সেহেতু এটা একবার ছড়িয়ে পড়লে আগের ভ্যারিয়্যান্টগুলির মতো নিয়ন্ত্রণ করাটা কঠিন। এতকাল চীনারা ‘জিরো কোভিড’ নীতিতে ব্যাপক সাফল্য পেলেও সেই একই কৌশল ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের ক্ষেত্রে কতটা সফল হতে পারে, সেটা অনিশ্চিত। ‘নিকেই এশিয়া’র এক লেখায় ‘চায়না মানি নেটওয়ার্ক’এর নিনা শিয়াং মত দিচ্ছেন যে, মহামারি নিয়ন্ত্রণ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর ক্ষমতার প্রতি একটা চ্যলেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। তিনি বলছেন যে, আড়াই বছর হয়ে গেলো সামনা সামনি কূটনীতি এবং জনগণের মাঝে আদানপ্রদান প্রায় বন্ধ। এটা অনেক ক্ষেত্রেই একসময়কার চীনের ‘কালচারাল রেভোলিউশন’এর মতো হয়ে উঠছে; যখন চীনারা সারা দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। এখন পশ্চিমাদের সাথে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝে চীনারা ক্রমান্বয়েই নিজেদেরকে গুটিয়ে নিচ্ছে। শি জিনপিংকে স্বীকার করতে হবে যে, এর আগে মাত্র দু’টা ভাইরাসকে দুনিয়া থেকে সরানো সম্ভব হয়েছিল। এর একটা হলো ‘স্মলপক্স’ এবং অপরটা হলো ‘রিন্ডারপেস্ট’; এটা নিশ্চিত যে, ‘সার্স কোভ-২’ এরকম তৃতীয় একটা ভাইরাস হবে না। শেষবার “মানুষের প্রকৃতিকে জয় করতে হবে” বলে যে চেষ্টা করা হয়েছিল, তা মারাত্মক ফলাফল বয়ে এনেছিল- এই চিন্তাটা কোনভাবেই মুছে ফেলা যাবে না।

পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা অথবা পশ্চিমা চিন্তাধারা অনুসরণ করা এশিয়রা এখন বুঝতে পারছেন যে, লকডাউনের মতো স্ববিধ্বংসী নীতি অনুসরণ করাটা ভুল। যদিও তারা কেউই স্বীকার করতে চাইছেন না যে, পশ্চিমারা ভুল করেছে। এখন সেই ‘ট্রায়াল এন্ড এরর’ ভিতের উপর গড়ে ওঠা পশ্চিমা সমাধানগুলিই তারা চীনকে গ্রহণ করতে বলছেন। স্বভাবতই চীনারাও করোনা নিয়ন্ত্রণে পশ্চিমাদের ব্যর্থতাকে মাথায় রেখেই পশ্চিমা উপদেশ উড়িয়ে দিয়েছে। তবে সাংহাই লকডাউন দেখিয়ে দিচ্ছে যে, চীনারা উহানে যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছিল, সেই একই পদ্ধতি সাংহাইএর মতো একটা শহরে প্রয়োগ করাটা কতটা কঠিন। বিশেষ করে সেটা যখন অতি সংক্রমণ প্রবণ এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্ট। ‘জিরো কোভিড’ নীতি থেকে সড়ে আসলে শি জিনপিংএর সরকারকে ভুল স্বীকার করতে হবে; যা হবে রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল। তাই তারা এখন পর্যন্ত তাদের সাফল্যগুলিকেই হাইলাইট করে যাচ্ছে। ফলাফলস্বরূপ, সারা দুনিয়ার ‘ম্যানুফ্যাকচারিং ক্যাপিটাল’ চীনের ‘জিরো কোভিড’ নীতির দিকেই সকলে চেয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। করোনা মহামারির লকডাউন তুলে নেবার পর থেকে চলেছে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই জট। এরপর ২০২১ সাল থেকেই চলছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্যস্ফীতি; যার সাথে ২০২২ সালে যোগ হয়েছে খাদ্যশস্যের বাজারে ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব। এই সকল কিছুর উপর যুক্ত হয়েছে চীনের লকডাউন; যা কিনা বর্তমান পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার অসারতার প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব এখন এমন এক দিকে ধাবিত হচ্ছে যে, মানুষ যেকোন বিকল্প বিশ্বব্যবস্থাকে ট্রায়াল দিতে রাজি থাকবে।

Sunday, 17 April 2022

শেহবাজ শরীফ কি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ককে মেরামত করতে পারবেন?

১৭ই এপ্রিল ২০২২

পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ এবং তার ভাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। নওয়াজ শরীফের পরিবারের প্রাক্তন ইতিহাস শেহবাজ শরীফের ব্যাপারে পাকিস্তানীদেরকে খুব বেশি আপ্লুত করার কথা নয়। বরং পাকিস্তানের জনগণের মাঝে মার্কিন বিরোধী চিন্তার উপর ভিত্তি করেই যেহেতু ইমরান ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলেন, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি পাকিস্তানকে কয়েক দশক ধরে নিয়ন্ত্রণ করলেও একুশ শতকে চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারতের ভূমিকা এবং পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার ক্রান্তিলগ্নে মস্কো ও বেইজিংএর ব্যাপারে পাকিস্তানের ‘নিরপেক্ষ’ নীতি মার্কিনীদের দুশ্চিন্তায় রাখছে।

 
পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ক্ষমতা হারাবার আগে এবং পরে বারংবার বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে ষড়যন্ত্র করেছে। তিনি বলেছেন যে, তিনি পাকিস্তানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতেই রাশিয়া সফর করার কারণে ওয়াশিংটন তার উপরে ক্ষুব্ধ হয়েছিল। ইমরানের পক্ষে এই ষড়যন্ত্রের পিছনে যেমন কোন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেখানো কঠিন, তেমনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ মনোনীত নতুন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের পক্ষেও দুই দেশের মাঝে সম্পর্ককে পুরোপুরিভাবে মেরামত করাটা কঠিন। তবে ইমরানের প্রস্থানের পর পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কিছুটা ভালো হবার সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে।

‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘টাফট ইউনিভার্সিটির’র প্রফেসর আয়েশা জালাল বলছেন যে, পাকিস্তানের শাসকরা এর আগে বহুবার নিজের ঘর সামাল দিতে না পেরে বিদেশী ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন। তারা সমস্যার সমাধান না করতে পেরে সেটার দায় বিদেশের উপরে দিয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকেরা এধরণের কথার উপর নির্ভর করেছেন কারণ দেশটার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুদিন যাবতই টানাপোড়েনের মাঝ দিয়ে চলেছে। ফলশ্রুতিতে নতুন প্রধানমন্ত্রী এবং সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের প্রধান কাজ হবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে মেরামত করা। ১৩ই এপ্রিল মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিংকেন এক বার্তায় শেহবাজ শরীফকে অভিন্দন জানিয়ে বলেন যে, দুই দেশের মাঝে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা অব্যহত থাকবে বলে তিনি আশা করেন। শরীফও একই দিনে এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, তার দেশ অন্যান্য দেশের সাথে পারস্পরিক সন্মান ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্কোন্নন করতে থাকবে। তবে প্রশ্ন হলো, বাইডেন প্রশাসনের কাছে পাকিস্তান এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক লেখায় নতুন দিল্লীর ‘জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ইউনিভার্সিটি’র নাজির আহমেদ মীর বলছেন যে, গত কয়েক দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তানের মাঝে সম্পর্কটা আদান প্রদানের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের কাছ থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে আফগানিস্তানের ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়েছে; আর এর বিনিময়ে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বারংবার অভিযোগ করেছেন যে, তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ পাকিস্তান তাদের সাথে যথেষ্ট সহযোগিতা করছে না এবং তালিবানের মতো অস্ত্রধারী গোষ্ঠীকে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়েছে। অপরদিকে ইসলামাবাদ বলেছে যে, পাকিস্তান মার্কিন ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে এবং মার্কিন নেতৃত্বে আফগানিস্তানের যুদ্ধে জড়িয়ে তাদের বিশাল ক্ষতির সন্মুখীন হতে হয়েছে। আরেক মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন’এর ফেলো মাদিহা আফজাল মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করে পাকিস্তানের জন্যে নিরাপত্তা সাহায্য বন্ধ করে দিলে দুই দেশের মাঝে সম্পর্ক আরও নিচে নেমে যায়। তবে ২০১৯এর মাঝামাঝি ইমরান খানের ওয়াশিংটন সফরের পর ওয়াশিংটনের সাথে ইসলামাবাদের সম্পর্ক ভালোর দিকে ফেরত আসে। কারণ সেই সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নতুন লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়া। সেটা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তালিবানদের সাথে মার্কিনীরা আলোচনায় বসছিলো; আর পাকিস্তান সেখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা রাখছিলো।

২০২১এর জুনে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর সাথে এক সাক্ষাতে ইমরান খান বলেন যে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কটা একপেশে ছিল। কারণ যুক্তরাষ্ট্র মনে করছিল যে, তারা পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে; কাজেই পাকিস্তানের উচিৎ যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী চলা। ইমরান বলেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা সমতার সম্পর্ক চাইছিলেন, যার মাঝে যথেষ্ট অর্থনৈতিক সুযোগও থাকবে পাকিস্তানের জন্যে। মাদিহা আফজাল বলছেন যে, জো বাইডেনের প্রশাসন ক্ষমতা নেবার পর থেকে ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব যথেষ্টই কমে গেছে। কারণ গত অগাস্টেই যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে গেছে। চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে মার্কিনীদের কাছে এখন ভারতের গুরুত্বই বেশি। তবে ঐতিহাসিকভাবেই পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের কেন্দ্রে ছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। ইমরান খান ক্ষমতা নেবার পর থেকে সেনাবাহিনীর নীতির সাথে খাপ খাইয়েই চলেছেন। উভয়েই পাকিস্তানের ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি’র উপর গুরুত্ব দিয়েছে; যার মাধ্যমে পাকিস্তান সকল দেশের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলবে। কিন্তু গত কয়েক মাসের মাঝে বেইজিং এবং মস্কোর সাথে ইমরান সরকারের সখ্যতা বৃদ্ধি পেলেও সেই হিসেবে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন হয়নি। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সর্বদাই ওয়াশিংটনের সাথে ভালো সম্পর্ক চেয়েছে। ওয়াশিংটনকে বাদ দিয়ে বেইজিংএর সাথে সম্পর্কোন্নয়ন সেনাবাহিনী চায়নি।

আয়েশা জালাল বলছেন যে, ওয়াশিংটন এবং বেইজিংএর সাথে সম্পর্ক ব্যালান্স করে চলার নীতিটা ইমরান খানের নীতি নয়; এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নীতি। কিন্তু পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির এই ব্যালান্স সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ‘সিএনবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ওয়াশিংটনের ‘অলব্রাইট স্টোনব্রিজ গ্রুপ’এর ডিরেক্টর জেমস শোয়েমলেইন বলছেন যে, ইমরান খান পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ওয়াশিংটন কেন্দ্রিক নীতিকে পরিবর্তন করে চীনকে আলিঙ্গন করেছেন; যা পাকিস্তানের জন্যে খুবই বিপজ্জনক। কারণ পাকিস্তান চীনে রপ্তানি করতে চাইলেও বাস্তবে পাকিস্তানের রপ্তানি যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে।

‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর’এর ‘ইন্সটিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ’এর ডিরেক্টর ইকবাল সিং সেভেয়া বলছেন যে, পাকিস্তান এই মুহুর্তে দেউলিয়াত্ব ঘোচাতে ‘আইএমএফ’এর ২৩তম সহায়তা প্যাকেজের মাঝে রয়েছে। দেশের মুদ্রাস্ফীতি এখন ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। শেহবাজ শরীফ খুব সম্ভবতঃ ‘আইএমএফ’এর কাছ থেকে আরও ঋণের দিকে ধাবিত হবেন। আর এর ফলশ্রুতিতে ‘আইএমএফ’এর কঠিন শর্ত পূরণে আর্থিক খাতের পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে পাকিস্তানকে; একইসাথে কর বৃদ্ধি করা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার দিকে যেতে হবে সরকারকে। আর শেহবাজ শরীফের সরকারকে হয়তো এই কঠিন কাজটা করতে হবে ভর্তুকি বজায় রেখেই।

নওয়াজ শরীফের পরিবারের প্রাক্তন ইতিহাস শেহবাজ শরীফের ব্যাপারে পাকিস্তানীদেরকে খুব বেশি আপ্লুত করার কথা নয়। বরং পাকিস্তানের জনগণের মাঝে মার্কিন বিরোধী চিন্তার উপর ভিত্তি করেই যেহেতু ইমরান ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলেন, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি পাকিস্তানকে কয়েক দশক ধরে নিয়ন্ত্রণ করলেও একুশ শতকে চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারতের ভূমিকা এবং পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার ক্রান্তিলগ্নে মস্কো ও বেইজিংএর ব্যাপারে পাকিস্তানের ‘নিরপেক্ষ’ নীতি মার্কিনীদের দুশ্চিন্তায় রাখছে।

Friday, 15 April 2022

‘গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার’ যুক্তরাষ্ট্র কি ইউক্রেন যুদ্ধের চাপ অনুভব করছে?

১৬ই এপ্রিল ২০২২

'জ্যাভেলিন' ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে মার্কিন সেনারা। ‘গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার’ বলে খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ইউক্রেনের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ একদিকে যেমন প্রতিদ্বন্দ্বী ‘গ্রেট পাওয়ার’ রাশিয়াকে আটকে রাখার একটা মোক্ষম সুযোগ, তেমনি নিজেদের অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতার চ্যালেঞ্জের কারণে রাশিয়াকে ইউক্রেনে আটকে রাখাটাই তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র অপশন।

 
‘রয়টার্স’ বলছে যে, ইউক্রেনে পাঠানো যুদ্ধাস্ত্রগুলিকে প্রতিস্থাপন করতে এবং ইউক্রেনের মাটিতে দীর্ঘ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি নিতেই মার্কিন কর্মকর্তারা গত ১৩ই এপ্রিল প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলির সাথে বৈঠকে বসেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ‘জ্যাভেলিন’ ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘স্টিংগার’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের বড় সংখ্যায় সরবরাহ এবং সেগুলির ব্যাপক সফলতার পর এই অস্ত্রগুলির স্টক পূর্বের স্থানে নিয়ে আসার জন্যে ওয়াশিংটনে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। মার্কিন কোম্পানি ‘রেথিয়ন’ এবং ‘লকহীড মার্টিন’ একত্রে ‘জ্যাভেলিন’ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে; আর ‘স্টিংগার’ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ‘রেথিয়ন’। মার্কিন কর্মকর্তারা ঘোষণা দিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করেছে; যার মাঝে রয়েছে ৭ হাজার ‘জ্যাভেলিন’ এবং ২ হাজার ‘স্টিংগার’।

‘জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর হ্যাল ব্র্যান্ডস ‘ব্লুমবার্গ’এর এক লেখায় বলছেন যে, যখন পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়া নতুন করে আক্রমণে যাচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সক্ষমতা হারাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে সমরাস্ত্র এবং অর্থ সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্র ‘গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার’ হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ লম্বা হবার সাথে সাথে তা যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতাগুলিকে সামনে নিয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতে ‘গ্রেট পাওয়ার’দের মাঝে যেকোন সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্যে যুক্তরাষ্ট্রকে অপ্রস্তুত করে ফেলছে। মার্কিনীরা মনে করেছিল যে, রুশরা খুব দ্রুতই পুরো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে; তখন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনিয়ানদেরকে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে সহায়তা দেবে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনিয়ানদের ব্যাপক সফলতা একেবারে হঠাত করেই বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের চাহিদা তৈরি করে ফেলেছে। এখন পশ্চিমা দেশগুলির সামনে দু’টা অপশন খোলা রয়েছে। প্রথমতঃ ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ বাড়ানো; এবং দ্বিতীয়তঃ নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্যে সীমিত অস্ত্রের স্টকগুলিকে রক্ষা করা। হ্যাল ব্র্যান্ডস বলছেন যে, পূর্ব ইউক্রেনের খোলা সমতলভূমিতে ইউক্রেনিয়ানদের চোরাগুপ্তা হামলা করার সুযোগ কম। এমতাবস্থায় ইউক্রেনের যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের প্রয়োজন হবে, তা যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত নতুন করে তৈরি করে দিতে সক্ষম হবে না।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ বা ‘সিএসআইএস’এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক ক্যানসিয়ান এক লেখায় বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এমন অবস্থানে পৌঁছেছে, যখন সম্ভাব্য কোন যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের স্টক ঠিক রাখতে গিয়ে ইউক্রেনকে কম সরবরাহ করতে বাধ্য হবে। তিনি আশংকা করছেন যে, ইউক্রেনিয়ানরা যুদ্ধক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা নিয়ে আসতে পারার আগেই তাদের ‘জ্যাভেলিন’এর সরবরাহ থেমে যেতে পারে। ক্যানসিয়ানের হিসেবে ১৯৯৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মার্কিন সেনাবাহিনী সর্বমোট ৩৭ হাজার ৭’শ ৩৯টা ‘জ্যাভেলিন’ ডেলিভারি পেয়েছে। প্রতি বছরে ট্রেনিংএর জন্যে যত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, সেটার সংখ্যা বাদ দিলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘জ্যাভেলিন’এর স্টক দাঁড়াবে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজারের মতো। এর ৭ হাজার যদি ইউক্রেনকে দেয়া হয়, তা মার্কিনীদের মোট ‘জ্যাভেলিন’এর এক তৃতীয়াংশ হবে। এখনও দুই তৃতীয়াংশ স্টক যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকলেও মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব উত্তর কোরিয়া, ইরান অথবা রাশিয়ার সাথে কোন সম্ভাব্য যুদ্ধে ‘জ্যাভেলিন’এর যথেষ্ট সরবরাহ পাবে কিনা, সেব্যাপারে নিশ্চিত থাকবে না। এর ফলশ্রুতিতে এই দেশগুলির সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধে তারা তাদের পরিকল্পনা পাল্টাতে বাধ্য হবে।

