Monday, 10 January 2022

ফ্রান্স কেন ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করছে?

১০ই জানুয়ারি ২০২২

ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ লা রিউনিয়নে 'রাফাল' যুদ্ধবিমান। ফ্রান্স বিশ্বব্যাপী তার উপনিবেশগুলি এবং তার প্রভাবে থাকা দেশগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যাপারে আগের মতো নিশ্চিত নয়; বিশেষ করে দূরবর্তী ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলির নিরাপত্তা ফ্রান্সের কাছে পুরোপুরি নিশ্চিত নয় বলেই সেখানে হাজার হাজার কিঃমিঃ পাড়ি দিয়ে ৪৮ ঘন্টার মাঝেই ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার মিশন পরিচালনা করা হচ্ছে। ফ্রান্সের প্রভাবের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্যান্য শক্তির মাঝে চলছে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।

 
গত ৫ই জানুয়ারি ফ্রান্স একটা মহড়ার অংশ হিসেবে বিমান বাহিনীর দু’টা অত্যাধুনিক ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানকে তার দক্ষিণ ভারত মহাসাগরীয় উপনিবেশ লা রিউনিয়ন দ্বীপে পাঠিয়েছে। ফরাসি সূত্রের বরাত দিয়ে ‘ডাচ এভিয়েশন সোসাইটি’র ম্যাগাজিন ‘স্ক্র্যাম্বল’ এক প্রতিবেদনে বলছে যে, ‘অপারেশন ম্যারাথন’এর মাধ্যমে ‘রাফাল’ বিমানগুলির সাথে ছিল আকাশ থেকে আকাশে জ্বালানি দেবার সক্ষমতার একটা ‘এয়ারবাস এ৩৩০ এমআরটিটি’ ট্যাংকার বিমান। বিমানগুলি ফ্রান্স থেকে শুরু করে কোথাও না থেমে একবারে ৮ হাজার ৮’শ কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিয়ে লা রিউনিয়ন দ্বীপে নামে। আকাশপথে ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানগুলি দু’টা ট্যাংকার বিমান থেকে আকাশেই ৬ থেকে ৭ বার জ্বালানি নিয়েছে। ‘মিশন শিকরা’র অধিনে এই অপারেশন ৩রা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে; যার অধীনে পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে অন্ততঃ ৫টা ভিন্ন অপারেশন পরিচালিত হবে। এছাড়াও বিমানগুলি পরবর্তীতে পূর্ব আফ্রিকার জিবুতিতে ‘খামসিন’ নামের এক মহড়ায় অংশ নেবে; মিশরেও তারা যাত্রাবিরতি করবে। ফরাসি বিমান বাহিনী প্রধান জেনারেল লাভিয়েনে বলছেন যে, ফ্রান্স ২০২৩ সালে আরেকটা বড় মিশনের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে; যার উদ্দেশ্য হবে ৪৮ ঘন্টার মাঝে ২০টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান এবং তার সাথে কিছু ট্যাংকার বিমানকে ইন্দোপ্যাসিফিকে মোতায়েন করা। ‘অপারেশন ম্যারাথন’ সেই মিশনেরই একটা প্রস্তুতি। ফরাসি এভিয়েশন ম্যাগাজিন ‘০৬৩০ ডেল্টা’ বলছে যে, এই অপারেশন পরিচালিত হচ্ছে ফ্রান্সের ‘স্ট্র্যাটেজিক এয়ার ফোর্সেস’এর অধীনে; যার মূল উদ্দেশ্য হলো ফরাসি পারমাণবিক সক্ষমতাকে জিইয়ে রাখা। একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই ফ্রান্স তার মূল ভূখন্ড থেকে এতদূরে এরকম মিশন পরিচালনা করছে।

বিশাল দূরত্বে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার ফরাসি মিশন এটাই প্রথম নয়। ‘স্ক্র্যাম্বল’ বলছে যে, ২০২১এর জুন মাসে ফরাসিরা ‘অপারেশন হেইফারা ওয়াকেয়া’র অধীনে ৩টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানকে ফ্রান্স থেকে ১৭ হাজার কিঃমিঃ দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে ফরাসি উপনিবেশ ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়াতে উড়িয়ে নিয়ে যায়। সাথে ছিল ৩টা ট্যাংকার বিমান এবং একটা পরিবহণ বিমান। পথিমধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নামে একবার। মিশনের মাধ্যমে তারা ৪৮ ঘন্টার মাঝে পলিনেশিয়ায় বোমাবর্ষণ করার সক্ষমতার কথা জানান দেয়। এর আগে ২০২০এর অগাস্টে ফরাসিরা গ্রিসে ২টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছিল। ‘বিবিসি’ বলছে যে, এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তেল গ্যাস আহরণকে কেন্দ্র করে গ্রিসের সাথে তুরস্কের উত্তেজনার মাঝে গ্রিসকে আস্বস্ত করা।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার ক্যারিবিয় উপকূলে ফরাসি উপনিবেশ ফ্রেঞ্চ গায়ানাতে ফ্রান্স যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। সর্বশেষ সেটা ছিল ২০২১এর নভেম্বরে। এভিয়েশন ম্যাগাজিন ‘এরোটাইম হাব’ বলছে যে, ফরাসি উপনিবেশ থেকে মহাকাশে ইউরোপিয়ান রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। যখন সেখান থেকে ফরাসি সামরিক স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হয়, তখন এর জন্যে আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। গত নভেম্বরে ‘ভেগা’ স্পেসক্রাফটের মাধ্যমে ৩টা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণ করার সময় ৩টা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান, একটা ‘সি ১৩৫’ রিফুয়েলিং বিমান এবং একটা ‘বোইং ই৩এফ’ এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং এন্ড কন্ট্রোল বিমান সেখানে প্রেরণ করা হয়েছিল। এছাড়াও ২০১৮ সালে একটা মহড়ার অংশ হিসেবে তিনটা ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমানকে অস্ট্রেলিয়াতেও পাঠানো হয়; সাথে ছিল একটা ট্যাংকার এবং একটা পরিবহণ বিমান।

 
বিশ্বব্যাপী ফ্রান্সের উপনিবেশগুলির মানচিত্র। ফ্রান্সের এই বিমান মোতায়েনের দূরপাল্লার মিশনগুলি এমন সময়ে আসছে, যখন আফ্রিকায় ফ্রান্সের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। শুধু পশ্চিম আফ্রিকার মালিতেই নয়, পুরো আফ্রিকা জুড়েই ফ্রান্সের প্রভাব হুমকির মাঝে পড়েছে। মোটকথা ফ্রান্সের বিশ্বব্যাপী সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টাগুলি ফ্রান্সের শক্তি নয়, বরং দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।

ফ্রান্স তার নৌবাহিনীর ইউনিটগুলিকেও বিশ্বব্যাপী মোতায়েন রাখছে। ২০২১ সালের প্রথমভাগে ৪ মাসের জন্যে ফরাসি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘শার্ল দ্য গল’কে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়। ‘ক্লিমেনসিউ ২১’ নামের সেই মিশনের প্রধান রিয়ার এডমিরাল অসেডাট বলেন যে, ২০১৫ সালের পর থেকে প্রথমবারের মতো ফরাসি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়। এছাড়াও একইবছর ফরাসি হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘টোনেরে’র নেতৃত্বে ফরাসি যুদ্ধজাহাজের গ্রুপ ইন্দোপ্যাসিফিক ঘুরে আসে। ‘মিশন জঁ ডে আর্ক’ নামের ৫ মাসের সেই মিশনে ‘টোনেরে’ জাহাজের সাথে ছিল ফ্রিগেট ‘সুরকুফ’। তবে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে যেখানে বেশ কিছু দিন বা সপ্তাহ বা মাস সময় লাগে, বিমান বাহিনীর বিমানগুলি কয়েক ঘন্টার মাঝেই মোতায়েন করা যায়। কোন দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিমান শক্তি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্স তার বৈশ্বিক অবস্থানকে নিরাপত্তা দিতেই বিমান শক্তিকে বিশ্বব্যাপী মোতায়েন করার সক্ষমতার উপর জোর দিচ্ছে; এবং একইসাথে বাকি বিশ্বকে তা জানান দিচ্ছে।