‘জ্যাভেলিন’ একবার অর্ডার করলে প্রথম ডেলিভারে পেতে ৩২ মাস সময় লাগতে পারে। এতদিন বছরে গড়ে ১ হাজার করে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ পেলেও সর্বোচ্চ সাড়ে ৬ হাজারও পাওয়া সম্ভব। তবে সেই হারে সরবরাহ পেতে হলে উৎপাদন কমপক্ষে এক বছর ধরে চলতে হবে। এর অর্থ হলো ইউক্রেনকে সরবরাহ করা ‘জ্যাভেলিন’গুলিকে প্রতিস্থাপিত করতে গেলে কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ বছর লেগে যাবে। অপরদিকে ‘স্টিংগার’ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহের অবস্থা আরও শোচনীয়। ২০০৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মোট ১১ হাজার ৬’শ ‘স্টিংগার’ ডেলিভারি পেয়েছে। ট্রেনিংএর জন্যে ব্যবহার করার পর হয়তো ৮ হাজারের মত অবশিষ্ট থাকতে পারে। ইউক্রেনকে ২ হাজার দেয়ার অর্থ হলো মোট স্টকের এক চতুর্থাংশ। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে প্রতিস্থাপন করতে গেলে কমপক্ষে ৫ বছর লেগে যাবে। আরেকটা সমস্যা হলো, পেন্টাগন ‘স্টিংগার’এর প্রতিস্থাপক খুঁজছে; যা এখনও প্রস্তুত নয়। এমতাবস্থায় নতুন করে ‘পুরোনো’ প্রযুক্তিতে তারা বিনিয়োগ করতে চাইবে না।

ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, রুশদের অপারেশনাল ইউনিটগুলিতে মোট ২ হাজার ৮ ট্যাংক এবং ১৩ হাজার অন্যান্য সাঁজোয়া যান রয়েছে। আর স্টক করে রাখা আছে আরও প্রায় ১০ হাজার ট্যাংক এবং সাড়ে ৮ হাজার অন্যান্য সাঁজোয়া যান। এর বিপরীতে ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স থেকে জানা যাচ্ছে যে, রুশরা যুদ্ধে প্রায় ১৩’শ ট্যাংক এবং সাঁজোয়া যান হারিয়েছে। এর অর্থ হলো, রুশ খুব দ্রুতই ট্যাংক বা সাঁজোয়া যানের স্বল্পতায় পড়ে যাচ্ছে না। তবে রুশরা নিঃসন্দেহে দক্ষ যোদ্ধার স্বল্পতায় রয়েছে। মার্ক ক্যানসিয়ান বলছেন যে, ক্ষতি পোষাতে রুশরা দুর্বল ট্রেনিংএর সেনাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসবে; যাদের মনোবল থাকবে কম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রুশদের জনবল যোগাড়ের চ্যালেঞ্জ আর ইউক্রেনিয়ানদের ‘জ্যাভেলিন’এর সরবরাহের চ্যালেঞ্জের মাঝে কোনটা জিতবে?

‘পলিটিকো’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের একটা চ্যালেঞ্জ হলো, এগুলির অনেক ছোট ছোট যন্ত্রাংশ রয়েছে, যেগুলি কয়েক’শ কোম্পানি সরবরাহ করে থাকে। এরা আবার সেগুলি উৎপাদন করতে গিয়ে ‘রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল’ এবং বিভিন্ন ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রাংশ বিভিন্ন উৎস থেকে যোগাড় করে থাকে। ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট’এর সিনিয়র ফেলো উইলিয়াম গ্রীনওয়াল্ট বলছেন যে, এই কোম্পানিগুলি স্টক মার্কেটে নিজের অবস্থান দুর্বল হবার ভয়ে সুনির্দিষ্ট অর্ডার ব্যাতীত কোন বিনিয়োগ করবে না। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপিয় বন্ধুরা নিশ্চয়তা চাইছে যে, ইউক্রেনকে তারা যেসব বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দিচ্ছে, সেগুলি যুক্তরাষ্ট্র প্রতিস্থাপন করে দেবে। এমতাবস্থায় যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, ‘গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার’ বলে খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ইউক্রেনের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ একদিকে যেমন প্রতিদ্বন্দ্বী ‘গ্রেট পাওয়ার’ রাশিয়াকে আটকে রাখার একটা মোক্ষম সুযোগ, তেমনি নিজেদের অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতার চ্যালেঞ্জের কারণে রাশিয়াকে ইউক্রেনে আটকে রাখাটাই তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র অপশন।

Thursday, 7 April 2022

ইউক্রেন যুদ্ধ… যুক্তরাষ্ট্র কি মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে?

০৭ই এপ্রিল ২০২২

যুক্তরাষ্ট্র বারংবার সতর্ক করা সত্ত্বেও মার্চ মাসে সকলকে অবাক করে দিয়ে আরব আমিরাত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে নিজেদের দেশে ডেকে নিয়ে আসে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশগুলি এখন নিজেদের স্বার্থ বাস্তবায়নে এগুচ্ছে। তারা শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। ইউক্রেন যুদ্ধ বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে আদর্শিক সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নগামীতাকে আরও নিচের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 
৫ই এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্যের জন্যে দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন উপ সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব ডানা স্ট্রাউল মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘উইলসন সেন্টার’এ এক ভাষণে বলেন যে, রাশিয়ার ইউক্রেনে আগ্রাসন হলো সাদা-কালোর ব্যাপার। এখানে কারুরই চুপ থেকে ধূসর কোন অবস্থানে থাকা উচিৎ নয়। তিনি বলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উচিৎ রাশিয়ার কর্মকান্ডের নিন্দা জানানো এবং ক্রেমলিনের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকর করতে সহায়তা করা। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ব্যাপারে স্ট্রাউল বলেন যে, এখানে যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট সামরিক শক্তি রয়েছে; এবং এটা যুক্তরাষ্ট্র ধরে রাখবে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, এই অঞ্চলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতা ছাড়াও আইসিসকে নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র এই শক্তি রাখবে। স্ট্রাউল যত দৃঢ়তার সাথেই কথাগুলি বলে থাকেন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ২০২১এর অগাস্টে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনীর পলায়নের পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি নিরাপত্তাহীনতার মাঝে পড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, তাদের এখন মূল ভূরাজনৈতিক ফোকাস হলো চীন। তাই তারা বিশ্বের অন্যান্য স্থানে তাদের উপস্থিতিকে পূর্বের তুলনায় কমিয়ে ফেলছে।

‘মিডলইস্ট আই’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার উপস্থিতি কমিয়ে ফেলার সাথেসাথে অত্র অঞ্চলের অনেক দেশই সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত জাতিসংঘে রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকে। তুরস্কের মতো আমিরাতও রাশিয়াকে একঘরে করে ফেলা থেকে বিরত রয়েছে। শুধু তাই নয়, জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক মূল্যস্ফীতির সময়ে মার্কিন জনগণের জন্যে সুলভে তেল যোগাড় করতে মার্কিনীরা যখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিকে তেলের বাজারে সরবরাহ বাড়াতে বলেছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন বন্ধু দেশ সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি করতে চাইছে না। এতে বহুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অত্র অঞ্চলের দেশগুলির তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তার যে সমঝোতা ছিল, তা প্রশ্নের মাঝে পড়েছে। তেল রপ্তানিকারক রাষ্ট্রের সংগঠন ‘ওপেক’এর সদস্য দেশগুলি রাশিয়াকে সাথে করে গঠিত ‘ওপেক প্লাস’এর ২০২১ সালের সমঝোতা মোতাবেক তেলের উৎপাদন দৈনিক ৪ লক্ষ ব্যারেলের মাঝে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে। এছাড়াও কিছুদিন আগেই ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সৌদিরা চীনাদের সাথে তেলের বাণিজ্য চালিয়ে নিতে ডলারের স্থলে ইউয়ানকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পার্থক্য এখন অনেকগুলি ক্ষেত্রে। ‘ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল’ বলছে যে, গত জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব এবং আরব আমিরাতের উপর ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর হুথিদের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট শক্ত অবস্থান না নেয়াকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি ভালোভাবে দেখেনি। এর আগে ২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেলখনির উপর মারাত্মক হামলার পরেও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কোন প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপে যেতে চায়নি। আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই সৌদি আরবের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলে আসছেন; যা কিনা রিয়াদের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে চাপের মাঝে ফেলেছে। এছাড়াও বাইডেন প্রশাসন ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তির ব্যাপারেও অগ্রসর হয়েছে; যা কিনা সৌদি আরব এবং আমিরাতসহ অন্যান্য আরব দেশগুলিকে নিরাপত্তাহীনতার মাঝে ফেলেছে।

সিরিয়ার ব্যাপারেও আরব দেশগুলির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মতানৈক্য চলছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বারংবার সতর্ক করা সত্ত্বেও মার্চ মাসে সকলকে অবাক করে দিয়ে আরব আমিরাত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে নিজেদের দেশে ডেকে নিয়ে আসে। ২০১১ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে কোন আরব দেশে প্রেসিডেন্ট আসাদের এটা প্রথম সফর। যুক্তরাষ্ট্র এই মুহুর্তে ইউক্রেনে রুশ মানবাধিকার লংঘনকে তুলে ধরতে সিরিয়াতে আসাদ সরকারের স্বপক্ষে একইরকম ব্যাপক মানবাধিকার লংঘনের ব্যাপারে রাশিয়ার কর্মকান্ডকে হাইলাইট করছে। বাশার আল আসাদের সরকার রাশিয়াকে ইউক্রেনের যুদ্ধে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। মার্কিন উপ সহাকারী সচিব ডানা স্ট্রাউল বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন আসাদ সরকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় না; তেমনি অন্য কোন দেশ আসাদ সরকারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে ফেলুক, সেটাও চায় না।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশগুলি এখন নিজেদের স্বার্থ বাস্তবায়নে এগুচ্ছে। তারা শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। ‘রাইস ইউনিভার্সিটি’র ‘বেকার ইন্সটিটিউট ফর পাবলিক পলিসি’র ফেলো ক্রিশ্চিয়ান কোটস আলরিকসেন বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং আফগানিস্তান থেকে পলায়নের ঘটনায় সৌদি এবং আমিরাতিরা সম্ভবতঃ যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা বুঝতে পারছে। তারা এমতাবস্থায় মনে করছে যে, বিভিন্ন ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নিলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও ছাড় পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক কনসাল্ট্যান্সি কোম্পানি ‘গালফ স্টেট এনালিটিক্স’এর প্রধান নির্বাহী জিওর্জিও কাফিয়েরো বলছেন যে, আমিরাতের কর্মকান্ডগুলি দেখিয়ে দেয় যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে নিজেদের নীতিনির্ধারণ করার চেষ্টা করছে। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে চলে যাচ্ছে না; বিশেষ করে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের পর। তারা বরং মনে করছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দনীয় পদক্ষেপ নিলেও তাদের ক্ষতির সম্ভাবনা কম। আর বাইডেন প্রশাসনও এমন পরিস্থিতিতে সৌদি এবং আমিরাতিদের সাথে সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাইছে। কারণ বেশি চাপ প্রয়োগ করলে এই দেশগুলি চীন এবং রাশিয়ার সাথে সম্পর্ককে আরও গভীর করে ফেলতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধ বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে আদর্শিক সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নগামীতাকে আরও নিচের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের অবস্থানকে দুর্বল করেছে। আর আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পলায়নের ব্যাপারটা মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য অঞ্চলের মার্কিন বন্ধুদের উপর কতটা প্রভাব ফেলেছে, সেটা এখন ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক বন্ধুরাও এখন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত। আর এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্রের এই দেশগুলির উপর চাপ সৃষ্টি করার মতো অবস্থাও নেই। এটা পরিষ্কার যে, মধ্যপ্রাচ্য আগের মতো শক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেই। ধ্বসে পড়া একটা বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্জাগরিত করার মত কোন সমাধান এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার অবশিষ্টাংশ মার্কিন ডলারের অবস্থানও যখন প্রশ্নবিদ্ধ হতে চলেছে, তখন একদিকে ব্যবস্থাগত ত্রুটি যেমন চোখে পড়ছে, তেমনি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার চিন্তাগুলিও ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।