ফ্রান্সের এই বিমান মোতায়েনের দূরপাল্লার মিশনগুলি এমন সময়ে আসছে, যখন আফ্রিকায় ফ্রান্সের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি প্রায় ৯ বছর পর ফরাসি সেনারা পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির উত্তরের তিমবুকতু শহর ছেড়ে যায়। ফ্রান্সের ‘অপারেশন বারখেইন’এর কমান্ডার জেনারেল এতিয়েন দু পেইরু বলেন যে, ফ্রান্স ‘অন্যভাবে’ মালিতে তার অবস্থান ধরে রাখবে। মালির অভ্যুত্থানকারী সামরিক অফিসার আসিমি গোইতার নেতৃত্বে থাকা মালি রাশিয়ার ‘ওয়াগনার গ্রুপ’এর ভাড়াটে সেনাদেরকে মালির সৈন্যদের ট্রেনিং দেয়ার জন্যে মোতায়েন করছে; যা কিনা ফ্রান্সের সাথে তার প্রাক্তন উপনিবেশ মালির দূরত্ব বাড়িয়েছে। এছাড়াও মালিতে ফ্রান্স বিরোধী চিন্তা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণ অনেকেই মনে করছে যে, ফরাসিরা মালির সহিংসতাকে কমাতে পারেনি; বরং তারা নিজেদের গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। মালির সহিংসতা সাম্প্রতিক সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশ বুরকিনা ফাসো এবং নিজেরএও ছড়িয়ে পড়েছে।

শুধু পশ্চিম আফ্রিকার মালিতেই নয়, পুরো আফ্রিকা জুড়েই ফ্রান্সের প্রভাব হুমকির মাঝে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্য আফ্রিকার দেশ শাদ এবং পশ্চিম আফ্রিকার গিনিতে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। মাদাগাস্কারেও সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চলেছে। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে গৃহযুদ্ধের মাঝে রুশ ভাড়াটে সেনারা সরকারের নিরাপত্তা দিচ্ছে। মোজাম্বিকেও ফরাসি বিনিয়োগ গৃহযুদ্ধের হুমকির মাঝে রয়েছে। মোটকথা ফ্রান্সের বিশ্বব্যাপী সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টাগুলি ফ্রান্সের শক্তি নয়, বরং দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। ফ্রান্স বিশ্বব্যাপী তার উপনিবেশগুলি এবং তার প্রভাবে থাকা দেশগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যাপারে আগের মতো নিশ্চিত নয়; বিশেষ করে দূরবর্তী ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলির নিরাপত্তা ফ্রান্সের কাছে পুরোপুরি নিশ্চিত নয় বলেই সেখানে হাজার হাজার কিঃমিঃ পাড়ি দিয়ে ৪৮ ঘন্টার মাঝেই ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার মিশন পরিচালনা করা হচ্ছে। ফ্রান্সের প্রভাবের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্যান্য শক্তির মাঝে চলছে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।

Saturday, 8 January 2022

কাজাখস্তানের রাস্তায় সহিংসতার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

০৮ই জানুয়ারি ২০২২

কাজাখস্তানের আলমাতির পথে বিমানে উঠছে রুশ প্যারাট্রুপাররা। কাজাখস্তানের সহিংসতা এমন সময়ে এলো, যখন ইউক্রেনের সীমানায় সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে রুশ সরকার ন্যাটোকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে। ইউক্রেন এবং মধ্য এশিয়ার দুই সীমানাকে একত্রে নিয়ন্ত্রণে আনা রাশিয়ার জন্যে একটা চ্যালেঞ্জ। আলমাতির বিক্ষোভ হয়তো রাশিয়াকে ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঝামেলা চুকিয়ে ফেলতে প্রভাবিত করতে পারে।


গত ৬ই জানুয়ারি থেকে মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখস্তানে সহিংসতায় পুলিশ এবং সাধারণ জনগণ সহ কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, তিন দশক আগে দেশটার জন্মের পর থেকে এখন পর্যন্ত এটা সবচাইতে মারাত্মক সহিংসতা। ১ কোটি ৯০ লক্ষ জনসংখ্যার দেশটায় এলপিজির মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। আলমাতির সরকারি অফিসগুলিতে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভকারীদের মতে, হাইড্রোকার্বন রপ্তানিকারী দেশ কাজাখস্তানের জন্যে এই মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক। কাজাখস্তানে পেট্রোলের চাইতে কমদামি এলপিজি গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাজাখস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয় যে, প্রধান শহর আলমাতি এবং পশ্চিমের মানগিসতাউ প্রদেশে দুই হাজার দুই শ’র অধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কমপক্ষে ১৮ জন সদস্য নিহত হওয়া ছাড়াও ৭’শ ৪৮ জন আহত হয়েছে বলে বলছে রুশ বার্তা সংস্থা ‘ইন্টারফ্যাক্স’। পুলিশের গুলিতে ২৬ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও শতশত সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে; কমপক্ষে ৬০ জন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট কাসিম জোমার্ত তোকাইয়েভ বিক্ষোভ ঠেকাতে সরকার ভেঙ্গে দিয়েছেন। তিনি বিক্ষোভকারীদেরকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে তাদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশও দিয়েছেন। একইসাথে তিনি দুই সপ্তাহের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা ছাড়াও রাশিয়াকে সেদেশে সেনা মোতায়েন করতে অনুরোধ করেন। তোকাইয়েভ বলেন যে, ২০ হাজার বিক্ষোভকারী পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক আলমাতির উপর হামলা করেছে। তাদের মাঝে যথেষ্ট সমন্বয় এবং সামরিক প্রস্তুতি রয়েছে।

রুশ বার্তা সংস্থা ‘আরআইএ’ বলছে যে, রুশ নেতৃত্বে ‘কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অরগানাইজেশন’ বা ‘সিএসটিও’ প্রায় আড়াই হাজারের মতো সেনা মোতায়েন করবে। তারা হয়তো সেখানে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের জন্যে মোতায়েন থাকবে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইগর কনাশেনকভ বলেন যে, রুশ প্যারাট্রুপাররা বিক্ষোভকারীদের হাত থেকে আলমাতির বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সেনাদের উপর সশস্ত্র হামলা হলে তারা গুলি চালাতে পারবে বলেও বলা হয়। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, দেশটার প্রথম প্রেসিডেন্ট নূরসুলতান নাজারবায়েভ প্রায় ২৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৯ সালে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। তবে অনেকের ধারণা তিনি এখনও তার নিজের নির্বাচিত বর্তমান প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে দেশ চালাচ্ছেন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কাজাখস্তানে কোন মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে কিনা, অথবা রুশ সেনারা সেখানে কোন ধরনের রাষ্ট্রীয় সংস্থার দখল নেয় কিনা, সেব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র খেয়াল রাখবে। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন সাংবাদিকদের বলেন যে, ইতিহাস বলে দেয় যে, রুশরা একবার কোন দেশে ঢুকলে তাদেরকে সেখান থেকে বের করা কঠিন হয়ে যায়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বলা হয় যে, ব্রিটেন কোন সহিংসতা এবং জনগণের সম্পদের ধ্বংসের বিরোধী। ব্রিটেন চায় কাজাখ সরকার ইন্টারনেট সার্ভিস খুলে দিক এবং জনগণের বাকস্বাধীনতার অধিকারকে মান্য করুক। অপরদিকে তুরস্কের কমিউনিকেন্স ডিরেকটিভ থেকে বলা হয় যে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান কাজাখ প্রেসিডেন্টকে ফোন করে তুরস্কের পুরোপুরি সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