Tuesday, 5 April 2022

অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব উঠানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় চীন

০৫ই এপ্রিল ২০২২

সেপ্টেম্বর ২০১৯। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়িএর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার স্বারক আদানপ্রদান করছেন সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমায়া মানেলে। অস্ট্রেলিয়া যেমন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগকে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখেছে, তেমনি চীনও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ছোট দ্বীপ দেশগুলিকে জাতিসংঘে তাইওয়ানের পক্ষে ভোট দিতে দেখে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সেই অঞ্চলে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।

 
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ দেশ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সাথে চীনের নিরাপত্তা আলোচনা চলছে কিনা, সেব্যাপারে গত ২৯শে মার্চ সেদেশের প্রধানমন্ত্রী মানাসেহ সোগাভারে পার্লামেন্টে বলেন যে, রাষ্ট্র হিসেবে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ কার সাথে আলোচনা করবে, সেব্যাপারে অন্য দেশের মন্তব্য করাটা খুবই অপমানজনক। এর অর্থ হলো এই দেশের নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষম। এর আগে ২৪শে মার্চ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার ডাটন সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সাথে চীনের সম্ভাব্য নিরাপত্তা চুক্তির ব্যাপারে বলেন যে, অস্ট্রেলিয়া থেকে ২ হাজার কিঃমিঃ দূরে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে কোন সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হলে অস্ট্রেলিয়া খুবই চিন্তিত হবে। তিনি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশগুলিকে চীনের কর্মকান্ড সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকার জন্যে আহ্বান জানান। তিনি বলেন যে, অস্ট্রেলিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশগুলি যে আদর্শকে আলিঙ্গন করে, চীনাদের কর্মকান্ড সেই আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, সম্ভাব্য এই চুক্তির একটা খসড়া কে বা কারা সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে এই মন্তব্য এসেছে। সম্ভাব্য সেই চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চীনা পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনী সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে আইন শৃংখলা রক্ষা, দুর্যোগের সময়ে ত্রাণসহায়তা দেয়া, এবং সেদেশে চীনা নাগরিক ও চীনা প্রকল্প রক্ষায় মোতায়েন করা যাবে। আর উভয় দেশ তাদের পার্লামেন্টের কাছে আরও বিস্তৃত আকারে নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্যে প্রস্তাব পাঠাবে। সেখানে বলা হচ্ছে যে, সেই প্রস্তাবে চীনা যুদ্ধজাহাজ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের নৌঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে।

সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তা সচিব ক্যারেন গালোকালে ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, চীনের সাথে তার দেশের আইন শৃংখলা রক্ষার ব্যাপারে একটা চুক্তি হয়েছে। এবং আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রে চুক্তির ব্যাপারে আলোচনা চলছে। আর এধরণের চুক্তি অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সাথে যেমন রয়েছে তেমনই হবে। পদ্ধতিগতভাবেই সেই চুক্তিকে মন্ত্রীসভার অনুমতি নিতে হবে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৮ সাল থেকে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে শান্তি শৃংখলা রক্ষার জন্যে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের অনুমতি দিয়ে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এর আগে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে পুঁজি করে ২০০৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সেখানে অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বাহিনী মোতায়েন ছিল। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পুলিশ মন্ত্রী এন্থনি ভেকে বলেন যে, ১৮ই মার্চ চীনের পাবলিক সিকিউরিটি মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ওয়াং শিয়াওহংএর সাথে তিনি এক ভার্চুয়াল বৈঠকের পর একটা সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষর করেন। এই সমঝোতা বিশ্বকে দেখিয়ে দেয় যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ তাদের নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের জন্যে যেকোন দেশের সাথেই সহযোগিতা করতে উচ্ছুক।

 
নভেম্বর ২০২১। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে অস্ট্রেলিয়ার সেনা। ‘স্বাধীন দেশ’ হিসেবে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ যখন তাইওয়ানকে আলিঙ্গন করেছে, তখন অস্ট্রেলিয়া দ্বীপ দেশটাকে ‘স্বাধীন’ হিসেবেই আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু যখন তারা অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থের বাইরে গিয়ে চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তখনই অস্ট্রেলিয়া দেশটার ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এবং দেশটার ‘সার্বভৌমত্ব’কে তুচ্ছজ্ঞান করছে।


সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ কি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ?

প্রধানমন্ত্রী সোগাভারে পার্লামেন্টে কথা বলার সময় চাপের মুখে তিনি বলেন যে, চীনের সাথে চুক্তি এখন স্বাক্ষর করার জন্যে প্রস্তুত। তিনি অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়ার প্রতিবেদনগুলি অস্বীকার করেন; যেখানে বলা হয় যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ চাপের মুখে চীনের কাছে নতি স্বীকার করেছে। অস্ট্রেলিয়ার ‘নিউজ কর্পোরেশন’এর এক কলামে এও লেখা হয় যে, দরকার হলে এই চুক্তি থামাতে অস্ট্রেলিয়ার উচিৎ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে সামরিক অগ্রাসন চালিয়ে সেখানকার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। সোগাভারে বলেন যে, অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়াতে এহেন কথাগুলি অপমানজনক এবং তা অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্ককে দুর্বল করে। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্যে যেকোন দেশকেই আমন্ত্রণ জানাবে। আর নিজের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে তিনি বলেন যে, চীনকে সামরিক ঘাঁটি তৈরিতে আহ্বান করার কোন ঘটনাই ঘটেনি। আর এর আগে অস্ট্রেলিয়াও আহ্বান করার পর সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে নৌঘাঁটি তৈরি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তবে তিনি সপ্তাখানেক আগে দেশের পূর্বাঞ্চলে তেমোতুতে একটা প্যাট্রোল বোটের জেটি বানাবার অস্ট্রেলিয়ান প্রস্তাবকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। সোগাভারে বলছেন যে, নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড সর্বদাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তবে তিনি এও বলেন যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের উচিৎ হবে দেশের নিরাপত্তার জন্যে সহযোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা। তিনি অভিযোগ করে বলেন যে, কিছু লোক রয়েছে যারা বিদেশী এজেন্ট; যারা গোপনীয়তাকে অস্বীকার করে এবং সরকারকে দুর্বল করতে চায়। তার দেশ জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন সহযোগী খুঁজবে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান সাংবাদিকদের বলেন যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতার উদ্দেশ্য হলো জনগণের জানমাল রক্ষা করা। এর বাইরে মিডিয়াতে যা বলা হচ্ছে, সেগুলি মূলতঃ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তবে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিবিদেরা এই চুক্তিকে মেনে নিতে পারছেন না। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারেন এন্ড্রুজ সাংবাদিকদের বলেন যে, প্রশান্ত মহাসাগর হলো অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব উঠান। এই অঞ্চলের যেকোন দ্বীপে যেকোন ঘটনা অস্ট্রেলিয়ার জন্যে চিন্তার কারণ। অপরদিকে অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী দলের উপনেতা রিচার্ড মার্লেস দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন যাতে তিনি নিশ্চিত করেন যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপ দেশগুলি যেন স্বাভাবিকভাবেই শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়াকেই একমাত্র নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে চিন্তা করে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন ইতোমধ্যেই এব্যাপারে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নের সাথে ফোনালাপ করেছেন বলে অস্ট্রেলিয়ার সরকার বলে।

সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ তাইওয়ানের সাথে তাদের সম্পর্ক কর্তন করে চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগী হলে এর প্রতিক্রিয়ায় গত নভেম্বরে সেদেশের রাজধানী হোনিয়ারাতে ব্যাপক সহিংসতা দেখা দেয় এবং সেই ছুতোয় অস্ট্রেলিয়া সেখানে ২’শ সেনা মোতায়েন করে। এই সেনা মোতায়েনের আইনী স্তম্ভ ছিল ২০১৮ সালের চুক্তি। তবে সেসময়েই চীন সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পুলিশকে সরঞ্জাম এবং ট্রেনিং দেয়ার প্রস্তাব দেয়। চীনের সাথে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেই অস্ট্রেলিয়া গত বছর ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘অকাস’ চুক্তি করে। যুক্তরাষ্ট্রও ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোষণা দেয় যে, প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের সামরিক অবস্থানকে নিয়ন্ত্রণ করতে তারা সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে দূতাবাস খুলবে। 

নভেম্বর ২০২১। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের প্রধানমন্ত্রী সোগাভারে অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে প্যাট্রোল বোটের ডেলিভারি নিচ্ছেন। কয়েক দশকের অস্ট্রেলিয় সহায়তা দেশটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। কাজেই এখন অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতার ব্যাপারে প্রশ্ন আসছে, এবং তারা অন্য অপশন খুঁজছে।


‘চেকবুক কূটনীতি’

‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, গত বছর অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উন্নয়ন সহযোগিতার অংশ হিসেবে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়া সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে ৪৯ মিলিয়ন ডলার খরচে দ্বিতীয় একটা প্যাট্রোল বোট দিয়েছে এবং নতুন একটা জেটি তৈরি করছে। সরকারি কর্মচারিদের বেতন, পুলিশের কর্মকান্ড, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ মোকাবেলার জন্যে দেশজুড়ে রেডিও নেটওয়ার্ক তৈরিতে আরও সাড়ে ১৬ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে অস্ট্রেলিয়া। গত বছর চীনা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উপর কিছু লোক হামলা করে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করলে পুলিশ রাবার বুলেট ছুঁড়ে জনগণকে ছত্রভঙ্গ করে। এই ঘটনার জেরে বিরোধী দল পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব আনে। সরকারের বিরোধীরা অভিযোগ করে যে, চীন সরকার পার্লামেন্ট সদস্যদের মাঝে অর্থ বিলি করে অনাস্থা প্রস্তাব বাতিল করার জন্যে, যদিও এর সুনির্দিষ্ট কোন প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি। সরকার বলছে যে, যারা সহিংসতা উস্কে দিয়েছিল, তারাই এধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ দাঁড় করিয়েছে।