 
এলপিজির মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। আলমাতির সরকারি অফিসগুলিতে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। আফগানিস্তান থেকে পলায়নের পরেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি মধ্য এশিয়ায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেই রয়ে গেছে। তবে আলমাতির সহিংসতার ব্যাপারে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানে মধ্য এশিয়ায় সৃষ্ট শূণ্যস্থান পূরণের প্রতিযোগিতার একটা লক্ষণও বটে, যা আঞ্চলিক অস্থিরতাকে বৃদ্ধি করবে।

রাশিয়ার দক্ষিণ সীমানায় কাজাখস্তানের এই সমস্যা এমন সময়ে এলো, যখন রাশিয়ার পূর্বদিকে ইউক্রেনের সীমানায় রুশ সেনা মোতায়েন নিয়ে ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার উত্তেজনা চলছে। হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব জেন পিসাকি সাংবাদিকদের বলেন যে, কাজাখস্তানের পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, পরবর্তী সপ্তাহে জেনেভায় ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার সাথে ন্যাটোর আলোচনা যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে।

কাজাখস্তান বিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উৎপাদনকারী দেশগুলির একটি। পৃথিবীর সবচাইতে বেশি ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী কোম্পানি ‘কাজাটমপ্রম’ বলছে যে, বিক্ষোভে তাদের উৎপাদন ব্যাহত হয়নি। তবে ‘প্ল্যাটস’এর হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরেনিয়ামের মূল্য কিছুটা বেড়েছে। অপরদিকে দৈনিক ১৬ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদনকারি কাজাখস্তানের সবচাইতে বড় বিদেশী তেল কোম্পানি ‘শেভরন’ বলছে যে, কিছু কনট্রাকটর বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে রেললাইন উপড়ে ফেলায় ‘তেনগিজ’ তেলখনিতে উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।

‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কাজাখস্তানের সহিংসতার কারণে দেশটায় চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ হুমকির মাঝে পড়েছে। চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’ চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ হাব হলো চীন এবং ইউরোপের মাঝে অবস্থিত কাজাখস্তান। সেখানে চীনারা ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। চীনা রাষ্ট্রীয় মিডিয়া বলছে যে, চীনা ব্যবসাগুলি এখনও কোন সমস্যায় পড়েনি; আর কাজাখস্তান থেকে চীন পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইনগুলি বিক্ষোভের শহরগুলি থেকে দূরে থাকায় খুব সম্ভবতঃ নিরাপদেই থাকবে। ২০১৯ সালের ১১ মাসে দুই দেশের মাঝে বাণিজ্য ছিল প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। একই বছরে চীনারা কাজাখস্তান হয়ে সাড়ে ১৪ লক্ষ টিইউএস কনটেইনার রেলপথে ইউরোপে পাঠিয়েছে।

 
আলমাতি শহরটা কাজাখস্তানের একেবারে পূর্বে; যেখানে দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষ থাকে। শহরটা কিরগিজস্তান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফারগানা ভ্যালির দেশ উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং চীনের উইঘুরের খুব কাছে। মুসলিম অধ্যুষিত এই অঞ্চল আফগানিস্তানের সীমানায়। রাশিয়া একারণেই তার দক্ষিণ সীমানায়, বিশেষ করে আলমাতি বা মধ্য এশিয়ায় কোন অস্থিরতা চায় না।

মার্কিন ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক পিটার জেইহান কাজাখস্তানের সমস্যার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলছেন যে, আলমাতি শহরটা কাজাখস্তানের একেবারে পূর্বে; যেখানে দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষ থাকে। শহরটা কিরগিজস্তান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফারগানা ভ্যালির দেশ উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং চীনের উইঘুরের খুব কাছে। মুসলিম অধ্যুষিত এই অঞ্চল আফগানিস্তানের সীমানায়। রাশিয়া একারণেই তার দক্ষিণ সীমানায়, বিশেষ করে আলমাতি বা মধ্য এশিয়ায় কোন অস্থিরতা চায় না। ওয়াশিংটনে রুশ রাষ্ট্রদূত আনাতোলি আন্তোনভ ‘নিউজউইক’কে বলেন যে, কাজাখস্তানের সমস্যা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ফলাফল। দুই দশক ধরে পশ্চিম এবং মধ্য এশিয়ায় গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের নামে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ অস্থিরতাকে উস্কে দিয়েছে। তাঁর ধারণা, মধ্য এশিয়াতে উগ্রবাদী ধর্মীয় আদর্শ ছড়িয়ে পড়ার হুমকি রয়েছে।

কাজাখস্তানের সহিংসতা এমন সময়ে এলো, যখন ইউক্রেনের সীমানায় সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে রুশ সরকার ন্যাটোকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে। ইউক্রেন এবং মধ্য এশিয়ার দুই সীমানাকে একত্রে নিয়ন্ত্রণে আনা রাশিয়ার জন্যে একটা চ্যালেঞ্জ। আলমাতির বিক্ষোভ হয়তো রাশিয়াকে ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঝামেলা চুকিয়ে ফেলতে প্রভাবিত করতে পারে। আফগানিস্তান থেকে পলায়নের পরেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি মধ্য এশিয়ায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেই রয়ে গেছে। তবে আলমাতির সহিংসতার ব্যাপারে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানে মধ্য এশিয়ায় সৃষ্ট শূণ্যস্থান পূরণের প্রতিযোগিতার একটা লক্ষণও বটে, যা আঞ্চলিক অস্থিরতাকে বৃদ্ধি করবে।

Sunday, 2 January 2022

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দোপ্যাসিফিক ফোকাসের মাঝেই বলকানে জাতিগত সমস্যার পুনরুদ্ধান

০২রা জানুয়ারি ২০২২

ডানপন্থী সার্ব জাতীয়তাবাদী নেতা মিলোরাদ দোদিক।  পূর্ব ইউরোপে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতারা যখন নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, তখন ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়েই ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র; ১৯৯০এর দশকে ওয়াশিংটনের ছায়াতলে স্বাক্ষরিত ডেইটন শান্তি চুক্তিকে ধরে রাখার মতো সময় তাদের নেই। বলকানে তিন দশকের ভিতরেই গণতান্ত্রিকভাবেই ভেঙ্গে পড়ছে মার্কিন রাজনৈতিক সমাধান।

 
গত ১০ই ডিসেম্বর বসনিয়ার জাতিগত সার্ব অংশের পার্লামেন্টের এক ভোটাভুটিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, সার্বরা বসনিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি থেকে বের হয়ে যাবে। উত্তপ্ত বাকবিতন্ডার মাঝে ডানপন্থী সার্ব জাতীয়তাবাদী নেতা মিলোরাদ দোদিক যথেষ্ট ভোট পেয়ে সার্বদেরকে বসনিয়ার সেনাবাহিনী, আদালত এবং কর ব্যবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসার জন্যে আইন তৈরি করার জন্যে সমর্থন পেয়ে যান। ছয় মাসের মধ্যে এই প্রস্তাবগুলি আইন আকারে স্বীকৃতি পেতে পারে। বিরোধী দলীয় সাংসদ ব্রানিস্লাভ বোরেনোভিচ সমালোচনা করে বলেন যে, এই প্রস্তাবের অর্থ হলো সংঘাত; যুদ্ধ এবং মৃত্যু। তিনি দোদিককে জিজ্ঞেস করেন যে, রিপাবলিকা সার্পস্কার সেনাবাহিনী কিসের প্রতিনিধিত্ব করবে? ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমানের জন্যে অর্থ কোত্থেকে আসবে? সীমানায় চেকপোস্ট বসানোর শর্তগুলি কি হবে? এই উত্তরগুলি দোদিককে দিতে হবে বলে তিনি দাবি করেন। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে সার্বদের এই সিদ্ধান্তের খবরটা বসনিয়ার তথা পুরো বলকানের কঠিন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বলেই উল্লেখিত হয়।

পৃথিবীর অন্যতম জটিল রাজনৈতিক ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে ‘ইউরোনিউজ’ বসনিয়ার রাষ্ট্র ব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছে। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার গৃহযুদ্ধের শেষে মার্কিন মধ্যস্ততায় ডেইটন শান্তি চুক্তির মাধ্যমে বর্তমান বসনিয়া রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়। এই রাষ্ট্রের মাঝে রয়েছে দু’টা আলাদা প্রশাসনিক সত্ত্বা। একটা হলো জাতিগত সার্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে রিপাবলিকা সার্পস্কা; আর অন্যটা হলো বসনিয়াক এবং ক্রোয়াটদের নিয়ে গঠিত ফেডারেশন অব বসনিয়া এন্ড হার্জেগোভিনা। জাতিগত সার্বরা হলো মূলতঃ অর্থোডক্স খ্রিস্টান; বসনিয়াকরা মূলতঃ মুসলিম; ক্রোয়াটরা মূলতঃ ক্যাথোলিক খ্রিস্টান। উভয় অঞ্চলকেই বেশকিছু ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে বসনিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার কিছু ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ করে; যার মাঝে রয়েছে সেনাবাহিনী, সর্বোচ্চ আদালত এবং কর আদায়ের কাঠামো। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হলো তিন সদস্য বিশিষ্ট প্রেসিডেন্সি; যার সদস্যরা হলেন বসনিয়াক, সার্ব এবং ক্রোয়াট। তিন জাতির মানুষের ভোটের দ্বারা তারা আলাদাভাবে নির্বাচিত হন। বর্তমানে এর বসনিয়াক সদস্য হলেন শেফিক জাফেরোভিচ; আর ক্রোয়াট সদস্য জেলিকো কমসিচ। উগ্র জাতীয়তাবাদী অচরণের জন্যে তারা পশ্চিমা দেশগুলির কাছে দোদিক এবং তার সমর্থকদের উপর চাপ সৃষ্টির আনুরোধ জানিয়ে আসছেন। ২০১৩ সালের শুমারি অনুযায়ি বসনিয়ার প্রায় ৩৩ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝে ৫০ শতাংশ হলো বসনিয়াক; সার্বরা হলো প্রায় ৩১ শতাংশ; ক্রোয়াটরা ১৫ শতাংশের মতো। ১৯৯০এর দশকে সাবেক ইউগোস্লাভিয়া ভেঙ্গে যাবার পর ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে ১ লক্ষের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। যুদ্ধের মাঝে ভয়ংকর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে বসনিয়ার স্রেব্রেনিসা শহরে সার্বদের হাতে ৮ হাজার নিরপরাধ বসনিয়াক মুসলিমের মৃত্যুর ঘটনা এখনও ভয়াবহ এক উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে।

মিলোরাদ দোদিক ২০১০ সালে গণতান্ত্রিক ভোটে রিপাবলিকা সার্পস্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে বসনিয়ার প্রেসিডেন্সির সদস্য নির্বাচিত হবার আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। এই পদে থাকার সময়েই তিনি বারংবার রিপাবলিকা সার্পস্কাকে বসনিয়ার রাষ্ট্রকাঠামো থেকে আলাদা করে ফেলার কথা বলেন। ডেইটন শান্তি চুক্তিকে হুমকিতে ফেলার কারণে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন সরকার দোদিকের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দেয় এবং তার সাথে কোন মার্কিন ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু দোদিক বলেন যে তিনি তার উপর অবরোধের কোন তোয়াক্কা করেন না। তিনি বসনিয়ার প্রেসিডেন্সির সদস্য হবার পর থেকে তার জাতীয়তাবাদী কথার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। ‘ইউরোনিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, গত সেপ্টেম্বর মাসে তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কার আলাদা সেনাবাহিনী, আদালত এবং কর কাঠামো তৈরি করার পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। তবে তিনি বলেন যে, এসব পরিকল্পনা বসনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবার প্রচেষ্টা নয়, অথবা নতুন করে যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনাকেও উস্কে দেবে না।

 

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অব ফরে রিলেশন্স’ বা ‘সিএফআর’এর এক লেখায় চার্লস কুপচান বলছেন যে, ডেইটন চুক্তি অনুসারে বসনিয়ার রাজনীতিটাই হলো জাতিগত। আর সার্বদের নতুন সিদ্ধান্তের অর্থ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আর কিছু নয়। তিনি বলেন যে, পুরো বলকান অঞ্চলেই এখন জাতীয়তাবাদের উত্থান হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ সার্বিয়াও দ্রুত নিজেদের সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করছে এবং দেশটার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুনিয়ার সকল সার্বদের একত্রিত হবার আহ্বান জানিয়েছেন। সার্বিয়া এখনও ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর সহায়তায় সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আলবেনিয় মুসলিম অধ্যুষিত কসভোকে স্বীকৃতি দেয়নি; এবং এখনও সার্বিয়ার সাথে কসভোর সম্পর্ক বেশ খারাপ। একইসাথে অত্র অঞ্চলে রাশিয়াও অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের মাঝে তার প্রভাব বিস্তার করছে; যার মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিকে ইইউ এবং ন্যাটো থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে রাশিয়া। এর মাঝে ইইউ বলকানের ব্যাপারে খুব বেশি দৃষ্টি দিচ্ছে না; আর যুক্তরাষ্ট্রও ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়ে ব্যস্ত। রাশিয়ার সাথেও চলছে উত্তেজনা। এমতাবস্থায় দোদিকের জাতীয়তাবাদী কর্মকান্ডের ফলে রিপাবলিকা সার্পস্কা যদি বসনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়, তাহলে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে; যা বসনিয়ার সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে যেতে পারে।

কুপচান বলকানের বেশ কয়েকটা দেশের ইইউ এবং ন্যাটোর সদস্য হওয়াকে সেখানকার উন্নয়ন আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ইইউ এবং ন্যাটো সদস্য দেশ হাঙ্গেরির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর অরবানই যখন উগ্রপন্থী কথা বলছেন, তখন ইউরোপের গণতান্ত্রিকতার মাঝেই জাতীয়তাবাদী সমস্যার গভীরতা নতুধাবন করা যায়। বুদাপেস্টে এক ভাষণে তিনি বলেন যে, বসনিয়াকে যদি ইইউএর ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে ২০ লক্ষ মুসলিমের কারণে নিরাপত্তার সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। গত ডিসেম্বরে এক সংবাদ সন্মেলনে অরবান বলেন যে, তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কাকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছেন এবং তিনি মিলোরাদ দোদিকের উপর অবরোধের বিরোধী। অরবান জার্মানির প্রতি দোদিকের বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকান্ডের কারণে শাস্তি না দিয়ে বরং আলিঙ্গন করার আহ্বান জানান। পূর্ব ইউরোপে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতারা যখন নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, তখন ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়েই ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র; ১৯৯০এর দশকে ওয়াশিংটনের ছায়াতলে স্বাক্ষরিত ডেইটন শান্তি চুক্তিকে ধরে রাখার মতো সময় তাদের নেই। বলকানে তিন দশকের ভিতরেই গণতান্ত্রিকভাবেই ভেঙ্গে পড়ছে মার্কিন রাজনৈতিক সমাধান।

Thursday, 30 December 2021

সৌদিরা নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করছে কেন?

৩১শে ডিসেম্বর ২০২১

রাজধানী রিয়াদের ২’শ ৩০ কিঃমিঃ পশ্চিমে দাওয়াদমি এলাকার ফ্যাসিলিটি। এখানেই সৌদি আরব চীনের সহায়তায় নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। মার্কিনীদের উপর নির্ভরশীল সৌদিরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভীত। সৌদিদের এই প্রকল্প হয়তো সেই ভীতি থেকেই এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করতে পারছে না। এমতাবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা যেমন বাড়বে, তেমনি সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়বে।

 
মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘সিএনএন’ জানাচ্ছে যে, সৌদি আরব চীনের সহায়তায় নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। প্রতিবেদনে ধারণা করা হয় যে, সৌদি আরবের এহেন কর্মকান্ডের ফলে পারমাণবিক অস্ত্র ডেভেলপ করার পরিকল্পনা থেকে ইরানকে দূরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। স্যাটেলাইট ছবিতেও দেখা যাচ্ছে যে, সৌদি আরবের কমপক্ষে একটা স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করা হচ্ছে। চীনারাই একসময় রাজধানী রিয়াদের ২’শ ৩০ কিঃমিঃ পশ্চিমে দাওয়াদমি এলাকায় সেই ফ্যাসিলিটি তৈরি করে দিয়েছিল। গত অক্টোবর এবং নভেম্বরের মাঝে নেয়া ছবিতে সেখানে ‘বার্ন অপারেশন’এর প্রমাণ পাওয়া যায়; যা কিনা বুঝিয়ে দেয় যে, সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করা হচ্ছে। মার্কিন সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’এর ব্রিফিংএ চীন থেকে সৌদি আরবের কাছে সংবেদনশীল প্রযুক্তির বেশ কয়েকটা বড় আকারের শিপমেন্টের ব্যাপারে ইন্টেলিজেন্স উপস্থাপন করা হয়েছে।

চীনা পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র ‘সিএনএন’কে জানান যে, সৌদি আরবের সাথে চীনের সম্পর্ক কৌশলগত। সামরিক বাণিজ্যসহ অনেক বিষয়েই দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। এই সহযোগিতাগুলি আন্তর্জাতিক আইন মেনেই হচ্ছ; এবং এর মাঝে ব্যাপক ধ্বংস সাধন করার মতো কোন প্রযুক্তির আদানপ্রদান নেই। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বিস্তার নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘মিসাইল টেকনলজি কনট্রোল রেজিম’ বা ‘এমটিসিআর’এ চীন এবং সৌদি আরব কেউই স্বাক্ষরকারী নয়। সৌদি আরব, ইস্রাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখেছে। অপরদিকে ইরান তার দুর্বল বিমান বাহিনীর স্থলে ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে ডিটারেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

তবে এই ব্যাপারটায় শুধু চীনকেই জড়ানো ঠিক নয় বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সৌদি আরব বেশ কয়েকটা দেশের কাছ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পাবার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিডলবুরি কলেজ’এর প্রফেসর জেফরি লুইস বলছেন যে, রকেট পরীক্ষা করার সময় কিছু জ্বালানি বেঁচে যায়। এই বেঁচে যাওয়া জ্বালানি খুবই দাহ্য এবং বিপজ্জনক। কঠিন জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করার সময় অনেক ক্ষেত্রেই বেঁচে যাওয়া জ্বালানিগুলিকে একটা ‘বার্ন পিট’এর মাঝে ফেলে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এই পুড়িয়ে ফেলার অপারেশন থাকার অর্থই হলো সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করার কাজ চলছে। সৌদি আরবের দাওয়াদমি এলাকার ফ্যাসিলিটির স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করলে এব্যাপারটাই নিশ্চিত হওয়া যায়। ‘আইআইএসএস’ ওয়াশিংটনের সিনিয়র ফেলো মাইকেল এলম্যান এবং মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর জোসেফ এস বারমুডেজ জুনিয়র ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর সাথে সাক্ষাতে এই ফ্যাসিলিটিকে কঠিন জ্বালানির রকেট ইঞ্জিন ডেভেলপ করার কারখানা বলে মত দেন। ব্রিটেনের ‘ডেইলি মেইল’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সৌদিদের এই ফ্যাসিলিটির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখানে ‘সলিড ফুয়েল’ বা কঠিন জ্বালানির রকেট তৈরি করা হচ্ছে। তরল জ্বালানির রকেটের চাইতে কঠিন জ্বালানির রকেট সহজে লুকিয়ে রাখা যায় এবং অনেক দ্রুততার সাথে উড্ডয়ন করা যায়।

 
ভিয়েনায় ইরানের সাথে পশ্চিমা দেশগুলির পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে আলোচনা। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট প্রশ্নের মাঝে পড়লেও সৌদি প্রকল্পের ব্যাপারে ততটা চিন্তিত দেখা যায়নি কাউকেই। ইরান নিশ্চয়ই এমন কোন নিয়ন্ত্রণমূলক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চাইবে না, যা কিনা অন্যদের উপর প্রয়োগ করা হবে না।

বাইডেন প্রশাসন এখন মনে করছে যে, এর ফলে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প সীমিতকরণের চেষ্টার ব্যাপ্তি আরও বাড়িয়ে সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পকেও সীমিত করার চেষ্টাকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ইস্রাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপারে যথেষ্টই চিন্তিত। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বলা হয় যে, সৌদি আরব তাদের প্রথম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা তৈরি করেছে। একই বছরের জুনে ‘সিএনএন’ আরেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল যে, মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা এব্যাপারে অবহিত রয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সামনে গোপন ইন্টেলিজেন্স প্রকাশ করতে চাননি। ডেমোক্র্যাটরা সরকারি চ্যানেলের বাইরে থেকে এব্যাপারে জানতে পেরে ক্ষেপে যায়। ডেমোক্র্যাটরা বলতে থাকে যে, ট্রাম্প প্রশাসন সৌদিদের ব্যাপারে খুবই নরম আচরণ করছিলেন। অনেকেই বলেন যে, ট্রাম্পের নিস্তব্দতাই সৌদিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পকে এগিয়ে নেবার পিছনে সাহস যুগিয়েছে। মার্কিন সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন যে, বাইডেন প্রশাসন এই আদানপ্রদানে জড়িত থাকা কিছু কোম্পানির উপর অবরোধ দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে; যদিও ক্যাপিটল হিলে অনেকেই মনে করেন না যে, বাইডেন প্রশাসন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কঠোর কোন সিদ্ধান্ত নেবে।

প্রফেসর জেফরি লুইস বলছেন যে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট প্রশ্নের মাঝে পড়লেও সৌদি প্রকল্পের ব্যাপারে ততটা চিন্তিত দেখা যায়নি কাউকেই। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির বিস্তার ঠেকাতে সৌদি আরব এবং ইস্রাইলের মতো আঞ্চলিক পক্ষগুলিকেও আলোচনায় আনতে হবে; কারণ এরাও নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র নিজেরাই তৈরি করতে পারছে। ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এসোসিয়েট ফেলো মার্ক ফিতজপ্যাট্রিক এক লেখায় বলছেন যে, ইরান নিশ্চয়ই এমন কোন নিয়ন্ত্রণমূলক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চাইবে না, যা কিনা অন্যদের উপর প্রয়োগ করা হবে না। তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করার ব্যাপারে ইরানের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বাইরে সৌদি আরবের আর কোন উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা, সেব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। সৌদিদের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে ব্যবহারের জন্যে কোন পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির প্রকল্প শুরুর কথাও শোনা যায় না। তবে ২০১৮ সালে মার্কিন মিডিয়া ‘সিবিএস’কে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছিলেন যে, সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্র যোগাড় করতে চায় না। তবে ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র ডেভেলপ করে, তবে সৌদি আরব নিশ্চিতভাবেই একই কাজ করবে।

মার্কিন ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘স্ট্রাটফর’ ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলে যে, যদি সৌদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের অবস্থানে পৌঁছে, তবে মার্কিন প্রশাসন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হতে পারে। মাইকেল এলম্যান ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে এক সাক্ষাতে বলেন যে, সৌদি আরবের বিমান বাহিনীতে অত্যাধুনিক ‘এফ ১৫’, ‘টর্নেডো’ এবং ‘টাইফুন’ যুদ্ধবিমান রয়েছে এবং তাদের পাইলটেরাও যথেষ্ট ভালো। তবে তাদের লজিস্টিক্যাল সাপোর্টের ক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। কিন্তু সৌদিরা যদি ইরানের উপর কোন হামলা করতে যায়, সেখানে কোন নিশ্চয়তা নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র সৌদিদেরকে সহায়তা দেবে। এই অনিশ্চয়তাই হয়তো সৌদিদেরকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পেতে আগ্রহী করে তুলেছে। গত সেপ্টেম্বরে ‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব থেকে তাদের ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের সাথে অনেকেই আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসার ব্যাপারটা যুক্ত করেছে; এবং একইসাথে তা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনীদের উপর নির্ভরশীল দেশগুলিকে দুশ্চিন্তার মাঝে ফেলে দিয়েছে। ‘রাইস ইউনিভার্সিটি’র ‘জেমস এ বেকার থ্রি ইন্সটিটিউট ফর পাবলিক পলিসি’র রিসার্চ ফেলো ক্রিশ্চিয়ান আলরিকসেন বলছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে সিদ্ধান্ত নেয়ার মানুষগুলি মোটামুটিভাবে একমত যে, যুক্তরাষ্ট্র একসময় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে রক্ষায় যতটা মনযোগী ছিল, এখন ততটা নেই। সৌদিরা মনে করছে যে, ওবামা, ট্রাম্প এবং বাইডেনের পরপর তিনটা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের মাঝেই তারা মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাবার প্রবণতা দেখেছে। অন্ততঃ ট্রাম্প প্রশাসনের পর বাইডেন যখন আফগানিস্তান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত দেয়ার সময়ে নিশ্চিত করেছেন যে, তার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই সর্বাগ্রে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বন্ধুরাই হতাশ হয়েছে।

 
২০১৮ সালে মার্কিন মিডিয়া ‘সিবিএস’কে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছিলেন যে, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র ডেভেলপ করে, তবে সৌদি আরব নিশ্চিতভাবেই একই কাজ করবে। সৌদিরা মনে করছে যে, ওবামা, ট্রাম্প এবং বাইডেনের পরপর তিনটা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের মাঝেই তারা মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাবার প্রবণতা দেখেছে। অন্ততঃ ট্রাম্প প্রশাসনের পর বাইডেন যখন আফগানিস্তান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত দেয়ার সময়ে নিশ্চিত করেছেন যে, তার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই সর্বাগ্রে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বন্ধুরাই হতাশ হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানে সৌদিরা নিজেদের প্রতিরক্ষা নিজেরাই নিশ্চিত করতে পারবে, সেব্যাপারে কেউই নিশ্চিত নয়। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গত পাঁচ বছরে সৌদি আরবের অস্ত্র আমদানি ৬১ শতাংশ বেড়েছে। আর ‘মিডিলইস্ট আই’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২১ সালেই সৌদি আরব ঘোষণা দেয় যে, তারা নিজস্ব সামরিক শিল্পে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে। এছাড়াও ২০৩০ সালের মাঝে তারা তাদের সামরিক বাজেটের ৫০ শতাংশ নিজস্ব উৎস থেকে ক্রয় করার টার্গেট ঠিক করেছে। অর্থাৎ বাইরের উৎসের উপর নির্ভরতা কমাতে পরিকল্পনা নিয়েছে সৌদি আরব। তবে কিছুদিন আগেই বাইডেন প্রশাসন সৌদিদের কাছে ট্রাম্প প্রশাসনের এক অস্ত্র বিক্রির চুক্তিতে আংশিক সম্মতি দিয়েছে। সাড়ে ৬’শ মিলিয়ন ডলারের সেই অস্ত্র চুক্তির মাঝে রয়েছে ২’শ ৮০টা ‘এআইএম ১২০সি’ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র; এবং এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ফাইটার বিমান থেকে ছোঁড়ার জন্যে ৫’শ ৯৬টা ‘এলএইউ ১২৮ মিসাইল রেইল লঞ্চার’। এই চুক্তিতে সম্মতির পর মার্কিন সিনেটে প্রবল বাকবিতন্ডা চলে। সিনেটররা ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি আরবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, দুই বছর আগে সৌদি ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের ফ্যাসিলিটি তৈরির কাজ শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র সেব্যাপারে চুপ ছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছিল যে, সৌদি প্রকল্পে ট্রাম্প প্রেরণা যুগিয়েছিলেন। এখন বাইডেন প্রশাসনের এক বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র এব্যাপারে অফিশিয়ালি কোন বিবৃতি দেয়নি। এমনকি অতি সংবেদনশীল প্রযুক্তির বড় কিছু শিপমেন্টের ব্যাপারে ইন্টেলিজেন্স থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র চুপ থেকেছে; যদিও সকলেই মনে করছেন যে, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনার ক্ষেত্রে সৌদিদের এই প্রকল্প একটা বড় বাধা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধে সৌদিদেরকে সরাসরি সহায়তা দেবে কিনা, সেব্যাপারে অনিশ্চয়তাই হয়তো সৌদিদেরকে নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তবে এই প্রকল্পের ব্যাপারে কয়েক বছর ধরে ট্রাম্প এবং বাইডেন প্রশাসনের নীরবতাই যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ স্বীকৃতির প্রমাণ। দু’বছর আগে ‘স্ট্রাটফর’ বলেছিল যে, সৌদিরা ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করলে যুক্তরাষ্ট্র সৌদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। তবে কি বাইডেন প্রশাসন পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের জন্যেই অপেক্ষা করছে? নাকি ইরানের সাথে আলোচনার সফলতার ব্যাপারে সন্দেহের কারণেই বাইডেন প্রশাসন সৌদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া থেকে দূরে থাকছে? অর্থাৎ ইরানের সাথে আলোচনায় সৌদিদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে দরকষাকষির একটা সুযোগ দিচ্ছে। তথাপি অনেকেই বলছেন যে, মার্কিনীদের উপর নির্ভরশীল সৌদিরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভীত। সৌদিদের এই প্রকল্প হয়তো সেই ভীতি থেকেই এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করতে পারছে না। এমতাবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা যেমন বাড়বে, তেমনি সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়বে।

Wednesday, 29 December 2021

মালদ্বীপে পৌঁছেছে বাংলাদেশ?

৩০শে ডিসেম্বর ২০২১

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৩শে ডিসেম্বর মালদ্বীপের পার্লামেন্টে শেখ হাসিনা এক বক্তব্য রাখেন। শেখ হাসিনার এই সফরটা বাংলাদেশ এবং মালদ্বীপের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্যেই শুধু নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্যেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এতকাল দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলি একমাত্র ভারতের প্রভাবের মাঝে থেকেই নিজেদের নীতি নির্ধারণ করেছে। এই প্রথমবারের মতো এই সমীকরণে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

 
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দ্বিতীয়ার্ধে ছয় দিনের জন্যে মালদ্বীপ সফর করে এসেছেন। দ্বৈত কর বাতিল করে বাণিজ্য সহজীকরণ, কারাবন্দী বিনিময়, বাংলাদেশ থেকে মেডিক্যাল প্রফেশনাল নেয়া এবং যুব উন্নয়ন বিষয়ে কয়েকটা সমঝোতা স্বারক এই সফরে স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়াও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মালদ্বীপকে ১৩টা সামরিক গাড়ি উপহার দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফরের মাঝে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট ফয়সাল নাসিম, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহামেদ নাশীদ এবং প্রধান বিচারপতি আহমেদ মুতাসিম আদনানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ২৩শে ডিসেম্বর মালদ্বীপের পার্লামেন্টে শেখ হাসিনা এক বক্তব্য রাখেন। এই সফরটা বাংলাদেশ এবং মালদ্বীপের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্যেই শুধু নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্যেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এতকাল দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলি একমাত্র ভারতের প্রভাবের মাঝে থেকেই নিজেদের নীতি নির্ধারণ করেছে। এই প্রথমবারের মতো এই সমীকরণে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

গত ১৩ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘আবু উবাইদাহ’ চট্টগ্রাম ছেড়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ সফর করা। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর ওয়েবসাইট বলছে যে, জাহাজটা ১৮ই ডিসেম্বর শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে পৌঁছায় এবং ২০শে ডিসেম্বর কলম্বো ছেড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মালদ্বীপ সফরের সময় জাহাজটা সেখানেই ছিল; যদিও জাহাজটা মিডিয়াতে তেমন একটা আসেনি। তবে মালদ্বীপে বাংলাদেশের সামরিক সফর এটাই প্রথম নয়। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক মালদ্বীপ সফরের সময় ৭টা সামরিক পিকআপ ট্রাক উপহার হিসেবে প্রদান করেছিলেন।

তবে এখনও পর্যন্ত মালদ্বীপ অনেক দিক থেকেই ভারতের প্রভাবের মাঝেই রয়েছে। পুরো মালদ্বীপ জুড়ে ভারত ১০টা স্বল্প পাল্লার উপকূলীয় রাডার বসিয়েছে মালদ্বীপের সমুদ্রসীমার উপর নজরদারি করার জন্যে। ২০০৬ সালে ভারত মালদ্বীপকে ৪৬ মিটার লম্বা একটা প্যাট্রোল বোট দেয়। ২০১৩ সালে ভারত মালদ্বীপকে দু’টা ‘ধ্রুভ’ হেলিকপ্টার উপহার দেয়। ২০১৯ সালের আরও একটা প্যাট্রোল বোট দেয় ভারত। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সাথে মালদ্বীপের নৌঘাঁটি ডেভেলপ করার ব্যাপারে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি মোতাবেক মালদ্বীপের ‘উথুরু থিলা ফালহু’ নৌঘাঁটি ডেভেলপ করার জন্যে ভারত মালদ্বীপকে ৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা দেবে। ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ বলছে যে, ভারত মালদ্বীপে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্যে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে। এছাড়াও করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্তি পেতেও ভারত মালদ্বীপকে আড়াই’শ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়েছে। ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ভারত মালদ্বীপকে ২ লক্ষ ডোজ করোনা ভ্যাকসিন প্রদান করেছে।

ভারতের সাথে মালদ্বীপের সম্পর্ক প্রভাব বিস্তারের হলেও মালদ্বীপের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের। মালদ্বীপের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কতটা গভীর, তা কয়েকটা ঘটনার মাঝেই প্রমাণ পাওয়া যাবে। সমুদ্রের পানির মাঝে বসবাস করলেও মালদ্বীপে খাবারের পানির অভাব রয়েছে। প্রতিটা দ্বীপের রয়েছে আলাদা বিদ্যুৎ এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে সমুদ্রের পানি থেকে সুপেয় পানি তৈরির যন্ত্র আগুন লেগে নষ্ট হয়ে গেলে পুরো পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ধ্বস নামে। প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষের খাবারের পানিটুকুও না থাকায় দেশটাতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। এরকমই এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ মালদ্বীপের সহায়তায় এগিয়ে আসে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘সমুদ্র জয়’ ১ লক্ষ লিটার খাবার পানি এবং ৫টা মোবাইল পানিশোধন প্ল্যান্ট নিয়ে রওয়ানা দেয় মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে। সর্বোচ্চ গতিতে ছুটে ৩ হাজার কিঃমিঃএর বেশি সমুদ্রপথ মাত্র ৪ দিনে পাড়ি দিয়ে মালেতে পৌঁছে জাহাজখানা।

 
মার্চ ২০২১। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মেডিক্যাল দল মালদ্বীপে। ভারতের সাথে মালদ্বীপের সম্পর্ক প্রভাব বিস্তারের হলেও মালদ্বীপের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের।


মালদ্বীপ অতি ছোট একটা দ্বীপ দেশ। দেশটার অতি জরুরি সেবার অনেককিছুই নিজেদের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। এর মাঝে রয়েছে প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল সেবা। বাংলাদেশের মেডিক্যাল প্রফেশনালরা মালদ্বীপে সার্ভিস দিচ্ছেন। ২০২০ সালে করোনা মহামারিতে মালদ্বীপের অর্থনীতিতে ধ্বস নামার সাথেসাথে এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ‘সমুদ্র অভিযান’ ১’শ টনের সাহায্য নিয়ে মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। এই সাহায্যের মাঝে ছিল ২০ হাজার সেট পিপিই, ৫ হাজার হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ৯’শ ৬০টা সেফটি গ্লাস এবং ৪০ কার্টন জরুরি ঔষধ। এছাড়াও ৮৫ টন খাবার ছিল জাহাজে। এর পরের মাসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটা পরিবহণ বিমানে করে ১১ জন ডাক্তারকে মালদ্বীপে পাঠানো হয়। ২০২১ সালের মার্চে মালদ্বীপের জনগণের মাঝে ভ্যাকসিনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘সি ১৩০’ পরিবহণ বিমানে করে সামরিক বাহিনীর ২৩ জন মেডিক্যাল প্রফেশনালকে মালদ্বীপে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশের প্রায় এক লক্ষ কর্মী মালদ্বীপের হুলহুমালে দ্বীপ তৈরিতে অংশ নিচ্ছে; যেখানে প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষের থাকার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্প হলো মালদ্বীপের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্প। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই দ্বীপ উন্নয়নের কাজ চলছে। তবে এই দ্বীপ উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ কম নয়। মালদ্বীপে কোন নদী নেই; যেকারণে পলিমাটি জমে মালদ্বীপের ভূমির পরিধি বাড়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। তাই মালদ্বীপ অন্য দেশ থেকে মাটি আমদানি করে হুলহুমালে দ্বীপ তৈরি করছে। এই জায়গাটাতেই মালদ্বীপের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার সুযোগ ছিল এক দশকের বেশি সময় ধরে। ২০১০ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত আহমেদ সারীর বাংলাদেশের নৌপরিবহণ মন্ত্রী শাহজাহান খানের কাছে বাংলাদেশ থেকে মাটি আমদানি করার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছিলেন। একই বছরের অগাস্টে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনকে মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত বলেন যে, তার দেশ প্রতি বছর ৪ লক্ষ টন মাটি আমদানি করছে; যার তিন চতুর্থাংশ আসছে ভারত থেকে। তিনি আরও বলেন যে, বাংলাদেশের নদীর পলিমাটি ভারতের মাটি থেকে উত্তম হওয়ায় তার দেশ বাংলাদেশ থেকে মাটি আমদানিতে বেশি আগ্রহী। ২০১৬ সালের এপ্রিলে মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত মোহামেদ আসিম বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমকে আবারও মাটি আমদানির কথা বলেন। সর্বশেষ ২০২০এর নভেম্বর মাসে মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল্লাহ শহীদ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের সাথে এক ফোনালাপে আবারও মাটি আমদানি করার ইচ্ছার কথা মনে করিয়ে দেন। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পরেও বাংলাদেশ থেকে মালদ্বীপে মাটি রপ্তানি হয়নি। যেহেতু বাংলাদেশের পলিমাটি দিয়ে ভারতের মাটিকে প্রতিস্থাপিত করার কথা ছিল, তাই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন খুব একটা সহজ ছিল না মোটেই। বলাই বাহুল্য যে, মালদ্বীপকে ভারত তার নিজস্ব প্রভাবের অধীন দেশ বলে মনে করে। এখানে বাংলাদেশ বা অন্য কোন দেশের প্রভাব বিস্তারকে ভারত ভালো চোখে দেখবে না। কিন্তু হয়তো এখন সেই ব্যাপারটাই ঘটতে যাচ্ছে, যা কিনা ভারত এত বছর আটকে রেখেছিল।

 
ডিসেম্বর ২০২১। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ 'আবু উবাইদাহ' শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মালদ্বীপ সফরের সময় জাহাজটা সেখানেই ছিল; যদিও জাহাজটা মিডিয়াতে তেমন একটা আসেনি। ভারত, শ্রীলংকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং আরও কিছু দেশ এতকাল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সফর তালিকায় ছিল; মালদ্বীপ ছিল না। জাহাজটার মালদ্বীপ সফর হয়তো 'কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ'এর ম্যারিটাইম অপারেশনেরই একটা রিহার্সাল। এটা পরিষ্কার যে, ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতি শুধুমাত্র ভারতকেন্দ্রিক আর থাকছে না।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘আবু উবাইদাহ’ মালদ্বীপ সফরে গিয়েছে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করার জন্যে নয়। ভারত, শ্রীলংকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং আরও কিছু দেশ এতকাল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সফর তালিকায় ছিল; মালদ্বীপ ছিল না। ২০২১ সালের অগাস্টে শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বোতে ‘কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ’ বা ‘সিএসসি’ নামের একটা নিরাপত্তা সহযোগিতা জোটের মাঝে বাংলাদেশের নাম চলে এসেছে। ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ বলছে যে, ২০১১ সালে শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোটাবায়া রাজাপক্ষের প্রচেষ্টায় শুরু করা এই জোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপের সমুদ্র নিরাপত্তায় ভারতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। তবে ২০১৪ সালের পর থেকে কয়েক বছর মালদ্বীপের সাথে ভারতের সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন চলায় এই কনক্লেভের কর্মকান্ড স্থগিত হয়ে যায়। ২০২০ সালে এই কর্মকান্ড আবারও নতুন উদ্যমে শুরু হয়; এর নামকরণটাও এবারেই আসে। এবারে গোটাবায়া রাজাপক্ষে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট। সেবছরের নভেম্বরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকে শ্রীলংকার প্রস্তাবে ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশ সেইশেল এবং মরিশাসের সাথে সাথে বাংলাদেশকেও এই জোটে ‘পর্যবেক্ষক’ হিসেবে ঢোকানো হয়। এর আগে ২০১৪ সালে সেইশেল এবং মরিশাস ‘অতিথি’ দেশ হিসেবে উপস্থিত ছিল। তবে সবচাইতে বড় ঘটনাটা ঘটে যায় ২০২১ সালের উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকে। এখানেই সিদ্ধান্ত হয়ে যায় যে নতুন তিনটা রাষ্ট্রকে স্থায়ী সদস্য হিসেবে জোটে ঢোকানো হবে। এর সাথে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আরেকটা ঘটনা ঘটে যায়; যা কিনা এই জোটের গুরুত্বকে বাড়িয়ে তোলে। ‘সিএসসি’এর অধীনে ভারত, শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপের অংশগ্রহণে একটা ‘ফোকাসড অপারেশন’ চালনা করা হয়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, এই অপারেশনে তিন দেশের নৌশক্তি অংশ নেয়। ভারতের ‘মনোহর পারিকার ইন্সটিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ এন্ড এনালিসিস’এর গবেষক গুলবিন সুলতানা ‘ফিনানশিয়াল এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক লেখায় বলছেন যে, প্রথমবারের মতো এই কনক্লেভের অধীনে একটা সামরিক অপারেশন করা হলো। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অন্যান্য ম্যারিটাইম নিরাপত্তা জোট, যেমন ‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম এসোসিয়েশন’এর সাথে কলম্বো কনক্লেভের একটা পার্থক্য হয়ে গেলো। তিনি মনে করছেন যে, ভারত মহাসাগরে এই জোট একটা গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পদক্ষেপ হিসেবে সামনে আসতে যাচ্ছে; যার গুরুত্ব আরও বাড়তে যাচ্ছে সেইশেল, মরিশাস এবং বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে।

মালদ্বীপ শুধুমাত্র বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের একটা উৎস হিসেবেই ছিল এতকাল। তবে এই অবস্থানের পরিবর্তন হতে চলেছে। গত ১৯শে নভেম্বর থেকে দুই দেশের মাঝে সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। বাণিজ্য সহজীকরণের জন্যে দুই দেশের মাঝে সরাসরি জাহাজ চলাচলের ব্যাপারেও ঐকমত্য হয়েছে ইতোমধ্যেই। এই প্রচেষ্টা বাস্তবায়িত হলে হয়তো বাংলাদেশ থেকে মালদ্বীপে পলিমাটি রপ্তানিও সম্ভব হতে পারে। আর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ‘বিআইডিএস’এর এক গোলটেবিল বৈঠকে বলেন যে, মালদ্বীপ বাংলাদেশের কাছে দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ চেয়েছে; এবং বাংলাদেশ সেটা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। এর আগে বাংলাদেশ শ্রীলংকাকে আড়াই’শ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে; যখন দেশটা ভারতের কাছ থেকে ঋণ পায়নি। আর ‘কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ’ এমন সময়ে ম্যারিটাইম অপারেশনকে এই জোটের অন্তর্ভুক্ত করলো, যখন শ্রীলংকার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ এই জোটের স্থায়ী সদস্য হিসেবে ঢুকতে যাচ্ছে। হয়তো অতি শিগগিরই বাংলাদেশের যুদ্ধজাহাজগুলিকে মালদ্বীপ, সেইশেল এবং মরিশাস পর্যন্ত সমুদ্রে টহল দিতে দেখা যাবে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ’আবু উবাইদাহ’র মালদ্বীপ সফর হয়তো এরকম অপারেশনেরই একটা রিহার্সাল। এটা পরিষ্কার যে, ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতি শুধুমাত্র ভারতকেন্দ্রিক আর থাকছে না।