গত নভেম্বরে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সহিংসতার পিছনে দেশটার মালাইতা প্রদেশের নেতৃত্বের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। মালাইতার নেতৃত্ব খোলাখুলিভাবেই অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে এবং চীনের বিপক্ষে কথা বলে থাকে। মালাইতা প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী ড্যানিয়েল সুইদানিএর উপদেষ্টা তালিফিলু বলছেন যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের মানুষ অস্ট্রেলিয়দের ব্যাপারে খুব ভালো দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে। অপরদিকে চীনারা এখানে গাছ কাটছে, খনি উন্নয়ন করছে এবং মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে; যেগুলির কারণে দেশটার পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে এবং সেখানে চীন বিরোধী চিন্তা বাড়ছে। তবে চীনারা যেহেতু সরাসরি সরকারের লোকদের পকেটে অর্থ দিচ্ছে, সেহেতু অস্ট্রেলিয়া দ্রুত সেখানে প্রভাব হারাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর রিসার্চ ফেলো মিহাই সোরা বলছেন যে, উন্নয়ন সহায়তা দিয়েও অস্ট্রেলিয়া সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের একমাত্র নিরাপত্তা সহযোগী হতে পারেনি। এতে প্রমাণ হয় যে, সেখানকার নিরাপত্তার কিছু দিক রয়েছে যা অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়; এবং শুধুমাত্র অর্থ সহায়তা দিয়ে অস্ট্রেলিয়া সেই দ্বীপ দেশটার একমাত্র সহযোগী হতে পারবে না। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকার মনে করেছে যে, উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে চীন তাইওয়ানের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেকারণে তারা তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আর প্রধানমন্ত্রী সোগাভারে জানেন যে, তার দেশে জনসমর্থন রয়েছে যে, নিরাপত্তার জন্যে তার দেশ শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ার উপরেই নির্ভরশীল না থাকুক। মেলবোর্নের ‘লা ট্রোব ইউনিভার্সিটি’র শিক্ষক মাইকেল ওকীফ বলছেন যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের দিক থেকে দেখলে, কয়েক দশকের অস্ট্রেলিয় সহায়তা দেশটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। কাজেই এখন অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতার ব্যাপারে প্রশ্ন আসছে, এবং তারা অন্য অপশন খুঁজছে। আর চীন দেখতে পাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তাদের নাগরিকদেরকে রক্ষা করছে। একই আঙ্গিকে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে চীনারা যখন তাদের নাগরিক এবং বিনিয়োগের উপর হামলা হতে দেখছে, তখন তারাও সেই অনুযায়ী এগুচ্ছে।

সুইদানিএর উপদেষ্টা তালিফিলু অস্ট্রেলিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ অনুসরণ করতে বলছেন। যুক্তরাষ্ট্র মালাইতা প্রদেশে বিভিন্ন এনজিওকে ২৫ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে, যারা কৃষি, বনজ সম্পদ এবং মৎস্য সম্পদ ব্যবহারে জনগণকে অর্থায়ন করছে। এভাবে অস্ট্রেলিয়াও যদি জনগণকে সরাসরি অর্থ সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা করে, তাহলে তারা বিরোধী দলের পক্ষে ভোট দেবে, যারা কিনা অস্ট্রেলিয়াকে ভালোবাসে এবং তাইওয়ানকেও পছন্দ করে। অপরদিকে মাইকেল ওকীফ বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার উচিৎ হবে চীনের সকল কর্মকান্ডকে হুমকি হিসেবে না দেখে বরং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীনের সাথে সমান্তরালে কাজ করা।


তাইওয়ান প্রণালি থেকে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ…

অস্ট্রেলিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হবার কারণেই ‘অকাস’ চুক্তির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া একাধারে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অতি সংবেদনশীল প্রযুক্তি পেতে চলেছে, তেমনি তা ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাটাকেও শক্তিশালী করেছে। তবে এহেন কৌশলগত চুক্তি চীনের জন্যে হুমকি হবার কারণেই চীনও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার সহযোগিতার মাঝে নিরাপত্তাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। অস্ট্রেলিয়া যেমন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগকে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখেছে, তেমনি চীনও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ছোট দ্বীপ দেশগুলিকে জাতিসংঘে তাইওয়ানের পক্ষে ভোট দিতে দেখে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সেই অঞ্চলে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। অস্ট্রেলিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপ দেশগুলিকে তার ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে এতকাল। যার ফলাফল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার নিজ উঠানে তাইওয়ান এবং চীনের মাঝে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আর একই সূত্রে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে থাকা জনগণের মাঝে চীন বিরোধী চিন্তার জেরে চীনা নাগরিক এবং বিনিয়োগের উপর হামলা শেষ পর্যন্ত চীনকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে টেনে নিয়ে এসেছে। তাইওয়ান প্রণালিতে অস্ট্রেলিয়ার যুদ্ধজাহাজ চীনের জন্যে যেমন হুমকি তৈরি করেছে, ঠিক তেমনই হুমকি এখন অস্ট্রেলিয়া দেখতে পাচ্ছে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে; যার ভূকৌশলগত অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। ‘স্বাধীন দেশ’ হিসেবে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ যখন তাইওয়ানকে আলিঙ্গন করেছে, তখন অস্ট্রেলিয়া দ্বীপ দেশটাকে ‘স্বাধীন’ হিসেবেই আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু যখন তারা অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থের বাইরে গিয়ে চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তখনই অস্ট্রেলিয়া দেশটার ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এবং দেশটার ‘সার্বভৌমত্ব’কে তুচ্ছজ্ঞান করছে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপ দেশ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সাথে চীনের নিরাপত্তা চুক্তি বেইজিংএর নীতির ক্ষেত্রে একটা নতুন অধ্যায়; যা কিনা ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সাথে পশ্চিমা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর স্বার্থের দ্বন্দ্বকে আরও ঘনীভূত করবে। এতে অত্র অঞ্চলে অস্থিরতা এবং সংঘাতের সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে।